(১৫৩)

পাঠক/ পাঠিকারা, বুইলেন, আইডিয়ালি এই পোস্টটা চলে আসার কথা ছিল সেই ৪ঠা জানুয়ারিতেই। কিন্তু এখন মাথায় পাকাচুলের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ধৈর্যও বেড়েছে বটে। তাই মনে হয়েছিল, আগে শেষ দেখি তারপর না হয়…

তা সেই জানুয়ারিস্য প্রথম প্রভাতে অচেনা দিল্লির কনকনানোহীন ঠাণ্ডার মধ্যে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েই চমকে গেলাম। আরে ওয়াহ এ রাস্তা তো চিনি না বাপ। ছ্যার ছ্যার করে ফোর্থ গিয়ার ফিফথ গিয়ারে গাড়ি গড়াচ্ছে। ফার্স্ট গ্রিয়ার, ক্লাচ, ব্রেক-এর জটিল সমাস নেই। নেই সময়ে অফিস পৌঁছোবার দফারফা অবস্থা। কি ব্যাপার? না অরবিন্দ কেজরিওয়াল বাবু দিল্লিতে ডিক্লেয়ার করেছেন যে বায়ুদূষণ কমাবার জন্য জোড় বিজোড়ের অঙ্ক কষে গাড়ি নামাতে হবে।
জোড়ের দিনে জোড়ের গাড়ি আর বিজোড়ের দিনে বিজোড়। আর অন্য দিনে? বাকি সব মেরে পিছে আও! মানে জোড় না থাকলে জোড়ের দিনে আস্তে লেডিজ! মেট্রো আর বাস আছে! স্কুল বন্ধ তো স্কুল বাস আছে! ধোঁয়া ওঠা সকালে ধোঁয়া ওঠা এক্সহস্টে তা দিয়ে বাড়তি দাম চাওয়া অটো আছে! কিন্তু নিজের গাড়ি নেই!

তা মেট্রো বা বাস তো আছে নিজের জায়গায়! কিন্তু লোক ঠাসার বহরের তো শেষ নেই! একদিন বিকেলে বউকে গোবিন্দপুরি মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে দিতে গিয়ে দেখি সিঁড়ি দিয়ে লাইন চালু হয়েছে। থাক বাবা! তুমি অটোতেই যাও! বেশি টাকা চাইলেও যাও! নইলে যদি জোড় বিজোড়ের চক্করে বউটাই হারিয়ে যায়? কেলেঙ্কারির শেষ থাকবা না!

যাই হোক। খিল্লি বন্ধ হোক! মূল মুদ্দায় ফিরে আসি! আসল কথা হল দূষণ বা পলিউশন! সেটা কি ভাবে কমানো যায়? বায়ু দূষণ, জল দূষণ, শব্দ দূষণ, আলোক দূষণ। সমস্ত কিছুর চক্করে আমরা তো কোন রকমে টেনেটুনে ম্যানেজ ট্যানেজ করে শেষের সেই দিনটাকে ইলাস্টিকের মতো টানটান করে রেখে দিয়েছি। কিন্তু তারপর? আমাদের সন্তান সন্ততিরা? তাদের পর? বা আরও তাদের পর? দুঃখিত পাঠক পাঠিকারা, আরও তাদের পরটা সত্যিই ঝাপ্সা! এই পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করার বদলে আমরা উত্তরাধিকারে রেখে যাব ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ফুসফুস আর আনুষাঙ্গিক রোগের ডিপোগুলোকে। আকাশটাই তো ছোট করে দিচ্ছি! তাহলে আর উড়বে কোন সাহসে তারা?

তো যাই হোক, হুড়মুড়ি প্রতিক্রিয়া (নি জার্ক রিঅ্যাকশন আর কি) বলে অরবিন্দ বাবুকে যতই হ্যাটা করি না কেন, কোন না কোন ভাবে আমাদেরও কিন্তু ভাবতে হবে এই বিষয়ে। মনে আছে সিএনজি বাস করার জন্য শীলা দীক্ষিতকে কতটা বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। সেই তুলনায় আজ পরিস্থিতি অনেক বেশি ঘোরালো! নিঃশ্বাসে বিষ ঢুকে ফুসফুস হৃদয় ফুটিফাটা করে দিচ্ছে।

কিন্তু দিল্লির মানুষও তো পাল্টেছে! গতবছরেই রেকর্ড মার্জিনে (আমার এখনও যেন বিশ্বাস হয় না!) কেজরিকে জিতিয়ে এনেছে, চোখে রঙিন চশমা পরে। আর নিত্ত নৈমিত্তিক নাটকগুলিকেও বড়ভাইয়ের স্নেহ নিয়ে সহ্য করছে। কেন? কেন না পরিবর্তন সবাই চায়! সময় সবাই চায়! একটু অন্য ভাবে পৃথিবীটাকে দেখার! তাই তো সিংহভাগ সফরকারী বিনাবাক্যব্যয়ে নিয়ম মেনে পথে নেমেছে! আর যারা মানছে না? বাবু ২০০০ টাকা গ্যাঁট গচ্চা দিয়ে গাড়ি চালাও! তা দিল্লির মানুষের কাছে টাকার অভাব নাকি? ধুস ২০০০ তো কড়ে আঙুলের ময়লারও সমান নয়!

কিন্তু যাদের দেবার ক্ষমতা নেই? এই যেমন আমি! প্রায় দেড় বছর পর লজঝড়ে বাইকটাকে সার্ভিস করিয়ে চকচকে করিয়ে মাঠে নেমেছি! আরিত্তারা কি তার অভিমান! কি তার আওয়াজ! চেন তো ঘটাং ঘটাং করছেই গিয়ার চেঞ্জ করতে গিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করছে হ্যান্ডেল ঠন ঠন দাঁত কনকন! কিন্তু বয়সটাও যেন এক ঝটকায় কমে গেল দশ বছর! বাইক চেপে জ্যাকেট পরে সানগ্লাস চাপিয়ে শীতের সকালে অফিস তো মুড়কি চিবোবার আগেই পৌঁছে যাচ্ছি। তার উপর মানানসই ঠাণ্ডাও পড়ে নি তেমন। আর পায় কে! তবে যেতে যেতে দেখলাম বাসস্ট্যাণ্ডে মানুষের ঢল রাস্তায় নেমে আসছে আর মেট্রোগুলোর কথা তো কহতব্য নয়!

তবে যে ঘটনাটা না বললেই নয় সেটা হল এক বামা গাড়ির ডানদিকে বসে জোড়ের দিন বিজোড় গাড়ি চালাচ্ছেন আর বাম দিকে এক বামাপদ! তা পুলিশের ব্যারিকেড আসতেই সে বামাপদ নিচু হয়ে সিটের নিচে সেঁধিয়ে গেল। আর মামণি দিব্যি মহিলা ড্রাইভারের সুবন্দোবস্ত নিয়ে গলে বেরিয়ে গেলেন! সিরিয়াসলি বলছি! নিয়ম থাকে তার ফাঁক ফোকর থাকে! ট্রেন বা সিনেমাহলে মহিলাদের অনেক পুরুষই এগিয়ে দেয় যাতে তারা গিয়ে টুক করে লাইন ভেঙে টিকিটখানি কেটে ফেলতে পারে! কিন্তু এ চীজ জিন্দেগিতে দেখতে পেতাম না যদি না অড ইভেনের এই উর্বর ধারণা দশাবতারের মস্তিষ্কে ধারণ না করতেন।

তার মাঝে কে আবার কোর্টে কেস ঠুকে দিয়েছে! এখন তো জনস্বার্থ মামলার হিড়িক পড়ে গেছে! ধোনির ভারত হারলেও জনস্বার্থ আর পাবলিক প্যাঁদালেও জনস্বার্থ! তা কোর্ট বাবাজিও জিজ্ঞাসা করলেন হ্যাঁ ভাই দূষণ বেড়েছে না কমেছে? একদম ইঞ্চিটেপ দিয়ে মাপতে হচ্ছে! হাফ ইঞ্চি বাড়লেও হই হই আর তিন ইঞ্চি কমলে তো কথাই নেই! লোকে মিষ্টি বিলোচ্ছে! কে যে ঠিক আর কে যে ভুল ছাতা বুঝতে বুঝতেই পনেরো দিন কেটে চলে গেল।

প্রথম দিন রাস্তা দিয়ে বিজোড় সংখ্যার গাড়ি চালাতে গিয়ে দেখলাম জোড় সংখ্যার গাড়িগুলো সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাবিয়ে চেয়ে দেখছে। সেই গল্পটা মনে পড়ে গেল! বাজে গল্প যদিও মানে জঙ্গলে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে জননাঙ্গ জমা রাখা হচ্ছে ব্যাঙ্কে পাঁচ বছরের জন্য টোকেনের বিনিময়ে। মনখারাপ নিয়ে এক বাঁদর হেঁটে যাচ্ছিল মাথা হেঁট করে। উপরে তাকিয়ে দেখে তিন চারটে বাঁদরী খিকখিক করে হাসছে। সে বাঁদর বলল, “এখন যত ইচ্ছে হেসে নে! আমি একটা হাতির টোকেন ঝেড়ে রেখে দিয়েছি!” ছিঃ বাজে কথা শুনবেন না, বলবেন না! দেখবেনও না!

নির্মল হাওয়ায় শ্বাস নিতে গিয়ে ঠিক ভরসা করতে পারলাম না যদিও! বাইক আর অটো আর ট্রাকের ধোঁয়া তো আগের মতই আছে! তবে পথ মাতার উপর বোঝা কমে গিয়েছে কদিনের জন্য! আর আবহাওয়াটাও বদলে গেল যেন, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মনোরম হেমন্তের পরিবেশ! ঠাণ্ডা পড়ল, জোড় বিজোড়ের রিপোর্ট কার্ড পেরিয়ে। তাও বেশি দিনের জন্য না! এই আসি এই যাই শীত, হঠাৎ গরম, ভুষভুষে ঘাম! দিল্লির আবহাওয়াটা পাল্টে যাওয়া বন্ধুর মতই অচেনা হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে!

তবুও আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি ক্ষতি কি! স্বপ্ন দেখতে তো ক্ষতি নেই! তবে একটু ভাবনা চিন্তা করে দেখা ভালো!। স্বপ্ন দেখি, দিল্লির চারপাশ দিয়ে বাইপাস তৈরী হয়েছে আর ধূলিধূসর ট্রাকগুলো শহরের বায়ু দূষিত না করে সেই রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে। ডিজেল প্যাসেঞ্জার গাড়ি ব্যান হয়ে গেছে। সরকার থেকে হাইব্রিড আর সিএনজি গাড়ির উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে! নিয়মিত দূষণ পরীক্ষা হচ্ছে! আর মানুষ জন নিজে থেকে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে, পৃথিবীর আয়ু বাড়াবার জন্য! আসলে উত্তরাধিকারের মধ্যে দিয়েই তো আমরা বেঁচে থাকি! আর এই সুন্দর পৃথিবীটা ছেড়ে যাব কোথায় বলুন তো! উত্তরাধিকারীরা তো এই পৃথিবীতেই খেলে পড়ে বড় হচ্ছে! চাঁদে বা মহাকাশে কলোনি তো এখনও ডিস্ট্যান্স ড্রিম!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ উত্তরাধিকারী বলতেই মনে হল ছোটটার কথা! সে আজকাল বহুত ফটর ফটর করে! ঘুমোতে গিয়ে গান শোনার ফরমাশ! তার মা তাকে চাপড়ে ঘুম পাড়াচ্ছে! আর সে নিয়মিত ফরমাস করে যাচ্ছে, ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে’ গাও! ‘আয় আয় ঘুম’ গাও! ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ গাও! ঘুমের তো আটকলা! তা এই সময় দরজা খুলে আমি প্রবেশ করেছি! সে মায়ের কোলে শুয়েই একবার উঁকি মেরে দেখে নিল বাবা ঢুকেছে! বলে উঠলঃ “ও বাবা! এচো! একটা ভাল গান হচ্চে!” পাগলা ঘুমোবি যদি, ঢেঁকুর তুলবি কেমনে!!!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s