(১৫৪)


কয়েকদিন আগেই টম হ্যাঙ্কসের হোস্টেজ ড্রামা ক্যাপ্টেন ফিলিপ দেখছিলাম। ভারত মহাসাগরে সোমালিয় জলদস্যুদের কবলে পড়ে ক্যাপ্টেন ফিলিপ্স ও তার জাহাজ। তার পর তার থেকে কিভাবে মুক্তি পায় ইত্যাদি! অসম্ভব সুন্দর অভিনয়ে যেন চোখের সামনে ঘটে চলেছে ঘটনাগুলি। তার শেষ দৃশ্য ছিল মুক্তি পাবার পরেও ট্রমাকবলিত টম হ্যাঙ্কসের অনবদ্য অভিনয়। সহজ থাকার চেষ্টা করেও পারছেন না! ট্রমা বা আতঙ্ক! যদিও ট্রমার বৃহত্তর অর্থ বাংলা ভাষায় বোঝানো সম্ভব হয় না! তবু দুর্ঘটনা বা অঘটন সম্পর্কিত ট্রমা আমরা বৈদ্যুতিন মাধ্যমের দৌলতে অহরহ দেখতে পাচ্ছি! দুর্ঘটনা কবলিত প্রিয়জন হারানো রাজধানীর যাত্রীর মুখ থেকে টিভি সাংবাদিকদের দৌলতে তাৎক্ষনিক অনুভূতিও জেনে নিতে পারছি। জানতে পারছি, পেটের দায়ে মানুষের জন্তু হয়ে যাবার, অসংবেদনশীল হয়ে যাবার গল্পও।

পাঠক/ পাঠিকারা, নিজের ঢাক পেটানোর মতো চওড়া বুক যে একেবারেই নেই তা বলব না। কিন্তু মধ্যবিত্ত মানসিকতায় চক্ষুলজ্জাটা কোথাও যেন এখনো আলগা ব্যাণ্ডএইডের মতো ঝুলে রয়েছে। তাই ভেবেছিলাম চেপে যাব। কিন্তু ফিসফাস তো আপনাদের আর আমার মধ্যে সুগম চলাচলের পথ। প্রিয়জনকে আমার নিজের মনের ভাব বোঝাবার সহজ মাধ্যম। যেখানে একান্ত ব্যক্তিগত এবং এহবাহ্য অভিজ্ঞতাগুলি ছাড়া সবই ভাগ করে নেওয়া হয়। পর্দা নেই কোন। তাই খুলে বলতে এলাম আর গৌরচন্দ্রিকা করলাম।

বছর দশেক আগে এক মে মাসের সকালে অফিস যাবার পথে এক পেট্রোল পাম্পের সামনে সদ্য ফেলে যাওয়া পেট্রোলে হড়কে গিয়ে ভয়ানক দুর্ঘটনায় পা উলটে পড়ে হাঁটুর সাড়ে চৌদ্দটা বাজিয়ে ফেলেছিলাম। তখন এক সহৃদয় ব্যবসায়ী আমায় গাড়িতে তুলে শক্করপুরের নিজের দোকানে নিয়ে গিয়ে কোল্ড ড্রিংক্স আর বিস্কুট খাইয়ে পেনকিলার খাইয়ে তারপর কোলে করে সেকেন্ড ফ্লোরে তুলে দিয়ে যান। সেই কথা ভুলি কেমন করে?

তার আগে বা পরেও কেমন করে জানি না, অযাচিত সাহায্য এই মানুষজনের কাছ থেকেই পেয়ে এসেছি। যাদের স্বার্থপরতার কথা আজ সর্বজনবিদিত। আমিও যে সম্মুখীন হই নি তা নয়। এই যেমন ধরুন, উলটো দিক থেকে এক রিক্সা এসে আমার গাড়িতে মেরে উলটে পড়ে যায় পাসে রাখা এক হণ্ডা সিটির উপর, তাতে সামান্য টাল খেয়ে যায় আর আমার গাড়ির হেডলাইট ভেঙে যায়। কিন্তু হণ্ডা সিটির মালিক আমার কাছ থেকে, সাড়ে চারশ (সারাবার খরচ) আদায় করে ছাড়ে। অথবা সেই দশ বছরের পুরনো চোটে আবার লাগার পরে অনুরোধ করা সত্ত্বেও কেউ স্কুটার চালু করে দিতে রাজী না হওয়ায় (তার মাস দুয়েক পরেই), প্রবল বৃষ্টির মধ্যে হ্যান্ড ব্রেকের সাহায্যে পা সোজা রেখে প্রচণ্ড ভিজতে ভিজতে বাড়ি এসে মনের শেষ জোরের বিন্দুটুকু দিয়ে গাড়ি স্ট্যান্ড করে হামাগুড়ি দিয়ে দুতলা চড়ার সময় কাউকে না পাওয়া! কিন্তু সে গুলো তো মামুলি ব্যাপার। এমনিতে কিন্তু উপরওলা বা সহযাত্রীদের কেউ না কেউ কখনো না কখনো সাহায্য করতে উপস্থিত হয়েইছে।

তা আমার সুযোগ এলে কি বিবাগী বৈরাগীর মতো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যাব? নাকি বিপদ বাঁধা দূরে ফেলে ঝড়ের রাতে দামোদরে ঝাঁপিয়ে পড়ব? স্যার হিরো হতে পারব না! কিন্তু মানুষ হওয়া থেকে কে আটকাবে!

দিল্লিতে জম্পেশ ঠাণ্ডা এদ্দিন পরে পড়েছে। না হলে চুল না ভিজিয়েই শীত সাঁতরে পাড়ে উঠে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ কি মনে হওয়ায় মাঝ দরিয়ায় ডুব দিয়েছে। ভালই হয়েছে! শীতকালে শীত না পড়লে তো গরমকালে গরমের চোটে চামড়া খুলে যাবার জোগাড় হবে। তা সক্কাল সক্কাল অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি, থার্মোমিটারের পারদ বলছে সাড়ে তিন। গাজীপুরের মোড়টা ঘুরতেই দেখি জটলা, পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখি একটা লোক সটান মাটিতে লম্বা হয়ে আছে আর বাকি পথচিকিতসকরা তার নিরীক্ষণ করে চলেছে। গাড়িটা থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, একজন এগিয়ে এসে বলল, “আগর হো সকে তো মদত কর দো!” মদত কর দো মানে? আমাদের জীবনই তো পরের জন্য উচ্ছুজ্ঞ করা হয়েছে। আহা এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে? গাড়ি খুলে দিলাম, বললাম কাউকে কিন্তু বসতে হবে সঙ্গে! ওবাবা যে ছেলেটির বাইকে সেই পড়ে থাকা লোকটির সাইকেল ঠোকাঠুকি হয়েছে তাকে ধরে বেঁধে লোকে এগিয়ে দিল। সে তো দেখি ভয়েই সিঁটিয়ে আছে। “জান বুঝকে নেহি মারা! উনহোনেই আগে চলে আয়ে মেরে উপর!” বিশ্বাসযোগ্য বয়ান বটে। কিন্তু একে নিয়ে তো যাওয়া যাবে না! যদি কেটে পড়ে?

অবশ্য কেটে পড়ার হলে সে আগেই পড়ত। তা না করে এগিয়ে এসে বাঁশ নিজেই নিয়েছে! অতএব উটকে কাঁটা বেছে খাওয়ানোর দায়িত্বও তো আমার উপর! ততক্ষণে ১০০-য় ফোন করায় পিসিআর ভ্যান চলে এসেছে। তা তার মধ্যে থেকে একজনকে বললাম যে আমার গাড়িতে বসে মুমুর্ষুর মাথা সোজা করে ধরে থাকতে। তিনি এদিকে হাঁটতে না পারলেও লোকজন জবরদস্তি করে মাথা চেপে হাঁটু টিপে ধরে প্যাকেট করে ঢুকিয়ে দিয়েছে পিছনের সিটে। কিন্তু নাক দিয়ে রক্তর আভা যেন? পিসিআরের পিছনে পিছনে গাড়ি চলতে লাগল। কিছু দূরেই কল্যাণপুরিতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হাসপাতাল। তার ট্রমা সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি স্ট্রেচার আছে কিন্তু ঠেলে আনার কেউ নেই! অগত্যা দুজন পুলিশ আর বাইক চালকের মদতে আহতকে স্ট্রেচারে বসানোর চেষ্টা শুরু হল। ভদ্রলোকের অর্ধেক জ্ঞান হয়েছে। কিছুতেই তিনি নামবেন না গাড়ি থেকে। এদিক দিয়ে নামাতে যাই তো ওদিকে চলে যায় আর ওদিকে গেলে এদিকে! শেষে দুটো তাগড়া কেঁদো বাঘা পুলিশ (দুটোরই বাড়ি কালিকট! আজব কেস! সুদূর কেরালা থেকে দিল্লি এসে দিল্লি পুলিশের চাকরি করছে! যেন কালিকটে কাটাকাটি হয়ই না!) তাকে টেনে নামিয়ে হাঁটিয়ে নিয়েই ভিতরে চলে গেল। তার পিছন পিছন আমি আর বাইক আরোহী গেল।

বাইক আরোহীর নিজেরও চোট লেগেছে। কিন্তু সে পুলিশ কেসের ভয়েই আধমরা! আমি অভয় দিলাম! “আছি তো!” যাই হোক ভিতরে আরেক কেস। ট্রমা সেন্টারে মধ্যে আমরা কেস লেখাচ্ছি আর তার মধ্যেই এক কনস্টেবল একটি কিঞ্চিত অপ্রকৃতস্থ চ্যাংড়াকে ফটাফট থাপ্পড় মেরে চিৎকার করে বলছে, “আবে ইয়ে হসপিটাল হ্যায়! তু চুপ হো যা! নেহি তো মারা যায়গা!” কি অদ্ভুত সমাপতন।

যাই হোক আহতের পকেট থেকে আমার উপস্থিতিতে পুলিশ পকেটমারি করে মোবাইল পার্স এগারোশো টাকা আর আইকার্ড বার করল। এনডিএমসিতে চাকুরী করেন হন্সরাজ রাই। বাড়ি নাকি কাছেই খেড়া গ্রামে! মোবাইল ঘেঁটে ছেলে বা কাউকে একটা ফোন করা হল। তুলল না কেউ! তারপর নম্বর ঘেঁটে মনুকি মাম্মি কে ফোন করে বোঝালাম কেসটা! বারবার বলতে হল এমন কিচ্ছু হয় নি! এদিকে বাইক চালক পঙ্কজেরও মাথা ঘুরতে লেগেছে! তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা করে দেওয়া হল। আবার ফোন এল! এবার মনুর ফোন! তাকে পরিষ্কার করে বলতেই সে একগাদা ধন্যবাদ দিল!

ওদিকে থাপ্পড় খাওয়া চ্যাংড়াটা মিনমিন করে বলার চেষ্টা করছে যে সে গান্ধীবাবার শিষ্য! মারধর তো দূরের কথা কোনদিন অসাবধানে পিঁপড়ে চাপাও দেয় নি! কিন্তু তার বিপরীত দিকের লোকটা তার ভাঙা চশমা আর ফুলে যাওয়া গাল নিয়ে তার বক্তব্যের অসাড়তা প্রমাণ করতে তৎপর। কে যে ট্রমাগ্রস্ত তাই বোঝা মুশকিল।

যাই হোক পুলিশকে নিজের নম্বর, পঙ্কজকে বরাভয় এবং মনুকে আশ্বাস দিয়ে অফিস পৌঁছলাম। মনের ভিতর কোথাও একটা চাপা আনন্দ কাজ করছিল। ভাল কিছু করার আনন্দ! ভেবেছিলাম নিজের মনেই চেপে যাব!

কিন্তু তা হতে দিল না খান সাতেক ফোন। তিনটে ফোন এল মনুর কাছ থেকে। প্রথমে জানতে চাইল কি ভাবে দুর্ঘটনা ঘটল! বাইকওলার দোষ ছিল কি না! বাইকওলা কি পালিয়ে গেছে? হন্সরাজ ইতিমধ্যেই বড় হসপিটালে চলে গেছেন। তাঁর মাথায় আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং বিপদসীমার বাইরে নয়! হাঁটাচলা চেনাশোনা সব হচ্ছে কিন্তু কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে।

শেষে আমায় মনু ফোন করে জিজ্ঞাসা করল বাবার ফোন এবং অন্যান্য জিনিসের কথা! পুলিশের কাছ থেকে কি ভাবে উদ্ধার (?) করা যাবে! আর পুলিশ সেখানে টাকা পয়সা দাবী করবে কি না! তাকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে আমি আছি! কিছু হলে আমি আছি!

এর পর এলো পঙ্কজের ফোন। তাকে ছাড়তে ছাড়তে বিকেল করে দিয়েছে! তার তাও ভয় রয়েছে! কেস খেয়ে যাবার ভয়! তাকেও আশ্বস্ত করলাম! শেষে তার ভিতরকার মনুষ্যত্বের ঝলক দেখলাম মনুর নম্বর চাইবার মধ্যে! নাকি মনুকে আগে থেকে ম্যানেজ করতে চাইছে? যাই হোক মনুকে আমি ইতিমধ্যেই বলেছি কারুর দোষ নয় আগে বাবাকে বাঁচাও! একেও বললাম! পুলিশ ফোন করলে তো আমি আছিই!

তা পুলিশ ফোন করল, খুব রোয়াব নিয়ে শুরু করলেও আমার অবিচল এবং শান্ত গলায় হয়তো কিছুটা অন্যরকম মনে হয়েছিল। শেষ করল খুব সম্ভ্রম নিয়ে! “স্যার জরুরত পড়েগি তো হাম দুবারা আপ কো কষ্ট দেঙ্গে!” ততক্ষণে নিশ্চিত হয়ে গেছি যে মনুর মানিব্যাগ পেতে আর পঙ্কজের ফালতু কেস না খেতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না!

যাই হোক কোথাও একটু নিজের জন্যও ভাল্লাগা এসে ঘর বাঁধল! তাই লজ্জা লজ্জা মুখে আপনাদের বললাম! তবে আরেকটা কারণও আছে! কোথাও যদি পাঁচ ফুট এগারোর সামান্য ভারী চেহারার একটা মানুষকে লাল গাড়ি বা কালো বাইকে দেখেন যে পথে ঘাটে মাটির গন্ধ নিচ্ছে। দয়া করে এগিয়ে আসবেন! মুখটা তো চেনেনই! না চিনলে নিচে দেখে নিন প্লিজঃ
12557157_1017542314970722_1308047321_o

ওই যে বাম দিকের চোঙা হাতে লোকটা! ঐটাই আর কি!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s