(১৫০)


আরে বাবু, ঘণ্টা বাজল না, পুষ্পবৃষ্টি হল না, শঙ্খধ্বনি হল না, বিদ্যুৎ চমকাল না, আজানের শব্দ ভেসে এল না কমসে কম বাতাসার হরির লুট হল না আর দেড়শ হয়ে গেল? বললেই হল? আরে তামাশা বনাকে রাখ দিয়া রে বাওয়া!!!

জন্মেই আপনি কি ভেবেছিলেন যে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার মোক্তার উকিল চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হবেন? বাজি রেখে বলতে পারি কক্ষনো না। আমি ছোটবেলায় ভেবেছিলাম গোলকিপার হব। সে তো কি ভাঁটের গোলকিপিং করতাম আমার স্কুলের বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করলেই জানবেন। তারপর একবার স্কুলের রচনায় (স্কুলে গরু ছাড়াও অন্য রচনা হয় কিন্তু- ইতিহাস রচনা) লিখলাম ক্রিকেটার হব। তখন স্বপ্নে দিলীপ দোশি আর ডেভিড গাওয়ার। আর বাস্তবে মনিন্দার সিং আর আজহার! ৯২তে ডেভিড গাওয়ারকে একদম সামনাসামনি দেখে কেঁপে গেছিলাম। বিশ্বাস করুন, শচীন তো কোন ছাড় ইমরান, ভিভ, গাভাসকার (নাকি গাওস্কর?) বা প্রকাশ পাড়ুকোন, লিয়েন্ডার বা পিটি ঊষাকে দেখেও কখনো হয় নি সে রকম। তা সে থাক সে তো ‘বাপি বাড়ি যা’-র ছন্দে সপাটে সিক্সারের মতো গ্যালারির বাইরে গিয়ে পড়েছে। স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে, বাস্তবের সিঁড়িতে চড়তে পারে নি।

তারপর আর কি? বাপের বড় ছেলে হয়ে দায়িত্ব কাঁধে উঠে গেল আর চাকরি নিয়ে চলে এলাম দিল্লিতে। তবে সত্যি বলব, না হলে মাথায় বাজ পড়বে! আমার বাবা কোনদিন জোর করেন নি- মাও না। মানে যখন বললাম জয়েন্টে বসব না, বা খেলা ছেড়ে দেব বা সায়েন্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করব না তখন যেমন বারণ করেন নি। তেমনই নব্বইয়ের শেষ বছরে হুট করে বললাম বিয়ে করব। তখনও বারণ করেন নি। কিন্তু এমন সৌভাগ্য কতজনের ভাগ্যে জোটে? নিজে নিজে উচ্ছন্নে যেতেও তো আজকের সমাজ দেয় না। ঘাড় ধরে ঘোড়দৌড়ে নামিয়ে দেবে তারপর ঠুলি পরিয়ে দৌড়। ট্র্যাক থেকে সরতে চাইলে চাবুক, অসুস্থ হয়ে পড়লে চাবুক, বিশ্রামে চাবুক। সকাল সন্ধ্যা শুধু ছুটে চল ছুটে!
আমার এক বন্ধু খুব টেনশন করছিলেন, তাঁর ছেলের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে বলে। কোন ক্লাস? আপার নার্সারি। বললাম, এই সময়ই তো টেনশন করতে হয়। উঁচুর দিকে উঠলে বাপ মার টেনশন ছেলেমেয়েরাই নিয়ে নেবে। আরে জিন্দেগী কো একদম তামাশা বনাকে রাখ দিয়া রে বাওয়া।

তা তামাশা গেলাম দেখতে! এমনিতে আমার এই রনবীর আর দীপিকা জুটি হিসাবে ভাল লাগে। গুড কেমিস্ট্রি। একে অপরকে কমপ্লিমেন্ট করে সহজেই। তা বলে বাস্তব জীবনেও এদের জুটি বাঁধতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। প্রায় পাঁচ বছর মুখ দেখাদেখি বন্ধ অবস্থাতেই ভূপতি আর পেজ একসঙ্গে খেলে গেছে।

যাই হোক, কর্সিকা আর কোলকাতা ছুঁয়ে শিমলা আর দিল্লি। গল্পের গরু জাবর কাটতে শুরু করল। যাকে মনে করলাম সবার থেকে আলাদা সেই দেখিই পরিস্থিতির চাপে খুঁটিতে বাঁধা গরু। একই চর্বিত চর্বণ দিন রাত চিবিয়ে যাচ্ছে। তা মার তাকে ল্যাং। সে তো ল্যাং খায় নি কখনো। প্যাকেজ, সেফটি, সিকিউরিটির চাকচিক্যে মিথ্যেটাকেই সত্যি বলে ধরে নিয়েছে। মাপা হাসি চাপা কান্না ছাপা রাগ কাঁপা কাঁপা স্বপ্ন নিয়ে তার জীবন নটা থেকে পাঁচটা আর পাঁচটা থেকে নটায় আবদ্ধ। কিন্তু ল্যাং খেয়েই মুখ থুবড়ে পড়ে বুঝতে পারল- ‘আরে! মাটির গন্ধটা তো সাফল্যের সৌরভের থেকেও বেশি কাছের! মুখোশের আড়ালে যে খচরামিটা চাপা পড়ে থাকে তাকে খুঁড়ে তুলে আনলে যে দারুণ আনন্দ হয়! ভালত্ব শুধু কনভেনশনের মোড়কে বাঁধা থাকে না! গল্প চাই গল্প! শুধু মুখে মুখে নয়! হৃদয় দিয়ে চাই গল্প! জীবনে চাই গল্প!”

তারপর আর কি। নটে গাছটি গল্পের গরু গপগপিয়ে খেয়ে চলে যায় আর গল্প নেমে আসে জীবনে। র‍্যাট রেসের বাংলা হয়ে যায় ঘোড়দৌড় আর রেসের স্টার্টে সকলের সঙ্গে শুরু না করে নায়ক হেলতে দুলতে হাঁটতে শুরু করে উলটো দিকে। যেখানে আকাশের রঙ সবুজ, ঘাসের রঙ নীল। হলুদ জলে লাল লাল মাছ চড়ে বেরায়। বেগুনী গোলাপ আর মিষ্টি গোলাপি রঙের ভায়োলেট ফুলের আলোর মালা ছড়িয়ে থাকে গাছে গাছে, আকাশে আকাশে আর হ্যালোজেনের পোস্টে।
আহা বড় ভাল লাগল দাদা ‘বই’টা! মানে মাথা দিয়ে ভাবলে প্রচুর গাফিলতি। কিন্তু স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখল তো! প্রিজনার অব জেন্দা টুকে রাজকুমারের দ্বৈত কাহিনীই বানাতে হয় নি আবার এন্টারটেইনমেন্টের নামে পচা কচুরি অ্যান্টাসিড দিয়ে গেলাতে হয় নি! স্মুদ টেকঅফ ফরম সিডনী, সিঙ্গাপুর অ্যাট সানরাইজ অ্যাণ্ড জিলেট জিলেট অ্যাণ্ড জিলেট। প্লেন থেকে নেমে এল সুচিত্রা সেন।

ভুলভাল বকছি? বেশ করছি! আমার ভাল লাগছে তাই বলছি! আপনিও ভুলভাল বকতে থাকুন না পাঠক বা পাঠিকা। আপনারও দারুণ ভাল লাগবে! মস্তি! বাঙাল ভাষা না জেনে বলুন। নিজের ভাষা তৈরী করুন। ছবি আঁকুন, অভিনয় করুন- রোলপ্লে, কচিকাঁচাদের সঙ্গে কাদা মাঠে সাদা শার্ট আর ব্ল্যাক টাই পরেই নেমে যান গোল খেতে- সুন্দরীরা আপনাকে স্নান করাবার জন্য তৈরী থাকুক আর না থাকুক। প্লাস্টিক আর গার্টার দিয়ে তৈরী বল পেটান কাঠের বাটাম দিয়ে- চোঁচ ফুটে গেলে দাঁত দিয়ে শুষে বার করে নিন। ঘাস ছিঁড়ে তার শাঁস চিবিয়ে নিন। প্যান্টে ফ্রকে সালোয়ার শাড়িতে জড়িয়ে নিন চোরকাঁটা। আর আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে দু চোখ ভরে শ্বাস নিন ফুসফুসে। তারপর বাড়ি আসুন! নিজের সামান্য জীবনেই একটু রঙ ছোঁয়ান, আলো জ্বালান। দিয়ালিতে হোলি আর হোলিতে দিওয়ালি। মানা কিসনে কিয়া হ্যায় ভাই? আর প্রয়োজনে হারিয়ে যান। আর অপ্রয়োজনেই নটা পাঁচটার ঘড়িটাকে আগে পরে করে দিন। তারপর দেখুন আউটপুটে আকাশ পাতাল পার্থক্য। ভবিষ্যৎ নয় বর্তমানেই বাঁচবেন। মনে আরাম মানে আপনিও নবাবী চালে! শাল্লা পৃথিবীটাই পালটে যাবে।

কিন্তু তা তো হবার নয়! তাই আর কি! নিজের ঘরেরটাই পরিবর্তন করি! সকলেই এরকম ভাবতেই পারে! আর নাও পারে! তবুও শুরু তো কোথাও না কোথাও করতেই হয়! তাই শেষ এখানেই করলাম! আমেন!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ আমার দুই সিনিয়র বসের কালকেই ট্যুরে যাবার কথা ছিল বলে বিকালে টিকিট কেটেছিলাম তামাশার। চারটে পঞ্চাশ। তা দেখলাম দুজনেই ট্যুর ক্যান্সেল করে বসে আছে! তার উপর চেরি অন দ্য টপের মত চারটেয় মিটিং। ভুজুং ভাজুং দিয়ে চাপ নিয়ে নিলাম পরের সপ্তাহের জন্য। তারপর পার্শ্ববর্তিনীকে তুলে দ্রুত চলে গেলাম হলে! উফ বাঁচা গেল, তখনও পাঁচ মিনিট বাকি! কিন্তু টিকিট খুলে দেখি সব্বনাশ! এ তো অন্য হল! তাও গুনগুনিয়ে গাইতে গাইতে গিয়ে যখন পৌঁছলাম সঠিক হলে তখন পাঁচটা বেজে গেছে। কিন্তু আমরা যাবার পরেই সিনেমা আরম্ভ হল। না হলে এসব হাবিজাবি লিখতাম কি ভাবে বলুন তো? পার্শ্ববর্তিনী কিছু বলেন নি। কিন্তু মুচকি হাসি দিয়েই যা বোঝাবার বুঝিয়ে দিলেন! শাল্লা জিন্দেগীকো তামাশা বনা কে রাখ দিয়া!
tamasha_640x480_51442924553

প্রওঃ পুঃ ১- আরে এক ব্যাঙ্কের ক্যাশ ভ্যান ড্রাইভার বাইশ কোটি টাকার ক্যাশ নিয়ে গায়েব হয়ে গেছিল। সবাই তার এখানকার বাড়ি দেশের বাড়ি আর হিল্লিদিল্লি খুঁজেও পেল না তাকে। পাওয়া গেল দেড় দিন পর, যেখান থেকে গায়েব হয়েছিল তার পাঁচ কিমি দূরে। মাত্র দশ হাজার টাকা ঝেড়ে দিয়ে ভদকা আর মুর্গির ঠ্যাঙ ওড়াচ্ছিল সে। দায় দায়িত্বকে ধুঁয়ায় উড়িয়ে। ধরা পড়তে বলল, ‘মাইনে ঠিক করে দিত না, গাধার খাটনি খাটাত! বেশ করেছি!’ অনুতপ্ত নয় সে। শাল্লা সচ মে জিন্দেগীকো তামাশা বনা কে রাখ দিয়া…

Advertisements

One thought on “(১৫০)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s