(১২৩)

শেষ যে বারে কোলকাতা বইমেলায় এসেছিলাম সেবার আগুন লেগে গিয়েছিল আর আমি মনের সুখে পোড়া কাঠ আসবাব পেরিয়ে পোড়া বইয়ের গন্ধ নেবার জন্য জঞ্জাল ঘেঁটেছিলাম। পুড়ে যাওয়া খালিল গিব্রান তুলে নিয়ে সযত্নে রেখে দিয়েছিলাম যদি কখনো তাকে মনে পড়ে বলে।

তারপর তো গঙ্গার জল যমুনায় এসে শুকিয়ে পালংশাকের ক্ষেত হয়ে গেছে… সেও অনেক বছর হল। ফিসফাস প্রথমবার যখন বার হল। তখনও কবে আসবে কবে আসবের চক্করে আসতে পারি নি। গত বছর তো আমার কন্যাটির ভূমিষ্ঠ হবার সময়, তাই প্রশ্নই নেই। কিন্তু এবারে ছাড় নেই, একে তো দুই নং ফিসফাস মুখ দেখাচ্ছে তার উপর ষোল্লো বছর পর বইমেলায় হাঁটার উত্তেজনা। সব মিলিয়ে একেবারে চলচ্চিত্রচঞ্চরী। দেবজ্যোতিদাকে জানালাম আসছি। দেবজ্যোতি দা আমায় বললেন, “আমার নাম কিন্তু দেবাশিষ নয়, দেবজ্যোতি!” আমি আর কি বলব? গরু হারানোর পর ফিরে পাওয়ার আনন্দে দন্তরুচিকৌমুদী।

তবে সে বত্রিশ পাটি আর বাইরে বেশীক্ষণ থাকল না। কাল অফিস থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরচ্ছি। শিয়ালদা রাজধানী ধরব বলে। নীচে নেমেই দেখি, আমার গাড়ির ঠিক পিছনেই এক সফেদ স্যান্ত্রো বেমালুম হ্যাণ্ডব্রেক সহকারে দাঁড়িয়ে। কি করি? গাড়ি ঘুরিয়ে কাশীর গলি দিয়ে বেরোতে গিয়ে দিয়েছি এক ঠোনা। ব্যাস গাড়ির মালিক সিআরপিএফ-এর সাবইনস্পেক্টর এসে জাঠ ভাষায় তুই তোকারি করে এক ঝটকায় টেনে নামাল। গাড়িতে ঠোনা মারা হয়তো দোষের কিন্তু পাঠক পাঠিকারা নিশ্চয় মানবেন গায়ে হাত তোলাটা অধিক দোষের। আমি তবুও যথেষ্ট সম্ভ্রম দেখিয়েই বললাম ঠিক ভাবে কথা বলতে। কিন্তু সে তো ইউনিফর্মের গরমে ফার্নেস। শেষে আমার নিজের অধিকার এবং আধিকারিক অবস্থান জানাতে আরও দেখি ক্ষেপে গেল। এবং সবথেকে খারাপ হল, যখন সে তার করা প্রতিটি অকাজ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিল। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে ট্রেন ধরার তাড়া, এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের অনুরোধ, “আপ তো পড়ে লিখে হো। মাফি মাঙ্গ লো!” (যেন পড়েলিখে হবার প্রথম শর্তই হল আত্মসমর্পন)

যাই হোক বুকে পাথর চাপিয়ে নিজেকে সিভিলিয়ান রূপী কুকুর ঘোষণা করে জাঠ ভাইকে বললাম যে ভাই শুধু এই কৃতকর্ম নয় সারা পৃথিবীর সমস্ত রকম অন্যায় অবিচার অনাচারের জন্য আমি ক্ষমা চাইলাম। অন্য কথা ভাবতেই পারতাম বিশেষত সে যখন সাদা স্যান্ত্রোর পিছনে আমার লাল স্পার্কের চুম্বনের খরচ নেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল তখন তো প্রায় ভেবেই নিয়েছিলাম ষোলো বছরের বিরহ যাক চুলোর দোরে। পুলিশে এবং সরকারী সামরিক ক্রিয়াকলাপ সম্পূর্ণ করেই তবে নিঃশ্বাস নেব। আমার সরকারী অফিসের চৌহদ্দির মধ্যেই যদি আমারই এমন অবস্থা হয় তাহলে রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষ কি অবস্থার মুখোমুখি হয় দিবারাত্র। সাধে কি আর লোকে কেজরিওয়ালের ওয়ালে নাম লেখাতে উঠে পড়ে লেগেছে? সে যতই তার রাজ্য চালানোর ক্ষমতায় প্রশ্নচিহ্ন থাকুক না কেন। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনউষ্মাকে কাজে লাগিয়ে।

যাই হোক, যে কোনভাবেই হোক, কেটে যাওয়া দুটো কানকে জুড়ে নিয়ে বাড়ি ফিরেই রওনা দিলাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে। বাক্সপ্যাঁটরাদের এতদিনের জন্য ছেড়ে যাব ভেবেই কেমন মনে হচ্ছিল। কিন্তু প্রকাশকের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা বলে কথা।

শিয়ালদা রাজধানীর খাবার দাবারের অবস্থা দিনে দিনে সঙ্গিন হচ্ছে। যাই বলুন না কেন, “সবই ব্যাদে লেখা আছে!” বলে কাটান দেওয়া লেগেই ছিল। সত্যিই ট্রেন সফর যদি এতই হ্যাঙ্গাম হয় তাহলে আর সরকার বদলেই বা কি লাভ হয় বলুন দেখি? সাধারণ মানুষের তো আগাতেও কাটা হয় আর গোড়াতেও!

তবুও সহযাত্রীদের দৌলতে আমার শহরে এসে পৌঁছলাম আর কোনরকমে নাক মুখ চোখে দুটি গুঁজে ছুট লাগালাম সৃষ্টিসুখের স্টলে।

রোহণ আর নিরুপম দা আর রূপঙ্কর দা আর দেবজ্যোতি দা আর ইন্দ্রনীল দা আর অতনু আর অমিতাভ দা, দোয়েলপাখী আর সন্দীপন আর কিশোর দা আর সুমেরু দা, পিনাকী আর অর্ঘ্য দা,আর উল্কা আর বৈজয়ন্ত দা, আর অরুনদা, দীপ্তি দি পেরিয়ে পার্থ, শুদ্ধসত্ত্ব। আহা বইমেলায় মেলা বই থাকলেও চোখ মেলে মন মেলে আড্ডা দেওয়া যায়।

রোহণ আবার নিজের ডাইরি হারিয়ে এর ওর পাতা থেকে নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল কিন্তু শেষ রাতে সেটাও ফিরে পেল। মাহরুফ গল্প শোনালো দিল্লির বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন তাকে নাকি ডিস্কাউন্টের উপর ডিস্কাউন্ট লাগিয়ে বইয়ের চেক নিয়ে যেতে বলেছে। আমি আবার আশ্বস্ত করলাম যে কোথাও কিছু ভুল টুল হয়েছে। মাঝে মাঝেই বেরিয়ে বুড়িয়ে এলাম এপাশ ওপাশ থেকে। মিলন মেলার সর্বোদ্দীপক যজ্ঞে নিজেকে এতদিনে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঙ্গ মনে ভেবে নিতেও ভাল লাগছিল। নিরুপম দা আবার আমায় সেলিব্রেটি বানিয়ে ছেড়ে দিলেন। উল্কা এসে তার বিজিটোনের সমালোচনা পড়ালো। (আমার অবশ্য মনে হল, উল্কার লেখা পড়ে তার ভাল লেগেছে বলে সামনা সামনি দেখবে বলেই গাল পেড়েছে। কিন্তু উল্কার মতে অন্যথা!)

বই আর আলো আর মেলা আর খাবার দাবার। তার মাঝে রসভঙ্গ করতে চোঙা মুখো মাইকরাও আছে। তবে সব মিলিয়ে যে জাঁদরেল পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে তা দেখে মন্দ লাগছে না।

তবে কোলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে অচেনা অজানা লোক ফিসফাস নিয়ে যাচ্ছেন দেখেও আরাম হল। দিল্লি তো নিজের জায়গা। কিন্তু সিংহের গুহায় যদি নেচে আসতে পারি তবেই কি না আমিও সিঙ্গি!

পাঠক পাঠিকারা, ফিসফাস ২ ও ১ ভরপুর কিনুন সঙ্গে কিনুন নতুনদের জন্য নতুন বই। সৃষ্টিসুখে দৃষ্টিসুখ আর মিষ্টিমুখ করতে চলে আসুন মচমচিয়ে ৪৫৭ নং স্টলে। কাল রোববার বন্ধুবান্ধব ক্রেতা বিক্রেতা নিয়ে মোচ্ছব করতে প্রস্তুত হচ্ছি। উফ কি যে উত্তেজনা হচ্ছে মাইরি। পুরো সাতদিন বইয়ের ধুলো চাটব। দিল্লিতেও এই সৌভাগ্য হয় না যে।

প্রয়োজনীয় পুনশ্চঃ দোয়েলপাখী আর অমিতাভ দা আমার হাতে এসে রসাতল দিয়ে গেল। আমার ভাইটার শেষ লেখা ‘রাণীকাহিনী’। কিছু কিছু সুখ- দুঃখ শেষ হয়েও শেষ হয় না যে। কি যে করিস না! রুলায়গা কেয়া পাগলে?

Advertisements

3 thoughts on “(১২৩)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s