(১৭৭)

আজকাল আমার পনেরো ক্রসিত ছেলেটি মাঝে মাঝেই জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবা, ব্লেড মারব?’ তারপর পজ নিয়ে বলে, ‘ঠোঁটের উপর!’ বস্তুতঃ বয়ঃসন্ধির ছেলেদের lack of facial hair এক বিরাট বড় সমস্যা। সে আমার আপনারও হয় নি কি?

আর এই সব ছেলেপুলেরাই চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিনকে অমর করে দিয়ে যায়। প্রথম গোঁফ কাটাটা আদি অনন্তকাল ধরে একই থেকে যাচ্ছে, ‘সেলুনে গোঁফ শেপে আনতে গিয়ে বা নিজেই ছাঁটতে গিয়ে চার্লি চ্যাপলিন হয়ে গিয়েছিল। তাই…’

সে আমারও ক্লাস ইলেভেনে হয়েছিল। তখন বাবা রঞ্জি ম্যাচ খেলাতে হিঙ্গনঘাট বলে এক অখাদ্য জায়গায় গেছে আর মা দেখলাম আমার ব্যাখ্যায় কনভিন্সড হয়ে গেল সহজেই, কিন্তু মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। গোঁফ কাটা আমি কলকাতা দাপিয়ে আই এম বিজয়ন হয়ে ঘুরে বেড়ালাম। আর বাবা এসেই ধরে ফেলল আমার ফানুস। কিন্তু আর কিছুই বলল না।

তারও বছর খানেক পর থেকে আরেক নতুন সমস্যা এসে উপস্থিত হল। আমার খোমাখানার আকৃতি এমনই যে আলমগির দাড়িতে পাক্কা ভিলেন লাগে। আর কে না জানেন মুখাবয়বই মনের আয়না। অতএব সেসময়ই যত কূটবুদ্ধি মাথায় আসে। সে যা হোক, সেই রিস্কে না গিয়ে ফরাসি কাটেই মন মজালাম। ঠোঁটের উপর কালো শ্যাওলা আর ঠোঁটের দুপাশ দিয়ে ঢল নেমে নিচে কালো জলার সৃষ্টি করেছে। মাঝ বরাবর একটা ফোয়ারা। এতেই কিস্তিমাত। কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। ব্যাটা দিন কুড়ি যেতেই ভুলে যাই মাকুন্দ আমিকে দেখতে কেমন ছিল! তাই যে কে সেই।

তারপর তো রাজ্য জুড়ে শৈত্য প্রবাহ শুরু হয়েই গেল আর সরোবরে বরফ পড়া শুরু হল। সে এমনিতেই আমি একুশ বছর ধরে বেয়াল্লিশে আটকে ছিলাম। গত বছর মুক্তি পেয়েছি।

কিন্তু গার্লফ্রেণ্ডই বলুন বা বউ। তাদেরও তো একটা মানইজ্জত আছে না কি! ঠ্যালায় পরে আজহারুদ্দিনকেও গোঁফ রাখতে হয়েছিল আর আমি তো সামান্য রৌদ্ররূপ সাঁপুই। আমার নাকি নাক আর ঠোঁটের মধ্যে ব্যবধান কম তাই গোঁফ রাখলে রাঙাকাকার মতো লাগে। একটা কথা বলেই রাখি আমার থেকে কম বয়সীদের আমি ঠিক প্রেয়সী ক্যাটাগরি ভুক্ত করতে পারি না। মেন্টাল ব্লক। তাই সলিড সলিড প্রেমের সুযোগ হারিয়েছি (তবে যা পেয়েছি একজন্মে তাই বা কম কিসের!) আর পাকা দাড়ির বয়ফ্রেণ্ড থাকলে নিজের বয়স ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা। অতএব…।

অবশ্য আমার পার্শ্ববর্তিনীর কথা আলাদা। সারা পৃথিবীতে ওয়ান পিস এক্সিস্টেন্স। তাঁর মতে ‘এজ ইস জাস্ট আ নাম্বাহ আর পাকাচুল আর জাস্ট আ ফিউ ডিজিটস!’ তাই এখন ফোয়ার শিকড় বরফে ডুবে গেলেও ফ্রেঞ্চ রাখার ছাড় পেয়ে গেছি। তবে ওই আরকি, স্ট্র দিয়ে সব কিছু খাওয়া যায় না। আর উদ্ভিদাবস্থায় ফোয়ারা বড্ড খোঁচা মারে। তাই গঞ্জনা আরর প্রাণে সয় না।

কিন্তু গত মাস থেকেই দেখছি, ফুলঝুরির মতো শেষবার একটা ঝিলকি মারার অদম্য ইচ্ছাটা চেপে বসেছে মাথায়। স্টাইল সর্বস্ব দুনিয়ায় একেবারে ফ্রেঞ্চহীন জীবনেই নর্থপোলে চলে যাব? তা আর হয় নাকি। তাই সকাল বিকেলে দাড়ি ঝুলিয়ে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে নারকেল তেলে চুবিয়ে গোটিসাধনা।

কিন্তু সত্যিটা হল, হ্রদের বরফ ফোয়ারা বেয়ে কার্নীশে উপরের শ্যাওলার ঝাড়েও পৌঁছচ্ছে। তাই ঠিক করলাম আ লা আলকাতরা ট্রিটমেন্ট মারতে হবে। বছর ছয়েক আগেও চুলের যত্নে লহার কড়াইতে চায়ের জলে ভেজানো মেহেন্দি (আমার ছেলে আবার ছেলেবেলায় তাকে ‘বেহেনজি’ বলত!) লাগাতাম। হালকা বাদামি একটা উড়ুউড়ু আভা আসত। তারপর বিয়ে হয়ে গেল।

আর হলও বটে সেই ওয়ানপিসের সঙ্গে যিনি বয়স পাকাচুল এসব ইস্যুকে ফুঁকে উড়িয়ে দেয়। অতএব চুলচর্চার সেখানেই ইতি ঘটে।

কিন্তু দাড়ির শৈত্যপ্রবাহের ফলে রাজকাপুরের অসমাপ্ত ছবির প্রয়োগেচ্ছা প্রবলভাবে উপস্থিত হল। তাই তিথি দেখে পণ্ডিত ডেকে ‘হেনা’ কিনে আনলাম। লোহার কড়াই কবেই গেছে। তাই যা পাই তাই সই করে কফি দিয়ে হেনা গুলে ঢ্যাঙ করে মারলাম চামচ দিয়ে কয়েক পোঁচ চুলে আর এক খাবলা দাড়িতে। সন্দেহটা আগেই হচ্ছিল, কিন্তু মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই প্রবল হল। খলবলিয়ে জলশ্যাম্পু মেরে দেখি যা ভেবেছি… মাথায় তো তবু আগুন লেগেছে। কিন্তু দাড়ি বিরিয়ানি হয়ে গেছে। খাপছাড়াভাবে সাদা কালোর সঙ্গে হলুদ, কমলার রামধনু। কেলোর নাম জগতগোপাল! পার্শ্ববর্তিনী পরামর্শ দিলেন, আর তার সঙ্গে ঠোনাও। ‘গরীবের কথা বাসি হলে’ টলে বলে সেন্টুতে বেহালা বাজালেন। শেষে উপায়ান্তর না দেখে দিলাম ছুট। দিশি সেলুনে। নাপিত বাবাজি এক্সপেরিয়েন্সড হ্যাণ্ড। তিনি রায় দিলেন এক পোঁচ বার্গেন্ডির সঙ্গে দেড় পোঁচ ডার্ক ব্রাউন। আমার তখন ক্যাটাভরাস অবস্থা। হরি প্রেম নিবি তো খাবলা খাবলা! যা করবি কর খালি আগুন নেভা আর বিরিয়ানি দাড়ি থেকে উদ্ধার কর। অভিজ্ঞ মানুষ মিনিট পনেরোতেই হাতের কামাল দেখিয়ে দিলেন। আর কী, ব্যাস এই পর্যন্তই। দাড়িটা কালো হওয়ার ফলে মুখে অপ্রত্যাশিত কাট চলে এসেছে আর লোকজন ‘রোগা হয়েছ’ বলে ছোলার মাচায় চড়াচ্ছে। কিন্তু পার্শ্ববর্তিনী ঝানু জিনিস, তিনি কেসটা অনায়াসেই সলভ করে ফেলেছেন। চর্বিটা কোমরেই, মনে নয়। কিন্তু সেটা কমাবার আমার যে প্রাণপাত প্রচেষ্টা তা তাঁর নজরাগত বলে কিছু বলছেন না।

আর ইয়ে, আমিও একটা ছোট মতো ‘নো অ্যামোনিয়া লাইট ব্রাউন কিনে রেখেছি। মাঝেসাঝে চলতে ফিরতে ব্রাশের একটা স্ট্রোক দাড়িতে ওয়েসিস নিয়ে আসছে। চলুক না হয় হাওয়ায় ভাসা কিছুদিন। অক্সিজেন তো অপ্রতুল হচ্ছে না!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s