(১২৯)

একটা লোক একজায়গায় বেশী দিন থাকলে হেদিয়ে মরে। কবে বাহিরিব কবে মেলিব পাখা ইত্যাদি করে। সেই রকমই ফিসফাস বেশীদিন কোলকাতা আর মুম্বই করলে অক্সিজেনের অভাব বোধ করে। আর যেখানে চারদিনের ছুটি একসঙ্গে সেখানে? আরে থাক না সর্বভারতীয় বঙ্গ সম্মেলন, নিজের কাজটা ঠিকমতো করে কেটে পড় রে মামা।

তা সেই মতই আগে থেকে ভেবে রেখেছিলাম যে ৩রা এপ্রিল বিকেলেই বেরিয়ে পড়ব জয়পুরের উদ্দেশ্যে। গাড়িও সার্ভিসিং টার্ভিসিং করে তৈরী। তেল ভরা হয়ে গেছে- স্যান্ডউইচ- জলের বোতল সব কিছু নিয়ে ছেলে মেয়ে নিয়ে বেরোতে বেরোতে ছটা। এ বাড়ি ও বাড়ি কোন বাড়িতেই বেরোবার সময় জানানো হল না। তাহলেই চিন্তা শুরু বলে।

জয়পুরের যে ভাইয়ের বাড়ি উঠব তারা আগে থেকেই বলে দিয়েছিল যে মানেসর পর্যন্ত জ্যাম লেগে থাকতেই পারে কিন্তু তারপর থেকে সহজ রাস্তা। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় এক। মানেসর পর্যন্ত বরং ফুঃ ফাঃ বেরিয়ে এলাম তারপর একটু হাত পা ছড়াতেই হয়। চা আনো রে। জল আনো রে। মেয়ের খাবার বার করো রে। সেদিন আবার চতুর্দশী। আকাশ জুড়ে চাঁদ মামা টি দিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যে নেমে এসেছে রাস্তাও পরিষ্কার নীমরানা পর্যন্ত।

নীমরানায় এসে আমরা চতুর্থ রাজ্যে পড়লাম। উত্তর প্রদেশ থেকে শুরু করে দিল্লি হরিয়ানা পেরিয়ে রাজস্থান।

তা এতক্ষণ পর্যন্ত টোল গেটে সরকারী ট্যাগ বেমালুম কাজ করেছে। রাজস্থান হরিয়ানার সীমান্তের চেকপোস্টে তা দেখাতেই সেটা নিয়ে টোল গেটের ছেলেটা সামনে কাউকে দেখাতে গেল। দেখিয়ে এসে নম্বর টুকে আমায় মনে হয় যেন হাতের ইশারায় বলল ঠিক হ্যায়। অন্তত তাই তো মনে হল।

তা আমি সেই মতো টুক টুক করে গাড়ি নিয়ে পঞ্চাশ মিটার এগোতেই দেখি সামনের ব্যারিকেডে হাত দেখাচ্ছে লোক। ভাবলাম কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে বটে। তা সে বলে কি না আমি টোল জাম্প করেছি। বোজো কাণ্ড! তা তাকে বললাম না ভাই জাম্প করি নি। আমাকে যেতে বলায় এসেছি। সে উলটে বলে “ব্যাগ চেক করুঁ?” আমি ভাবলাম ব্যাগে কিই বা আছে, হ্যাঁ চেক করো বাবা! তা ব্যাগ খুলতে নেমে একবার জিজ্ঞাসা করলাম কেস কি? সে বলল টোল জাম্প করেছি আমাকে ফিরে গিয়ে টোল দিতে হবে।

তা সে কথা তো গোদা হিন্দিতে বললেই হয়। আধা হরিয়ানভি আর আধা রাজস্থানিতে লস্ট ইন ট্রান্সলেশন।

ফিরে গিয়ে টোল দিতে গিয়েও দেখি হম্বি তম্বি করছে। আমি ঠাণ্ডা মাথায় ম্যানেজ করে ফিরে এলাম গাড়িতে গড়াতে শুরু করল গাড়ি। আর ঘড়িও টুক টুক করে নটার ঘরে ঢুকে পড়ল। মেয়েটার খাবার সময় হয়ে গেছে বলে রাস্তার ধারে একটা সভ্য ভদ্র ধাবা দেখে দাঁড়ালাম। হাল্কা হবার কাজ কম্মও হয়ে গেল। বাড়িতে ফোন করে জানানোও হল যে প্রায় পৌঁছে গেছি। ধাবায় জিজ্ঞাসা করলাম আর কত দূর জয়পুর? উত্তর এল ৭৬ কিমি! বাহ বাহ। রাতের আয়নায় আলতো হিসাবে চালালেও তো মেরে কেটে দেড় ঘন্টা।

কিন্তু অন্ধকার আকাশে মাঝে মাঝেই যে ঝলকানি দেখি। ঊষর মরুভূমিতে আর কতোটাই বা বৃষ্টি হতে পারে। বলতে বলতেই টিপটাপ শুরু। দ্রুত গাড়ি গুটিয়ে ছুট লাগালাম জয়পুরি রাস্তায়।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাও উঁচু নিচু হতে শুরু করল, আর পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল বৃষ্টির তোড়। শেষে মুষলধারা। অন্ধকার রাস্তা। কিন্তু আশেপাশের ছোট খাটো টিলা থেকে বড় বড় পাহাড়ের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছে বজ্রবিদ্যুৎ তার ডাক দিয়ে।

বৃষ্টি গতি বাড়াচ্ছে। সামনের চলন্ত ট্রাকগুলোর এ পাশ ওপাশ দিয়ে উড়ে উড়ে আসছে। অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ আলোর ফুলঝুরির মতো আছড়ে পড়ছে উইণ্ডস্ক্রিনে। ভয়াবহ পরিবেশ। ট্রাকগুলোর ধোঁয়া একদম ব্যোমকেশ বক্সীর নতুন সিনেমার মতো রোমাঞ্চে ভরপুর কিন্তু অচেনা আবহের সৃষ্টি করছে।

রাস্তার হদিশ দশ মিটার দূর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। উইণ্ডস্ক্রিনে ঘাম রুমাল দিয়ে মুছে মুছেও পরিষ্কার হচ্ছে না। গোয়েন্দা স্বপন কুমার তাঁর এক হাতে স্টিয়ারিং হুইল আরেক হাতে মুঠোর রুমাল আর তৃতীয় হাতে ভবিতব্যকে সম্বল করে একাগ্র চিত্তে এগিয়ে চলেছেন অন্ধকারের উদ্দেশ্য। পিছনের সিটে সকলেই ঘুমে মগ্ন। পার্শ্ববর্তিনী শুধু এক মনে সহায়তার রাস্তা খুঁজে যাচ্ছেন- “হ্যালো হ্যালো! ওয়াচ টাওয়ার! ট্যাঙ্গো কলিং চার্লি!” “হ্যালো চার্লি স্পিকিং! খাবার দাবার সব রেডি আছে তোমরা ধীরে ধীরে সোজা রাস্তা ধরে এগিয়ে এসে সিন্ধি ক্যাম্প ছুঁয়ে সিকার রোড ধরে অম্বা বাড়ি থেকে বিরিয়ানি কলেজে পৌঁছও।“

ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে এক সময় বৃষ্টিও শেষ হয়ে আসে হুড়মুড় দুমদাম দুড়দাড় ছুঁয়ে টিপ টাপ টুপ টুপ। সামনের নির্বাক স্টিরিওর ঘড়ি তখন সময় দেখাচ্ছে এগারোটা চল্লিশ। ওয়েলকাম টু জয়পুর। তারপরেও পথ ফুরোয় না! শেষে জাগরণের মঞ্চে গিয়ে পাওয়া গেল সিকার রোডের খোঁজ। কিন্তু সেও তো চলেছে তো চলেছেই। বৃষ্টিও হাল্কা যেন বেড়ে গেছে। ওই তো! রাস্তায় একটা লোক দেখা গেছে। মাথায় একটা প্লাস্টিকের ফোল্ডার দিয়ে কোন রকমে আড়াল করে রাত সোয়া বারোটায় ছুটছে। “ভাই সাব, অম্বাবাড়ি কিধার হ্যায়?” “সামনে থোড়ি দূর যাকে ফির ডাইনে! ম্যায় উধারই যা রাহা থা!”

চলে এসো ভাই সাব! রাত্রি বেলা বিপদের ঝুঁকি অমান্য করে মানবিকতার ডাক। সেও ফোন করে কাকে যেন বলে দিল। ম্যায় থোড়ি দের পৌঁছুঙ্গা। অভি কিসিকো রাস্তা দিখা রাহা হুঁ।

মানবিকতার জয়। বিরিয়ানি কলেজের হাঁড়ির মাথায় সে পৌঁছে দিয়ে ফিরে গেল আধা কিমি! গলির ভিতরে। আমরাও হাঁচড়াতে পাঁচড়াতে গিয়ে উঠলাম গন্তব্যে। আবার কাল শুরু হবে জয়পুর ভ্রমণ।

একটাই দিন উটকো পরিশ্রম পেরিয়ে শুধুমাত্র সিটি প্যালেসই সময় করে দিল। গুগল ম্যাপসের ভরসায় সবাইকে নিয়ে চললাম রাজপুতানার সব থেকে বন্ধু রাজার প্যালেসে। জয়পুরের রাজারা বিশেষ ঝগড়াঝাঁটি করে নি। এ ব্যাপারে মাড়োয়ার মেবারের একেবারেই বিপরীত। মুখ থাকতে হাত কেন। তা তাদের বৈভব আর ভয়ঙ্কর অস্ত্রশালার কড়কড়ে আওয়াজই শুনলাম। এ শুধু গর্জায় বর্ষায় না। বর্শায় তাই মরচে ধরে গেছে। খঞ্জর, বন্দুক কামান সাজানো থাকে কাঁচের শো কেসে। গল্পের ভাঁড়ারে খালি একশো পাঁচ লিটার গঙ্গাজলের ঠনঠনে জালা।

গায়ত্রী দেবীর সৌন্দর্য্যের কাহিনীতে ঢাকা পরে যায় ছুটকো ছাটকা শিকার কাহিনী। যুদ্ধের দেওয়ালে মহাভারতের চক্রব্যূহ শোভা পায়। আর মুঘল তথা ইংরেজদের পদলেহনের লালা শুকিয়ে গিয়েছে সেই কবেই। পাণ্ডুর পৃথিবীতে গোলাপি বাগিচা।

প্রসঙ্গতঃ কদিন আগেই কোলকাতা হাইকোর্টে সরকারী কৌঁসুলি জয়পুরের গোলাপি শহরের উদাহরণ দিয়েছেন কোলকাতার আর্জেন্টিনাকরণের কারণ হিসাবে। কিন্তু বিচারক মশায় ভূগোলে পারদর্শী। গোলাপি মার্বেলকে তাই অনুকরণ করতে পারে নি রাজনৈতিক নীল সাদা।

বিকালে চাঁদপোলের মহম্মদী রেস্তোরায় আবার চমক। মালদার চাঁচোলের ইশফাক সাদা বাংলায় আমাদের মাটন চাঁপ আর চিকেন চাঙ্গিজী পেশ করল খামেরি রুটি আর ক্ষীরের সকাশে। ফিরে আসার সময় টিপস পেয়ে মিষ্টি হাসিটা তো ফাউ।

পরের দিন একটু কেনাকাটা করে বিকালের গাড়ি পাড়ি। ফোন ভেসে এল, “চার্লি কলিং ট্যাঙ্গো! তোমরা বই আর কিছু মিছু সব ফেলে গেছ!” আসলে তো আবার একটু সময় বাড়াবার ছল। দুশো নব্বই কিমির দূরত্ব কি পাঁচ মিনিটে মেটে? তাই আবার আসিব ফিরে বলে ফিরে এলাম নিজ গৃহে।

মাঝখানে মেয়ের সঙ্গে মোলাকাত হল ইয়াব্বড় উটের। মেয়ে তো এক কাঠি বাড়া। পার্লে জি নিয়ে উটকে খাওয়াতে যায়। উটের চালক, “ঘরমে খাতা হ্যায় জি!” বলে এক লাফে উটের গাড়ির উপর উঠে মার ছুট। মেয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে! বিস্কুট খেতে দিলে কেউ পালায় নাকি?

মানেসর পেরিয়ে কিছু দূর এসেই গৌ মাতা সেবা ধাবায় চা সহযোগে মিক্সড পরোটা মেরে রাত সাড়ে দশটার মধ্যেই নিজ খুপরিতে। কাল থেকেই তো ছেলের স্কুল আর আমার ঘোড়দৌড় শুরু।

আবার বসে থাকা কবে একটা শুক্র বা সোম শনিরবির লেজুড় হয়ে হাজির হবে। তদ্দিন অপেক্ষায়!

2 thoughts on “(১২৯)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s