(১৭৩)

আজ ভোরবেলার স্পেশাল স্বপ্নময় ঘুম ভেঙে গেলো চিল চিৎকারে। কেউ মাইক নিয়ে প্রবল জোরে কিছু করার চেষ্টা করছে। আমার অভ্যেস আছে গুরুপরবের দিন কিন্তু আজ সত্যিই চমকে গেলাম। ঘড়িতে দেখি বাজে সাড়ে পাঁচটা আর ‘রাধে রাধে’ করতে করতে একদল বেসুরো লোক সুরে গাইতে গাইতে এলো আর চলে গেল। পার্শ্ববর্তিনী এমনিতেই তার মিনিয়েচার সংস্করণের নানান আবদারে মাঝরাত পেরিয়ে নিদ্রায় যান। তার উপর সাড়ে পাঁচটায় ক্যাকোফোনি শুনে হঠাৎ ধড়মড়িয়ে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন,” ‘আশারাম! আশারাম!’ করে চেঁচাচ্ছে কেন?”
আমি ততক্ষণে একটু ধাতস্থ হয়েছি ভাল করে বুঝলাম ওটা ‘আ যা শ্যাম’! তারপর এই ক্যাকোফোনির মানেটা খোঁজার চেষ্টা করলাম। এক পুরুষ কণ্ঠ, যা কিনা সামান্য সুরেলা তিনি গেয়ে চলেছেন জি শার্পে আর তাঁর ঠিক পরেই এক মহিলা কণ্ঠ একই লাইন বি ফ্ল্যাটে মারছেন। আর সুরের ধান হামানদিস্তায় মাড়াই হচ্ছে।

ছেলেবেলায় আমার মেজমাসির বাড়ি যেতাম নীলমণি মিত্র স্ট্রিটে। তা মাসির বাড়ির ঠিক মুখোমুখি একপাল গুজরাটি থাকত। তখন আসলে গুজরাটি, রাজস্থানি, বুন্দেলখন্ডী, বিহারী, ইত্যাদি সকল প্রকার আমিষ অসেবনকারীকে ‘মাওড়া’ বলেই জানতাম। আমার এহেন জাতিবিদ্বেষী মনোভাবকে ক্ষমা করবেন, কিন্তু সত্যিই ছেলেবেলায় সাদামনে কাদা ছিলনা।
সে যা হোক, তা সেই মহান গুজরাটিরা প্রতি সন্ধ্যায় ইষ্টনাম জপ করতেন একত্রিত হয়ে। এবং বিশ্বাস করুন! এত্ত কুৎসিত বেসুরো আমিও গাইতাম না কোনকালে। তাই শুনিও নি। পরবর্তীকালে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মনে হয়েছে, ‘এ হল কৃচ্ছসাধনের অপর রূপ। যা কিছু শ্রুতিমধুর, তা মনে হয়ে ভগবানের চিত্তবৈকল্য ঘটাতে পারে। তাই পরম ভক্ত, চরম কর্কশ স্বরে গান ফায়ার করছেন’ এরকম টাইপের কিছু।

তা সে তো প্রসেশান করে এসেছিল আবার তেমনই চলে গেল। আর আমার ঘুমটা গেল ভেঙে। আর ভেঙেই বুঝতে পারলাম কোমরে একটু ফেভিকলের অভাব ঘটেছে, তাই একটা চ্যাটচ্যাটে ব্যথা।

আসলে হয়েছে কি, ছেলে ছোকরাদের উৎসাহে আবার করে সেক্রেটারিয়েট লীগ খেলতে নেমেছি। প্রায় বছর নয়েক পরে। এই মন্ত্রণালয়ে এর আগে ক্রিকেট টিম ছিল না। এবারে তাদের উৎসাহে যে টিমটা বানানো হয়েছে তাতে আবার সিরিয়াস ক্রিকেট খেলোয়াড়ের অভাব।
ছেলেপুলেরা খেলেছে। কিন্তু ওই আর কি! দুজনের মাঝখান দিয়ে বল গেলে এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় দেখ! সব বল বাউণ্ডারির বাইরে ছ বলে ছত্রিশ মারার ইচ্ছা রাখা ব্যাটসম্যান সব, কিন্তু আসলে কাপ আর ঠোঁটের মধ্যে খোঁচা লাগা না লাগার ফারাক। আর বল হাতে ধরিয়ে দিলে সবাই শোয়েব আখতার। খাঁইমাই ছুটে এসে হাঁইমাই বল ফেলছে। এরই মধ্যে দুটোকে বুঝলাম যে সিমটা সোজা ফেলতে পারে। একটা বাঁ হাতি। তার বলটায় একটু গ্রিপ ঠিক করিয়ে দিতেই দেখলাম ডান হাতি ব্যাটসম্যানের ভিতরে আসা শুরু করেছে। আর একটা সাক্ষাৎ টমসন! চাকার মতো হাত ঘুরিয়ে বেশ জোরের সঙ্গে আউটস্যুইং করে। আর বাকিদের কুড়িয়ে বাড়িয়ে হয়ে যাবে। কিন্তু ব্যাটিং?

একটা আমার থেকে সামান্য কম বয়সী অফিসার আছে, সে মোটামুটি কাজ চালিয়ে দেবে ব্যাটিং আর বোলিং দুটোতেই ওপেন করে। আর আরেকটা আমার পুরনো মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সহযোদ্ধা। ব্যাটে বলে করে ফেলতে পারে। আর বাকী যা সব আছে, তাদের সিনিয়র অফিসারদের কাছে ফাইল পুট আপ করতে করতে আত্মবিশ্বাসই হয় নি ঠিক মত।

আমার ইতিহাসটা বেশ করুণ এ বিষয়ে। পুরাকালে কেন জানি না আমার কোচেদের মনে হয়েছিল যে আমি বাঁহাতি স্পিনার, তো সেটাই ভালো করে করতে হবে। ব্যাটিং করতে হবে না। সবই করতাম কিন্তু ব্যাটিং করতে দিত না। ফলে সঠিক ব্যাটসম্যানে রূপান্তরিত হতে পারিনি কখনই। ওই কাজ চালানোর মতো করে ব্যাট চালিয়ে দিতাম। পরে স্কুল বা কলেজের ম্যাচে ওপেন করার ফলে প্রোমোশন হয়েছিল নাইটওয়াচম্যান হিসাবে। ব্যাস ওখানেই আটকে যায়। কিন্তু দিল্লিতে এসে বুঝতে পারি ব্যাটিংটা আদতে খুবই সহজ জিনিস, অজটিল ব্যাপার। মানে তোমার পজিটিভ আর নেগেটিভ বুঝে গেলে নেগেটিভকে ডিফেন্স দিয়ে আটকে দাও আর পজিটিভের ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে রান কর। এইভাবে মোটামুটি সফল হয়ে চলছিলাম।

তা এমতবস্থায় আবার সেই বুড়ো বয়সে ওপেন করতে রাজি হয়ে গেলাম। একে ক্যাপ্টেন, আর তার উপর শুধুই ক্যাঁচা ব্যাট চালাই না। আব্বার কী! হাঁটুতে ক্রেপ জড়িয়ে নিক্যাপ পরে ওপেন করতে নেমে পড়া। আর স্লেজিং? ছেলেবেলায় একবার শুনে শিখে ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলে ফেলেছিলাম বলে মা জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তোমার বাবা বলে?’ সেই থেকে বাপের সম্মান রক্ষার্থে ওসব আমি ঠিক পাবলিকালি বলে উঠতে পারি না।

কিন্তু স্লেজিং মানে কী গালাগালি শুধুই! স্লেজিং এর অস্ট্রেলীয় মানে তো মেন্টাল ডিসইন্টিগ্রেশন। মানসিক ন্যালপ্যালেকরণ। তা সে তো অন্যভাবেও হয়।
তা এসব নিয়েই ময়দানে নেমে পড়লাম। আর পড়বি তো পড় প্রথম ম্যাচেই আমার পুরনো মন্ত্রণালয় মানব সম্পদ উন্নয়ন।

টস! জিত! ব্যাটিং সক্কাল সক্কাল। বেশ কথা। দেখলাম ব্যাটে বলে হতে শুরু করেছে। কিন্তু যেই দু ওভারে একুশ উঠে গেছে আমি দুটো চার মেরে দিয়েছি, ওব্বাবা ওপ্রান্তে ভটাভট উইকেট পড়া শুরু হল। পরপর দুটো। একজন গার্ড নিল ‘টু লেগ’! নিয়ে মিডল স্টাম্পে দাঁড়িয়ে শাফল করে অফস্টাম্পের উপর উঠে এল। নিট ফল পিছন দিয়ে বোল্ড। তারপর যে এল সে দেখি ভয়ানক নার্ভাস। সেদিন মিনিস্ট্রির পার্লিয়ামেন্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং আছে আর সে পার্লামেন্ট সেকশনে কাজ করে। খালি ভয় পাচ্ছে ‘এই বুঝি ফোনে ডাক এল’! ব্যাট করতে গিয়েও একই অবস্থা। বল স্যুইং করছে বলে বললাম, ‘আগে আকে খেল না’! মানে ক্রিজের বাইরে দাঁড়িয়ে স্যুইংটা সামলাতে। ওবাবা সেও দেখি অফস্টাম্পের দিকে এগিয়ে গেল। ফলাফল যা হবার তাই হল। আরও তিনটে চলে গেল।

তারপরের ছেলেটা বড়ই ভালো। আমি যেমন যেমন বলছি, তেমন তেমন খেলছে। এমন কী আতুপুতু স্পিনার পেয়ে ঠ্যাঙাবার আগেও আমাকে জিজ্ঞাসা করে নিচ্ছে, ‘মার লু ইসে?’ তা এসব করেই চলছিল।

আমি আবার সিঙ্গলস মোডে চলে গেছি। বল স্যুইং হচ্ছে সকালের তাজা উইকেট। কায়দার দরকার নেই। ব্যাটে বলে কর গ্যাপে ফেল আর ছোট। ছোট মানে? বলি বয়সটা কত হল খেয়াল আছে? আর তার উপর অভ্যাসের দফারফা! যা হবার তাই হল, বারো ওভার ব্যাট করার পর আর দেখি হাতে পায়ে জোর পাচ্ছি না। লোপ্পা একটা হাফ ভলি মিড উইকেটের উপর দিয়ে তুলতে গিয়ে দেখলাম ব্যাটটাই শুধু কাঁধে তুলেছি! লোপ্পা ক্যাচ দিয়ে বিদায়। আর টিমও তারপর ধসে পড়ল ১০৩ রানে। আমি সর্বাধিক ২১!

হাসবেন না! আসল গল্প তো এবারে শুরু হল। আগেই বলেছিলাম বোলাররা ঠিকঠাক বিশেষত, বাঁ হাতি পেসারটা শুরু করল ভিতরের দিকে বল আনা। ব্যাস দু দুটো উইকেট তুলে নিতে ঘাড়ে চেপে বসলাম। টমসন হাত ঘুরিয়ে তুলল দুটো। আমি বল করতে এলাম, ছ নম্বর ওভারে, যে ছেলেটা ব্যাট করছিল তাকে একটু আস্তে সামান্য স্পিন মেশানো বল দিয়ে সেট করলাম। তার মনে হল আমাকে মাঠের বাইরে ওড়ানো যাবে। আর যায় কোথায়! পরের বলটা ১১০ কিমি গতির আর্মার। ঘঁক করে ভিতরে ঢুকল আম্পায়ারের আঙুল তোলা ছাড়া কিচ্ছুটি করার ছিল না।
অবশ্য এখানেও কাজ করা আছে! শুরু থেকেই আম্পায়ারে সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলেছি। কোন ডিসিশন চ্যালেঞ্জ করলে বকাবকি করছি ছেলেদের, আর নিজেও করছি না।

আম্পায়ারকে গুরুত্ব দিলে সেও দেবে। মানব সম্পর্কের গল্প। এসব করে দেখি আট উইকেট চলে গেছে। আমার দুটো উইকেট। কিন্তু টানা চার নম্বর ওভার করতে গিয়ে আইঢাই অবস্থা। দম পাচ্ছি না। দুটো ওয়াইড করে ফেললাম। কিন্তু শেষ বলটায় সর্বশক্তি নিয়ে জায়গায় ফেলে আবার একটা আর্মার। ফিফটি ফিফটি ডিসিশন। কিন্তু ততক্ষণে আম্পায়ারের মনে এই বিশ্বাস জাগাতে পেরেছি যে ‘দিস ম্যান ক্যান ডু নো রঙ!’ অ্যাপিল করতেই ঢ্যাং করে আঙুল তুলে দিল। উফফফ শান্তি শান্তি!

শেষ উইকেট। চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কত রান!’ বলে আট রান বাকি! আমি বললাম, ওসব দরকার নেই কত রান হয়েছে বল!

এগুলো সব মানসিক খেলা। যদি বলেন আট রান করতে হবে আট ওভারে, সেটা লোকে করে দেবে। কিন্তু যদি বলেন ছিয়ানব্বই হয়েছে আর করতে হবে একশো চার। তাহলেই দেখবেন চাপের নাম বাপ, খাপে খাপ, পহলে আপ! আরে একশো করুক আগে তারপর কথা বলিস। ঠিক তাই। শেষ উইকেটে যখন পাঁচ রান বাকী শেষ ব্যাটসম্যান দাঁড়ালো টমসনের সামনে। আমি ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট থেকে চেঁচিয়ে বললাম, ‘উইকেট মে ডাল ইয়ে সামহাল নেহি পায়েগা!’ আর হলও তাই! নিরেনব্বুইটা পাখি তীরে উঠতে পারল না। চার রানে জিতে গেলাম।
আর তারপর বন্য উৎসব! (ওয়াইল্ড সেলিব্রেশনের বাংলা তো এটাই হবে নাকি?)

অফিসেও কেউ ভাবে নি প্রথম ম্যাচ জিতে ফিতে যাব। সে তো একদম হিরোজ ওয়েলকাম। মিষ্টি বিতরণ ইত্যাদি।
পরের ম্যাচ কোলকাতা থেকে ফিরে একত্রিশে অক্টোবর। এবার মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস মন্ত্রণালয়। এবারে অবশ্য প্রস্তুতি সামান্য বেশী। আগের দিন ডেসিগ্নেটেড থ্রোডাউন নিয়েছি। বল করেছি বেশ কিছুক্ষণ সারা মাঠ বার দুয়েক চক্কর লাগিয়েছি।
কিন্তু টসে জিতে আবার ব্যাটিং। আবার ওপেন! এবারে আমার সঙ্গে সেই মানব সম্পদের পুরনো সাথী। কোনরকমে ব্যাটে বলে করতে পারে কিন্তু অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু আমার সঙ্গে আছে আমার স্লেজিং। মেন্টাল ডিসইন্টিগ্রেশন। ভাল করে দেখলাম, বিপক্ষের বোলার বলতে পৌনে দুই! একটা বেশ ভাল বোলার আছে, যেটা বেশ গতিতে আউট স্যুইং করায়। আর একটা মোটামুটি। বাকিগুলো বেড়া ডিঙানোর ভেড়ার মতো নম্বর পুরো করতে খেলছে। কিন্তু আউইট স্যুইং বোলারটার একটা সমস্যা হয়েছে বোলিং স্পাইকস গেছে ভেঙে। ব্যাস আমায় পায় কে। শুরু থেকেই তার কানের কাছে ফুসুর ফুসুর করতে লাগলাম, ‘সামহালকে হাঁ জাম্পকে টাইম পে থোড়া দেখকে। প্যায়ের মে মোচ না আ যায়ে! মুঝে তুমহারে লিয়ে ডর লাগ রহা হ্যায়!’ ইত্যাদি। সে বেচারি বাঁহাতিকে বল করতে গিয়ে গুছিয়ে পায়ের উপর দিচ্ছে আর আমিও গুছিয়ে তাকে বাউণ্ডারির বাইরে ফেলছি। মাঝে সাঝে ওয়াইড এসব নিয়েই তেরো ওভারে একশো দশ করে ফেলেছি।
এর মধ্যেই অবশ্য প্রথম ওভারের একটা রিস্কি সিঙ্গলস নিতে গিয়ে ডানপায়ের হ্যামস্ট্রিঙ-এ টান ফেলে তাতে স্প্রে করিয়ে নিয়েছি। জল পানের বিরতিতে আমার আরেক সিনিয়র সহযোদ্ধা বলে গেল ‘মাত্র ছাপ্পান্ন রান দূর হ্যায় আপ সেঞ্চুরি সে!’ ব্যাস ব্যাটা সেটাই কাল হল। ছেচল্লিশ করে লোপ্পাই ফুল্টসে দিলাম ঘুরিয়ে! পুরো লেগ সাইডে একটাই শর্ট মিডউইকেট। সে ভয়ে মুখের সামনে হাত নিয়ে মুখ বাঁচাতে গিয়ে দেখল হাতের মধ্যেই বল আসছে আর ব্যাটা খপাৎ করে নিল লুফে। হাফ সেঞ্চুরিটা মাঠে ফেলে এলাম।

সে যাই হোক শেষ হল একশো চৌষট্টি রানে তিন উইকেটে। আমার সঙ্গীটি পঞ্চাশ করেই ফিরল। আর কুড়ি ওভারের খেলায় একশো চৌষট্টি অনেক। তবুও আমি সবাইকে বলে দিলাম যে, মাঠে রান বেরিয়ে যাচ্ছে বলে খুব চেঁচামেচি করব। বিপক্ষ ভাববে প্রচুর রান করছে কিন্তু পটাপট ওভারগুলো করে ফেলব, যতক্ষণে বুঝবে ততক্ষণে স্টিমার গোয়ালন্দ ছেড়ে চলে গেছে। খুব একটা সমস্যা হয় নি! আমি খুব ভালো বল করিনি! কিন্তু একটা আশি রানের পার্টনারশিপ ভাঙলাম একটু বেশি ফ্লাইট আর ওভারস্পিন ব্যবহার করে। আর তারপর আর কি! টমসন আবার চার উইকেট নিল। ওরা একশো বাইশে অলআউট শেষ ওভারে। আর তারপর ভয়ানক গাত্রদাহ।

হ্যামস্ট্রিংটা সেদিন রাত থেকেই জানান দিচ্ছিল। সেটা একটু কমতে এই কোমরে ব্যথা। রিকভারি টাইমই বেরিয়ে যাচ্ছে তিন চার দিন করে। আর এখন তো হোম, কমার্স আর ওয়াটার রিসোর্সের মত শক্ত ম্যাচগুলো বাকি। দেখা যাক। মন্দ তো লাগছে না! নেয়াপাতি ভুঁড়িটা একটু একটু করে কেটে পড়েছে। ব্যাটে বলে হওয়ার বা ব্যাটকে টার্ণ বা বাউন্সে বিট করার একটা স্বর্গীয় আনন্দ আছে! সেটাও জীবনে ফিরে এসেছে। দিন কয়েকের জন্য হলেও! আরে এসব ক্ষেত্রেই তো গুলজার ফুলজার লিখে গেছেন না, ‘ফির এক নয়ি জিন্দেগি জিলে তু! বস ঠিক সে শ্বাস লেলে তু!’ না না গুলজার নন! ফুলজারই বোধহয় এমনটা লিখেছেন! আমেন!

Advertisements

(১৭১)

প্রত্যেকবার লটবহর গুছিয়ে হড়বড় করে কোলকেতা যাই আর ফিরে আসি। এসে দেখি আসার সময় কিছু একটা অবশ্যই ফেলে এসেছি। চিরুনি, ব্রাশ, পেন, মায় পাঞ্জাবী টাঞ্জাবী শুদ্ধু। এভাবেই বোধহয় আমার শহরটাতে উত্তরাধিকার রেখে আসি! এখনও।

পাঞ্জাবী বলতে মনে পড়ল, গত মার্চ মাস থেকে বিশেষ কারণে অফিসে পাঞ্জাবী পাজামা পরিধান করা শুরু করেছিলাম, যা প্রথমে প্রয়োজন ছিল কিন্তু এখন বেশ একটা স্টাইল স্টেটমেন্ট কাম আরাম কা মামলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন কী দুর্গা পুজোর ষষ্ঠীর দিন আমি কপাল ঠুকে ধুতি পরেও চালিয়ে দিয়েছি। প্রথম দিকে যারা এসব নিয়ে টিটকিরি দিত, তাদের জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয় পোশাকের ধুয়ো তুলে ধুয়ে দিতাম। আজকাল দেখছি তারাই আমার ভারতীয়ত্ব এবং ইণ্ডিয়াননেসের (দুটোই এক হয়ে গেল নাকি?) প্রশংসা করছে আর পাঞ্জাবীর ভ্যারাইটির তারিফের সেতুবন্ধন ঘটাচ্ছে।

আমাদের বর্তমানে যিনি বিভাগীয় দায়িত্বে আছেন তিনি আদতে সামাজিক ন্যায় বিভাগের সচিব। মহিলা নিজের ডিপার্টমেন্টে ইনফরমাল পোশাকের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। কিন্তু সেদিন এক রিভিউ মিটিং-এ দিব্যি কালো পাঞ্জাবি আর চুড়িদার পরে তাঁর সামনেই প্রেজেন্টেশন দিয়ে চলে এলাম। ধ্যাতানি না খেয়েই। আর আমাকে পায় কে!

যাকগে যাক, আবার বাপু লাইনে ফিরে আসি। এবারের বার্ষিক শিকড় অন্বেষণ মাত্র দিন নয়েক হবার জন্য অনেক কিছু কাটছাঁট করতে হয়েছে। তবে, এর মধ্যেই একদিন বালি ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। বালিতে আমি বেশ কয়েকবার গেছিই, আমার বাবার প্রায় ২৭ বছরের সহকর্মী কাম বন্ধুর বাড়ি ছিল বালিতে। সেই বন্ধু, যাঁরা একে অপরকে ২৭ বছর ধরে, ‘অতীন দা আপনি’, ‘মনু আপনি’ করে কাটিয়ে দিয়েছেন। আর আজকাল তো নিজের পার্শ্ববর্তিনীকেও তুই মুই করে ফেলি!

তা সেই মনুকাকুর বাড়ি ছিল আদতে মোহন বাগানের আড্ডা। বালির চ্যাটার্জী বাড়ির নাম ৭০-৮০র দশকের মোহনবাগানের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সেখানেই দেখা ৭০-র সুপারস্টার আর আশির নক্ষত্রদের।

এরপর বালির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী হল যখন আমি ৯৭তে পেজার সেলসে মোবিলিঙ্কে ঢুকলাম। সবে গ্র্যাজুয়েশনের পর পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট পড়ে মাস চারেক হুগলী জুটমিলে যাতায়াত করছি। সরকারী চাকুরীর পরীক্ষা দেওয়া প্রায় শেষ। এদিকে গার্লফ্রেণ্ডের বাড়ি থেকে চাপ আসছে বিয়ে করতে হবে। তা আমার মতো সাধারণ একটা ছেলেকে চাকরী কে দেবে? তাই এক অগাস্টে সব দ্বিধা দ্বন্দ ঝেড়ে ফেলে চলে গেলাম মোবিলিঙ্কের অফিসে। ইন্টারভিউ! সাক্ষাতকার! তা ডিঙিয়ে চাকরিও পেয়ে গেলাম ডিলার সেলস এক্সিকিউটিভের।

প্রথম দিনেই ডাইরেক্টর আর সেলস ম্যানেজারের চ্যালেঞ্জ। পেজার বেচে দেখাও। আর আমার তো তিন দিন আগে থেকেই ফিট করা খরিদ্দার। ভাইয়ের বন্ধুর কাকা! পেজার নেব বলছিলেন। তাকে দিন তিনেক আটকানো হয়েছে। আমি দেব বলে। ব্যাস, মঞ্চে উঠে ঠিকঠাক ডায়লগ বলতে দিতেই জুটে গেল চ্যালেঞ্জ বিজয়ীর পুরস্কার পার্কার পেন। তারপর আর কী! আটমাসের মধ্যেই শোঁ শোঁ উত্থান আর দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসাবে ডিএসএ থেকে সোজা কোম্পানির পে রোলে। আর সেই সময় জুটল বালি আর উত্তরপাড়ার দুই ডিলার। উত্তরপাড়ার ডাক্তারবাবু (নাম বলব না) ভাঁওতাবাজ নাম্বার ওয়ান। তাঁর অধীনে রাখা ডিএসএগুলোকে মাইনে দিত না। কিন্তু বালির যে ছেলেটি ডিলার হল, তার সঙ্গে বেশ পটে গেল আমার। দোষ বলতে ছিল বহুত মিথ্যে কথা বলল। কিন্তু আমি আবার সেলিং-এর ক্ষেত্রে রেপুটেশনটাকেই মূলমন্ত্র মনে করি। গাপ্পি দিয়ে সেলিং বন্ধ, কিন্তু তারপরেও কর্পোরেট আর লোকাল মার্কেট ধরে মাস তিনেকের মধ্যেই আমরা টপ সেলার হয়ে গেলাম।

ছিলামও চার মাস একদম সকলের মাথার মণি হয়ে। ইতিমধ্যেই দিল্লিতে সরকারী চাকরির ডাক এসে উপস্থিত। তাই বন্ধন ছিন্ন করতেই হল। তারপরেও কিন্তু বালির ছেলেটি আমার বিয়েতে এসেছিল। আর নিজে নেমন্তন্ন করে বাগদা চিংড়ি খাইয়েছিল। তা সেসব তো নিরেনব্বুইতেই তীরে উঠে গেছে।

এবারে যাওয়া হল এক পারিবারিক গ্রেটার নয়ডাবাসী বন্ধুর আমন্ত্রণে। কালীপুজো পর দিন। আকাশ মুখ ভার করে এসেছে। কিন্তু তার মধ্যেও গুছিয়ে নিয়ে পৌঁছে গেলাম ট্রেন চড়ে তারপর টোটো করে। আর তারপর তো এলাহি ব্যাপার। বাড়ির মহিলারা রান্না বান্না করে রাত তিনটেয় কালীপুজো শেষ করে বিশ্রামও পান নি। সকালের খেতে সবাই হাজির। আর খাওয়া বলে খাওয়া? চিংড়ি মাছ দিয়ে চচ্চড়ি, সিঙ্গি মাছ দিয়ে লাল শাক, পার্সে, বোয়াল আরও কত কী! এত খেলাম যে হজম করার জন্য ট্রেডমিল দরকার পড়ছিল। কিন্তু সে সব ছিল না বলে ভর দুপুরে ভঁসভঁসিয়ে ঘুমলাম।

আর বাড়িটার ব্যাপারই আলাদা। মাসীমার পায়ে ব্যথা বলে উঠে উঠে দরজা খুলতে পারেন না। তাই দরজা খোলাই থাকে আর লোকজন এসে, ‘কেমন আছেন কাকীমা?’ বলে কলাটা মুলোটা তুলে নিয়ে চলে যায়। বন্ধুর ভাই একবার মাসীমাকে ডেকে দেখায় ‘আরে মা, দেখো তোমার শাড়ি পরে ঘুরছে!’ মাসীমা নির্বিকার, ‘আর পরুক না! আমার তো অনেকই আছে!’ ঠাকুর দেবতারা বোধহয় এসব বাড়িতেই অধিষ্ঠান করেন।

সবই ভালো ছিল ঝামেলা বাধালো আকাশ। মুখ তো ভার ছিলই কিন্তু খাওয়া দাওয়ার পর ঝাঁপিয়ে ভিজতে চলে এলো। এক এক করে ট্রেনের সময় কেটে যাচ্ছে আর আমরা প্রস্তুত হচ্ছি। কিন্তু প্রস্তুতি তো নেওয়া হয় নি। তাই সাড়ে সাতটা নাগাদ বেরলাম কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু কিনতে আরে বেরিয়ে দেখি, বৃষ্টি ধরে গেছে আর লোকজন ভ্যানকে ভ্যান কালী ঠাকুর নিয়ে ভাসানে চলেছে। যেন সরস্বতী পুজো। এ আমার নতুন অভিজ্ঞতা। পাঁড় কোলকাতার ছেলে আমি ইন্সটিটিউশনালাইজড কালীপুজো দুর্গাপুজো আর হোমোজেনাইজড লক্ষ্মী সরস্বতী আর কার্তিক পুজো দেখেছি। গণেশ পুজোর রমরমায় আমি ইতোমধ্যেই পাড়ি জমিয়েছি পাথুরে ল্যাণ্ডে। কিন্তু সাইকেল ভ্যানে হাজার হাজার হাজরা ইয়ে কালী বিসর্জন নতুন অভিজ্ঞতা তো বটেই। আর নতুন হল আকাশ ভর্তি আকাশ প্রদীপ। অকালবৃষ্টির হাওয়ায় ভর করে ফানুসদের হইহই করে ভেসে যাওয়া। এসব দেখতে দেখতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যে ফিরে যেতে হবে। বাড়ি। আর যেমন ভাবা তেমন কাজ। আবার সেই টোটোয় টো টো করে স্টেশন আর স্টেশনের আবছায়া বেয়ে স্যাঁতস্যাঁতে সন্ধ্যে।

ট্রেন এল আর আধঘণ্টা ধরে দমদমে চারে ঢুকব না পাঁচে ঢুকব করে কাটিয়ে দিল আর রাত্রে চিরপরিচিত লর্ডসের চাইনিজ খেয়েই বাড়ি ফেরা। সময় হয়ে গেল কোলকাতাকে দৃষ্টির ওপারে করার।

মাঝে এদিক ওদিক, স্যান্টাজ ফ্যান্টাসিয়ায় ঝুপুপিসির মাটন আর বাঁশপোড়া মাটন দিয়ে সরুচাকলি আর সিফুড স্যালাড হলই। কিন্তু যাবার সময় হয়ে গেল।

আর হলই বা কোন দিন। ২২ অক্টোবর! পনেরো বছর আগে ঠিক এগারোটা চল্লিশে একটা পুঁটলিকে বাম কোলে ধরেছিলাম। চল্লিশ সপ্তাহ ভিতরে থাকার পর নখ চুল নিয়ে তার সমগ্র বিরক্তি জানান দিচ্ছিল সে। আর আজ পনেরো বছর পরে ঝড়ঝাপটার সফর পেরিয়ে বয়সপ্রাপ্তির দোরগোড়ায় হাজির। এত বছরে প্রথমবারের জন্য জন্মভূমিতে ফিরে গেছিল দাদু ঠাকুমার সান্যিধ্যে। তাই আদর মেখে আসতে গিয়ে দেরী হল একটু।

কিন্তু চিন্তাটা আগের দিন রাত থেকেই নাড়া দিচ্ছিল। বাড়ির চাবিটা যেন পার্শ্ববর্তিনীকে বলেছিলাম আমার ব্যাগে রাখতে। কিন্তু আমি এবং পার্শ্ববর্তিনী উভয়েই আগাপাশতলা ব্যাগ খুঁজেও পেলাম না কিছু। সারা ফ্লাইটেও চিন্তা ছিল। প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম যে কী ভাবে বারান্দায় নামব। তাও একটা বারান্দায় তালা লাগানো ছিল না। সেই বারান্দায়! উবার করে অফিস। অফিসেই রাখা ছিল আমাদের নীল রঙের নব বাহন। এতক্ষণ ধরে আশার বিপরীতেও বাজি ধরে আসছিলাম যে গাড়িতেই বোধহয় আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুটল লবডঙ্কা। গাড়ি ঘুরিয়ে বারাপুল্লায় চড়ায় সময় মোটামুটি প্রস্তুত। উপরের ফ্ল্যাট থেকেই নামাটা সমীচীন হবে। পাশের ফ্ল্যাট থেকে কার্ণিস ছুঁয়ে একটু বেশিই ঝুঁকি বটে। চাদরও আছে ব্যাগে তাই চিন্তা নেই। আর অন্যদিকে পার্শ্ববর্তিনী মনে মনে নুনের প্যাকেট মানত করছিলেন যদি পাওয়া যায়। আর কি সাংঘাতিক রিগ্রেসিভ কাণ্ড। যার জন্মদিন সেই ব্যাটা পড়াং করে আমার ব্যাগের ভিতর হাত দিয়েই বার করে আনল আরেকটি কাপড়ের ব্যাগ। যার মধ্যে মিটিমিটি হাসছে চাবিসোনাটি। আর পুঁটলি দিদিমণি তখনও তাঁর প্রশ্নের ঝাঁপি ঝাড়পোঁছ করছেন- ‘কেন?’ ‘দাদা চেঁচাল কেন?’ ‘তোমরা চ্যাঁচালে কেন?’
আরে জানিস না? ‘এ ফর বল’ বলে!

তারপর? তারপর আর কী? পরদিন সকাল থেকেই আবার হাঁটু ডোবা যমুনা বেয়ে জীবন জোয়ারে ঝাঁপিয়ে পড়া। আর থোড় দিয়ে বড়ি আর শাকের তরকারি রন্ধ্রণ। এভাবেই চলতে থাক জীবন। সময় আর দূরত্বকে পেরিয়ে। চরৈবেতি!

(১৭০)

বেশী সময় নেই বুইলেন। সদ্য সদ্য কোল্কেতায় এসে পৌঁছেছি, আর এখনই যদি আপনাদের সঙ্গে পিরিত করি তাহলে আমার প্রথম প্রেমিকাই রাগ করবে। সে যাই হোক এয়ার ইণ্ডিয়া আজকাল মানুষজনকে পাক্কা নিমাই সন্নেসী বানাবার ধান্ধা করছে। এমনিতেই কস্টকাটিং-এর চক্করে এয়ার ইণ্ডিয়ার ইস বার শনিবার আব কী বার মঙ্গলবার।

তা গতবারে কোলকাতা আসতে গিয়ে বললাম তো ঘুমের ঘোরে ‘জৈন মিল’ খাইয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেটা ছিল ঘুঘনি আর পরোটা। আর নর্মাল মিল দিয়েছিল ক্যারামের স্ট্রাইকারের সাইজের ইডলি আর মাকড়ির সাইজের বড়া। যে কোন সুস্থ পেটের এবং মস্তিষ্কের মানুষ পরেরটা ছেড়ে আগেরটাই খাবে। আমিও নিজেকে সুস্থ বলেই দাবী করে থাকি! অতএব এবারেও আসার সময় আগ বাড়িয়ে আমি ‘জৈন মিল’ খাব বললাম আর এবারে আমার বাক্স প্যাঁটরারা নর্মাল ভেজ মিলই নিল।

কিন্তু এবারে তো মিলে সুর মেরা তুমহারা হয়ে গেছে। তিন দিন আগেই আমি ময়ূর বিহারের মার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে পাঁচ মশলার ফুচকা খেয়েছি। জিরের জল, ধনেপাতার জল, হিংএর জল, পুদিনার জল আর কেওড়ার জল। নাকের জল চোখের জল না ফেলেই বলছি হিং আর কেওড়াটা আমার মেফিস্টোফিলিস লেগেছিল। এই রে কর্ড লাইন ধরে ফেলেছি!

তা যা বলছিলাম! আমার জৈন মিল খুলতে দেখি ইক্কিরে বাওয়া! এখানে বিয়ের আংটির সাইজের বড়া আর ধনে পাতা দেওয়া পাঁচ সিকের সাইজের সাদা রঙের একটা কিছু যাকে ইডলি বা পরোটা বলতে মন সরে না। সঙ্গে অবশ্য একটা জাঁদরেল লাল লঙ্কা দেওয়া সাম্বারও দিয়েছিল। আর কেলো টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি কেসে দেখি বাক্স প্যাঁটরারা ঘুঘনি পরোটা প্লেটে নিয়ে আমার দিকে মুচকি হেসে চোখ নাচাচ্ছে।

সে যাই হোক সেসব খেয়ে আমার অপাপবিদ্ধ পেটে জেলুসিল গোঁজার অবস্থা হয়েছে। কিন্তু একটা কথা বলতেই হচ্ছে! নেহাত পার্শ্ববর্তিনী সক্কালবেলায় পনেরো মিনিট পরে সবার ঘুম ভাঙা সত্ত্বেও অবিশ্বাস্য তৎপরতায় একটা জবরদস্ত চিজ অমলেট খাইয়ে বাড়ি থেকে বার করেছিল তাই আজ টিকে আছি। কিন্তু তিন দিনের বাসী বড়া আর আধকাঁচা ইডলির মতো কিছুটা এখনও পেটে গজগজ করে যাচ্ছে। যাই হোক, কোলকাতা আমার দুঃখ ভুলিয়ে দেয়, এবারও দেবে বলে আশা রাখছি। আর সেই সব বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আবার দেখা হবে জেনেই পুলক লাগছে, যা পুদিনহরার মতো গলা ছুঁয়ে বুক পেটে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

আজ তাহলে এ পর্যন্তই!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ সকালে তিনটেয় একটা অ্যালার্ম মেরেছিলাম নিজের মোবাইলে আর ব্যাকআপ হিসেবে পার্শ্ববর্তিনীর মোবাইলে তিনটে দশ-এ! আবিষ্কার করলাম যে তিনটে দশের অ্যালার্মটা এখন বাজছে। ভর বিকেলে কোলকাতার বুকে, শান সে! না আসার সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিলাম। কিন্তু কেমন করে জানি না আমার বাক্স প্যাঁটরাদের উৎসাহে এসে পড়েছি বটেক।

(১৬৮)

২০১৪র পরে আর ফিসফাস বই হিসাবে বেরোয় নি। এবারে করলে বইটার কভারের রঙ কালো বা ধূসর রাখব ভাবছি। না মানে শুরুতেই এমন কথা কেন? কে জানে কেন? বুঝতে পারি না! খালি আকাশে বাতাসে ঘাসে ঘাসে দেখি রঙগুলো বদলাচ্ছে। সমানে সমানে বদলাচ্ছে। পথে ঘাটে দূষণেরা ফুসফুস ছেড়ে হৃদয়ে দানা বাঁধছে। আর একটা অদ্ভুত ধরণের ইমোশন (সরি আবেগটা বড়ই কাঁচা লাগছিল ইমোশনের কাছে!) গলার কাছে দানা বাঁধছে।

মনের ভাবটা স্পষ্টভাবে বলে উঠতে পারছি না। মানে এটা ঠিক ভয় লাগা নয়। ভয়টা বরং চলে যাচ্ছে। এটা বিচ্ছিরি লাগাও না। বিচ্ছিরি লাগা এর কাছে কিছুই না। অথবা রাগ ঘৃণা বিদ্বেষ এই শব্দগুলোও ঠিক বসাতে পারছি না। কারণ এই যে ইয়ে লাগা সেটা তো এগুলোকে নিয়েই। রাগ ঘৃণা বিদ্বেষ।

কোথাও কোথাও একেই যেন পুরুষত্ব বা বীরত্বের প্রতীক বলে বোঝানো হয়। বুক দাপিয়ে চিৎকার করে বিজয়ীর উল্লাস। যেন রোনাল্ডো গোল করেছে!

এক এক করে বলে দেখি। আপনারা কী বলেন!

ভাদ্র মাস একটা বিশেষ মাস যা নিয়ে চারপায়ের প্রাণীদের খিল্লির শেষ নেই। তেমনই শ্রাবণ মাস হল ভক্তির মাস। শারদোৎসবে যেগুলো হয় সেগুলোকে ভক্তি দিয়ে মাপা যায় না। হৃদয় দিয়ে মাপতে হয়। কিন্তু শ্রাবণে শৈব উপাসকরা ভক্তিরসে ভগবানকে সিঞ্চিত করেন। আমাদের ছিল তারকেশ্বর আর এখানে হরিদ্বার।

না সেসব নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই। কিন্তু মেঘটা জমতে শুরু করেছে গত কয়েক বছর ধরে। যখন থেকে এই কাহার কাঁধে কাঁওয়াড়িদের জন্য সুযোগসন্ধানীরা এই একান্ত ব্যক্তিগত যাত্রাকে সাংগঠনিক করে দিয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বড় বড় কাটআউটে ঝোপে ঝাড়ে গজানো রাজনৈতিক সুবিদাবাদীদের অভিবাদন জানানো ব্যানার। দেবেন্দ্র দেড়া থেকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কেউ বাকী নেই। কাঁওয়াড়িদের জল পান করানো জন্য গগন বিদারী মিউজিক সিস্টেমে হানি শিঙের চরণে সেবা লাগির রিমিক্স সমেত বড় বড় শামিয়ানা। আর কার্যবিহীন স্বেচ্ছাসেবকদের দল। যারা মনের সুখে মাদক সেবন করে (শিবের চ্যালা! কিচ্ছু বলার নেই!) উত্তুঙ্গ উচ্ছ্বাসে হর হর মহাদেব ধ্বনিতে আকাশ বাতাস ছেয়ে দিয়েছে। আর ইদানীং আবার নতুন ট্রেণ্ড। জাতীয় পতাকা হাত মোছার কাপড়ের মতো যত্র তত্র লাগানো। যেন দেশাত্মবোধ দেখালেই সাত খুন মাফ।

তে এরকমই এক সকালে দেখি একটা নেশায় চুরচুর বিরোধী সমাজের লাগামহীন ষাঁড় হাতে লাঠি নিয়ে গাড়ি শাসনে লেগে পড়েছে। আমার এই গাড়িটা বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই ভাই যাবার পর থেকেই ইমোশন ফিমোশন একটু কম। অন্ততঃ বিয়োগ ব্যথা গুণিতক হয়ে পার্শ্বচর হয় না। কিন্তু লাঠির বাড়ি মারলে তো কথা নেই কোন।

তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি, পাড়ার মধ্যেই সাইকেল নিয়ে যাবার সময় ‘লুচি’ গুণ্ডার চটির পিছনের ভাগ মাড়িয়ে দিই। বাছাবাছা বিশেষণ চড়চাপড় সব হজম করে নিয়েছিলাম ‘বাপের সম্মান’ রক্ষার্থে। (এই বাপের সম্মান কেসটা বহুত গোলমেলে কেস। আপনার ঘেঁটি ধরে একটা তালপাতার সেপাই ক্রমাগত নেড়ে দিয়ে সুভাষিতাবলী ঝেড়ে যাচ্ছে আর আপনি কিসসু করতে পারবেন না!) কিন্তু যেই ব্যাটা ‘শালা আজ সাইকেলই ভেঙে ফেলব’ সাইকেলে হাত দিয়েছে। কোনা মেরে বাঁহাতের দুটো আপার কাট চোখের কোল ফাটিয়ে দিয়েছিল। সেই জোশ আজ আর নেই, তোরঙ্গে বাঁধা। কিন্তু গাড়িতে হাত দিলেই কী থেকে কী হয়ে যেতে পারত সে আর বলতে পারব না। কপাল ভাল (কার কে জানে?) আমি অনেক চেষ্টা করেও গাড়ি আস্তে চালিয়ে, ছেলেটার গা ঘেঁসে চালিয়েও তার লাঠির প্রসাদ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলাম। না হলে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়ার একটা অভিজ্ঞতা থেকে যেত। হয়তো গণ ধোলাইয়েরও।

তা সে সব থাক। দিন পনেরো সবাইকে ভক্তিতে ভাসিয়ে শ্রাবণ মাস বিদায় নিল ভাদ্রের শেষ এসে হাজির। সেদিন গাড়ি না থাকায় উবারের সাহায্য নিয়েছি, দশ মিনিটের রাস্তা যেতে দশ ঘন্টা লাগছে, ড্রাইভার বলল, ‘ম্যায় পচ্চিশ সাল সে দিল্লি মে হুঁ। বাই গড কভভি ইত্নে সারে গণেশজীকে ভক্ত নেহি দেখা।’

আর ট্রেণ্ডটাও এক। মাথায় একটা রঙ না জানা ফেট্টি, পেটে মাল, মুখে আবির, চোখে রঙ আর ঠোঁটে রাজ্যের নৈরাজ্যের প্রদর্শনী। আর অবশ্যই বক্স বাজছে। যার যত বেশী বক্স তার তত বেশী দর। গানের কথা কিসসু বুঝতে পারবেন না, খালি গুম গুম আওয়াজে গাড়ির উইণ্ডস্ক্রিন থেকে আত্মারাম সবাই খাঁচা ছেড়ে পালাবার কথা ভাবছে। যত্র তত্র মূত্র ত্যাগ আর জাতীয় পতাকা নাড়িয়ে বিজয়োল্লাস। ঠিক যে ভাবে আপনার কাজের মাসি ঝুল ঝাড়ু দিয়ে ঘরের কোণের কালো কালো ঝুল সরিয়ে সাফ করেন। ঠিক সেভাবেই এরা দেশভক্তিকে প্রশ্নকারী সুস্থশরীরগুলোকে সাফ করে দিয়ে ব্যস্ত করে ফেলবে।

আর সবাই সেই হ্যামলিনের ইঁদুর। নেতাজি কাল লাল কিলা থেকে আপনাকে ডোকলাম দেখাচ্ছে তো আপনিও অবিশ্বাসীদের বৃন্দাবন দেখাতে রেডি। আর দরকার পড়লে অন্ধকারও। সত্যিই যেন অন্ধকার যুগে এসে পড়লাম। যেখানে বিরোধাভাস মাত্রেই কার্গিলের ঠাণ্ডার চিন্তা জাগিয়ে দেওয়া গরম গরম বুলি আর সে সব ডিঙিয়ে গেলে চাপাতির কোপ বা বন্দুকের নল। আমাদের অবস্থা হচ্ছে সেইসব পতিব্রতা স্ত্রীয়ের মতো, যারা মার খেয়ে মরে গেলেও সিকিউরিটি হারাবার ভয়ে আপাত মানব পরিচয়বহির্ভুত সেই সব রাক্ষসদের বিরুদ্ধে একটাও কথা বলে না। ঠাণ্ডা ঘর ল্যাপটপ স্মার্টফোন আর নিয়ন্ত্রিত জীবন চৌহদ্দি পেরিয়ে একসঙ্গে বিরোধ করা কি চাড্ডিখানি কথা। (দেখবেন এরপর কমি ছাগু তিনো নিয়েও গাল শুনব।)

আসল কথা হল ফাঁপা ঢোল বাজে বেশী। আর আমাদের দেশটা হয়ে উঠছে সে রকমই। আমরা মায়ানমার যাব বলে পরিকল্পিত ভাবে ঘরহীন মানুষগুলোকে দেশছাড়া করে দিতে ছাড়ি না। গাজা ভুলে গিয়ে নেতানেইয়াহুর সঙ্গে ছবি তুলে ফেলি আর আপামর অশ্বেতকায়ের সর্বনাশ মাথায় তুলে ট্রাম্প কার্ড খেলে বসে থাকি কেকেকেকিরণ! (ক্লু ক্লুক্স ক্লান আর কি!)
এত কিছুর মধ্যেও কিন্তু স্বপ্ন দেখতে শখ জাগে জানেন? স্বপ্ন দেখি ধর্ম বলতে মানুষ চিনবে মানুষ শুধু। সালমা খাতুন বা জাভেদ হাবিব তাদের ধর্মের কলাম নিয়ে আমাদের কাছে পরিচিত হবেন না। শুধু মানুষ হিসেবেই যেন পরিচিত হয়ে যাই। সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুকে একটা ডায়লগ ছিল অর্গানাইজড রিলিজিয়ন মানুষ মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে। আর কত বিভেদ বা ফারাক হবে? উপরওলা তো ইতিমধ্যেই, কালো সাদা বাদামী, পুরুষ মহিলা, গুঁফো মাকুন্দ, হিস্প্যানিক এশীয়, লম্বু মোটু এসব ফারাকগুলো দিয়েই পাঠিয়েছেন। কিন্তু সে তো স্বাতন্ত্র্যের খাতিরে। দল পাকিয়ে পাঞ্জা লড়ার জন্য তো নয় সে সব।

মানুষ সবথেকে দুর্বল প্রাণী হয়েও মানবতা আর মানবিকতা দিয়েই তো আজ শ্রেষ্ঠ আসন নিয়েছে। তাহলে আর আলাদা করে আমরাই সেই চামড়া গুটিয়ে নিয়ে অপরের চামড়া গুটিয়ে দিতে তৎপর হয়ে পড়ছি কেন? মানুষ মরে। যে একবার জন্ম নিয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু আমরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাকে অবশ্যম্ভাবী থেকে অমোঘাবস্থায় নিয়ে যাচ্ছি কেন? আসুন না। বিশ্বাসী অবিশ্বাসী নাস্তিক আস্তিক ধনী গরিব সাদা কালো সবাই মিলে পৃথিবীটাকে আরেকবার সবুজ করে তুলি। শুধু গাছ পুঁতেই তো নয়। মানুষের মনটাকে হৃদয়টাকে সবুজ করে তুলতে হবে। কষ্টকর পথ, ধান্দাবাজীর জায়গা নেই, শর্টকাট নেই, মস্তিস্কহীনতা, বিবেকহীনতা, হৃদয়হীনতার জায়গা নেই। যে যতটুকু পেয়েছি তাই নিয়েই সবার কথা ভেবেই কাজ করতে শুরু করি। বাংলায় যাকে বলে হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ। তাহলে হয়তো আপনার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীটাও বাঁচতে পারে। নয়তো কে জানে, সময় কোথায় আমাদের জন্য চাপাতি নিয়ে অপেক্ষা করছে। কল্লা আমাদেরও নামতে পারে ভাই! তাই না?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এই লেখাটা নিয়ে আমরা ওরা করবেন না প্লিজ। সব ধর্মেই কম বেশী নাশকতা রয়েছে। নাহলে বৌদ্ধ ধর্ম বলতে যে অহিংসা বুঝি তারা রোহিঙ্গাদের কেটে পিস পিস করে ফেলতে পারে? রোহিঙ্গাদের জন্য, আশ্রয়হীন মানুষগুলোর জন্য একটু ভাবুন। আপনার দরজা খুলে দিতে হবে না। কিন্তু সামগ্রিক দরজাটা যেন খুলে যায়। আলোচনারও।

প্র পু ১ – নাহ লেখাটা শুরু করার সময় মনটা যে রকম ধূসর ছিল এখন কেমন যেন নীল নীল হতে শুরু করেছে। আকাশের মতো বিস্তৃত নীল। এবারে ফিসফাসের রঙটা নীলই হোক কেমন?

(১৬৭)


আমি ভিক্ষা দিই না। কোন স্পষ্ট লজিক নেই। কিন্তু দিই না। হয়তো মানুষকে কর্মক্ষম দেখতে ভালো লাগে বা অভ্যাস খারাপ করতে দিতে চাই না ইত্যাদি কিছু হবে। অথবা এই যে রাজধানীর রেডলাইটে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে কিছু দেহাতি মহিলা ঘোরাঘুরি করে তারা মাদারি নাকি অন্য কিছু? কয়েকটা বাচ্চা সং সেজে ডিগবাজী কলাবাজী দেখায় আর চুলে লম্বা বিনুনি বেঁধে টাঁই টাঁই করে ঘোরাতে থাকে। বা কয়েকটা বাচ্চা একটা নোংরা কাপড় নিয়ে এসে গাড়ির এখানে ওখানে একটু মুছে দেয়। এরা কারা? কোথা থেকে আসে? শহরবাসী আমরা শুধু সন্দেহ নিয়েই তাকিয়ে থাকি। আর দেখি যে রাজধানীর ক্রমবর্ধমান ফ্লাইওভারগুলি ঠিক নিচে, কাঠের চুল্লি আর পোড়া হাঁড়ি দিয়ে নিশ্চিন্তে সংসার পেতেছে। দশ ফুট বাই দশ ফুটের গণ্ডিটাও তাদের জন্য নেই।

সন্ধ্যা হলেই সন্দেহ বেড়ে যায়। দেহব্যবসা অথবা রাহাজানি। সন্দেহের তীর এদিকেই ঘুরতে থাকে। মাথায় জট, চোখে পিচুটি আর নাকে পোঁটাওলা শৈশবের পরেই এসে হাজির হয় অপুষ্টির যৌবন বা অপক্ক বার্ধক্য। আকাশের দিকে তীর ছুঁড়ে দিয়ে, পৃথিবীর বুকে রুক্ষ পদক্ষেপ ফেলে জীবন কেটে যায়। আদমসুমারি আর আচ্ছে দিন, সরকারি সাহায্য আর গরিবী হটাওয়ের ইমেজে এরা বড় বড় ছোপ। পুলিশ আর সমাজবিরোধীদের সঙ্গে নিত্য হিসেবে নিত্য যাপন। এরাই হল সেই সব মুখ যাদেরকে লুকিয়ে রেখে আমরা আধুনিক ভারতের ছবি তুলে ধরছি বিশ্বপিতার কাছে।

সে যাই হোক, সেই সব লজ্জাই হোক আর নিজেকে মুক্ত পৃথিবীর প্রতিভূ হিসাবে দেখার অভ্যাস থেকেই হোক। আমি ভিক্ষা দিই না। শুধু যখন কোন বয়স্ক লোককে দেখে মনটা উদ্বেল হয়ে ওঠে যাদের সত্যিই হয়তো করার কিছু নেই, সেখানে হাতটা আপনিই পকেটের দিকে চলে যায়। আর নিজের অপারগম্যতায় মাথা নিচু হতে থাকে।

কদিন আগে রবিবার, আইটিও থেকে মানদই হাউসের দিকে গাড়ি ঘোরাবার আগেই দেখলাম এক আপাত অন্তঃসত্ত্বাকে। সেই দেহাতি রূপ আর তার সঙ্গে আরও জনা চারেক কম বেশী বয়সের মহিলা। এরা হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য সাহায্য চাইছে। কিন্তু আমরা শহুরেরা এখন অভিজ্ঞ হয়ে গেছি। সব জানি এর পিছনের গল্প। কিছুদূর নিয়ে গিয়ে যা নয় তাই হয়ে যেতে পারে। পেটের থেকে বেরিয়ে পড়তে পারে পিস্তল অথবা অন্য কোন প্রাণহানি অস্ত্র।

কিন্তু মজার ব্যাপারটা হল, গাড়িটা ঘুরতেই দেখি একদল পুলিশ দাঁড়িয়ে, লালবাতি টপকানোদের জন্য টোপ ফেলে বসে আছে। গল্পটা কেমন যেন ইয়ে লাগল! মানে মেয়েটি যদি সত্যিই অন্তঃসত্ত্বা হয়, তাহলে তো তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো উচিত। আর না হলে শ্রীঘরে।

তাড়া ছিল কিন্তু তাও গাড়িটা থামিয়ে মুখ বার করলাম। দিল্লিতে পুলুশ এসব ব্যাপারে খুব হেল্পফুল। জানে কি জানে না কিন্তু ঠিক দিক দেখিয়ে দিতে ছাড়ে না। বললাম ব্যাপারটা- ব্যাস যেন চোর ধরা পড়েছে এমন মুখ করে বিগলিত হাসি দিয়ে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা দেখতা হুঁ!” যেন আকাশ থেকে বিষ্ণু দেবতা বরাভয় মূর্তি নিয়ে বিশ্বরূপ দর্শন দিচ্ছেন। কিন্তু ঐ যে বললাম ট্যাম। ট্যামই নেহি থা না! তাই নাগরিক কর্তব্যকে নীলটুপিধারীর হাতে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে চললাম পিছনের দিকে না তাকিয়ে। জানি একবার বলায় কিছু হবে না, আর বারবার বলায় হয় তো সেদিনের জন্য ভাত মারা যাবে চৌর্যোপজীবিনীদের।

তবে সব গল্পগুলো ঘেঁটেঘুঁটে গেল কালকে। মানে আমি নিজে আত্মপ্রচারকে খুব একটা পছন্দ না করলেও, এই রোগটা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নই। কোথায় কখন যেন কোন সূক্ষ্ম গণ্ডিটা পেরিয়ে চলে যাই আর রাবণ রূপ ধারণ করে ফেলি, তার হিসাব রাখতে পারি না। তবুও বলছি জানেন।
কাল রাতে পার্শ্ববর্তিনী আর মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। ফর আ চেঞ্জ মেয়েটা আমার পাশের সিটে বসে। সামনেই লালবাতি আর লালবাতি পেরোলেই গাজীয়াবাদে ঢুকব। সামনে একটা এসইউভি। আর আমরা এদিক ওদিক হাবিজাবি বকে যাচ্ছি। যদি করবী ফুলগুলো টুপ করে গাছ থেকে পড়ত গাড়ির জানলার কাঁচ বেয়ে তাহলে রাতের বেলা ফুল পাড়ার কষ্ট থাকত না আর লাল গোলাপি ফুলগুলোও মেয়ের কানে ঠাঁই পেতো! এই সব।

তাকিয়ে দেখলাম লাল বাতির কাছেই দুটি বাচ্চা মেয়ে বেলুন বেচছে। হঠাৎ লাল আলো সবুজ হল আর দেখলাম আমার সামনে দাঁড়ানো গাড়িটা যেটা এগিয়ে গিয়ে গাজীয়াবাদে ঢুকবে তার ড্রাইভারটা হাত বাড়িয়ে যেটি দুটির মধ্যে ছোট সেই মেয়েটির হাত থেকে একটা বেলুন ছিনিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল গন্তব্যের দিকে।

পাঠক/ পাঠিকারা, আমরা তো মানুষ। সবার আগে মানুষ। চকচকে গাড়ি আর ঝকঝকে পোশাকের মোড়ক পেরিয়ে আমরা মানুষ। সামান্য সুকুমারবৃত্তিগুলো কি ষড়রিপুর অধীনে ফেলে রেখে দাঁত নখ বার করে ফেলতে পারি? মনুষ্যত্বের লেশ নিয়ে দুপায়ে হেঁটে যাবার সময় ‘আরে এ তো সামান্য ব্যাপার!’ এই কথাটা না বলে একটু মন নিয়ে ভাবতে পারব না? দাঁত নখ? তোমার মন নাই মানুষ?

হতবাক অবস্থার মধ্যেও এগিয়ে গেলাম গাড়িটা নিয়ে। হাপুস নয়নে কাঁদছে মেয়েটা। কাশছেও। তার দিদি তাকে বুকে জড়িয়ে বোঝাবার চেষ্টা করছে আর মাই বোধহয়, কোথা থেকে ছুটে এসেছে। মেয়ের কান্না থামেও না। পাঠক/ পাঠিকারা, আমরা সামান্য মানুষ! সারা পৃথিবীর সকলের দায়ভার নিই নি। কিন্তু ওই মুহুর্তে যেটা করতে পারলাম সেটা হল, বেলুনের দাম জিজ্ঞাসা করে দুটো দশটাকার নোট ধরালাম। একটা বেলুন নিজের মেয়ের হাতে দিলাম আর আরেকটা সেই অমানুষটার হয়ে ক্ষমা চেয়ে। মেয়েটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ওই দিদিটা বেলুন দিল? দিল হয় তো! হয়তো সমগ্র মানব জাতির পক্ষ থেকে একটা অক্ষম চেষ্টা মনুষ্যত্ব বাঁচিয়ে রাখার।

মাঝে মাঝে মনে হয় ফিসফাসটা ফিসফাস না হয়ে নিজের ঢাক নাম দিলেই হতো। এ তো শুধুমাত্র নিজের কথা বলা। এই করেছি সেই করেছি। বা হয় তো নিজেকে আয়নায় দেখা অথবা আপনাদের নিক্তিতে নিজেকে মেপে নেওয়া। সে যা হোক। মুখ্য হল মানুষ হওয়া। সবরকমভাবে তো হয়ে ওঠা হয় না। এই যেমন মোড় ঘুরে গাজীয়াবাদে ঢুকে যখন দেখলাম দুটো ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে আর তার কিছু দূরে সেই অলপ্পেয়ে এসইউভি। বিশ্বাস করুন হিরো হবার ইচ্ছে থাকলেও নেমে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারি নি তাদের। ঝামেলায় জড়াতে চাই নি বলেই। কিন্তু পার্শ্ববর্তিনী বা আমি কেউই হয়তো বাচ্চাটার কান্নাটা ভুলতে পারি নি। বেলুনটা বাড়িতে খেলতে খেলতে ফেটে গেল আধ ঘন্টার মধ্যেই। কিন্তু তাও বোধহয় অমানুষদের বুদবুদ ফাটল না। ক্ষণিকের মস্তিষ্কহীন ছ্যাবলামোই হয়ে রয়ে গেল মনুষ্যত্বের আলো আঁধারি ঘিরে।

আর আমাকেও ভাবতে বাধ্য করল সময়, ওই কিচ্ছু না পাওয়া লোকগুলোর কথা। যারা পুলিশের লাঠি আর সমাজবিরোধীদের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকে পরের দিনের সূর্যটাকে দেখার আশায়। সেটাও ঠিক করে দেখতে পায় কি না কে জানে?

(১৬৬)


(১৬৬)

ছেলেবেলা থেকেই আমি ন্যাচারাল অ্যাথলিট ছিলাম না। মানে সেই অনেকে থাকে না? যারা যে খেলাই খেলবে তাতেই দারুণ হবে। আমার পাড়ায় এরকম একটা ছেলে ছিল, বাপ্পা বলে। সে ফুটবল ক্রিকেট ব্যাডমিন্টন ক্যারম সবেতেই চৌখস ছিল। আমার থেকে বয়সে সামান্য ছোট। কিন্তু এই চৌখসগিরিটাকে কোথাও না কোথাও হিংসে করতাম। তা যাই হোক একবার পিকনিকে গিয়ে জলে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে বুঝতে পারি যে ব্যাটা সাঁতার জানে না। ব্যাস তবে থেকেই ওই হিংসে ব্যাপারটা গায়েব হয়ে যায়।

অর্ণব বলে আমার ক্লাসমেট ছিল এক। সেও ওইরকম। কোনদিন ক্রিকেট শেখে নি কিন্তু তাতেও হাতে একটা অসম্ভব ন্যাচারাল আউটস্যুইং ছিল। এতটাই ছিল যে একবার স্কুল ম্যাচে ওকে ক্রস সিমে বল করতে বাধ্য করেছিলাম। কারণ স্যুইং করে বল বারবার ওয়াইড হয়ে যাচ্ছে আর উইকেট কিপার বাপবাপান্ত করছে। যাকগে সেসব কথা অন্য। আসল কথা হল আমার ন্যাচারাল অ্যাথলিট না হওয়া। এই যেমন ধরুন রাহুল দ্রাবিড়। ট্যালেন্ট তো ছিলই কিন্তু শচীন সৌরভের মতো স্বাভাবিক প্রতিভা নিয়ে জন্মায় নি ছেলেটা। অথচ শুধুমাত্র অধ্যবসায় আর মস্তিষ্ক দিয়ে দু ধরণের ক্রিকেটে দশ হাজারের ওপর রান করে বেরিয়ে গেছে ছেলেটা।

ক্রিকেট মাঠে ফিল্ডিঙও আমার কাছে সেইরকম। শুরুর দিকে আউটফিল্ডে লুকোতে হত। তারপর প্রচুর ক্যাচ নিতে নিতে বুঝতে পারলাম ক্লোজ ইন ফিল্ডিংটা আমার চলবে। স্লিপ গালি ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট এসব জায়গায় বল গোলার মতো আসে। কিন্তু বোলারে হাত থেকে ব্যাটের মোটিভ, এসবগুলো নজর করতে পারলে, আর রিফ্লেক্স বাড়ালে অনুমানক্ষমতার জোরে বোল কোনদিকে আসবে বা কত জোরে আসবে সেটা বোঝা যায় আর বাকিটা টেকনিক আর অনুশীলন। আমার একটা বিশেষ প্র্যাকটিস ছিল। ক্যাচিং-এর। যে ক্যাচ দিচ্ছে, তাকে এক হাতে ব্যাট নিয়ে বলটাকে মারতে বলতাম আমার দিকে। আর আমি প্রতিটি ক্যাচ ধরার পর এক পা এক পা করে এগিয়ে যেতাম। তাতে চোখ অভ্যস্থ হয়ে পড়ত। আর চোখ একবার অভ্যস্থ হয়ে গেলে বাকিটা সহজই। এইভাবে স্লিপ বা গালিতে ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর কিছু ক্যাচ আছে। যেগুলো আমার সঙ্গে যারা খেলেছে তাদের জিজ্ঞাসা করলে কুড়ি পঁচিশ বছর পরেও বলতে পারবে আশা করি।

এইভাবেই কভার এক্সট্রা কভারে অনুমান ক্ষমতার জোরে করে দিতাম ফিল্ডিং। খুব দ্রুত মুভমেন্ট না থাকলেও আগে থেকে অনুমানের উপর ভিত্তি করে প্রচুর বাউন্ডারি শট বাঁচিয়ে দিয়েছি ডানদিকে বা বাম দিকে বলের গতি মুভমেন্ট ব্যাটের নড়াচড়া ব্যাটসম্যানের পায়ের নড়াচড়া নজর করে আগে থেকে সরে গিয়ে।

ছেলেবেলায় ফুটবলে গোলকিপিং করতে গিয়ে পেনাল্টিও বাঁচিয়েছি এসবের উপর ভিত্তি করে। আর ডাইভ দেওয়াটা তো দুধভাত। কংক্রিটের উপরেও ডাইভ দেওয়াটাও। গায়ে না লাগিয়ে বিশেষ টেকনিকে মোটামুটি ছ ফুট ডাইভ দেবার ক্ষমতা ছিলই। সেগুলো এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত মঞ্চে লাফঝাঁপ করার জন্য বাচ্চাদের নাটকে শিখিয়েছি। চার ফিট উপর থেকে লাফ দিয়ে মেঝেতে কিভাবে রোল করে পায়ের উপর প্রেশার না নিয়ে উঠে দাঁড়ানো এসব। আর কি।

পাঠক পাঠিকারা, আসল কথাটা এবার বলে ফেলি। এই যে এতক্ষণ ধরে নিজের বড়াই করলাম, এটা হল গৌরচন্দ্রিকা। কালকে রিহার্সালের পর মেয়ে আর পার্শ্ববর্তিনীকে নিয়ে বাড়ি ফিরব। রাস্তা পেরিয়ে গাড়ির কাছে আমি আর মেয়ে। আর পার্শ্ববর্তিনী রাস্তার ওপারে দু তিনজনের সঙ্গে কথা বলছেন। ছোট দু লেনের রাস্তা। বড় রাস্তা না হলেও গাড়ি চলে আর ফাঁকা থাকায় বেশ দ্রুতই চলে। তা গাড়ির চাবিটা খুলে মেয়েকে সামনের সিটের দিক দিয়ে ঢোকাবার জন্য হাতটা ছেড়েছি। চাবিটা ঘোরাতে ঘোরাতে বাঁ চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেলাম, মেয়েটা ‘মা’ বলে চিৎকার করে ছুট লাগিয়েছে আর একটা স্যান্ত্রো তীর বেগে ছুটে আসছে।

পাঠকপাঠিকারা, মেয়ে বা ছেলের মধ্যে পার্থক্য দেখি না। যে কাজগুলো ছেলেটা করবে সবগুলোই যেন আমার ছোট্ট মেয়েটা করতে পারে এই চেষ্টাই করি। পাঁচিলে চড়া গাছে ওঠা লাফ ঝাঁপ এসব বন্য আনন্দ থেকে যেন মেয়েটা বঞ্চিত না হয়, তাই কখনই বাধা দিই না। খালি সতর্ক থাকি, কিছু হলেই যাতে ধরে নিতে পারে। বেশ কিছুদিন আগে খাটের উপর ডিগবাজী খেতে গিয়ে তিনি পড়াক করে মাটিতে ছিটকে পড়ছিলেন আর একটু দূরেই ছিল একটা ট্রাঙ্ক। সহজাত রিফ্লেক্সে পট করে ডানহাতের কাঁধের কাছটা ধরে ফেলে আস্তে করে মাটিতে নামিয়ে দিই। ভয় পেয়েছিল অবশ্যই কিন্তু বিপদ হয় নি।

কালকেও সেই রিফ্লেক্স নিয়ে শরীর এবং হাত ঘোরাই। আমার ডান হাঁটুর এসিএল আংশিক ছেঁড়া। অর্থাৎ লিগামেন্ট। দেড় বছর আগে মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ার সময় হাঁটুটা আরও চোট পায় কিন্তু দু হাতে মেয়েটাকে চোট লাগতে দিই নি।

খেলাধুলো ছাড়ার বহু বছর পরে দশ বছর আগে অফিস ক্রিকেটে ইণ্ডিয়ান অয়েলের সঙ্গে খেলায় ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে মারা স্কোয়ার ড্রাইভ ব্যাট থেকে শেষ পর্যন্ত নজর রেখে শরীরের পিছনে ঝাঁপিয়ে দু হাতে না পেয়ে এক হাতে ক্যাচ করি।

ঠিক একইভাবে সেকেণ্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে গাড়িটার হেডলাইটের আলো চুরি করে বাঁহাত ছুঁড়ে দিয়ে মেয়েটার ডান হাতের কনুইয়ের কাছটা কোনরকমে ধরে ঝটকায় বুকের কাছে নিয়ে নিই। গাড়ি বিকট শব্দে থামে। আমায় সামনের সীটে বসা মহিলা জিজ্ঞাসা করেন লাগে নি তো। আমি ‘না’ বলায় ওঁরা বেরিয়ে যান। রাস্তার ওপারে যাঁরাই ছিলেন ছুটে এদিকে চলে আসেন। মেয়েটাকে বকতে গিয়েও দেখি সে ঘাবড়ে গেছে। তাই সান্ত্বনা দিয়ে মেয়েকে মায়ের কাছে ছেড়ে দিয়ে নিজের গাড়ির ড্রাইভিং সীটের দরজাটা ফাঁক করে দাঁড়াতে গিয়ে বুঝতে পারি, বাঁ কাঁধের ডেল্টয়েড আর পাঁজরের কাছের পেশীতে ভয়ানক টান লেগেছে। আর টান লেগেছে পাঁজরের ভিতরে হৃৎপিণ্ডে।

‘আমি ভয় পাই না’ এই কথাটা বলা খুব সহজ। আমি সেটা বলি না। বরং বলি, ভয় পেলেও দ্রুত সেই ভয়টাকে জয় করে ফেলি। ফলে যখন মানুষ ভয় পেতে শুরু করে ততক্ষণে আমার তার সঙ্গে মোকাবিলা করা হয়ে গেছে। কাল বিকেলেই ছেলের স্কুলের কাছে এক মার্কেটের সিঁড়ি থেকে নামার সময় একটা কালো মতো চার পেয়ে সিং সমেত দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেটা ‘বাপরে’ বলে অন্য দিক দিয়ে চলে গেল। আমি সেসব না করে সেটাকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে গিয়ে দেখি সেটা ষাঁড়। ষাঁড়েদের আবার আমি একটু সমঝে চলি। বহুদিন অব্জার্ভ করে দেখেছি, তারা গরু আর বিচুলি ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। বাকিগুলো দেখতে পায় না। তাই কালকেও আমিও ধাক্কা দিয়েই, ‘কোই বাত নেহি’ বলে ঘুরে চলে যাই।

কিন্তু ভয়? এরকম ভয় আমি বহু দিন পাই নি। বহুদিন। কুড়ি বছর আগে গার্ল ফ্রেন্ড সহ কলেজ স্কোয়ারে টিটকিরি দেওয়া জনতার মুখোমুখি হতেও পাই নি অথবা যখন সেন্ট্রাল স্টেশনের সামনে রাস্তা পেরবার সময় গতি নিয়ে গালাগাল দেবার অপরাধে হিন্দি/ উর্দুভাষী দুজন গাড়ি থামিয়ে বেরিয়ে এসে আমাকে পিছন থেকে ধরে আমার বান্ধবীকে যখন শাসাচ্ছে, ‘ইসকো লে যা নেহি তো ইয়েহি পে গাড় দুঙ্গা’, তখনও না। শেষোক্ত ক্ষেত্রে তো তারা পুলিস দেখে আমাকে ছেড়ে গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে যাবার সময় দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে তাদের চেসও করেছিলাম। এমনই ক্যারা মাথায়। কিন্তু কালকে আমার অস্তিত্বটাই টলে গেছিল। বাবা হবার অস্তিত্ব, দায়িত্ববান নাগরিক হবার, মানুষ হবার সামান্য জীব হয়ে বেঁচে থাকার অস্তিত্ব। একটা জিনিস হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। আমার রিফ্লেক্স আগের মতো না থাকলেও একটা বেশ কম্যান্ডিং জায়গাতেই আছে। কিন্তু আরও বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে অন্তত পরবর্তী দু তিন বছরের জন্য। যতক্ষণ না পর্যন্ত মেয়েটা পারিপার্শ্বিক বিপদগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়।

আপনাদেরও বলছি। আয়েশের বালিশটাকে চর্বির পরতে কোমরের চারপাশে মুড়ে না রেখে একটু গা ঝাড়া দিন। এরকম না হলেও হয়তো অন্য কোন বিপদ আপনার জন্য ঘাপটি মেরে আছে। আর কিছু না হলেও সঠিক সময়ে পলায়ন তো সম্ভব হবে!

(১৬৫)

দেখতে দেখতে একাত্তর বছরে পদার্পণ করল আমাদের স্বাধীন ভারতবর্ষ। এ গলি থেকে জনগণমন(এখানে হসন্ত ব্যবহৃত হয়), ও গলি থেকে সারে জাহাঁ সে আচ্ছা। ইমোশনের চোখের জল আর বাধ মানে না। গড়াতেই থাকে গড়াতেই থাকে ঘড়া তো শূন্য হবার নয়।
আসলে দেশ আমাদের মতো সত্তরের দশকে জন্মানো মানুষগুলোর কাছে অন্যভাবে এসেছে। আমরা জরুরী অবস্থা দেখি নি, নকশাল আন্দোলন দেখি নি ট্রাম পোড়ানো দেখি নি। হান্টের পতাকা বাঁচাতে দৌড়ও দেখি নি। আমাদের কাছে স্বাধীন ভারতের স্বাদ নিয়ে এসেছিল জাতীয় সঙ্গীত। রবি ঠাকুরের ক্ষোভ রাগের প্রতিক্রিয়া। যা প্রায় একশো বছর ধরে দেশের ধারণা ভারতবাসীর হৃদয়ে ম্যাপের মতো এঁকে দিচ্ছে।
সালটা ১৯৮২। সেই প্রথম দেখলাম পতপত করে তিরঙ্গা উড়লে আর জনগণমন বাজলে (আসলে জনগণমন আমাদের প্রাণের ডাক, তাকে জাতীয় সঙ্গীত বা রাষ্ট্রগানের মতো ভারিক্কি নামে ডাকতেই ইচ্ছা করে না) চোখ দিয়ে আপনা আপনিই জল বেরিয়ে আসে বুকের ভিতরটা ভরে যায়। সেবারের ৭-১এর লজ্জার পরেই ১৩বার বেজেছিল সেই গান।
আর তার পরের বছর তো কথাই নেই। লালমুখোদের রোমরাজ্যে লর্ডসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পাঁচফুট চারের সেই বেঁটে মতো লম্বা মানুষটা যখন পাঁচ ফুট এগারোর হ্যারিকেনের আগুনটাকে তুলে ধরল আর পতপত করে তিরঙ্গা নিয়ে কোন এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি ছুটতে আরম্ভ করল লর্ডস জুড়ে। কি বলব একটা সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত নেশন (দেশ নয় দেশ নয়। পরিচিতিযুক্ত দেশকেই ত নেশন বলে!) যেন সকালের আনন্দবাজার যুগান্তর টেলিগ্রাফের পাতায় পাতায় জেগে উঠল কবির সেই পঙক্তি নিয়ে, ‘ভারত আবার জগতসভার শ্রেষ্ঠ আসন লবে’।
সেই ছিল ভারতবর্ষের প্রথম রূপ। আমার কাছে। মনন তখন তৈরী হচ্ছে গোঁফের রেখা উঠছে। দেশের এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে দেশটাকে ধরতে শিখলাম। দুহাতে, বুকের উপর। এদিক ওদিকের কলরব তখন কানে আসে না। ময়দানে সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক দেখে গর্বে বুক ফুলে ওঠে। দিল্লিতে ইন্ডিয়া গেট দেখেও।
বড় হলাম আর ঠাঁই হল এই কেঠো শহরে। কার্গিলের যুদ্ধের সময়ই। জাতীয়তাবোধ তখন নিজস্ব বোধে রূপ নিয়েছে। খারাপ ভালো পূতিময় দুর্গন্ধ ফুলের নির্যাস সবই দেখতে শুনতে চাখতে শুঁকতে শুকতে এগোচ্ছি।
সোশাল মিডিয়া এলো আর এলো নিজের একটা ঠিকানা। দুই জায়গাতেই মনন রাখতে শুরু করলাম। দেশ সম্পর্কে ধারণা দেশের ভালো কি করে হতে পারে এসবগুলো জিঙ্গোইজম পেরিয়ে তখন বুকে ঠাঁই পেতে শুরু করেছে। ২০০৫ থেকে আমার সোসাইটি। এখানকার ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীনতার মানে নিজের মতো করে বোঝানো। নিজের সন্তানদের বোঝানো এইভাবেই বেশ চলছিল।
কিন্তু গত কয়েকবছরে হঠাৎ দেখছি জাতীয়তাবোধের মানে বদলে গেছে। জনগণমন এখন নতুন অস্ত্র, ভারতবাসীকে জাতীয়তাবোধের মানে বোঝানোর জন্য। স্বামীজী এখন ডানপন্থীদের হাতিয়ার আর সুভাষ বোস বামপন্থীদের। বেশ কিছু বছর আগের কথা, একটা কবিতা লিখেছিলাম। যদিও তখন বুঝতে পারি নি যে কবিতা ফবিতা আমার নয়। তবুও দু কলি শুনিয়ে দিই কি বলেন?

সুখেই থাকুন
নরম নরম। ও দাদা নরম নরম কাব্য মাখুন গরম গরম ভাতে
ফুলেল তেলে বাবরি ভাজা সঙ্গে রাখুন পাতে
আহ্লাদেতে আটখানা হোন ফ্যাশন টিভি দেখে
পরের বউকে চাকুমচুকুম নিজের বউকে রেখে
আড্ডা জমান গমগমিয়ে তুফান তুলে চায়ে
পাড়ার রকেই পাহাড় ডিঙোন বরফ ঘষুন গায়ে
সৌরভেরই ব্যাট ধরে রোজ ছক্কা মারুন তেড়ে
মুগুর ভাঁজুন, মুরগি ভাজুন চর্বি তেলে ছেড়ে।

যুদ্ধে যাবেন? ও দাদা যুদ্ধে যাবেন দেশ বাঁচাতে কামান নিয়ে হাতে?
তার চেয়ে নয় মুখেই মারুন পাকিস্তানকে ভাতে।
আকাশ ছোঁয়া বাজার দরে শেয়ার বাজার কাত?
আপনি বরং ঘাপটি মারুন দিনকে করুন রাত
তাজ হোটেলে চললে গুলি গুনতে থাকুন লাশ
রাজনেতাদের মুণ্ডু ছিঁড়ে গলায় লাগান ফাঁস
দাঙ্গা হলেই সটকে পড়ুন ব্যস্ত থাকুন কাজে
আপনি দাদা মহামানব, আর ব্যাটারা বাজে

স্বপ্ন দেখুন। ও দাদা, স্বপ্ন দেখুন আকাশকুসুম পাশবালিশে পা
ভাবতে থাকুন দেশের ভালো করতে যাবেন না
আপনি দাদা ভীষণ ভালো আপনি থাকুন শুয়ে
অন্যে বরং শপথ করুক পড়বে না কো নুয়ে
লড়বে ওরা কাঁধ মিলিয়ে গড়বে এদেশ সোনা
করবে তখন দেশের বুকে সুখের আনাগোনা
আপনি দেখুন, ওরাও দেখুক, স্বপ্নতে নেই ক্ষতি
আপনি বরং স্থবির থাকুন ওরাই আনুক গতি।।

কাব্যগুণ নিয়ে টেনশন করবেন না কিন্তু যারা লেবেল লাগাতে যাবেন তারা ধন্দে পড়ে যাবেন বাম না ডান? ওসব ছাড়ুন আজকে আমাদের সোসাইটির গল্পটা বলি।

এই যে বলেন যাঁরা বাংলায় থাকেন তাঁরা কত দুরবস্থায় আছেন ইত্যাদি। আসলে আমাদের মতো যাঁরা তথাকথিত আলোকপ্রাপ্ত অথচ পরদেশে আছি তাঁদের কথা ভাবুন। আমাদের সোসাইটির একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছিল। যেখানে কয়েকটা ডানপন্থীর ভীষণ আনাগোনায় নিজে থেকেই অব্যহতি নিয়েছি। আর ওই যে বলছিলাম না, দেশভক্তি, স্বাধীনতা দিবস ইত্যাদি। এসব আমি ২০০৫ থেকে বেশ করাতাম ২০১৪-১৫ অব্ধি। তারপর দেখছি পৃথিবীটা কেমনবদলে বদলে যাচ্ছে। সেইসব ডানপন্থী ভীষণবাদীরা দেশের মানে শেখাতে চলে এসেছেন হাতে চাইনিজ মোবাইল নিয়ে চিন বয়কট করার ডাক দিয়ে। আজ দেখলাম জাতীয় পতাকার নীচে অখণ্ড ভারত মাতার চিত্র। ভিতর ভিতর কাঁপছি কিন্তু বলতে পারছি না। দৃপ্তভাবে জাতীয় সঙ্গীত গাইলাম হিন্দি উচ্চারণে নয়। বাংলায়। তারপর ভাষণ টাশন শুনে মাথা গরম হয়ে গেল। চলে এলাম কোন সিন ক্রিয়েট না করে। অখণ্ড ভারতের স্বপ্নটাকে জাতীয় স্বেচ্ছাসেবকরা স্বপ্রণোদিত হয়ে এভাবে কচিমনে ছড়াবার চেষ্টা করছে দেখে বিচলিত বোধ করছি। সোসাইটি মিটিংএ কথাটা হয় তো তুলব। কিন্তু কতটা কি করতে পারব জানি না। তবে চেষ্টাটা তো চালিয়েই যেতে হবে বলুন। পরবর্তী প্রজন্মকে কি এই ভেঙে যাওয়া সমাজ রেখে যেতে পারি? কবিতাটা খিল্লি ছিল বটে কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিটা নয়। সতর্ক থাকুন এবং সঠিক স্থানে গলায় জোর আনুন। আমিও আনব। ঠিক আনব। আর আনলে সবার আগে আপনাদেরই জানাব। কথা দিলাম।

আরেকটা কবিতাও দিই। যতই পাতে দেবার মতো না হোক।

ঠোঁটের উপর দাঁত দিয়েছি মেরে
নখের ভিতর লুকিয়ে আছে নখ
আমরা তবু বলছি গলা ছেড়ে
অবিশ্বাসী তোমারই জয় হোক

সুখের ভিতর বসত করে সুখ
বুকের ভিতর একটুকু সুখ থাক
বুকের ভিতর মুখোশ পরুক মুখ
সুখের পাখি ডানায় উড়াল পাক

পাঁকের ভিতর লুকিয়ে রাখা সোনা
সোনার উপর ছিঁড়ে রাখা জাল
দেখছি কিন্তু বলছি, দেখব না
জালের নীচে পাতানো জঞ্জাল।

রথের ভিতর হৃদয় আসন পাতে
রথের উপর বানিয়ে রাখা খাঁচা
রথের রশি আসুক তোমার হাতে
খাঁচার পাখির পথ ভোলানো বাঁচা

মেলুক ডানা আকাশ কুসুম ছুঁয়ে
মেলুক ডানা দিগন্তে বিস্তার
যেখানে আর পড়ব না কো নুয়ে
সেখানে হোক শান্তির পারাবার।।

সেই ইউটোপিয়াটাই খুঁজে চলি… কেমন?