(১৫২)

ছেলে বড় হয়ে গেলে মায়েদের সঙ্গে সম্পর্কটা বদলে ফেলা দরকার হয়। আজকের পরমাণু পরিবারের মার স্বপ্নভঙ্গের জীবনে একমাত্র স্বপ্নের নাম হয় ছেলে। তা সে ছেলে যখন মায়ের আঁচল ছেড়ে সংসারে পা রাখে কড়ায় গণ্ডায় হিসাব বুঝে নিতে। মায়ের হৃদয়ের মড়মড়ানি যেন মরমিয়া ধুনে বাজে। সমাজ সংসার তখন তুচ্ছ হয়ে যায়। দুরদর্শিতা মুছে যায় অপত্য স্নেহের আদলে।

কোলকাতা আর আমার সম্পর্কটাও ঠিক যেন এই রকম। কোলকাতা ছেড়ে ষোল বছরের উপর হয়ে গেল পাকাপাকি দিল্লিতে মন বসিয়েছি, কিন্তু কাজে অকাজে সুতোর টানে ঠিক ফিরে যেতে হয়। মনটাও দেখি কুড় কুড় করে লেজ গুটিয়ে সঙ্গ নেয়। শহর কোলকাতার সঙ্গে আমার বাঙালিয়ানা জড়িয়ে নেই। বরং বাঙালির কোলকাতা সর্বস্বতা দেখলে আমার টিউবলাইটের চোকে স্পার্ক মারতে থাকে! বাংলা শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি তারকাটার সীমানা পেরিয়ে ওপার বাংলা হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে তবুও কোলকাতার বাঙালিরই নার্শিসাসি লক্ষণ যাবার নয়!

তবুও কেন জানি না ফিরে যেতে হয়, বার বার! কদিন আগেই যেমন পিয়ারলেস হাসপাতালের কাছে পরিপূর্ণতা হাফওয়ে হোম পরিদর্শনে যেতে হল। মানসিক অপারগতা পেরিয়ে সমাজের বুকে ফিরে যাবার জন্য তৈরী মেয়েদের মাঝপথের বিরামঘর, জীবনের মোগলসরাই! দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ পেরিয়ে যোগ বিয়োগের অঙ্কে উৎরে যাবার স্থান। তবুও কেন জানি না সমাজ মেনে নিতে পারে না! যেমন পারে না জেল খাটা আসামিকে ফিরে আসার পথ বাতলাতে। কিছু কিছু কথা ভাষা পেয়ে গান হয়ে ওঠে আর কিছু কিছু প্রাণ সমাজচ্যুতির ভেঙে যাওয়া আয়না জোড়া না লাগাতে পেরে থেকে যায় ছায়াহীন হয়ে।

উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা বছর বাইশের সাফিনা আমার দিকে আকুল নয়নে প্রশ্ন করে, “আঙ্কল, ইয়াঁহ রহনে দেগা না মুঝে? দো ভাই হ্যায়। ঘর সে নিকাল দিয়া আঙ্কল, পাগলি হুঁ না ম্যায়!” মাথায় হাত বোলানো ছাড়া মুখের ভাষা খুঁজে পাওয়ার মত আতস কাঁচ পাই না তখন।

পরিপূর্ণতা পাক সকলে

পরিপূর্ণতা পাক সকলে


বিষণ্ণতা নিয়ে শহর কলকাতা খুঁড়ে ফেলি চেনামুখের খোঁজে। নতুন পুরনো মুখ নিয়ে শহরটা আবার আমায় আগলে ধরে।

সময় কাটতে থাকে, কলের যন্ত্রের মতো ধীরে ধীরে। বাস্তবে ফিরে আসতে হয় নিজে থেকেই! সন্ধ্যায় যাবার ছিল এক বিয়েবাড়ির ভোজে! আর তার আগে আমার নতুন পূজার মন্দির, কলেজ স্ট্রীট। বিয়ের ধুতি পাঞ্জাবী পরেই হাজির হলাম কাজ সারলাম কলেজ স্ট্রীটের। কিন্তু তারপর আর ট্যাক্সি পাই না!

এই এক ব্যামো হয়েছে বটে শহরের! আগের দিন রাতে আমার চেন্নাই প্রবাসী পিসতুতো দাদা, ট্যাক্সি না পেয়ে প্রায় আধ ঘন্টা অপেক্ষা করে হেঁটে গিরিশ পার্ক গিয়ে একটা অটোকে একশো টাকা দিয়ে কোন রকমে হাওড়া পৌঁছেছিলেন। আমি যাব টালা পার্কে কিন্তু নো ট্যাক্সি! সবাই উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে চলেছে। যাত্রীর গন্তব্যে নয়, যাত্রীকে নিজের মতো করে মানিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে! হলুদ আর সাদা ট্যাক্সিগুলোর গায়ে ‘নো রিফিউজাল’ লেখাটা কেমন জোকারের মতো জিভ বার করে ভেঙচি কেটে চলেছে যেন।

শেষে ধুতি পাঞ্জাবী আর বিদ্যাসাগরী চটি পরে আর জি কর অবধি হেঁটে শেষে একটা ফাঁকা বাসে উঠে টালা পার্কে নেমে বিয়েবাড়িতে মুখ দেখালাম! আহ বিয়ে বাড়ি আর বাহ বিয়ে বাড়ি!

কি বলব প্রবাসীদের দুঃখ! প্রবাসী বাঙালী গিরগিটির মতো আজকাল ছোলে চাওল, নবরতন কোর্মা আর লাউয়ের কোফতায় হাত গন্ধ করছে! বাঙালী খুব সহজেই মানিয়ে নিতে পারে বটে, তবে তা নিজের আত্মপরিচয় গচ্ছিত রেখে হলেই মুশকিল। উত্তরভারতীয় আগ্রাসনে মাথা নত তো কোলকাতার বিয়েগুলোও করতে লেগেছে, সেখানেও দেখি বর্ণহীন পনিরের চৌখুপি চেকনাই।

আহা নিরামিষেও কি বাঙালির তুলনাহীনতা ছিল না? ধোকা আর শুক্তো, কাঁকরোল বড়া আর মোচা, পালং ঘণ্ট আর ছানার ডালনা! সব তো বুড়ি গঙ্গার জলে ভেসে গেছে যেন। রাধাবল্লভী আর ছোলার ডালের জায়গা নিয়েছে কম্বলের মতো ভাটুরে আর ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা কৃষ্ণবর্ণের ছোলে। মনের মধ্যে আশা রাখি, কোথাও কোন খানে নিশ্চয় কোন না কোন বিপ্লবী মায়ের কোলে, বাবার চওড়া বুকে রন্ধ্রণ বিপ্লবী বাঙালী বেড়ে উঠছে। সুনামির মত ঠিক সময়ে আছড়ে পড়বে।

তবে যে বিয়ে বাড়িটা গেলাম সেখানে তো মাসাল্লাহ আয়োজন! ছোট্ট অথচ বুকে ধাক্কা মারা ব্যঞ্জন! একটা মাছের কচুরি দিয়ে নামমাত্র আলুরদম সাবড়ে দিয়েই ঝটকা খেলাম! খেলে যাহ! এ কেউ একটা খায় নাকি? তারপর আবার অধুনালুপ্ত ব্রেস্ট কাটলেট আর পাঁঠার কষা! কচুরি তু ফুচকা বন যা গুরু! আর ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ পেটের ভিতরে সেঁধিয়ে যা! তারপর আবার গুড়ের রসমালাই আর তপ্ত মাখা সন্দেশে নলেন গুড়ের টাকনা! আহা কি বোর্ডটা মোছার জন্য কাপড়টা কোথা গেল যে কে জানে! গৃহস্বামীকে বললাম, “সেই আমার নিজের বিয়েতে খেয়েছিলাম আর এই তোমার মেয়ের বিয়েতে খাচ্ছি! নিজের বিবাহবার্ষিকীটাও ফটাফট করে ফেল! আর ডেকে দিও!”

কোলকাতায় আসা সার্থক করে বিয়েবাড়িটা বিদায় নিল সময়ের চাদরে। হালকা আমেজে বন্ধুর বাইকে বসে আসার সময় পালটে যাওয়া শহরটাকে শুষে নিলাম আবার যতটা পারা যায়! পরের দিন সকালেই ফিরে আসার পালা। আহা ভাল থেকো কোলকাতা! পালটে যাওয়া সমীকরণে ভাল থেকো!

গুগল থেকে নেওয়া

গুগল থেকে নেওয়া


প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ আমার মেয়েটি এখন বহুত বকতে শিখেছে। ফটর ফটর করে গান গাইছে! সে বাতাসাকে বলে ‘বাতাস’, লেবুকে বলে ‘টকটক’। নিজেই সেদিন শুনে শুনে গাইতে লেগেছে, “আলোবাতাস পেলাম শুধু আলোবাতাস বুজলাম না! (ভালোবাসা)” আর গাইতে গাইতেই চেঁচিয়ে উঠেছে, “বাতাস কাবে, মুই দিয়ে বাতাস কাবে!” আর আগের দিন সুকুমার রায় এসেছিল তার মুখে, “আকাশের গায়ে নাকি টক টক গন্ধ!” আর যায় কোথা! গাড়ি চালাতে চালাতেই খোঁজ নিতে হল বাড়িতে ফ্রিজে লেবু আছে কি না! উফ! বাতাস ইয়ে ইয়ে মানে হাওয়া আনে দে!

3 thoughts on “(১৫২)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s