(১৬৪)

সেই রামজন্মের আগে শেষ ফিসফাস লিখেছিলাম। তারপর লব আর কুশও দাদু হয়ে গেল। প্রশ্ন উঠতে পারে, আবার কেন? কেন আর কী! আমার এই হেলদোলহীন জীবনের একমাত্র কনফেশনের জায়গা হল ফিসফাস। আপনাদের সামনে গলায় গামছা দিয়ে করজোড়ে বিনীত নিবেদন।

দেখুন পাঠক/ পাঠিকারা, কেসটা হল আমার মাথায় বেশ অনেকধরণের ক্যারা আছে। কিন্তু বয়সকালে হাঁটুর ঠকঠকানি আর কব্জির ফড়ফড়ানি বাড়ার পর এক বিশাল বড় নিঃশ্বাসে বুক ভরে অক্সিজেন নিয়ে তাতে অবদমিত রাগমাগ ডুবিয়ে দেবার একটা কায়দা প্রায় মেরে এনেছি। কিন্তু প্যাসকেলের সূত্র- ফুস করে আরেক ফুটো দিয়ে জল বেরিয়েই যায়।

যে ঘটনা দুটি বলছি তাদের মধ্যে ব্যবধান বিস্তর। উভয় ক্ষেত্রেই সিংহভাগ দায় আমার। (আহ এই যে আপনাদের বলতে পারছি এতেই কত গ্লানিবোধ দূর হয়ে যাচ্ছে। স্বর্গের সিঁড়ির উপর পড়ে থাকা আবর্জনা সরে যাচ্ছে। বেশ একটা হার্প হার্প নাকি বেহালা টেহালার সুর শুনতে পাচ্ছি।)

প্রথমটা বেশ মাস পাঁচেক আগে ঘটেছিল। ভেবেছিলাম ভুলে যাব। কিন্তু ওই আর কি- বিবেকের কাঁটা ইলিশের ন্যায় কপাৎ করে গলায় আটকে গেছে।

যাক ভ্যানতারা দূর হউক। গল্পে নামি। হয়েছিল কি, অফিসের রাস্তায় যাচ্ছি গাড়ি হাঁকিয়ে, এমন সময় একটা ওয়াগন আর (অবশ্যই ড্রাইভার সমেত) এসে বার দুয়েক এদিক ওদিক দিয়ে ভয়ঙ্কর ভাবে রাস্তা কেটে গেল। কোন রকমে ব্রেকে পা দিয়ে, একবার তো বাসের সামনে পড়তে পড়তে বাঁচলাম। একদম হুজুর মাইবাপ মার্কা সত্যি বলছি! দশবারের মধ্যে সোয়া নয়বারই ওই অক্সিজেনে দুঃখ ডুবিয়ে কেটে পড়তাম। সেদিন যে কি হয়ে গেল। গাড়িটাকে চেজ করে তার পাশাপাশি গিয়ে বলতে গেলাম। সে অমনি এক গাল গালাগাল দিয়ে ডান হাতের মধ্যমা দেখিয়ে কেটে পড়ল।

এবারে না মাথার ক্যারা চুলের ডগা বেয়ে নেমে এল যেন। ধূসর ওয়াগন আরের গা বরাবর গিয়ে নিজের গাড়িটা দিয়ে হালকা করে চুমু খেয়ে কেটে পড়লাম। এবার বিড়াল আর ইঁদুরের রোল রিভার্সাল। সে আমায় চেজ করছে, আমি খুব আরামসে এদিক ওদিক স্মুদলি সরায় কালে খাঁ অব্ধি চলে এলাম। এবারে সামনে রেড লাইট আর ওয়াগন আর আমার পাশে। আর আমি খুব মনোযোগ সহকারে সামনের দিকে তাকিয়ে। কাঁচ নামিয়ে সে তেড়ে গালাগাল করছে, কিন্তু আমি শুনছি না। এবারে করল কি দুম দুম করে হাত দিয়ে মেরে আমার সাইড ভিউ মিরর ভাঙতে লাগল।

সত্যি বলছি পাঠক/ পাঠিকারা। এই বাহন টাহন সম্পর্কে আমার খুব ইয়ের টান। সেই ক্লাস নাইনে আমার থেকে বছর দশেকের বড় পাড়ার মস্তান ‘লুচি’র সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলাম কিন্তু ‘বাপের সম্মান’-এর কথা চিন্তা করে তার চিন চারটে ঘুষিটুসি বিনা বাক্যব্যয়ে হজম করেছিলাম। কিন্তু সে যে আমার সাইকেল ভাঙতে যাচ্ছিল। ব্যাস জাস্ট ডান পা আগে ডান কাঁধ ঝুঁকিয়ে দুটো আপার কাট। একটা ঠোঁটে আর একটা ডান চোখের পাশে। সে একদম দেখবার মতো কেস হয়েছিল বটে।

এখানেও তেমনই একটা ফিলিং হল যেন। সামনে রেড লাইট সেখানে পুলিশের ভ্যান দাঁড়িয়ে ফুটপাথে ট্রাফিক পুলিশ। এসব কিচ্ছু খেয়ালে থাকল না। জাস্ট গাড়ি খুলে নামলাম। আমার মোবাইলটা চার্জড হচ্ছিল গাড়ির মিউজিক সিস্টেম থেকে এবং রাখা ছিল আমার ডানহাতের দরজার উপর। সেটা ছিটকে নিচে পড়ল। সেটাকে তুলে রেখে গাড়ি খোলা অবস্থায় ওয়াগন আরের পাশে গিয়ে চালকের থোবড়ায় একটা ঝাড়লাম। এবারে পরিষ্কার হুক! আর তখনই আমার চল্লিশোর্ধ টনক নড়ে উঠল বিপুল বিক্রমে। দেখি ট্রাফিক পুলিশটি ভিডিও করে নিয়েছে। আর পিসিআর ভ্যান থেকে দুটো কনস্টেবল ছুটে আসছে। কিন্তু ভিতরটা তখনও কাঁপছে রাগে।

উফ এসব জায়গায় মিঠুনদার দরকার ছিল। একটা কাঁধ ঝাঁকি আর সব্বাই উড়ে উড়ে গিয়ে শুয়ে পড়ত। কিন্তু ততক্ষণে ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে হবে। ঘুষি খেয়ে তো সে হরিদাস পাল ময়দানে নেমে পড়েছে। এর আগে কি ঘটেছে কেউ জানে না। খালি আমি ঘুষি মেরেছি এটাই ভিডিও! এটাই বাস্তব। পুলিশ তো আমায় দুদিনের রিমান্ডে পাঠাবেই। তারপর বেপরোয়া গাড়ি চালানো রয়েইছে। আর তার সঙ্গে হরিদাস পাল তো একে ডাকে তাকে ডাকে। আমার মাথাটা খারাপ হতে হতেও যেন দৈব বলে বেঁচে গেলাম। প্রায় দশ মিনিটের প্রচেষ্টায় পিসিআরের দুই কনস্টেবলকে নিরস্ত্র করতে পারলাম। মানে ঘটনাটা বোঝালাম আর কি! তারা বিচক্ষণ, কিন্তু বলল- হরিদাস পাল ইতিমধ্যেই ১০০-এ ফোন করে দিয়েছে। আর আইডিয়ালি সামনে যখন পিসিআর ভ্যান ছিল আমার সেখানেই দৌড়ে আসার কথা ছিল। বললাম আমার অবলা গাড়ির উপর আক্রমণ হয়েছে কি করে ওসব আইডিয়াল ফাইডিয়াল মাথায় থাকে! দেখলাম সেটাও বুঝল। কিন্তু ১০০-এ ফোনটাই চাপের। তারপর বলল ‘আপ উনসে নিপট লিজিয়ে’! কি আর করি! তখন তো আপনি বাঁচলে হয় তারপর জাতির জনক। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফাটা কষে হাত বুলিয়ে তুলো ডেটল (পিসিআর ভ্যান থেকে নিয়ে) বুলিয়ে তারপর দুটো স্বচ্ছভারতের নতুন সবুজ সার্টিফিকেট দিয়ে তারপর রেহাই পেলাম। বললাম কিচ্ছু ডেন্ট হয় নি। এতেই সারাই হয়ে যাবে গাড়ির। যদিও জানি তিনশো টাকাও লাগার কথা নয়।

তারপরেও হরিদাস পাল বলে কি, ‘ইনকা কুছ কর দো!’ পিসিআরের পুলিশ তখন দেখি চেগে গেল। এমনি তে আমি দিল্লিতে খারাপ পুলিশ প্রায় পাইই নি। এরা তো তখন দেবদূত। হরিদাস পালকেই ঝেড়ে দিল। বলে, ‘আপকা তো হো গয়া আব মিউচুয়ালপে সাইন কর দিজিয়ে অউর ভাগিয়ে। হাম আপনা নিপটনা জানতে হ্যায়!’ হরিদাস পাল তারপর গেল নিজের গন্তব্যে। তখন ট্রাফিক পুলিশ এবং পিসিআরের দুই দেবদূতকে সামনে রেখেই বললাম, ‘এক বাত বোলে? ইয়ে আদমি আচ্ছা নেহি থে!’ জ্ঞান বৃক্ষের পেয়ারা খেয়েছি কি না? তা দেবদূতের একজন বলল, ‘ও তো হাম সমঝই গয়ে থে যব ইসনে হাজার রুপয়া লে লিয়া। গাড়ি কো কুছ হুয়াহি নহি হ্যায়! পর আপকো ভি হাত উঠানা নেহি চাহিহে থা! চলিয়ে জী রাম রাম!’ আর হিসাব কিতাব? আরে সরকারি চাকরদের আবার হিসাব কিতাব কি? সততা বলে একটা জিনিস আছে না?

সে যাই হোক সেদিন থেকে নাক কান মুলেছি। রাস্তায় কারুর সঙ্গে ঝগড়া নয় এমন কি চোখাচোখিও নয়। এই যেমন গত পরশু। একটা গলি থেকে বেরোবার সময় হাতের মোবাইলটা সামনে সেট করে রাখতে গেছিলাম। সামনের রাস্তায় যে গাড়িটা যাচ্ছিল তার ধারে কাছেও কোন ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু তার মনে হয়েছিল আমি মোবাইলে কথা বলছি। (গাড়ি চালাতে চালাতে আমি কথা বলি বটে, কিন্তু হ্যান্ডস ফ্রি না থাকলে বলি না!) সে অমনি ক্যাঁচ করে আমার গাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যুদ্ধং দেহি মনোভাবে বেরিয়ে এসেছিল। আমি ডানদিকের জায়গাটা দেখলাম আর টুক করে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম। রোড রেজ বড়ই ভয়ঙ্কর জিনিস। যাদের হয় তাদের জন্য একটা রেড রোজ আর জাদু কি ঝাপ্পি রেখে গেলাম।

আর ইয়ে, আমি কিন্তু এমনিতে ল্যাজবিশিষ্ট। আগে অন্য কিছু হত। তবে এখন ল্যাজের বিশেষ জায়গায় পা না পড়লে শান্তশিষ্টই থাকি। আর বিশেষ জায়গা বা সুইট স্পট তো কমিয়েই আনছি জীবনে। হাজার হোক ছেলে মেয়ের বাপ বলে কথা!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s