(১৪২)

বহুদিন ধরে দেখা সাক্ষাত না হলে Out of sight (নাকি site?) out of mind হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। তাই সেরকম প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো কিছু না ঘটলেও পাঠকও/ পাঠিকাদের কাছে জাস্ট মুখ দেখাবার জন্য এসে হাজির হলাম।

দুটি গল্প, দুটিই ধার করা। আমার এক ভাই কাম বন্ধু জয়পুর থেকে এসেছিল বাড়িতে তো তারই মুখে শোনা তাদের পরিবারের গল্পঃ

এক

সেই সময় শহরতলি অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। তা দুই পিঠোপিঠি ভাই একান্নবর্তী পরিবারে, তাই নিয়ে গবেষণা করছে। দুই ভাইয়ের মধ্যে শর্ত রাখা হচ্ছেঃ

  • তুই এটা খেয়ে দেখাতে পারবি?
  • হ্যাঁ হ্যাঁ! এ আবার এমন কি!
  • কুইনাইন বলে না কি হেব্বি ইয়ে!
  • সে না খেলে বুঝব কি করে হেব্বি ইয়ে?
  • দেখ কিন্তু! পরে কিন্তু আমায় কিছু বলবি না!
  • ধুর ধুর! চল চল!

তারপর সেই ভাই বলছেন, “বড়দার ঘরের টেবিলটার উপর কুইনাইন মিক্সচারটা রাখা ছিল তা চুপি চুপি ঢুকে কর্ক খুলে এক চুমুক মেরে দিয়েছি! তারপর আর কিছু মনে নেই! বেশ কিছুক্ষণ পর সব কিছু কালো কালো ধূসর ধূসরের মধ্যে হঠাৎ মায়ের মতো দেখতে একটা ছায়া বলে উঠল,

  • আরে জ্ঞান ফিরেছে বলে মনে হচ্ছে! ও খোকন! শুনতে পাচ্ছিস!

পিছন থেকে আওয়াজ শুনলাম,

  • আরে এও তো দেখছি নড়াচড়া করছে! তাহলে আর চিন্তা নেই।

আরে যে অ্যাডভেঞ্চারে দুজনে মিলে ঝাঁপিয়েছিল তাতে একজন লটকে পড়েছে দেখে আরেকজনের উপর কি অত্যাচার নেমে আসতে পারে সেই ভেবে সেও কুইনাইন থেকে এক ঢোঁক মেরে পাশাপাশি জ্ঞান হারিয়ে পড়েছিল। এক যাত্রায় পৃথক ফল কেন হবে? সহোদর ভাই বলে কথা! বাওয়া!”

দুই

এটা ছোট বোনের কথা! আগেকার দিনের ছোট বোন বা ভাইয়েরা বেশ অনেকটাই ছোট হত। প্রায় একখানা জেনারেশন গ্যাপ বলা যেতে পারে! দাদা বা দিদি বলতে তারা অজ্ঞান। বাবা বা মায়ের থেকেও বেশী মান্যি! তা দাদা দিদিরাও কি সে সুযোগ নিত না?

ছোট্ট ১০ বছরের বোনটাকে বিয়েবাড়িতে শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়ে গেছে মেজদা, “শোন রাজভোগ বলে একটা জিনিস খেতে দেবে। সেটার খোসাটা খাবি না! ওটা আমায় দিয়ে দিস! আসল জিনিসটা হল ভিতরে!”  তা সেই নাড়ুর মতো ক্ষীরের এলাচ গন্ধ ওলা ভিতরটা খেয়ে আর কতটাই বা মন ভরে! মেজদা ভাল মানুষের মতো কি সুন্দরভাবে খোসা ছাড়িয়ে খোসা খেয়ে বোনটাকে নাড়ু খেতে দিচ্ছে। তা বোনটি পরিবেশনকারীকে বললে, “কাকু আমাকে আরও দুটো রাজভোগ দেবে?” কাকু অবাক! বাচ্চা মেয়েটা ইতিমধ্যেই চারটে রাজভোগ নিয়েছে! দয়াপরবশ হয়ে বললেন, “মা তুমি ছ ছটা রাজভোগ খাবে? পেট কামড়াবে না?” “না কাকু, আমি তো রাজভোগটুকু খাচ্ছি আমার মেজদা খোসাগুলো খেয়ে নিয়েছে, ওগুলোতে পেট কামড়াত। আমাকে আরও দুটো দিতে বলেছে তাই বললাম!” মেজদা তখন প্যান্ডেলের ছাতের সাদা রঙের মধ্যে হলুদের দাগ লেগে আছে কি না তাই দেখতে ব্যস্ত!

এ তো গেল পরের মুখের ঝাল!

এবার আমার ছোট্ট বুঁচকিটার গল্প! পৌনে দু বছরে সে এখন তার দাদার দেখা দেখি দু পা ফাঁক করে লাফ দিয়ে “কাজাক” নাচ আর “ড্রপকিক” মারতে শিখছে। আর আগেরদিন রেস্তোরাঁতে গিয়ে মিসসি রোটি আর রায়তা খেয়ে টেয়ে বলেছে, “এবারে নামবে”! তারপর “বাবাও নামবে” তা তারপর দাঁড়িয়ে থাকা সকল ওয়েটার এবং অন্যান্য রেস্তোরাঁ কর্মীদের কাছে গিয়ে সকলকে বলল, “অ্যাও” তারপর বলল, “ভাও”! তারপর “এএএই ক্কাজাক” করে বার দুই নেচে তাদের মনোরঞ্জন করল। তারপর আমার দিকে ঘুরে বলল, “পটি”। আমরা আর কি করি বাবা আর মা দুজনে মিলে খেয়ে দেয়ে বিল চুকিয়ে তাদের বাথরুমের বেশ ভালো রকম ব্যবহার করে ফিরে এলাম।

বস্তুত আজকের দিনে একে অপরের সঙ্গে কথা বলে গল্প করে সময় কাটাচ্ছে এটা দেখাই যায় না! পার্টিতে গেলেই দেখি বাচ্চাদের একটা ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়! সেখানে সবাই বসে হয় সিনেমা বা কার্টুন দেখছে! অথবা বাবা মা বা নিজের মোবাইলে মাথা গুঁজে বসে আছে! নিজেদের মধ্যে বাতচিত বিলকুল বন্ধ!

মেয়েটাকে নিয়ে সেদিন পার্কে গেলাম সে নিজে যেচে গেল বাকি বাচ্চাগুলোর সঙ্গে আলাপ করতে। তারা বিশেষ দাঁত ফোটাতে দিল না। তারপর নিজের নিজের মধ্যে মশগুল রইল। মা বা অন্যান্যয যারা ছিলেন তারাও বিশেষ উদ্যোগ দেখাল না। এটা হয়তো দিল্লির একটা বিশেষ চরিত্র হবে। পার্কে গিয়ে খেলতে খুব কমই দেখি বাচ্চাকাচ্চাগুলোকে।

মুম্বই গেছিলাম কদিন আগে আন্ধেরিতে আমার বাল্যবন্ধু থাকে সে বলল আর দেখালও যে রাতের বেলা ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে ওরা ফুটবল খেলে বিল্ডিংগুলোর মাঝের খেলার জায়গায়। যেখানে সেখানে ক্রিকেট টুর্ণামেন্ট হয়ে যায়। আর আমাদের এখানে? যেখানে আমার ছেলে তাইকোয়ন্ডো অনুশীলন করত সেখানেও ঠিক সময়ে জল ঢেলে ভিজিয়ে ঘাস বোনার বাহানা হাজির হয়ে যায়! সমতল ঘাসের জায়গা থাকলেই অ্যামিউজমেন্ট পার্কের মতো উঁচু নিচু করে দাও যাতে খেলতে না পারে। কি জানি এতে কার লাভ হচ্ছে!

মেয়েটাকে নিয়ে যখন গল্প শুরু করেছিলাম তখন শেষও করি তার গল্প দিয়েই! তার দাদু দীর্ঘদিন হাসপাতাল যাপনের পর বাড়ি ফিরে এসেছেন। তাতে তার আনন্দের সীমা পরিসীমা নেই! কিন্তু কাল যখন ফিজিও থেরাপিস্ট এসে দাদুকে ব্যায়াম করাচ্ছে তখন তার খুব চিন্তা হয়ে গেল। হাঁউ মাউ করে খাটের উপর উঠে চেঁচাতে লাগল, “ভুঁড়ি বন্দ কর দাদু! ভুঁড়ি বন্দ কর!” ন্যালাখ্যাপা থাকার দিনকাল গেছে। এখন থেকেই এই বাচ্চাগুলো ইমেজ কনসাস! কি যে হবে! ভগাই জানেন!

4 thoughts on “(১৪২)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s