(১৪০)

(আমরা কেউ ধর্মে বিশ্বাস করি, কেউ হয়ত ধর্মকে পরিত্যাগ করিনি কিন্তু ধর্ম নিয়ে মাথাও ঘামাই না, কেউ কট্টর নাস্তিক আবার কেউ বা ধর্মনিরপেক্ষ – কিন্তু একটা জায়গায় আমাদের গভীর মিল আছে, আমরা সবাই বাকস্বাধীনতায় প্রবল ভাবে বিশ্বাসী। আর সেই জন্যই রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাস, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়রা যে কথাগুলো বলতে চেয়ে প্রাণ হারালেন সে কথাগুলো যাতে হারিয়ে না যায় তার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাব, ওনাদের সঙ্গে আমাদের মতাদর্শের মিল আছে কি নেই সেটা এই মুহূর্তে অবান্তর প্রশ্ন। কথাগুলো পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়েই সা্রা বিশ্ব জুড়ে একাধিক ব্লগার কীবোর্ড নিয়ে বসেছেন, সেই লেখাগুলো সঙ্কলিত করে দেওয়া হল পাঠকদের জন্য – তালিকাটি দেখা যাবে এই ব্লগপোস্টের শেষে।)

বরোদা থেকে ফিরে এলাম আজ, এই একটু আগে। যাবার আগেই খবরটা পেয়ে যাই যে রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর, অনন্ত পেরিয়ে এবার নীলাদ্রি… হয়তো অনেকের অনেক মতের সঙ্গেই আমার মত মেলে না। তা বলে সরিয়ে দেবার রাজনীতিকেই বা কি ভাবে মেনে নিই বলুন তো? কেন এই যে এইভাবে! এই একটা ব্লগ লিখে দায়িত্ব সেরে ফেলে আমরা আবার বরোদার গল্পে ফিরে যাব। হেসে কেঁদে খুন হব আবার দৈনন্দিন জাবর কাটতে কাটতে পারিজাতে বিভোর হব। আর খুন হতে থাকবে একে একে আমাদের পাশের দেশটা। আমাদের ভাষায় যারা কথা বলে- অন্যভাবে বলে, তারা। নিজের মতো করে আমি পাশের বাড়ির সমস্যা বলে সরিয়ে রাখতেই পারি। কিন্তু তাতে কি শীত লাগাটা একটু কমবে?

আসলে এই ধর্ম, নিধর্ম আর খুনিধর্ম ব্যাপারগুলো বেশ জটিল। মস্তিষ্কের গলিয়াড়িতে যখন ট্র্যাফিক জ্যাম হয়, তখন চিন্তা অচিন্তাগুলোকে সরিয়ে রাখতে হয়। আর যারা সেই সব অচিন্তা পয়দা করে তাদের? হ্যাঁ তাদেরকেও পৃথিবী থেকে সরিয়ে রাখতে হয়। হয়, হয় হয়! জানতি পার না।

তবে জটিল ব্যাপারগুলো একটু বরং ঘেঁটে দেখি। ওসব বরোদা টরোদা পরে লিখি। মার্চেন্ট অব ভেনিসে শেক্ষপীর একখান কথা রেখে গেছেনঃ I fear you speak upon the rack, Where men enforced do speak anything. (র্যা ক হল মধ্যযুগীয় অত্যাচারের একটি যন্ত্র।) আর এই কথাটার বিপরীত কথা হলঃ If he is not speaking in the night, get his wife to do the talking in morning.
কি মনে হচ্ছে পাঠক পাঠিকা? মধ্যযুগে পড়ে নেই আমরা না? আসলে আমাদের মাথার উপরের আকাশটা থেকে অন্ধকার পর্দাটা সরে গেলেও মনের দরজার পর্দাটা এখনো ময়লা। বহুদিনের অযত্নে কালো কালো ময়লার ছোপ জমে রয়েছে। পুতিগন্ধ ঢাকার জন্য আমরা অগুরুর সাহায্য নিই কিন্তু এখানে গুরু অগুরুই হয়তো ভুল পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

নাকি জটিলতাটা অন্যত্র? আসলে একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে কোথাও। আর ফাঁকটা ভরাট করাও যাচ্ছে না আর বেড়েই চলেছে। সংস্কৃতিগত ফাঁক, ব্যবহারিক ফাঁক, বোঝার ফাঁক। এ যেন দুটো আলাদা আলাদা ট্রেন লাইন সমান্তরাল যেতে যেতে সিদ্ধান্ত নিল ট্রেন দু নৌকায় পা দিয়ে চলবে না! তাই যে কোন একটাকে বেছে নিতে হবে।

আর তাই ৯/১১, ৭/৭, ২৬/১১, নাইজিরিয়া, ইরাক, সিরিয়া, বামিয়ান, মেসোপটেমিয়া, তালিবান আইসিস হয়েই চলেছে। বড়দা তো নিজের হিসেব মতো কাঁটা বেছে খাচ্ছেন ফেলে ছড়িয়ে। আর জান মাল নিয়ে সাধারণ মানুষ রোজ রোজ বলি হয়ে চলেছেন ট্রেনের সামনে পড়ে।

ব্লগার হত্যা এবং অন্যান্য ধর্মীয় গোঁড়ামিগত সমস্যাকে কি এর থেকে আলাদা করে দেখব? ধর্ম জীবনকে ধারণ করে রাখে। কিন্তু ধর্ম জীবনকে ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে পিষে মেরে ফেললে তো আধার বদলাবার সময় হয়েছে বলেই মনে হয়?

বাটি ঘটি গ্লাস কুঁজো কড়াই ডেকচি পুরনো হয়ে ফুটো হয়ে গেলেও কি পুরাতাত্ত্বিক মূল্যের জন্য স্মৃতি আগলে পড়ে থাকি নাকি তাকে প্রথমে সারাবার চেষ্টা করি আর সব কিছুর বাইরে চলে গেলে তাকে ফেলে দিয়ে নতুন আধার নিয়ে আসি? নতুন আধার কিন্তু পুরনোরই রূপরেখায় হয়। মাল মশলা খালি বদলে যায়।

দুঃখ হয় জানেন! রাগ হতাশা ক্ষোভ বিদ্বেষ ভেতরে গুমরে গুমরে ওঠে। আর কি বোর্ড বেয়ে নেমে আসে তরল ক্রিস্টাল পর্দায়। আর তারপর আবার আরশোলার জিন্দেগি নিয়ে পরমাণু বিস্ফোরণ পেরিয়েও ঘুরে বেরাতে থাকে পর্দার আনাচে কানাচে।

আর ভাল লাগছে না! কেন যেন মন হচ্ছে এই প্রতিবাদ প্রতিবাদ খেলাটা খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। ছাতা কিচ্ছু হচ্ছে না বলে প্রতিবাদ করতেই যেন ভুলে যাব। তার থেকে পরের পোস্টে মন দিই। বরোদায় কি হল টল। দেশের উন্নতি বাঙালির উন্নতি এই সব নিয়েই মেতে থাকি। ক্ষুদ্র জীবন, নরকের কীটের মতো ঘুরে ঘুরে মৃত গলা সমাজটা থেকে পাথেয় খুঁজে নিই আর একদিন টপ করে খসে যাই! কার যে তাতে আরাম হবে কে জানে! হ্যাহ!

পরের পর্বটা লিখব নিয়মিত ফিসফাসের মন নিয়ে। তার আগে বরং আমার থেকে বেশী ভাল করে আমাদের কষ্টটা প্রকাশ করতে পেরেছে যে সব সহ ব্লগার, তাদের লেখা পড়ুন। আমি একটু চোখে মুখে জল দিয়ে আসি!! ছ্যাঃ

ও হ্যাঁ গিয়েও ফিরে এলামঃ বরোদার অল ইণ্ডিয়া বেঙ্গলী অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সমিতির প্রশ্নোত্তর সেশন হচ্ছে। একটা প্রশ্ন এল, “বাঙালী কারা? যে সংখ্যালঘু মুসলমান বাংলা ভাষায় কথা বলে তাদেরকেও কি আমরা বাঙালী বলব?” সত্যি বলছি বিশ্বাস করুন! উত্তর দেবার ইচ্ছা ছিল না! কিন্তু সভ্য সমাজে বাস করি মধ্যবিত্ত মানসিকতা নিয়ে তো! তাই চশমাটা খুলে প্রশ্নকর্তার চোখে চোখ রেখে ঠাণ্ডা গলায় শুধুমাত্র একটা শব্দ “হ্যাঁ” বলা ছাড়া কিছু করতে পারি নি! মানব জনম আমার!!! বেঁচে থাক বাওয়া!

ব্লগগুলির লিঙ্কঃ
অভিষেক মুখার্জী- আইডিয়া
Kausik Datta – Plight of secular bloggers in Bangladesh
তন্ময় মুখার্জ্জী – ধর্ম, ব্লগ আর একঘেয়ে খুন-টুন
তপোব্রত ব্যানার্জ্জী – আহত কলম
প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় — ঊনচল্লিশের এক এবং অন্যান্য
রোহণ কুদ্দুস- আমার মহানবী
ইন্দ্রনীল বক্সী- অধর্ম

প্রয়োজনীয় পুনশ্চঃ দয়া করে লাইক মারবেন না! শেয়ার করতে পারেন যদি মনে করেন। তবে লাইক মারবেন না প্লিজ!

One thought on “(১৪০)

  1. পিংব্যাকঃ ঊনচল্লিশের এক এবং অন্যান্য – বাংলাদেশ প্রসঙ্গে | সাড়ে বত্রিশ ভাজা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s