চোদ্দই ফেব্রুয়ারী- কিছু বিক্ষিপ্ত বক্তব্য


এই দেখুন, আমি কিন্তু কিছু করি নি। মানে আমায় অভীক মাথায় গোলাপ ফুল ঠেকিয়ে কসম টসম খাইয়ে লিখতে বলেছে। এমনিতে ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে আমি জম্মে কিস্যু লিখে উঠতে পারি নি! না না ভুল বললাম, বেশ বছর চারেক আগে তেরোই ফেব্রুয়ারিতে ‘লা বেলা পারসোনা’ বলে একখান ইংরাজি সাবটাইটেল সহ ফরাসি সিনেমা দেখে চেগে গিয়ে কবতে কপচে ফেলেচিনু “হেই বিউটিফুল” বলে। তা সে কবতের কি হয়েছিল সে দুঃখের কাহিনী আর কোথায় বলব। খালি এটা জানি ষাটের দশকে সনি রামাধিনের সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এক বাঁহাতি স্পিনারের নাম ছিল অ্যালফ ভ্যালেন্টাইন।

আর ওমনিতেও দেখতে গেলে ১৪ই ফেব্রুয়ারী নিয়ে সাহেবদের মাথাব্যথা আমাদের ঘাড় বেয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে সেই ‘দিল তো পাগল হ্যায়’-এর সময় থেকে। গোল বেলুনের মাঝখানে রদ্দা মেরে পানের মতো বানিয়ে তাপ্পর বাণিজ্যিক দর নির্মাণ এবং সব শেষে মুরগী জবাই। তারপর আর্চিস আর কী সব যেন জুড়ে টুরে একদম ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ অবস্থা।

তা আঙুল ফুলে কলাগাছ হলে তার নিদান পুলটিস সবই জুটে যায়। এখানেও মরাল পুলিস কচি কচি থোকা থোকা মেঘেদের ছানাদের মরাল গ্রীবা ধরতে উদ্যত হতে শুরু হল। কিছু অবিশ্বাসী চারকদমে জোরকদমে ঘোষণা করতে শুরু করল যে আমাদের জন্য বছরের ৩৬৫ দিনই প্রেম দিবস তাই বিশেষ দিনের প্রয়োজন নাই। কিন্তু মাঝখান থেকে আপামর শহরাঞ্চলের লাল পান বেলুনদের গাল ফোলা গোবিন্দ হয়ে ব্যবসায় বৃহস্পতি তুঙ্গে উঠল। টাইটান থেকে শুরুর করে পাঁড়ে ফ্লাওয়ারস সবাই রেস্তের ঝনঝনানি বাড়িয়ে ফেলল।

এইবার আমার হল শিরে পৌষ পাব্বন। লিখতে বসেছি ভ্যালেন্টাইন নিয়ে ভয়ানক গদ্য সেখানে পাঁচ পাতা জুড়ে খালি সারে গামা আলাপ করাই সার। তাহলে একটু ইতিহাস বা উইকিপিডিয়ার পাতা উলটে দেখি আসুন, ভ্যালেন্টাইনটা খায় না মাথায় মাখে?

উইকিপিডিয়া সোজা সাপটা বলছে ১৪ ফেব্রুয়ারীটাকে ভ্যালেন্টাইনের দিন বলে ক্যাথলিকরাই মানে। জনশ্রুতি আছে, ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইন’স নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচার-অভিযোগে তৎকালীন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাঁকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছিল। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইন’স স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন’ দিবস ঘোষণা করেন।

পূর্ব ইউরোপীয় অর্থোডক্স চার্চ আবার ভ্যালেন্টাইন্স ডে উদযাপন করে ৬ই জুলাই। এবারে আসুন ভ্যালেন্টাইন্স দিবস সম্পর্কিত অন্যান্য রীতিনীতি ঘেঁটে দেখি। ইংল্যাণ্ডের নরফোকে এখনো সেন্ট নিকোলাসের মতই জ্যাক ভ্যালেন্টাইন্স বলে এক কাল্পনিক চরিত্র বাড়ির পিছনের দরজায় মিষ্টি কেক এবং উপহার রেখে যান।

শ্লোভানিয়ায় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন বা স্থানীয় ভাষায় জ্রাভকোকে বসন্ত এবং বীজবপনের সন্ত হিসাবে বর্তমান। ১৪ই ফেব্রুয়ারী থেকে বসন্ত আগমনের সূচনা হয়। নবজীবনের বার্তা বয়ে আনেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন।

সত্যি কথা বলতে কি ভ্যালেন্টাইন যে কিভাবে প্রেম ভালবাসার সঙ্গে জুড়ে গেল তার কোন প্রাচীন যুগের প্রমাণ নেই। চসারের পদ্যতেই প্রথম প্রেমের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তার আগে তো প্রেম দিবস ছিল ১২ই মার্চ সেন্ট গ্রেগরী দিবসে।

যাই হোক কবিকুলশিরোমণি চসারের দয়ায় ১৪ই ফেব্রুয়ারী লাল বেলুনের মর্যাদা তো লাভ করল। কিন্তু তা এইরকম ভয়ানকভাবে দেশে দেশে ছড়িয়ে গেল কি ভাবে? আসলে সাহিত্যের একটা বিশাল বড় প্রভাব রয়েছে, ভ্যালেন্টাইন্স দিবসের কবিতা দেখতে গেলে চসার পেরিয়ে শেক্সপিয়ার হয়ে জন ডান এমন কি নার্সারি রাইমেও দেখি

গোলাপেরা লাল, ভায়োলেট চুমি
মধু হলে মিঠে মধুভাষী তুমি
আমি তুমি মিলে প্রেমে একাকার-
তোমাকে আমার মেনেছি যে সখী
ভ্যালেন্টাইন লটারিতে দেখি
আহা কি যে শোভা
মন মনলোভা
তুমি যে আমার আমি যে তোমার।।

এহে সেই ‘রোজেস আর রেড’-এর অক্ষম অনুবাদ। ক্ষমা টমা করে দেবেন।

সে যাই হোক অষ্টদশ শতকেই আমরা দেখতে পাই গণহিস্টেরিয়া বিশেষত ইংল্যাণ্ডে উর্ধগামী। তবে গোঁড়া পিউরিটানিজম তো সব জায়গাতেই থাকে। ইংল্যাণ্ড এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশেও কখনো না কখনো প্রেম ভালবাসার নামে তথাকথিত উদ্দাম বেলেল্লাপনার উপর ধর্মের খাঁড়া নেমে এসেছে।

তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রেম দিবস পালনের হিড়িক সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বোধহয় উনবিংশ শতকে এসে। ততদিনে গ্রিটিংস কার্ড চলে এসেছে। বাজারও বুঝে গেছে শুধুমাত্র নাতির অন্যপ্রাশন ছেলের বিয়ে আর মেয়ের সন্ধ্যাহ্নিকের গুটি কয়েক কার্ড বিক্রি করলে তার পেট চলবে না। অতএব চালাও পানসি খালাসিটোলা। ভারত বর্ষ চিরকালই এইসব ব্যাপারে পেটে কথা মুখে লাজ। ঘোমটার আড়ালে প্রিয়তমার মুখই বুঝতে পারে না তো গ্রিটিংস কার্ডে ‘আই লব ইউ’। রোসো বাছা, বয়সটা আরও একটু বাড়ুক না হয়।

কিন্তু ম্যাচিউরিটির চক্করে পরাণ যায় জ্বলিয়া। প্রেম শুনবে কেন। সে এতদিন ধরে নীরবে দুয়ারপ্রান্তে বিদ্যাসাগরের ছাতার মতো পড়ে থেকে থেকে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাই বাণিজ্যিক সাহায্য নিয়ে গর্জে উঠল, ভসভসিয়ে সোডার মতো গ্যাসের মতো ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল। প্রেমহীন সমাজকে। কিন্তু সমাজের প্রাণে তো প্রেম দেয় নি কবি। সে জানে সময়ের গাড়ি চলতে থাকলেও লটবহরকে শতাব্দী প্রাচীন সিন্দুকের ভিতরেই ভোমরার প্রাণের মতো কিভাবে ভরে রাখতে হয়। তাই অচলায়তনে উঠলো বোল, ‘হর হর মহাদেব’ ‘আল্লা হো আকবর’।

ইউরোপ অ্যামেরিকা এসব দেখে দেখেই বড় হয়েছে। তাই তারাও গতি বাড়ালো। বাজারও বাড়ালো চাপ। প্রেম নেই তো কি হয়েছে? প্রেমের জন্য ভ্যালেন্টাইন নাকি ভ্যালেন্টাইনের জন্য প্রেম? আগে দিনটাকে রঙিন করি, জীবন তো বহুদূর পথ, তোমাকে চাইতে এখনো অনেক দেরী।
অন্যদিকেও গোঁসাইপুর সরগরম- ধর তক্তা কর বিয়ে- সুশীল সমাজও ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভ্যালেন্টাইন্স ডেতে দোকা দেখলেই ফেবিকল।

এসবের জাঁতাকলে পড়ে প্রেম কেমন জানি ছটফটিয়ে ওঠে। প্রথম দেখার উজ্জ্বল স্মৃতিটাকে হাতড়ে নিয়ে বিশবছর পরের সকালে একটু ছোঁয়া একটু বিশ্বাস একটু নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু শুকনো বেলুন বাদাম আর চকোলেটে চিঁড়ে ভেজে না। শুল্ক? শুল্ক দিয়েছ? ন্যাহ দাও নি? বিরহহীন জীবন তখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

প্রেমহীন হরিমটর আর বাস্তবের খরকেকাঠি তখন এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় দেখ। এর মধ্যেই পাঁচু বলে ওঠে, “ওরে বাঙালীর ভ্যালেন্টাইন তো সরস্বতী পুজো! সেই লাল পাড় সাদা শাড়ির পেঁচীর জন্য হাজারটা লাল গোলাপ কুরবান, মেহেরবান কদরদান!” সকলে কনুই ধরে টেনে পাঁচুকে বসিয়ে দেয়।

মোলো যা! হচ্ছে খটখটে বাজারের ওঠানামার কথা ইতিহাসের কথা ইতিহাসহীনতার কথা! কোথথেকে নরম সরম মরাল গ্রীবার হংসবাহিনীকে এনে হাজির কল্লি। এখুনি মরাল পুলিশকে ডাকছি।

ব্যাস তার পরেই গেরুয়া, লাল, সাদা, সবুজ আর না জানি কত না ঝাণ্ডা ডাণ্ডা দুলিয়ে শিং নাড়িয়ে এ বলে আমায় গুঁতো ও বলে আমায় গুঁতো। রিয়ালিটি টিভি- একটু চোখের জল, একটু নাক কোঁচকানো, একটু ভ্রুপল্লব, একটু ঠোঁট কামড়ানি আর একটু অন্তঃসারশূন্য বোকা বোকা ‘আই লব ইউ’।

আসলে সবই তো দড়ির উপর ট্রাপিজ খেলা, একটু ধাক্কা দিলেই নীচে ধরে থাকা জালে বন্দী। পালাবার পথটি নেই।

তাই বাপু বলি কি, এদেরকে ভ্যালেন্টাইন ভ্যালেন্টাইন খেলতে দাও, চাই কি একটু শিবসেনা বানরসেনা কুরবানি সেনাও খেলতে পার। দরকার হলে প্রিয়তম বা প্রিয়তমাকে একটা বৃন্তচ্যুত গোলাপ একটা মোমদানি একটু যত্ন দিয়ে দিনটা কাবার করে দাও। কিন্তু বাকি দিনগুলোকেও মাঝে মধ্যে কক্ষচ্যুত করে নিয়ে নিজেদের করে তুলতে ভুলো না।

আর যাদের প্রাণে প্রেম দিলে না তাদের? উৎসবের দিনে তাদেরকেও ভুলো না হে প্রেমিক পাগল। আনন্দ তো ভাগ করলেই বাড়ে। মন্দির মসজিদ গীর্জা গুরুদ্বারে না হলে নিজের হৃদয় মাঝে তাদের জন্যও এক ফোঁটা জল বরাদ্দ রেখ।

শেষপাতে একমুঠো গালিব রেখে যাইঃ
আভি মশরুফ হুঁ কাফি, কভি ফুরসত মে শোচুঙ্গা
কে তুঝকো ইয়াদ রাখনে মে ম্যায় কেয়া কেয়া ভুল যাতা হুঁ

ওয়াহ ওয়াহ!! আর একটা প্লিজঃ
হামকো মালুম হ্যায় জন্নত কি হকিকত লেকিন
দিল কো খুশ করনে কা, গালিব, ইয়ে খয়াল আচ্ছা হ্যায়!!

(আদরের নৌকায় প্রকাশিত)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s