(১৪৯)

তারপর তো শ্রীরামচন্দ্র বহুত ধানাইপানাই-য়ের পর কোন রকমে চোদ্দটা বছর কাটিয়ে অযোধ্যায় ফিরলেন। সঙ্গে ওয়ান পিসে তেনার বউ আর হট হেডেড ভাইটি। ভাইটির অসহিষ্ণুতায় যে সমস্যা হয়েছিল তা দেবতাদের আনটাইমলি (পড়ুন অকালে বোধন) ঘুষটুস দিয়ে মেকআপ করে বউকে তুলে নিয়ে যাওয়া বুড়ো ভামটাকে কাটার জন্য তারই ছোটভাইকে রাজত্ব আর বৌদির লোভ দেখিয়ে তার মেজ ছেলেটাকে আনপ্রিপেয়ার্ড অবস্থায় মেরে আর বাকিদের সাবাড় করে পনেরো দিন পরে ফিরে এলেন ভরতের কাছ থেকে লিজ দেওয়া পাদুকা ফেরত নেবার জন্য। ভরতেরও হয়েছিল এক জ্বালা! কোকিলের বাচ্চার মতো দাদার পাদুকা ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে ক্ষমতাহীন দায়িত্ব পালন করে করে হেদিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। লক্ষণের বউটি ১৪ বছর ধরে ঘর বন্ধ অবস্থায় ছিল, সেও হই হই করে ছুটে এল দাদাভক্ত আমসত্ত্বটিকে ঘিরে উল্লাস করার জন্য। আর সীতা দেবী? তিনি তো জয়ের মালা বা মাল! হরধনু ভেঙে রাম দখল নিলেন, চুপকি দিয়ে রাবণ আর তাকে ডবল চুপকি দিয়ে রাম আবার ফিরিয়ে নিলেন। তার পরেও অবশ্য ক্যারমের ঘুঁটির মতো তিনি এস্পার ওস্পার করেছেন। কিন্তু সেসবের ইতিহাস অন্য।

দীপাবলি উদযাপনের সেই শুরু। অনার্য দ্রাবিড়দের উপর আর্যদের বিজয়গাথা। লক্ষ্মীর পূজার মাধ্যমে সমৃদ্ধির আনয়ন। সারা উত্তরভারতে এবং বিজয়ীর ইতিহাসের তলায় চাপা পড়ে যাওয়া দ্রাবিড় ভারতের আলোর উৎসব।

ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে দীপাবলির দিন দীপান্বিতা লক্ষ্মী পুজো হত। আমার বিশেষ কিছু কাজ ছিল না! বিকেল বিকেল কলার ডোঙা করে একটু গোবর তুলে আনা আর পরে প্যাঁকাটি দিয়ে কুলো বাজাতে বাজাতে অলক্ষ্মী বিদায়। তারপর পরিবার পরিজনেরা হাতে হাত মিলিয়ে লুচি ঘুগনি আলু ফুলকপি প্লাস্টিকের চাটনি আর মিষ্টি। তাই সাবড়ে পটকা ফাটিয়ে ফুলঝুরি জ্বালিয়ে কালীপূজোর উদযাপন। তার দুদিন পরেই ছিল ভাই ফোঁটা। তা নিজের বোন আন থাকলেও ভাই ফোঁটার অভাব হয় নি। মাসতুতো পাড়াতুতো মিলিয়ে জমজমাট কেস।

ছোটবেলায় পটকায় হাত পাকাবার আগে ক্যাপ ফাটানো আর সাপের ট্যাবলেটে ফুলঝুরি স্থাপন। রকেট টকেট আমাদের হাতের মধ্যে ছিল না। আর বুড়িমা তো লেজেন্ড- আমাদের বড় হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ। সে একবার পরের দিন সকালে বেড়াবাগান মাঠে চকলেট জ্বালিয়ে দূরে ছুঁড়ে দিলাম। আর ঠিক মাটিতে পড়ার মুহুর্তে ফেটে সে অদ্ভুত এক ধোঁয়ার রিং তৈরী হল। সিগারেট দিয়ে তো সবাই করে হে অর্বাচীন। বোমা দিয়ে করে দেখান দিকি? বলয়? মৃত্যু বলয়?

তারপর সত্যিই বড় হয়ে গেলাম আর দিল্লি চলে এলাম বছর চারেক আগে এক বন্ধুর বাড়িতে তিনটে বোমা একসঙ্গে বেঁধে ফাটাতে গিয়ে দেখে বাচ্চা ছুটে আসছে। উপায়ান্তর না দেখে হাতেই ফাটিয়ে চিত্তির কাণ্ড। নেহাত ঠাণ্ডা জল আর বার্ণল ছিল তাই প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিয়ে সামলে নিলাম।

তা সে সব তো ইতিহাস। শব্দবাজী নিয়ে আক্কেলটা গত দু তিন বছর ধরেই খুলেছে। আর এবারে তো সামনের বাড়ির ছোট মেয়েটি শব্দবাজীর বিরুদ্ধে ‘প্লেজ’-এ সই করিয়ে নিয়ে গেল।

জ্ঞানত অন্যথা করি কি করে? তাই ছেলেকেও বুঝিয়ে বাঝিয়ে চরকি তুবড়ি ফুলঝুরি আর রঙ মশালে ম্যানেজ করলাম। সেও দেখি সমস্যাটা বুঝল। যদিও ফাঁকে ফুঁকে কালিপটকা টটকা ইতিমধ্যেই ফাটানো হয়ে গেছে। তবুও একটা দিন যদি শব্দদূষণ কমে একজনের থেকেও। তাই আর কি।

যাই হোক সক্কালবেলায় পিলান ছিল জামা মসজিদের করিমে গিয়ে নাহারি সাঁটিয়ে আসব। কিন্তু মেয়েটার একটু শরীর বেগড়বাঁই করাতে সে প্রোগরাম ক্যানসেল। তাই একটু পরে বেরোলাম। স্টুডিওর ঘড়িতে তখন প্রায় দুই ছুঁই ছুঁই। কিন্তু রাখব কোথা গাড়ি? মেট্রোতে তো আর দিওয়ালি দিন চড়া যায় না। তাই অনেক ভেবেচিন্তে জামা মসজিদের ঠিক আগের গলি দিয়ে ঢুকিয়ে পতৌদি হাউসের পিছনে এক গলিতে সাইড করে রাখলাম। তারপর ছেলে আর পার্শ্ববর্তিনীকে নিয়ে শুরু হল জামা মসজিদের আশপাশের গলি গলি তস্য গলি অভিযান। মোটামুটি চেনা খাঁজ ধরে ঠিক চলে এলাম করিমে। কিন্তু তার আগে পুরনো দিল্লির ওয়াল্ড সিটির প্রাচীন চার্ম চোখে মনে গেঁথে নিলাম। এই এখানে রুটির কারখানা তো ওখানে বিস্কুট তৈরী হচ্ছে। সেখানে সব্জি নিয়ে বসেছে তো দূরেই তার দিয়ে ঝোলানো পায়রার খোপ। পার্শ্ববর্তিনী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে জানালো যে এই ছোট্ট সাম্রাজ্যে সকলের জন্যই জায়গা আছে।

ঘুরঘুরে একটুকরো সিঁড়ি উঠে গেছে উপরের জানলার খোপটায় যেখানে ওড়না টেনে সদ্য তরুণী চলাচলের খবর নিচ্ছে। ঠিক তার পাশ দিয়ে একটা বট গাছের শিকড় নেমে গেছে, মানুষের অনবধানতার সাক্ষী হয়ে। দোকান বাজার বিকিকিনি পেরিয়ে ঘরছাড়া নেড়িও একটা গদি পেয়ে গেছে নিশ্চিন্তের আশ্রয়ে। নর্দমার জলের আর ময়লার দুর্গন্ধ মানুষের নিত্য যুদ্ধের বেঁচে থাকার সাক্ষী।

সব ডিঙিয়ে মসজিদ জামা! তার পায় পায়ে, খেজুরের দোকান পেরিয়ে ‘বড়ের মাংস’ পেরিয়ে বিরিয়ানি পেরিয়ে খোবানি পেরিয়ে জ্যান্ত মাছের নড়াচড়া পেরিয়ে হাবসি হালুয়া পেরিয়ে ফিরনির গন্ধ নিয়ে ছোট্ট গলিতে করিম খুলে দিল জন্মতের খাজানা। এমনিতে দিল্লিতে বিরিয়ানি তেমন দড় কিছুই পাই নি। যা ছিল মটকা পীর সেও সময়ের প্রভাবে গেছে সামান্যের আওতায়। জামিয়ায় এক আছে ‘হামাদ’ সেও চলনসই। করিমে খেতে হলে নাহারি আর রাণ। ইয়াব্বড় পাঁঠার লেগপিস তারিয়ে তারিয়ে কাঠ কয়লার আগুনে চুবিয়ে স্বর্গীয় অনুভূতি। আর হল মাটন স্ট্যু। আহা প্রতিটি মসলার আলাদা স্বাদ জিভটাকে খেলার ময়দান বানিয়ে দিচ্ছে। আর পাশবালিশের মত খামিরি রুটি। খেয়ে দেয়ে খেজুর করে ফেরা।

করিমেই দেখা হয়ে গেল পরিচিত পরিবারের। তাদের ছবি তোলার মধ্যে দিয়েই আমাদের গোপন অভিসার জিন্দা হয়ে রইল। তবে এই ফিসফাসের ময়দানে নামা কিন্তু অন্য কারণে। একটা গলিতে প্রায় শ ফিট এগিয়ে গাড়ি লাগাবার জায়গা পেয়েছিলাম। সেখান থেকে বেরতে গিয়ে গলদ্ঘর্ম হয়ে গেল যদিও। কিন্তু বার করার পর পার্শ্ববর্তিনীর অবজারভেশনটা মনে রাখার মতঃ

এ যেন অন্য পৃথিবী। কেউ কাউকে গালাগাল দিচ্ছে না। সকলেই ধৈর্য ধরে পথ করে দিচ্ছে। সুবিধা মতো এগিয়ে দিচ্ছে একে অপরকে নিজেরটা পরোয়া না করেই। দিল্লির জ্যাম বিশ্ববিদিত। যে যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে বিনাযুদ্ধে কেউ নড়বে না। নড়লেই কোর্ট মার্শাল- ফায়ারিং স্কোয়াড।

 

কিন্তু যে জায়গাটাকে আমাদের সংস্কার ও সমাজ অবিশ্বাসের চোখে দেখতে শেখাচ্ছে, সেখান থেকেই মানবতার বেঁচে থাকা নজরে পড়ে যায়। চাঁদনি চকের এই গলিটা কিভাবে আজকের দিনে বেঁচে থাকব তা শিখিয়ে দিয়ে গেল যেন। অপরকে জায়গা দিলে তবেই নিজের জায়গা থাকবে। এই বিশ্বাস দিয়ে গেল যেন।

বিশ্বাস থাক বিশ্বাসের জায়গায়, কিন্তু সবার উপরে থাক মানুষের উপর বিশ্বাস। সহমমর্মিতা! আমেন।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ ওহ বলতে ভুলে যাচ্ছিলাম। চলার পথে এক তিন চাক্কার পিছনে দেখলাম, লেখা আছেঃ হ্যায় আগর বাজুও মে দম তো হিলা দে তাজমহল। নেহি হ্যায় তো মেরে সাথ দো দম লাগা- তাজমহল কো হিলতা হুয়া দেখ!

কোই সক? হাইঁ?

12227949_10153737677030763_1970378731_o

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s