(১৫৬)


পুরাকালের দেবতাদের ফেলে ছড়িয়ে চলাফেরা করার অভ্যাস ছিল। বিশেষত বিষ্ণুর। সতীর মৃত্যুতে শিবের মতিগতি দেখে সন্দিহান হয়ে উনি করলেন কি সতীদেহটিকেই একান্ন অংশে ভাগ করে ফেললেন। আর তারপর এদিক ওদিক ছুঁড়ে টুঁড়ে ফেললেন। ব্যোমভোলা শিব বেচারি বউয়ের বডিপার্ট খুঁজতে খুঁজতেই সব রাগ টাগ ভুলে গেল।

অমৃতভাণ্ড নিয়েও বিষ্ণুবাবু একই কাজ করেছিলেন। ভারত মহাসাগরে দেবতা আর অসুররা মিলে শেষনাগের মুণ্ডু আর লেজ ধরে টানা হ্যাঁচড়া করে অনেক কষ্টে অমৃত উৎপাদন করেছে। আর বিষ্ণুবাবাজীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যে লুকিয়ে লুকিয়ে অমৃতের কলসিটাকে সটান অমর্ত্যলোকে ট্রান্সফার করতে। কিন্তু বাবাজী তো কোন কাজই গুছিয়ে করতে অভ্যস্ত নন! প্রত্যেক যুগে একটা না একটা ঝামেলা বাঁধিয়েছেন। তা সে রাবণই হোক আর দুর্যোধন শকুনি। তাই চার জায়গায় ফেলতে ফুলতে কলসি নিয়ে গিয়ে গ্যারেজ করলেন।

মর্ত্যের মানুষ বরাবরই ন্যালাখ্যাপা! তা সেই সামান্য অমৃতের স্বাদ পেয়েই অমৃত কুম্ভের সন্ধানে শুরু করে দিল খোঁজ প্রয়াস। আর হরিদ্বার আর এলাহাবাদের ত্রিবেণীতে কুম্ভ আর শিপ্রা নদীর তীরে উজ্জ্বয়নীতে এবং গোদাবরী তীরে নাসিকে সিংহ রাশিতে হতে লাগল সিংহস্থ কুম্ভমেলা। নাম মাহাত্ম্য আর স্থানমাহাত্ম্য যাই বলুন। এই স্থানগুলি সাধারণ পর্যটকের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্র। কারণ খুঁজতে গেলে খুব বেশী দূর যেতে হয় না! মানুষ! পুণ্য অর্জন কি আর জল জঙ্গল দেবতায় হয়? সে তো মানুষের হাতেই মানুষেরই বুকেই খুঁজে পাওয়া যায়।

যাই হোক, এবারে ফিসফাসে ফিরে আসা যাক। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ইন্সপেকশনের কাজে মাঝে মাঝেই আমায় আমতলা থেকে বটতলা করতে হয়। এইবারে সুযোগ চলে এসেছিল এলাহাবাদ যাবার। একটা ইন্সপেকশন নোটিস এসেছিল বটে। কিন্তু সে তো কত কিছু আসে যায়। খেয়াল করি নি! ব্যাস এক রাতে হুকুম এলো কালকেই যেতে হবে। খেইচে! আমরা মধ্যবিত্তরা, বেশ হাতপা ছড়িয়ে সংসার করি! বললেই মশক কাঁধে ভিস্তির মত বেরিয়ে পড়তে পারি না! বাক্স প্যাঁটরা সমাজ দায়দায়িত্ব নিয়ে মাকড়সার মতো বাঁচা।

যাই হোক, সক্কাল সক্কাল উড়ে যাবার জন্য তৈরী হলাম। সঙ্গে এলাহাবাদের শুক্লাজি। শহরের ঘাঁট ঘোঁট জানেন বলে তিনিও আমার সঙ্গী হলেন। তা আমাদের জাহাজ হল নাইন্টিন টুয়েন্টির লজঝরে এটিএস। একবার ঢুকেছেন কি দু পা দিয়ে বহিঃপ্রকাশের কোন রকম ইচ্ছা চেপে ঠুসে রেখে দিতে হবে। একটা সবুজ পাতার কানওলা পাঁউরুটি আর আর মিশরীয় মমিদের সঙ্গী চকোলেট কেক দেবে খাবেন তো খান না হলে হাওয়ায় ভেসে যান।

হাওয়ায় ভেসে যাবার কথা বলতে গেলে যে কথাটা প্রথমেই মনে হল সেটা হল ওই প্লেনটা ভাসে কি করে হাওয়ায়? আছে আছে! প্রপেলার আছে! সে তো প্লেনের মুখের থেকেও বড় দুর্গার দশ হাতের মতো। আর লাগানের গোলি-র মতো পাঁই পাঁই করে হাত ঘোরাতে থাকে আর প্লেন লরি হয়ে আকাশে উড়ে যায়। সফর সঙ্গী ছিলেন জেনারেল বক্সি, যিনি কদিন আগেই ন্যাশনাল নিউজ চ্যানেলে সুখেন দাসের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ভাল লোক বোধহয় হবে। সারাক্ষণ ইংরাজিতে কথা বলে গেলেন আর ভারতীয় ব্যবস্থাপনার বাপবাপান্তও। তা যাই হোক। ভাল লোকদের কি আর কথা শুনে বোঝা যায়? দেশের জন্য কেন আমি আমার বউয়ের জন্যও বোধহয় সুখেন দাস হতে পারি না! (আমার কান্নাটা আবার রাজেন্দ্র কুমারের মতো! হেহে)

তা প্লেনটা শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে নামল এলাহাবাদ বিমানবন্দরে। বন্দর কোথায়? এ তো জেটি। ট্যাং ট্যাং করে হেঁটে হেঁটে গিয়ে ঘাটে উঠলাম। আর ব্যাগগুলো আমাদের পিছু পিছু ট্র্যাকটরে করে এসে পৌঁছল তারপর একজন পোর্টার দুহাতে করে দুটো করে ব্যাগ নিয়ে আসছে। আর হরির লুটের মতো সব লাফফ্যে ঝাপ্প্যে নিজের মাল কব্জা করছে। সে একেবারে দেখার মতো ব্যাপার।

ওহ! বক্সী বাবুর জন্য অবশ্য নিজস্ব বাহক ছিল! সে আবার ভারতীয়ই দেখলাম।

তা যাই হোক। সাড়ে তিনশো কম বেশী বয়সের ছেলে মেয়েগুলোর সঙ্গে ঘন্টা দেড়েক আড্ডা মেরে ফিরে এলাম হোটেলে। এই ইন্সপেকশনের এই একটা ভাল দিক আছে। অসাধারণ বাচ্চাগুলোর সঙ্গে সময় কাটানো! আর নিজেকে মানুষ হিসাবে আরও একটু সংবেদনশীল করে তোলা।

আমার সঙ্গের শুক্লাজি অবশ্য একটুতেই উত্তেজিত। ইন্সপেকশনের সময় হুড়ুৎ করে হাউঁমাউ প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন। আর ছেলে মেয়েগুলো ঘাবড়ে গেছে। আমি ওনাকে বুঝিয়ে বললামও! আস্তে লেডিজ! বাচ্চাদের পড়াশুনো জানার জন্য শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রশ্ন করুন! তাও শান্তস্বরে। সম্মানহানী কখনই নয়! হাজার হোক ১৯২৯ থেকে চলে আসা রেপুটেড স্কুল বলে কথা।
রাত্রে খাবার টেবিলেও অর্ডার দেবার পর পুড়ুক করে উঠে পড়লেন ওঁর পরিচিত কেউ ওঁর সঙ্গে এসেছে দেখা করতে বলে! আর আমি চিকেন টিক্কা একাই সাবড়ালাম!

যাই হোক, এ তো গেল কেজো কথা! কিন্তু আসুন এই অভিযানের অন্য পর্বে। যেখানে ভিতেরের চোখ আবার খুলে গেল।

ওই যে শুরুতেই গল্পটা বললাম না? ত্রিবেণী, প্রয়াগ, অমৃত, কুম্ভ, বিষ্ণু এসব? কদিন আগেই তো পৌষ মাসে হয়ে গেল এলাহাবাদের সঙ্গমে। যতই সঙ্গমের দিকে এগোতে থাকি। উত্তেজনার তুঙ্গের মতো খাড়া হয়ে আছে ফেলে যাওয়া তাঁবু আর পূর্বাগমনের স্মৃতিচিহ্ন। এখানে ওখানে রাস্তার ব্যারিকেড। ধুসর লোকারণ্য পেরিয়ে এলাহাবাদ কেল্লার ধারে। কথিত আছে আকবরের তৈরী এই কেল্লাতেই নাকি কোন এক গোপন কুয়োয় সরস্বতীর অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। কথিত কাহাবত তো বিজ্ঞানের ধার ধারে না! লোকায়ত কথন নিয়েই তার কারবার!

নদিতে নামলাম। নৌকায়। এ হল যমুনা নদী! এখানে গভীর হয়েছে তার বুক! ঘোলা জলে গভীর! গভীর কিন্তু স্রোতহীন। দূর থেকে দেখা যায় সঙ্গমের দিকে তীরবেগে এগিয়ে চলেছে সে কিন্তু এলাহাবাদ কেল্লার কাছে নিশ্চল। যেন উত্তুঙ্গ সঙ্গমের আগের দুদণ্ড জিরিয়ে নেওয়া। নৌকো এগোতে লাগল ত্রিবেণীর দিকে! ওদিকের গঙ্গা আর এদিকের যমুনা! সরস্বতী তো থেকেও নেই! না থেকেও আছে। আর আছে, অজস্র সাইবেরীয় সঙ্গমাভিমুখী সাদা ‘গাল’ পাখি। আর তাদের খাওয়ানোর জন্য নৌকায় পসরা সাজিয়ে বিপণী। কিনছেও লোকে ছবি তোলার জন্য। আজকের দিনে ছবি তুলতে তো পারদর্শিতার প্রয়োজন হয় না! শুধু মূল্যবান অ্যাণ্ড্রয়েডেই কাজ চলে যায়।

আর আছে একইমুখি সারি সারি যাত্রী ঠাসা নৌকা! সকলেই চলেছে পুণ্য অর্জনে। আবার একবার জেএনইউ, ক্যাম্পাস, পার্লামেন্ট, মলসংস্কৃতি, হাইরাইজ পার করে ভারতের সুগভীর বিস্তৃতি দেখে নিলাম। শহুরে বুদ্ধিদীপ্ত চাকচিক্যের পিছনে আছে এই আপাত রংহীন কিন্তু ভাবনায় রঙিন জীবনশৈলী! ভারতবর্ষ তো বাস করে গ্রামে গঞ্জে মাঠে ঘাটে এলাহাবাদ হরিদ্বারের সঙ্গমে মন্দির মসজিদে। যতই আমরা শিক্ষার দোহাই দিয়ে এই বিশালতাকে অস্বীকার করি না কেন। এদের কাছ থেকে ক্রমশই দূরে সরে যাওয়া ঘটে চলেছে প্রতিনিয়তই।

তফাত শুধু শিরদাঁড়ায় নয় হে কবি! মানুষে মানুষে ফারাক তার স্থান কাল পাত্র বিছিয়ে ভিন্নতাকে একত্রিত করে দূর থেকে দূরতর দ্বীপ হয়ে চলেছে প্রতিনিয়তই। অর্ধনগ্ন নারী পুরুষ কেশহীন নারী পুরুষ করজোররত নারী পুরুষ দেখে আমরা আত্মশ্লাঘা বোধ করতেই পারি যে এ আমি নই! কিন্তু ভীড় ভেদ করে উঠে দাঁড়িয়ে যদি আবার ভীড়েই মিশে যেতে না পারলাম তাহলে তো অভিমন্যুর শিক্ষা সম্পূর্ণ হল না!

সঙ্গমে পৌঁছে দেখলাম গঙ্গা এখানে অগভীর। যেন যমুনার সঙ্গে মিলনের অপেক্ষায় মাত্র! তারপরেই দ্রুত ছুটে চলেছে লোকালয়ের উপর দিয়ে সাগর সঙ্গমে। পথে কত শত পচাগলা ফুলমালা আবর্জনা বুকে করে বয়ে নিয়ে চলেছে সাগর অভিমুখে। বেশী নয়, দশ মিনিট! চুপ করে প্রত্যক্ষ করলাম উত্তর ভারতের শিরাস্রোতকে! প্রদীপ ভাসানো বা দুধের অঞ্জলি দানের অনুরোধ উপেক্ষা করে। প্রকৃতি আর স্বীয়র মাঝে কোন ফারাক নেই! নেই কোন দূরত্ব! শুধু অপার বিস্ময়!

ফিরে আসার সময় সঙ্গে ছিল এলাহাবাদের বিখ্যাত লাল পেয়ারা! কাশীর পেয়ারার মতো এর সব রঙ ভিতরে নয়! বাহ্যিক লালেই রসনা লালায়িত করে! আর ছিল কাঁচা ছোলা নুনে সেঁকে ছোলাভাজা! আহা আমার মতো ঘোর অঘোড়া যারা তাদেরও লালা নিঃস্বরণ ঘটাল সে।

আবার সেই লরি আর আবার সেই চাঁদমালার মতো প্রপেলার। আর কি আশ্চর্য এবারও সঙ্গে ছিলেন মেজর বক্সী! যাক আরে সবাইকেই তো সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে! এরই নাম তো ভারতবর্ষ! তাই না?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ মেয়েটার নতুন নতুন গানের শখ! সেদিন ভোরে দেখি ‘ওগো পুরবাসী’ গাইছে। কিন্তু ‘পুর’ গেছে ভুলে! তাই ‘ওগো বাসী’ “ওগো বাসী” বলে সুর ধরেছে। কিছুক্ষণ পরে মাঝে একটা ভাই ঢুকিয়ে দিল! ব্যাস তারপর সরগম তানপুরো, বেহালা, পিয়ানো, ঢোল করতাল সব বেজে উঠল একসঙ্গে সুরে সুরে। “ওগো ভাই বাসী” “ওগো ভাই বাসী”!

প্র পু১- ছেলেটা এখন দেখছি শখ করে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে সুর বাঁধছে “এভরি শা লা লা লা লা”। নিজে নিজেই! আহা ওর জীবনটাও যেন এতটাই সুরম্য হয়! আমেন!!
siberian-birds-ganga-3

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s