(১৪৭)

আমার বাবার ঘুরে বেড়াবার বেশ শখ ছিল। সেই সে ছোটবেলা থেকেই প্রতি তিন বছর অন্তর এলটিসি নিয়ে হিল্লি দিল্লি করে বেড়িয়েছি প্রচুর। নিজেও আম্পায়ারিং-এর সূত্রে দেশের ছোট ছোট সেন্টারগুলোতে দিব্যি ঢুঁ মেরে এসেছেন তিনি। তা বাবা রিটায়ার করেছেন সেই গত শতাব্দীর শেষ দশকের মধ্য ভাগে। আর আমার চাকরির পর আমি বনের মোষ তাড়াতে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে কোথাও ঘুরতে গেলে এক একটা ফিসফাস হয়ে ওঠে। আর কে না জানে ফিসফাস মানেই ঘটনার ঘনঘটা।

দিল্লিতে আমার ষোলো বছর হয়ে গেল। আর সত্যি বলতে কি সেই ২০০২এর পর দুর্গা পুজোয় দিল্লির বাইরে যাওয়াই হয়ে ওঠে নি! বঙ্গ জীবনের অঙ্গ দুর্গোপুজো দিল্লিতেও এখন নয় নয় করে সাতশোর উপর। আর দিল্লির পঁচিশ লক্ষ বাঙালির মধ্যে অন্তত তিরিশ লক্ষ কোন না পুজোর সঙ্গে বোরোলিনের মতো মেখে থাকে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে একই কাজ রুটিনের মতো করতে করতে কোথায় যেন একটা একঘেয়েমি এসে যায় না? তাই এবার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই বাক্সপ্যাঁটরা উত্তরপুরুষ পুর্বপুরুষ সহযোগে নিরিবিলিতে পাহাড়ের কোলে গিয়ে বিশ্রাম নেবার কথা ভেবে রেখেছিলাম।

সেই মতো সপ্তমীর দিন ভোরবেলায় তাল ঠুকে ইনোভা চেপে হাজির হলাম নিউ দিল্লি স্টেশনে শতাব্দীর আওয়াজ শুনব বলে। তা ড্রাইভার মহারাজ হেব্বি গম্ভীর আর তার থেকেও বিশাল বপুযুক্ত আর মাঝ রাস্তাতেই পেট্রোল ভরার নামে পুরো টাকা গুনে নিল। ভয়ে ভয়ে ছিলাম কিন্তু চুপচাপ সর্দারজী টুপটাপ নামিয়ে দিল নিউ দিল্লি স্টেশনে। তবে অতিরিক্ত পশ্চাৎপক্ক হয়ে সমস্যা ডেকে আনল এই শর্মা নিজেই। এমনিতে শতাব্দীগুলো ছাড়ে পাহাড়গঞ্জের দিকের প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে। কিন্তু নেমেই বুঝলুম এ একেবারে উল্টোদিকে একদম ১৬ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে। তারপর যাও বা ষোলোয় পৌঁছনো, তাও কামরা শেষ প্রান্তে। শেষ মেশ সদলবলে সারা নিউ দিল্লি স্টেশন পরিদর্শন করে শেষে যখন ট্রেনে চেপে বসলাম, ট্রেন ছাড়তে মাত্র পাঁচ মিনিট।

তা সে যা হোক দেরাদুন শতাব্দী চলতে শুরু করল বটে। আর আমার কন্যারত্নটি যেন হাতির পাঁচ পা দেখলেন। সারা সি২ কামরা জুড়ে তাঁর আর খান চারেক কচিকাঁচার রাজ চলতে লাগল। কিচিরমিচির করতে করতে সাহারানপুর আর তারপরেই আবার ট্রেন বেশ কিছুক্ষণ উল্টো পথে চলে হরিদ্বার।

যাব ঋষিকেশ বালানন্দজীর আশ্রমে। নদীর ধারে সুন্দর ছিমছাম জায়গা নাকি। হরিদ্বারের অটোওলা ধরল, স্টেশনেই। তার সঙ্গে দরদস্তুর হল। সে আমাদের নিয়ে গিয়ে হরিদ্বার শহর পেরিয়ে ঋষিকেশের অটোতে তুলে দেবে! কিন্তু তার আগেই সুটকেস তুলতে গিয়ে হাতল দিল ভেঙে। যাই হোক ভাঙা হাতল নিয়েই দুপুর বারোটায় হরিদ্বার হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে রইলাম। কেউ যেতে চাইছে না বা যাচ্ছে না। হৃষীকেশে হরতাল চলছে অটোদের। সব্বনাশের সাড়ে বারোটা। একজন যাও বা যেতে চাইছে, তা সে যা দর হাঁকছে তা হরিদ্বারের অটোওলার সঙ্গে সর্বমোট যা দর ফাইনাল হয়েছে তারও বেশী। সে বেচারির তো মাথায় হাত। শেষে তাকে একটা নীল পাত্তি ছুঁইয়ে বেশী দরেই রওনা হলাম গন্তব্যের দিকে। কিন্তু হৃষিকেশে ঢুকেই সে সুড়ুত করে সাইডলাইন দিয়ে ঢুকে গেল ভিতরে। ব্যাস আর রাস্তা চিনতে পারি না! চলছি তো চলছিই। চালক বলে মেন রোড দিয়ে গেলে ঠ্যাঙানির ভয় আছে। বাপরে শান্ত শহরেও রোগ এসে দেখা দিয়েছে? শেষে পৌনে দুটোয় পৌঁছলাম। যেতেই হুড়মুড় করে খেতে বসিয়ে দিল। পেঁয়াজ রসুন হীন অমৃত এক্কেরে! তার উপর পুজোর সপ্তমী! মানকচুর মতো অপদার্থও পারিজাতের গন্ধ নিয়ে দেখা দিয়েছে। আর পাঁচ ভাজার তো কথাই নেই।

12177663_10153703938900763_1127737430_o

এত খেয়ে দেয়ে বসে শুয়ে কাটালে তো বিপত্তি! তাই বিকেলে আমি আর ছেলে রওনা দিলাম নদীর পাড় বেয়ে! এমনিতে নদীর পাড় জুড়ে একটা মেরিন ড্রাইভ মতো আছে যা ত্রিবেণী নিয়ে যায়। কিন্তু ছেলের তখন অ্যাডভেঞ্চারের ভূত চেপেছে মাথায়। ঋষিকেশ তো প্রথম ধাপ, এর পর আছে গঙ্গোত্রী আর শেষে গোমুখ। সে সব করতে গেলে নদীর পাড়ে নেমে হাঁটা অভ্যাস করতে হবে। আমাকে বলল, “ধরো আমরা ফিউচার থেকে এসেছি। আর ক্রোম্যাগনানদের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছি’- বলে রওনা দিল। সূর্য পশ্চিম পাড়ে ঢলে পড়ছে আর আমরা দু বছর আগের বন্যায় ধ্বসে পড়া বাঁধানো ঘাটের উঁচু নিচু পেরিয়ে চলেছি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। স্বপ্নের মতন উঠে আসছেন হলুদ সন্ন্যাসী।

12138454_10153703940900763_4954951246755905002_o

আকাশ লাল পেরিয়ে ধুসর দেখতে পেলাম ঋষিকেশের ত্রিবেণীতে আরতি হচ্ছে একদম হর কি পৌরির মতই। পথ শেষ এবার হাল্কা সোঁতা। আলো আঁধারির মধ্যেই পাথর ডিঙিয়ে জল মাড়িয়ে পৌঁছলাম সেই আলোকোজ্জ্বল ত্রিবেণীতে। তারপর এদিক ওদিক করে ফিরতে গিয়ে শুনি অটো স্ট্রাইক তাই কিস্যুটি পাওয়া যাবে না!

12028781_10153703941165763_701279998506955735_o

তাই হেঁটে হেঁটেই ফিরতে হল। এবার মেন রোড বেয়ে! শুনলাম হরিদ্বার হাইওয়ে দিয়ে সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত অটো চলতে দেবে না প্রশাসন আর সেই নিয়ে কাজিয়া। হেই সামহালো! ঘোরা তো সম্পূর্ণ মাটি!

সন্ধ্যা নেমেছে সারা গঙ্গার পাড় জুড়ে। দূরে পাহাড়টায় টিম টিম করছে আলোর আলপনা! শান্ত সুনিবিড় কুলকুল শব্দ ছাড়া নদীর গতিপথ বোঝা যাচ্ছে না! ঘুমের সময় এসে গেল!

সক্কালে উঠেই পূব পাড় রাঙা করা তার আবির্ভাব! বারন্দায় বসে বসে উপভোগ করা। মেয়ে ‘নদীর পাড়’ দেখবে বলে এসে বসল চেয়ার নিয়ে! ছেলে ক্যামেরা হাতে! আর বারন্দার লাগোয়া অক্ষয়বট ফল খেতে বানর সম্রাট হাজির হলেন! সঙ্গে শাকরেদ দুই ধনেশ আর কতো নাম না জানা পাখি! শব্দে শব্দে সাড়া পড়ে গিয়েছে একেবারে! সুয্যিমামাও গুটিসুটি মেরে হাজির!

12045390_10153703942020763_5314703716853553549_o

অষ্টমীর পুজোর ঘন্টা বেজে গেল! আরতি পেরিয়ে সন্ধিপুজো পেরিয়ে খিচুড়ি ভোগ নটা না বাজতে বাজতেই! ব্যাস তারপর আর কোন কাজ নেই! গল্প আড্ডা ছেলের ছবি তোলা। মেয়ের বকর বকর! আর নদীর পরতে পরতে রঙ বদলানো! মেয়ে মহারাজকেই জিজ্ঞাসা করে বসল, ‘তুমি খেয়েচ?’ মহারাজ তো মহা খুশী! নিজেই তদারকি করছেন আমাদের খাওয়া দাওয়া! দিল্লি থেকে খবর আসছে পুজোর। কোলকাতা থেকে খবর আসছে পুজোর। আর আমরা নিরালায় বসে মন সুনিবিড় করে সারছি মায়ের আবাহন! বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে প্রায়। ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু আধঘণ্টা এদিক ওদিক করে ফিরেই আসতে হল! কিস্যুটি নেই কোথাও যাবার জন্য! তাদের মা তখন হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছে! মেয়ে এসেই সটাং মার কাছে গিয়ে ফ্যাঁচর ফ্যাঁচর করে বলল, “বন্দ করো!” বেগতিক দেখে তাকে নিয়ে বাইরে গিয়ে ‘চাঁদ তারা ফুল পাখি’ দেখাতে হল আধ ঘন্টা। গান শোনার তেইশটা বেজে গেল!

পরের দিন ছিল ছেলের জন্মদিন! এমনিতেই সে তথাকথিত ট্র্যাডিশনাল জন্মদিন পালনের বাইরে এসে যারপরনায় রাগান্বিত! কিন্তু তাকে কথা দিয়েছিলাম সকাল হতে না হতেই ছবি তুলতে ছুটব তাকে নিয়ে! কিন্তু কোন বাহন নেই যে চিল্লা যাব! তাই সাতসকালে বাসে চেপে হর কি পৌরি! আর সেই মালাই কা সামোসা! আহা ইদম অমৃতম বটেং! সরের মোড়কে ক্ষীরের পুর!IMG_1014 মুখে দিলে গলে যায় আহারে কি তুষ্টি! সঙ্গে ঢকর ঢকর করে এক গ্লাস লস্যি! ছেলের আবদার! মনসা পাহাড়ে চড়বে রোপওয়ে করে! কিন্তু ওয়েটিং টাইম দেড় ঘন্টা! তাই একরকম জোর করেই রওনা দিলাম পায়ে হেঁটে। প্রথম দিকের গাঁইগুঁই উপরে উঠতে উঠতে উদ্যমে বদলে গেল! হরিদ্বার এত সুন্দর লাগে উপর থেকে? বানরদের সংসার, রামফল ছোট ছোট জলের ধারা! আহা পথশ্রম ক্লান্তি সব ধুয়ে যায় ঠাণ্ডা জল বুক জুড়ে নামার সঙ্গে সঙ্গে! উপরে গিয়ে দেখি রোপওয়ে ফাঁকা। ফাঁকতালে রোপওয়ে চড়াও হয়ে গেল! নীচে নেমে দেখি সে কি বিশাল লাইন রে বাওয়া! লোকে তখনো উপরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে! আর আমরা প্রতিশ্রুতি রেখে নেমে আসছি নীচে। নবমী পেরিয়ে দশেরা আসবে! বাসে করে এসে নামলাম ঋষিকেশের বাসস্ট্যাণ্ডে! তারপর আবার হন্টন।

12039099_10153703945715763_3101254736014530975_o

887564_10153703945895763_7148297881622420807_o

সন্ধ্যায় মেয়ে আর তার মাও সঙ্গী হল আমাদের! মা বাবা বললেন আর বেরোবেন না! চারজনে মিলে চাঁদের আলোয় রওনা দিলাম ত্রিবেণীর উদ্দেশ্যে! দশেরার রাবণ তার ভ্রাতা পুত্রকে নিয়ে অগ্নিপরীক্ষার অপেক্ষায়!

বাজি ফাটছে আকাশের আতসকাঁচে। ক্যামেরা দিয়ে তাকে ধরার বৃথা চেষ্টা করতে করতে হাজির হলাম আলোর মালায়! ও বাবা দেখি, রাবণ তার দলবল নিয়ে হামলা করেছে রামের রথের রশিকে! ওদিকে শেষনাগে শায়িত বোরড বিষ্ণু আর তার পদসেবারত কচিলক্ষ্মী। সে সব পেরিয়ে দেখি বাঙালি ধরণে দুগগো ঠাকুর! ছেলেপুলে অসুর কলাবউ নিয়ে এককোণে দাঁড়িয়ে! মানুষ তখন তাক করছে রাবণকে! গগনবিদারী শব্দে মেঘনাদ ও কুম্ভকর্ণ মৃত! ছুটল বাণ- জ্বলে উঠল রাবণের বুক! একবুক জ্বালা নিয়ে ভস্মীভূত হল রাবণ! আর আমরা তখন সিঙারা আর জিলিপি চিবুতে চিবুতে ফিরে এলাম রাতের ঠিকানায়!

12052437_10153703948345763_2985459281010682501_o

12182719_10153703948180763_6930213227419068557_o

12038614_10153703946905763_3904428309773694397_o11013401_10153703948590763_2516088822500246240_o

এদিকে সমস্যা অন্য! হরিদ্বার থেকে পরদিনের ট্রেন ওয়েটিং লিস্ট দশে টিং টিং করছে! গাড়ি বুক করা যাচ্ছে না! শেষে জনগণের আওয়াজে! টিকিট ক্যানসেল করে সকালের ট্যাভেরায় বসলাম চেপে! প্রথম স্টপ হর কি পৌরি চোটিওয়ালা! জল খাবার সাঁটিয়ে তড়াক করে উঠলাম ট্যাভেরায়! আর সেও পাঁইপাঁই করে ছুটে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পৌঁছিয়ে দিল এক্কেবারে অলকনন্দা অ্যাপার্টমেণ্টে! মধুরেণ সমাপয়েত ডিমের ঝোল আর ঢ্যাঁড়স পোস্ত দিয়ে!

কিন্তু ঋষিকেশের জল যেন বুকের কলজেটাকে আরও দু ইঞ্চি বাড়িয়ে দিয়েছে। খাঁচার ছাকনিটাকেও দিয়েছে পরিষ্কার করে! নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আজ থেকে গতানুগতিকে! শুভ বিজয়া জানিয়ে! ভেসে যাই জীবনস্রোতে। আমেন!

11056067_10153703947795763_5147558234981474552_o

2 thoughts on “(১৪৭)

    • জেঠু জেঠিমা বয়স হয়েছে খুব বেশী ঘুরতে পারেন নি! কিন্তু ওই সুন্দর নিস্তব্ধ নিরালা জায়গাটা খুব এনজয় করেছেন! একটা ব্লগ পোস্টে তো সবটা কভার করা যায় না। তাই না? ছবি আছে! সন্ধ্যায় দিয়ে দেব না হয়!

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s