(১৩৫)


11402381_10153397736595763_8016975454157146210_o
ব্লেড আর কলম ব্যবহার না করলে মরচে ধরে যায়। আবার অতিরিক্ত ব্যবহারেও এই দুটি ভোঁতা হয়ে যায়। তাই মধ্যপন্থা খুঁজে বার করা খুব জরুরী। কিন্তু সাম্যের গান গাহিয়া ভারসাম্য রক্ষা করতে তো সমগ্র মানবজাতিকে ভগা শেখান নি। তাই পা হড়কে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। ক্রিকেটে বোলারদের অধিনায়ক করলে তারা হয় বেশী বোলিং করে নয় তো কম বোলিং। বলি ভারসাম্যের বলি তো যত্র তত্র সর্বত্রই দেখা যায়। তাহলে আর আলাদা করে ফিসফাসের লেখককে দোষ দিয়ে কি করবেন বলুন? তারচেয়ে বরং সদ্য সমাপ্ত জামশেদপুর-কোলকাতা-দীঘা ত্রিকোণ প্রেম সফর নিয়ে কিছু মুখরোচক আর কিছু মিইয়ে যাওয়া গল্প বলি।

কথায় আছে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। সারা বছর ধরে স্বচ্ছতা নিয়ে মাতামাতি করে হঠাৎ করে মোদী সরকারের যোগের নামে হুটোপাটি করে ল্যাজে গোবর অবস্থা। সরকারি কর্মচারীদের কিসসু করার নেই হ্যাঁতে যদি হ্যাঁ মেলাতেই না পারলে তাইলে আর আমলা হলে কেন? সাধারণ মানুষের অবস্থা তো আরও করুণ।

কোনও এক অজ্ঞাত কারণে টিকিট বুকিং দু মাসের জায়গায় চার মাস আগে থেকেই করা যাবে। আরে বাবা সফর সূচী প্রধানমন্ত্রীরই চার মাস আগে পাকা হয়ে ওঠে না আর আমরা তো নশ্বর মানুষ। তাই প্রাপ্তি ওয়েটিং লিস্ট আর উৎকণ্ঠা। আর সকলের মতই ততকাল বুকিং-এর টোটকা এখনো ফিসফাস লেখক বার করে উঠতে পারে নি বলে জনসমুদ্রেই বিলীন হন।

এবারের গরমের ছুটি কাটাবার শুরু করার কথা ছিল জামশেদপুর থেকে, কিন্তু টিকিট কাটছি কাটব করে সময় কেটে যায়। আর লাইন সংরক্ষিত টিকিট পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় ওয়েটিং লিস্টে। প্রথমে বিশেষ পাত্তা না দেওয়া, “ও হয়ে যাবে” ভেবে। তারপর ধীরে ধীরে যখন সময় দাঁত নখ বার করতে শুরু করে তখন, দাদা ধরার তাড়া। সাধারণ ক্ষেত্রে নিজের জন্য কখনই ভিআইপি কোটার ব্যবহার করি না। কিন্তু এবার তো চাপ বাপ বাপ বলে ডাক দিয়েছে। শ্বশুরবাড়ির দেশে যাব আর টিকিট কনফার্মড না হলে মুখ পুড়বে। তাই বাধ্য হয়েই পিএনআর নম্বর দিয়ে পাঠালাম যথাস্থানে। যাত্রার ঠিক দুদিন আগে খবর এল, নাও হতে পারে।

মরেছে! জামশেদপুর থেকে কোলকাতা, কোলকাতা থেকে দীঘা, দীঘা থেকে কোলকাতা এমন কি যাবার আগের আগের দিন কোলকাতা থেকে ফেরার টিকিট যা কিনা শতাধিক ওয়েটিং লিস্টে ছিল তাও কনফার্মড হয়ে গেল। অথচ শ্রী গণেশই গোঁসা করে বসে। তাও তদ্বির তকদির লাগিয়ে ব্যাগ গুছোতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

তারপর আমার অফিসের বড় বস আবার বলে বসলেন যাবার আগের দিন নাকি পাটনা যেতে হতে পারে। আমি অনেক করে বোঝালাম যে প্যাকিং ট্যাকিং কিসসু হয় নি। ছোট বাচ্চা নিয়ে যাওয়া টাওয়া চাপ হয়ে যাবে। শেষে নিরস্ত্র করা গেল। পরে অবশ্য জানা গেল যে অনুষ্ঠানের পূর্বালোকনের জন্য আমাকে পাঠানো হচ্ছিল সেই অনুষ্ঠানটিই বাতিল হয়ে গেছে আদর্শ আচার সংহিতার পাল্লায়। বিধানসভা নির্বাচন বলে কথা। হুঁ হুঁ বাওয়া সবার উপরে কমিশন সত্য তাহার উপরে নাই।

তবুও আশায় বুক বেঁধে বাক্স প্যাঁটরা বেঁধে আগের দিন ট্যাক্সি ফর সিওরে বুক করলাম। মেল এল স্টেশনে যাবার ট্যাক্সি আসবে অথচ মেসেজ এল আসবে না। দ্বিধা কাটাতে যাত্রার দিন সকালে তাদের গ্রাহক পরিষেবার ফোন করলাম। তারা আশঙ্কা সত্যি করে দিল। শেষে ওলা ক্যাবস বুক করলাম। যাবার ঠিক ১৫ মিনিট আগে ড্রাইভারের বিস্তৃত বর্ণনা এল, সেই অনুযায়ী ফোন করলাম। সে বলে আমার গাজিয়াবাদ ঢোকার পারমিট নেই। খেলে যা। তার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই রিগ্রেট এসএমএস এসে গেল। ওলা অপারগ।

শেষে চার্ট তৈরী হবার আগেই যাত্রা শুরু করলাম অটো করে। যেতে যেতে এসএমএস এল দুটি টিকিট কনফার্মড হয়েছে আর আমার ছেলেরটি হয় নি। সে তো বিদ্রোহ করে বসল। তাকে ছাড়া আমরা যেতে পারিই না। তাকে বুঝিয়ে বাঝিয়ে ফোন ধরলাম বিশেষজ্ঞদের। অনলাইন বুকিং-এ তো আবার ওয়েট লিস্টেড টিকিট সরাসরি রিফাণ্ড হয়ে যায়। তা নানা মুনির নানা মত! একজন বলে, “সুপারফাস্টের জেনারেল টিকিট কেটে চড়ে পড়” ভাল কথা। তা রাজধানীর তো জেনারেল থাকে না। কে বোঝায় কাকে! আরেক গন্যিমান্যি বলেন, “এমনি এমনি চড়ে পড়ো, টিটিকে বলবে তুমি জানতে না”। ইল্লি আর কি, টিটি তো বোকা পাঁঠা আর আমরা চকিত চপলা হরিণী।

তা শেষে সেই বাতলে দিল, যদি হেড অফিস কোটা থেকে হয়ে থাকে তাহলে কিচ্ছু করতে হবে না। অতিরিক্ত চাহিদা থাকায় সবগুলো হয় নি। তা টিটি এসেও দেখলাম সেই কথাই বলল। এক দিক দিয়ে নিশ্চিন্ত। কিন্তু ভুবনেশ্বর রাজধানীর বার্থগুলি আবার ছোট ছোট। একটায় পার্শ্ববর্তিনী মেয়েকে নিয়ে আর একটায় আমি আর ছেলে। দুজনেই দুজনকে কষে লাথি গোঁত্তা মরে গত বারো বছরের যত রাগ আছে মিটিয়ে নিলাম। আর মেয়ে সেই ফাঁকে পুরো কামরা জুড়ে জমিদারী পরখ করে শেষমেশ বই খাতা পেন্সিল নিয়ে ট্রেনের মেঝেতে উবু হয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করতে লাগল। এই ভাবেই পৌঁছে গেলাম জামশেদপুর।

অবশ্য রাজধানীর খাবার দাবারের অবস্থা কহতব্য নয়। শিয়ালদা রাজধানী আগে অন্তত পুঁটি মাছের ফ্রাই দিত। ভুবনেশ্বর রাজধানীতে তো রাতের কন্টিনেটালে ভেজিটেবল সেদ্ধই দিয়ে দেয়। ব্রেডের কথা জিজ্ঞাসা করলে বলে সাড়ে দশটায় কানপুর এলে ব্রেড দিতে পারবে। শেষে স্যুট বুটের সঙ্গে তিলক কেটে সাদা দই খেয়েই পেট ভরাই।

জামশেদপুরের পুরনো তারগুলির সঙ্গে এবার জোড়া লাগল নতুন তার বারিন দার সঙ্গে দেখা। তারপর অবশ্য বিশেষ ভোগান্তির গল্প হল না, শুধু মাত্র যে রাতে হাওড়া তার দুয়ার খুলে দিল ঝড়ে সে রাতে ভিজে ভিজে বাড়ি এসে পৌঁছলাম সাড়ে দশটায়। আহা কোলকাতা আমার, ছেড়ে দিলেও শহরটা আমায় ছাড়ে না। কোথাও না কোথাও আস্টেপিস্টে জড়িয়ে রাখে অর্জুন গাছের মত।

তাই আমি এলে সৃষ্টিসুখের বইপ্রকাশ, পুরনো কূট সাহিত্যের বন্ধুদের সঙ্গে জিটি আর স্কুলের সহপাঠী পাঠিনীদের সঙ্গে আড্ডা তো বাঁধাই থাকে। সঙ্গে কিছু নতুন বন্ধুর পুরনো হয়ে যাওয়া আর পুরনো বন্ধুদের নতুন করে ফিরে পাওয়া। এর সঙ্গেই থাকে আমাদের শিকড়ের টান। যে সব শিকড়গুলো আমাদেরকে ঘিরে ধরে বড় করে তুললো তাদের বৎসরান্তে একটা সন্ধ্যা, একটা সকাল বা একটা বিকেল দিয়ে জোরদার করে তোলা। বলে যাওয়া আবার আসব আমরা আবার একসঙ্গে বসে কিছুটা সময় জীবন কাটাব আমরা।

রূপঙ্কর দা-র সঙ্গে গল্প লেখা গদ্য লেখা নিয়ে হুল্লাট আড্ডা, কিশোর দা, কৌশিক দা, তমাল, অতনু, ইন্দ্রনীলদা, সুবীরদা, সোমা, রাজা দা, বাসু দা, শুদ্ধ, ইন্দ্রাণী, হরি দা, কোয়েলি, সুস্মিতা দি, অমিতাভ, বক্সী, কেয়ার বইপ্রকাশ, সামরানদির পুরস্কার প্রাপ্তি, সরোজ, সিদ্ধার্থ- মিঠুন পেরিয়ে স্কুলের গণ্ডির এক্কা দোক্কা।

এর মধ্যেই মনে থাকে অ্যাকাদেমি চত্বরে রূপঙ্কর দার সঙ্গে আড্ডার সময় হঠাৎ পেনের দরকার পড়লে পাশের টেবিলের সদ্য তরুণীটি বলে ওঠে আমার বই পড়তে খুব ভালো লাগে। আর বই উপহার পেয়ে কিশোরীর মত খুশীতে ভরে ওঠে সে। বলে, আমি নিশ্চয় জানাবো কেমন লাগল। আমার বই কাউকে দিই না। আগলে রাখি! বইয়ের গন্ধটাই যে আলাদা হয়।

এর মাঝে প্রিয়জনের অসুস্থতা আবার সেই বয়স্কদের অসহায়তা সামনে এনে দেয়। কথায় বলে সরকারী পেনশনপ্রাপকরা নাকি সবথেকে সুখী সরকার তাদের জন্য পেনশন দিচ্ছে, স্বাস্থ্য সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু কোলকাতা ছেড়ে পরবর্তী প্রজন্ম যে প্রবাসে পাড়ি জমায় তখন তাদের সঙ্গ কে দেয়? আর সরকারী স্বাস্থ্য পরিষেবার পেয়ারায় যে পোকাগুলো বাস করে, সেগুলোকে যত্ন করে সরিয়ে দেবার লোকের বড়ই অভাব। খোঁজ নিন পাঠক পাঠিকারা, খোঁজ নিন আমাদের আগের প্রজন্ম কেমন আছেন? আমাদের মুখের দিকে তাকিয়েই তাদের জীবন কাটছে নাকি সেখানেও অন্ধকার?

ফিরে আসার সময়, ট্রেনের মধ্যেই দুটো ঘটনা মনে থেকে যাবে। শিয়ালদায় নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বার্থে গিয়ে দেখি সেখানে সর্দারনি হাজার খানেক বাক্স প্যাঁটরা আর খান দশেক কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে বসে আছে। বড় গলায় বললেন তাদের নাকি চারটে বার্থ আছে। আমি বললাম আমাদেরই তিনটে আছে তো তাঁদের চারটে কি করে হয়? হয় হয় zaনতি পার না। দুই আর দুইয়ে পাঁচ হলে চার আর তিনে ছয় হবে না কেন? সন্দেহ হতে চার্টে গিয়ে দেখি কোন এক মহাপাত্র এবং পুরকায়স্থ আছেন আর আছেন এক মালাকার, তিনি আবার দূর্গাপুর থেকে উঠবেন। সে কথা বলতে সর্দারনি বললেন তিনি জানেন, তাঁদের বার্থ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে বলে সর্দারগুলো সেগুলো খুঁজতে গেছে। আমি বললাম সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন “তো?” “ধিরজ রাখো, অন্দর অন্দর নিকল জায়েঙ্গে!” আমি বললাম “আর আমরা?” তিনি তেড়িয়া হয়ে বললেন, দশ মিনিট রুকনে সে কেয়া ট্রেন নিকল জায়গা?” অকাট্য সর্দারি যুক্তি। নীচে নেমে ওদের মধ্যেই যে একটু পাগড়ি খোলা মুক্ত হাওয়া ছিল তাকে বলতেই পরিষ্কার হল কেসটা। এদের বুকিং বি ১ এবং ২য়ে। অতটা পথ পেরতে গেলে হাঁপিয়ে যাবে বলে সর্দারনি ইচ্ছে মতো জায়গা দখল করে বসে আছে। শেষে কামরা শুদ্ধ লোককে রেহাই দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়ে সর্দারকুল বিদায় নিল। মহাপাত্রবাবু বললেন, যে তিনি বেজায় ঘাবড়ে গেছিলেন। তিনি নিজের জায়গায় বসতে যেতেই নাকি সর্দারনি তাকে হুকুম করেছিলেন যে তাদের বার্থ বি১এ আছে এবং মহাপাত্র বাবুকে সেখানেই যেতে হবে। শেষে আমি মিষ্টি কথায় বলতে নাকি তিনি একটু সাহস পেলেন।

আর দুটি বিজাতীয় বাচ্চা চৌবাচ্চার মতো বাঁদরামো করে যাচ্ছিল। তাদের মা এক একবার বকছে আবার তারপরেই তারা কান্না জুড়লে ভোলাতে গিয়ে বলছে মার মুঝে। বোজো ঠ্যালা। তাদের মা একবার আমায় বললেন, “ভাইয়া ডাঁট দিজিয়ে জোরসে! নেহি তো শুনেগা নেহি!” তা সে আমার কেন। এক আরপিএফ জোয়ান বন্দুক দেখালেও তারা হ্যা হ্যা করে। শেষে রাত দশটায় পার্শ্ববর্তিনীর সিংহি নাদে তারা চুপ করে।

তারপর? তারপর আর কি? ট্রেন ফেরার পথে তুমুল বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে পড়ে সাহিবাবাদে, নেমে পড়ে ট্যাক্সি সার্ভিস থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সময়ের আগেই বাড়ি। কিন্তু পৌঁছতে পার্শ্ববর্তিনীর বৃষ্টিবাবদ নতুন মোবাইল হারানো এবং তারপর বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের রক্তদান শিবিরে রক্তদান করে পাকাপাকি দিল্লি মোডে ফিরে আসা।

সেদিন আবার যোগা দিবস। সারা জীবন ধরে যারা লাভ ক্ষতির হিসেব রাখতে পারে না সেই চল্লিশ হাজার ভারতীয় রাজপথে জড় হয়ে সুস্থ শরীরকে ব্যস্ত করে তোলে। প্রায় সত্তর বছর পেরিয়েও দেশের মেরুদণ্ড সোজা হল না। স্টান্টবাজদের পাল্লায় যেন এক একুশে জুনেই হয়ে যাবে! যাই হোক স্বপ্ন দেখতে তো স্বচ্ছ ভারত সেস লাগে না। তাই এই আকালেও চলতে থাকুক স্বপ্ন দেখা আর চলতে থাকুক ফি বছর শিকড়ের কাছাকাছি ফিরে যাওয়া। শিকড়ের টানটাই তো আমাদের উড়তে দেয় আকাশে ঘুড়ির মতো। লাটাই গোটাতে গোটাতে যেন সুতো ছিঁড়ে না যায়। মাঞ্জাটা ভাল হওয়া চাই মামা! বৃষ্টি আসবেই…
11402381_10153397736595763_8016975454157146210_o

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ সারা ময়দান মার্কেট ঘুরেও একটা দরের মোহনবাগান জার্সি পেলাম না। ক্লাবগুলোর এবার ভাবার সময় হয়েছে মার্চেন্ডাইজিং নিয়ে।

2 thoughts on “(১৩৫)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s