(১২২)

পুরনো কয়েকটি ঠাকুরবাড়ির মাথা ছুঁয়ে টুনিবাল্বগুলো সূর্যের দোলাচলের সুযোগ নিয়ে বোধহীন ভাষায় টুপটাপ করে যাচ্ছে। তিস্তা তোর্সা এক্সপ্রেসের বাঙ্কে ঘুমচ্ছিলাম, একজন কুলি এসে বলে গেল যে সরস্বতী পূজো এসে গেছে। বসন্ত না আসুক বসন্ত পঞ্চমী এসে গেছে। দুটো ব্যাগ টেনে শিয়ালদা স্টেশনে নামলাম। অপ্রাকৃতিক আলোগুলোর কাছে গুটি কয় মানুষ যেন ক্ষীণ হয়ে গেছে। জগত সিনেমার কাছাকাছি এক ট্যাক্সিওলা যেচে বাড়ি পৌঁছে দিতে এসে ‘কিছুই নয়’ এমন মুখ করে বলল, ‘একশো টাকা দিয়ে দেবেন!’ রাস্তা পেরতেই অন্য একটা ট্যাক্সির দেখা মিলল- ‘নো রিফিউজাল’। সে বলল ‘পঞ্চাশ’ আমিও বললাম, ‘পঞ্চাশ!’ ব্যাস বসন্ত পঞ্চমী এসে গেছে।

এই দিনটায় বাবা ভোরবেলায় উঠে আলপনা দিত- ঠাকুর সাজাত। মা আর অন্যান্য মহিলারা ফলপাকুড় কাটাকুটি আর পুজোর যোগাড় যন্ত্রে হৈহৈ করত। পাঁচটা পাঁচে বাড়ি পৌঁছে দেখলাম দুজনেই ঘুমচ্ছে। সন্তপর্ণে কড়া নাড়া শুনতে পেল না। গলা তুলে ডাকতেই, তিন ভুবনের পার থেকে সিগনাল এল, দরজা খোলার। বাবা মা এখন সরস্বতী পুজোর সকালে ওঠে না। আমাদের বাড়িতে সরস্বতী পুজো হয় না তা বেশ কিছুদিন হল।

প্রত্যেকটি ক্ষতিই জীবনে কিছু না কিছু ক্ষত বয়ে আনে। নিজস্ব ক্ষত। বছর আটেক আগে আমার ভাইয়ের পড়াশুনো শেষের সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের বাড়িতে সরস্বতী পুজো হয় না। আর এখন সেই তো নেই।

তবু আমি আছি! ষোল বছর পর সরস্বতী পুজোতে আছি আমি। আজকের দিনটায় দেখি কি ভাবে কি করতে পারি। তবে আমার সরস্বতী পুজো কাল হয়ে গেছে।

ইন্সপেকশনের কাজে মানসিক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য মালদায় সালেহা মেমোরিয়াল স্কুল গিয়েছিলাম! বহুদিন ধরে সরকারি সহায়তা তাদের প্রতি বিমুখ। যদি রিপোর্টের ভিত্তিতে কিছু হয় তাই উপোষী মুখের শিক্ষক শিক্ষিকা আর শিশুদের মায়েরা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
P1150176

নেতাজী সুভাষ বঙ্গজীবনের গুটিকয় অ্যাডভেঞ্চারের অঙ্গ। আমরা ছোটবেলাতে বিশ্বাস করতাম সুভাষ ফিরে আসবে। সুভাষ হয়তো ফিরে এসেছিল- হয়তো আসে নি। হয়তো তিনি সাইবেরিয়ার বাঘের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। রূপকথার লড়াই। গল্প শুনি, নেহেরুর প্রাইভেট সেক্রেটারীর সঙ্গে নাকি দেখা হয়েছিল তাঁর। ফিরে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন রাশিয়া থেকে। বাকিটা তো সাউথ ব্লকের গোপন নথিতে, কূটনীতিক সম্পর্কে আঘাত লাগবের পর্দার আড়ালে আত্মগোপন করে আছে। সরকার আসে সরকার যায়, বোফর্স আর সুভাষ কূটনীতিক সম্পর্কের আড়ালে ধুলো মাখে। পুরনো মৃতদেহগুলোকে সরিয়ে নতুন মৃতদেহ আসে। (এটা প্রতিদিন ক্রোড়পত্র থেকে নেওয়া- শেষ বাক্যটি!)

তবুও স্কুলের অনুষ্ঠানে প্রায় দুশো মানসিক এবং শ্রবণিক অসমর্থ বাচ্চাগুলোর সামনে যখন নেতাজীকে নিয়ে বলতে উঠলাম, কেন জানি না মনে হল- এদের কাছেও সুভাষকে এনে ফেলতে হবে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন তাঁর সন্তান বিধানসভা সদস্য ঈশা খানকে। এও যেন রূপকথার নায়ক। বঙ্গ জীবনের বৃহত্তর অঙ্গ রাজনীতির মধ্যেও বহিরাগত। আজ দাঁড়িয়ে ভাবা যায় কেউ বলছে যে আমার পার্টিরও কেউ যদি হাঙ্গামা করে তাহলে পুলিশের কর্তব্য তাকে গ্রেফতার করা। সীমান্ত অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক টেনশন মুক্তির জন্য ঘোষ এবং চা’ মণ্ডলদের দুই পাণ্ডাকেই গ্রেফতার করান ভোটব্যাঙ্কের তোয়াক্কা না করে।

অবশ্য মালদায় গনিখান চৌধুরী যা করে গেছেন তাতে তাঁর উত্তরপুরুষরা অন্ততঃ পঞ্চাশ বছর করে খেতে পারবেন, রাজনীতি করে। এতদিন পরেও সকলেই একবাক্যে স্বীকার করলেন মালদার প্রবাদপুরুষের সমাজ সেবার কথা। সরকারি কাজকর্ম সেরে রওনা দিলাম গৌড়ের উদ্দেশ্যে। শুরুতেই অবশ্য গৌড় পেরিয়ে সীমান্ত- কোতোয়ালি গেট, বিএসএফ চেকপোস্ট, নো ম্যান্স ল্যাণ্ড আর ‘বাংলাদেশে স্বাগত’ হোর্ডিং। একবার ভুটান সীমান্ত পর্যন্ত গেছিলাম ওয়াগায় যাওয়া হয় নি। এটাই আমার সদ্য সদ্য বিদেশ ভ্রমণের ঘোল। দুপাড়ের সবুজ আর সোনা রঙ কিন্তু একই মনে হল। মনগুলো বোধহয় আলাদা হয়ে গেছে। নাকি হয় নি! রাজনৈতিক মন্তব্যের স্থান নেই। কূটনীতিক অবস্থান নড়ে যেতে পারে, তাই।
P1150203

P1150205

মালদার সবকিছুই গৌড়ের নামে। বিশ্ববিদ্যালয়, গেস্ট হাউস, ট্রেন, বিড়ির দোকান, ফ্লাইওভার এমনকি ইঁটের নামও গৌড়। গৌড়ের ইঁট তুলে নিয়ে এসে শতশত গ্রাম শহরের বাড়ি তৈরী হয়েছে। এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে অতীত বৈভবের কাহিনী। স্বাধীনতা সংগ্রামের আগে বাংলা বলে যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে সে শশাঙ্কের গৌড়, পাল বংশের, বল্লাল- লক্ষ্মণ সেনের গৌড়, সুলতানি গৌড়ের প্রতিপত্তি।

কেন্দ্র সরকার থেকে নাকি চেষ্টা করা হয়েছিল, লক্ষণ সেনের কোষাগারের সন্ধান করতে। তার বদলে প্রত্নতাত্ত্বিকরা যা খুঁজে বার করলেন তা হল বল্লাল বাটি। সেই ‘বোঝে না সে বোঝে না’-র গান, ‘কঠিন, তোমাকে ছাড়া একদিন’- এখানেই হয়েছিল। ইতিহাসের বুকে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি- এমন সময় দুটি বাইক এসে থামল! তারাও বোধহয় ইতিহাস খুঁড়তে এসেছিল। কিন্তু আশাহত হল, ‘পাঁউরুটির কারখানা’ দেখে! আমার সঙ্গী ড্রাইভার আমাকে বোঝাতে গেলেন, “পড়াশুনো করে নি তো, তাই!” ইতিহাসের গৌরবেও (নাকি গৌড়বে!) আঁচ লাগতে দেয় না গৌড়বাসী।

P1150210
P1150222

এগিয়ে গেলাম জাহাজ ঘাটার দিকে মহানন্দার মরা খাতের পাশে জাহাজ ঘাটের ইতিহাসের থেকে মন টেনে নিল, পয়রা গুড়ের গল্পে। এক গ্রামবাসী অসমর্থ খেজুর গাছে দাগ দিয়ে হাঁড়ি বসাচ্ছেন। রাত পোহালে সূর্যের ছোঁয়া লাগার আগেই তাকে নামিয়ে ফেলে জ্বাল দিয়ে ফেলতে হবে। তারপর? অমৃতের সন্ধান অমর্ত্যদের জন্য!
P1150229

P1150231

ফিরে আসতে আসতে চামকাটি, চিকা, লোটন মসজিদ পেরিয়ে কদম রসুল মসজিদ। হজরত মহম্মদের পায়ের ছাপ। আর তার কিছুটা দূরেই রামকেলী গ্রামে চৈতন্যদেবের পায়ের ছাপ। ধর্ম কর্মের পথচলা পায়ে পায়ে ধুলোয়ে এক হয়ে মিশে যায়।
P1150254

P1150248
বারো দুয়ারি- দুয়ার বারো কিন্তু উন্মুখ এগারো। একটি দূর থেকে চম্পার মতো তাকিয়ে থাকে এগারো ভাইয়ের দিকে।

সন্ধ্যা নামে, অতীত ‘গৌড়’বের বাংলার সূর্য কি সত্যিই অস্তাচলে যাচ্ছে? জীবনের সর্বক্ষেত্রে রাজনীতি ত্যাগ না করতে পারলে কিন্তু তাই হয়ে যাবে হয় তো।

ছোটবেলায় বাড়ির পুজো ছাড়াও সুখস্মৃতি ছড়িয়ে আছে স্কুলের দেওয়ালে দেওয়ালে। ঠাকুর আনা ফল কাটা, পুজো করা, মাঞ্জা দেওয়া আর শেষমেশ ধুতি পরে ক্রিকেট। বঙ্গজীবনের ভ্যালেন্টাইন্স ডে এখন টাকের মতন স্মৃতি নিয়ে আছে এপারে ওপারে।

আমাদের ক্লাব নারকেলডাঙা সাধারণ সমিতির এক পুজোয় বাজারের দায়িত্ব ছিল আমার। পঁচিশ কিলো আলু আর তিরিশ কিলো ফুলকপি দু কাঁধে চাপিয়ে ফিরেছিলাম শুধুমাত্র মুটের দশটাকা বাঁচানোর জন্য। একা হাতে এক হাঁড়ি দধিকর্মা মাখা। আর গোটা সেদ্ধ। আজ রাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চক্করে দিল্লি কখন গিয়ে পৌঁছব জানি না। তবে কালকে গোটা সেদ্ধ তো খেতেই হবে। আর আর নারকেলে কুল? বাজারে বাজারে সেগুলো তরমুজের মতো বড় হয়ে পেকে গিয়ে কুমড়ো হয়ে যাচ্ছে আর আমি বসে আছি সরস্বতী পুজোর অপেক্ষায়। ছেলেবেলার সংস্কার বলে কথা। নারকেলে কুল নাকি সরস্বতী পুজো না হলে খেতে নেই। তাই সই।
P1150181

আজ দুপুরে হয়তো একবার স্কুলে যাব- আর একবার বইমেলার মাঠে যাব। ষোল বছর পর- এখন বইমেলাই তো আমার কাছে সরস্বতী পুজো হয়ে গেছে। ফিসফাসের কাছেও। আপনারাও আসবেন কিন্তু ৪৫৭ নং স্টল। সৃষ্টিসুখ আর ফিসফাসের জন্য! সরস্বতী বানান কি বলুন দিকি? নইলে লবডঙ্কা!

6 thoughts on “(১২২)

  1. সরস্বতী পুজোর সঙ্গে বইমেলার, নারকেলি কুলের, ভোরের কুয়াশার, ছোটবেলার আর খিচুরী-লাবড়ার যার সাথে আপামর বাঙালি নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারবে, সেগুলো এমন সুন্দর করে এক সুতোয় বুনে পরিবেশন করার জন্যে তোকে কুর্নিশ। দারুন উপভোগ করলাম। আর সেই সঙ্গে বড় হয়ে যাওয়ার হতাশা, বয়েস তো উল্টোবাগে বয় না, যদি বইত , আবার করে ছুঁতে চাইতাম সেইসব স্মৃতিদের, আবার হলদে সাড়ি পরে মায়ের পায়ে-পায়ে ঘুরে যোগান দিতাম, লুকিয়ে কুল খেয়ে পিঠে দুঘা খেতাম, সবচেয়ে কঠিন বইটা এনে পায়ের কাছে রেখে মনে মনে বলতাম ‘এইবার যেন ভালো হয়, দেখো একটু’।🙂

    Liked by 1 person

  2. আমাদের এখানেও হয় সরস্বতী পুজো। এই পুজোর আমেজটাও একটু আলাদা। এখন যদিও পুজো দেখার সময় তেমন একটা হয়ে ওঠে না।
    লেখাটা ভালো লেগেছে। একটা আফসোসের জায়গা আছে বুঝতে পারছি। কিন্তু কি করবেন বলুন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে আফসোস বা দুঃখ বাড়বে এটাই যে জীবনের ধর্ম।

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s