(১৫১)

শুরুর দিকে ফিসফাস শুধুমাত্র লেখকের সঙ্গে কি ঘটছে বা না ঘটছে তাই নিয়ে ছিল। তারপর তো এনসাইক্লোপিডিয়া হয়ে গেল। ফিসফাসের লেখক তার পাঠক পাঠিকার সঙ্গে আলপিন থেকে এলিফ্যান্ট, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, মেফিস্টোফিলিস থেকে মশলা ধোসা সবই আলোচনা করে চলেন। আসলে খবরে টিকে থাকতে হবে তো!

সে যাই হোক এখন যে মন্ত্রণালয়ে আছি তা হল বিকলাঙ্গজন সশক্তিকরণ বিভাগ। তা সেখানে হোমও হয় যজ্ঞও। এই তো সে দিন ন্যাশনাল ফিল্ম ডিভিশনের সঙ্গে মিলিয়ে প্রথম বিকলাঙ্গজনের জন্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হয়ে গেল সিরি ফোর্টে। দেশ বিদেশ থেকে ৪০টি পূর্ণ দৈর্ঘ্য, স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচিত্র এবং ডকুমেন্টারি হাজির ছিল। যার মধ্যে বাংলায় কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘ছোটদের ছবি’ও ছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন গুলজার ও সঞ্জনা কাপুর। একজন শ্বেত কপোত আর আর একজন সবুজ প্রান্তরের মতো নীল। কিন্তু সেসব ছেড়ে দিয়ে মন কেড়ে নিল দৃষ্টিবাধিত, মনোবিকৃত ও শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ বাচ্চাদের অনিন্দ্য সুন্দর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

দিবাকর বলে ছেলেটা প্রথম সারেগামাপা লিটল চ্যাম্প-এর পর কোথায় যেন হারিয়ে গেছিল। তাকে আবার পাওয়া গেল। আর পাওয়া গেল, ‘সাইস্বয়ম’, ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর ব্লাইণ্ড আর শেষে অমরজ্যোতি ট্রাস্টের শিশু কিশোরদের হৃদয় রাঙানো পারফরম্যান্স। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল জীবনে বাধা না থাকলে অতিক্রমের সাহস থাকে না!

সামাজিক ন্যায় ও সশক্ততা মন্ত্রণালয়তে আছি বলে কি না জানি না এখন বেশ মাঝে মাঝেই সোশাল এক্সপেরিমেন্ট করতে ইচ্ছে হয়। এই যে দিন চারেক আগে যে দিন বিকলাঙ্গ দিবসে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বিতরণ হল সেদিন চোখে কালো চশমা আর সাদা শার্টে কালো টাই মেরে ডিজাইনার গোটি নিয়ে ছবি দিলাম ফেবুতে। কমেন্টের ঢল নামল। এবং প্রত্যাশিত কমেন্টাবলীই।

কিন্তু আমার ধান্দা ছিল অন্য। গোটির দু পাশের দুটি দাঁড়া কেটে একদম শায়ের শায়ের ভঙ্গিমার দাড়ি রাখা। কাল সকালেই নিউ দিল্লি স্টেশনে যাবার ছিল যে! তা সেই দাড়ি নিয়ে ভোর বেলা সাড়ে ছটায় গিয়ে হাজির হলাম স্টেশন চত্বরে। কাউকে ট্রেনে তুলে দেওয়া ছাড়াও একবার চোখ খুলে দেখা দাড়ি সম্বলিত আমিকে কোন ক্যাটাগরাইজেশনে ফেলা হয় না কি।

তার উপর বিশেষ দাড়ি। যা দেখলেই মুখ থেকে আপনা আপনি উর্দু বেরিয়ে যায় আর মাথার পিছনে ট্যাঁও ট্যাঁও করে সেতার বাজতে থাকে।

গিয়েই দেখলাম ভোরের আলো ফোটার ঠিক মোক্ষম মুহুর্তে শিকার ধরার জন্য একদল টিটিই ঘোরাঘুরি করছে। বিনা বাক্য ব্যয়ে আমি গিয়ে প্ল্যাটফর্ম টিকিট কেটে আনলাম। তারপর যাত্রীকে ঠিক ঠাক ট্রেনে তুলে দিয়ে বেশ ধীর কদমে উঠলাম ওভারব্রীজে। এবং টিটিদের মোটামুটি দূরত্ব থেকে হঠাৎ সোজা তাকিয়ে জোর হাঁটতে আরম্ভ করলাম। যা ভেবেছিলাম, দুই টিটি আমাকে ক্যাঁক করে ধরল, “টিকিট?” আমি বললাম, “আই কার্ড?” ঘাবড়ে গেল। কারণ কালো কোট তো ছিল না। তাও একজন একটু গরম দেখিয়ে বলতে গেল, “কিউ?” আমি অম্লান বদনে বললাম, “কিঁউ কি মুঝে দেখনা হ্যায়!” “আপ হো কোউন?” ‘কোই নেহি, পর দেখনা হ্যায়!”

এটা আর বললাম না, যে সব বেটাকে ছেড়ে দিয়ে দেড়ে ব্যাটাকেই ধরলি কেন মামা? বিশেষ রকমের দাড়ি দেখলেই এক বিশেষ জাতকে মনে হয় না? আর আজকাল তো তার সগ্নে উগ্রপন্থাকে মিশিয়ে দিয়ে দারুণ একটা কক্টেল তৈরী হচ্ছে।

যাই হোক কিছু একটা সমস্যা নিশ্চয় ছিল, তাই তারা একযোগে বলে উঠল, “কোই বাত নেহি যাইয়ে!” আমি তো তখন জিতে গেছি! তাই পকেট থেকে ট্যাঙস করে প্ল্যাটফর্ম টিকিট বার করে দেখিয়ে, “আই কার্ড দিখানে কা জরুরত নেহি” বলে ট্যাং ট্যাং করে হাঁটা দিলাম হতভম্ব মুখগুলোর সামনে দিয়ে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবার পরেও দেখি দিবাস্বপ্নের চটকা তাদের তখনও ভাঙে নি। ভোরের স্বপ্ন তো নাকি সত্যিও হয়। সূর্য তখন ভোরের আলোর জ্যামিতি এঁকে চলেছে একমনে।

12324970_10153784469695763_749557157_n

আসলে, এই সাংস্কৃতিক ভিন্নতা বা অজ্ঞতা সম্পর্কিত ভয়টা শুধুমাত্র ইউরোপীয় দেশগুলিতেই চেপে বসে নি। যেখানে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী রাজধানী ক্ষতবিক্ষত হবার কিছু দিনের মধ্যেই অভিযুক্তের নাম ‘করিম’ (বেঞ্জিমা) হবার জন্য তাঁকে দেশদ্রোহী ঘোষণা করে দেন বিচার শেষ হবার আগেই। সাংস্কৃতিক পরিচয় বাঁচিয়ে রাখা যেমন জরুরী তেমনই জরুরী বহুমাত্রিক সমাজে অপরের পরিচয়কে গুরত্ব দেওয়া বা স্বীকার করা।

এই ধরুন আমরা বাঙালীরা যারা বেশ কিছুকাল যাবৎ প্রবাসে রয়েছি। সন্তান সন্ততি এবং বিশেষ করে নিজের মধ্যে বঙ্গ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা করে যাচ্ছি। শিকড়টাকে ধরে রাখার চেষ্টা। এর সঙ্গে কিন্তু কসমোপলিটানিজম বা আন্তর্জাতিক সার্বিক মতবাদের কোন বিভেদ নেই। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে বহুরূপীও হতে হয় না আবার অন্য রঙ লেগে গেলেও চোখ গেল চোখ গেল করে চিৎকার করার দরকার পড়ে না। অনায়াসে পরিবর্তনকে বুকে করে ধ্বসে যাওয়া থেকে পা বাঁচিয়ে সন্তপর্ণে বেঁচে থাকা যায়। একেবারে দিল্লিরও হতে হবে না আর কোলকাতায় স্বপ্ন হন্টন মারারও দরকার নেই। মধ্যপন্থাটা জরুরী। সেটা কেন জানি না, যারা এক নৌকায় ইতিমধ্যেই সওয়ার তাদের বোঝানো সম্ভব হয় না। তাদের মাল্টিটাস্কিং হৃদয় নয় বোধহয়।

এই যে দেখুন কোলকাতার বিয়েবাড়িগুলোতে, বেবাক ব্ল্যাণ্ড হয়েও ছোলে মশালা, নবরতন কোর্মা বা বেবি নান ঢুকে চলে গেছে। অথচ শুক্তো, মোচা, পাতুরি, ধোকার ডালনা দাদু ঠাকুমার গল্পে বা রেসিপির বইতে ঠাঁই পেয়েছে। বাঙালি আসলে জাত হিসেবে বিশাল এক্সপেরিমেন্টাল। সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্যের ঝোল নিজের গায়ে টানতে লাগবে। অথচ নিজের হেঁশেলে রত্নের অভাব নেই।

অবশ্য দিল্লিতে থাকার জন্য এমনও বাঙালি দেখাও হয়ে গেছে, যারা নিজের রঙ ছেড়ে হরবোলা হয়ে গেছে। মুখে বাংলা সংস্কৃতির বারফট্টাই মেরে নিমন্ত্রণ বাড়িতে সর্ষো কি সাগ আর মক্কে দি রোটি অথবা মালাই কোফতা আর পনীর মশালা দিয়ে কাজ সারে। একদম উত্তরভারতীয় আন্দাজ। বাড়িতে বা বাইরে চিকেনের ঠ্যাং ভেঙে ভিতরের রস সুররর সুররর করে টানবে কিন্তু অনুষ্ঠানে বিড়াল তপস্বী সাত্বিক সাজ। কে জানে, ছেলেপুলেগুলোর জন্য আমরা কি রেখে যাচ্ছি? হায় হায় না বাই বাই?

ওহ পনির বলতে মনে হল একটা ইন্টারভিউয়ের কথা। যেখানে এক আন্তর্জাতিক গোয়ানিজ শেফ পনীরকে ভারতীয় নিরামিষ খাবারের অভিশাপ বলে বর্ণনা করেছেন। পনীরকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বিভিন্নতাকে ভুলতে বসেছি আমরা। একটা কুমড়োর ছোকা বা শুক্তনি বা কচু শাক বা অন্যভাবে দেখতে গেলে ধোকলা, উপমা, সম্বরের মাহাত্ব্য গেছে যমুনায় ভেসে। আর কে না জানে যমুনার জলও যে তলানিতে ঠেকেছে।

Paneer-1000

3 thoughts on “(১৫১)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s