(১৬০)

অবশেষে… অরিন্দম কহিলা বিষাদে
কুম্ভকর্ণের ঘুমঘোর ভাঙিল সখেদে
ফিসফাস দিল ডাক কলিকাতা বুকে
যার মাঝে কৈশোর গিয়েছিল চুকে।
ফি বৎসর একবার রাজধানী চড়ি
অম্লজান আহরণ ফিরিয়াছি করি…
ব্যাস আর পারলাম না দাদা! অনেক দূর টেনে দিয়েচি। তবে কথাটা হল, এই যে এতদিনের হিয়াটাস বা অজ্ঞাতবাস, তা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম সেই কোলকাতা নিয়েই। বস্তুতঃ কম দিন তো হল না! নিজদেশে প্রবাসী হয়ে আছি। দিল্লির লাড্ডুতে পাক দিচ্ছি। থেকে থেকে কোলকাতার মুণ্ডপাত করছি। কিন্তু কেন জানি না শহর কোলকাতা আমাকে রসে ডুবিয়ে রাখে। সেই মাছি ধরার ফাঁদের মত! গল্প তৈরী হয় রাতে গল্প তৈরী হয় দিনে। আর তার পরই চলে আসে ফিসফাস!

তা হলে আর দেরি কেন? নেমে পড়ি ময়দানে!

সেই শনিবার দুরন্ত থামল কোলকাতার বুকে। শিয়ালদহ থেকে বাড়ি হয়েই আড্ডা! ছেলেটাকে বইমেলাতেই বেশ পছন্দ হয়েছিল! বলল এখন আছি মুর্শিদাবাদে! কিন্তু থাকব শনিবার! ডাক দিলাম চলে এল! কলেজ স্ট্রীট কলেজ স্কোয়ার! বাপুরে কি ভিড়! আড্ডা তো পগার পাড়। না কফি হাউসে ঠাঁই না প্যারামাউন্টে পাই! তাতে কী? দেলখোশ আছে না? কব্জি ডুবে জায় কভারেজে আর আঙুল ডোবে না চায়ের কাপে! আড্ডা দিয়ে ফিরে আসার সময় বলে আসলে আমার জন্মদিন! লাও! দিই ঠুসে একখান বই!

তাপ্পর আর কি? যেখানেই যাই নাই আর নাই! পুরনো কোলকাতার প্রদর্শনী! বৃষ্টি মাথায় সাড়ে বারোটায় ছেলে মেয়ে ট্যাঁকে! বলে চারটেয় খুলবা! লাও! রোববারের বাজারে গেনু পিটারক্যাট! বলে একঘণ্টা লাগবা! তাপ্পর আর ট্যাক্সিও নাই! একটাকে ধরে গেলাম আর্সেলান! সেখানেও পঞ্চাশ মিনিট। শেষে সিরাজে পাকে চক্রে ঢুকে পড়ে মাখনের মতো মাটন বরায় দাঁত চোবানো! বিরিয়ানিগুলোও আছে ঠিক ঠাক। ঠিক যেমনটি থাকার কথা… ডিম, আলু, মাংসের টুকরো, স্নেহ, মশলা, কেওড়া জল আর মোলায়েম প্রলেপে!

সে সব থাক! কফি হাউস ট্র্যাডিশন ট্র্যাডিশন! নিডস বিগ চেঞ্জ বস! ঠাণ্ডা কফি যেন টই টই পুকুরের জল! গরম কফি যেন ইক্ষুমোরন! আহা ইনফিউশনে যদি চিনি না থাকত! বাবি আর গুড্ডুকে জিগাও! কেমন লাগে কভারেজ চিকেন?

সে সব কথাও থাক। বরং বলি অন্য গল্প! পরের রোববার হক্কালে পার্শ্ববর্তিনী বাক্স প্যাঁটরা সহযোগে রওনা দিল জামশেদপুর। কায়দা মেরে আইআরসিটিসি থেকে বুক করলাম খাবার। মন আমার আর আরেক ঠাঁই থেকে। মন আমার খুশ করে দিল, কিন্তু চিকেন ফ্রাইড রাইস শত ফোনেও এল না। বললাম অর্ডার ক্যান্সেল করান! বলে মেল ঢেলে দিন (মেল ডাল দিজিয়ে)। দিলাম ঢেলে! আকাশ থেকে এক মুঠো মেঘ ধার নিয়ে! তা দেড় সপ্তাহ হয়ে গেল কোন জবাব নেই! অথচ ওলায় ওঠার পর ভুল করে চল্লিশ টাকা পার্কিং ফি নেওয়ায় তা সঙ্গে সঙ্গেই ফেরত পেলাম সেই দিনই। সরকারি ফস্কা গেরো! ব্যায়াম কর রে ভাই!

এছাড়া আরও কত কি! ট্রাম বাস ঠেলা টেম্পোর শহর এখনও সেই রকমই রয়ে গেছে। আধবোজা চোখের আধো আধো রোমান্স। বৃষ্টি আসবেই ধরে চাতকপাখিরা হাঁ করে থাকে সূর্যের পানে। গণ্ড দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ে। ভিতরের ঠাণ্ডা আর বাইরের গরম মিলে ক্যাটাভরাস।

IMG_1818.JPG

নকুড় নন্দীর সন্দেশ, ঘোষ ব্রাদার্স- দ্বারিক- গাঙ্গুরামের বেকড চমচম- সাব্বিরের রেজালা- রয়ালের চাঁপ- নিজামের কাঠি রোল আর জিলেট জিলেট জিলেট। নরম মসৃণ গালের মতো স্মৃতিরা নেমে আসে বুকের উপর।

আচ্ছা দক্ষিণ কি আমার দুয়োরাণী? চিরন্তন উত্তর দক্ষিণ লড়াই পেরিয়ে আজ তো দক্ষিণেও আমার বন্ধু কুটুম আত্মীয়রা ছড়িয়ে আছে! তাহলে দক্ষিণে রোমান্স নেই? গড়িয়াহাটার মোড়, রাসবিহারী, গলফ লিঙ্ক, আনোয়ার শা, গোলপার্ক, বচ্চনের ধাবা, ঢাকুরিয়া, হাজরার মোড়, আদিগঙ্গা আর ন্যাশনাল লাইব্রেরী!

জাতীয় গ্রন্থাগার? আরিব্বাস! তারা সাড়ে তেরোর ডাচ আর কোরীয় ভাষার ভক্তকে উপদেশ দেয় হার্ডি বয়েজ পড়তে আর অনেক খুঁজে পেতে একটা বই চাইলে বলে ‘জামাই ষষ্ঠী’! তার থেকে তো বাইরের জঙ্গলটাই ভাল! কি সুন্দর পরী নামে সেখানে, গাছের ঝুরি বেয়ে- কাঠবিড়ালীর আঁচড় বেয়ে ছায়া ঘনায় পথের প্রান্তে।
আর আছে পোলাপান! দুইখান! তারা রাতে জাগে! আলো দেখলেই একজন বলে ‘পাঁচ মিনিট’ বলে ঘুমিয়ে পড়ে! আর একজন বলে, ‘কি মজা সক্কাল হয়ে গেছে! উঠে পড় সবাই!’ বলে ঘুমিয়ে পড়ে! তা তারা এখন নিজ নিজ দায়িত্বে বড় হচ্ছে। শহর কোলকাতা তাদের আপন নয়! কিন্তু তবু যেন কোথায় একটা নাড়ির টান তৈরী হচ্ছে!

যাই হোক তিনখান গল্প বলে এই সব হাবিজাবি শেষ করি!

এক
ঘনাদাকে ফোন করলাম, কিভাবে যাব? বইয়ের দাম দিতে হবে! বলল বাস অটো আর হরির দোকান। পৌঁছলাম। গিয়ে আড়াইশো টাকা দিতে গিয়ে খুচরো উপর করতে হল! সব বড় নোটের বাহার! আড্ডা মেরে এবার যাব বাসু দার কাছে! কদ্দুর? এই তো দমদম সাতগাছি থেকে বাস ধরে মিল্ক কলোনি! বাহ বাহ!

কিন্তু পকেটে পাঁচশোর রাজত্ব। সঙ্গে একটা পাঁচ টাকার কয়েন! দুটো বাস বলল পাঁচশোর খুচরো নেই! হাঁটতে থাকলাম! ট্যাক্সি? খুচরো নেই! আরও হাঁটতে গিয়ে কেলেঙ্কারি! চটির পটি গেল খুলে! লাও ঠ্যালা! হাঁটতে থাকলাম! মুচির দেখা নেই! কোলকাতায় সবাই রোববার ছুটি মারে নাকি? শেষে দু কিমি হেঁটে কেষ্টপুর খালের বাঙ্গুর আর যশোর রোডের মাথায় পেলাম তাকে? কত টাকা? লাগাতে পাঁচ আর টেকাতে দশ! পাঁচই নাও ভাই! জুড়ে দাও! সর্বশ্রান্ত সর্বস্বান্ত হয়ে চটি সারিয়ে এগোতে লাগলাম! আরও এক দুই! গলা শুকিয়ে পাঁপড় টিশার্ট ঘাম গড়িয়ে ন্যাতা! স্টুডিওর ঘড়িতে সাড়ে বারো! দুটো বাস একটা ট্যাক্সি হাঁকিয়ে দিল! কোথাকার বেয়াদপ! খুচরো ছাড়া সওয়ারি হও! তাও রোববারের বাজারে! পাস দিয়ে এক এক করে আখের রস, ছাতুর সরবত, লেবুর সরবত সব বেরিয়ে যাচ্ছে! একটাও কোল্ডড্রিংসের দোকান নেই! ক্যাথলিন খোলা! ন্যাহ খোলা নেই হে! আড্ডা দিচ্ছেন তারা! জয়ত্তারা! লেক্টাউন যশোর রোড পেরিয়ে একটা মোড়ে পেলাম তার দেখা! আহা সশশীরে বর্তমান সহৃদয় সজ্জন! ফ্রুট জুস খাইয়ে পাঁচ শো টাকা খুচরো করে দেবেন তিনি! কিন্তু বললেন আমার কাছে তো মোটে চারশো ষাট হচ্ছে! কালিয়া… মানে তালিয়া! আরও একপিস ফ্রুট জুস দিন দাদা! তাপ্পর দুটো স্টপেজের জন্য বাসে উঠে গেলাম বাসুদার বাড়ি। বাসুদা শম্পাদিকে বলল ওকে একটা নয় দুটো লস্যি দাও! লাপিস লাজুলি লস্যি! সাদা টেট্রা প্যাকে নীল আঙ্গিকের আমূল ভালোবাসা ছড়ানো লস্যি! গরমের দুপুরে নরমের পরশ আহা!

সে যাই হোক। এবারে দুই
সরোজের সঙ্গে দেখা করতে ভর সন্ধ্যায় গেলাম ই-মল-এ! মল অত্যন্ত নোংরা শব্দ! কিন্তু ভিতরটা শব্দহীন ও পরিষ্কার। তার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেও মাঝে মাঝেই দরজা খুলে গিয়ে পিঠে হাওয়া খাওয়া যায়। তারপর হাঁটতে হাঁটতে র্যাালিজের কুলফি, নিজামের কাঠি রোল ঠেঙিয়ে সরোজের সৌমিতাকে নিয়ে হাজির হলাম ঔধ ১৫৯০!

মাঝে তারা কাকে সব ফোন করে বলল দাঁড়াতে পারব না! ভালো কথা! গিয়ে দেখি, বেশ একটা সুন্দর সুন্দর মেহফিল! আধো অন্ধকারের নরম আলো নষ্ট করে দিয়ে আধদামড়া আধকানা কোলকাতাবাসী, মোবাইলে আলোকিত হচ্ছে আর আর সেলফি মারছে। উপরে প্রদীপ আর নীচে সিন্দুক দেখে সৌমিতা বলল, ‘দীপক তিজোরি’। পুরনো জোকেও হেসে উঠল মেহফিল। নরম গলাওটি কাবাবের সঙ্গে রেশমি রুমালি! আর রান বিরিয়ানি। মশলার গন্ধ হাতে চলে আসে আর আসে নরম মাটনি তন্তু। মুখে দিলে একটা জবজবে ভাব থাকে বটে কিন্তু গলে যেতে সময় নেয় না। তবে চমকে দিল এক চাটনি। তেঁতুল দিয়ে রাঙালুর চাটনি! কেয়াবাত মিয়াঁ! সব কিছু মিটিয়ে বিল চেয়েছি! পরিবেশক গলায় গামছা দিয়ে বলে কমপ্লিমেন্টারি! আইলা টিকিট কমপ্লিমেন্টারি হয় শুনেছি! তা বলে আস্ত ডিনার? বলে না না উপরঅলা বলে দিয়েছে! আর সিসিটিভিতে নজর রাখছে! পয়সা নিলে পাপ হবে! সৌমিতা আবার ফোন ঘুরিয়ে জেরা করল কাকে কি বলেছিস! আমিও তাদেরকে জেরা করলাম কাকে কি বলেছিস! জানলাম ফোন গেছিল ঔধ-এর জন সংযোগের কাছে। ভ্যাবলার মত বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলাম, “হ্যাঁ গা তোমাদের আলুর গুদামে আবার কবে আগুন লাগবে?”

IMG_1850.JPG

 

আড়াই
অনেক খুঁজে পেতে গেলাম স্যান্টাস ফ্যান্টাসিয়া! গোলপার্কের লোকেরাই জানে না কিন্তু কসবার রূপঙ্কর সরকার জানেন যে বাঁশপোড়া চিকেন আর চালের রুটির সঙ্গে স্কুইড আর অক্টোপাসও পাওয়া যায় হেথায়! কিন্তু বিধি তো এখন জোট! যেখানে যাবি চোট খাবি! বন্ধু ফোন করে বলল আজ তো বন্ধ! তাই বসে বসে কফি চিবোন আর বচ্চনের ধাবায় গিয়ে রেশমি কাবাব চোষা!

শেষ পাতে একদিন গিয়ে মোহনবাগান মাঠে খালি পায়ে ঘাস জড়িয়ে ইডেনের সঙ্গে ভালোবাসা সেরে এলাম। ঝিরিঝিরি আকাশ সামান্য সময় রেয়াত দিয়ে পাশে দাঁড়াল আমার! ব্যাস খেল খতম! এবারকার মতন আর কি!

এই আর কি! কলেজের বন্ধু স্কুলের বন্ধু দীনের বন্ধু কৃপাসিন্ধু আরও সব এবারে দেখা না করতে পারা বন্ধুদের সঙ্গে থেকে দূরে চলে এলাম পরশু! আহা মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিও… ওগো আমার প্রিয়!

 

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ ফিসফাস কিচেন ছাপা হচ্ছে http://www.abasar.net-এ পড়বেন কিন্তু!

2 thoughts on “(১৬০)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s