(১৪৮)

বাবা মা এসেছিলেন পুজোর কদিন। কাল ট্রেনে উঠে ফিরে গেলেন আমার শৈশবের শহর কোলকাতায়। ষোলো বছরের উপর হয়ে গেল তাও এখন মেয়ের বাবারা যেমন বিদায় মুহুর্তে গম্ভীর গ্রামভারী থাকতে পারে না, সেই রকম এই বিচ্ছেদের মুহুর্তগুলোতে মাঝে মাঝেই চোখের ঘটি হাত হড়কে উপুড় হয়ে পড়ে। আমি এই অবশ্যম্ভাবী ইমোশনটা সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করি। নিরানব্বই থেকে কত কিছুই তো ঘটে গেল, চোখের ঘটি এখনও খালি হয় না তাও। আমার আবার বদনাম আছে আমি সিনিমা দেখতে দেখতেও ‘ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ’ করে কেঁদে ফেলি।

সে আমার এক বন্ধু ছিল স্কুলে, ঋষিরাজ। দুম করে সে চলে গেল রামকৃষ্ণ মিশনে। কিন্তু যোগাযোগটা থেকে গেছিল স্কুল শেষ হওয়া পর্যন্ত। কলেজে ঢুকলে যা হয় যে যেদিক পানে দেখে চলে যায় টায়। তা তখনও আমার বান্ধবী হয় নি কি না! তাই একা একাই সিনেমা মারতাম। তা সেদিনটা ছিল নন্দনে ঢুঁ মারার দিন। ৭টাকা আর ১৪ টাকা। লাইনে দাঁড়িয়ে দেখি পিছনের দিকে ঋষিরাজ। তা মধ্যবিত্ত নীতিজ্ঞানটা তখন টনটনে। তাই ঋষিরাজকে সামনে না এনে আমিই পিছনে গিয়ে আড্ডা মারতে লাগলাম। একসঙ্গে সিনেমা দেখব ইটি। কিন্তু কপাল জোরে বা বিজোড়ে দেখি মাত্র কয়েকটা টিকিটই বাকি। (আমার নিজের জায়গায় থাকলে অবশ্যই এটা হত না)

যাই হোক তারপর সেই সাতটাকার টিকিট কেটে একদম ফ্রন্টরোয়ে বসে চোখে রুমাল চাপা দিয়ে ঘাড় জিরাফের মতো করে সিনেমা দেখে হল থেকে বেরলাম। নাকের জলে চোখের জলে অবস্থা। অত সামনে থেকে দেখলে যা হয়। ঋষিরাজ বলল, “বহুদিন পর কোন সিনেমা দেখে কাঁদলাম!” আমি বললাম, “ছাতা চোখ দিয়ে এমন দিব্যরশ্মির মতো জল পড়ছিল যে বুঝতেই পারি নি সিনেমা দেখে কাঁদলাম না ফ্রন্ট রোয়ে বসে!!”

সে যা হোক। ঘটনাটা কিন্তু সেটা না। দিল্লির পূর্বপ্রান্তে একটা বিশশাল মাছের আড়ত আছে। গাজীপুর। কোলকাতাতেও এতবড় নেই। এনএইচ ২৪ দিয়ে গাজীপুরে ঢুকলে ডানদিকে পড়ে ননভেজ মাণ্ডি। বাঁহাতে চিকেন মাটন আর ডিম এবং ডানদিকে মাছ। এ নিয়ে ফিসফাসে বোধহয় আগেই লিখেছি। সব্জি আর ফুলের মণ্ডিটা রাস্তার বাঁদিকে।

যাই হোক, বাবাকে নিয়ে মণ্ডি দেখাবো বলে নিয়ে গেলাম শনিবার। বাবা নিজেও দেখে অবাক। এতরকমের মরা মাছ একসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা দেখে নি কখনো! আর বরফ পেষার কল। বাপরে বাপ। বেলচা বেলচা বরফ ঝুড়ি ভর্তি করে আড়তে আড়তে চালান হচ্ছে। আর মাছগুলো চলে যাচ্ছে বরফের পেটে। আমার মা ইলিশ চিংড়ি এসব ছাড়া এখন খেতে চান না কোন মাছ। বাবার হয়েছে মুশকিল, এক টুকরো পোনা মাছ আর কে দেবে! সে যাই হোক। ইলিশের মরসুম না হলেও দিল্লিতে একবার যদি জুত করে খাওয়াতেই না পারলাম তাহলে আর প্রথম সন্তান হলাম কি করতে!

খুঁজতে খুঁজতে এক ইয়া পেটানো জোয়ান গোঁফ তার উর্দ্ধমুখি আড়তদারের সামনে গিয়ে দেখি একদম মাকুর মতো একটা ইয়াব্বড় ইলিশ রয়েছে এক্সট্রা অভিনেতাদের ভিড়ে। বাবা আর আমার কথার মধ্যেই সেই ভদ্রলোক বিশুদ্ধ বাংলায় বলে উঠলেন, “দাদা এটা পদ্মাপারের, নিয়ে যান একটু বেশী দাম হবে বটে! তবু সমঝদারকে খাইয়েও সুখ! নিয়ে যান!” নাম বললেন চিন্ময় রায়! আহা বল বল আমায় উত্তম কুমার বল! কে যে কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন আর বাহুবলীর নাম চিন্ময় রায় রাখে!

আর কি নেবেন? চিংড়ি ছাড়ুন কোলেস্টেরল আছে। ওদিকের ভেটকিগুলো একবার দেখুন তো! কি কাকু? কেমন? নিয়ে যান নিয়ে যান!

তারপর পরিচিত এক কোচবিহারের ছেলেকে বঁটিতে ধরিয়ে দিলেন তিনি, ছেলে পাঠিয়ে। আর ছেলেটি অভ্যস্ত হাতে পটাপট কেটে সাফসুতরো করে দিল। বাবাকে বললাম, দিল্লিতে তিনরকমভাবে মাছ কাটা হয়। বাঙালীরা সব কিছু রেখে গাদা পেটি করে নেয়। উত্তর ভারতীয়রা চোখ নাক মুখ ল্যাজ বাদ দিয়ে বরফি বানিয়ে নেয় আর দক্ষিণীরা ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে কচি শসা বানায়! তবে কোলকাতায় যেমন ছোট মাছ কাঁচি দিয়ে ছেঁটে দেয় সেটাও অভিনব কেস।

তা যাই হোক, দুদিন ধরে বেশ বিনমরসুমি ইলিশ আর ভেটকি পেটানো হল বটে। কিন্তু চমকটা লাগল অন্যত্র! লালকৃষ্ণ আদবানি যখন গৃহমন্ত্রী ছিলেন তখন এফবিআই কায়দায় একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা বানিয়ে তার হাতে দেশের আভ্যন্তরীণ সুরক্ষার ভার তুলে দেবার কথা বলে হেব্বি সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। ব্যক্তি স্বাধীনতায় হাত পড়ে যাবে যেমন এফবিআই অপরাধী নিরপরাধী নির্বিশেষে চরিত্র চিত্রণ করে, এই বলে ঢিঢি পড়ে যায়।

সে যাহোক সেটা হয় নি বটে কিন্তু ইন্টারনেট আর স্নোডেনের উইকিলিক্সের পরে সেই জিনিসটাই যে হচ্ছে না তা কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলা যায় না! ফেবুতে তো আবার ইন্টারনেটডট ওআরজি নিয়ে উথালপাথাল কেস। ডাল মে তো কুছ কালা জরুর হ্যায়। নাহলে এমন হয় বলুন? আরে সেই শনিবার মাছ কিনলাম আর সোমবার দেখি ফেবু আমায় সাজেস্ট করছে যে আমি জনৈক ‘চিন্ময় রায়’-এর বন্ধু হয়ে যাই! কি কেস! এই সেই ভিকো বজ্রদন্তী গোঁফবিশিষ্ট চিন্ময় রায়! কিম আশ্চর্যম! কাল রাতেই তিনি বন্ধু প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন! কিন্তু কি করে ফেবু ব্যাটা পেরেছে জানতে… সেটাই বুইলাম না দাদা! রোজ কত কি ঘটে যাহা তাহা আহা…!

10357816_593240844132714_2970673643453627726_n

2 thoughts on “(১৪৮)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s