(১৩১)


গত বৃহস্পতিবার গেছিলাম গাজীপুর মণ্ডিতে। মণ্ডি হল যেখানে গেলে মন ভালো হয়ে যায় এমন জায়গা। অবিশ্বাসীদের কাছে অবশ্য মণ্ডির ইংরাজি অর্থ হল পাইকারি মার্কেট বা আড়ত। তার উপর গাজীপুর মণ্ডির এক বিশাল নাম আছে। যারা জানেন না তাদের জন্য জানাই গাজীপুর-এ মোট পাঁচটি মণ্ডি। ফুল মণ্ডি (নাকি full monty?), সবজি মণ্ডি, ডিম ও চিকেন মণ্ডি, ঈদগাহ আর মচ্ছি মণ্ডি।

হ্যাঁ, কোলকাতার লোককে মাছের গল্প শোনাতে গেলেই তো চিত্তির। আরে শুনুনই না। কোলকাতায় প্রচুর মাছ পাওয়া যায় বটে, কিন্তু এক জায়গায় এতো মাছ তো পাওয়া যায় না! তাই চুপটি করে শুনুন পাঠক পাঠিকারা।

হয়েছে কি, গত রবিবার বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন আয়োজন করেছিল বাংলা ফুড ফেস্টিভ্যাল-এর। খাবার দাবারের বিষয়ে আমি দুই পায়ে খাড়া। তার উপর বাংলা ফুড ফেস্টিভ্যাল। এর আগে আমার অভিজ্ঞতা বলতে দুগগো পুজোর আনন্দমেলা। কিন্তু এত বড় স্কেলে কোনদিনই কিছু করি নি বলে একটু চিন্তাভাবনা করছিলাম। তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খোঁচানোয় ক্ষুদিরাম হতে রাজি হলাম।

রামপুরী চত্বরে দেখতে দেখতে আমার নয় পেরিয়ে দশ বছর প্রায় হয়ে গেল। কিন্তু বাড়ির সামনের এই বিস্ময় বালককে চাক্ষুষ কোন দিনই করা হয় নি। মানে গাজীপুর মণ্ডিতে গিয়ে মাছ কেন মাংসও কেনা হয় নি। কিনবই বা কেন। মধ্যবিত্ত ঘরের ২৩০ লিটার ফ্রিজে এক কিলোর বেশী তো মাছ ধরে না। আর সেখানে শুনেছি কুইন্টালে হিসাব হয়।

তাও বড় বড় শহরে এরকম ছোট ছোট ভুল ত্রুটি হয়েই থাকে। রবীন্দ্রনাথও তো আজন্ম ধানের শীষে শিশির বিন্দুর জন্য হেদিয়ে রইলেন।

যাই হোক সক্কালবেলা উঠে ছেলেকেও টেনে তুললাম। ‘চল আজ তোকে একটা জায়গা দেখিয়ে আনি’! ‘কোথায় বাবা?’ ‘চলই না!’

তারপর দুচাকায় করে জিজ্ঞাসা করতে করতে পৌঁছিয়ে গেলাম মণ্ডি রাজ্যে। গাজীপুরকে একটু দূর থেকে দেখলে একদম আমাদের কাদাপাড়া লেকের পাশটা মনে হবে। সেই একই রকম আবর্জনা জমিয়ে পাহাড় করে সুসজ্জিত রাখার চেষ্টা চোখের পীড়া কম করে।

তা গাড়ি পার্ক করে ভিতরে ঢুকে চোখ সওয়াতে সওয়াতেই পনেরো মিনিট চলে গেল। তারপর এদিক ওদিক জিজ্ঞাসা করতে করতে সামুদ্রিক মাছের আড়তে। “বাবা ওটা কি?” “শঙ্কর মাছ” “ঊরিত্তারা স্টিং রে? আর ওটা কি?” “হাঙর” “ হ্যামারহেড?” বাপরে বাপ! সে সব অদ্ভুত অদ্ভুত নাম না জানা মাছের পেট থকে বের হওয়া দানাদারের সাইজের এক একটা ডিম। খাব কি মিউজিয়ামে রাখব তাই জানি না।

20150430_090152

বহুকাল আগে দীঘায় গিয়ে টাটকা বাগদা চিংড়ি দেখে চিত্তচাঞ্চল্য অনুভব করেছিলাম। এখানে বরফবন্দি মাছ দেখেও একইরকম আনন্দ হল বটে। কাতারে কাতারে সামুদ্রিক আর অসামুদ্রিক মাছ ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে আছে খরিদ্দার কখন তাদের তুলে নিয়ে গিয়ে ঝালে ঝোলে অম্বলে ফেলে মুক্তি দেবে বলে।

আমার দরকার খুব সীমিত ছিল, তাই খুঁজে খুঁজে হাজির হলাম বাগদা চিংড়ির এক পাইকারি বিক্রেতার কাছে। বাগদার ব্যাপার আবার একটু সেনসিটিভ। একদম তাজা না হলেই মুড়ো ছাড়তে শুরু করে। আর এ কি আর আপনার কোলকাতার মানিকতলা বা শিয়ালদা বাজার পেয়েছেন? পুকুর থেকে তুলে এনে মার্কেটে ফেলে বলবে কেমন দিলাম? এখানে বাবা অনেক সাধ্য সাধনার পর গুজরাট বা অন্ধ্র থেকে মাছ আসে। তার তাজা থাকার সম্ভাবনা আর দিল্লির রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে বিনা ঝঞ্ঝাটে গন্তব্যে পৌঁছনো একই রকমের অসম্ভব প্রায়।

তাও হিসেব টিসেব করে বললাম আড়াই কিলো! সর্দারজি আড়তদার বলল তিনশো কুড়ি। আমি যেন হাতের কাছে ঝুড়ি ভরতি চাঁদ পেয়েছি! আহা তিনশো কুড়িতে প্রায় তাজা বাগদা? রয়াল বেঙ্গল টাইগারের হাসিও এর থেকে দূর্লভ বস্তু। সময় নষ্ট না করেই বস্তা বন্দি করে হাঁটা লাগালাম।

একটু দূরেই দেখি, আহা, দিনের বেলায় রূপালি চাঁদ উঁকি দিচ্ছে থরে থরে বরফের মেঘ থেকে। দিল্লির বাজারে প্রথম গঙ্গার ইলিশ। সেদিনই। পাইকারি দাম হাজার আর আমাদের মত খুচরো পাপীদের জন্য এগারশো! আহা জন্নত তো একবারই যাব বাওয়া! কিন্তু আমিও হেমলক খেয়েছি আর অপ্সরাদের নাচ দেখেছি বলার সৌভাগ্য কি ছেড়ে দেওয়া যায়? শোনা কথা যে সমুদ্র মন্থনে প্রথমে উঠেছিল বিষ। তা মহাদেব গলায় ধারণ করে নীলকণ্ঠ হয়েছিলেন- বেঁচেছিলেন দূর্গার আশ্রয়ে। আরে সে সব দেবাদেবীর ব্যাপার বাপু। আমি সামান্য মানুষ, একই সঙ্গে ঘটি বাঙালের স্বর্গজাত পারিজাত দু হাতে ধরার সৌভাগ্য হাতছানি দিয়ে ডাকছে দেখে সামলাতে পারলাম না।

বললাম দিন দাদা এক খান কিলো খানেক। শেষে পেট টিপে টুপে চ্যাপ্টা কিন্তু রাগবি বলের মতো চওড়া পেট ওলা এক চাঁদপানাকে হস্তগত করে হেঁটে এলাম পেশাদারি কাটিয়েদের কাছে। কোলকাতার বিভিন্ন বাজারে মাছ দোকানিরা সাধারণত কেটে দেয় না। কাঁচি আর বঁটির সাহায্য এইসব কাটিয়েরা শির কলাম করে। দিল্লিতে মাছের দোকানিরাই সাধারণত কেটে দেয়। কিন্তু এ তো পাইকারি বাজার। তাই এখানেও ব্যাপার স্যাপার আলাদা। মুঘলাই কাটিয়েরা ইয়া ইয়া বড় আরবি তলোয়ারের মতো দেখতে বঁটি নিয়ে বসে থাকে আর ছুরি দিয়ে ফাইন সে ফাইন ফাইল ‘ফিলে’কেটে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে “জিলেট”।

ইলিশ দেখেই তারা গল্প জুড়ে দিল। কুড়ি বছর আগেও দশ টাকা কিলো পাওয়া যেত। দশ বছর আগেও একশো টাকা করে না পেলে খরিদ্দার ফেলে রেখে চলে যেত। হঠাৎ করে যে কবে রূপালি অমৃতগুলো আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেল কে জানে?

যাই হোক, অমৃত একা খেলে অমর হওয়া যায় না। তাই ভাগ করে নিয়েই খেলাম। পোস্ত সর্ষে আর দই বাটা দিয়ে মাখিয়ে একটু সরষের তেল আর কাঁচা লংকা চিরে ভাপা আহা ভাত কে ভাত উড়ে চলে গেল হাঁড়ি সাফ করে দিয়ে। আর মুড়ো দিয়ে তেঁতুলের টক। আহা কচুশাকগুলো যে কোথায় গজাচ্ছে কে জানে?

20150430_213932

আর চিংড়ি? আহা বাঘের বাচ্চার মতো সেও রাজ করল রবিবার বাংলা ফুড ফেস্টিভ্যালে। সঙ্গে খোদ মালদা থেকে আনা আমসত্ত্বের খেজুর দিয়ে চাটনি। আহা ল্যাংড়ার গন্ধেই বেণুবন মাতাল হয়ে গেল।

IMG_20150504_203512

স্বর্গের সন্ধানে স্বপ্নসন্ধানীরা বারবার ফিরে ফিরে আসে আর আমরা তো সামান্য বাঙালী। রসনার বাসনায় বুঁদ হয়ে মজে থাকি। আহা রাখিস মা রসে বসে।
প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ সাধারণতঃ ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো ব্যক্তিগতই থাকে। কিন্তু আজকে তার জন্মদিন ছিল। এই নিয়ে দুটো জন্মদিন হয়ে গেল সে নেই। মানুষ এগিয়ে চলে কিন্তু ফাঁকগুলো ফাঁকই থেকে যায়। আমার ভাইটা আমারই মতো খেতে ভালবাসত কি না!!

2 thoughts on “(১৩১)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s