(১৪৩)

বিশ্বের প্রথম ছাপাখানা থেকে বেরনো বই ছিল বাইবেল। জোহানেস গুটেনবার্গ ১৪৫৫তে পরিবর্তনশীল টাইপ দিয়ে এই ছাপাখানায় অনেক কম খরচে অধিক সংখ্যক বই ছাপার কাজ করেন। এর আগে কাঠ বা ধাতুর ব্লক দিয়ে ছাপার কাজ প্রায় তৃতীয় শতাব্দীতেই চীনে শুরু হয়ে গিয়েছিল। কাঠের ব্লকে কালি লাগিয়ে সিল্কের উপর ছাপার কাজ। অবশ্য ১০ হাজার অক্ষর নিয়ে যাদের কাজ তারা যদি ছাপাছাপিতে না যায় তাহলে উপলক্ষ্য (অক্ষর) লক্ষ্যকে (লেখনী) ছাপিয়ে যেতেই পারে।

তবে কলম দিয়ে লেখা অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছিল। সেই আদ্যিকালের গুহাচিত্রগুলোতে বিভিন্ন পাথর থেকে কুঁদে রঙ বার করে তা দিয়ে আলতামিরার ছবি… সে তো মানব ইতিহাসের গোড়ার কথা।

কিন্তু কথা হল, গজগজ করে লেখা আর শৈল্পিক লেখার মধ্যে পার্থক্য আছে তো না কি? হিসেবের ফর্দ আর রবি ঠাকুরের পদ্য কি একইভাবে একই কলমে একই কাগজে লেখা যায়? অবিশ্বাসীরা বলবেন, লেচ্চয় যায়। কিন্তু যুগ যুগ ধরে যে মানুষ শিল্পের পূজারী- আকাশের পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, ঘাসের উপর ফড়িং-এর দোলা, কুলুকুলু নদীর বয়ে যাওয়া, শিশিরবিন্দুর পাতা ছুঁয়ে পড়ে যাওয়া, পাখির ডাকে ঘুম ভাঙা, পালকের স্পর্শে শিহরণ জাগা নিয়ে যাদের রাতদিনের কারবার। তারা কি আর ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে এ থেকে জেড, অ থেকে চন্দ্রবিন্দু, আলিফ থেকে হামজা ছিরিছাঁদহীন লিখে শান্তি পাবে?

কাজটা যতদূর সম্ভব চিনেরাই শুরু করেছিল। তাদের এক একটা অক্ষর এক একটা চরিত্র এক একটা ভাব প্রকাশের অপেক্ষায়। সূক্ষ্ম তুলি বা কলমের টানে তা রূপ নেয়। পরবর্তীতে ইউরোপীয়রা তার মধ্যে গাম্ভীর্য আনে, আরবরা আনে দিশা। কিন্তু ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস পূর্ব এশিয়া থেকেই শুরু হয়।

cal

art5

আরবিক

craigynosrough

ইউরোপীয়

ক্যালিগ্রাফির ক্ষেত্রে চৈনিকদের চা এবং চালের মতই পথিকৃৎ বলা যায়। মনে পড়ে যায় চৈনিক সুপারস্টার জেট লির ছবি হিরোতে বীণার মূর্ছনায় টনি চিউয়ের বালির উপর ক্যালিগ্রাফি আহা নটরাজ যেন রুদ্রবীণার তালে তালে নৃত্যে মেতেছেন।

hero

চৈনিক ক্যালিগ্রাফি নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনার স্থান ফিসফাস নয় হয় তো। কিন্তু এই গৌরচন্দ্রিকার দরকার কেন পড়ল তাই বলি। কাল থেকে ছেলেকে নিয়ে প্রথম লাজপত নগরের কোরিয়ান কালচারাল সেন্টারে তায়কোওন্ডোর ক্লাসে নিয়ে গেলাম। গাজিয়াবাদ থেকে লাজপত নগর একবার টুকটুক করে দুবার মেট্রো বদলে প্রায় ১ ঘন্টার রাস্তা সে একা যাতায়াত করবে বলে প্রথমদিন দেখিয়ে দেওয়া। তা সেখানে দেখি ভারতীয় ও কোরিয় ক্যালিগ্রাফির উপর শো হচ্ছে। আর একগাদা কোরিয় ক্যালিগ্রাফি শিল্পী আর বেশকিছু ভারতীয় চিত্রশিল্পী এসেছেন।

তিন ঘন্টা সময় কাটাবার জন্য প্রথমে একটি পপুলার পত্রিকা আর তারপর ক্যুরিয়ারে আসা সোমার বই নিয়ে বসলাম। শেষে কোরিয়ান কালচারাল সেন্টারের কফি সেন্টারে বসেও যখন সময় কাটল না তখন নীচে নামতে গিয়েই প্রায় হোঁচট খাই খাই আর কি। একটা কালো মত পার্চমেন্টের কাগজ বিছানো আছে আর তার উপর প্রায় পা পড়ে গিয়েইছিল, আর খান তিনেক ভারতীয় আর দুয়েক কোরিয়ান (আসলে মঙ্গোলয়েড, কিন্তু কোরিয়ান সেন্টারে চৈনিক বা জাপানী মেয়ে আসবে বলে কল্পনা করছি না। এ বিষয়ে ওরা বেশ ভালমাপের রাজনীতিগত সাম্প্রদায়িক) মেয়ে হাঁ হাঁ করে ছুটে এল। আমি ক্ষমাটমা চেয়ে চোখ তুলে দেখলাম তার ধারে একটা কালো মতো কিছু রাখা আছে। পাশে বাহান্ন ইঞ্চির বিশাল পর্দায় ক্যালিগ্রাফি নিয়ে জ্ঞান বিতরণ চলছে আর এক বুড়ো কোরিয়ান তাতে পোড়া গাছের ডালে কাপড় জড়িয়ে নেচে কুঁদে মাটিতে রাখা কাগজে স্মাইলি এঁকে যাচ্ছে। বেশ ইন্টারেস্টিং!

গেলাম প্রদর্শনীর হলে। সেখানে সকলে ক্যালিগ্রাফি নিয়ে নিজের মতামত আর নিজের ওয়র্ক সম্পর্কে পরিচিতি দিচ্ছে। বিবরণ পড়লাম। ভারতীয় ক্যালিগ্রাফি অনেকবেশী ফর্ম আর ডিজাইনের উপর নির্ভর করে। তার মধ্যে পি পি রাজুর কৃষ্ণার্জুনের রথ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্যালিগ্রাফিতে অনুপ্রাণিত কমর ডাগরের আর্ট ওয়র্ক দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

20150914_184844

কৃষ্ণার্জুনের রথ

20150914_184830 20150914_184858

কোরিয়ান ক্যালিগ্রাফি চীন থেকে প্রায় তৃতীয় শতাব্দীতে সে দেশে এসে শুরু হয়েছিল। এখন তা অনেক বেশী গোলাকৃতি এবং অক্ষরের বিন্যাসের উপর নির্ভরশীল। তারই মধ্যে বেশ কয়েকটা মন জিতে নিল তার মধ্যে ফুলছাপের উপর সূক্ষ্ম লি হিউং জা-এর ক্যালিগ্রাফিটি অনবদ্য।

korea

কোরীয় ক্যালিগ্রাফি

কিন্তু সব কাজের শেষে শুরু হল লাইভ ডেমো। সেখানেই কেলো হয়ে গেল। কোরীয়রা ভারতকে এবং ভারত তাদের কত ভালবাসে তা দেখাতে গিয়ে “আই লাভ ইণ্ডিয়া” হিন্দিতে “কোরিয়া” টাইপের বালখিল্যতা শুরু হয়ে গেল। এক শিল্পী তো ক্যালিগ্রাফির ধারে কাছে না গিয়ে তুলি দিয়ে এক নারীর মুখ এঁকে নিজের নাম লিখে বাহবা কুড়োতে আরম্ভ করলেন। আর একজন কচ্ছপের ছবি এঁকে নিজের স্ট্যাম্প লাগিয়ে মাস্টারপিস বানিয়ে দিলেন। যে কোন শিল্পই সময় নিয়ে সৃষ্ট হয়। এ তো আর ম ফি হুসেন নয় যে তুলির চার টানে ঘোড়া এঁকে কোটি টাকায় বিক্রি করে দিলাম। বিষয়টা আরও জটিল আর গভীর। হুসেনের চার টানের মধ্যেও শিল্পের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যও প্রবল।

20150914_190227 20150914_184328

এসবের মধ্যেই চিকেন বল আর কোরিয়ান রাইস ওয়াইন এসে হাজির হল। একটু আধটু হাত লাগালাম বটে! তারপর যেই ডিনারের আমন্ত্রণ এল তখন দেখি ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে শুরু করেছে। আর ছেলেও ততক্ষণে হাজির। তাই কোরিয় ডিনারে মুখ না ডুবিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলাম।

তবে সংস্কৃতির আদানপ্রদান কিন্তু যে কোন স্ট্যান্ড অ্যালোন সংস্কৃতিকে বিস্তৃত করে। খুব ভাল লাগল যে পাশ্চাত্যই নয় শুধু, প্রাচ্যের প্রতিও ভারতের আগ্রহ একইরকমভাবে বর্তমান। ছেলের সূত্রে সম্পর্কটা পাকা হবে বলেই ইঙ্গিত হচ্ছে। সে তো আবার ভাষাবিদ হবার চেষ্টায় কোরিয়ানে নিজের নাম লিখতেও পারদর্শী আর বারবার বলছে “বাবা ওখানে লাইব্রেরীটায় যাব!” দেখা যাক রাস্তা কোন পথে নিয়ে যায়।

ও হ্যাঁ! আসার সময় দেখলাম জাপানী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটাও কাছেই! এক রামে রক্ষা নেই সঙ্গে সুগ্রীব দোসর!

dream

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s