(১৩৮)

মোমিন কামড়েছে!!

অ্যাঁহ? ফিসফাসের শুরুতেই এরকম ভয়ঙ্কর হেডলাইন বা পাঞ্চলাইন? পাঠক পাঠিকা কেন লেখককেই নড়ে চড়ে বসতে হয়!

সেই ছোটবেলায় আমি যখন খুব ছোট ছিলাম না। বাজুও মে দম আসতে শুরু করেছে। সেই সময় খেলা নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে মারামারি হয়ে যায়। তা সে ছিল পাঁচ ফুট আর আমি বর্তমান পাঁচ এগারোতে ততক্ষণে ল্যাণ্ড করে গেছি। তাই সে অমিতশক্তিধর হলেও শুধুমাত্র ‘রিচ’-এর ফায়দা নিয়ে তাকে বগলদাবা করতে দেরী হয় নি। তা সে বগলদাবা বলে বগলদাবা? একেবারে বালির বগলে রাবণের ছটপটানি অবস্থা। অবিশ্রান্ত বুকে পিঠে ঘুষি খেয়েও সে আলগা হয় নি। তবে কিনা কচ্ছপের কামড় ছাড়ে বিদ্যুৎ গর্জনে। আমার ক্ষেত্রে উল্টো ঘটল। সে বন্ধুই হঠাৎ ক্ষেপে মেপে (অথবা না মেপে) “সৌরানশু” বলে খ্যাঁক করে আমার থুতনিতে দিল কামড়ে। মানে সেটাই ছিল আয়ত্ত্বের মধ্যে। ফলে হল হিতে বিপরীত। মারপিট রাগ দুঃখ ভুলে আমি খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে শুরু করলাম। আর সে বন্ধুও গেল আরও চটে। যাই হোক ততক্ষণে বাকিরা এসে যাওয়ায় সে মারপিট বেশি দূর গড়ায় নি।

তারপর বেশ কয়েকবার কুকুর, বিড়াল এমন কি সাপের কামড় থেকে স্রেফ রিফ্লেক্সের জোরে বেঁচে গিয়েও শেষ রক্ষা হল না। কাল মোমিন কামড়ে দিল!

হ্যাঁ পাঠক পাঠিকারা! ঠিকই শুনেছেন! মোমিন কামড়েছে!

তাহলে খোলসা করেই বলি! কি বলেন? আমার অত্যন্ত আপনজন মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে দিল্লির গঙ্গারাম হাসপাতালে ভর্তি আছেন। সেই সুকুমার গঙ্গারাম শুধু মাত্র পিলের জ্বর আর পাণ্ডু রোগে ভুগত। কিন্তু এই গঙ্গারাম হাসপাতাল হিসাবে এক ঘর এবং বেসরকারি হাসপাতাল হবার পরেও তার বাণিজ্যিক বদগুণ কিছুটা হলেও কম। গত সতেরো দিনে আমরা পরিবারের সবাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পাহারাদারের ভূমিকা নিচ্ছি। উনি সুস্থ হচ্ছেন ধীরে ধীরে। তাই এখন আইসিইউ-এর পরিবর্তে এইচডিইউ বা হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে রয়েছেন। যেখানে ২৪ ঘন্টা একজন অ্যাটেন্ডেন্ট থাকা বাধ্যতামূলক।

কাল ছিল আমার পালা। শুনছিলাম গত দু-তিন দিন ধরেই এবং তাকে সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে থাকতে দেখে সন্দেহই হচ্ছিল। রাত্রিবেলায় সমস্ত ক্রিয়াকর্ম সাধন করে তারপর পাশের গদিটায় গুছিয়ে নিজেকে লম্বা করেছি। আমাদের পাশের বেডটিতে যে ভদ্রমহিলা আছেন, তিনি মস্তিষ্কে শর্করার পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে ঘুম ছাড়া সর্বক্ষণ একঘেয়ে “অ্যাহ অ্যাহ” করে যান, তিনিও ঘুমিয়েছেন।

হঠাৎ গভীর রাত্রে গেল ঘুম ভেঙে। ঘড়ি দেখলাম তিনটে বাজে। আর সামনের বাবাজী, যার নাম নথিভুক্ত আছে ‘মোমিন’ তিনি উঠে পড়েছেন। তাঁর একটি বিশাল নিইরোলজিকাল অস্ত্রোপচার হয়েছে। ফলে উৎকট উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। তাঁর খালি মনে হচ্ছে যে তিনি সুস্থ এবং রাত্রে তলপেটে বেগ এলে তাকে করতে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ক্যাথেটার ফ্যাথেটার মারও গোলি! পায়ে লাগানো গ্লুকোজ এবং অন্যান্য ওষুধের ড্রিপ ছিঁড়ে ফ্যাল। ‘মুঝে পিসাব করনা হ্যায়’। তিনজন নার্স এবং মোমিনের দুইজন বেঁটেখাটো কিন্তু শক্ত সমর্থ অ্যাটেন্ড্যান্ট নাঝেহাল। গালাগাল আর হাত পা চালানোর তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এইসব ক্ষেত্রে আমার ভিতরের বনের মোষ তাড়ানো রাখালটা ঝাঁপিয়ে পড়ে পরোপকারে। এই অবলা নারীপুরুষদের কে বাঁচাবে? আমি ছাড়া?
ময়দানে নামলাম। প্রথমে নরমে হল না গরমেও না। আমাকেও চার অক্ষর থেকে শুরু করে ছয় অক্ষরে ভাসিয়ে দিল। “মুঝে পিসাব করনা হ্যায়”! ওদিকে ডিউটিতে থাকা কোন ডাক্তারকেও তক্ষনি পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে নার্সরাই সিডেটিভ ইনজেকশন নিয়ে প্রস্তুত হল। কিন্তু লাগায় কার সাধ্য। শেষে আমিঃ তার উর্ধ্ববাহুর অংশ দুটো চেপ্পে ধরলাম। আর এক নার্স তাকে ঘোরাবার চেষ্টা করতে লাগল। তার দুই অ্যাটেন্ড্যান্ট তার দুপা চেপে ধরল। সে কিছু করতে না পেরে, ডেকে উঠল, ‘ডি কে বোস, হাত ছোড় মেরে, পিসাব করনা হ্যায়!’ ডেকেই ঘ্যাঁক করে দিল কামড়ে আমার ডান হাতের অনামিকার গাঁটে। রক্তপাতের মাঝেও আমি মাথা ঠাণ্ডা রেখে বললাম “ইসকা ক্যাথেটার নিকাল দো” দুই মালায়লি নার্স ভাসা ভাসা হিন্দিতে, “আউই নিকাউল রয়ে অ্যায়” বলে প্যাঁট করে পিছনে দিল ইনজেকশন ফুটিয়ে। “লাগ গয়া, লাগ গয়া!” বলতে বলতে এদিক ওদিক করতে করতে তারপর শুয়ে পড়ল। আর আমি বেটাডিন লাগিয়ে ছুটলাম এমার্জেন্সিতে।

সেখানে আর এক ঘটনা! গিয়ে বললাম, টেটভ্যাক নেব! জিজ্ঞাসা করল, কেন? আমি বললাম, মোমিন কামড়েছে! এমার্জেন্সির উপস্থিত ডাক্তারটা চমকে আমার মুখের দিকে তাকাল। তারপর বিপজ্জনকভাবে আমার মুখের সামনে এসে জিজ্ঞাসা করল, “ফিরসে বোলিয়ে কেয়া হুয়া?” আমি তখন বললাম, “এক নিউরো পেসেন্টনে কাট দিয়া!” ততক্ষণে সে মুখের কাছে শুঁকে টুকে বুঝে গেছে আমি গোপাল বা তমাল নই! তা এক স্টুয়ার্ডকে বলল টিটেনাস দিয়ে দিতে। তারপর বলল, “নিউরো ডিপার্ট্মেন্টমে পেসেন্টকে যাদা পাস মত যাইয়ে”।

আমিও মাথা নেড়ে ফিরে এলাম। এসে দেখি মোমিনের তেজ কমে এসেছে। সে মাঝে মাঝে উঠে বসছে “মুঝে পিসাব করনা হ্যায়” বলে। তারপর আবার শুয়ে পড়ছে। কিন্তু এদিকের বেডের ভদ্রমহিলা উঠে পড়ে, এক ঘেয়ে সুরে “অ্যাহ অ্যাহ” গান গাইতে লেগেছেন। ওদিকের এক ভদ্রলোক অসহ্য যন্ত্রণায় “আম্মা! উঠালে! উঠালে!” করে ডাকতে লেগেছেন। এর মধ্যেই কোনের দিকের এক ভদ্রলোকের আবার ইয়ে হয়ে গেল। তিনি হাঁক ডাক করতে লাগলেন পরিষ্কার করে দেবার জন্য। যাই হোক এরকম করতে করতে সকাল হয়ে গেল। আর সূর্যের ডাক শুনে আমরাও উঠে পড়লাম। ডাক্তার রাউণ্ডে এলেন, তাঁকে বলতে গেলে তিনিই খ্যাঁক করে উঠলেন, “হোয়াই ডিড ইউ গো দেয়ার? হি ইজ অ্যা নিউরো পেসেন্ট অ্যান্ড ডেঞ্জারাস!” যাই হোক তাকেও বোঝানো গেল। নার্সিং ইন চার্জকেও বললাম যে রাতে এই বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলোর সাথে একটা শক্ত সমর্থ অ্যাটেন্ড্যান্ট বয়ের থাকা প্রয়োজন। সেই নার্সগুলোও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আগ বাড়িয়ে বেশি বেশি কাজ করে দিত লাগল।
এই আর কি! চলে আসার সময় দেখি মোমিনকে আজ ডিসচার্জ করে দেওয়া হবে। কারণ বেচারি সব্জিওলার কাছে কতই বা টাকা থাকবে এবং এখন তার শুধু ওষুধ চলবে তা কোন সস্তা হাসপাতালেও চলতে পারে। ততক্ষণে অবশ্য মেট্রন টাইপের নার্সরা এসে গেছেন এবং মোমিনকে ধমকে ধামকে ব্ল্যাক টি খাইয়ে দিচ্ছেন।

দিন শুরু করার আগে পার্শ্ববর্তিনীকে ফোন করে জানলাম, “মোমিন কামড়েছে!” তিনি না বুঝতে পেরে বললেন, একটা গুড নাইট রাখা উচিত ছিল! আমেন… ইয়ে… মোমিন কামড়েছে।

2 thoughts on “(১৩৮)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s