(১৩৯)


ধরা যাক রাত সাড়ে নটার সময় একটি চারলেনের রাস্তায় আপনি একা একা হাঁটছেন। আপনার একশো হাতের মধ্যে কোন জনমনিষ্যি দেখতে পাচ্ছেন না। গ্যাসলাইটের আলো মাঝে মাঝেই ব্রেক দিচ্ছে অন্ধকারকে জায়গা করে দিতে। পাশের জানকী দেবী কলেজের গেট পেরিয়ে জঙ্গলের মতো মাঠ উঁকি দিচ্ছে। রাস্তাটা একটু গিয়ে বাঁক নিয়েছে সেখানে হয়তো বেশ কিছু লোক রয়েছে। ডানদিকের রাস্তার ওপারের বাড়িগুলোর জানলাগুলো সবই এসি মেশিনের খাঁচা দিয়ে ঢাকা।

এমন সময় একটা পাঠান টাইপের দেখতে গুঁফো মস্তান মতো লোক কাঁধে ঝোলা ফেলে পাশের গলি থেকে ঠিক আপনার পিছনের দশ পা দূরে আপনার সঙ্গী হল। এমনিতে আপনার গায়ে যে খুব একটা কম জোর তাও নয়। তবুও পরিবেশ আর আবহাওয়া শক্তির প্রায় তিরিশ শতাংশ শুষে নিয়েছে। শহরের রাস্তা, চিৎকার করলেও একটা ঝিঁঝিঁ পোকাও আপনাকে দেখতে আসবে না। সাহায্য করা তো দূরের কথা।

আপনি গতি বাড়ালেন, সেও বাড়ালো। দশ পা ক্রমে ক্রমে নয় আট সাত করে চারে! আপনি আরও জোরে হাঁটলেন। চার বেড়ে ছয় হল কিন্তু আবার কমে দুই। মোড়টা দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের আউট গেট- গেট কিপার- দুটো টোটো রিক্সা- একটা চায়ের দোকান- আরও কিছু লোকজন! আপনি পড়ি কি মরি করে দৌড় লাগালেন! লোকটা হাঁটছে, কিন্তু বড় বড় পায়ে যেন আপনার ঘাড়ের কাছে উঠে আসছে। নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন আপনি। গরম গরম নিঃশ্বাস আপনার ঘাড়ে পড়ে ঠাণ্ডা বরফ ছাপ হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের গেটের দিকে আপনি ঘুরে গেলেন লোকটাও ঘুরল। সামনেই সিকিউরিটি রুম, কিন্তু লোকটা যেন সব কিছু অগ্রাহ্য করেছে আজ। আপনার দমে টান পড়ছে। সিকিউরিটি রুমটা পেরিয়েই ক্যান্টিন। চোখ বুজে ছুটে ঢুকে পড়লেন আলো মিলিয়ে। কি আশ্চর্য লোকটাও ঢুকে পড়েছে। ভয় ডর বলে কিছু নেই না কি?

জল একটু জল চাই! দৌড়ে গিয়ে ওয়াটার কুলারটার উপরে রাখা প্লাস্টিকের জলের গ্লাসটা নিয়ে কল খুলে দিলেন আর তার তিন সেকেণ্ড পরেই গ্লাসের সমস্ত ঠাণ্ডাটা গলা বেয়ে শিরদাঁড়া চুঁইয়ে নামতে লাগল। আর আপনি পরম বিস্ময়ে দেখলেন, লোকটা আপনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ক্যান্টিনের কাউন্টার থেকে দু কাপ চা নিয়ে হাসপাতালের মেন বিল্ডিং-এর দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। যাক বাবা খুব জোর বাঁচা গেছে!

এদিকে লোকটা বিল্ডিং-এর চার তলায় নির্দিষ্ট ঘরে গিয়ে পূর্বপরিচিত দুজনের হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে ফিচ ফিচ করে হাসতে হাসতে ঘটনাটা বলতে লাগল। অবশ্য আপনি সেটা শুনতে বা দেখতে পেলেন না। কিন্তু মনে মনে ভাবলেন খুব বাঁচান বেঁচেছেন আজ! অবশ্য আপনি এটাও বুঝতে পারলেন না পরের দিন দুপুরে লোকটা ফিসফাস বলে একটা ব্লগে আপনার ভয় পেয়ে গলা শুকিয়ে যাবার ঘটনাটা রসিয়ে রসিয়ে লিখেও দিল। যান খুব কমের উপর দিয়ে গেছে যখন তখন আপনাকে আর ঘাঁটাব না। বরং আসুন লোকটা কি বলছে দেখি।

কি আর বলব মশাই! রাত বিরেতে জনমনিষ্যিহীন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ যদি খেয়াল করেন যে আপনার ঠিক আগের লোকটা আপনার সঙ্গে রেস লাগাচ্ছে, তাহলে খাবার হজম করার ফিকিরে আপনিও কি তাল মেলাবেন না? মেল ইগো বলে কথা! আমেন!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এমনিতে মাঝেসাঝেই বিখ্যাত ব্যক্তিদের সফর সঙ্গী হবার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তা আর এমন কি? তবে কদিনের আগে লণ্ডন যেতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আমার সফর সঙ্গী হলেন। মানে আমি লণ্ডন যাচ্ছিলাম না, দিল্লি যাচ্ছিলাম। (প্রয়োজন ছিল না বলার! কিন্তু প্রঃ পুঃ বলে কথা!!) তা তিনি দেখলাম লাইন দিয়ে চেক ইন করলেন, এবং ইকোনমি ক্লাসে ঢুকে সকলকে নমস্কার জানিয়ে বলবার চেষ্টা করলেন, “আমরা সকলে তাহলে দিল্লি যাচ্ছি!” টাইপের কিছু একটা। কিন্তু ব্যাপারটা এতই অবভিয়স যে কেউ আর বিশেষ সাড়া দিল না। তিনিও নিজের সিটে গিয়ে বসে পড়লেন। সোশাল মিডিয়া খুললেই যেখানে ভদ্রমহিলার খিল্লি ও মেমেতে ভরপুর, সেখানে এই ধরণের ব্যবহার (যদি অভিনয় হয় তাও হোক না!) বেশ চমক জাগানো। আমি যে ভদ্রমহিলার বিশাল বড় পাখা সেটা আমার বৃহত্তম শত্রুও বলবে না। খারাপটাকে খারাপ যখন দিল খুলে বলি, ভাল জিনিসকে ভাল বলতেই হয়। দিল্লির ভিআইপি কালচারে গত ষোল বছর ধরে দিন গুজরান করেই বলছি, এটা সত্যিই বিরল। এক মনোহর পারিক্কর ছাড়া কাউকেই বিশেষ দেখি টেখি নি! ভুল হলে শুধরে দেবেন পাঠক পাঠিকারা।

প্রঃ পুঃ ২- গত কয়েকদিনের কয়েকটি মৃত্যু এবং ততসম্বন্ধীয় ঘটনায় মনে হয়েছে সমালোচনা করার অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব বলেও একটা ব্যাপার আমাদের ঘাড়ে অদৃশ্যভাবে চেপে বসে। যত তাড়াতাড়ি আমরা সেটাকে পাকড়াও করতে পারি ততই মঙ্গল। দেশের, দশের কিম্বা একের!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s