(১৩৩)

বহুদিন ধরে যদি না লিখি তাহলে অনেকগুলো ফিসফাস জমা হয়ে পড়ে। আজকের ফিসফাসটাও মনে হয় একের মধ্যে বহুকে দেখার প্রয়াসঃ
(এক)
কদিন আগেই ভাষা শহিদ দিবস হয়ে গেল। আসলে ভাষা দিবস বলতেই আমরা একুশে ফেব্রুয়ারিকেই বুঝি। অথচ তার ১১ বছর পরেই ভারতেরই বুকে বাংলাভাষার জন্য ১১জন প্রাণ দিয়েছিলেন সে বিষয়ে আমাদের অজ্ঞতা কহতব্য নয়। যদিও ইদানীং ফেসবুক ও ইন্টারনেটের দৌলতে আপামর বাঙালী জনগণ এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল হচ্ছেন।

যাই হোক ফিসফাসের পাতায় জ্ঞান বিতরণ না করে বরং পাঠক/ পাঠিকারা একটু অন্তর্জাল খুঁজে দেখে নেবেন। আমি শুধু ভাষা শহিদ দিবসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনাকে আপনাদের সামনে নিয়ে আসি।

উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলতে গেলে এটাও বলতে হয় যে প্রাতিষ্ঠানিক আবৃত্তি করতে আমার কেমন যেন একটু অনীহাই বোধ হয়। যদিও নিজ মুখেই বলি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা বা আবৃত্তি করতে খারাপ লাগে না। তবে তা নেহাতই ঘরোয়াভাবে বা সঞ্চালনার সময়ে। ঘোষণা করে গলা কাঁপিয়ে আবৃত্তি করতে গেলে যত রাজ্যের কুঁড়েমি জেগে বসে।

সে যাক গে গিয়া, ভাষা দিবস উপলক্ষে তিনটি কবিতা আবৃত্তি করার সুযোগ ঘটে যায় মুক্তধারায়। তা সময়াভাবে সেই তিন নেমে আসে দুইটিতে। সে তো অন্য কথা। আসল ঘটনা হয়েছিল, বাক্স প্যাঁটরা সমেত আমার পুঁটলিটিও গেছিল। কিন্তু সে বেশীক্ষণ অডিটোরিয়ামে বসে থাকার পাবলিক নয়। বাধ্য হয়েই তার মাসিমণি তাকে নিয়ে নীচে নেমে আসে। তার খানিক পর তার মাও এবং অনতিবিলম্বে, তার দাদাও। একা কুম্ভের মতো মোবাইল হাতে নিয়ে আমি গড় রক্ষা করতে থাকি। আবৃত্তির সময় এলেই মিসড কল দিতে হবে পার্শ্ববর্তিনীকে।

মিসড কলে শুধুমাত্র পার্শ্ববর্তিনীই তাঁর তীব্র অনুরাগবশত হাজিরা দিতে পারেন। বাকিরা কোন এক বিশেষ কাজে নীচেই আবদ্ধ ছিল। সে গল্প তো পরে শুনলাম। কিন্তু আবৃত্তির পরে নীচে গিয়েই দেখি নরক গুলজার। আমার এক বছর চার মাসের পুঁটলিটি আর এক দুই বছরের পোঁটলাকে জোগাড় করে, “উই শ্যাল ওভারকাম” করে বেরাচ্ছে। আর বাকিরা অসহায়ের মতো “ধর ধর”, “গেল গেল”, “আয় আয়”, “ওইযযাহ” ইত্যাদি সহকারে চরকি খাচ্ছে। একজন সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করে তো আরেকজন সোজা পাপোষে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে “কেমন দিলাম” চাহনি দিয়ে। একজন সামনে হাজির সব চেয়ার উল্টোতে থাকে তো আরেকজন গাছের কান ধরে টানাটানি করে। এর মধ্যে একজন আবার সটাং হাঁটা দিল বাইরের দিকে। অপরজন তখন হাত ছাড়িয়ে দোতলার দিকে। আর আমার বড় ভায়রা, বড় শালী, পার্শ্ববর্তিনী ও পোঁটলার মা মিলে এই ধর তো সেই ধর।

মাঝে এক বয়স্ক ভদ্রলোক সিঁড়ি দিয়ে টলমল করে নামছিলেন। পুঁটলি উপরে ওঠবার তাগিদে ফস করে তার পায়ের তলায় হাত দিয়ে দিয়েছে। আর সে ভদ্রলোক তো টাল না সামলাতে পেরে যায় যায়।

এর মধ্যে আর এক কাণ্ড। একটি দাড়িওলা কম বয়সী ছেলে, আমার আবৃত্তির ঠিক পরে অডিটোরিয়ামে ঢুকে আমার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, “হোয়াট ইজ শি সেয়িং? আই ডোন্ট আণ্ডারস্ট্যান্ড বেঙ্গলি” মঞ্চে তখন ঈশিতা দাস অধিকারী “বিদ্রোহী” আবৃত্তি করছেন। আমি বললাম, “অ্যা লট অফ থিংস, কান্ট বি এক্সপ্রেসড ইন ওয়র্ডস!” তা সে মন দিয়ে ভিডিও তুলতে লাগল। আমি ভাবলাম যে সকল বাচ্চাগুলো একটু পরেই নাচবে তাদের কারুর সঙ্গে এসেছে বোধহয়।

নীচে গিয়ে শুনি তিনি একটু টেনে এসেছেন। তারপর কেক খেতে খেতে দুম করে কেক অফার করেছেন আমার ছেলে আর দুটো বাচ্চাকেই। তা ছেলে তো পত্রপাঠ কেক খেয়ে ফেলে দাঁত বার করে আছে। আর সেই ছেলেটি পুঁটলিকে কেকে খাওয়াবেই! শেষে তার মা বেশ জোরে বকা দিলে ক্ষান্ত দিল। সে মাতাল তখন অডিটোরিয়ামে গিয়ে স্টেজের একদম নীচেই বসে বাচ্চা মেয়েদের নাচের ভিডিও করতে লেগেছে। তাকে আমি বকা দিতে সে আমায় জিজ্ঞাসা করল, “ইস দেয়ার এনি প্রবলেম ফর সামবডি?” আমি বললাম, “ইয়েস, আই অ্যাম হ্যাভিং প্রব্লেমস!”

তা তারপর তো কোন রকমে সবাইকে টাটা করে আমরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। পরে শুনি আমার প্রায় আশির কাছাকাছি শ্বশুর মশাই সেই মাতালটার কলার চেপে ধরে দিয়েছেন দাবড়ানি।

সে যা হোক, আসার পথে অকল্পনীয় পরিশ্রম করার ফল স্বরূপ পার্শ্ববর্তিনী বললেন, একটু কিছু খেলে হত। যেমন বলা তেমন কাজ। সামনেই এক কোয়ালিটি আইসক্রিমের কাছ থেকে দুটো ছোট কোন আর একটা বড় কোন কেনা হল। পুঁটলি আশা করা হচ্ছিল দৌড়াদৌড়ি আর হুল্লাট করার পর খাওয়া দাওয়া করে গাড়িতে ঘুম দেবে। কিন্তু সে অম্লান বদনে তার মায়ের আইসক্রিমটি ঠিক তার দাদার মতো করে সাঁটাতে শুরু করল। মানে আইসক্রিম থেকে ক্রিম গলে নীচে পড়ার সময় পাচ্ছে না তার আগেই গভীরতর পাহাড় তৈরী হচ্ছে। শেষে প্যাটেল চকের কাছাকাছি সেই পাহাড় যখন আগ্নেয়গিরি হয়ে গেল, আমি বাধ্য হয়েই নেমে তাকে আগ্নেয়গিরি থেকে খুঁটে খুঁটে আইসক্রিম খাওয়াতে লাগলাম আর একটা নতুন আইসক্রিম তার মাকে ধরালাম যাতে অন্তত পেটে কিছু পড়ে।
10898235_10202975453466532_8390398564431442462_n
গরমে কলকব্জা সমেত ছানাপোনারাও বিগড়ে যেতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অবশ্য এমনিতেই সব কথা রিপিট করতে শুরু করেছে বলে পুঁটলির নাম হয়েছে কাকাতুয়া!

(দুই)
গরমে শুধু ছানাপোনারাও নয়, আমরাও বিগড়ে যেতে পারি। সে বিগড়ানোর সংবাদ দেবার আগে জিজ্ঞাসা করি, ১৯৮৭-র হাসিমপুরার ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানেন? সাতাশি সালে হিন্দু মুসলিম রায়েট হয় মেরঠে। তার ফল স্বরূপ, তার পার্শ্ববর্তী হাসিমপুরা গ্রাম থেকে প্রায় ৪০এরও বেশী মুসলিম পুরুষদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, অনুসন্ধান এবং প্রশ্ন করার জন্য। তাদের আর জীবিত ফেরত পাওয়া যায় নি। যে সতেরো জন পুলিশ সেই সময় সেই তল্লাশিতে অংশ নিয়েছিল তারা সকলেই স্টেট রায়েট পুলিশের সদস্য। কিন্তু গত সপ্তাহে প্রমাণাভাবে সকলেই মুক্ত ঘোষিত হয় দিল্লি হাইকোর্ট থেকে।
উত্তরপ্রদেশকে পিতৃদেবের জমিদারী ধরে নেওয়া বিতর্কের ধ্বজাধারী আজম খান নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ার তৈরীই করে ফেলেছিলেন হাসিমপুরার আক্রান্তদের তুরুপের তাস করে। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত তাঁর ঘুম ভাঙে নি। হাই কোর্টের রায় বেরোবার পরেই তিনি হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে শনিবার ছুটির দিন প্রতিবাদ র‍্যালি করতে দিল্লি ছুটে এসেছেন।
IndiaTvb885b5_hashimpura
তা কাল ছিল আমাদের বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের ‘সুচিত্রা স্মরণ’। সেই জন্যই যাচ্ছিলাম। কিন্তু সমাজবাদী পার্টির কার্যালয়ের সামনে জ্যামের মধ্যেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎ ব্রেক থেকে পা ফস্কে গিয়ে দিলাম সামনের ইন্ডিকাটাকে ঠুকে। সুবোধ বালকের মতো তাকে এস্কর্ট করে একটু খালি জায়গায় নিয়ে এসে আত্মসমর্পণ করে বললাম, “ভাই পুলিশ ডাকো!” তা গাড়ি থেকে নেমে এল দুটি পুরুষ এবং দুটি মহিলা। চারজনেই তেলেগুভাষী। তারা অন্যায় আবদার শুরু করল। বলে এ গাড়ি নাকি তাদের বন্ধুর। তাই আমাকে তাদের সঙ্গে গিয়ে গাড়ি ঠিক করিয়ে দিতে হবে। ইল্লি আর কি! আমি বললাম ভাই হয়েছে কি? খালি তো বাম্পারে একটা ক্র্যাক হয়েছে। দুটো পাঁচশো টাকার কড়কড়ে নোট পকেট থেকে বার করে দিচ্ছি (উফফ যেন পাঁজরা খুলে দিচ্ছিলাম! কিন্তু দ্রুত যেতে হবে! ইতিমধ্যেই ফোন আসা শুরু হয়ে গেছে।) তারপর দেখে নাও। তারা নাছোড়বান্দা! পুলিশও ডাকবে না! হাজার টাকাও নেবে না (মানে অঙ্কটা বাড়াতে হবে!)! যাবেও না। শেষে ভালো মানুষের মুখোশটা খুলব খুলব করছি, তাও একটা চান্স নিলাম, বললাম, “আমার ফোন নাম্বার নিন, কার্ড রাখুন! না কাজ হলে আমায় বলবেন! বাকি টাকাটা আমি দিয়ে দেব!” ছাতা তাও গাঁইগুঁই করছে।

তখন বললাম, “চন্নু তাহলে!” বলে “অ্যায়সে ক্যায়সে যা সক্তে হো?” আমি বললাম, “দেখ লো?” লেনা হ্যায় তো লো? ইয়া পুলিশ বুলাও ইয়া ফির ম্যায় যা রহা হুঁ!” তারা ইনিয়ে মিনিয়ে নিয়ে বলল, “ইফ মোর মানি ইজ রিকোয়ার্ড উই উইল বি কলিং ইউ!” আমি “হ্যাঁ হ্যাঁ!” করে গাড়ি চালিয়ে কেটে পড়লাম। মুক্তধারায় এসে শুনি আসলে সময় ছিল সাড়ে ছটা থেকে আর আমি লোকজনকে বলেছি সাড়ে চারটে। গরমে পেগ্লিয়ে গেছি পুরো।

অপরের গাড়ি নিয়ে এত কিছু বললাম, কিন্তু নিজের গাড়িটাই বিগড়েছে। বাম্পারটা হাল্কা ঢুকে গিয়ে বনেট একদম ধনুক হয়ে আছে। খামোকা সুখে থাকতে ভুতে কিলোয়।

(তিন)
এটা কোন ঘটনা নয়। আসলে রোহিঙ্গাদের জন্য খুব কষ্ট লাগছে বলেই লিখে হাল্কা হচ্ছি। সেই ইঙ্গআরাকান যুদ্ধে জিতে ব্রিটিশরা এদের মিয়ানমারের পূর্বপারে বসিয়ে দিয়েছিল। সংস্কৃতি বা আচার আচরণে সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের সঙ্গে কখনই কোন মিল ছিল না। জাতিযুদ্ধ চরম পর্যায়ে পৌঁছলেও মিয়ানমার সরকার, এমন কি আং সাং সু কির পার্টিও মুখ বন্ধ রাখে। শেষ মেশ হাজার হাজার রোহিঙ্গা জাহাজে করে ভেসে পড়ে নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে। জানা গেল যে পানীয় জলে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছিল নাকি সরকার। মানবতার আশ্চর্য নিদর্শনই বটে।

মিয়ানমার এদের রাখতে উৎসাহী নয়, শ্যামদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া কেউই এদের স্মরনার্থীর মর্যাদা দিতে উদ্যোগী নয়। শুধুমাত্র সুদূর ফিলিপিন্স জায়গা দিতে রাজি। গত দেড় দু মাস ধরে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেরাচ্ছে এরা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার জলে জলে। খাবার নেই পানীয় জল নেই। ইতিমধ্যেই মানসিক বিকারের কারণে বেশ কিছু জাহাজবাসী সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে হারিয়ে গেছে। মানবিক কারণে কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও সরকারীভাবে নিষেধাজ্ঞা জারী করছে থাইল্যাণ্ড, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া। কোন পৃথিবীতে বাস করছি আমরা কে জানে? রাষ্ট্রসংঘ, ভারত বা বাংলাদেশও কি কিছু করতে পারে? উত্তরটাও বোধহয় লোনা জলের মতই বিস্বাদ। সত্যিই তো কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা…!
786714DWL
(চার)
আজ জামাই ষষ্ঠী! ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাই ফিসফাসটা শেষ করতে ইচ্ছা করল না বলে কিশলয় পত্রিকায় প্রকাশিত সমর কুমার সরকারের একটা গল্পের সাহায্য নিলামঃ
প্রাচীন বঙ্গভাষী হিন্দু সমাজে জামাইষষ্ঠী উপলক্ষ্যে গৃহে আগত জামাতাদিগ কে শ্বশ্রূমাতাগণ যেমন সাধ্যাতীত আদর অপ্যায়ন করিতেন,তেমন ই জামাতা ইচ্ছাপূরণে ব্যর্থ হইলে অর্থাৎ শ্বশ্রুমাতাকে দৌহিত্র বা দৌহিত্রী উপহারে ব্যর্থ হইলে তাহার আদর ও মান সন্মান ক্রমশঃ হ্রাসমান হইত। এমনই একটি গল্প
আপনাদের কাছে নিবেদন করিব। এই গল্পের কতখানি অংশ সত্য,বা কতখানি অংশ লেখকের কল্পনা প্রসূত তাহা নির্ণয়ের চেষ্টায় বিরত থাকিয়া গল্পকে না হয় গল্পের দৃষ্টিতেই দেখুন।

প্রাচীন কলিকাতা নিবাসী এক গৃহস্থ কোন এক সময়ে ভাগ্যের বিড়ম্বনায় তাহার
পরম সুন্দরী কন্যা কে হুগলী জেলার কোন এক অজ পাড়াগাঁয়ের এক দরিদ্র
পরিবারে পাত্রস্থ করিয়াছিলেন। বিবাহের কয়েক মাস পরেই প্রথম জামাইষষ্ঠী তে
ঐ গৃহস্থের কন্যা ও জামাতা নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। গৃহস্থ পত্নী নতুন জামাতা কে
যথাবিধি মান্যতা সহ ধান্য ও দূর্বা দ্বারা আশীর্বাদ করিয়া নানা স্নেহসূচক
বাক্যে তাহার প্রীতি বর্ধন করিলেন। মধ্যাহ্নে মহার্ঘ উপাদেয় ভোজ্যবস্তু দ্বারা
তাহাকে অপ্যায়িত করিলেন এবং জামাই ষষ্ঠীর আশীর্বাদী স্বরূপ জামাতাকে এক
জোড়া জুতা,ধুতি,পাঞ্জাবি ও গাত্রবস্ত্র অর্থাৎ চাদর উপহার দিলেন। জামাতা ও
কন্যার বিদায় কালে গৃহস্থ পত্নী পুনরায় তাহাদের আশীর্বাদ করিয়া
বলিলেন-“সামনের জামাই ষষ্ঠীতে অবশ্যই সন্তান কোলে লইয়া আসিবে।”

বর্ষকাল পরে দ্বিতীয় বার কন্যা ও জামাতা জামাই ষষ্ঠীতে নিমন্ত্রিত হইলেন। ঐ
জামাতার ঘোরতর আর্থিক অনটন ছিল এবং তিনি ছিলেন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। তিনি
হয়তো ভাবিয়াছিলেন – “আমার যা স্বল্প রোজগার,তাহাতে দুই জনেরই অন্নের
সংস্থান হয় না,সন্তানের জন্ম হইলে কোনক্রমেই তিন জনের ব্যয় সংকুলান
হইবে না। শ্বশ্রুমাতা দৌহিত্রের মুখ দর্শন করিতে চাহেন তো আমার কি ?
তাহার সাধ পূরণের সংকল্পে আমি কেন সংকটাপন্ন হইব?” তাই তিনি সন্তানের
জন্ম যাহাতে কোনমতেই সম্ভব না হয়,সেই বিষয়ে যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন। কন্যা
ও জামাতাকে গৃহস্থ পত্নী এইবারেও যথেষ্টই অপ্যায়িত করিলেন। মধ্যাহ্নের
ভোজ্যসকল পূর্বাপর উপাদেয় ও লোভনীয়ই ছিল। কেবল জামাই ষষ্ঠীর
আশীর্বাদীতে পূর্বের ন্যায় এক জোড়া জুতা,ধুতি ও পাঞ্জাবি থাকিলেও গাত্রবস্ত্র
অর্থাৎ চাদর অনুপস্থিত ছিল। আর ধান্য-দূর্বাদি দ্বারা জামাতা কে আশীর্বাদ
কালে শ্বশ্রূমাতা কিঞ্চিত মলিন বদনে শুধু মাত্র জামাতা শুনিতে পায় এমন অনুচ্চ
স্বরে মন্ত্র আওড়ানোর কায়দায় পুত্রবৎ জামাতাকে তিরস্কার করিলেন –
“সন্তানহীন, গেছো বাঁদর,
বাদ গেল তোর গায়ের চাদর।”
কেবল মাত্র জামাতা বাবাজী ই বুঝিতে পারিলেন,শ্বশ্রুমাতাকে দৌহিত্রদানের
অক্ষমতার দণ্ডস্বরূপ তাহার প্রাপ্তি হইতে চাদর বাদ গেল। এবারেও বিদায় কালে
শ্বশ্রুমাতা আশীর্বাদের সময় বলিলেন-“সামনের জামাই ষষ্ঠীতে অবশ্যই সন্তান
কোলে লইয়া আসিবে।”

যথাবিধি বর্ষ গতে তৃতীয় বার কন্যা ও জামাতা জামাই ষষ্ঠীতে নিমন্ত্রিত হইলেন।
কন্যা ও জামাতা কে গৃহস্থ পত্নী যথাবিধি অপ্যায়িত করিলেও, এবারের মধ্যাহ্ন
ভোজে দুই একটি মহার্ঘ উপাদেয় পদের ঘাটতি ছিল। অবশ্য গৃহস্থ পত্নী দোষ
খণ্ডন হেতু বারে বারেই ব্যক্ত করিলেন,তাহার শরীরটা না কি বেশ কয়েক দিন
ধরিয়াই অসুস্থ। এবারে জামাই ষষ্ঠীর আশীর্বাদীতে শুধু এক জোড়া জুতা ও
একটি ধুতি ছিল। চাদর তো আগের বৎসরেই বাদ পড়িয়াছিল,এবারে বাদ গেছে
পাঞ্জাবি। এবারে শ্বশ্রুমাতা ছায়াঘন বদনে ধান্য-দূর্বাদি দ্বারা আশীর্বাদ কালে
জামাতাকে পূর্বোক্ত ভঙ্গীতে তিরস্কার করিলেন-
“ছেলে আমার হয় না মামা,
বাদ গেল তোর গায়ের জামা।”
জামাতা বাবাজী মনে মনে বলিলেন,”অদৃষ্টের কি পরিহাস,শ্বশ্রুমাতার পুত্র মামা
হইতে পারে নাই,অর্থাৎ তাহার ভগিনীর কোন সন্তান জন্মে নাই,সেই অপরাধে
আমার প্রাপ্তি হইতে পাঞ্জাবি বাদ গেল। চাদর বাদ গিয়াছে,পাঞ্জাবি বাদ
গেল,না জানি অদৃষ্টে আরও কত দুর্ভোগ আছে।” এবারে বিদায় কালে শ্বশুর
মহাশয় বারংবার জামাতাকে বলিলেন,”তোমার শরীর টা কেমন দুর্বল দেখিতেছি
বাবাজী,চিকিৎসকের পরামর্শ মত চলিয়ো।” পিতৃবৎ শ্বশুর মহাশয়ের পক্ষে এর
বেশী কিছু বলা সম্ভব নয়। শ্বশ্রুমাতা আশীর্বাদের সময় শ্লোক কটিয়া বলিলেন-
” সবার কপাল সোনায় মোড়া,
আমার জুটেছে বেতো ঘোড়া।
সামনের জামাই ষষ্ঠীতে অবশ্যই সন্তান কোলে লইয়া আসিবে।”
এববিধ সব বাক্য শ্রবণে জামাতা মর্মাহত হইলেন। ভাবিলেন,আর শ্বশুরালয়ে
আসিবেন না। কিন্তু বাস্তব বড় রূঢ়,সন্মানের ধার ধারিলে তাহাকে আরও সঙ্কটে
পড়িতে হইবে। এই দুর্মূল্যের বাজারে এক জোড়া জুতা ও একটি ধুতির মূল্য কম
নহে। আপন রোজগার হইতে এতগুলি টাকা খরচ করা তাহার সাধ্যাতীত।

জীবনে হতাশ হইলে জগৎ মিথ্যা। যত দিন মানুষ বাঁচে,আশা লইয়াই বাঁচে।
তাই চতুর্থ বার কন্যা ও জামাতা জামাই ষষ্ঠীতে নিমন্ত্রিত হইলেন। ভাঙ্গা চেয়ার
টেবিলের পায়াটিও কোন গৃহস্থ মায়াবশতঃ ফেলেন না কখন কোন কাজে লাগে
বলিয়া,আর এ তো জামাই বলিয়া কথা ! গৃহস্থ পত্নী যথারীতি জামাতাকে
অপ্যায়িত করিলেন।শ্বশ্রুমাতার শরীর আর সারে নাই,তাই আয়োজনে এবারে ও ঘাটতি ছিল।
এবারে জামাই ষষ্ঠীর আশীর্বাদীতে শুধু এক জোড়া জুতা পাওয়া
গেল। প্রাপ্তি হইতে ধুতি বাদ গিয়াছে। শ্বশ্রুমাতা নির্লিপ্ত ভাবে ধান্য-দূর্বাদি দ্বারা
আশীর্বাদ কালে জামাতাকে চাপা স্বরে তিরস্কার করিলেন-
“নপুংসক,মদ্দা হাতি,
বাদ গেল তোর পাছার ধুতি।”
জামাতা বাবাজী মনে মনে বলিলেন, “এ তো জানা কথাই,দণ্ড কেবল বাড়িয়াই চলিবে।
তাই বলিয়া আমি পরের সুখের কারণে আত্মবলি দিতে পারিব না।” এবারে বিদায় কালে শ্বশুর
মহাশয় বারংবার জামাতাকে উপদেশ দিলেন,”সময়ের কাজ সময়ে না করিলে পরে পস্তাইতে
হয় বাবাজী,তুমি বুদ্ধিমান,তোমাকে অধিক বলা অশোভন।” শ্বশ্রুমাতা আশীর্বাদের সময়
শ্লোক কাটিয়া বলিলেন-
“পুরুষ যারা, নড়েচড়ে-
মেদিমুখো ডরে মরে।
সামনের জামাই ষষ্ঠীতে অবশ্যই সন্তান কোলে লইয়া আসিবে।”
জামাতা মনে মনে বলিলেন, “আপনি মেদীমুখোই বলুন,আর যাই বলুন,আমার
চিন্তাধারায় কোন রূপ পরিবর্তন হইবে না। আমি মেদিমুখো হইতে পারি,কিন্তু
আপনার কন্যা আমার অঙ্গুলীহেলন ব্যতীত টুঁ শব্দ টি পর্যন্ত করিতে পারে না।”

কালচক্র নিয়ত ঘূর্ণায়মান, তাই আবার পঞ্চমবারের মত কন্যা ও জামাতা
জামাই ষষ্ঠীতে নিমন্ত্রিত হইলেন। এবারের অপ্যায়নে আতিশয্য ছিল না,আর
জামাতার জন্য কোন উপহারও ছিল না। শ্বশ্রূমাতা শুধু ধান্য-দূর্বাদি দ্বারা
আশীর্বাদ কালে অনুচ্চ অথচ শ্লেষের স্বরে বলিলেন –
“ঠিক ধরেছি জামাই খুঁতো,
শেষ বাদ তোর পায়ের জুতো।”
জামাতা বাবাজী মনে মনে বলিলেন,”ভাবিয়াছিলাম,দণ্ড হইতে নিস্কৃতি নাই,কিন্তু
একেবারেই শূণ্যহস্তে ফিরিতে হইবে,এইরূপ ভাবি নাই।” এবারে বিদায় কালে
শ্বশ্রমাতা শুধুমাত্র শ্লোক কাটিয়া বলিলেন-
“যতই না হও পাহাড় চূড়া,
মুখ দেখে না আঁটকুড়া।”
সামনের জামাই ষষ্ঠীতে অবশ্যই সন্তান কোলে লইয়া আসিবে-এই কথাটি
শ্বশ্রূমাতা আর বলিলেন না।
জামাতা মনে মনে বলিলেন,”শ্বশ্রূমাতা স্থিরনিশ্চিত হইয়াছেন,আমি
পুরুষত্বহীন,তাই এবারে আর বলিলেন না যে,সামনের জামাই ষষ্ঠীতে সন্তান
কোলে আসিয়ো। উপরন্তু জ্ঞাত করিলেন,যতই তুমি পাহাড়ের চূড়ার মত
উঁচুদরের মানুষ হও,আঁটকুড়া অর্থাৎ নিঃসন্তান লোকের মুখ কেহই দেখিতে চাহে
না।শ্বশ্রুমাতাকে দোষ দিয়া লাভ কি ? এইরূপ চিন্তা তো আমার আত্মীয় স্বজন,
বন্ধু বর্গও করিতে পারেন।সত্য বলিতে কি,আমার ও তো পরীক্ষা হয়
নাই,আমার পক্ষে সন্তানের জনক হওয়া সম্ভব কি না ? যতই কষ্ট হউক,
সন্তানের পিতা হইতে না পারিলে আমি আর শ্বশুরালয়ে পদার্পণ করিব না।”
অতএব গৃহে প্রত্যাগমন করিয়াই জামাতা সন্তানের জন্মের ব্যাপারে বিশেষ
যত্নবান হইলেন। উদ্যমী পুরুষের চেষ্টা বিফলে যায় না। তাই পুনরায়
জামাইষষ্ঠীর পূর্বেই জামাতা এক দেবশিশু তুল্য পুত্র লাভ করিলেন।

পরবর্তী বৎসরে আবার কন্যা ও জামাতা জামাই ষষ্ঠীতে নিমন্ত্রিত হইলেন।
এবারে কন্যা আর শূণ্য ক্রোড়ে আসেন নাই,তাহার ক্রোড়ে এবার এক ফুটফুটে
সুন্দর শিশুপুত্র। শিশুর জন্মের সংবাদ শ্বশ্রূমাতা পূর্বেই অবগত হইয়াছেন। তাই
এবারের আয়োজনে প্রাচুর্যের ছড়াছড়ি। অতি উপাদেয় ও মহার্ঘ সব খাদ্য সম্ভার।
শ্বশ্রুমাতা এইবারে পুলকের আতিশয্যে জামাতাকে বারংবার ব্যজনী দ্বারা বাতাস
করিলেন। উৎফুল্ল বদনে জামাতাকে ধান্য-দূর্বাদি দ্বারা আশীর্বাদ করিয়া
বলিলেন,”চিরসুখী হও বাবা। ষাট ষষ্ঠীর ষাট,এতদিনে আমার ষষ্ঠী পূজা সফল
হইয়াছে।” আশীর্বাদী স্বরূপ জামাতাকে একজোড়া জুতা,ধুতি,পাঞ্জাবি ও চাদর
তো দিলেন ই,অতিরিক্ত উপহার স্বরূপ দিলেন একটি ওজনদার কারুকার্য খচিত
সোনার আংটি। জামাতা বাবাজী এতদিনের অপমান বিস্মৃত হন নাই। তাই পূর্বেই
একটি চির কুটে কিছু লিখিয়া রাখিয়াছিলেন, শ্বশ্রূমাতাকে প্রণামের ছলে চিরকুট
টি তাহার পদতলে রাখিয়া দিলেন। শ্বশ্রূমাতা পড়িয়া দেখিলেন,তাহাতে লিখা
আছে –
“পাঁচ বছরে ঢের শিখেছি,বেশ হয়েছে জ্ঞান,
হয়নি ছেলে,অবহেলে,দাও নি আমায় মান।
যার কারণে ফিরে পেলাম সকল উপহার,
আশীর্বাদ টা তাকেই ক’রো,জানাই নমস্কার।
নইতো আমি নপুংসক,নই তো আর আঁটকুড়া,
সংসারেতে টানাটানি,তাই তো দেরী করা।
নাতি দেবে স্বর্গে বাতি,নিয়ো তাহার ভার।
কর্ম আমার হলো সারা,আসবো না কো আর।”

হতবাক শ্বশ্রুমাতা নিরুত্তর রহিলেন। কিন্তু জামাতার যে সন্মানবোধ জন্মিয়াছে,সেই কারণে অতিশয় প্রীত হইলেন।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ জামাই ষষ্ঠীর পরে জামাতা বিদায়ের সময় শ্বাশুড়িরা কি গান করেন? উঃ “জামাই কা ফেয়ারওয়েল”। পিজে পিজে!
jamai

4 thoughts on “(১৩৩)

  1. সম্ভবত বছর দেড়েক আগে ইন্ডিপেন্ডেন্ট চ্যানেলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান দেখেছিলাম, সেখানে বলেছিল প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্রগ্রামে আছে।

    Like

    • কিন্তু আরাকানের রোহিঙ্গাদেরই সমস্যা। মানবাধিকার তাদের প্রতি নিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। সকলেই চুপ আছি… কি যে হবে।

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s