(১৩২)

যখন ফিসফাসের একখান পোস্ট লেখার জন্য সকাল থেকে কম্পু মুখে করে বসতে হয় পড়াশুনোর জন্য তখন কেমন মনে হয় না যে ফিসফাস জাতে উঠছে? বেশ একটা রাশভারী বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব জাগে আর বইটাও পেপারব্যাক ছেড়ে হার্ড বাউণ্ডের রাস্তায় ঘুরপাক খায়।

যাক সে কথা, প্রথমে কিছু ইতিহাস ঘেঁটে ঘ করি। তিব্বত গেছেন তিব্বত? আরে এই কোলকাতা হয়ে ডায়মণ্ডহারবার হয়ে তিব্বত। এমা হযবরল পড়েন নি? নিশ্চয় পড়েছেন? কিন্তু তিব্বতের কেসটা কি বলুন তো? ছোটবেলায় পড়া সাধারণ জ্ঞান উগড়ে দিই বরং! তিব্বতের রাজধানীর নাম লাসা। তিব্বতকে পৃথিবীর ছাদ বলা হয় কারণ বিশ্বের সর্বোচ্চ মালভূমি তিব্বতেই। আর লাসাকে আবার নিষিদ্ধ শহর বলা হয়। সে সব মেলা ব্যাপার স্যাপার।

তিব্বতের কথা আসলেই আসে দলাই লামা আর ধরমশালার ম্যাকলিওডগঞ্জের কথা। এক ভদ্রলোক ১৯৫৯ থেকে নিজের দেশ থেকে পালিয়ে এসে ভারতে বসে আছেন আর ১৯৮৯তে নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়ে গেছেন। কিন্তু দলাই লামা কে আর কি? এসব ঘাঁটতে বসে দেখা গেল দলাই লামা হল তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু। বর্তমান দলাই লামা ১৯৩৭ থেকে দলাই লামার আসন গ্রহণ করেছেন এবং ওনার আসল নাম ‘জেতসুন জাম্পেন নগাওয়াং লবসাং ইয়েসে তেনজিং গ্যাতসো’ বা সংক্ষেপে তেনজিং গ্যাতসো। উনি যখন দলাই লামার আসন গ্রহণ করছেন তখন ইতিমধ্যেই তিব্বত চীনের অভ্যন্তরস্থ ধরি মাছ না ছুঁই পানি মার্কা জায়গা হয়ে আছে।

আসলে হয় কি, তিব্বতিদের বিশ্বাস অনুযায়ী দলাই লামা এবং সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড পানচেন লামা দুজনেই যুগে যুগে পুনর্জন্মের মাধ্যমে ফিরে ফিরে আসেন। সে এক এলাহি ব্যাপার দলাই লামা মারা গেলে কিছু অলৌকিক সূত্রের মাধ্যমে স্থান নির্ণয় করে সেই এলাকার বাচ্চা কাচ্চাদের কাছে দলাই লামার খেলনাপাতি আরও কিছু ফলস মার্কা খেলনাপাতি নিয়ে যাওয়া হয়। পূনর্জন্ম প্রাপ্ত লামা ঠিক নিজেরটা চিনতে পারেন। আরে সেই যে আমাদের অন্নপ্রাশনে যেমন টাকা, মাটি আর পেন দেওয়া হয় থালা ভরে আর বাচ্চাগুলো নিজের নিজের ভবিষ্যৎ ছোট ছোট দু হাতে নির্ধারণ করে সেই রকম ব্যাপার।

তা তেনজিং গ্যাতসোও নাকি নিজের খেলনা চিনতে পেরেছিলেন। ব্যাস আর যায় কোথা। তাকে তুলে এনে ঠিক মতো পড়াশুনো করিয়ে একদম মাথায় তুলে দেওয়া হয়। সেই যে এক হ্যাভেলসের বিজ্ঞাপন মনে আছে? ‘রিনপোছে’ ‘রিনপোছে’? সেই রকম।

তা বর্তমান দলাই লামার আগের ভদ্রলোক তো ১৯১৩ সালে মওকা বুঝে তিব্বতকে স্বাধীন ঘোষণা করে দেন ১৯৩৩এ তাঁর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত। এর মাঝে ১৯২৪এ সিমলাতে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার, তিব্বত ও চীনের মধ্যে চুক্তি সম্পূর্ণ হয় নি চীন মাঝ পথে চলে যাওয়ায়। তার পরে প্রায় দশ বছর চীনকে তিব্বতে ঢুকতে দেওয়া হত না। কিন্তু তিব্বতেও সমস্যা লেগে ছিল।

তার প্রধান কারণ ধর্মকে হাতিয়ার করে সামন্ত্রতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। যার ফলে ছুটকো ছাটকা বিদ্রোহ শুরু হয়। আর চিয়াং কাই সেকের হাত ধরে ১৯৪২এ আর শেষে মাও সে তুং-এর হাত ধরে ১৯৪৯এ তিব্বত দখলের প্রয়াস শুরু হয়। শেষমেষ ১৯৫০এ চীন তিব্বতকে চীনের অংশ বলে ঘোষণা করে কিন্তু লাসা সহ আর আশেপাশের অঞ্চলকে স্বশাসিত প্রদেশ হিসাবে চিহ্নিত করে রাখা হয়।

কিন্তু দড়ি টানাটানি চলছিলই। শেষে ১৯৫৯ সালে লাসার বিদ্রোহকে হাতিয়ার করে চিন পাকাপাকিভাবে লাসা দখল করে এবং দলাই লামা তার সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে নিয়ে ম্যাকলিওডগঞ্জে আশ্রয় নেন। আর বহু তিব্বতি দিল্লি এবং কর্ণাটকের বিভিন্ন জায়গায় রিফিউজি হিসাবে থাকতে শুরু করে।

তিব্বতিদের যে উপনিবেশ দিল্লিতে আছে সেটি মজনু কা টিলা এবং কাশ্মীরী গেটের বৌদ্ধ বিহারের আশেপাশে। ভোজনবিলাসীদের জন্য সেগুলি স্বর্গরাজ্য। হালকা অন্ধকার গলির মধ্য দিয়ে সুসজ্জিত এবং সাংস্কৃতিকভাবে উজ্জ্বল রেস্তোরাঁগুলিতে খাবার দাবাড়ের দামও অবিশ্বাস্য রকমের কম। কাশ্মীরী গেটের বৌদ্ধ বিহারে বার কয়েক গেলেও মজনু কা টিলায় যাওয়া হয়ে ওঠে নি কিছুটা কুঁড়েমি আর কিছুটা অজ্ঞানতা বশতঃ।
তা কালকের দিনটা একটু অন্যরকম ছিল। হয়েছে কি? ছেলের তায়কোয়ণ্ডো প্রতিযোগিতার দিনই আমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠক। অনেক কাকুতি মিনতিতেও ছুটির চিঁড়ে ভেজে নি। তাই ভাবলাম একটু নিয়ে টিয়ে যাব কোথাও খেতে। তাই জোম্যাটো ডট কম ঘেঁটে ঘুঁটে গবেষণা করে রেখে দিয়েছি। তার মধ্যেই পার্শ্ববর্তিনী খবর পাঠালেন যে তাঁর বাল্যবন্ধুর পেণ্টিং-এর প্রদর্শনীতে তিনি যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু মানুষ ইচ্ছা পোষণ করে আর উপর ওলা নিজের ইচ্ছা মতো তাতে কাঠি করেন। তাই সাতটার মধ্যে শেষ হওয়া প্রদর্শনীতে পৌঁছনো দিল্লির ট্র্যাফিক জ্যামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হল।

কিন্তু বাড়ি থেকে তাম ঝাম নিয়ে বেরিয়েছি কি ল্যাজ গুটিয়ে ফিরে আসার জন্য? তাই হিসেব কষে রিগো রেস্তোরাঁ মজনু কা টিলা যাব বলে ঠিক করলাম। একটা কোরিয়ান রেস্তোরাঁর কথা ভাবা হয়েছিল বটে পাহাড়গঞ্জে, কিন্তু দুর্গমতার কারণে তা বাতিল হল। গাড়িটাকে সবুজ ওভারব্রিজের কাছে রেখে পায়ে হেঁটে ব্রিজ পেরিয়ে গেলাম। ছেলে তো মহা উৎসাহী হয়ে তিব্বতি ভাষা পড়ার চেষ্টা করতে লাগল। চাইনিজ প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি আগমনে তিব্বতিদের প্রতিবাদ নিয়েও উৎসাহিত রিপোর্তাজ পেশ করতে শুরু করল। তারপর আমাদের শুরু হল গলিখুঁজি।

খুঁজে খুঁজে হাজির হলাম রিগো রেস্তোরাঁয়। যেই বসতে যাব, ওমা পরিবেশনকারী এসে বোমাটা ফেললেন। ‘আজ কিন্তু নিরামিষ’।

খেলে যা! নিরামিষ কেন রে বাওয়া? আবার চল চল। ততক্ষণে পার্শ্ববর্তিনী তাঁর মঙ্গোলিয়ান বন্ধুর সঙ্গে এই প্রান্তরের এক রেস্তোরাঁয় বিফ খাবার গল্প বলছেন। সেই রেস্তোরাঁও এসে পড়ল কিন্তু নিরামিষ আজ বলে বোর্ড গলায় ঝুলিয়ে সে দাঁড়িয়ে। শেষে আ-মা রেস্তোরাঁয় এসে হাজির হলাম। ততক্ষণে নিশ্চিত জেনে গেছি তিব্বতি কলোনিতে আজ সর্বত্র নিরামিষ। কিন্তু এসে না খেয়ে চলে যাব? তাই রেস্তোরার পরিবেশকের স্মরণাপন্ন হলাম। সেও দেখলাম নিরামিষ তিব্বতি খাবারের বিষয়ে অন্ধকারে। বলে কি না উত্তরভারতীয় খান। আমাদের পাশের টেবিলে অবশ্য কয়েকটি মনিপুরী ছেলে মেয়ে তাই খাচ্ছিল।

কিন্তু নাইতে নেমে গা ভেজাব না বললে চলবে? সাবান না থাকলেই বা কি? বেছে বেছে উটকো নামের জিনিষপত্র অর্ডার করলাম। আলু ফিং মাশরুম ভেজ থানটুক আর টিগমা। আলু ফিং-এর আলু হচ্ছে বাংলায় আলু আর ফিংটা বুঝলাম না। কিন্তু চাইনিজ রাইস ওয়াইন দেওয়া নুডলস আলু ও মাশরুমের সুরুয়া আমাদের সামনে উপস্থিত করা হল। আর ছিল থানটুক। যা আবার তিব্বতি সুরুয়া। বান রুটির মতো টিগমাও ছিল। তা তাই দিয়ে স্যুপের বন্যা বইয়ে দিয়ে শেষে ফ্রুট বিয়ার দিয়ে শেষ করব কি? ইচ্ছা হল সুইট ডিশ খাই! তা ব্যানানা টফি ছাড়া কিচ্ছুটি নেই। তাই সই! তার কলা চটকে তার উপর তিল আর মধুর ক্যারামেলাইজড কোটিং দিয়ে চিবিয়ে পেট ঢকঢকিয়ে বাড়ি এলাম।
b5ced35548efb53fc17fd484bef32070_200_thumb

টিগমা

টিগমা


আসার পথে ছেলে আবিষ্কার করল, নিরামিষি বুধবারের কারণ। বুধবারকে খুব পুণ্যবান দিন হিসাবে দেখা হয় দলাই লামার জীবনে। তাই গত অগাস্টে এক বছরের জন্য মজনু কা টিলার তিব্বতি বাসিন্দারা বুধবার নিরামিষ খাবার অঙ্গীকার করেছে। অজ্ঞানীরা আর কি করবে? আবার কোন নতুন সূর্যাস্তের অপেক্ষায় থাকবে, গিয়ে একটু বিফ, ল্যাম্ব, পর্ক, চিকেন বা ফিশের তিব্বতি সংস্করণে যাতে দাঁত ফোটানো যায়। তদ্দিন না হয়, পেটের মধ্যে স্যুপের সাম্রাজ্য ঢক ঢক করুক!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বেরিয়ে আসার সময় বিশ্বের সর্ব কনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্দির ছবি দেখলাম। পানচেন লামা নির্বাচিত হবার পর গেধুন চৈকি নেইমাকে ১৯৯৫ থেকেই চীনা সরকার কোন অচেনা জায়গায় সরিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং তিব্বতি জনগণের আবেদনের পরেও তাঁর বর্তমান অবস্থান প্রকাশিত হয় নি। ছেলেটি এখন প্রায় ২৫ বছরের হয়ে গেল। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বা বিরুদ্ধ মতকে রাষ্ট্রযন্ত্র বরাবর ভয় পেয়ে এসেছে। চীন তো আরও বেশীই। তিয়েন আন মেনেরও তো পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেল।
300px-Save_the_Panchen-lama
প্রয়োজনহীন পুনশ্চ১- কালকেই দেখলাম সলমন খানের পাঁচ বছর জেলযাত্রা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। বিশেষত ফেসবুকে উপচে পড়ছে সলমনের জন্য “ঠিক হয়েছে” আর তার সমর্থনকারী (পড়ুন অভিজিত ভট্টাচার্য্য ও ফারহা খান আলি)-দের জন্য “ছিছিক্কার”। জনগণ একবার ভেবে দেখুন আপনার বাড়ির ছেলেটি এরকম বিচারবিবেচনাহীন কাজ করলে আপনারা কি তাকে বিবেকের কাছে আত্মসমর্পণ করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে জেলে পাঠাবেন? না কি আপনারাও মনগড়া গল্প তৈরী করে তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করবেন? প্রথমটা হলে তো আপনাকে স্যালুট আর যা করছেন তা চালিয়ে যান। আর দ্বিতীয়টা হলে? আপনিও কিন্তু অভিজিত কিংবা ফারহা খান আলি (ইনি সঞ্জয় খানের কন্যা) কিংবা অর্জুন কাপুর হয়ে পড়ছেন।

অভিজিৎ ভট্টাচার্যকে নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই, ভদ্রলোক এর আগেও পাকিস্তানী গায়ক বা ইত্যাদির উপর নিজের অকালে ঝরে যাওয়া জ্ঞান বর্ষণ করেছেন। এখানেও ব্যতিক্রম নয়। বাকিরা স্রেফ নিজেদের পরিচিতকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে। দুঃখের বিষয় হল আমরা এতদিন ধরে কিন্তু সেই রাত্রে হতভাগ্য নুরউল্লাহ মেহবুব শরীফ (নামটা আমিও জানতাম না স্বীকার করছি) বা সলমনের পুলিশি দেহরক্ষী রবীন্দ্র পাতিল (যিনি প্রথম এফআইআর করেছিলেন কিন্তু অদ্ভুত অবস্থায় সাত বছর পর সহায় সম্বলহীন অবস্থায় যক্ষ্মাগ্রস্থ হয়ে মারা গেছিলেন)-এর কোন খবর নিই নি। তাই বলি কি, শুধু চুপ করে খবরটা দেখি, বাক্যবাণের অধিকার বোধহয় আমরা হারিয়েছি! আমেন!
Junior-Car-Designer-Car-Drawing-For-Kids-Made-Very-Easy-SUV-Front-View-6

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s