(১২৮)


মাঠ
সবুজ সবুজ ঘন সবুজ ঘাসে ঘাসে পা ফেলে চোখে চোখে হাতে হাত মন মজে যায় মাঠে। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড তখন সবুজের অভিযানে মগ্ন। দিনের মধ্যে মিনিট পাঁচেক সবুজদের দিকে তাকিয়ে বসে থাকুন মন সবুজ হয়ে যাবে পাঠক পাঠিকারা। সবুজের কতই না রঙ, কচি সবুজ পাকা সবুজ, হলদেটে সবুজ, নেড়া সবুজ, ঘন সবুজ, জংলা সবুজ, জলপাই সবুজ। আরে মনটাই তো সবুজ, সবুজ দ্বীপের রাজা!

২২ গজ
ঘন সবুজ হলদেটে ছোপ কোথাও কোথাও এক ফোঁটা টাক তার মাঝখানে একফালি মরূদ্যান সাদাটে স্বর্গের মতো দুপাশে স্বর্গ নরকের গেটে তিনখানি খুঁটি পোঁতা। লাগলে তুক না লাগলে তাক। লাগলেই লাল আলো জ্বলে উঠবে আগুনের। C’mon Man, pitch it on the right spot… সারা জীবন ধরে সঠিক জায়গাটাই খুঁজে গেলাম, যেটা পড়লেই উইকেট বাঁধা, কেউটের ছোবলের মতো স্পিন, বেহালার সুরের মতো স্যুইং, করাতের মতো কাট, স্বপ্নসুন্দরীর মতো ল্যুপ, ব্যাটসম্যানের চোখে মুখে লালা ঝরিয়ে তাকে লক্ষণ রেখার বাইরে টেনে এনে রাবণ বেশধারী ফ্লাইট… Pitch it on the right spot baby!

উইলো
৮৫র সেপ্টেম্বরে গুলমার্গ থেকে একটা পার্চমেন্ট লাগানো কাশ্মীর উইলো কিনেছিলাম। ৬৫টাকা দাম। তারও পরে ৮৭তে ২১০ টাকায় এসজি স্ট্রোকওয়েল। কাশ্মীরি উইলো। ৯২তে এসে প্রথম ইংলিশ উইলো এসজি সেঞ্চুরি। সেটা এখনো রয়ে গেছে মাঝে মাঝেই নেড়ে চেড়ে দেখি, ব্যাট সুইংটা ঠিক আছে কি না। বাবা দেখে বলল, এখন আর কি হবে? অফিসেও তো খেলিস না! স্বপ্নে ম্যকগ্রা আর শোয়েবকে সামলানোর তো হিসাব থাকে না কোন। লাভ ক্ষতি সব স্বপনে মিলিয়ে যায়। Follow the seam Man, নতুন বল পালিশ তোলা অবধি অফস্টাম্পের বাইরে খুচখুচানি নয়। ছাড়া প্র্যাকটিস করো কাকা। ধরার থেকেও ছাড়া বেশী জরুরী। ছাড়তে ছাড়তে সন্ন্যাসী হয়ে গেলেও ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু বিনা যুদ্ধে ক্রিজ ছাড়বে না কখনও। খাড়ুশ! রবি শাস্ত্রী-আর্থারটন-গ্যারি কার্স্টেন!

কিন্তু উইলো তো তুলি! ছবি আঁকতে ডাক পড়ে তাই ভিশি-আজ্জু-মার্ক ওয়া- আর ডেভিড গাওয়ারের। গল্প গাছা যা আছে সব ব্যাটসম্যানদেরই আছে। কজনই বা ইমরান খান হয় বলুন?

চেরি অন দ্য টপ
লাল চামড়ার চারটে টুকরো, ভিতরে কর্ক আর উলের বোনা। তার উপরে ঠিক হিসাব করে ছটা সুতোর সেলাই, লাল সাদা লাল সাদা লাল। গনগনে আগুনের মতো তেড়ে এসে আছড়ে পড়ছে বুকে হেলমেটে হাতে গ্লাভসে প্যাডে বা ব্যাটে। না পারলেই উইকেটকিপারের দস্তানা বা কাঠের কফিন তৈরী গুঁড়িয়ে দেবার জন্য। ফাইট কোনি ফাইট!

রোলার

ছোটবেলায় “তোর বাবা ইডেনে রোলার চালায়” বলে আমায় মাসির বাড়িতে খেপাত। আরও একটু পরে রোলার হেভি রোলার মিডিয়াম রোলার ঘুরে রোলারে মেরে রিফ্লেক্স ক্যাচ প্র্যাকটিস। তার পর দেখতে দেখতে বর্ষা হেমন্ত শীত বসন্ত পেরিয়ে কত যে রোলার বুকের উপর দিয়ে চলে গেল। পিচ তবু অসমান হয়েই রয়ে গেল। লাইফ লাইন- জীবন রেখার মতো। আশির দশকের শেষের দিকে এমকে রায়না আর তনভি আজমি-র একটা সিরিয়াল হতো লাইফলাইন। এখন সেই ধরণের সুন্দর ছোট ছোট আবেগ সিরিয়ালে দেখা যায় না। সকলেই ম্যাক্সওয়েল সকলেই বিগ শো।

আজাহার
আজ হার কিন্তু কাল জিত। ধনুক ভাঙা জ্যা মুক্ত স্কোয়ার ড্রাইভ, জিভ বার করে অ্যাব্রাকাড্যাব্রা লাঠিখেলা, কব্জি মুচড়ে এক্সট্রা কভার থেকে ফাইন লেগ, এক অ্যাকশনে বল ধরে উইকেটে তাক। স্লিপে দুরন্ত রিফ্লেক্স ক্যাচ। কলার তোলা মস্তানি, সঙ্গীতা বিজলানী, আমদানি রপ্তানী। বাঁজারা হিলসে বাড়ি, ফিক্সিং-এ ভাব আড়ি। নিরেনব্বুইয়ে তীরে এসে তরী ডোবে। স্বপ্ন ভাঙতে পনেরো বছর সময় লাগল। পনেরোটা বছর। কৈশোর তখন ক্লিন শেভেন যুবক। কেন কেন কেন? মিয়াঁ কাপ্তান বনোগে?

আক্রম
সাতাশির দুপুর ইমরানের চওড়া বুকের কাপ্তানিতে লম্বা চুলের ব্রণের ক্ষতময় মুখ। অদ্ভুত দুলে এসে আউট স্যুইং ইন স্যুইং অফ কাটার শর্ট আর্ম বাউন্সার, ইয়র্কার আর রিভার্স। পেস বোলিং অন্য ভাবে লেখা হয়ে গেল। শারজায় হোক বা এজবাস্টনে, মেলবোর্ণ বা জর্জটাউন, চেন্নাই বা কেপটাউন- ডায়বেটিস আর ভয়ঙ্করতম কাঁধের অস্ত্রোপচার পেরিয়ে, সীমান্ত পেরিয়ে একজনই বুকে এসে ধাক্কা মারে। ডিউস বলে বাঁহাতি স্পিন হলেও, টেনিস বল ক্রিকেটে পেস, ওয়াসিম আক্রম কপি বুক। বলে বলে ইয়র্কার। পাড়ার ম্যাচ অনভ্যাসের তিনটে ওয়াইডের পরই দুটো দুর্গ ভাঙা ইয়র্কার। ওয়াসিম ভাই জিন্দাবাদ!

এবং শচীন

উননব্বইয়ের এশিয়া কাপের প্র্যাকটিস শেষে ছোট্ট খাট্টো ছোটু বাবু এসে দাঁড়ালেন সামনে। হাতে অটোগ্রাফ খাতা। বাম হাতি শচীনের ডান হাতি ব্যাটিং। ফ্যান না হলেও শ্রদ্ধা কোথায় যায়? মাধুরীও তো পছন্দের অভিনেত্রী নন। তা বলে টুপি কি খুলে সেলাম জানাই না। Respect! Respect!

আরও কত স্মৃতি

৯৬য়ের যে বার বেলায় ধরে নিলাম যে আর হবে না। সেদিন ছিল কোলকাতা কর্পোরেশনের সঙ্গে খেলা বাবার অফিসের। খেলি বছর দুয়েক। অপর দিকে আমার ক্লাব দল হাওড়া ইউনিয়নের অধিনায়ক। সারা মরসুম জুড়ে নিজে ৪০ ওভার বল করে গেল কিন্তু বাম হাতি স্পিনার বলে সুযোগ দিল না। বয়স বাড়ছে। প্রতিশোধ? ব্যাট করতে নেমে তার বলে জীবনের প্রথম রিভার্স স্যুইপ, এক্সট্রা কভারের উপর দিয়ে ছয়। ম্যাচ তবু হাতে আসে না, আউট আম্পায়ারের আঙুল উঠে যায় লেগ বিফোর উইকেট। ঘরবাড়ি ছেড়ে সরে যাবার আগে মাথাটা যদি উঁচু থাকে তো কেয়া বাত মিয়াঁ। স্কুল কলেজ ফার্স্ট সেকেণ্ড ডিভিশন ডিসট্রিক্ট ক্রিকেট ইউনিভার্সিটি সব পেরিয়ে আদিগন্ত ধূসর গোধূলি।

হাউজ দ্যাট
আমার বাবা ইন স্যুইং বল করতেন। মোহন বাগানে যে বছর গেলেন সে বছরই হাঁটু ঘুরল। সালটা ৬৫! তারপর থেকে তিনি সাদা কোট কালো প্যান্ট। স্থানীয় ক্রিকেট পেরিয়ে রঞ্জি দলীপ দেওধর ট্রফি। একবার অরুণ লাল খেলতে খেলতে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, “You are son of Mr. A N Sinha? He is the most sober human being I’ve ever seen on the cricket field. Please remember me with him.” বাবার জন্য গর্বে বুক ফুলে গেল। আমার বাবা! সব সময় পশ্চাৎপটে থাকা আর্ক লাইট থেকে দূরে থাকা বাবা। খেলাটা যিনি আমায় হাতে করে শেখালেন সেই বাবা। সৎ হতে যিনি শেখালেন সেই বাবা। আজ যখন ভুল আম্পায়ারিং-এর জন্য ম্যাচ হেরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এক বন্ধুর দেওয়ালে দেখলাম Son of Umpire=বরাহ নন্দন… কোথায় বাজল বলুন তো?

জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েই তো আমরা জীবনের গাড়ি চালাতে শিখি। উঠতে পড়তে পড়তে উঠতে গড়াতে গড়াতে এগিয়ে যাওয়া। মাথা নিচু না করে সোজা হয়ে বাঁচা। জিততে শেখার থেকেও বড় শেখা হারতে। উফফ আমরা যে কবে হারতে শিখব?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে মুরি মুড়কির মতো করে বিরুদ্ধমতাবলম্বী ব্লগারদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। চারিদিকে প্রতিহিংসা ক্ষোভ বিদ্বেষ আগুন আগুন। উফ এতো বিষ জমে থাকে এই টুকু ক্ষুদ্র মানুষের বুকে?

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s