(১৩৭)


শেক্ষপীর বলে গেছেন, “বাবুমশায়, ইয়ে দুনিয়া এক রঙ্গমঞ্চ হ্যায়, অউর হাম সব কাঠপুতলিয়া…” উল্লাস করুন পাঠক/ পাঠিকারা, আপনাদের ফিসফাস লেখক তাঁর জীবনে প্রথমবার জীবনদায়ীর ভূমিকায় অভিনয় করল। অবশ্য কারুরই জীবন সে দান করে নি বা ফিরিয়ে আনে নি। তবু অভিনয় তো! কেউ যে মুখ ফুটে তাকে
“ডাক্তার সাব” বলে ডেকেছে, তাই বা কম কি?

অতিরিক্ত ভ্যানত্যারা না মেরে সোজাসুজি কথায় আসি। হয়েছে কি গতকাল বিকেলের দিকে ফিসফাস লেখক পার্শ্ববর্তিনীর সঙ্গে দিল্লির গঙ্গারাম হাসপাতালের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। তালকাটোরা স্টেডিয়াম পেরিয়ে সবে সে শঙ্কর রোডে ঢুকবে, তখন দেখল, সার বেঁধে পুলুশ টুলুশ দাঁড়িয়ে আছে আর জেব্রা ক্রশিং-এ কিছু লোক জবরদস্তি রাস্তা পার হবার চেষ্টা করছে।

রাস্তা তুমি কার?
যার যত বেশী চাকা আমি তার!!

পদযাত্রীদের তো ভাগ্যের চাকা- তাও যে ঘোরেও না। মাঝে সাঝে ইচ্ছে হলে দু পা এগিয়েও এক পা পিছিয়ে আসে। তাই পথ পেরোতে চারচাকা যে অগ্রাধিকার পাবে সে কথা আর বলতে নয়। তবে দিল্লি পুলুশ মাঝে মধ্যেই বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে কিন্তু চালান না কাটলে খরচ বাড়ে। তাই সপ্তাহান্তের ব্যবহারিক প্রক্রিয়া।

আমাদের অবশ্য চিন্তা নেই, দ্বিপ্রাহরিক ভাতঘুমের পর গাড়ি চালাচ্ছি, বেল্ট পরিহিত, বীমার কাগজ এখনো তার গুরুত্ব হারায় নি। অতএব আমার আবার চিন্তা কি? বিশ্বের সকল পুলুশই আমার মাতুলক্রমঃ।
তা সেই মাতুলতুতো ভালবাসা মাঝে মধ্যেই প্রবল হয়ে ওঠে, জানেনই তো। এখানেও আমায় ডাকল ধারে। একেবারে কর্ডলেস মাইকে করে। তাপ্পর বলে কি না, একশো টাকা বার কর, চালান কাটা হবে। কেন? জেব্রা ক্রসিং-এ পদযাত্রীর অগ্রাধিকার, সে কান চুলকোতে চুলকোতে, ব্যাঁও সহ ঢেকুর তুলতে তুলতে চু কিত কিত খেলতে খেলতে পথ পেরবে জেব্রা ক্রসিং বেয়ে। আর আপনি চল্লিশ-ষাট-আশি ছুঁয়ে ঝট করে গাড়িকে শূন্যে নামিয়ে নিয়ে চলে আসবেন তাঁর অনুগ্রহের ভরসায়।

অন্ততঃ সেইটাই আমায় বলা হল, সেই আগে বলেছিলাম পুলুশ শুনলেই কান মাথা ভোঁ ভোঁ করে মাথার চারদিকে আলো হয়ে যায় আর দিব্যদৃষ্টি আসে। এখানেও তাই হল! কি হল কে জানে, হেঁটে গিয়ে দেখতে গেলাম জেব্রা ক্রসিং পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে কি না, নেগেটিভ। ব্লিঙ্কার রেড লাইট আছে কি না, নেগেটিভ। পুলুশের কোটা পূর্ণ করার তাড়া আছে কি না, এইটায় কেমন যেন সন্দেহ বদ্ধমূল হল। ব্যাস আর যাবি কোথায়, হেড কনস্টেবলকে বেশ চড়া গলায় বললাম, “আপলোগ ইয়ে সাজিশ রচ কে ফাঁসা রহে হো, লাইন্সেন্স লে লো! ফাইন ম্যায় দুঙ্গা নহি! কনটেস্ট করনা হ্যায়!”

হেডকনস্টেবল রামপাল গেল ক্ষেপে, বলে, “দিজিয়ে লাইসেন্স!” কেলো, এক ঝটকায় ম্যায় কাহাঁ হুঁ!! কিন্তু এই সময় চট করে হার মানলে তো প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন! হঠাত দেখলাম আরেক পুলুশ আমার দিকে এগিয়ে আসছে এই বলতে বলতে, “আপ চিল্লা কে কিঁউ বাত কর রহে হো?” সত্যিই তো! কিন্তু আমি তো রজনীকান্ত নই, বন্দুকের গুলি একবার বেরিয়ে গেলে তাকে হাজার চেষ্টাতেও ফেরানো যায় না। টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলেছেন, কিন্তু বল গেছে দু টুকরো হয়ে, কোন টুকরোটা ধরলে আউট হবে? হবে না দাদা এটা ডেড বল। হঠাৎ দেখলাম, একটু আশার আলো, নতুন যে পুলুশ আমার দিকে এগিয়ে এলো তার ডান হাতের কব্জির উপর থেকে কনুই পর্যন্ত বেশ অনেকটা ছড়ে যাবার চিহ্ন। ঘা দগদগ করছে, তারউপর ঘাম পড়ে ডুবন্ত সূর্যয় চকচকে হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিস্যু না ভেবে বললাম, “ইয়ে কেয়া হ্যায়? বাইকসে গির গয়ে থে?” সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। রামপাল ততক্ষণে দোর্দণ্ডপ্রতাপ। কিন্তু তাকে একেবারে অমোঘ হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে নতুন পুলুশকে বললাম, উঁহু! গলত কাম হ্যায় ইয়ে! খোলকে কিঁউ রাখখে হো?” সে বলে শুকিয়ে যাবে বলে। তাকে বেশ বকাঝকার মতো করেই বললাম, ধুল মিট্টি আর ঘাম লেগে সেরে ওঠার জায়গায় হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। (কথাটা সত্যি যদিও!!) তার সঙ্গে একদম চেরি অন দ্য টপ লাগিয়ে দিলাম। গম গম করে বলে উঠলাম, “ম্যায় ডক্টর হো কে ইয়ে বাত কহ রাহা হুঁ!” বিশ্বাস করুন পাঠক পাঠিকারা, মাটি চিড়ে দু ফাঁক হল না। মন্দিরের ঘণ্টা, মসজিদের আজান ধ্বনি গীর্জার ঢং ঢং সারা আকাশ বাতাস ভরিয়ে দিল না! এমন কি আমার জিভটাও খসে পড়ল না। খালি নতুন পুলুশ জিজ্ঞাসা করল, কোথাকার ডাক্তার? অম্লান বদনে বলে ফেললাম, “গঙ্গারাম”!

তার চোখমুখই পালটে গেল, সে সম্ভ্রমের সঙ্গে বলে উঠল, “ডক্টর সাব”। আরে হট পাগলে, কাঁদাবি নাকি? আরও বলল, তবে এবার রামপালকে, “ডাক্তার সাব কো ছোড় দো, কোই নহি! ডক্টর সাব দো মিনিট রুক যাও! সব লগ দেখ রহে হ্যায়! রামপাল জী লাইসেন্স ওয়াপস করো!” অ্যাঁ? ছোঁড়া বলে কি? কিন্তু রামপালের তো ডাইরেক্ট ঝামেলা হয়েছে। সে ছাড়বে কেন, তখনো সে তড়পাচ্ছে, “পেয়ার সে বোলতে, সরকারী অফসর, ডক্টর পেয়ার সে বোলতে তো ছোড় নেহি দেতে?”

ধুর পাগলা, এখন আমি দশাবতার, বিনয় অবতার, কাঁটাতার, প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার…। তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “রামপাল জী দেখিয়ে, আব তো আপ চিল্লাকে বাত কর রহে হ্যায় অউর ম্যায় হাস রাহা হুঁ! কেয়া ফায়দা? চলিয়ে সরি বোল দিয়ে! হো গয়ে?” নতুন পুলুশও তখন আমার নতুন উকিল। রামপাল আর কতক্ষণ চালাবে? আসার সময় লাইসেন্সটা নিয়ে রামপালের পিঠ চাপড়ে দিয়ে চালকের আসনে ফিরে এলাম। হায়দ্রাবাদ থেকে আমার বোন বলল, “এটা সফট স্কিল!” হেঁহেঁ ডুবন্ত সূর্যটা তখন বেশ রাঙা হয়ে উঠেছে।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বলছি ফ্রিজ সারাতে পারেন? কাল আমার শ্বশুরবাড়িতে ফ্রিজ সারাতে এসেছিল কোম্পানি থেকে। আমার মেয়ে গিয়ে সটান তার জালির দরজা খুলে দিয়ে তাকে “অ্যাও” বলে হাত বাড়িয়ে দিল। সে লোকটা তো হেসেই খুন। তারপর ফ্রিজ টিজ সারিয়ে যখন বিলের কপিটা আমার শ্বাশুড়ি মাকে দিতে গেছে, মেয়ে গিয়ে তার হাত থেকে সেটা নিয়ে বলল, “তাঙ্কু” তারপর বলল, “টাটা”! লোকটা হাসতে হাসতে চলে গেল। ফিজটা নিয়েছিল কি না সেটা জানা নেই। তবে যেটা পেল সেটা আমি দিন রাত পাই বলেই জানি কতটা ধনী আমি! আমেন!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s