(১৬৮)

২০১৪র পরে আর ফিসফাস বই হিসাবে বেরোয় নি। এবারে করলে বইটার কভারের রঙ কালো বা ধূসর রাখব ভাবছি। না মানে শুরুতেই এমন কথা কেন? কে জানে কেন? বুঝতে পারি না! খালি আকাশে বাতাসে ঘাসে ঘাসে দেখি রঙগুলো বদলাচ্ছে। সমানে সমানে বদলাচ্ছে। পথে ঘাটে দূষণেরা ফুসফুস ছেড়ে হৃদয়ে দানা বাঁধছে। আর একটা অদ্ভুত ধরণের ইমোশন (সরি আবেগটা বড়ই কাঁচা লাগছিল ইমোশনের কাছে!) গলার কাছে দানা বাঁধছে।

মনের ভাবটা স্পষ্টভাবে বলে উঠতে পারছি না। মানে এটা ঠিক ভয় লাগা নয়। ভয়টা বরং চলে যাচ্ছে। এটা বিচ্ছিরি লাগাও না। বিচ্ছিরি লাগা এর কাছে কিছুই না। অথবা রাগ ঘৃণা বিদ্বেষ এই শব্দগুলোও ঠিক বসাতে পারছি না। কারণ এই যে ইয়ে লাগা সেটা তো এগুলোকে নিয়েই। রাগ ঘৃণা বিদ্বেষ।

কোথাও কোথাও একেই যেন পুরুষত্ব বা বীরত্বের প্রতীক বলে বোঝানো হয়। বুক দাপিয়ে চিৎকার করে বিজয়ীর উল্লাস। যেন রোনাল্ডো গোল করেছে!

এক এক করে বলে দেখি। আপনারা কী বলেন!

ভাদ্র মাস একটা বিশেষ মাস যা নিয়ে চারপায়ের প্রাণীদের খিল্লির শেষ নেই। তেমনই শ্রাবণ মাস হল ভক্তির মাস। শারদোৎসবে যেগুলো হয় সেগুলোকে ভক্তি দিয়ে মাপা যায় না। হৃদয় দিয়ে মাপতে হয়। কিন্তু শ্রাবণে শৈব উপাসকরা ভক্তিরসে ভগবানকে সিঞ্চিত করেন। আমাদের ছিল তারকেশ্বর আর এখানে হরিদ্বার।

না সেসব নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই। কিন্তু মেঘটা জমতে শুরু করেছে গত কয়েক বছর ধরে। যখন থেকে এই কাহার কাঁধে কাঁওয়াড়িদের জন্য সুযোগসন্ধানীরা এই একান্ত ব্যক্তিগত যাত্রাকে সাংগঠনিক করে দিয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বড় বড় কাটআউটে ঝোপে ঝাড়ে গজানো রাজনৈতিক সুবিদাবাদীদের অভিবাদন জানানো ব্যানার। দেবেন্দ্র দেড়া থেকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কেউ বাকী নেই। কাঁওয়াড়িদের জল পান করানো জন্য গগন বিদারী মিউজিক সিস্টেমে হানি শিঙের চরণে সেবা লাগির রিমিক্স সমেত বড় বড় শামিয়ানা। আর কার্যবিহীন স্বেচ্ছাসেবকদের দল। যারা মনের সুখে মাদক সেবন করে (শিবের চ্যালা! কিচ্ছু বলার নেই!) উত্তুঙ্গ উচ্ছ্বাসে হর হর মহাদেব ধ্বনিতে আকাশ বাতাস ছেয়ে দিয়েছে। আর ইদানীং আবার নতুন ট্রেণ্ড। জাতীয় পতাকা হাত মোছার কাপড়ের মতো যত্র তত্র লাগানো। যেন দেশাত্মবোধ দেখালেই সাত খুন মাফ।

তে এরকমই এক সকালে দেখি একটা নেশায় চুরচুর বিরোধী সমাজের লাগামহীন ষাঁড় হাতে লাঠি নিয়ে গাড়ি শাসনে লেগে পড়েছে। আমার এই গাড়িটা বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই ভাই যাবার পর থেকেই ইমোশন ফিমোশন একটু কম। অন্ততঃ বিয়োগ ব্যথা গুণিতক হয়ে পার্শ্বচর হয় না। কিন্তু লাঠির বাড়ি মারলে তো কথা নেই কোন।

তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি, পাড়ার মধ্যেই সাইকেল নিয়ে যাবার সময় ‘লুচি’ গুণ্ডার চটির পিছনের ভাগ মাড়িয়ে দিই। বাছাবাছা বিশেষণ চড়চাপড় সব হজম করে নিয়েছিলাম ‘বাপের সম্মান’ রক্ষার্থে। (এই বাপের সম্মান কেসটা বহুত গোলমেলে কেস। আপনার ঘেঁটি ধরে একটা তালপাতার সেপাই ক্রমাগত নেড়ে দিয়ে সুভাষিতাবলী ঝেড়ে যাচ্ছে আর আপনি কিসসু করতে পারবেন না!) কিন্তু যেই ব্যাটা ‘শালা আজ সাইকেলই ভেঙে ফেলব’ সাইকেলে হাত দিয়েছে। কোনা মেরে বাঁহাতের দুটো আপার কাট চোখের কোল ফাটিয়ে দিয়েছিল। সেই জোশ আজ আর নেই, তোরঙ্গে বাঁধা। কিন্তু গাড়িতে হাত দিলেই কী থেকে কী হয়ে যেতে পারত সে আর বলতে পারব না। কপাল ভাল (কার কে জানে?) আমি অনেক চেষ্টা করেও গাড়ি আস্তে চালিয়ে, ছেলেটার গা ঘেঁসে চালিয়েও তার লাঠির প্রসাদ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলাম। না হলে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়ার একটা অভিজ্ঞতা থেকে যেত। হয়তো গণ ধোলাইয়েরও।

তা সে সব থাক। দিন পনেরো সবাইকে ভক্তিতে ভাসিয়ে শ্রাবণ মাস বিদায় নিল ভাদ্রের শেষ এসে হাজির। সেদিন গাড়ি না থাকায় উবারের সাহায্য নিয়েছি, দশ মিনিটের রাস্তা যেতে দশ ঘন্টা লাগছে, ড্রাইভার বলল, ‘ম্যায় পচ্চিশ সাল সে দিল্লি মে হুঁ। বাই গড কভভি ইত্নে সারে গণেশজীকে ভক্ত নেহি দেখা।’

আর ট্রেণ্ডটাও এক। মাথায় একটা রঙ না জানা ফেট্টি, পেটে মাল, মুখে আবির, চোখে রঙ আর ঠোঁটে রাজ্যের নৈরাজ্যের প্রদর্শনী। আর অবশ্যই বক্স বাজছে। যার যত বেশী বক্স তার তত বেশী দর। গানের কথা কিসসু বুঝতে পারবেন না, খালি গুম গুম আওয়াজে গাড়ির উইণ্ডস্ক্রিন থেকে আত্মারাম সবাই খাঁচা ছেড়ে পালাবার কথা ভাবছে। যত্র তত্র মূত্র ত্যাগ আর জাতীয় পতাকা নাড়িয়ে বিজয়োল্লাস। ঠিক যে ভাবে আপনার কাজের মাসি ঝুল ঝাড়ু দিয়ে ঘরের কোণের কালো কালো ঝুল সরিয়ে সাফ করেন। ঠিক সেভাবেই এরা দেশভক্তিকে প্রশ্নকারী সুস্থশরীরগুলোকে সাফ করে দিয়ে ব্যস্ত করে ফেলবে।

আর সবাই সেই হ্যামলিনের ইঁদুর। নেতাজি কাল লাল কিলা থেকে আপনাকে ডোকলাম দেখাচ্ছে তো আপনিও অবিশ্বাসীদের বৃন্দাবন দেখাতে রেডি। আর দরকার পড়লে অন্ধকারও। সত্যিই যেন অন্ধকার যুগে এসে পড়লাম। যেখানে বিরোধাভাস মাত্রেই কার্গিলের ঠাণ্ডার চিন্তা জাগিয়ে দেওয়া গরম গরম বুলি আর সে সব ডিঙিয়ে গেলে চাপাতির কোপ বা বন্দুকের নল। আমাদের অবস্থা হচ্ছে সেইসব পতিব্রতা স্ত্রীয়ের মতো, যারা মার খেয়ে মরে গেলেও সিকিউরিটি হারাবার ভয়ে আপাত মানব পরিচয়বহির্ভুত সেই সব রাক্ষসদের বিরুদ্ধে একটাও কথা বলে না। ঠাণ্ডা ঘর ল্যাপটপ স্মার্টফোন আর নিয়ন্ত্রিত জীবন চৌহদ্দি পেরিয়ে একসঙ্গে বিরোধ করা কি চাড্ডিখানি কথা। (দেখবেন এরপর কমি ছাগু তিনো নিয়েও গাল শুনব।)

আসল কথা হল ফাঁপা ঢোল বাজে বেশী। আর আমাদের দেশটা হয়ে উঠছে সে রকমই। আমরা মায়ানমার যাব বলে পরিকল্পিত ভাবে ঘরহীন মানুষগুলোকে দেশছাড়া করে দিতে ছাড়ি না। গাজা ভুলে গিয়ে নেতানেইয়াহুর সঙ্গে ছবি তুলে ফেলি আর আপামর অশ্বেতকায়ের সর্বনাশ মাথায় তুলে ট্রাম্প কার্ড খেলে বসে থাকি কেকেকেকিরণ! (ক্লু ক্লুক্স ক্লান আর কি!)
এত কিছুর মধ্যেও কিন্তু স্বপ্ন দেখতে শখ জাগে জানেন? স্বপ্ন দেখি ধর্ম বলতে মানুষ চিনবে মানুষ শুধু। সালমা খাতুন বা জাভেদ হাবিব তাদের ধর্মের কলাম নিয়ে আমাদের কাছে পরিচিত হবেন না। শুধু মানুষ হিসেবেই যেন পরিচিত হয়ে যাই। সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুকে একটা ডায়লগ ছিল অর্গানাইজড রিলিজিয়ন মানুষ মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে। আর কত বিভেদ বা ফারাক হবে? উপরওলা তো ইতিমধ্যেই, কালো সাদা বাদামী, পুরুষ মহিলা, গুঁফো মাকুন্দ, হিস্প্যানিক এশীয়, লম্বু মোটু এসব ফারাকগুলো দিয়েই পাঠিয়েছেন। কিন্তু সে তো স্বাতন্ত্র্যের খাতিরে। দল পাকিয়ে পাঞ্জা লড়ার জন্য তো নয় সে সব।

মানুষ সবথেকে দুর্বল প্রাণী হয়েও মানবতা আর মানবিকতা দিয়েই তো আজ শ্রেষ্ঠ আসন নিয়েছে। তাহলে আর আলাদা করে আমরাই সেই চামড়া গুটিয়ে নিয়ে অপরের চামড়া গুটিয়ে দিতে তৎপর হয়ে পড়ছি কেন? মানুষ মরে। যে একবার জন্ম নিয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু আমরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাকে অবশ্যম্ভাবী থেকে অমোঘাবস্থায় নিয়ে যাচ্ছি কেন? আসুন না। বিশ্বাসী অবিশ্বাসী নাস্তিক আস্তিক ধনী গরিব সাদা কালো সবাই মিলে পৃথিবীটাকে আরেকবার সবুজ করে তুলি। শুধু গাছ পুঁতেই তো নয়। মানুষের মনটাকে হৃদয়টাকে সবুজ করে তুলতে হবে। কষ্টকর পথ, ধান্দাবাজীর জায়গা নেই, শর্টকাট নেই, মস্তিস্কহীনতা, বিবেকহীনতা, হৃদয়হীনতার জায়গা নেই। যে যতটুকু পেয়েছি তাই নিয়েই সবার কথা ভেবেই কাজ করতে শুরু করি। বাংলায় যাকে বলে হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ। তাহলে হয়তো আপনার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীটাও বাঁচতে পারে। নয়তো কে জানে, সময় কোথায় আমাদের জন্য চাপাতি নিয়ে অপেক্ষা করছে। কল্লা আমাদেরও নামতে পারে ভাই! তাই না?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এই লেখাটা নিয়ে আমরা ওরা করবেন না প্লিজ। সব ধর্মেই কম বেশী নাশকতা রয়েছে। নাহলে বৌদ্ধ ধর্ম বলতে যে অহিংসা বুঝি তারা রোহিঙ্গাদের কেটে পিস পিস করে ফেলতে পারে? রোহিঙ্গাদের জন্য, আশ্রয়হীন মানুষগুলোর জন্য একটু ভাবুন। আপনার দরজা খুলে দিতে হবে না। কিন্তু সামগ্রিক দরজাটা যেন খুলে যায়। আলোচনারও।

প্র পু ১ – নাহ লেখাটা শুরু করার সময় মনটা যে রকম ধূসর ছিল এখন কেমন যেন নীল নীল হতে শুরু করেছে। আকাশের মতো বিস্তৃত নীল। এবারে ফিসফাসের রঙটা নীলই হোক কেমন?

Advertisements

(১৬৭)


আমি ভিক্ষা দিই না। কোন স্পষ্ট লজিক নেই। কিন্তু দিই না। হয়তো মানুষকে কর্মক্ষম দেখতে ভালো লাগে বা অভ্যাস খারাপ করতে দিতে চাই না ইত্যাদি কিছু হবে। অথবা এই যে রাজধানীর রেডলাইটে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে কিছু দেহাতি মহিলা ঘোরাঘুরি করে তারা মাদারি নাকি অন্য কিছু? কয়েকটা বাচ্চা সং সেজে ডিগবাজী কলাবাজী দেখায় আর চুলে লম্বা বিনুনি বেঁধে টাঁই টাঁই করে ঘোরাতে থাকে। বা কয়েকটা বাচ্চা একটা নোংরা কাপড় নিয়ে এসে গাড়ির এখানে ওখানে একটু মুছে দেয়। এরা কারা? কোথা থেকে আসে? শহরবাসী আমরা শুধু সন্দেহ নিয়েই তাকিয়ে থাকি। আর দেখি যে রাজধানীর ক্রমবর্ধমান ফ্লাইওভারগুলি ঠিক নিচে, কাঠের চুল্লি আর পোড়া হাঁড়ি দিয়ে নিশ্চিন্তে সংসার পেতেছে। দশ ফুট বাই দশ ফুটের গণ্ডিটাও তাদের জন্য নেই।

সন্ধ্যা হলেই সন্দেহ বেড়ে যায়। দেহব্যবসা অথবা রাহাজানি। সন্দেহের তীর এদিকেই ঘুরতে থাকে। মাথায় জট, চোখে পিচুটি আর নাকে পোঁটাওলা শৈশবের পরেই এসে হাজির হয় অপুষ্টির যৌবন বা অপক্ক বার্ধক্য। আকাশের দিকে তীর ছুঁড়ে দিয়ে, পৃথিবীর বুকে রুক্ষ পদক্ষেপ ফেলে জীবন কেটে যায়। আদমসুমারি আর আচ্ছে দিন, সরকারি সাহায্য আর গরিবী হটাওয়ের ইমেজে এরা বড় বড় ছোপ। পুলিশ আর সমাজবিরোধীদের সঙ্গে নিত্য হিসেবে নিত্য যাপন। এরাই হল সেই সব মুখ যাদেরকে লুকিয়ে রেখে আমরা আধুনিক ভারতের ছবি তুলে ধরছি বিশ্বপিতার কাছে।

সে যাই হোক, সেই সব লজ্জাই হোক আর নিজেকে মুক্ত পৃথিবীর প্রতিভূ হিসাবে দেখার অভ্যাস থেকেই হোক। আমি ভিক্ষা দিই না। শুধু যখন কোন বয়স্ক লোককে দেখে মনটা উদ্বেল হয়ে ওঠে যাদের সত্যিই হয়তো করার কিছু নেই, সেখানে হাতটা আপনিই পকেটের দিকে চলে যায়। আর নিজের অপারগম্যতায় মাথা নিচু হতে থাকে।

কদিন আগে রবিবার, আইটিও থেকে মানদই হাউসের দিকে গাড়ি ঘোরাবার আগেই দেখলাম এক আপাত অন্তঃসত্ত্বাকে। সেই দেহাতি রূপ আর তার সঙ্গে আরও জনা চারেক কম বেশী বয়সের মহিলা। এরা হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য সাহায্য চাইছে। কিন্তু আমরা শহুরেরা এখন অভিজ্ঞ হয়ে গেছি। সব জানি এর পিছনের গল্প। কিছুদূর নিয়ে গিয়ে যা নয় তাই হয়ে যেতে পারে। পেটের থেকে বেরিয়ে পড়তে পারে পিস্তল অথবা অন্য কোন প্রাণহানি অস্ত্র।

কিন্তু মজার ব্যাপারটা হল, গাড়িটা ঘুরতেই দেখি একদল পুলিশ দাঁড়িয়ে, লালবাতি টপকানোদের জন্য টোপ ফেলে বসে আছে। গল্পটা কেমন যেন ইয়ে লাগল! মানে মেয়েটি যদি সত্যিই অন্তঃসত্ত্বা হয়, তাহলে তো তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো উচিত। আর না হলে শ্রীঘরে।

তাড়া ছিল কিন্তু তাও গাড়িটা থামিয়ে মুখ বার করলাম। দিল্লিতে পুলুশ এসব ব্যাপারে খুব হেল্পফুল। জানে কি জানে না কিন্তু ঠিক দিক দেখিয়ে দিতে ছাড়ে না। বললাম ব্যাপারটা- ব্যাস যেন চোর ধরা পড়েছে এমন মুখ করে বিগলিত হাসি দিয়ে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা দেখতা হুঁ!” যেন আকাশ থেকে বিষ্ণু দেবতা বরাভয় মূর্তি নিয়ে বিশ্বরূপ দর্শন দিচ্ছেন। কিন্তু ঐ যে বললাম ট্যাম। ট্যামই নেহি থা না! তাই নাগরিক কর্তব্যকে নীলটুপিধারীর হাতে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে চললাম পিছনের দিকে না তাকিয়ে। জানি একবার বলায় কিছু হবে না, আর বারবার বলায় হয় তো সেদিনের জন্য ভাত মারা যাবে চৌর্যোপজীবিনীদের।

তবে সব গল্পগুলো ঘেঁটেঘুঁটে গেল কালকে। মানে আমি নিজে আত্মপ্রচারকে খুব একটা পছন্দ না করলেও, এই রোগটা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নই। কোথায় কখন যেন কোন সূক্ষ্ম গণ্ডিটা পেরিয়ে চলে যাই আর রাবণ রূপ ধারণ করে ফেলি, তার হিসাব রাখতে পারি না। তবুও বলছি জানেন।
কাল রাতে পার্শ্ববর্তিনী আর মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। ফর আ চেঞ্জ মেয়েটা আমার পাশের সিটে বসে। সামনেই লালবাতি আর লালবাতি পেরোলেই গাজীয়াবাদে ঢুকব। সামনে একটা এসইউভি। আর আমরা এদিক ওদিক হাবিজাবি বকে যাচ্ছি। যদি করবী ফুলগুলো টুপ করে গাছ থেকে পড়ত গাড়ির জানলার কাঁচ বেয়ে তাহলে রাতের বেলা ফুল পাড়ার কষ্ট থাকত না আর লাল গোলাপি ফুলগুলোও মেয়ের কানে ঠাঁই পেতো! এই সব।

তাকিয়ে দেখলাম লাল বাতির কাছেই দুটি বাচ্চা মেয়ে বেলুন বেচছে। হঠাৎ লাল আলো সবুজ হল আর দেখলাম আমার সামনে দাঁড়ানো গাড়িটা যেটা এগিয়ে গিয়ে গাজীয়াবাদে ঢুকবে তার ড্রাইভারটা হাত বাড়িয়ে যেটি দুটির মধ্যে ছোট সেই মেয়েটির হাত থেকে একটা বেলুন ছিনিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল গন্তব্যের দিকে।

পাঠক/ পাঠিকারা, আমরা তো মানুষ। সবার আগে মানুষ। চকচকে গাড়ি আর ঝকঝকে পোশাকের মোড়ক পেরিয়ে আমরা মানুষ। সামান্য সুকুমারবৃত্তিগুলো কি ষড়রিপুর অধীনে ফেলে রেখে দাঁত নখ বার করে ফেলতে পারি? মনুষ্যত্বের লেশ নিয়ে দুপায়ে হেঁটে যাবার সময় ‘আরে এ তো সামান্য ব্যাপার!’ এই কথাটা না বলে একটু মন নিয়ে ভাবতে পারব না? দাঁত নখ? তোমার মন নাই মানুষ?

হতবাক অবস্থার মধ্যেও এগিয়ে গেলাম গাড়িটা নিয়ে। হাপুস নয়নে কাঁদছে মেয়েটা। কাশছেও। তার দিদি তাকে বুকে জড়িয়ে বোঝাবার চেষ্টা করছে আর মাই বোধহয়, কোথা থেকে ছুটে এসেছে। মেয়ের কান্না থামেও না। পাঠক/ পাঠিকারা, আমরা সামান্য মানুষ! সারা পৃথিবীর সকলের দায়ভার নিই নি। কিন্তু ওই মুহুর্তে যেটা করতে পারলাম সেটা হল, বেলুনের দাম জিজ্ঞাসা করে দুটো দশটাকার নোট ধরালাম। একটা বেলুন নিজের মেয়ের হাতে দিলাম আর আরেকটা সেই অমানুষটার হয়ে ক্ষমা চেয়ে। মেয়েটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ওই দিদিটা বেলুন দিল? দিল হয় তো! হয়তো সমগ্র মানব জাতির পক্ষ থেকে একটা অক্ষম চেষ্টা মনুষ্যত্ব বাঁচিয়ে রাখার।

মাঝে মাঝে মনে হয় ফিসফাসটা ফিসফাস না হয়ে নিজের ঢাক নাম দিলেই হতো। এ তো শুধুমাত্র নিজের কথা বলা। এই করেছি সেই করেছি। বা হয় তো নিজেকে আয়নায় দেখা অথবা আপনাদের নিক্তিতে নিজেকে মেপে নেওয়া। সে যা হোক। মুখ্য হল মানুষ হওয়া। সবরকমভাবে তো হয়ে ওঠা হয় না। এই যেমন মোড় ঘুরে গাজীয়াবাদে ঢুকে যখন দেখলাম দুটো ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে আর তার কিছু দূরে সেই অলপ্পেয়ে এসইউভি। বিশ্বাস করুন হিরো হবার ইচ্ছে থাকলেও নেমে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারি নি তাদের। ঝামেলায় জড়াতে চাই নি বলেই। কিন্তু পার্শ্ববর্তিনী বা আমি কেউই হয়তো বাচ্চাটার কান্নাটা ভুলতে পারি নি। বেলুনটা বাড়িতে খেলতে খেলতে ফেটে গেল আধ ঘন্টার মধ্যেই। কিন্তু তাও বোধহয় অমানুষদের বুদবুদ ফাটল না। ক্ষণিকের মস্তিষ্কহীন ছ্যাবলামোই হয়ে রয়ে গেল মনুষ্যত্বের আলো আঁধারি ঘিরে।

আর আমাকেও ভাবতে বাধ্য করল সময়, ওই কিচ্ছু না পাওয়া লোকগুলোর কথা। যারা পুলিশের লাঠি আর সমাজবিরোধীদের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকে পরের দিনের সূর্যটাকে দেখার আশায়। সেটাও ঠিক করে দেখতে পায় কি না কে জানে?

(১৬৬)


(১৬৬)

ছেলেবেলা থেকেই আমি ন্যাচারাল অ্যাথলিট ছিলাম না। মানে সেই অনেকে থাকে না? যারা যে খেলাই খেলবে তাতেই দারুণ হবে। আমার পাড়ায় এরকম একটা ছেলে ছিল, বাপ্পা বলে। সে ফুটবল ক্রিকেট ব্যাডমিন্টন ক্যারম সবেতেই চৌখস ছিল। আমার থেকে বয়সে সামান্য ছোট। কিন্তু এই চৌখসগিরিটাকে কোথাও না কোথাও হিংসে করতাম। তা যাই হোক একবার পিকনিকে গিয়ে জলে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে বুঝতে পারি যে ব্যাটা সাঁতার জানে না। ব্যাস তবে থেকেই ওই হিংসে ব্যাপারটা গায়েব হয়ে যায়।

অর্ণব বলে আমার ক্লাসমেট ছিল এক। সেও ওইরকম। কোনদিন ক্রিকেট শেখে নি কিন্তু তাতেও হাতে একটা অসম্ভব ন্যাচারাল আউটস্যুইং ছিল। এতটাই ছিল যে একবার স্কুল ম্যাচে ওকে ক্রস সিমে বল করতে বাধ্য করেছিলাম। কারণ স্যুইং করে বল বারবার ওয়াইড হয়ে যাচ্ছে আর উইকেট কিপার বাপবাপান্ত করছে। যাকগে সেসব কথা অন্য। আসল কথা হল আমার ন্যাচারাল অ্যাথলিট না হওয়া। এই যেমন ধরুন রাহুল দ্রাবিড়। ট্যালেন্ট তো ছিলই কিন্তু শচীন সৌরভের মতো স্বাভাবিক প্রতিভা নিয়ে জন্মায় নি ছেলেটা। অথচ শুধুমাত্র অধ্যবসায় আর মস্তিষ্ক দিয়ে দু ধরণের ক্রিকেটে দশ হাজারের ওপর রান করে বেরিয়ে গেছে ছেলেটা।

ক্রিকেট মাঠে ফিল্ডিঙও আমার কাছে সেইরকম। শুরুর দিকে আউটফিল্ডে লুকোতে হত। তারপর প্রচুর ক্যাচ নিতে নিতে বুঝতে পারলাম ক্লোজ ইন ফিল্ডিংটা আমার চলবে। স্লিপ গালি ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট এসব জায়গায় বল গোলার মতো আসে। কিন্তু বোলারে হাত থেকে ব্যাটের মোটিভ, এসবগুলো নজর করতে পারলে, আর রিফ্লেক্স বাড়ালে অনুমানক্ষমতার জোরে বোল কোনদিকে আসবে বা কত জোরে আসবে সেটা বোঝা যায় আর বাকিটা টেকনিক আর অনুশীলন। আমার একটা বিশেষ প্র্যাকটিস ছিল। ক্যাচিং-এর। যে ক্যাচ দিচ্ছে, তাকে এক হাতে ব্যাট নিয়ে বলটাকে মারতে বলতাম আমার দিকে। আর আমি প্রতিটি ক্যাচ ধরার পর এক পা এক পা করে এগিয়ে যেতাম। তাতে চোখ অভ্যস্থ হয়ে পড়ত। আর চোখ একবার অভ্যস্থ হয়ে গেলে বাকিটা সহজই। এইভাবে স্লিপ বা গালিতে ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর কিছু ক্যাচ আছে। যেগুলো আমার সঙ্গে যারা খেলেছে তাদের জিজ্ঞাসা করলে কুড়ি পঁচিশ বছর পরেও বলতে পারবে আশা করি।

এইভাবেই কভার এক্সট্রা কভারে অনুমান ক্ষমতার জোরে করে দিতাম ফিল্ডিং। খুব দ্রুত মুভমেন্ট না থাকলেও আগে থেকে অনুমানের উপর ভিত্তি করে প্রচুর বাউন্ডারি শট বাঁচিয়ে দিয়েছি ডানদিকে বা বাম দিকে বলের গতি মুভমেন্ট ব্যাটের নড়াচড়া ব্যাটসম্যানের পায়ের নড়াচড়া নজর করে আগে থেকে সরে গিয়ে।

ছেলেবেলায় ফুটবলে গোলকিপিং করতে গিয়ে পেনাল্টিও বাঁচিয়েছি এসবের উপর ভিত্তি করে। আর ডাইভ দেওয়াটা তো দুধভাত। কংক্রিটের উপরেও ডাইভ দেওয়াটাও। গায়ে না লাগিয়ে বিশেষ টেকনিকে মোটামুটি ছ ফুট ডাইভ দেবার ক্ষমতা ছিলই। সেগুলো এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত মঞ্চে লাফঝাঁপ করার জন্য বাচ্চাদের নাটকে শিখিয়েছি। চার ফিট উপর থেকে লাফ দিয়ে মেঝেতে কিভাবে রোল করে পায়ের উপর প্রেশার না নিয়ে উঠে দাঁড়ানো এসব। আর কি।

পাঠক পাঠিকারা, আসল কথাটা এবার বলে ফেলি। এই যে এতক্ষণ ধরে নিজের বড়াই করলাম, এটা হল গৌরচন্দ্রিকা। কালকে রিহার্সালের পর মেয়ে আর পার্শ্ববর্তিনীকে নিয়ে বাড়ি ফিরব। রাস্তা পেরিয়ে গাড়ির কাছে আমি আর মেয়ে। আর পার্শ্ববর্তিনী রাস্তার ওপারে দু তিনজনের সঙ্গে কথা বলছেন। ছোট দু লেনের রাস্তা। বড় রাস্তা না হলেও গাড়ি চলে আর ফাঁকা থাকায় বেশ দ্রুতই চলে। তা গাড়ির চাবিটা খুলে মেয়েকে সামনের সিটের দিক দিয়ে ঢোকাবার জন্য হাতটা ছেড়েছি। চাবিটা ঘোরাতে ঘোরাতে বাঁ চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেলাম, মেয়েটা ‘মা’ বলে চিৎকার করে ছুট লাগিয়েছে আর একটা স্যান্ত্রো তীর বেগে ছুটে আসছে।

পাঠকপাঠিকারা, মেয়ে বা ছেলের মধ্যে পার্থক্য দেখি না। যে কাজগুলো ছেলেটা করবে সবগুলোই যেন আমার ছোট্ট মেয়েটা করতে পারে এই চেষ্টাই করি। পাঁচিলে চড়া গাছে ওঠা লাফ ঝাঁপ এসব বন্য আনন্দ থেকে যেন মেয়েটা বঞ্চিত না হয়, তাই কখনই বাধা দিই না। খালি সতর্ক থাকি, কিছু হলেই যাতে ধরে নিতে পারে। বেশ কিছুদিন আগে খাটের উপর ডিগবাজী খেতে গিয়ে তিনি পড়াক করে মাটিতে ছিটকে পড়ছিলেন আর একটু দূরেই ছিল একটা ট্রাঙ্ক। সহজাত রিফ্লেক্সে পট করে ডানহাতের কাঁধের কাছটা ধরে ফেলে আস্তে করে মাটিতে নামিয়ে দিই। ভয় পেয়েছিল অবশ্যই কিন্তু বিপদ হয় নি।

কালকেও সেই রিফ্লেক্স নিয়ে শরীর এবং হাত ঘোরাই। আমার ডান হাঁটুর এসিএল আংশিক ছেঁড়া। অর্থাৎ লিগামেন্ট। দেড় বছর আগে মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ার সময় হাঁটুটা আরও চোট পায় কিন্তু দু হাতে মেয়েটাকে চোট লাগতে দিই নি।

খেলাধুলো ছাড়ার বহু বছর পরে দশ বছর আগে অফিস ক্রিকেটে ইণ্ডিয়ান অয়েলের সঙ্গে খেলায় ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে মারা স্কোয়ার ড্রাইভ ব্যাট থেকে শেষ পর্যন্ত নজর রেখে শরীরের পিছনে ঝাঁপিয়ে দু হাতে না পেয়ে এক হাতে ক্যাচ করি।

ঠিক একইভাবে সেকেণ্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে গাড়িটার হেডলাইটের আলো চুরি করে বাঁহাত ছুঁড়ে দিয়ে মেয়েটার ডান হাতের কনুইয়ের কাছটা কোনরকমে ধরে ঝটকায় বুকের কাছে নিয়ে নিই। গাড়ি বিকট শব্দে থামে। আমায় সামনের সীটে বসা মহিলা জিজ্ঞাসা করেন লাগে নি তো। আমি ‘না’ বলায় ওঁরা বেরিয়ে যান। রাস্তার ওপারে যাঁরাই ছিলেন ছুটে এদিকে চলে আসেন। মেয়েটাকে বকতে গিয়েও দেখি সে ঘাবড়ে গেছে। তাই সান্ত্বনা দিয়ে মেয়েকে মায়ের কাছে ছেড়ে দিয়ে নিজের গাড়ির ড্রাইভিং সীটের দরজাটা ফাঁক করে দাঁড়াতে গিয়ে বুঝতে পারি, বাঁ কাঁধের ডেল্টয়েড আর পাঁজরের কাছের পেশীতে ভয়ানক টান লেগেছে। আর টান লেগেছে পাঁজরের ভিতরে হৃৎপিণ্ডে।

‘আমি ভয় পাই না’ এই কথাটা বলা খুব সহজ। আমি সেটা বলি না। বরং বলি, ভয় পেলেও দ্রুত সেই ভয়টাকে জয় করে ফেলি। ফলে যখন মানুষ ভয় পেতে শুরু করে ততক্ষণে আমার তার সঙ্গে মোকাবিলা করা হয়ে গেছে। কাল বিকেলেই ছেলের স্কুলের কাছে এক মার্কেটের সিঁড়ি থেকে নামার সময় একটা কালো মতো চার পেয়ে সিং সমেত দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেটা ‘বাপরে’ বলে অন্য দিক দিয়ে চলে গেল। আমি সেসব না করে সেটাকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে গিয়ে দেখি সেটা ষাঁড়। ষাঁড়েদের আবার আমি একটু সমঝে চলি। বহুদিন অব্জার্ভ করে দেখেছি, তারা গরু আর বিচুলি ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। বাকিগুলো দেখতে পায় না। তাই কালকেও আমিও ধাক্কা দিয়েই, ‘কোই বাত নেহি’ বলে ঘুরে চলে যাই।

কিন্তু ভয়? এরকম ভয় আমি বহু দিন পাই নি। বহুদিন। কুড়ি বছর আগে গার্ল ফ্রেন্ড সহ কলেজ স্কোয়ারে টিটকিরি দেওয়া জনতার মুখোমুখি হতেও পাই নি অথবা যখন সেন্ট্রাল স্টেশনের সামনে রাস্তা পেরবার সময় গতি নিয়ে গালাগাল দেবার অপরাধে হিন্দি/ উর্দুভাষী দুজন গাড়ি থামিয়ে বেরিয়ে এসে আমাকে পিছন থেকে ধরে আমার বান্ধবীকে যখন শাসাচ্ছে, ‘ইসকো লে যা নেহি তো ইয়েহি পে গাড় দুঙ্গা’, তখনও না। শেষোক্ত ক্ষেত্রে তো তারা পুলিস দেখে আমাকে ছেড়ে গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে যাবার সময় দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে তাদের চেসও করেছিলাম। এমনই ক্যারা মাথায়। কিন্তু কালকে আমার অস্তিত্বটাই টলে গেছিল। বাবা হবার অস্তিত্ব, দায়িত্ববান নাগরিক হবার, মানুষ হবার সামান্য জীব হয়ে বেঁচে থাকার অস্তিত্ব। একটা জিনিস হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। আমার রিফ্লেক্স আগের মতো না থাকলেও একটা বেশ কম্যান্ডিং জায়গাতেই আছে। কিন্তু আরও বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে অন্তত পরবর্তী দু তিন বছরের জন্য। যতক্ষণ না পর্যন্ত মেয়েটা পারিপার্শ্বিক বিপদগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়।

আপনাদেরও বলছি। আয়েশের বালিশটাকে চর্বির পরতে কোমরের চারপাশে মুড়ে না রেখে একটু গা ঝাড়া দিন। এরকম না হলেও হয়তো অন্য কোন বিপদ আপনার জন্য ঘাপটি মেরে আছে। আর কিছু না হলেও সঠিক সময়ে পলায়ন তো সম্ভব হবে!

(১৬৫)

দেখতে দেখতে একাত্তর বছরে পদার্পণ করল আমাদের স্বাধীন ভারতবর্ষ। এ গলি থেকে জনগণমন(এখানে হসন্ত ব্যবহৃত হয়), ও গলি থেকে সারে জাহাঁ সে আচ্ছা। ইমোশনের চোখের জল আর বাধ মানে না। গড়াতেই থাকে গড়াতেই থাকে ঘড়া তো শূন্য হবার নয়।
আসলে দেশ আমাদের মতো সত্তরের দশকে জন্মানো মানুষগুলোর কাছে অন্যভাবে এসেছে। আমরা জরুরী অবস্থা দেখি নি, নকশাল আন্দোলন দেখি নি ট্রাম পোড়ানো দেখি নি। হান্টের পতাকা বাঁচাতে দৌড়ও দেখি নি। আমাদের কাছে স্বাধীন ভারতের স্বাদ নিয়ে এসেছিল জাতীয় সঙ্গীত। রবি ঠাকুরের ক্ষোভ রাগের প্রতিক্রিয়া। যা প্রায় একশো বছর ধরে দেশের ধারণা ভারতবাসীর হৃদয়ে ম্যাপের মতো এঁকে দিচ্ছে।
সালটা ১৯৮২। সেই প্রথম দেখলাম পতপত করে তিরঙ্গা উড়লে আর জনগণমন বাজলে (আসলে জনগণমন আমাদের প্রাণের ডাক, তাকে জাতীয় সঙ্গীত বা রাষ্ট্রগানের মতো ভারিক্কি নামে ডাকতেই ইচ্ছা করে না) চোখ দিয়ে আপনা আপনিই জল বেরিয়ে আসে বুকের ভিতরটা ভরে যায়। সেবারের ৭-১এর লজ্জার পরেই ১৩বার বেজেছিল সেই গান।
আর তার পরের বছর তো কথাই নেই। লালমুখোদের রোমরাজ্যে লর্ডসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পাঁচফুট চারের সেই বেঁটে মতো লম্বা মানুষটা যখন পাঁচ ফুট এগারোর হ্যারিকেনের আগুনটাকে তুলে ধরল আর পতপত করে তিরঙ্গা নিয়ে কোন এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি ছুটতে আরম্ভ করল লর্ডস জুড়ে। কি বলব একটা সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত নেশন (দেশ নয় দেশ নয়। পরিচিতিযুক্ত দেশকেই ত নেশন বলে!) যেন সকালের আনন্দবাজার যুগান্তর টেলিগ্রাফের পাতায় পাতায় জেগে উঠল কবির সেই পঙক্তি নিয়ে, ‘ভারত আবার জগতসভার শ্রেষ্ঠ আসন লবে’।
সেই ছিল ভারতবর্ষের প্রথম রূপ। আমার কাছে। মনন তখন তৈরী হচ্ছে গোঁফের রেখা উঠছে। দেশের এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে দেশটাকে ধরতে শিখলাম। দুহাতে, বুকের উপর। এদিক ওদিকের কলরব তখন কানে আসে না। ময়দানে সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক দেখে গর্বে বুক ফুলে ওঠে। দিল্লিতে ইন্ডিয়া গেট দেখেও।
বড় হলাম আর ঠাঁই হল এই কেঠো শহরে। কার্গিলের যুদ্ধের সময়ই। জাতীয়তাবোধ তখন নিজস্ব বোধে রূপ নিয়েছে। খারাপ ভালো পূতিময় দুর্গন্ধ ফুলের নির্যাস সবই দেখতে শুনতে চাখতে শুঁকতে শুকতে এগোচ্ছি।
সোশাল মিডিয়া এলো আর এলো নিজের একটা ঠিকানা। দুই জায়গাতেই মনন রাখতে শুরু করলাম। দেশ সম্পর্কে ধারণা দেশের ভালো কি করে হতে পারে এসবগুলো জিঙ্গোইজম পেরিয়ে তখন বুকে ঠাঁই পেতে শুরু করেছে। ২০০৫ থেকে আমার সোসাইটি। এখানকার ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীনতার মানে নিজের মতো করে বোঝানো। নিজের সন্তানদের বোঝানো এইভাবেই বেশ চলছিল।
কিন্তু গত কয়েকবছরে হঠাৎ দেখছি জাতীয়তাবোধের মানে বদলে গেছে। জনগণমন এখন নতুন অস্ত্র, ভারতবাসীকে জাতীয়তাবোধের মানে বোঝানোর জন্য। স্বামীজী এখন ডানপন্থীদের হাতিয়ার আর সুভাষ বোস বামপন্থীদের। বেশ কিছু বছর আগের কথা, একটা কবিতা লিখেছিলাম। যদিও তখন বুঝতে পারি নি যে কবিতা ফবিতা আমার নয়। তবুও দু কলি শুনিয়ে দিই কি বলেন?

সুখেই থাকুন
নরম নরম। ও দাদা নরম নরম কাব্য মাখুন গরম গরম ভাতে
ফুলেল তেলে বাবরি ভাজা সঙ্গে রাখুন পাতে
আহ্লাদেতে আটখানা হোন ফ্যাশন টিভি দেখে
পরের বউকে চাকুমচুকুম নিজের বউকে রেখে
আড্ডা জমান গমগমিয়ে তুফান তুলে চায়ে
পাড়ার রকেই পাহাড় ডিঙোন বরফ ঘষুন গায়ে
সৌরভেরই ব্যাট ধরে রোজ ছক্কা মারুন তেড়ে
মুগুর ভাঁজুন, মুরগি ভাজুন চর্বি তেলে ছেড়ে।

যুদ্ধে যাবেন? ও দাদা যুদ্ধে যাবেন দেশ বাঁচাতে কামান নিয়ে হাতে?
তার চেয়ে নয় মুখেই মারুন পাকিস্তানকে ভাতে।
আকাশ ছোঁয়া বাজার দরে শেয়ার বাজার কাত?
আপনি বরং ঘাপটি মারুন দিনকে করুন রাত
তাজ হোটেলে চললে গুলি গুনতে থাকুন লাশ
রাজনেতাদের মুণ্ডু ছিঁড়ে গলায় লাগান ফাঁস
দাঙ্গা হলেই সটকে পড়ুন ব্যস্ত থাকুন কাজে
আপনি দাদা মহামানব, আর ব্যাটারা বাজে

স্বপ্ন দেখুন। ও দাদা, স্বপ্ন দেখুন আকাশকুসুম পাশবালিশে পা
ভাবতে থাকুন দেশের ভালো করতে যাবেন না
আপনি দাদা ভীষণ ভালো আপনি থাকুন শুয়ে
অন্যে বরং শপথ করুক পড়বে না কো নুয়ে
লড়বে ওরা কাঁধ মিলিয়ে গড়বে এদেশ সোনা
করবে তখন দেশের বুকে সুখের আনাগোনা
আপনি দেখুন, ওরাও দেখুক, স্বপ্নতে নেই ক্ষতি
আপনি বরং স্থবির থাকুন ওরাই আনুক গতি।।

কাব্যগুণ নিয়ে টেনশন করবেন না কিন্তু যারা লেবেল লাগাতে যাবেন তারা ধন্দে পড়ে যাবেন বাম না ডান? ওসব ছাড়ুন আজকে আমাদের সোসাইটির গল্পটা বলি।

এই যে বলেন যাঁরা বাংলায় থাকেন তাঁরা কত দুরবস্থায় আছেন ইত্যাদি। আসলে আমাদের মতো যাঁরা তথাকথিত আলোকপ্রাপ্ত অথচ পরদেশে আছি তাঁদের কথা ভাবুন। আমাদের সোসাইটির একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছিল। যেখানে কয়েকটা ডানপন্থীর ভীষণ আনাগোনায় নিজে থেকেই অব্যহতি নিয়েছি। আর ওই যে বলছিলাম না, দেশভক্তি, স্বাধীনতা দিবস ইত্যাদি। এসব আমি ২০০৫ থেকে বেশ করাতাম ২০১৪-১৫ অব্ধি। তারপর দেখছি পৃথিবীটা কেমনবদলে বদলে যাচ্ছে। সেইসব ডানপন্থী ভীষণবাদীরা দেশের মানে শেখাতে চলে এসেছেন হাতে চাইনিজ মোবাইল নিয়ে চিন বয়কট করার ডাক দিয়ে। আজ দেখলাম জাতীয় পতাকার নীচে অখণ্ড ভারত মাতার চিত্র। ভিতর ভিতর কাঁপছি কিন্তু বলতে পারছি না। দৃপ্তভাবে জাতীয় সঙ্গীত গাইলাম হিন্দি উচ্চারণে নয়। বাংলায়। তারপর ভাষণ টাশন শুনে মাথা গরম হয়ে গেল। চলে এলাম কোন সিন ক্রিয়েট না করে। অখণ্ড ভারতের স্বপ্নটাকে জাতীয় স্বেচ্ছাসেবকরা স্বপ্রণোদিত হয়ে এভাবে কচিমনে ছড়াবার চেষ্টা করছে দেখে বিচলিত বোধ করছি। সোসাইটি মিটিংএ কথাটা হয় তো তুলব। কিন্তু কতটা কি করতে পারব জানি না। তবে চেষ্টাটা তো চালিয়েই যেতে হবে বলুন। পরবর্তী প্রজন্মকে কি এই ভেঙে যাওয়া সমাজ রেখে যেতে পারি? কবিতাটা খিল্লি ছিল বটে কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিটা নয়। সতর্ক থাকুন এবং সঠিক স্থানে গলায় জোর আনুন। আমিও আনব। ঠিক আনব। আর আনলে সবার আগে আপনাদেরই জানাব। কথা দিলাম।

আরেকটা কবিতাও দিই। যতই পাতে দেবার মতো না হোক।

ঠোঁটের উপর দাঁত দিয়েছি মেরে
নখের ভিতর লুকিয়ে আছে নখ
আমরা তবু বলছি গলা ছেড়ে
অবিশ্বাসী তোমারই জয় হোক

সুখের ভিতর বসত করে সুখ
বুকের ভিতর একটুকু সুখ থাক
বুকের ভিতর মুখোশ পরুক মুখ
সুখের পাখি ডানায় উড়াল পাক

পাঁকের ভিতর লুকিয়ে রাখা সোনা
সোনার উপর ছিঁড়ে রাখা জাল
দেখছি কিন্তু বলছি, দেখব না
জালের নীচে পাতানো জঞ্জাল।

রথের ভিতর হৃদয় আসন পাতে
রথের উপর বানিয়ে রাখা খাঁচা
রথের রশি আসুক তোমার হাতে
খাঁচার পাখির পথ ভোলানো বাঁচা

মেলুক ডানা আকাশ কুসুম ছুঁয়ে
মেলুক ডানা দিগন্তে বিস্তার
যেখানে আর পড়ব না কো নুয়ে
সেখানে হোক শান্তির পারাবার।।

সেই ইউটোপিয়াটাই খুঁজে চলি… কেমন?

(১৬৪)

সেই রামজন্মের আগে শেষ ফিসফাস লিখেছিলাম। তারপর লব আর কুশও দাদু হয়ে গেল। প্রশ্ন উঠতে পারে, আবার কেন? কেন আর কী! আমার এই হেলদোলহীন জীবনের একমাত্র কনফেশনের জায়গা হল ফিসফাস। আপনাদের সামনে গলায় গামছা দিয়ে করজোড়ে বিনীত নিবেদন।

দেখুন পাঠক/ পাঠিকারা, কেসটা হল আমার মাথায় বেশ অনেকধরণের ক্যারা আছে। কিন্তু বয়সকালে হাঁটুর ঠকঠকানি আর কব্জির ফড়ফড়ানি বাড়ার পর এক বিশাল বড় নিঃশ্বাসে বুক ভরে অক্সিজেন নিয়ে তাতে অবদমিত রাগমাগ ডুবিয়ে দেবার একটা কায়দা প্রায় মেরে এনেছি। কিন্তু প্যাসকেলের সূত্র- ফুস করে আরেক ফুটো দিয়ে জল বেরিয়েই যায়।

যে ঘটনা দুটি বলছি তাদের মধ্যে ব্যবধান বিস্তর। উভয় ক্ষেত্রেই সিংহভাগ দায় আমার। (আহ এই যে আপনাদের বলতে পারছি এতেই কত গ্লানিবোধ দূর হয়ে যাচ্ছে। স্বর্গের সিঁড়ির উপর পড়ে থাকা আবর্জনা সরে যাচ্ছে। বেশ একটা হার্প হার্প নাকি বেহালা টেহালার সুর শুনতে পাচ্ছি।)

প্রথমটা বেশ মাস পাঁচেক আগে ঘটেছিল। ভেবেছিলাম ভুলে যাব। কিন্তু ওই আর কি- বিবেকের কাঁটা ইলিশের ন্যায় কপাৎ করে গলায় আটকে গেছে।

যাক ভ্যানতারা দূর হউক। গল্পে নামি। হয়েছিল কি, অফিসের রাস্তায় যাচ্ছি গাড়ি হাঁকিয়ে, এমন সময় একটা ওয়াগন আর (অবশ্যই ড্রাইভার সমেত) এসে বার দুয়েক এদিক ওদিক দিয়ে ভয়ঙ্কর ভাবে রাস্তা কেটে গেল। কোন রকমে ব্রেকে পা দিয়ে, একবার তো বাসের সামনে পড়তে পড়তে বাঁচলাম। একদম হুজুর মাইবাপ মার্কা সত্যি বলছি! দশবারের মধ্যে সোয়া নয়বারই ওই অক্সিজেনে দুঃখ ডুবিয়ে কেটে পড়তাম। সেদিন যে কি হয়ে গেল। গাড়িটাকে চেজ করে তার পাশাপাশি গিয়ে বলতে গেলাম। সে অমনি এক গাল গালাগাল দিয়ে ডান হাতের মধ্যমা দেখিয়ে কেটে পড়ল।

এবারে না মাথার ক্যারা চুলের ডগা বেয়ে নেমে এল যেন। ধূসর ওয়াগন আরের গা বরাবর গিয়ে নিজের গাড়িটা দিয়ে হালকা করে চুমু খেয়ে কেটে পড়লাম। এবার বিড়াল আর ইঁদুরের রোল রিভার্সাল। সে আমায় চেজ করছে, আমি খুব আরামসে এদিক ওদিক স্মুদলি সরায় কালে খাঁ অব্ধি চলে এলাম। এবারে সামনে রেড লাইট আর ওয়াগন আর আমার পাশে। আর আমি খুব মনোযোগ সহকারে সামনের দিকে তাকিয়ে। কাঁচ নামিয়ে সে তেড়ে গালাগাল করছে, কিন্তু আমি শুনছি না। এবারে করল কি দুম দুম করে হাত দিয়ে মেরে আমার সাইড ভিউ মিরর ভাঙতে লাগল।

সত্যি বলছি পাঠক/ পাঠিকারা। এই বাহন টাহন সম্পর্কে আমার খুব ইয়ের টান। সেই ক্লাস নাইনে আমার থেকে বছর দশেকের বড় পাড়ার মস্তান ‘লুচি’র সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলাম কিন্তু ‘বাপের সম্মান’-এর কথা চিন্তা করে তার চিন চারটে ঘুষিটুসি বিনা বাক্যব্যয়ে হজম করেছিলাম। কিন্তু সে যে আমার সাইকেল ভাঙতে যাচ্ছিল। ব্যাস জাস্ট ডান পা আগে ডান কাঁধ ঝুঁকিয়ে দুটো আপার কাট। একটা ঠোঁটে আর একটা ডান চোখের পাশে। সে একদম দেখবার মতো কেস হয়েছিল বটে।

এখানেও তেমনই একটা ফিলিং হল যেন। সামনে রেড লাইট সেখানে পুলিশের ভ্যান দাঁড়িয়ে ফুটপাথে ট্রাফিক পুলিশ। এসব কিচ্ছু খেয়ালে থাকল না। জাস্ট গাড়ি খুলে নামলাম। আমার মোবাইলটা চার্জড হচ্ছিল গাড়ির মিউজিক সিস্টেম থেকে এবং রাখা ছিল আমার ডানহাতের দরজার উপর। সেটা ছিটকে নিচে পড়ল। সেটাকে তুলে রেখে গাড়ি খোলা অবস্থায় ওয়াগন আরের পাশে গিয়ে চালকের থোবড়ায় একটা ঝাড়লাম। এবারে পরিষ্কার হুক! আর তখনই আমার চল্লিশোর্ধ টনক নড়ে উঠল বিপুল বিক্রমে। দেখি ট্রাফিক পুলিশটি ভিডিও করে নিয়েছে। আর পিসিআর ভ্যান থেকে দুটো কনস্টেবল ছুটে আসছে। কিন্তু ভিতরটা তখনও কাঁপছে রাগে।

উফ এসব জায়গায় মিঠুনদার দরকার ছিল। একটা কাঁধ ঝাঁকি আর সব্বাই উড়ে উড়ে গিয়ে শুয়ে পড়ত। কিন্তু ততক্ষণে ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে হবে। ঘুষি খেয়ে তো সে হরিদাস পাল ময়দানে নেমে পড়েছে। এর আগে কি ঘটেছে কেউ জানে না। খালি আমি ঘুষি মেরেছি এটাই ভিডিও! এটাই বাস্তব। পুলিশ তো আমায় দুদিনের রিমান্ডে পাঠাবেই। তারপর বেপরোয়া গাড়ি চালানো রয়েইছে। আর তার সঙ্গে হরিদাস পাল তো একে ডাকে তাকে ডাকে। আমার মাথাটা খারাপ হতে হতেও যেন দৈব বলে বেঁচে গেলাম। প্রায় দশ মিনিটের প্রচেষ্টায় পিসিআরের দুই কনস্টেবলকে নিরস্ত্র করতে পারলাম। মানে ঘটনাটা বোঝালাম আর কি! তারা বিচক্ষণ, কিন্তু বলল- হরিদাস পাল ইতিমধ্যেই ১০০-এ ফোন করে দিয়েছে। আর আইডিয়ালি সামনে যখন পিসিআর ভ্যান ছিল আমার সেখানেই দৌড়ে আসার কথা ছিল। বললাম আমার অবলা গাড়ির উপর আক্রমণ হয়েছে কি করে ওসব আইডিয়াল ফাইডিয়াল মাথায় থাকে! দেখলাম সেটাও বুঝল। কিন্তু ১০০-এ ফোনটাই চাপের। তারপর বলল ‘আপ উনসে নিপট লিজিয়ে’! কি আর করি! তখন তো আপনি বাঁচলে হয় তারপর জাতির জনক। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফাটা কষে হাত বুলিয়ে তুলো ডেটল (পিসিআর ভ্যান থেকে নিয়ে) বুলিয়ে তারপর দুটো স্বচ্ছভারতের নতুন সবুজ সার্টিফিকেট দিয়ে তারপর রেহাই পেলাম। বললাম কিচ্ছু ডেন্ট হয় নি। এতেই সারাই হয়ে যাবে গাড়ির। যদিও জানি তিনশো টাকাও লাগার কথা নয়।

তারপরেও হরিদাস পাল বলে কি, ‘ইনকা কুছ কর দো!’ পিসিআরের পুলিশ তখন দেখি চেগে গেল। এমনি তে আমি দিল্লিতে খারাপ পুলিশ প্রায় পাইই নি। এরা তো তখন দেবদূত। হরিদাস পালকেই ঝেড়ে দিল। বলে, ‘আপকা তো হো গয়া আব মিউচুয়ালপে সাইন কর দিজিয়ে অউর ভাগিয়ে। হাম আপনা নিপটনা জানতে হ্যায়!’ হরিদাস পাল তারপর গেল নিজের গন্তব্যে। তখন ট্রাফিক পুলিশ এবং পিসিআরের দুই দেবদূতকে সামনে রেখেই বললাম, ‘এক বাত বোলে? ইয়ে আদমি আচ্ছা নেহি থে!’ জ্ঞান বৃক্ষের পেয়ারা খেয়েছি কি না? তা দেবদূতের একজন বলল, ‘ও তো হাম সমঝই গয়ে থে যব ইসনে হাজার রুপয়া লে লিয়া। গাড়ি কো কুছ হুয়াহি নহি হ্যায়! পর আপকো ভি হাত উঠানা নেহি চাহিহে থা! চলিয়ে জী রাম রাম!’ আর হিসাব কিতাব? আরে সরকারি চাকরদের আবার হিসাব কিতাব কি? সততা বলে একটা জিনিস আছে না?

সে যাই হোক সেদিন থেকে নাক কান মুলেছি। রাস্তায় কারুর সঙ্গে ঝগড়া নয় এমন কি চোখাচোখিও নয়। এই যেমন গত পরশু। একটা গলি থেকে বেরোবার সময় হাতের মোবাইলটা সামনে সেট করে রাখতে গেছিলাম। সামনের রাস্তায় যে গাড়িটা যাচ্ছিল তার ধারে কাছেও কোন ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু তার মনে হয়েছিল আমি মোবাইলে কথা বলছি। (গাড়ি চালাতে চালাতে আমি কথা বলি বটে, কিন্তু হ্যান্ডস ফ্রি না থাকলে বলি না!) সে অমনি ক্যাঁচ করে আমার গাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যুদ্ধং দেহি মনোভাবে বেরিয়ে এসেছিল। আমি ডানদিকের জায়গাটা দেখলাম আর টুক করে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম। রোড রেজ বড়ই ভয়ঙ্কর জিনিস। যাদের হয় তাদের জন্য একটা রেড রোজ আর জাদু কি ঝাপ্পি রেখে গেলাম।

আর ইয়ে, আমি কিন্তু এমনিতে ল্যাজবিশিষ্ট। আগে অন্য কিছু হত। তবে এখন ল্যাজের বিশেষ জায়গায় পা না পড়লে শান্তশিষ্টই থাকি। আর বিশেষ জায়গা বা সুইট স্পট তো কমিয়েই আনছি জীবনে। হাজার হোক ছেলে মেয়ের বাপ বলে কথা!

(১৬৩)

 

উফফ কত্তদিন বাদে দেখা বলুন তো? কেমন আছেন পাঠক/ পাঠিকারা? এর মধ্যে গঙ্গা দিয়ে প্রচুর জল আর যমুনা দিয়ে প্রচুর অ্যাসিড বয়ে চলে গেল! চাঁদের রঙ নীল থেকে বদলাতে বদলাতে হলদেটে হয়ে গেল! আর দু চারটে পাকা চুল মাথায় গালে বংশ বৃদ্ধি করে ফেলল!

আমার খবর? তা খবর বলতে দুটো-
এক) সৃষ্টিসুখ প্রকাশন থেকে একটা গল্পের বই প্রকাশ পেল আমার। ‘ইয়র্কার এবং অন্যান্য গল্প’। দিল্লিতে পুজোয় আর কোলকাতায় বন্ধুদের সঙ্গে তার হইহই করে উন্মোচন হয়েও গেল মোড়ক।
দুই) অবসরে প্রকাশিত ফিসফাস কিচেন এখন কলেবর বাড়িয়ে বই আকারে আসতে চলেছে বইমেলায়!
সবই আপনাদের ভালোবাসা আর কি!

তা যাই হোক, আজ বেশী ফেনাব না! ছোট ছোট গল্পে এতকালের অদেখা যাপন কাটিয়ে নেব আপনাদের সঙ্গে। নম্বর টম্বরের দরকার নেই! কি বলেন?

গাড়িটাকে নিয়ে মাঝে খুব ভুগলাম জানেন! যদিও নব্বই হাজার কিলোমিটার সঙ্গ দিল! এখনও হাজার তিরিশ চল্লিশ আরামসে দিয়ে দেবে! কিন্তু নিজের গুরুত্ব বোঝাবার জন্য মাঝে মাঝেই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে! সেখানেই সমস্যা!

একদিন আইটিও ফ্লাইওভারের পরেই ক্লাচের তার কেটে বসল! আর যাই কোথা! ঠেলতে শুরু করলাম এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে। অভ্যাস নেই। কোন রকমে ঠেলতে ঠেলতে কিছুদূর যাবার পর দিলাম এক গাড়ির সাইডে ঠুকে। সে আমার সেই অবস্থাতেও বেরিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ করে বসল। লাও! ঠাণ্ডা গলায় বললাম, ‘দেখো জি! থককে চুর হো গয়া! ঝগড়া করনে কা একদম মুড নেহি হ্যায়! যাদা বোলোগে তো ও যো পাত্থর পড়া হুয়া হ্যায় আপকে সরপে বইঠা দুঙ্গা! সেও হেবিজোর ঘাবড়ে গিয়ে চেল্লামেল্লি লাগাল! আমি পাত্তা না দিয়ে চলতে শুরু করলাম।

দেড় কিমিটাক চলার পর এক অটো এগিয়ে এল সাহায্যের পা নিয়ে! ড্রাইভারটি একশোটি টাকার বিনিময়ে পা দিয়ে ঠেলে দেবে অটো চালাতে চালাতে! এইভাবে যদি কিছুদূর যাওয়া যায়! গেলামও! তিন কিমি দূরের এক মেকানিক শপের সামনে যখন পৌঁছলাম তখন বাজে সাড়ে ছটা। সেদিন আবার রিহার্সাল। পার্শ্ববর্তিনীকে বললাম ওলা বুলা লো! তার মধ্যে আবার টিপটিপ বারিশ! আর মেকানিক দেখে বলল, ওয়েল্ডিং খুলে গেছে, এখন লাগানো সম্ভব হবে না! লাও ঠ্যালা! অটোটাকেও ছেড়ে দিয়েছি!

কোন অটোই আর অ্যাটলাসের বোঝা বইতে রাজী হচ্ছে না! ক্রসরোড বলে এক দীনবন্ধু কোম্পানির মেম্বারশিপ নেওয়া আছে। যদি বিপদে আপদে সাহায্য করে! তা সে বলল রাত দশটার আগে গাড়ি টেনে নিয়ে যেতে আসবে না! সামনে এদিকে রেললাইনের নীচ দিয়ে যাবার জন্য আণ্ডারপাস। তারও আগে রাস্তা অর্ধেক তৈরী হয়েছে বলে বাঁ দিকে জল জমে আছে! যা থাকে কপালে! ঠেলা লাগালাম। গত আড়াই ঘন্টায় গাড়ি ঠেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ঠিক কায়দা করে জলের উপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে আমি নিজে শুকনোর উপর দিয়ে হেঁটে এলাম। বৃষ্টি তখন থেমেই গেছে। কিন্তু ভিজেই গেছি, ঘামে! তারপর ঢালে দাঁড়িয়ে গাড়ি ঠ্যালা দিয়ে ঠনঠনে হাঁটু নিয়েই লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিতেই গিয়ারে ফেলা গেল! যাক বাবা, বলে আণ্ডারপাস প্রায় পেরিয়ে এনেছি ও বাবা সামনে গাড়ির জ্যাম দেকে উল্টো ঢালেই গেল গাড়ি বন্ধ হয়ে। মাঝ রাস্তায় ব্রেক মেরে চুপচাপ বসে আছি। পিছনে ভঁকভঁক হর্ণ পড়ছে গাড়ির লাইন! কিন্তু বেরব কি করে? ব্রেক থেকে পা সরালেই গাড়ি হড়কাবে পিছনের দিকে। হ্যাণ্ডব্রেকে কাজ হবে না! যাই হোক কয়েকজন অটোওলা ছিল কাছাকাছিই তাড়া ছুটে এসে ধরল পিছনের দিকে তারপর ধাক্কা দিয়ে দিল। আর গাড়িও গিয়ারে মেরে চালু করে দিলাম।

বেশী না, আধ কিমি! তারপরেই রেডলাইট। যাই হোক এগোতে শুরু করলাম। গলির দিকে! সামনে একটা গাড়ি রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়িতে নটা বেজে গেছে। অনুরোধ করতে গেলাম গাড়ি সরাবার। জ্ঞান দিয়ে বসল, অ্যা্যসে থোড়ি হোতা হ্যায়! আপ টো করওয়ানে গাড়ি বুলালো ইত্যাদি! যাই হোক। কোন রকমে ম্যানেজ করে গলির মধ্যে ঢুকতে হেল্প জুটে গেল। পৌনে দশটায় গলির মুখে আরেকটা ঢালে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করলাম এক ঠ্যালা মারুন! দিয়েও দিল! ব্যাস আর দেড়শো মিটার ভোঁ ভাঁ হর্ণ দিয়ে পৌঁছে গেলাম বাড়ির কাছে। তারপর রিহার্সাল (মিউজিক রিহার্সাল ছিল) দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পরের দিন গাড়ি সারিয়ে।

তা বেশ ছিল। সার্ভিসিং করাব করাব ভাবছি তার আগে শনিবার গ্রেটার নয়ডার স্কুল থেকে ছেলেকে আনতে যাচ্ছি। বেশি না, বাড়ি থেকে ৪৫ কিমি। নয়ডার মহামায়া ফ্লাইওভারের পর আরও পঁচিশ। তা মহামায়া ফ্লাইওভার পেরিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে পড়তেই ফটাং করে আওয়াজ! ক্লাচ গায়েব! লাও ঠ্যালা! ভাগ্যিস গাড়ি ফোর্থ গিয়ারে। আমি ক্লাচ ছাড়াই গাড়ি ষাট-আশি গতিতে চালাচ্ছি, বন্ধুকে ফোন করলাম, গ্রেটার নয়ডায় থাকে গাড়ির ঘাঁট ঘোঁট জানে। বলল পঁচিশ কিমির শেষে এক মার্কেটে মেকানিক আছে! গাড়ি টো করতেও পারবে! আমি বললাম আমি মাথা ঠাণ্ডা করে চালাচ্ছি, কোথাও থামব না! বড় কিছু ঝামেলা না হলে পৌঁছিয়েও যাব সেই অব্ধি! কিন্তু তারপরেই দরকার। তো ফোন করে দিলাম। আর আধ ঘন্টা ক্লাচ ছাড়াই কায়দা করে চালিয়ে পৌঁছেও গেলাম। সে অপেক্ষাতেই ছিল। কাদির নাম তার! যত্ন করে ঠিক ঠাক করে দিল। আর পরদিন বাড়ি ফিরেই দিয়ে দিলাম সার্ভিসিং করাতে।

তারপর আর কি! দিন দুয়েকের মধ্যেই “মেরে পেয়ারে দেশবাসীও কাল কুছ যাদাই হো গয়া থাআআ!” ব্যাস গেলো কাণ্ড। পরের দিন গাড়ির ফাইনাল সার্ভিসিং করিয়ে পেমেন্ট করব বলে ব্যাঙ্ক থেকে পাঁচ হাজার ছশো টাকা তুলতে গেছিলাম সেই সন্ধ্যাতেই! তা এটিএম ব্যাটা বলে পঞ্চাশ আর একশো নেই! এগারোটা পাঁচশোর নোট। তার মধ্যে বাজারটাজার করতে একটা চলেই গেছে। ব্যাস হাতে পৌনে চারশো টাকা আর দশটা পাঁচশোর নোট। আমি পথে! তা যা হোক, অনেক ঘাতপ্রতিঘাতের পর নিজেকে শিখিয়েছি যাই হোক বিচলিত হব না! তা পথ পেয়েও যাচ্ছি। দুটো বড় নোট একটু বেশী সব্জি কিনে ভাঙিয়ে ফেললাম। আর তারপর ব্যাঙ্কে দাঁড়িয়ে বার দুয়েক টাকাও তুলে ফেলেছি অচল আটটি পাঁচশো ফেরত দিয়ে। সময় যাচ্ছে বটে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে মজাও হচ্ছে। দুঃখও হচ্ছে। মানব জীবন দেখতে পাচ্ছি যেমন তেমন।

বয়স্ক এবং বিকলাঙ্গদের জায়গা করে দেবার ব্যাপারে দিল্লি অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে মহিলাদের প্রতি ব্যবহারে আবার লাইনেই আসে না। এক ভদ্রমহিলা, সন্তান কোলে আমার দু তিন জনের পিছনে ছিলেন বলে প্রথম দিকে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে অনুরোধ করতে গেলাম। সে বলে খাড়ে রহনে দো! লাও! মনে হচ্ছিল ব্যাটাকে এটিএম-এর মেশিনে ঢুকে পিস পিস করে দিই। কিন্তু মানবজাতি এখন অনেক সভ্য হয়ে গেছে। ভদ্র হয়ে গেছে। এখন আমরা কাউকে বিপন্ন দেখলে ছুটে গিয়ে সাহায্য করি না, রাস্তায় আহত কাউকে দেখলে পাস কাটিয়ে চলে যাই, আর তেড়ে সরকারকে গালাগাল দিই কাজ করার বা না করার জন্য! তাই স্বগতোক্তি করেই রাগ ছাঁটাই করতে হয়। সেইভাবেই আছি। খরচ কমিয়ে হিসাব কষে বেশ ভালোই আছি! বেচাল দেখলে লাফিয়ে পড়ে প্রতিবাদ করে প্রতিকার করার চেষ্টা করি। শুধু জিগির তুলেই ঢেঁকুরের মিঠা স্বাদ গ্রহণ করি না। অসুবিধাকে অসুবিধা বলে না দেখে চ্যালেঞ্জ ধরে নিয়ে হার্ডলস পেরিয়ে যাবার আনন্দ অনুভব করি! ব্যাস এই তো জীবন কালী দা!

তা তার মধ্যেই এক দুটো জোকস আর একটা সত্যি ঘটনা শুনতে পাই। যে বাড়িতে বিয়ে (এটা বলতে আমরা এখনও যে কেন মেয়ের বাড়ি বুঝি কে জানে!) সে বাড়ির একজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশিকা মেনে ব্যাঙ্কে গিয়ে আড়াই লাখ টাকা দাবি করেছেন। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার যতই বলছেন যে আপনার অ্যাকাউন্টে অত টাকাই নেই! কে শোনে কার কথা!

আর এটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক- আমার পরিচিত এক ঘটি বাঙালকে বিয়ে করেছিলেন। মানে এখনও বিবাহিত আছেন কিন্তু করেছিলেন গত শতাব্দীতে। তা বাঙাল ভদ্রলোক আবার প্রবাসী, মানে চেন্নাইতে বড় হয়েছেন। সব বাংলা গান রবীন্দ্রসঙ্গীত পল্লিগীতি ব্যান্ডের গানটান শোনেন নি। তা মহিলা দরদ দিয়ে গাইছিলেন, ‘রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে, দিনের শেষে…’ আর ভদ্রলোক ইনভ্যারিয়েবলি শুনেছেন বাঙাল! আর যায় কোথা! নতুন বিয়ে ভেঙে যাবার উপক্রম হয়েছিল। বাঙালকে জাত তুলকে খোঁটা? তা সে বিয়ে টিকে গেছে সে যাত্রা, কিন্তু সঙ্গে দিয়ে গেছে এই টাইমলেস গল্পগুলোকে!

আমাদের প্রত্যেকের জীবনই তো এক ঝুড়ি গল্পের কথামালা! এতো আনন্দ রাখি কোথায় বলুন তো? কেন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে! সরকার তো আনন্দেরও হিসাব রাখতে শুরু করেছে। আমেন!

(১৬২)

 

সাধারণতঃ আমি নাগরিক হিসাবে বেশ ভালো। নিয়মানুবর্তিতা এবং নির্দেশানুসারে চলাটা একদম রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। এতদিনের সরকারি মুটেগিরির এফেক্ট বলতে পারেন। চট করে খাঁই মাই করে প্রতিবাদ না করে আগে দেখার চেষ্টা করি ব্যাপারটা কি। বিশেষতঃ সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্র ভিতরে থাকলে তো বটেই।

১৭ বছর হয়ে গেল সরকারি ঠিকানায়, লোকে বলে সরকারি চাকুরেগুলো নাকি ফ্রিতে বিষ পেলেও তা খেয়ে নেবে! তারা আরও বলে, সরকারি কর্মচারীদের কাজ করতে হয় না! ‘আসি যাই মাইনে পাই, কাজ করলে ওভারটাইম পাই’! একজন সরকারি কর্মচারীর দিনপঞ্জী লিখতে গিয়ে এটাই মোটামুটি ট্র্যাডিশন ধরে নেওয়া হয় যে সে এগারোটায় অফিস যায়, ছেলে হলে দুটো ফাইল নাড়িয়ে চা খেতে বসে মহিলা হলে উল বুনতে বসে। দুপুরে লাঞ্চ দেড় ঘন্টা তার পর এক কাপ চা খেয়ে বাড়ি। ভালো কথা! যুগ যুগ ধরে সরকারি চাকুরেরা ইম্প্রেশনটা সেইরকমই করে রেখেছেন বলেই না এসব কথা!

আবার নদীর এপারের গল্পও আছে, সরকারি চাকর হবার জন্য নাওয়া খাওয়া ভুলে সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা অব্ধি ঘস্টানো, মন্ত্রী বা আমলাদের পা চাটা, ঘাড়টাকে তলপেট পর্যন্ত নুইয়ে তাদের মনমর্জিমাফিক ল্যাজ নেড়ে যাওয়া, না পারলেই কম্ফোর্ট জোনের বাইরে ছুঁড়ে ফেলা। এরপরেও কাজ করলেও একই মাইনে কাজ না করলেও! বরং যারা কাজ করে, ঘাড় সোজা রেখে কাজ করে তাদের ধরে ধরে মাঝেই তুর্কীর ক্যুতে চুকিতকিত খেলতে পাঠানো হয়।

যাকগে পাঠক পাঠিকারা, উপরের হাবিজাবিগুলো স্রেফ ভুলে যান! আসুন কালকের গল্পে নামি! দেখুন হামি গরীব আদমি আছে! তাই ডব্লিউএইচ প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে পারব না। কেন কবে কি বৃত্তান্ত! কিন্তু ঘটনা হল, বিকলাঙ্গ সশক্তিকরণ বিভাগের অ্যাক্সেসেবল ইন্ডিয়া ক্যাম্পেনের জন্য একটা সুপার বাইক র‍্যালি সংঘটিত হল রবিবার। আর তাতে ভর সকালবেলায় সাড়ে চারশো সুপারবাইকার তাদের ন্যুনতম ৫০০ সিসির সুপারবাইকের ১০০০ ওয়াটের হেডলাইট জ্বালিয়ে ঢ্যাকঢ্যাক করতে করতে ইন্ডিয়াগেটে এল আর গেল! আর হুজুগে পাবলিক সেলফি তুলে তুলে হয়রান হয়ে গেল।

ও হ্যাঁ মন্ত্রী আর আমলাদের সঙ্গে ছিলেন দেশের অন্যতম ‘সুপারস্টার’ বিবেক ওবেরয়। সবাই বিশাল বিশাল মানুষ। এদের ভিড়ে আমি থাকি টাকি না! নিজের কাজ করে টুক করে সরে পড়ি। এবারেও আমার দায়িত্ব ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ডঃ হর্ষবর্ধনকে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে ব্রিফ করা এবং তাঁকে অন্ধের যষ্টির মতো এস্কর্ট করে নিয়ে আসা। হর্ষবর্ধন অতীব অমায়িক ব্যক্তি। তাঁকে ব্রিফ করার সময়ও চুপ থাকেন, তাঁকে ক্যাম্পেনের টিশার্ট পরবার জন্য অনুরোধ করলেও মেনে নেন। আর চ্যাংড়া চামচার দল যখন বারফট্টাই করে কাউকে ভোর সাতটায় তার ইয়ার দোস্ত ‘মন্ত্রী’র সঙ্গে দেখা করাতে আনে তখনও হাসিমুখে মেনে নেন। এমনকি অতিরিক্ত উত্তেজিত কোন সহনির্দেশক, অনুষ্ঠান মঞ্চের দিকে ডাক্তারবাবুর যাবার সময় যদি ধাক্কা মেরে চলে যায় তাহলেও কিছু বলেন না এবং সেই সহ নির্দেশককে রীতিমতো বকাঝকা করে যদি ডাক্তার বাবুর এসকর্ট ডাক্তারবাবুর কাছে ক্ষমা চাওয়াতে বাধ্য করে তাহলেও হাসিমুখে তা মেনে নেন।
কিন্তু সকলেই তো সেরকম হয় না! সরকারী ক্ষেত্রে লুকানো কারণ সর্বত্র থাকে! কে কোথায় কার নম্বর বাড়াচ্ছে সে সব জানিয়ে কি করব বলুন! শুধুমাত্রা নিজেকে মাঝে মাঝেই এই পৃথিবীতে বড়ই অপাংক্তেয় বলে মনে হয়। উদ্দেশ্য বিধেয় কিস্যুটি খুঁজে না পেয়ে কেমন যেন ম্যাদামারা ভ্রমণ করছি! উদ্দেশ্যহীন, বিধেয়বিলীন!

সে যাই হোক, তারপর একটা লম্বা মিটিং সামলে বাড়ি ফিরলাম সাড়ে তিনটে। এবারে পার্শ্ববর্তিনীকে নিয়ে একটু ইডলি উডলি উহু করতে গাড়ি নিয়ে বেরোলাম। আনন্দবিহারের দিকে যাচ্ছি! রাস্তা একদম গড়ের মাঠ! ফ্লাইওভার চড়লাম! রেডিওতে একটা বেশ চ্যানেল হয়েছে ১০৭.২ কাছের দূরের পুরনো গান ফান দেয়। তাতে স্বপ্নো কি রাণী চলছে আর পার্শ্ববর্তিনী পাশে বসে। কি ইয়াইয়া মৌসম! ফ্লাইওভার থেকে নামলাম!

হঠাৎ দেখি চার পাঁচটা কচি কচি পুলিশ ছুটে এল! আমি ভাবলাম সিটবেল্ট পরে চালাচ্ছি না বলেই বোধহয়। যাও গচ্চা যাবেই! কিস্যু করার নেই! মুড খারাপ করব না ভেবেও জিগালাম! কি কেস ভাই? বলে কি ওভারস্পিডিং? অ্যাঁহ বলে কি? আমার নাইন্টিন ফর্টি টু আ লাভস্টোরির শেভরোলে স্পার্ক মডেল, যেটা একাশিহাজার কিমি ড্যাংড্যাং করে চলে গেছে সেটা ওভারস্পিড করছে? মেজাজটা একটু ইয়ে হল বটে তাও জিজ্ঞাসা করলাম কত? বলে একাত্তর! লাও গজা! খালি রাস্তায় ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় একাত্তর? জিজ্ঞাসা করলাম স্পিড গান কই? আর লিমিট কত? বলে স্পিড গান ক্যামেরায় লাগিয়ে ফ্লাইওভার থেকে নেমেই লাগানো আছে! আর লিমিট পঞ্চাশ। মাজাকি পায়া হ্যায়! দশ বারোটা পুলিশ আর আমি একা! দে ঝাড় দে ঝাড়! ইয়ে তো জান বুঝকে ফাঁসানে কি তরিকা!

কিছু করার নেই স্যার সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! লাও ব্যাটা যখন সোমবার আটটার সময় আনন্দ বিহার দিয়ে যাবার সময় পাঁচশো অটো আর টুকটুক দাঁড়িয়ে থাকে আর আট লেনের রাস্তাটাও কাশীর পেয়ারের গলি হয়ে যায় তখন তোমাদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ কোথায় যায় হে? উত্তর নেই! আমি বললাম, না হে এগুলো তোমরা বাড়াবাড়ি করছ! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! ইচ্ছে করে ফাঁকা রাস্তায় স্লোপে টঙে তুলে ক্যামেরা লাগিয়েছ। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! সাধারণ মানুষকে বিবস্ত্র করার এটা নতুন পন্থা। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! শেষে বলে কি লাইসেন্স সিজ করবে! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! লাও ঠ্যালা! সু নাগরিক হবার ট্যালা বোঝ! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! ওকে ওকে! বুঝেছি! চিৎকার করছি, এরই মধ্যে পার্শ্ববর্তিনী বেরিয়ে এসেছেন। আর তাঁর সেই বরাভয় মুর্তি দেখে মামারা গেছে ভয় পেয়ে! বলে ‘ম্যাডাম আপ বৈঠিয়ে না কুছ নাহি হুয়া!’ আমি বলি কুছ নাহি হুয়া মতলব? লাইসেন্স তুমি নিয়ে নিচ্ছ আর কুছ নহি হুয়া? তবুও তারা দেখি রা কাড়ে না! তা ম্যাডাম বললেন, যা করার একটু তাড়াতাড়ি করতে! লাও! তারপর তিন পাতার একটা চোথা ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তিন মাস পরে নিয়ে যাবেন! কিস্যু হবে না!

কেমন ভেবলে গেলাম! পুলিশও এমন অমায়িক ভাবে গ্যাঁট কেটে নিল? সাতজন ছিল অধিকাংশ জাঠ গুর্জর! স্বচ্ছন্দে আমাকে মাটি ধরিয়ে দিতে পারত! কিন্তু এমন একটা মাটির মানুষের মত ব্যবহার করল যে আমিই কেমন মাটিতে মিশে গেলাম! ফাইন দিয়ে লাইসেন্স দিয়ে তিনপাতার ক্রোড়পত্র নিয়ে গাড়িতে যখন এলাম পার্শ্ববর্তিনী গচ্চার হিসাব চাইলেন! বিরস বদনে বলিলাম চারশো! কিন্তু বিকেলের মুডটার দফারফা করে চলে গেল শুধু মাত্র লাইসেন্স নিয়ে!

লাইসেন্সের শোক ভোলার জন্য আজ সকালে যখন গ্রেটার নয়ডা হাইওয়ে ধরেছি ছেলেকে স্কুলে পৌঁছোবার জন্য তখনও বাধ্য নাগরিকের মতো ওডোমিটারের কাঁটায় চোখ রেখে চলেছি! ফ্লাইওভার থেকে নামতে গিয়ে পঞ্চাশের নিচে গতি নিয়ে আসতে কালঘাম ছুটে গেল! তাও ছাড়লাম না! তারপর ক্রিকেট মাঠের আম্পায়ারের মতো ব্যাটসম্যানের দিকে নজর দেবার আগে দেখে নিচ্ছি নোবল হচ্ছে কি না!

পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার রাস্তা। প্রতিটি লুকনো ক্যামেরার হিসাব নেওয়া হয়ে গেছে বস! খোঁজ খবর নিয়ে রাহাজানি করতে হলে আমাকে জিজ্ঞাসা করে নেবেন! বিলকুল ফাস্টোকেলাশ গাইডের কাজ করে দেব। তবে কিনা রাহাজানি বাটপাড়ি এসবই বেআইনি কাজ! আর কে না জানে, অন্ততঃ এখন তো জেনেই গেছেন যে। ঘাড়টায় এমন মালিশ হয়েছে, যে আইনের দাস হয়ে নিজেকে সুনাগরিক প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লেগেছি।

তবে কি না এতো পথ দুর্ঘটনা হচ্ছে হামেশাই! না হয় একটা লাইসেন্স তিন মাসের জন্য সরকারি মেহমাননওয়াজির জন্য পাঠিয়েই দিলাম! পুলিশ তো আমায় তুললো না! আমার লাইসেন্সটাকে আলতো করে তুলে নিল! লাইং সেন্সটাই কমে যায় যাতে, আর লাইনে আসার সেন্সটা বাড়ে! আমেন!