(১৩৪)

 আমাদের সূর্য মেরুন ,
নাড়ির যোগ সবুজ ঘাসে ,
আমাদের খুঁজলে পাবে –
সোনায় লেখা ইতিহাসে ..
আমাদের রক্তে খেলা ,
খেলার ছলে বিপ্লবীদের –
আমরাই কখনও বুক ,
কখনও দল ,
কখনও দেশ …..
জন্মেছি মাথায় নিয়ে খেলয়ারি পরোয়ানা ,
বুকের এই কলজে বলে লড়াই করো হার না মানা ,
আমাদের বুকের ভেতর ,
সবুজ মেরুন এক ঝাঁক বান ,
আমরাই মোহনবাগান ,
মোহনবাগান।।
326997-mohun-bagan-logo ‘এগারো’ সিনেমাটা দেখতে গিয়ে সিনেমার গুণাগুণ বিচার না করে একবার আবেগ দিয়ে ভাবতে গেলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। স্পাইক বুট পরিহিত বড় বড় চেহারার গোরা দল ইস্ট ইয়র্কের সঙ্গে ১৯১১ সালের ফাইনালে শিবদাস ভাদুড়ির নেতৃত্বে মোহনবাগানের জয়টা জাতীয় গৌরবগাথায় পর্যবাসিত হয়েছে। যদিও পরবর্তী সাফল্য আসতে আসতে ১৯৩৯ হয়ে যায় মোহনবাগানের। তবু মোহনবাগান আর তার চির প্রতিদ্বন্দ্বী ইস্ট বেঙ্গলের ইতিহাস বাঙালীর বুকের খুব কাছাকাছি। যে কোন বাঙালীকে জিজ্ঞাসা করুন, যার তারুণ্য বা যুবাবস্থা কেটেছে ৭০এর দশকে। নিদেনপক্ষে আশির দশকেও যারা হামাগুড়ি দিয়েছে তারা পর্যন্ত মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল , ঘটি বাঙাল, ইলিশ চিংড়ি নিয়ে নরক গুলজার করতে ছাড়বে না।

একটা বেড়ে সিনেমা এসেছিল, ‘মোহনবাগানের মেয়ে’ তার ফিরতি জবাব হল ‘ইস্টবেঙ্গলের ছেলে’। দ্বিতীয় সিনেমাটার কথা জানেন না বুঝি? একটু ঘেঁটে দেখুন আর্কাইভ, চিরঞ্জিতের এই বেওয়ারিশ ফিলিমটা আপনার নজরে পড়েই যাবে।

আমার বাড়িতে ক্রিকেট টা যতটা ছিল ফুটবলটা অতটা না হলেও বেশ ছিল। অন্তত মোহন বাগান তো ভাল ভাবেই ছিল।

সেই কোন ষাটের দশকে আমার বাবা মোহন বাগানে ক্রিকেট খেলেছিলেন সেই ঘিয়ের গন্ধ আমার ছোটবেলায় খুব ভালকরেই গরম ভাতে ঘোরাফেরা করত। আমার ভাই যখন হয় নি তখন বাবার হাত ধরে মোহনবাগান তাঁবুতে যে কতবার গেছি তার ইয়ত্তা নেই। সেই যে সেই তাঁবু, যার গেটে যেদিন মোহনবাগান মাঠে খেলা থাকত। এক কালো চশমা স্যুট বুট পরিহিত ভদ্রলোক আগলে দাঁড়িয়ে থাকতেন যাতে যে কেউ তাঁবুতে ঢুকে পড়তে না পারেন। ধীরেন দে।

কিন্তু ১৯৮০ সালের ১৬ই আগস্ট ইডেন গার্ডেনের সেই অভিশপ্ত ইব্লকের গ্যালারি আমার ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান ম্যাচ মাঠে গিয়ে দেখার ব্যাপারে অলিখিত গণ্ডি টেনে দিয়েছিল। আর সেই গণ্ডি অতিক্রমের দূর্মতি আমার হয় নি। খেলাটা আমি টিভিতে দেখেছিলাম। টিকিট বণ্টনে গড়বড় ছিল। এক লাখ দর্শকের চিৎকারের মধ্যে ইস্টবেঙ্গলের দিলিপ পালিত বিদেশ বসুকে একটা জঘন্য ফাউল করে বসে। তার পর থেকেই গ্যালারিতে আগুন জ্বলতে শুরু করে যা দাবানলের রূপ নেয় খেলা শেষে। ১৬টা তাজা প্রাণ… হাজার লোকের পায়ের চাপে হারিয়ে গেল খোকা… মান্না দের গানটায় চোখ ভিজে যেত পাঠক পাঠিকারা… বয়স তখন অল্প হলেও।

মোহন বাগান দলের আমার প্রথম প্রিয় খেলোয়াড় ছিল এক মালায়লি। না বিজয়ন নয়, বিজয়নের আগে যে মালায়লি বাংলা জয় করেছিল সে হল জেভিয়ার পায়াস। পায়ে বল পড়লেই উদ্বেল হয়ে পড়ত মোহনবাগান জনতা। কিন্তু ক্রিকেট খেলাটা শুরু করার আগে স্বপ্ন দেখতাম শিবাজী ব্যানার্জি হবার। ৭৭এর পেলের পেনাল্টি বাঁচাবার পর থেকেই শিবাজী ব্যানার্জি লেজেন্ড। প্রশান্ত সিনহার টেকনিক, ভাস্কর ব্যানার্জীর সাহস বা তরুণ বসুর গ্যাদারিং না থাকলেও পেনাল্টি হলেই শিবাজী উঠে আসতেন সকলের হৃদয়ে। সেই একটা পোস্ট ছেড়ে রেখে সে দিকে মারতে বাধ্য করা আর অবধারিত সেভ।

তিরাশি সালের এক বিকালে টাইব্রেকারে মোহনবাগান শিল্ড সেমিফাইনালে হেরে গেল এরিয়ানের কাছে। বড়মাসির বাড়িতে রেডিও শুনছিলাম। ছুটে গিয়ে চৌকাঠে মাথা ঠুকে মাথা ফুলিয়ে ফেলেছিলাম বলে যে বকা জুটেছিল তা হেরে যাবার দুঃখের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

আশির সেই অভিশপ্ত বিকেল আর বিরাশির বিশ্বকাপ ফুটবল সরাসরি টিভিতে দেখার পর থেকেই কেন জানি না স্থানীয় ফুটবল নিয়ে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের একটা বিরাট অংশের ক্রেজ কমতে শুরু করে। আশির দশকের শেষের দিকে পিকে ব্যানার্জি শুরু করলেন সিরিয়া এ-র খেলা দেখানো। ব্যাস আর যায় কোথা। মোহন বাগান ইস্টবেঙ্গলের পাগলামিটা প্রান্তিক হয়ে দাঁড়ালো। আমিও যে খুব বেশী মাঠে যেতাম তা নয়।

ততদিনে তো যুবভারতীও ছন্নছাড়া হতে শুরু করেছে। তারপর সেই পর্ব এল। যখন আমারই ভাইটা বড় হচ্ছে আর তার চারপাশে ইস্টবেঙ্গলের স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছে। মোহন বাগান তলিয়ে যাচ্ছে। এমন কি প্রথম জাতীয় লিগেই স্থান হল না মোহনবাগানের। আবিষ্কার করলাম ঘরের মধ্যেই বিভীষণ ইস্টবেঙ্গল সমর্থক। কি যন্ত্রণা হয়েছিল বলে বোঝাতে পারব না।

তার পর আর কি তিনটে জাতীয় লিগ জয়। আমি তখন দিল্লিতে। শেষবার বাবলু দার কোচিং-এ মনে আছে দল দুর্দান্ত না হলেও প্রচুর অ্যাওয়ে ম্যাচ এক গোলে জিতে যাচ্ছিল ব্যারেটো আর জেদের উপর ভর করে। শেষ ম্যাচে চার্চিল ড্র করলেই চ্যাম্পিয়ন আর আমাদের জিততে হবে। স্যালিউ ব্রহ্মতালু দিয়ে গোল করল। আমি অফিস থেকে ফিরে এসে বাংলা চ্যানেল খুলে জানলাম। অবিশ্বাস্য আনন্দ। উপভোগ করার জন্য আশেপাশে তো কেউ নেই। খালি আমার তদানীন্তন বাড়িওলা মোহনবাগানী। ফোন কর বাড়িতে ফোন কর বাড়িওলাকে। ব্যাস ওইটুকুই।

তাই ১৩ বছরের আই লিগের খরা আর ৫ বছরের ট্রফির খরা কাটিয়ে উঠতে যখন তীরে এসে তরী ডোবার অবস্থা হচ্ছে। তখন শুনলাম দিল্লির মেরিনাররা আহায় বুক বেঁধে চিত্তরঞ্জন ভবনে এক সঙ্গে খেলা দেখার জন্য বড় স্ক্রিন প্রোজেক্টরের ব্যবস্থা করছে। যা থাকে কপালে, অমিতাভ দাকে বললাম ছেলেকে নিয়ে যাব। ছেলে তো আই লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়া দেখতেই পায় নি তার জীবনে। যেমন ব্রাজিল বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন তার হবার বছরেই হয়েছিল। বাবার দেখাদেখি সেও যে ব্রাজিল আর মোহনবাগান। যেমন আমার ভাইটা ছিল আজহার আর বরিস বেকার আর ব্রাজিল।

অমিতাভ দা জানালেন। ফিসফ্রাই আর চা আর বিরিয়ানিও থাকছে। আমি বললাম দেখবেন যেন সব উৎসব মাটি না হয় তাহলে হবিষ্যি খেতে হবে। দুপুরে বাড়ি থেকে বেরোবার আগে কি পরি কি পরি। মেরুন আর সবুজ একসঙ্গে কিছুই নেই। তো মার গুলি মেরুন ধুতি আর সবুজ পাঞ্জাবী। ছেলে বলল তার খালি সবুজ টি শার্ট আছে। তাই সই। গালে সবুজ মেরুন কপেল সবুজ মেরুন তিলক কেটে দিয়ে হাজির হলাম চিত্তরঞ্জন পার্কে চিত্তরঞ্জন ভবনে। এবার খেলা শুরু পালা।

এদিক ওদিক অচেনা মুখের ভিড়ে চেনা মুখও হাজির। তার আবার সহধর্মিনীর জন্মদিন। তা ঘটনাটা পরে শুনেছিলাম। মিয়া বিবির তর্ক চলছে, বউয়ের জন্মদিন বছরে একবার আসে আর মোহনবাগানের আইলিগ/ জাতীয় লিগ তেরোবছরে একবার! এ যে মহাকুম্ভেরও এক কাঠি বাড়া। সাতটার সময় ফেরা যাবে না! কথা বন্ধ তো বিকালে তনু ওয়েডস মনু হি সই! কিন্তু সেটাও কায়দা করে চিত্তরঞ্জন পার্কের কাছাকাছি সাড়ে চারটেয় রাখা গেলে কেমন হয়? সিনেমা তো সাড়ে ছটায় শেষ! হ্যাঁ রে তুই বলছিলি না কোথায় যেন মোহনবাগানের খেলা দেখাবে! আহা এই জন্যই তো রাজযোটক মামা। বাই ডিজাইন আর বাই হুক অর ক্রুক! এই সুযোগ কি মিস করা যায়? তাই চিত্তরঞ্জন ভবন! 11209415_10153373088970763_26967760107449995_n
এদিকে ব্যাঙ্গালুরুতে প্রবল বৃষ্টি, খেলা শুরু সময়ও টিপটাপ চলছে। ভাষ্যকার বললেন কুড়ি বছরে নাকি এরকম বৃষ্টি দেখেন নি ব্যাঙ্গালুরুতে। বড় স্ক্রিনে মাঠে বসে খেলা দেখার শখ ঘোলে মেটাচ্ছি। কিন্তু সবই তো ব্যাঙ্গালুরুর দর্শকদের দেখায়। মোহন বাগান সমর্থকরা যে টিভি স্ক্রিনের বাম দিকে বসে আছে তাদের তো কই একবারও পাত্তা দিচ্ছে না ক্যামেরা? তবে তাতে কি? খেলা মাঝমাঠে তুল্যমূল্য। বল নিয়ন্ত্রণে রাখা সমস্যা হচ্ছে। ব্যাঙ্গালুরু চাপে বোঝা যাচ্ছে আর তাদের কোচ অ্যাসলে ওয়েস্টউড সেরা খেলোয়াড় সুনীল ছেত্রীকে বাইরে রেখে বোধহয় হাত কামড়াচ্ছেন। গলার শির কাঁধের মাসল ফুলিয়ে চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছেন। উল্টো দিকে সঞ্জয় সেন নির্বিকার। সোনি নর্ডের শট বার কাঁপিয়ে ফিরে এল। আশঙ্কা! উল্টোদিকে জন জনসন লিংডোর কর্ণার থেকে মাপা হেডে গোল। আমরা হায় হায় করে উঠলাম। কিন্তু তারপরেও আশা ছাড়া নেই।

মাঝে ফিশফ্রাই আর লেবু চা চলছে। কিন্তু তাতে মন নেই কারুর। হাফটাইমে হাডল। সংকল্প শপথ বোয়া কাতসুমি সোনি প্রীতম শিলটনদের। হাফটাইমে বাসু দাকে ফোনে ধরলাম। এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার মুখোমুখি হওয়া থেকে খুব ঘনিষ্ঠ কেউ কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে। সারাদিন হাসপাতালে থেকে সন্ধ্যায় ফিরেছেন ক্লান্ত মন নিয়ে। বললেন, ‘আর বোধহয় হল না!’ বললাম ‘দেখই না কি হয়?’ খেলা শুরু হল আর ব্যাঙ্গালুরুতে বর্ষারও। বল নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। তাও মোহনবাগান খেলা নিয়ন্ত্রণ করছে, মুহুর্মুহু আক্রমণ। মিসের পর মিস মাথা চাপড়ানি হা হুতাশ। কিন্তু মনে হচ্ছে হয়ে যাবে। টেনশন ধীরে ধীরে বুকের পাঁজর বেয়ে গলার কাছে। আশি মিনিট, বলবন্তের পরিবর্তে জেজে। পঁচাশি মিনিট, সোনির শট দুই ডিফেন্ডার ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁচাল। পর মুহূর্তেই ধনচন্দ্রের হেড ব্যাঙ্গালুরুর গোলকিপার বাঁচাল। সাতাশি মিনিট আবার কর্ণার এবার মাপা কর্ণার সোনির, বেলো রজাক, যার উচ্চতা প্রশ্নাতীত নয় সবার থেকে লম্বা হয়ে গিয়ে সেদিন হেড করল দ্বিতীয় পোস্টের মাটিতে। বল জালে জড়িয়ে যেতেই উত্তাল কোলকাতা উত্তাল দর্শক উত্তাল আমরা। দৌড়োদৌড়িতে কেবলের সেটটপ বক্সই গেল পড়ে। কোনরকমে আবার লাগিয়ে শুরু হল। ৫ মিনিট ইনজুরি টাইম। অমিতাভ দা বাইরে পায়চারি করছেন। যে যেখানে সেখান থেকে যেন না নড়ে। কার্তিক কোথায়? তুকতাক কার্তিক? আরে সবাই আমরা কার্তিক হয়ে গেছি। জলের বোতল চেয়ারে নয় মাটিতে নামাও কাকা। উঠে দাঁড়িও না। বসে থাক যেখানে ছিলে। বাইরে গেছ তো ভিতরে নয় বৌদি। বল শিলটনের গোলকিক থেকে মাঝমাঠে রেফারির হাত উঠছে। আমাদেরও হাত… ‘পিপ পিপ পিইইইইইইইইইইইইইইইই’ উল্লাসে ফেটে পড়ছি সবাই। দৌড়ে গিয়ে সবুজ মেরুন পতাকাটা ধরে নিজেকে শান্ত করছি। 1620752_10153373089090763_8048590252821093025_n 11390227_10153373089055763_2705089799655946378_n
এত আবেগ নিজে খেলার সময় তো থাকে না! শুধু বস্তাপচা ভারতের বস্তাপচা ফুটবলে মোহনবাগানের জন্য আবেগ? না সে আবেগ ভারতের জন্যও হয়, ব্রাজিলের জন্যও হয়। কিন্তু ১৩ বছর বনবাসের যন্ত্রণা নিয়ে শুধু ক্লাবের জন্য আবেগ যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল সেদিন। বাসুদা, হরিদা, পবিত্র সবার উপরে বাবাকে ফোন করে আনন্দ ভাগ করে নিলাম। এ আনন্দ তো একা খাওয়া যায় না। উপস্থিত সবাই মিলেই বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে বাড়ি ফিরছি। ভেসে যাক আদরের নৌকা। চিংড়ির মালাইকারি আর দইপোনা থাক খাবার টেবিলে।

ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের দুঃখটা বুঝি, কিন্তু ভাই হিংসে কোর না তোমারও হবে! তখন না হয় আমরাও অভিনন্দন জানাবো। ততদিন বরং এই গানটা আরেকবার গাইঃ https://www.youtube.com/watch?v=Dw97-ZNaSEs

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s