(১৪১)


না দাদা, আর চিন্তা নেই গাড়ি লাইনে ফিরে এসেছে… বিবেকের তাড়নায় একটু ক্ষেতে নেমে বিবেকের পিছনে ছোটাছুটি করল বটে, কিন্তু তা নিষ্ফল বুঝেই লাইনের ট্রেন লাইনে ফিরে এসেছে। সরকারি চাকরি করি চারপাশে কি হচ্ছে দেখে আর জেনে কি করব বলুন? তার থেকে না হয় ঘোড়ার ঠুলি পরে থাকি।

তেতো ভাবটা যাচ্ছে না বুঝলেন… যাই জীবন তো চলতেই থাকে! বরোদার গল্পটায় ফিরে আসি!

সর্বভারতীয় বাঙালী অ্যাসোসিয়েশন- সমগ্র ভারতের প্রবাসী বাঙালী সংস্থাগুলিকে এক ছাতার নীচে নিয়ে আসা, তাদের মধ্যে সমন্বয় গঠন করা এর উদ্দেশ্য। এর ফলে, বিভিন্ন প্রদেশের বাঙালী অন্য প্রদেশে চিকিৎসা, শিক্ষা বা চাকুরী স্বার্থে গেলে যেন রেডিমেড সহায়তা পায় সেটার জন্যই এই সর্বভারতীয় সংস্থা AIBA বা আইবা গঠিত হয়েছে গত ৩রা এপ্রিল, ২০১৫। তা তার গঠনতন্ত্রকে পঞ্জীকৃত করার জন্য এবং ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি আরও অধিক সংখ্যক স্থানীয় সংস্থাকে আইবার ছাতার তলায় নিয়ে আসতে দিল্লি ও গুরগাঁও থেকে জনা চারেক প্রতিনিধি রওনা দেব বরোদা, ৯ তারিখের সম্মেলন উপলক্ষ্যে। তা সেই কারণে টিকিট এসেছে হাতে। ব্যস্ততায় আর খুলে দেখা হয় নি। নিজে কাটলে তো টিকিট এখন মোবাইলেই থাকে। অভ্যাস মানুষের দাস!

নির্দিষ্ট দিনের আগেই কথা হল যে মেট্রো টেট্রো করে পৌঁছে যাব অফিস থেকে। গাড়ি অফিসেই থাকবে। চারটে পঞ্চাশের ট্রেন। সেই মত তিনটে পঁয়ত্রিশে বেরলাম মেট্রো করে। মানব সমুদ্রে দুলতে দুলতে ভাসতে ভাসতে নিউ দিল্লি রেল স্টেশনে যখন পৌঁছলাম তখন স্টুডিওর ঘড়িতে বাজে চারটে পাঁচ। হেলতে দুলতে, ওভারব্রিজের উপর উঠে এগিয়ে গেলাম ট্রেন খুঁজে নেবার জন্য। মুম্বই রাজধানী ৯ নং প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে।

কিন্তু হঠাৎ যেন মনে হল এ তো সে নয়!! মানে শেষ পাতে ৯২-র জায়গায় ৯৪ দেখেছিলাম না? টিকিটে? সঙ্গে সঙ্গে হাতড়ে টিকিট বেরলো হিপ পকেট থেকে। যেটা থেকে শুধুমাত্র পিএনআর নং দেখেছিলাম মন দিয়ে সিট নং জানার জন্য। তারপর?

তারপর আর কি বড় বড় চোখ দিয়ে ড্যাবা ড্যাবা করে দেখলাম ট্রেন মুম্বই রাজধানী নয়, অগস্ট ক্রান্তি রাজধানী এক্সপ্রেস! এবং তা ছাড়বে নয়া দিল্লি নয়, তার থেকে দশ কিমি দূরের নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে। মূহুর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে- ঘড়ি চারটে দশে! আজমেরি গেট নয়, পাহাড়গঞ্জ দিয়েই নামলাম। হাত বাড়ানো ট্যাক্সিওলাগুলোকে পেরিয়ে অটোকে ধরলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, পৌনে পাঁচ তক নিজামুদ্দিন পৌঁছা দোগে?

দোশো রুপিয়া! তাই সই! সে বলল, স্যার কোশিশ তো জরুর করেঙ্গে। আমিও ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়ে ভাবলাম, তাই সই!

ওয়ান ওয়েতে রেড লাইট থাকা কালীন যাত্রা শুরু করলাম। “ভাইয়া পৌনে পাঁচকা ট্রেন নিজামুদ্দিন পৌঁছনা হ্যায়” আই কার্ড ফ্ল্যাশ করতে করতে হাত তুলে থাকা ট্রাফিককে বললাম। সে বরাভয় হয়ে এগিয়ে দিল। আহা শুরুয়াতই সুভানাল্লা!

কুট্টি দা কল করেন নি, দেবাশিস দা ফোনালেন, “কোথায়?” ঘটনাটা ঠাণ্ডা মাথায় বলে বললাম যে যদি সাড়ে চারটের মধ্যে ইণ্ডিয়া গেট ঢুকে যাই তাহলে পৌঁছে যাব। না হলে আর কি! বৌ বাচ্চার সঙ্গে দিনগুলো কাটাব! আপনারা মার্কেট সামলে নেবেন!

চারটে পঁচিশ! কনট প্লেসের ভুলভুলাইয়াতে অটোটা একবার ডানদিক একবার বাঁদিক করছে। আর আমার মাথার ভিতরে অঙ্কের খেলা চলছে। ড্রাইভারকে বললাম সামহালকে চলো! হড়বড় মাত করো। পৌঁছ যায়েঙ্গে। পার্শ্ববর্তিনীর ফোন এল, “পৌঁছে গেছ নাকি?” তাকেও বরাভয় দিলাম। হলে হবে না হলে কি আর হবে! চারটে তিরিশ ইন্ডিয়া গেট! দেবাশিস দাকে বললাম, দেখুন দু মিনিটের এদিক ওদিক হতে পারে। দরকারে অন্য কামরায় গিয়ে চেন টেনে দেবেন। নিজের কামরার বড় হ্যাপা। পুলিশ আসতে আসতে পৌঁছে যাব না হয়।

চারটে পঁয়ত্রিশ, নিজামুদ্দিনের শেষ রেড লাইট পেরিয়ে বাঁ দিকে নিজামুদ্দিন ইষ্টে ঢুকলাম। আঃ শান্তি। ভাড়া মিটিয়ে লাফ দিয়ে ফ্লাইওভারে চড়ে দেখি চারটে তেত্রিশ। ধুস! সিকিউরিটিকে বললাম ভাই রাজধানী! সে বলল, “অগস্টক্রান্তি?” মাথা নাড়লাম! লাইন ছেড়ে দিল। নেমে গিয়ে ট্রেনে উঠতে দেখলাম সবাই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। গুরগাঁও থেকে শ্যামলদাও জ্যামে আটকে গেছিলেন আমার একটু আগেই পৌঁছে গেছেন আর কি। সব মিলিয়ে একদম জ্যামজমাট।

সাতজন যাচ্ছি, একসঙ্গে সিট নেই? আরে কুট্টি দা আছেন তো! ম্যানেজ করা হল। মথুরা থেকে দুজন উঠবেন তাদেরকেও অন্য দিকে ঠেলে দিতে হবে। সেটাও ম্যানেজ হল। তারপর আর কি ঘন্টা চারেকের প্রাণখুলে আড্ডা দিয়ে ঘুমোতে গেলাম যথা সময়ে। যথা সময়ে ট্রেন থামল ভাদোদরা স্টেশনে। ঘড়িতে তখন রাত চারটে কুড়ি। দিল্লির প্রদীপ গাঙ্গুলী ব্যাঙ্কের উচ্চপদে আছেন আর বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে চর্চিত চর্চন করেন। তিনি গত এক বছর যাবত বরোদায়। আর আছেন আইবার ভাইস চেয়ারম্যান অশোক গুপ্ত। সাড়ে চারটের সময় তাঁরা আপ্যায়ন করলেন আমাদের। ভারত সেবাশ্রমের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিসরে ঠাঁই হল।

ঘুমবো কি? আড্ডা তো থামতেই চায় না। সাড়ে সাতটায় চা চলে এল। আর সাড়ে নটায় জলখাবার! আর তার সঙ্গে চলতে থাকল আলোচনাও। বরোদার প্রতিনিধিরা যোগ দিলেন। সব আলোচনা টনা করে উঠে স্নান করতে যাব! এলেন নেতাজী! মাতৃভাষা প্রচার সমিতির পক্ষ থেকে। তারপর আর কি ৭৫ বছরের অভিজ্ঞ ব্যক্তি সবেতেই ফ্যাকড়া তোলেন। এটা কেন নয় এটা কেন? আবার প্রশ্ন করে বসলেন আপনারা কতটা ভারতবর্ষ দেখেছেন একটু জানতে চাইব! খেলে যা! বড় বড় শেরই কুপোকাত হবে তো আমি চুনোপুঁটি ১৬ বছর সরকারি চাকরি করছি তো কদ্দুর যাব? তাও বেশ গুছিয়ে দিলাম। তারপরে একে একে প্রশ্ন তুলতে শুরু করলেন তাঁকে থামান হল এই বলে যে কাল আলোচনা করব আমরা একটু ঘুরে আসি না হয়?

তা পর দিন আলোচনার আগে তো আলো দিতে হবে। প্রতিটি স্থানীয় সংস্থা কি করছে না করছে তার ফিরিস্তি। তা দিতে উঠেই তিনি আবার টেনে দিলেন, দিল্লি চলোর মতো আঙুল তুলে তুলে দাবী রাখলেন, বিবাহ সম্বন্ধ করা, বৃদ্ধাশ্রম খোলা, বাঙালীর পরিচয় নির্ধারণ করা এবং শেষ মেষ বরোদা থেকে কোলকাতা দুরন্ত ট্রেন চালু করা। বলতে উঠলাম, আইবা যে শুধুমাত্র সমন্বয় সাধন ক্ষেত্র এবং জাদুর পুঁটলি নয়, সেটুকু বলেই কায়দা করে চলে যেতে চাইলাম অন্য বক্তাদের কাছে।

ও বাবা মাইকই ছাড়েন না। পিছনের লোক জন চুল ছিঁড়ছে! শেষে একজন উঠে এসে ওনার সামনে বেশ হাত পা নাড়িয়ে বলেই দিলেন, আর একটাও প্রশ্ন নয়! ততক্ষণে রাষ্ট্রীয় চেয়ারম্যান নিজের বক্তব্য রাখতে উঠে গেছেন। আর আমিও মানে মানে সরে এলাম। বিরসবদনে উনি যাবার সময় বলে গেলেন, “আমি একটু আগুন দিয়ে সব ডিটেলসটা জেনে নিলাম। ভাল লাগল বেশ”। কি আর করি! প্রতি ভাল্লাগা জানিয়ে কালকের মতো ক্ষ্যামা দিলাম।

অবশ্য আলোচনার মাধ্যমে আইবার প্রথম শিকড় পশ্চিমাঞ্চলে গাড়া হল। ৩রা এপ্রিল যে চারা গাছটা ১৭টি রাজ্যের ৬৭টি জন প্রতিনিধির সামনে দিল্লিতে পোঁতা হয়েছিল তা ধীরে ধীরে নিজের পা শক্ত করছে! এই শ্লাঘা নিয়েই আজ সকালে ফিরে এলাম।

আর কিছুদিন পরে হয়তো অন্য কোথাও, আহমেদাবাদ থেকে ডাক এসেছে! ন্যাশনাল কনভেনশন চেন্নাইতে জানুয়ারি! বইমেলার চক্করে হয় তো যেতে পারব না। কিন্তু ভারতের কোণে কোণে অন্ততঃ কেউ পরিচিত হয়ে যাবে আর দেশটাও হাতের মুঠোয় চলে আসছে ভাবতেই ভাল লাগল। এক কোটি প্রবাসী বাঙালী বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে শুধুমাত্র কোলকাতার মুখাপেক্ষী থাকবে না! কি দারুণ ব্যাপার হবে বলুন তো? সাফল্য কামনাতেই শুধু হয় না। এগিয়েও আসতে হবে! দায় বা দায়িত্ব আমাদেরই তো! বলুন?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s