(১৪৬)

অ্যাথেনিয়াম ইনস্টিটিউশনের বৈকুণ্ঠনাথ মল্লিক যদি লিখতেন তাহলে অনেকটা এরকম হতঃ

আকাশের পানে চেয়ে ডাক শুনি কাহার

একা একা দাঁড়িয়ে শিলঙের পাহাড়

মেঘেদের বাড়িতে রাজধানী তাহার

চোখে ধোঁয়া মুখে ধোঁয়া শিলঙের পাহাড়।।

ভেবে দেখুন, অমিত লাবণ্যের শিলং, রবি ঠাকুরের শিলং, বাঙালীর চূড়ান্ত রোমান্টিক ডেসটিনেশন শিলং-এ যাবার হুকুম হল, অথচ। দুদণ্ড শান্তিতে বসে শায়েরি করব তার জো নেই!

গান্ধী জয়ন্তীর উইকেণ্ডের আগেই জানতে পারলাম যে শিলং যেতে হবে। ৯ তারিখ একটা মেগা ইভেন্ট হবে, আর আমাকে গিয়ে ঝাড়ু দিয়ে আসতে হবে। মানে খানিকটা তাইই আর কি!

শিলং শব্দ এসেছে খাসিদের দেবতা ‘কোট শিলং’ থেকে যে নাকি কুমারী মায়ের গর্ভে জন্ম নিয়েছিল এবং স্টিল বর্ণ ছিল। তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলে মা! অনেক বছর পর বাইরে আলো দেখে জানতে পারেন যে দিব্যবর্ণ হয়ে ছেলে ফিরে এসেছে। মানুষের দুঃসময়ে রক্ষা করার জন্য। তার নাম হল ইউ শিলং। সেই থেকে শিলং পাহাড়। কথিত আছে সেই আত্মা নাকি এখনও শিলং পাহাড়ের চুড়ায় বসবাস করেন।

তা এই জম্বুদ্বীপের রাজধানী থেকে মেঘেদের রাজধানীতে যাবার ঝক্কি অনেক। শেষে অনেক মাথা খাটিয়ে বার করলাম যে যাবার সময় গৌহাটি ছুঁয়ে গেলে আর আসার সময় কোলকাতা হয়ে এলে কাজও সম্পূর্ণ হবে আবার লাঠিও ভাঙবে না।

তাই সেই মত যাত্রা শুরু করলাম। গৌহাটি পৌঁছোবার কথা ছিল দুপুর একটায়। সেই মত সন্ধ্যায় ৫টার মধ্যে শিলং পৌঁছে গেলে মিটিং টিটিং-এর কাজগুলো শুরু করে দেওয়া যায় বটে। কিন্তু যেই এয়ার ইণ্ডিয়া পৌঁছতে আধ ঘন্টা দেরী করল, ব্যাস সব হিসেব গেল উল্টোপাল্টা হয়ে। পাশাপাশি দুটো কনভেয়ার বেল্টে জমা করা বড় ব্যাগগুলো আসতে শুরু করল। হদিস রাখতে না পেরে অপেক্ষায় অপেক্ষায় বেলা কাটল। শেষ আড়াইটে বেজে যেতে সুরক্ষা বেষ্টনীর বাধা ডিঙিয়ে এয়ার ইণ্ডিয়ার অফিসে গিয়ে তত্ত্ব তালাস করতে তবে ব্যাগ পাওয়া গেল।

আসলে যে ফ্লাইটে এলাম তা আমাদের নামিয়ে দিয়ে ইম্ফল অবধি যেত। আর যে কোন কারণেই হোক না কেন তখনো পর্যন্ত সেই ফ্লাইট টেকঅফ করে নি এবং যথারীতি আমার ব্যাগটি ফ্লাইটেই থেকে গেছিল বড় বড় করে ‘গৌ’ লেখা থাকার পরেও। যাই হোক পৌনে তিনটেয় বেরিয়ে সরাসরি যাত্রা শুরু করলাম। আমার সঙ্গে রয়েছেন, ডঃ সুমিত কুমার সিআরসি গৌহাটির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর।

তিনি নিয়ে গেলেন পথ মাঝে এক রিসর্টে মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য! পেটে তখন ছুঁচো নেতিয়ে পড়েছে।  সেখানে গিয়ে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন ভ্যাজ না ননভ্যাজ। এঃ এ বার জিজ্ঞাসা করার মত প্রশ্ন নাকি? তারপর মাছ না চিকেন? আমি বললাম মাছ খাই! তা তিনি বেশ ক বছর কোলকাতা কাটিয়ে গত ৯ বছর ধরে গৌহাটিতে। তাই একটা করে মাছের নাম বলছে ওয়েটার আর ডঃ সুমিত আমায় তার বিশেষত্ব বোঝাচ্ছেন। আমি চোখ বড় বড় করে জ্ঞান আহরণ করছি। শেষে বলল ইলিশ। তা আমায় ডঃ সুমিত বোঝাতে বসলেন। ‘ইলিশ মে বহুত কাঁটা হোতা হ্যায় স্যার!’ আমি আর থাকতে না পেরে বিশুদ্ধ বাংলায় বলে উঠলাম, “মামা, হাইকোর্ট দেখানো থামা!” তারপর আর কি? সর্ষে ইলিশ দিয়ে দুপুরের পেটপুজো সেরে চললাম শিলং-এর পথে।

সন্ধ্যে নামছে আকাশে আর আশেপাশের দৃশ্যরাও পট পরিবর্তন করছে। গৌহাটি এমনিতে সুন্দর শহর বটে কিন্তু হাইওয়ে নং ৩৭ ধরে মেঘালয়ের পথে এগোতে এগোতেই  রাস্তা জেন্ডার সোয়াপ করে ফেলল। মেঘালয় এমনটি মাতৃপ্রধান সমাজ। মহিলারা পরিবারের মুখিয়া, কিন্তু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেখবেন পুরুষ। সেই যে সেই এক পুরুষ বলেছিলেন না, “আমার বাড়ির সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যেমন অ্যামেরিকা ইরাক আক্রমণ করবে কি না, মোদী রাষ্ট্রসংঘে কি বলবেন বা কি পরে যাবেন, বেতন কমিশনের কি করা উচিত, এই সব সিদ্ধান্ত আমি নিই। আর ছোট খাট ব্যাপার যেমন, আজ কি রান্না হবে, বা ছেলেমেয়ের জন্য কি কেনা হবে বা বাজার কবে করতে যাবে তাঁবে এই সব ফালতু সিদ্ধান্ত আমার স্ত্রী নেন!” সে যাই হোক। অন্য রাজ্যের বিষয়ে বড় বড় বাত মারার আমি কে হে?

সে যাই হোক, বিশেষ পোশাক পরিহিতা খাসি মহিলারা সন্ধ্যার আলোতেও কাজ থেকে ফিরছেন বা দোকানের পসরা সাজিয়ে বসেছেন দেখতেও বড় ভাল লাগল। খাসীদের আবার প্রতিটি নামের লিঙ্গভেদ আছে। ‘ইউ’ পুং আর ‘কা’ স্ত্রীলিঙ্গ। তাই ‘কা স্টেট ব্যাঙ্ক’, ‘কা স্টোর’ এসব দেখে দেখে মনে হল পুরুষ নয় মহিলাদেরই জয়জয়কার সেখানে। পৌঁছতে পৌঁছতে বেজে গেল ৭টা।

উত্তরপূর্বাঞ্চলে আগে অন্ধকার নেমে যায় বলে সন্ধ্যা ৫টার পরেই সকলে পাততাড়ি গুটিয়ে পগার পার। আর সান্ধ্য আড্ডা বলতে গরম চা নয়, গরম পানীয়! তা আমি সে রসে বঞ্চিত। তাই ডঃ সুমিতকে নিয়ে স্থির করলাম কাছে পিঠের বাজারে হানা দেব। পুলিশ বাজার! গিয়ে দেখি আরে! এখানে তো বাঙালীরাই ভিড় করে আছে। নিজেদের মধ্যে বাংলায় দরদাম করছে আর অহমীয়ার দোকানদারের সঙ্গে। বেশ মজা তো! ট্রাইবাল জিনিস ছেড়ে আধুনিক পণ্যের সম্ভারই বেশী! অথচ শুনেছি উত্তর পূর্বে উপজাতি সমাজে যাতে বেনোজল ঢুকে না পড়ে তাই গাঁওবুড়োরা বিকাশকে দরজার বাইরেই আটকে রেখেছে।

যদিও একটা অবাক করা ব্যাপার দেখলাম। পশু পাখী বা ফল সবজী যাই হোক না কেন। এরা কচি কিছু খায় না। পূর্ণ বিকশিত না হলে নাকি তাকে উদরের প্রতিও উতসর্গ করা উচিত নয়। আর বিফ খাই খাই করে যারা রাতদিন নেত্য করে গদি ছিঁড়ছেন তাদের তো স্বর্গরাজ্য। মোটা চর্বিওলা মাংসগুলো মোড় ঘুরলেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। আমিও ভেবেছিলাম মারব দাঁও কিন্তু সঙ্গে বিহারী বাবু থাকায় সেই পথে গেলাম না।

রাত্রাবাস দেখে অবশ্য বেশ নিরাশই হলাম। তাই সেটা নিয়ে অধিক টানাটানির দরকার নেই। ভ্রমণবিলাসীদের স্বর্ণ মরসুমে সামান্য যে থাকার জায়গা পাওয়া গেছে এই ঢের। একটা রাতেরই তো ব্যাপার! যা হোক পাখা চালিয়ে কম্বল টেনে চালিয়ে দেব।

পরের দিন ভোর অবশ্য অন্য আমেজ নিয়ে এল। এমনিতেই পূর্ব উত্তরে দ্রুত সকাল হয়। পাঁচটায় সোনালি রোদ মাটিতে পড়ার আগেই গা ছুঁয়ে চলে গেল। আমিও উঠে পড়লাম। গুছিয়ে টুছিয়ে নিয়ে সুমিতকে বললাম দেখ ভায়া আমাদের কাজকারবার শুরু হবে নটা থেকে। চল ভাই ঘুরে আসি শিলং পাহাড়ের পথে! নিবারণ চক্কোত্তির সেই অমোঘ লাইন কটা আওরাতে আওরাতে স্নান করলাম নবরবিকিরণে।

IMG_0875 IMG_0865

এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আর শিলং-এর বিখ্যাত ট্রাফিক জামও শুরু হয়ে গেছে। আসলে খাসি বা গারোরা শহুরে সংস্কৃতির আঁচে পরনের বস্ত্রের থেকে গাড়ির সংস্থান করতেই উঠে পড়ে লেগে গেছে বোধহয়। তাই ঘন্টার পর ঘন্টা ওয়ান ওয়ের পথে একক লেনে আটকে থাকা। আমাদের ইনোভাও সেই সব ডিঙিয়ে বেথানি সোসাইটির মাঠে এসে উপস্থিত হল। ডঃ কার্মো নোরনহো বেশ কিছু বছর ধরে উপজাতি এবং গ্রামাঞ্চলের উন্নয়নের কাজ করে চলেছেন। দৃষ্টিহীন এবং মানসিকভাবে প্রতিবন্ধীদের স্কুল তার মধ্যে একটি। বেথানীরই মাঠে ৯ তারিখ উৎসব হবে। আর তারই তদারকি করতে আমার আসা।

IMG_0871

সেখান থেকে গেলাম মেঘালয়ের মুখ্য সচিব সর্ব শিক্ষা অভিযান, শ্রী ইঙ্গটির সঙ্গে দেখা করতে। অমায়িক ভদ্রলোক সুন্দর ব্যবহার ও আন্তরিকতায় মন জয় করে নিলেন। অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে গেল দেখ না দেখ। আমার অভিযানের শেষ গন্তব্য হিসাবে এর পর গেলাম শহর থেকে ৮ কিমি বাইরে মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল পূর্ব উত্তর ইন্দিরা গান্ধী আঞ্চলিক স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণা কেন্দ্রে। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে একটি আধুনিক সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। যেখানে আধুনিক কখলার ইমপ্ল্যান্ট বা কৃত্রিম শ্রবণযন্ত্রের প্রতিস্থাপনের শিলান্যাসের উদ্দেশ্যে একটি সমারোহ হবার কথা। ডেভিড উমদার সেখানকার সহকারী নির্দেশক প্রশাসন। আধ ঘন্টার আলাপেই ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলেন।

IMG_0898 IMG_0878

সব কিছু দেখে বেরতে বেরতে ১টা বেজে গেল। এদিকে খাওয়াও হয় নি আবার ফ্লাইট ধরতে হবে শিলং এয়ারপোর্ট থেকে। সেটা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিমি দূরে। ইনোভা ছুটতে আরম্ভ করল। যানজট পেরিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ইগ্নোর করে ছুটতে আরম্ভ করল। যেতে যেতে শেষ প্রান্তে পড়ল বড়াপানি লেক। আরে গুলি মার ফ্লাইট মিস করাকে। দাঁড়িয়ে মনে ভরে না নিলে আর এলাম কি করতে! তাও ঝড়তে পড়তে দুটোয় গিয়ে পৌঁছলাম। খাবার কিছু নেই! কিন্তু ছবির মতো সুন্দর এয়ারপোর্ট দেখেই পেট ভরে গেল। আহা বেন স্টিলারের ‘দ্য সিক্রেট লাইফ অব ওয়াল্টার মিটি’তে আইসল্যান্ডের এক বিমানবন্দর বোধহয় এতটাই সুন্দর ছিল। শিলং-এ আসা সার্থক করে এয়ার ইণ্ডিয়ার ছ্যাকড়া গাড়ি উড়ে পড়ল আকাশে। জনা পনেরো যাত্রী কিন্তু কেউ কারুর সঙ্গে আলাপ করে না। আধুনিক ভারতের উন্নয়নের উড়োজাহাজে ভ্রমণকারী বন্ধুহীন ভারতীয়গণ। সব কিছু ভুলে মন দিলাম নিচের দৃশ্যে। বৈকুণ্ঠ মল্লিক হলে বলতেনঃ

IMG_0914 IMG_0904

নীচেতে কাহার

ছায়া দেখা যায়

শিলং পাহাড় শিলং পাহাড়

চুড়াতে তাহার

সবুজ মাখায়

শিলং পাহাড় শিলং পাহাড়।

আর নিবারণ চক্কোত্তি? তিনিও পিছিয়ে নেইঃ

শিরে হস্ত হেনে
একে একে নিবে মেনে
ক্রোধে ক্ষোভ ভয়ে
লোকালয়ে
অপরিচিতের জয়,
অপরিচিতের পরিচয়-
যে অপরিচিত
বৈশাখের রুদ্র ঝড়ে বসুন্ধরা করে আন্দোলিত,
হানি বজ্রমুঠি
মেঘের কার্পণ্য টুটি
সংগোপন বর্ষণসঞ্চয়
ছিন্ন করে,মুক্ত করে সর্বজগন্ময়।।

IMG_0856

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s