জহর কোট অথবা মেওয়ারি পরত

২০০০ সাল, তখন সদ্য সদ্য বিয়ে হয়েছে। তা ফান্দে পড়ে সেই প্রথম এবং শেষবার কালীঘাটে গেছিলাম। যথারীতি পাণ্ডার পাল্লায় পড়েছি। কানাঘুষায় শুনেছি, কিন্তু সেই পাণ্ডা একদম নিশ্চিতভাবে বলল যে সিঙ্গীবাড়িতে নাকি রাজপুত রক্ত। মানে আমার পূর্বপুরুষরা কাশীর সেই ব্রাহ্মণের সঙ্গে সভ্যতার আলো নিয়ে পূর্ব ভারতে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। বাকীটা গালগল্প বা ইতিহাস।

সে যাই হোক, রাজপুত বীরের জাত আর আমিও মদনলাল হয়ে গেছিলাম। মানে গর্বে ছাতি ফুলে সাড়ে পঞ্চান্ন ইঞ্চি হয়ে গেছিল। (ছাপ্পান্নটা একটা লোকের জন্যই রাখা আছে। আয়নাগুলোও!)

তা রাজস্থান নিয়ে রূপকথার তো কমতি নেই! ২০১৪য় গেলাম চিতোরগড়, রাজপুত বীরগাথার পীঠস্থান। ১৫৬৭তে আকবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় জয়মল সিং এমন বল্লম ছুঁড়েছিল নাকি, যে হাতির পিঠে আকবরের ডানদিকের গোঁফ চার মিলিমিটার কমে যায়। মানে আকবরের নাকি কান কটকট করছিল। তাই, ডান অনামিকা দিয়ে কান চুলকোতে গিয়ে ঘাড়টা ডানদিকে একটু হেলে পড়েছিল। নাহলেই হয়েছিল আর কি!

তা সেই জয়মল আহত হয়ে পড়ার পর তাঁর একান্ত সহচর কল্লা সিং ঘোড়ার পিঠে চিতোরের ঢালু রাস্তা বেয়ে ছুটে আসার সময় কোন এক সিপাহসালারের হাতের লোহার চাবুক তলোয়ার যাকে তামিলে ‘উরুমি’ বলে তার পাল্লায় গর্দান দান করে বসেন। কথিত আছে দুই হাতে খোলা তলোয়ার নিয়ে কল্লা সিং-এর মুণ্ডহীন দেহকে ওভাবে ছুটে আসতে দেখে মুঘল সৈন্যরা থরহরি কম্প লাগিয়ে নাইন পিন বোলিং-এর মতো ঢাংঢুং করে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কিন্তু চালকহীন ঘোড়া আর কত টানবে? অতএব, রাজপুত প্রতিরোধ শেষ প্রায় আর আকবর দখলও করে ফেললেন চিতোর।

সে যাই হোক, চিতোরের কথা যখন উঠল তখন একটু তার ইতিহাস নিয়ে কথা বলা যাক। চিতোর নামটাই এসেছে, স্থানীয় মৌর্য জাতির নেতা চিত্রাঙ্গের নামে। পঞ্চম শতাব্দীতে চিতোরের পত্তন হয়।

কিন্তু চিতোর তার নিজস্ব মহিমায় প্রকাশিত হয় অষ্টম শতাব্দীতে বাপ্পা রাওলের সময়। বাপ্পা রাওল গেহলোট সর্দার ছিলেন। মৌর্য বা মোরিদের হাত থেকে যখন চিতোর গড় আরবরা দখল করেছিল তখন মনে হয় আশেপাশের রাজপুত সর্দাররা মিলে একজোট হয়ে তাদের ভাগায় আর বাপ্পা রাওল চিতোরের অধিপতি হয়ে বসেন। তো বিতর্কিত ইতিহাসমতো ৭২৫ খৃষ্টাব্দ থেকে মেবার সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটে।

তা তখন থেকেই মেবারের নাম ভারতের বৃহত্তম এবং দুর্গমতম দুর্গ হিসাবে পরিচিত। তারপর তো প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর ধরে চিতোরের টিকিটিও ছুঁতে পারে নি হানাদাররা। কেন? আসুন দেখি! চিতোরের দুর্গটি পরাইয়া ৭০০ একর জমির উপর তৈরী। প্রায় ১ কিমি চড়াই উৎরাই পেরিয়ে মূল দ্বার। সাতটি পোল বা দ্বার এই পথে। মধ্যপ্রদেশে আরেকটা দুর্গ ছিল কালিঞ্জর। যেটা দখল করতে গিয়ে শের শাহের মৃত্যু হয় আর এই চিতোর।

তা হেন চিতোরকে গেহলোটদের হাত থেকে প্রথম দখল করেন আলাউদ্দিন খলজী। আট মাস ধরে নাকাবন্দী করে রাখার পর ১৩০৩ খৃষ্টাব্দে চিতোরের পতন হয়। এবং কথিত আছে চিতোরের প্রথম জহর নাকী তখনই পালিত হয়েছিল। যদিও স্পষ্ট করে তখনকার কথাকার বা পরবর্তীকালে যাঁদের জবানবন্দীকেই ইতিহাস হিসাবে ধরা হচ্ছে সেই জিয়াউদ্দিন বারাউনী বা মহান সুফি কবি আমীর খসরুর কোন প্রতিবেদনেই সেই জহরের উল্লেখ নেই, কিন্তু তার বছর দুয়েক আগে রণথম্ভোরে ঘটিত জহর ব্রতের উল্লেখ খসরু সাহেব করেছিলেন।

আলাউদ্দিন খলজী। বলা যেতে পারে মধ্যযুগীয় ভারতের সেরা যুদ্ধবিদ। যদিও আমি এঁর আশেপাশেই রাখব শেরশাহ এবং পেশোয়া বাজিরাওকে। কিন্তু তাঁদের নিয়ে এখুনি ঘাঁটাঘাঁটি করছি না। আলাউদ্দিন খলজীকে কী ভাবে বর্ণনা করব? একাধারে কুটিল সুলতান এবং সেই সঙ্গেই প্রতিভাবান যুদ্ধবাজ। খলজী বংশের শ্রেষ্ঠ সুলতান কিন্তু নিজের শ্বশুর তথা কাকাকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করে দিল্লির সলতনত অধিকার করেছিলেন। উত্তর-পশ্চিম ভারত আফগানিস্তান পর্যন্ত এবং দক্ষিণে কাকোতিয়া এবং পাণ্ড্য সাম্রাজ্য ধ্বংস করে অধুনা কর্ণাটকা পর্যন্ত তাঁর প্রতাপ ছড়িয়ে পড়েছিল। ঠিক ঔরংজেবের মতোই কাউকে বিশ্বাস করতেন না, এক বিশ্বস্ত সহচর মালিক কাফুরকে ছাড়া। কাফুর কিন্তু আবার খলজী বা তদানীন্তন দিল্লির আমীরদের মতো তুর্কী ছিলেন না। তাঁকে গুজরাটের বাঘেলাদের পরাজিত করার পর দাস হিসাবে দখল করেছিলেন আলাউদ্দিন। আর মালিক কাফুরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়েও কানাঘুষোও চলতে থাকে। পরবর্তীকালে তাঁকে মালিক কাফুরের জন্যই বহুকামী হিসাবেও বহু ঐতিহাসিক চিহ্নিত করেন।

ইয়ে তবে ওই নারীধর্ষক, কামাতুর ইত্যাদি বলাটা কিন্তু খুব যুক্তিযুক্ত হবে না। আলাউদ্দিন বদনামের ভাগীদার হয়েছিলেন কিন্তু তাঁর মৃত্যুর প্রায় দুশো বছর পরে। যখন মালিক মহম্মদ জায়সি নামক এক সুফি কবি অওধি ভাষায় সুফি রসসম্পৃক্ত ‘পদ্মাবত’ লেখেন। সালটা ছিল ১৫৪০। আর সেখান থেকেই যত সমস্যার শুরু। এমনিতে জায়সি নিজেই বলেছেন যেন ‘পদ্মাবত’ রূপকধর্মী এক রচনা। যেখানে মেবারকে ধরা হয়েছে শরীর, রাওল রতন সিং আত্মা, হীরামণ তোতাপাখী যে সর্বদা সঠিক পরামর্শ প্রদান করত তা আধ্যাত্মিক গুরু, পদ্মিনী, সুবুদ্ধি এবং সর্বশেষে আলাউদ্দিনকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিভ্রমের রূপক হিসাবে দেখানো হয়েছে।

এমনিতে রাওল রতন সিং যতই সত্যিকারের চরিত্র হোক বা নেশাগ্রস্ত মাতাল বা দুর্বল হৃদয়ের মানুষ হোন না কেন, পরবর্তীকালের আপাতঐতিহাসিক ভাটগল্পে ট্র্যাজিক হিরো হিসাবে পরিচিত হয়েছেন। হাজার হোক গায়ে রাজপুত রক্ত কিনা। আর ফেঁসে গেছেন বেচারা আলাউদ্দিন। যদিও আলাউদ্দিনের পরাক্রমের সঙ্গে বেচারা শব্দটা একেবারেই যায় না। যে লোকটা নিজের শ্বশুরকে মারতে পারে, শ্বশুরের মন্ত্রণাসভার সদস্যদের প্রথমে ধনসম্পদ দিয়ে নিজের দলে করে পরে একে একে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে পারে এবং শেষে বার্ধক্যজনিত অবস্থায় নিজের ডানহাত মালিক কাফুরের হাতের পুতুল হয়ে নিজের দুই বড় ছেলেকে অন্ধ করে দিতে পারে। সে লোকটা আর যাই হোক বেচারা নয়।

কিন্তু আলাউদ্দিন খলজীর একটা বিশাল বড় অবদান ভারতকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে। এই যে আমরা স্বচ্ছন্দে ভারতীয় সংস্কৃতির কথা বলতে গিয়ে বুক বাজিয়ে বলি যে একমাত্র সভ্যতা যা আদিকাল থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে আধুনিক কাল অবধি চলে এসেছে সেটা কিন্তু বলা যেতে পারে আলাউদ্দিন খলজীর জন্যই সম্ভব হয়েছে।

লোকটা একবার দুবার নয় পাঁচ পাঁচবার ভয়ঙ্কর দুর্ধর্ষ মঙ্গোলদের পরাজিত করেছে এবং একবার ড্র হয়েছিল বলা যায়। সেই মঙ্গোলরা, যারা নাকি সভ্যতার পর সভ্যতাকে জাস্ট মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। প্রাচীন পারস্য বা ইরাক বা ইউরোপ যেই হোক না কেন দেড়শো বছর ধরে মঙ্গোলরা বারবার পরশুরামের মতো ক্ষত্রিয় শুধু নয়, ব্রাহ্মণ বৈশ্য শূদ্র সহ সবকিছু শূন্য করে দিয়েছে। সেই ভয়ঙ্কর মঙ্গোলদের বারবার হারিয়েছিল আলাউদ্দিনের সেনা। একবার খালি চিতোর অবরোধের সময় দিল্লি ফাঁকা পেয়ে আক্রমণ করে মঙ্গোলরা। তখন সুলতানের তখত ছিল সিরিফোর্টে, আলাউদ্দিন সেখান অবধি পৌঁছে তো যান কিন্তু মূল সেনাবাহিনী তখন গুজরাট দখল করছিল। ফলে তার অবর্তমানে সারা দিল্লিকে বানজার বানিয়ে দেয় মঙ্গোলরা। কিন্তু আলাউদ্দিন বা সিরিফোর্টের টিকিটাও ছুঁতে পারে নি তারা। ১৩০৬এ আমরোহার কাছে আরপার লড়াইতে মঙ্গোলদের হারিয়ে মোটামুটিভাবে ভারতবর্ষ্কে বাঁচিয়ে দেন সুলতান।

তারপরে সেই ১৫২৬এ সমরকন্দের দুর্দান্ত মঙ্গোল বাদশাহ বাবর হামলা করে দিল্লি দখল করলেও তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যের বিস্তার। ধ্বংস নয়।

সে যা হোক কী বলতে শুরু করে কোথায় পৌঁছে গেলাম। কথা হচ্ছিল রাজপুত আর মেবার নিয়ে পৌঁছে গেলাম মঙ্গোল বার বা বাহার করার অভিযানে।

যাই হোক মোদ্দা কথা হল, মেবারের ইতিহাসে তিনটে জহরের কথা আছে। কিন্তু সেটাই তো প্রথম জনআত্মবলিদান নয়। ভারতের ইতিহাসে প্রথম জনআত্মবলিদানের উল্লেখ পাই সিকান্দারের ভারত অভিযানের সময়। সিকান্দার অর্থাৎ আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। হাজির হয়েছিলেন ভারতের পশ্চিম সীমান্তে ৩৩৬-৩২৩ খৃষ্টপূর্বাব্দে। সেই সিকান্দার আর পুরুর গল্প। থানেশ্বরের পুরু, হেরে গিয়েও যিনি নাকি রাজার কাছে রাজার মতো ব্যবহারের গল্প বলে মুক্তি পেয়েছিলেন। আর পাটলিপুত্রের নন্দ সাম্রাজ্যের বিস্তারের গল্প শুনে রণক্লান্ত সম্রাটের সৈন্যরা সিন্ধুনদ পেরোতে চায় না আর মেগাস্থিনিসকে দায়িত্ব সঁপে কেটে পড়েন তিনি। ম্যাসিডোনিয়া ফেরার পথে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে অজানা জ্বরে (এই রে আবার অজানা জ্বর?) মারা যান তরুণ সম্রাট।

সেই আলেকজান্ডারের আক্রমণের সময় নিম্ন সিন্ধু উপত্যকার অগলশস্যৈ উপজাতি হেরে গিয়ে জনআত্মবলিদান দিয়েছিল অধিকৃত দাস হওয়া থেকে বাঁচার জন্য।

তারপরের গল্পটা আসছে, অষ্টম শতাব্দীতে সিন্ধ প্রদেশে। মহম্মদ বিন কাশিমের আক্রমণে সিন্ধুর রাজা দাহীর মারা যাবার পর বেশ কিছু দিন ধরে সৈন্যরা প্রতিরোধ করে। কিন্তু ধীরে ধীরে নিত্যপ্রয়োজনীয়ের সরবরাহ কমে আসতে থাকলে উপায়ান্তর না দেখে রাণী সমস্ত রমণীদের নিয়ে আগুনে আত্মবলিদান দেন এবং পুরুষরা আমৃত্যু যুদ্ধের শপথে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রু সেনার উপর। পুরুষদের এই প্রথার নাম কিন্তু ‘শক’।

এরপরের গল্পটা আমীর খসরুর জবানী। রনথম্বোরের জওহর ১৩০১। আর ঠিক এখানেই জায়সির গল্পটা গল্পই লাগছে। কারণ ১৩০৩এর পদ্মিনীর উপস্থিতি এবং তাঁর সৌন্দর্য্যে বিভোর হয়ে আলাউদ্দিনের আক্রমণ এবং রতন সিং পদ্মিনী গোরা বাদল আর আলাউদ্দিনের চোরপুলিশ খেলা এবং শেষে তেরোহাজার মহিলার জহর। আমীর খসরু তখন বোধহয় চীনদেশে বেড়াতে গেছিলেন, রতন সিং-এর জন্য আয়নার ব্যবস্থা করার জন্য। যাতে আলাউদ্দিন জলপ্যালেসে পদ্মিনীকে দেখতে পান। সে যাই হোক। তখন বোধহয় সুন্দরী মহিলাদেরকে ঠিক সুন্দরী মহিলা বলে ধরা হত না। সুলতানী সময় তো। তারা সবাই ভোগবস্তু ছিল। হ্যাঁ রাজপুতদেরও। জায়সি যেমন রতন সিং-এর পনেরোটি আরও রাণীর কথা উল্লেখ করেছেন। অথবা রাণা প্রতাপ সিং-এর কথাই ধরা যাক। তাঁর ১১টি বিভিন্ন বয়সের রাণী এবং ২১টি সন্তান ছিল।

তা এই লেখাটার কাজ তো কোন বিশেষ ব্যক্তির প্রতি বিরাগ প্রদর্শন নয়। শুধু সত্যের অনুসন্ধান। সেটা করতে গিয়ে মধ্যযুগের বিভিন্ন ধ্যানধারণা সামনে চলে আসছে। এই যেমন জহর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে তৃতীয় জহরের গল্পে একটু জল মেশানো।

মানে ১৫৬৮, জয়মল সিং ভয়ঙ্করভাবে আহত। তাঁর নির্দেশে চিতোর দুর্গে অবস্থিত নারীরা সোমরস পান করে, গায়ে আয়ুর্বেদিক ভেষজের প্রলেপ মেখে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ শুনতে শুনতে এগিয়ে গেলেন জহরকুণ্ডের দিকে। কতটা স্বেচ্ছায় তা তো বলা যাবে না। কারণ জীবন এবং ইচ্ছা সবই তো রাণা বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ইচ্ছায় সমর্পিত। রাণা বাঁচার জন্য রাণীদের নিয়ে গুপ্তপথে পালিয়ে গিয়ে উদয়পুরে রাজধানী স্থাপন করেন আর আট হাজার সেনা নিয়ে বিশাল মোগল বাহিনীর মোকাবিলার জন্য থাকেন জয়মল ও ফতেহ সিং। মহিলারা তো সেখানে উদ্বৃত্ত অথবা হয়তো সহমরণের জন্য বলিপ্রদত্ত প্রাণ। সে যাই হোক মেয়েরা জহর করে আর ছেলেরাও শকের উদ্দেশ্যে গেরুয়া পোশাক পরে হর হর মহাদেব মন্ত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে পরাক্রমী শত্রুবাহিনীর উপর।

সেই নাকি কে ক্ষুদিরামকে বলেছিল যে বোমা মার তোর নাম হবে। কিন্তু ধরা পড়লে যে ফাঁসি হবে সেসব আর জানা ছিল না। অতএব… ইতিহাসের পাতায় ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয় জহর হিসাবে মালা গাঁথা হয়ে গেল। আগেরটার ঠিক কুড়ি বছরের মধ্যেই।

আগেরটা অবশ্য বেশ আবেগপূর্ণ ব্যাপার ছিল। মানে মানুষের মৃত্যু অবশ্যই আবেগপূর্ণ। এবং রাজপুতদের ক্ষেত্রে কৌশলের থেকে আবেগটাই বেশী। তবুও সেটার ক্ষেত্রে অন্য ঘটনা।

হয়েছে কী, রাণা সংগ্রাম সিংহ আহত হয়ে ফিরেছেন খানুয়ার যুদ্ধে বাবরের কাছে হেরে। কিন্তু তিনি বীর রাজপুত যোদ্ধা। বীরত্ব দিয়েই হারিয়ে দিতেন বাবরকে কিন্তু তাঁর তো কামান ছিল না। সমরখন্দী মঙ্গোলটা কোথা থেকে চাকালাগানো ড্রেনপাইপে ডাম্বেল ভরে ছুঁড়তে শুরু করেছে। তার সামনে হাতি ঘোড়া বাঘ ভাল্লুক নিমেষে ধুলো হয়ে যাচ্ছে তো রাজপুত বীরত্ব কেয়া চিজ। কিন্তু রাণা তো দমবার পাত্র নন। আবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কিন্তু সেনাপতিরা নিশ্চিত জানেন যে এ যুদ্ধ জেতার নয়। তাই নাকি রাণা সঙ্গাকে বিষপ্রয়োগ করে মারা হয়। ইতিমধ্যে বাবরও ‘প্রার্থনা’ আউড়ে হুমায়ুনকে বাঁচিয়ে মৃত্যুবরণ করেন ১৫৩০-এ। হুমায়ুন তখন বিশেষ বড় নন। ফলে দিল্লির তখতে টালমাটাল অবস্থা দেখে গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ মেবার আক্রমণ করতে মনস্থ করলেন। সঙ্গার রাণী ছিলেন কর্ণাবতী। তিনি চিঠি পাঠালেন হুমায়ুনকে। সঙ্গে একটি রাখী। হুমায়ুন তখন বাচ্চা ছেলে। এসব হিন্দু- মুসলিম, রাজপুত- মোগল বুঝতেন না। তাই তিনিও তড়িঘড়ি করে রওনা দিলেন পাতানো বোনের ইজ্জত রক্ষার্থে। কিন্তু ‘বড় দেরী করে ফেলেছেন ভাই!’ বাহাদুর শাহ মাউন্ট আবু ছুঁয়ে হাজির চিতোরের দোরগোড়ায়। হুমায়ুন তখনও বোধহয় আলওয়াড় পেরোন নি। যা হবার হল। ইতিমধ্যেই ভেঙে পড়া মেবার বাহিনী ন্যুনতম প্রতিরোধ খাড়া করলেও সেটা যথেষ্ট ছিল না। ফলস্বরূপ রাণী কর্ণাবতীর প্রায় ৫ হাজার রাজপুত রমণী সহ জহর পালন আর ছেলেপুলেরা গেরুয়ায় মুড়ে গেল যুদ্ধ করে শহীদ হতে।

বস্তুত রাজপুতদের কপালটাই মন্দ! সাহস বীরত্ব দেশপ্রেম এসবের লম্বা চওড়া গল্পই হয়ে আছে আর সেগুলোকেই উপজীব্য করে গত হাজার বছর চালিয়ে আসছে। ওই যে ব্রেশট বলেছিলেন না? ‘পিটি দ্য কান্ট্রি, হুইচ নিডস হিরোজ’। সেইরকম। প্রতাপ সিং ছাড়া কেউ চেষ্টা পর্যন্ত করে নি বিভিন্ন রাজপুত জাতি উপজাতিদের একত্রিত করতে। তাই সুলতানি আমল বা মোগল আমলের দিল্লিই বলুন বা পেশোয়ার পুনে। রাজপুতদের বীরত্ব সত্ত্বেও তাদেরকে ‘ভালো খেলিয়াও পরাজিত’ তালিকাভুক্ত হতে হয়েছে বারবার।

তা এহেন জাতির এক ক্ষুদ্রতর আঁশের টুকরো হয়ে আমারও তো কোথাও জাত্যাভিমানে লাগতেই পারে। গল্পকথাই সই, পদ্মিনী তো আমাদের দেবী। মেয়েদের আজন্ম পাপোষ হিসাবে ব্যবহার করে এসে শিশোদিয়া, রাঠোর, রোহিলা এসব ক্ল্যানকাহিনীর তেজে আগুন লাগিয়ে লকলকে শিখাকে আকাশ ছোঁয়া আত্মগৌরবের বেলুন বানাতে পারি, আর সেখানে কেউ যদি একটু পিন ফুটিয়েছে তো চিড়বিড়িয়ে তার কাঁথায় আগুন লাগানো না পর্যন্ত শান্তি নেই।

চিতোরের গাইডের গল্পকথা শুনতে শুনতে খালি মনেই হচ্ছিল। এতো আয়োজনে বংশবৃদ্ধির মেশিনগুলোকে আগুনে না ফেলে যদি যুদ্ধবিদ্যা শেখানো যেত, তাহলে হয়তো…! নাহ এগুলো সব কষ্টকল্পনা। এগুলো মনের মধ্যেই থাক। মীরাবাঈ পঞ্চদশ শতাব্দীতে যখন কৃষ্ণের প্রতি নিজের ইহজীবন উৎসর্গ করেছেন তখন তাঁকে সন্দেহের বিষে পরজীবনে পাঠিয়ে দেবার গল্পও এই মেবারেরই। কিন্তু মীরা নয়। পদ্মিনীই রাজস্থানি বীরগাথার রূপক। যিনি শেষ পর্যন্ত প্রিয় দেবতার কাছে আগুনে বিলীন হয়ে আধুনিক রাজপুত মননকে মধ্যযুগীয় আবেশে রাখার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে ফেলেন। রুখা প্রদেশটায় বৃষ্টির আশির্বাদও নেমে আসে না তখন!

Advertisements

(১৭২)

এই যে আমরা যারা ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে চল্লিশ ছুঁয়ে একটু থিতু হয়ে বসেছি। যারা চাঁদের পাহাড়ের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব সম্পর্কে এতদিনে নিশ্চিত হয়ে পড়েছি। আমাদের একদিকে লাইফ বিগিন্স অ্যাট ফর্টির দুষ্টুমিভরা চোখ টেপাটেপি আর আরেক দিকে স্বপ্নভঙ্গের আশাবেদনার দোলনচাঁপার গন্ধবিধুরতা। এক প্রান্তে ষাট সত্তর আশির ফেলে আসা গ্রামাফোন, টেপ রেকর্ডার, ওয়াকম্যানের তার, বাক্সভর্তি টিভি, টেনিস বল, ব্যাট, টিটি র‍্যাকেট, কাঁটা কম্পাস, চাঁদা, টিনের স্যুটকেস, জলের বোতল আর সেফটিপিন দিয়ে আটকানো রুমাল- আবার অন্য দিকে, চাঁদ পেরিয়ে মঙ্গলের দিকে বাড়ানো হাতে, আইপ্যাড, আইফোন, মিতসুবিশি আর অটোমেশন ছোঁয়া নতুন স্বপ্নের বেচাকেনা।

এর মাঝেই কিছু কিছু জায়গায় কেমন যেন তাল মেলাতে দেরি হয়ে যায়। কখনও কখনও মানসচক্ষে ভেসে ওঠে শৈশবের বাসস্টপে দাঁড়ানো একটা লোক বা রান্না ঘরে তেলঘামে ভেজা একটি মহিলার ছবি। শৈশবে কারা যেন আমার পিছনে লাগত, “তোর বাবা ইডেনে চাকা চালায়!” আর আমি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতাম।

একটা ভদ্রলোক কিছু না করেই আমার জীবনধারা নির্মাণ করে দিয়েছে। মধ্যবিত্তের ইমানধরমকে একশো বছরের একটা পুরনো দোতলা বাড়িকে পেরিয়ে দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটের ব্র‍্যাকেটে এনে ফেলেছে। সাফল্যকে পা মাটিতে পুঁতে ক্রিজ কামড়ে খেলার হাতিয়ার আর ব্যর্থতাকে রবার্ট ব্রুসের গল্পের উপজীব্য করে তুলতে শিখিয়েছে। ময়দানের ঘাসের মধ্যেও শিরদাঁড়া খুঁজে পাবার মন্ত্র দিয়েছে। এমন মন্ত্র যে কুড়ি বছর আগে ময়দানের ভদ্রতম ক্রিকেটার অরুণ লালও বলতে বাধ্য হন, “The most gentle person in the circuit, please remember me with him.”

এই ভদ্রলোককে দিলীপ বেঙ্গসরকার আম্পায়ারস রেটিং-এ শূন্য দিয়েছিল কারণ তখনকার ভারত অধিনায়কের আবদার রাখেন নি বলে। তিনি মনোজ প্রভাকর আর কপিলদেবকে একসঙ্গে ডেকে ধমক দিয়ে খেলোয়াড়ি মানসিকতায় ক্রিকেট খেলতে বলেছিলেন। দেওধরের ফাইনালে আজ্জু মিয়াঁর কাছে বেধড়ক ঠ্যাঙানি খেয়ে মণিন্দর সিং এসেছিল যদি কোন টিপস পাওয়া যায়। তিনি আমাকে আবৃত্তি শিখিয়েছিলেন। একটা আগফা ক্লিক, একটা ইয়াশিকা দিয়ে পাঁচবছরেই ফ্রেমবন্দি করতে শিখিয়েছেন। জোড়াসাঁকো কলামন্দির জ্ঞান মঞ্চের ঠিকানা দিয়েছেন আর দিয়েছেন এক আসমান ভর্তি ভালোবাসা।

আর সেই মহিলা। আসলে সেরকমভাবে লিখতে গেলে কিচ্ছু পাব না জানেন! অন্ততঃ উপরের মত রেজিউমে তৈরি করা তো যাবেই না। কিন্তু সব কথা কি স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে? স্বয়ং নেভিল কার্ডাস বলে গেছেন না? স্কোরবোর্ড তুলো আর নুনের বস্তাকে একই চোখে দেখে যে। আমার দেখার চোখ, আমার শোনার কান, আমার গলায় ডাক আর স্পর্শ বর্ণ রূপ গন্ধের দুনিয়াকে খুলে দিয়েছিলেন এই মহিলা। ক্লাস সিক্সের লার্নিং ইংলিশ পড়া একটা হাফপ্যাণ্টুলকে স্বচ্ছন্দে গ্যাস লাইটার ধরিয়ে ভাত করতে দেওয়ার ইতিহাসই তো ফিসফাস কিচেন গড়ে। ক্লাস এইটে ফ্রেঞ্চ টোস্ট আর ইংলিশ চা। অটুট পরিশ্রম, মগ্নতার ডাক, ব্যালেন্স অফ মাইন্ড আর সত্যবদ্ধ অভিমান। রক্তমাংসের বাইরে এসব নিয়েই মানুষ গড়ে ওঠে।

ভদ্রলোককে একটা টাচস্ক্রিণের মোবাইল দেওয়া হল। ব্যবহার করেন নি কোনদিন বলে, আড়ভাঙা এখনও হয় নি। এই যে ফোনে ফোনে শেখানো, এগুলোয় মনে পড়ে যায়, আমার মেয়েটা কেমন কথায় কথায় ‘কেন?’ ছুঁয়ে থাকে। ছেলেটা কান পাতলেই ফোনের স্ক্রিনের আড়ালেই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। উচ্চতা তো এভাবেই বাড়ে। অথচ আমার পাঁচফুট এগারোয় যেদিন আমি ভদ্রলোককে ছুঁলাম, সেদিন থেকেই যেন নিজের ইতিহাসে ওই দুজনের জায়গা কোথায় কীভাবে দেব, তাই নিয়ে ‘কিন্তু কিন্তু’ ভাব।

ভদ্রমহিলা গান শিখছিলেন, মাঝে বছর পাঁচেক। আগেও শিখেছেন, কিন্তু আবার শিখছিলেন। পূর্বনির্ধারিত বুড়ো বয়সেই। কিন্তু কেমনভাবে যেন ২০১৩র বিয়োগান্তক দৃশ্যের পর সেসব চুকেবুকে গেল। এখন মেধাহীন বাংলা টিভির ধারাবাহিক চক্ষুনিবারণ। কিছু নেই, কি ঘটে কেন ঘটে কোন কথা নেই। কেটে যায় সময়। মাঝে সাঝে নাতি নাতনিরা ফোন করে। তাদের সঙ্গে আড়াইটে-সাড়ে তিনখানা কথা আর তারপরের সেই খাড়াবড়িথোড়ের জীবন। ভালো লাগে না আর। সময় পেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় শ্বাস নেওয়া। একটু গান, একটু সংস্কৃতির তাধিন তাক। কখনও যদি মুচকি হেসে জীবন তাকায় তাহলে তো মনটা বেঁচে যায় তবু।

দুদিন আগেই ভদ্রলোক জ্বরে পড়েছিলেন। কিন্তু করার মতো কোন জায়গায় তো ছিলাম না পাঠক/ পাঠিকা, আর তার উপরে আরও পাঁচ ছ কাঠি পেরিয়ে ফোন করে খবর নিতেও ভুলে গেছি প্রচণ্ড চাপে।

কষ্টগুলো কীভাবে পেরিয়ে যায় চোদ্দ শ চল্লিশ কিলোমিটার যেন। নিজের শহরে জায়গা নেবার মতো যোগ্যতা ছিল না বলে শিকড় গেড়েছি এত দূরে। কিন্তু ওদিকের শিকড় ক্রমে ক্রমে শুকোতে শুকোতে টান পড়ে যায় সেটুকু নিয়ে আগে হয়তো করতাম, কিন্তু এখনও একটা প্রশ্বাসও খরচ করি না। মনকে বুঝিয়ে নিয়েছি, বাপ এগিয়ে চলাই জীবন। নির্বিকার মুখ আর ভাবলেশহীন হৃদয় এই নিয়েই এক্কাদোক্কা খেলা চলেছে। কিন্তু পার্শ্ববর্তিনী মানতে চান না! যদি নিয়ে আসা যেত! যদি নিয়ে আসা যায় এখানে? সত্যিই কি যায়? আট দশকের শিকড় কি এক টানেই উপড়ে ফেলা যায়? তখন জলও পাওয়া যাবে না কোথাও!

তবুও তাঁরা থেকে যান। নানান ছলে যখন মহেশ বারিক লেনের গাড়ি ঢুকতে না পারা সরু গলিঘুঁজির মধ্যে দিয়ে দোতলা বাড়িটা এসে পড়ে, তখন দেখি এক ঋজু চেহারার ভদ্রলোক আর এক দৃশ্যতঃ স্থবির হয়ে যাওয়া কিন্তু মনের কোণে সবুজ রেখে নেওয়া ভদ্রমহিলা। আর এদের পিছন থেকে ছায়া হয়ে যাওয়া একটা ছফুটের অবয়বহীন অভিব্যক্তি অভিবাদন জানাচ্ছে। আর যাবার সময় যেন একটা অস্ফুট জিজ্ঞাসা রেখে যায়, ‘আবার আসবি তো?’। কতদিন একদিকে ঘাড় কাত করে উত্তর দিতে পারব ছাতা নিজেও বুঝে উঠতে পারি না।

বয়স তো হচ্ছে আর তার সঙ্গে সঙ্গেই বোধগুলো ভবিষ্যৎকে রূপান্তরিত করছে। বাঁধনগুলোকে ধরে রাখার হাতটাও আজ যেন বাঁধা পড়ে যাচ্ছে।

নাহ! কীবোর্ভ ভিজে ওঠার আগেই লেখাটা শেষ করি। খালি একটা কথা, পাঠক/ পাঠিকারা! শিকলগুলোকে জুড়ে রাখতে ভুলবেন না! দেখবেন স্পর্শের মধ্য দিয়েই আমার আপনার মত সাধারণ মানুষের ইতিহাস গাথা অমর হয়ে থাকবে। আমেন!

(১৬৯)

এই প্রথম সম্পূর্ণ মোবাইল থেকে ফিসফাস লিখছি। আর এই প্রথম আমার কোলকাতায় আসার ইচ্ছে ছিল না!

মানে সমস্যা নেই কোন, কিন্তু পুজোর ঠিক আগেই যদি ‘ওঠ ছুঁড়ি, তোর বিয়ে’ বলে টিকিট কাটতে বলা হয়। তাহলে বাপের বাড়িও বিস্বাদ লাগে।

তা সে যাই হোক, ভোর ছটা পঞ্চাশের ফ্লাইট ধরার আগে তিনটেয় উঠে নতুন বাহন উবার আর মেট্রোর যুগপৎ সফরের চক্করে ঘুম গেছিল টেলেরামা টিভি হয়ে।

তবুও দিনগত পাপক্ষয় করতে গিয়ে সিকিউরিটি চেকের পর একটু পেটে কিছু ফেলার ইচ্ছে হল। ওদিকে সিকিউরিটি চেকে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল যে, যেহেতু আমার ছোট সাইজের বিড় ব্যাগটি লাগেজ চেকিংএ দিই নি সেই হেতু একটা খোলা ব্লেড আর একটা গোটা সুপার প্ল্যাটিনামের প্যাকেট সহ শেভিং কিটটি রয়ে গেছে।

দাড়ি চাঁচার ক্ষেত্রে আমি এখনও সেই বিরল প্রজাতির অন্তর্গত, যারা তিন টুকরো সেফটি রেজারকে এক করে তা মাঝখানে ভোটের ডিউটিতে প্রদত্ত মাছের মতো পাতলা ব্লেড ঢুকিয়ে কচাকচ দাড়ি কাটি।

আর ব্লেড মানে সুপার প্ল্যাটিনাম। ধারে ভারে কোন কথা হবে না এই মহার্ঘ্য বস্তুটিকে নিয়ে। কচুগাছ থেকে পেরেক সবই গাল বরাবর নামিয়ে দিতে পারে এই দু ইঞ্চির ওয়েপন। তবে জিলেট স্যাটাস্যাট আর হাইফাইয়ের দৌলতে একে পাওয়া বেশ দুষ্করই। আমার দশ বছরের পুরনো আদর্শ স্টোরে রীতিমতো অর্ডার দিয়ে আনাতে হয়।

এতো সীতা রামায়ণ লেখার কারণ বঙ্গ জীবনে তার প্রয়োজনীয়তা বোঝাবার জন্যই। তা ওয়ান পিস ব্লেডটিকে সিকিউরিটি জওয়ানের সামনেই বিদায় করলাম। কিন্তু খচরা মন কাজে নামল প্যাকেটটির ক্ষেত্রে। এডগার অ্যালান পোর একটি গল্প ছিল, যেখানে প্রয়োজনীয় চিঠিটি একটু দুমড়ে, সামনের টেবিলেই ফেলে রাখা ছিল আর তাবড় পুলিশ আর তার চেয়েও বড় হনুরা সারা রাষ্ট্র তন্নতন্ন করে খুঁজেই হদিশ পায় নি। পোয়ের গোয়েন্দার কেস আলাদা, গল্প কথকের অনির্বচনীয় পক্ষপাতিত্বের সুবাদে তিনি ধরে ফেলেন।

তা আমিও সেইভসবেই লাগেজের মধ্যেই নিতান্ত অজান্তেই যেন পড়ে গিয়েছে, এইরূপ ফেলে রাখলাম প্যাকেটটিকে। আর নিজে সর্বস্বান্ত কাকতাড়ুয়া হয়ে টিকিটে স্ট্যাম্প লাগিয়ে গিয়ে দেখি সিকিউরিটির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ব্যাগ বাবাজী ব্লেডের প্যাকেট নিয়ে বেপনাহ হাসছে।

সাধারণত এসব নিয়মভঙ্গের গল্পের মধ্যে কোন বাহাদুরী নেই বলেই মনে করি তাই এসিব কথা পাঁচকান করবেন না। চুপটি করে বরং পরের কিসসা শুনুন।

সেই যে বলেছিলাম না, পেটে কিছু ফেলতে হবে? তা সেই সূত্রে ফুডকোর্টে গিয়ে দেখি পুরোটাই এয়ার ইন্ডিয়া হয়ে গেছে। মানে দাক্ষিণাত্য ফেস্টিভ্যালের নামে ইডলি সাম্বরের ছড়াছড়ি। অগত্যা একটি নোনতা লস্যি আর একটি নোনতা সুজির মাইক্রোগরম বাক্স হাতে নিয়েই শুনি ফাইনাল অ্যানাউন্সমেন্ট মারছে। খেয়েছে! মানে খেয়ে আর ছেই বা কোথায়! শুরুই করি নি। অবশেষে দুই কাঁধে দুই ব্যাগ আর হাতে সাউথের সমারোহ নিয়েই প্লেনের পেটে ঢুকে পড়লাম। মাঝে আবার একটি লোককে ইন্টেস্টাইনের রাস্তায় প্যালেস্টাইন চলে যাওয়া থেকে আটকালামও ‘অ দাদা, উদিকে নয়, ইদিকে!’ বলে

তারপর আর কী? তার আর পর নেই। সুড়ুৎ সহযোগে অগ্রবর্তিনীর বিষ্ময় উপেক্ষা করে হাতের দাক্ষিণাত্য ক্লিশে শেষ করার পরে দেখতে গেলাম দুঘন্টায় সাফলিং সিনেমা। তিন ঘন্টার সিনেমাকেও বিশেষ অংশের মাধ্যমে দেখাটা এক ধরণের পারদর্শিতা। আর গ্রাউণ্ডহগ ডে আমার বিল মারের অত্যন্ত প্রিয় ছবি। জীবনের যাঁতাকল থেকে বেরিয়ে আসার ইন্সপিরেশনও বলা যায়। সবে সেটাকে খুলে গুছিয়ে বসেছি, আর কটাস করে সব স্ক্রিন নীল হয়ে গেল। স্টুয়ার্ড বয়টিকে যত বোঝাবার চেষ্টা করি যে টিভি গোল হয়ে গেছে। সে ততই তার চৌকো মাথায় আমাকে অন্য সিটে বসিয়ে সিনেমা দেখানোর চেষ্টা করতে লাগল। শেষে বুদ্ধিমতী এয়ারকাকিমাই ঘোষণা করে দিলেন আন্তর্ফ্লাইট এন্টারটেনমেন্টের অবলুপ্ত ঘটেছে যান্ত্রিক গোলযোগের স্টিকারের আড়ালে।

অগত্যা গতরাত্রের ঘুমহীনতায় প্রলেপ চড়ানো মগ্নতায় প্রবেশ করলাম। প্রচণ্ড গভীরে চলে গেছিলাম। পঞ্চম পাতাল ফাতালে হবে। হঠাৎ মনে হল কেউ কড়া নাড়ছে। আধবোজা উঠে দেখি যে সেই স্টুয়ার্ডবালক ‘পেগান মিল’ খাওয়াতে উঠে পড়ে লেগেছে। খাদ্যাখাদ্যের ক্ষেত্রে আমি রবিশঙ্কর জয়াদিত্য শাস্ত্রীর দর্শন অনুসরণ করি। অর্থাৎ কেউ তোমায় খেয়ে ফেলার আগেই তাকে খেয়ে ফেল।

অতএব, পেগান মিল শুনে আমি যারপরনায় আহ্লাদিত হয়ে ঘটঘট মাথা নাড়িয়েই মনে হল, আরে এটা তো এয়ার ইণ্ডিয়া। তারা সাত্বিক ভোজনের নামে পলান্ন বিসর্জন সেই কবেই দিয়েছে। তাই বাকী চোখটাও খুলে বুঝিলাম বালক আমায় ‘ভেগান মিল’ খাওয়াতে চাইছে। কিন্তু ততক্ষণে যা সর্বনাশ হবার হয়ে গিয়েছে। আয়তাকার ফয়েলবাক্সটি আমার টেবিলস্থ হয়েছে। খুলে দেখি রুটি আর ঘুঘনি।মাথার টর্চটা দেড় ব্যাটারি জ্বলে উঠল। আহা রুটি ঘুঘনি আমার আপাত জন্ম সার্থকখাদ্য। বিউলি পোস্ত দিয়ে ভাত আর রুটি দিয়ে ঘুঘনি পেলে আমার দেশের আসন্ন নিরামিষিকরণ নিয়ে বৃথা চিন্তা ত্যাগ করতে পারি। আর এ তো পাঞ্জাবি ছোলে নয়, আমার দেশোয়ালি মটরের ঘুঘনি। মাথার মিধ্য হ্যালজেনের আভা অনুভব এর কিছুক্ষণ পরেই করলাম যখন দেখলাম সহযাত্রী ব্যাটার টেবিলে সেই ইডলি সাম্বরের সম্ভার পড়েছে।

তারপর আর কী, সারাদিনের অসংখ্য গ্রীন টি পেরিয়ে বাড়ি এসে পৌছলাম। মাঝে লাঞ্চে আমার জয়েন্ট সেক্রেটারী এবং জেপিসির অন্যান্য সদস্যদের কারণে প্যাকড লাঞ্চ খেতে হল। যেখানে গিয়েছিলাম, সেই বনহুগলীর ইনস্টিটিউটের ডাইরেক্টর আমার দিকে করুণ হেসে বললেন ‘আজকাল কোলকাতাতেও এসব পাওয়া যাচ্ছে।’ দিল্লিতে কর্মসূত্রে থাকি, তাই কষ্টটা বুঝি বলেই বললেন।

অবশ্য বাড়ি এসে মায়ের হাতে ঘটির মালাইকারি আর বাঙাল ভাপার তামসিক রান্না খেয়ে মানসিক যন্ত্রণা কিছুটা ঘুচল বলেই কি না আপনাদের সক্কাল সক্কাল গল্প শোনাতে বসে গেলাম।

আজ কোলকাতা ঘুরব। পুজো সময় আসা হয় না। ভালোও লাগবে না হয়তো ভেবে। তাই এখনি পুজোর গন্ধ নিয়ে পালাব। বাকীটা ব্যক্তিগতই থাক।

(১৬০)

অবশেষে… অরিন্দম কহিলা বিষাদে
কুম্ভকর্ণের ঘুমঘোর ভাঙিল সখেদে
ফিসফাস দিল ডাক কলিকাতা বুকে
যার মাঝে কৈশোর গিয়েছিল চুকে।
ফি বৎসর একবার রাজধানী চড়ি
অম্লজান আহরণ ফিরিয়াছি করি…
ব্যাস আর পারলাম না দাদা! অনেক দূর টেনে দিয়েচি। তবে কথাটা হল, এই যে এতদিনের হিয়াটাস বা অজ্ঞাতবাস, তা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম সেই কোলকাতা নিয়েই। বস্তুতঃ কম দিন তো হল না! নিজদেশে প্রবাসী হয়ে আছি। দিল্লির লাড্ডুতে পাক দিচ্ছি। থেকে থেকে কোলকাতার মুণ্ডপাত করছি। কিন্তু কেন জানি না শহর কোলকাতা আমাকে রসে ডুবিয়ে রাখে। সেই মাছি ধরার ফাঁদের মত! গল্প তৈরী হয় রাতে গল্প তৈরী হয় দিনে। আর তার পরই চলে আসে ফিসফাস!

তা হলে আর দেরি কেন? নেমে পড়ি ময়দানে!

সেই শনিবার দুরন্ত থামল কোলকাতার বুকে। শিয়ালদহ থেকে বাড়ি হয়েই আড্ডা! ছেলেটাকে বইমেলাতেই বেশ পছন্দ হয়েছিল! বলল এখন আছি মুর্শিদাবাদে! কিন্তু থাকব শনিবার! ডাক দিলাম চলে এল! কলেজ স্ট্রীট কলেজ স্কোয়ার! বাপুরে কি ভিড়! আড্ডা তো পগার পাড়। না কফি হাউসে ঠাঁই না প্যারামাউন্টে পাই! তাতে কী? দেলখোশ আছে না? কব্জি ডুবে জায় কভারেজে আর আঙুল ডোবে না চায়ের কাপে! আড্ডা দিয়ে ফিরে আসার সময় বলে আসলে আমার জন্মদিন! লাও! দিই ঠুসে একখান বই!

তাপ্পর আর কি? যেখানেই যাই নাই আর নাই! পুরনো কোলকাতার প্রদর্শনী! বৃষ্টি মাথায় সাড়ে বারোটায় ছেলে মেয়ে ট্যাঁকে! বলে চারটেয় খুলবা! লাও! রোববারের বাজারে গেনু পিটারক্যাট! বলে একঘণ্টা লাগবা! তাপ্পর আর ট্যাক্সিও নাই! একটাকে ধরে গেলাম আর্সেলান! সেখানেও পঞ্চাশ মিনিট। শেষে সিরাজে পাকে চক্রে ঢুকে পড়ে মাখনের মতো মাটন বরায় দাঁত চোবানো! বিরিয়ানিগুলোও আছে ঠিক ঠাক। ঠিক যেমনটি থাকার কথা… ডিম, আলু, মাংসের টুকরো, স্নেহ, মশলা, কেওড়া জল আর মোলায়েম প্রলেপে!

সে সব থাক! কফি হাউস ট্র্যাডিশন ট্র্যাডিশন! নিডস বিগ চেঞ্জ বস! ঠাণ্ডা কফি যেন টই টই পুকুরের জল! গরম কফি যেন ইক্ষুমোরন! আহা ইনফিউশনে যদি চিনি না থাকত! বাবি আর গুড্ডুকে জিগাও! কেমন লাগে কভারেজ চিকেন?

সে সব কথাও থাক। বরং বলি অন্য গল্প! পরের রোববার হক্কালে পার্শ্ববর্তিনী বাক্স প্যাঁটরা সহযোগে রওনা দিল জামশেদপুর। কায়দা মেরে আইআরসিটিসি থেকে বুক করলাম খাবার। মন আমার আর আরেক ঠাঁই থেকে। মন আমার খুশ করে দিল, কিন্তু চিকেন ফ্রাইড রাইস শত ফোনেও এল না। বললাম অর্ডার ক্যান্সেল করান! বলে মেল ঢেলে দিন (মেল ডাল দিজিয়ে)। দিলাম ঢেলে! আকাশ থেকে এক মুঠো মেঘ ধার নিয়ে! তা দেড় সপ্তাহ হয়ে গেল কোন জবাব নেই! অথচ ওলায় ওঠার পর ভুল করে চল্লিশ টাকা পার্কিং ফি নেওয়ায় তা সঙ্গে সঙ্গেই ফেরত পেলাম সেই দিনই। সরকারি ফস্কা গেরো! ব্যায়াম কর রে ভাই!

এছাড়া আরও কত কি! ট্রাম বাস ঠেলা টেম্পোর শহর এখনও সেই রকমই রয়ে গেছে। আধবোজা চোখের আধো আধো রোমান্স। বৃষ্টি আসবেই ধরে চাতকপাখিরা হাঁ করে থাকে সূর্যের পানে। গণ্ড দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ে। ভিতরের ঠাণ্ডা আর বাইরের গরম মিলে ক্যাটাভরাস।

IMG_1818.JPG

নকুড় নন্দীর সন্দেশ, ঘোষ ব্রাদার্স- দ্বারিক- গাঙ্গুরামের বেকড চমচম- সাব্বিরের রেজালা- রয়ালের চাঁপ- নিজামের কাঠি রোল আর জিলেট জিলেট জিলেট। নরম মসৃণ গালের মতো স্মৃতিরা নেমে আসে বুকের উপর।

আচ্ছা দক্ষিণ কি আমার দুয়োরাণী? চিরন্তন উত্তর দক্ষিণ লড়াই পেরিয়ে আজ তো দক্ষিণেও আমার বন্ধু কুটুম আত্মীয়রা ছড়িয়ে আছে! তাহলে দক্ষিণে রোমান্স নেই? গড়িয়াহাটার মোড়, রাসবিহারী, গলফ লিঙ্ক, আনোয়ার শা, গোলপার্ক, বচ্চনের ধাবা, ঢাকুরিয়া, হাজরার মোড়, আদিগঙ্গা আর ন্যাশনাল লাইব্রেরী!

জাতীয় গ্রন্থাগার? আরিব্বাস! তারা সাড়ে তেরোর ডাচ আর কোরীয় ভাষার ভক্তকে উপদেশ দেয় হার্ডি বয়েজ পড়তে আর অনেক খুঁজে পেতে একটা বই চাইলে বলে ‘জামাই ষষ্ঠী’! তার থেকে তো বাইরের জঙ্গলটাই ভাল! কি সুন্দর পরী নামে সেখানে, গাছের ঝুরি বেয়ে- কাঠবিড়ালীর আঁচড় বেয়ে ছায়া ঘনায় পথের প্রান্তে।
আর আছে পোলাপান! দুইখান! তারা রাতে জাগে! আলো দেখলেই একজন বলে ‘পাঁচ মিনিট’ বলে ঘুমিয়ে পড়ে! আর একজন বলে, ‘কি মজা সক্কাল হয়ে গেছে! উঠে পড় সবাই!’ বলে ঘুমিয়ে পড়ে! তা তারা এখন নিজ নিজ দায়িত্বে বড় হচ্ছে। শহর কোলকাতা তাদের আপন নয়! কিন্তু তবু যেন কোথায় একটা নাড়ির টান তৈরী হচ্ছে!

যাই হোক তিনখান গল্প বলে এই সব হাবিজাবি শেষ করি!

এক
ঘনাদাকে ফোন করলাম, কিভাবে যাব? বইয়ের দাম দিতে হবে! বলল বাস অটো আর হরির দোকান। পৌঁছলাম। গিয়ে আড়াইশো টাকা দিতে গিয়ে খুচরো উপর করতে হল! সব বড় নোটের বাহার! আড্ডা মেরে এবার যাব বাসু দার কাছে! কদ্দুর? এই তো দমদম সাতগাছি থেকে বাস ধরে মিল্ক কলোনি! বাহ বাহ!

কিন্তু পকেটে পাঁচশোর রাজত্ব। সঙ্গে একটা পাঁচ টাকার কয়েন! দুটো বাস বলল পাঁচশোর খুচরো নেই! হাঁটতে থাকলাম! ট্যাক্সি? খুচরো নেই! আরও হাঁটতে গিয়ে কেলেঙ্কারি! চটির পটি গেল খুলে! লাও ঠ্যালা! হাঁটতে থাকলাম! মুচির দেখা নেই! কোলকাতায় সবাই রোববার ছুটি মারে নাকি? শেষে দু কিমি হেঁটে কেষ্টপুর খালের বাঙ্গুর আর যশোর রোডের মাথায় পেলাম তাকে? কত টাকা? লাগাতে পাঁচ আর টেকাতে দশ! পাঁচই নাও ভাই! জুড়ে দাও! সর্বশ্রান্ত সর্বস্বান্ত হয়ে চটি সারিয়ে এগোতে লাগলাম! আরও এক দুই! গলা শুকিয়ে পাঁপড় টিশার্ট ঘাম গড়িয়ে ন্যাতা! স্টুডিওর ঘড়িতে সাড়ে বারো! দুটো বাস একটা ট্যাক্সি হাঁকিয়ে দিল! কোথাকার বেয়াদপ! খুচরো ছাড়া সওয়ারি হও! তাও রোববারের বাজারে! পাস দিয়ে এক এক করে আখের রস, ছাতুর সরবত, লেবুর সরবত সব বেরিয়ে যাচ্ছে! একটাও কোল্ডড্রিংসের দোকান নেই! ক্যাথলিন খোলা! ন্যাহ খোলা নেই হে! আড্ডা দিচ্ছেন তারা! জয়ত্তারা! লেক্টাউন যশোর রোড পেরিয়ে একটা মোড়ে পেলাম তার দেখা! আহা সশশীরে বর্তমান সহৃদয় সজ্জন! ফ্রুট জুস খাইয়ে পাঁচ শো টাকা খুচরো করে দেবেন তিনি! কিন্তু বললেন আমার কাছে তো মোটে চারশো ষাট হচ্ছে! কালিয়া… মানে তালিয়া! আরও একপিস ফ্রুট জুস দিন দাদা! তাপ্পর দুটো স্টপেজের জন্য বাসে উঠে গেলাম বাসুদার বাড়ি। বাসুদা শম্পাদিকে বলল ওকে একটা নয় দুটো লস্যি দাও! লাপিস লাজুলি লস্যি! সাদা টেট্রা প্যাকে নীল আঙ্গিকের আমূল ভালোবাসা ছড়ানো লস্যি! গরমের দুপুরে নরমের পরশ আহা!

সে যাই হোক। এবারে দুই
সরোজের সঙ্গে দেখা করতে ভর সন্ধ্যায় গেলাম ই-মল-এ! মল অত্যন্ত নোংরা শব্দ! কিন্তু ভিতরটা শব্দহীন ও পরিষ্কার। তার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেও মাঝে মাঝেই দরজা খুলে গিয়ে পিঠে হাওয়া খাওয়া যায়। তারপর হাঁটতে হাঁটতে র্যাালিজের কুলফি, নিজামের কাঠি রোল ঠেঙিয়ে সরোজের সৌমিতাকে নিয়ে হাজির হলাম ঔধ ১৫৯০!

মাঝে তারা কাকে সব ফোন করে বলল দাঁড়াতে পারব না! ভালো কথা! গিয়ে দেখি, বেশ একটা সুন্দর সুন্দর মেহফিল! আধো অন্ধকারের নরম আলো নষ্ট করে দিয়ে আধদামড়া আধকানা কোলকাতাবাসী, মোবাইলে আলোকিত হচ্ছে আর আর সেলফি মারছে। উপরে প্রদীপ আর নীচে সিন্দুক দেখে সৌমিতা বলল, ‘দীপক তিজোরি’। পুরনো জোকেও হেসে উঠল মেহফিল। নরম গলাওটি কাবাবের সঙ্গে রেশমি রুমালি! আর রান বিরিয়ানি। মশলার গন্ধ হাতে চলে আসে আর আসে নরম মাটনি তন্তু। মুখে দিলে একটা জবজবে ভাব থাকে বটে কিন্তু গলে যেতে সময় নেয় না। তবে চমকে দিল এক চাটনি। তেঁতুল দিয়ে রাঙালুর চাটনি! কেয়াবাত মিয়াঁ! সব কিছু মিটিয়ে বিল চেয়েছি! পরিবেশক গলায় গামছা দিয়ে বলে কমপ্লিমেন্টারি! আইলা টিকিট কমপ্লিমেন্টারি হয় শুনেছি! তা বলে আস্ত ডিনার? বলে না না উপরঅলা বলে দিয়েছে! আর সিসিটিভিতে নজর রাখছে! পয়সা নিলে পাপ হবে! সৌমিতা আবার ফোন ঘুরিয়ে জেরা করল কাকে কি বলেছিস! আমিও তাদেরকে জেরা করলাম কাকে কি বলেছিস! জানলাম ফোন গেছিল ঔধ-এর জন সংযোগের কাছে। ভ্যাবলার মত বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলাম, “হ্যাঁ গা তোমাদের আলুর গুদামে আবার কবে আগুন লাগবে?”

IMG_1850.JPG

 

আড়াই
অনেক খুঁজে পেতে গেলাম স্যান্টাস ফ্যান্টাসিয়া! গোলপার্কের লোকেরাই জানে না কিন্তু কসবার রূপঙ্কর সরকার জানেন যে বাঁশপোড়া চিকেন আর চালের রুটির সঙ্গে স্কুইড আর অক্টোপাসও পাওয়া যায় হেথায়! কিন্তু বিধি তো এখন জোট! যেখানে যাবি চোট খাবি! বন্ধু ফোন করে বলল আজ তো বন্ধ! তাই বসে বসে কফি চিবোন আর বচ্চনের ধাবায় গিয়ে রেশমি কাবাব চোষা!

শেষ পাতে একদিন গিয়ে মোহনবাগান মাঠে খালি পায়ে ঘাস জড়িয়ে ইডেনের সঙ্গে ভালোবাসা সেরে এলাম। ঝিরিঝিরি আকাশ সামান্য সময় রেয়াত দিয়ে পাশে দাঁড়াল আমার! ব্যাস খেল খতম! এবারকার মতন আর কি!

এই আর কি! কলেজের বন্ধু স্কুলের বন্ধু দীনের বন্ধু কৃপাসিন্ধু আরও সব এবারে দেখা না করতে পারা বন্ধুদের সঙ্গে থেকে দূরে চলে এলাম পরশু! আহা মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিও… ওগো আমার প্রিয়!

 

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ ফিসফাস কিচেন ছাপা হচ্ছে http://www.abasar.net-এ পড়বেন কিন্তু!

(১৫৯)

“খুদা ভি আসমা সে যব জমিন পর দেখতা হোগা
মেরে মেহবুব কো কিসনে বানায়া শোচতা হোগা…”

কন্টেক্সটের একেবারেই বাইরে কোটেশন কিন্তু তবুও যদি ধরে নিই প্রত্যেকটি মানুষকে উপরওলা নিজে হাতে করে বানায়, তাহলে কম বেশির দাঁড়িপাল্লাটা উনিশ বিশ হয়েই যায়।

প্রতিবন্ধী কথাটা আজকের দিনে আলাদা করে কোন অনুভূতি জাগায়? অনুকম্পা না সহমর্মিতা? দুর্বলের প্রতি অনুকম্পা নয় সহমর্মিতার প্রয়োজন। কিন্তু আপনার সহমর্মিতার সুযোগ যদি কেউ নেয় তাহলে? লাইনে আসি পাঠক পাঠিকারা তাহলে?

গতকাল দিল্লি বইমেলা সমাপন হল। বাণিজ্য- বিপণন- প্রচার- প্রসার- প্রভাবের দিক থেকে দেখতে গেলে সফলতম বইমেলা। কিন্তু ওই যে বলি না? টেবিলের এপারে থাকার উটকো ঝামেলা!

সেটাই কাল হল বটে! এক ভদ্রলোক আছেন বসন্তকুঞ্জে থাকেন! গানটান করেন বটে কিন্তু তার থেকে বেশী করেন ইষ্টুকুটুমি ঝামেলা। গতবছর বইমেলায় আবৃত্তি প্রতিযোগিতার ফলাফল ওঁর সুবিধার জন্য কেন সেদিনই ঘোষণা করা হবে না সেই নিয়ে সপরিবারে ঝামেলা করেন। ওঁর মেয়েটি বেশ ভালই আবৃত্তি করে বটে। আর ভদ্রলোকের পায়ে একটু অসুবিধা আছে।

গতকাল সবে পসরা সাজিয়ে বসেছি। ওবাবা আবার এসে হাজির এবং দেখলাম অন্যান্য আধিকারিক, যাঁরা ওঁকে চেনেন না তাদের সঙ্গে রীতিমত বিতণ্ডায় মত্ত। আপত্তিজনক কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন। কিন্তু খুব মিষ্টি করে। আমি ইশারা করলাম বাকিদের, ‘কাটিয়ে দাও’। কিন্তু ততক্ষণে কেউ একজন ওঁর কাঁধে হাত রেখে বলেছেন যে আপনি একটু ধীরে কথা বলুন না!

ব্যাস আর যায় কোথা! “আমার গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?’ এই সেই তুই তোকারি! তারপর হঠাৎ একজনকে নিজেই ধাক্কা মেরে পড়ে গেলেন। আর পড়বি তো পড় আমার স্টলেরই গায়ে। হুড়মুড় করে অক্টোনমের র্যােকে রাখা বই ঝরে পড়ল। বোর্ডে ফাটল দেখা দিল। আমি দৌড়ে গিয়ে বললামও, “আরে মশায় উঠুন! কি করছেন কি?” অকথ্য চিৎকার করতে শুরু করলেন। সঙ্গে স্ত্রী ও মেয়েকে এগিয়ে দিচ্ছেন! আমি ওনাকে তুলতে গেলাম তো, ঢ্যাপ করে পায়ে লাথি মারলেন! আমি সাবধান করছি এদিকে কেউ এগিও না। এ কিন্তু ঠিক প্রতিবন্ধকতার সুযোগ নেবে! তারপর ‘ওরে বাবারে মেরে ফেলল রে!” বলে নিজে গিয়ে স্টেজের সামনে শুয়ে পড়লেন।

মঞ্চে তখন ছোটদের অনুষ্ঠান শুরু হব হব করছে। সবাই প্রমাদ গণল। এমন কি কোলকাতা থেকে আগত পুস্তক বিক্রেতারাও অনুরোধ উপরোধ করতে শুরু করেছেন। বয়স্ক ব্যক্তিরা অনুরোধ করছেন। ‘তুইও প্রতিবন্ধী হবি’ ‘তোদের জেলের হাওয়া খাওয়াব’ ‘আমি মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছি’ ‘এই জন্যই ভগবান তোকে টাকলা করে দিয়েছে’, ‘তুই তাঁবেদার, তুই এই তুই ওই’। ইতিমধ্যেই পুলিশকে ফোন করে দিয়েছে।

পুলিশও এসে হাজির। কিন্তু পুলিশের অনুরোধেও সে নড়তে রাজি নয়। আইওকে আসতে হবে। আইও এসে পৌঁছল। ধর্মেন্দ্র কুমার! বয়স সাতাশ আঠাশ। এসেই রিপোর্টিং করতে লাগল। নাম এল আমার এবং আমার সম্পাদকের! আহা আমাদেরই তো চেনে সে! তবু সে নড়বে না! যতক্ষণ না আমাদের গ্রেফতার করা হবে। তার নাকি বেজায় লেগেছে। প্যারামেডিক্স না হলে সে স্ট্রেচারেও উঠবে না।

এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে, কোন আশ্বাস বিশ্বাসেও থামছে না। শেষে অ্যাম্বুলেন্স এনে তাকে পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হল আর আমাদের বলা হল তার স্ত্রী এবং মেয়ের সঙ্গেই থানায় যেতে। আইওর ব্যবহারেই কেমন যেন ইয়ে ইয়ে ঠেকছিল। পরে শুনলাম বইমেলার পুলিশ পার্মিশনের জন্য পঁচিশ হাজার টাকা চেয়েছিল। কিন্তু সবকিছু অনলাইন হয়ে যাওয়ায় তার কপাল পুড়েছে। তাই বাগে পেয়ে ভাল্লুকের মতো ঘেরবার প্ল্যান। আমাদের বসিয়ে রেখে সে হাওয়া। এদিকে সময় বেড়ে চলেছে। বিকেলে তিনটেয় এই সময়ের সুমন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা আছে বইমেলায় সে কি হবে কে জানে। আমার বড়শালীকে ফোন করলাম। তিনি বিধান দিলেন যে আবেদন লিখতে দুটি একটি তো ওঁদের বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ। এবং অপরটি কেন আটকে রাখা হচ্ছে তার কারণ জানানো! আইও এবার নিজমূর্তি ধরলে। বলে কিনা ৩৫৪ ধারা! মহিলাদের উপর অত্যাচার! আচ্ছা?

এদিকে আমার বড় শালী আসতেও দেরী হচ্ছে। আর অ্যাসোসিয়েশনের আধিকারিকদের টেনশন বাড়ছে। তাঁরাও এসে হাজির। তারপর আর কি? এদিক সেদিক থেকে ফোন টোন চলছে। মেলা প্রাঙ্গণ থেকে খবর চাইছে এবার কি হবে? এবার কি অনুষ্ঠান ইত্যাদি! হাসপাতাল থেকে খবর এল। খবর আনলেন ডাক্তারবাবুই! ডাক্তাররা পরীক্ষা করে ছেড়ে দিয়েছে। রিপোর্টও দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তিনি রিসেপশনেই শুয়ে আছেন। তাঁর এক্সরে হবে। আইও হেলতে দুলতে গেল রিপোর্ট আনতে। তিনঘণ্টা হয়ে গেছে। সময় কাটছে না। সেকেন্ড অফিসারকে জিজ্ঞাসা করলাম, “মশা হয় না?” “রাতে ঘুম হয়?” ফালতুকা আলফাল প্রশ্ন করে টাইম পাস করছি।

আইও ফিরে এল প্রায় পাঁচটায়। এসে বলে এখনও ছাড়া পায় নি! আর আমাদের নাকি জেলের ভিতর রাখা হবে! আমরা মচকাব না! ইতিমধ্যে এসএইচও এসে হাজির। হাজির সহসভাপতিও আর আমার বড় শালীও। তা এসএইচও বেশ ভদ্রই। তিনি আইওকে ডেকে মিষ্টি করে দাবড়ে দিলেন। আমাদের রিপোর্ট নিলেন! আর আইওকে দায়িত্ব দিলেন তদন্তকে ঠাণ্ডা বস্তায় ঢোকাতে।

আর আমরা হইহই করে ছুটলাম মেলা প্রাঙ্গণের দিকে। সেখানে তখন হইচই পড়ে গেছে। কে নাকি রটিয়েছে যে আমাদের গ্রেফতার করা হয়েছে! আর যে কি সব হয়েছে কে জানে!

যাই হোক আমি ঢুকেই ঘোষণা করলাম, “মাই নেম ইস সৌরাংশু সিনহা! অ্যান্ড আই অ্যাম নট আ টেররিস্ট!” আর কি দুজনেই কানহাইয়ার অভ্যর্থনা পেলাম! বই টই বিক্রি হল। প্রচুর আড্ডা হল। অনুষ্ঠান ধন্যবাদ জ্ঞাপন। ছৌনাচ আর চেন্নাইয়ের নাটক। তারপর? তারপর আর কি? রাত বারোটায় একে একে ময়দান ফাঁকা আর আমরা আবার সেই থোড় বড়ি খাড়ায় ফেরত। কিন্তু যে কথাটা আজ ফেবুতে ইংরাজিতে লিখলাম সেটাই আবার লিখি!

নাম নেওয়াটা আমার ঠিক আসে না। তাই এখানেও নিলাম না! তবে কি না! নিজের আপাত পিছিয়ে থাকাটাকে কেউ যদি অস্ত্র করেন তাহলে সব পিছিয়ে থাকা মানুষকেই কিন্তু অসৎ ভাববেন না। মনে রাখবেন সহানুভূতি নয় সুযোগ। অনুকম্পা নয় বিশ্বাস দরকার। একটু সুযোগ একটু বিশ্বাস পেলেই কিন্তু প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তারা বহুদূর এগিয়ে যাবে। আর যারা অসৎ অস্ত্র ব্যবহার করে? হেহ! কি যে কন কত্তা? কদ্দিন? পাবলিক কিন্তু জেনে গেছে! তাই সাধু সাবধান!

ফিসফাস ১ ও ২ পাওয়া যাবে কোলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় ২৭শে জানুয়ারি-৭ই ফেব্রুয়ারি ২০১৬- সৃষ্টিসুখের স্টল নং ৪৯৩-এ (থিম প্যাভিলিয়ন বলিভিয়ার পাশে)

Fullscreen capture 20-01-2016 103833.bmp

(১৪৮)

বাবা মা এসেছিলেন পুজোর কদিন। কাল ট্রেনে উঠে ফিরে গেলেন আমার শৈশবের শহর কোলকাতায়। ষোলো বছরের উপর হয়ে গেল তাও এখন মেয়ের বাবারা যেমন বিদায় মুহুর্তে গম্ভীর গ্রামভারী থাকতে পারে না, সেই রকম এই বিচ্ছেদের মুহুর্তগুলোতে মাঝে মাঝেই চোখের ঘটি হাত হড়কে উপুড় হয়ে পড়ে। আমি এই অবশ্যম্ভাবী ইমোশনটা সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করি। নিরানব্বই থেকে কত কিছুই তো ঘটে গেল, চোখের ঘটি এখনও খালি হয় না তাও। আমার আবার বদনাম আছে আমি সিনিমা দেখতে দেখতেও ‘ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ’ করে কেঁদে ফেলি।

সে আমার এক বন্ধু ছিল স্কুলে, ঋষিরাজ। দুম করে সে চলে গেল রামকৃষ্ণ মিশনে। কিন্তু যোগাযোগটা থেকে গেছিল স্কুল শেষ হওয়া পর্যন্ত। কলেজে ঢুকলে যা হয় যে যেদিক পানে দেখে চলে যায় টায়। তা তখনও আমার বান্ধবী হয় নি কি না! তাই একা একাই সিনেমা মারতাম। তা সেদিনটা ছিল নন্দনে ঢুঁ মারার দিন। ৭টাকা আর ১৪ টাকা। লাইনে দাঁড়িয়ে দেখি পিছনের দিকে ঋষিরাজ। তা মধ্যবিত্ত নীতিজ্ঞানটা তখন টনটনে। তাই ঋষিরাজকে সামনে না এনে আমিই পিছনে গিয়ে আড্ডা মারতে লাগলাম। একসঙ্গে সিনেমা দেখব ইটি। কিন্তু কপাল জোরে বা বিজোড়ে দেখি মাত্র কয়েকটা টিকিটই বাকি। (আমার নিজের জায়গায় থাকলে অবশ্যই এটা হত না)

যাই হোক তারপর সেই সাতটাকার টিকিট কেটে একদম ফ্রন্টরোয়ে বসে চোখে রুমাল চাপা দিয়ে ঘাড় জিরাফের মতো করে সিনেমা দেখে হল থেকে বেরলাম। নাকের জলে চোখের জলে অবস্থা। অত সামনে থেকে দেখলে যা হয়। ঋষিরাজ বলল, “বহুদিন পর কোন সিনেমা দেখে কাঁদলাম!” আমি বললাম, “ছাতা চোখ দিয়ে এমন দিব্যরশ্মির মতো জল পড়ছিল যে বুঝতেই পারি নি সিনেমা দেখে কাঁদলাম না ফ্রন্ট রোয়ে বসে!!”

সে যা হোক। ঘটনাটা কিন্তু সেটা না। দিল্লির পূর্বপ্রান্তে একটা বিশশাল মাছের আড়ত আছে। গাজীপুর। কোলকাতাতেও এতবড় নেই। এনএইচ ২৪ দিয়ে গাজীপুরে ঢুকলে ডানদিকে পড়ে ননভেজ মাণ্ডি। বাঁহাতে চিকেন মাটন আর ডিম এবং ডানদিকে মাছ। এ নিয়ে ফিসফাসে বোধহয় আগেই লিখেছি। সব্জি আর ফুলের মণ্ডিটা রাস্তার বাঁদিকে।

যাই হোক, বাবাকে নিয়ে মণ্ডি দেখাবো বলে নিয়ে গেলাম শনিবার। বাবা নিজেও দেখে অবাক। এতরকমের মরা মাছ একসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা দেখে নি কখনো! আর বরফ পেষার কল। বাপরে বাপ। বেলচা বেলচা বরফ ঝুড়ি ভর্তি করে আড়তে আড়তে চালান হচ্ছে। আর মাছগুলো চলে যাচ্ছে বরফের পেটে। আমার মা ইলিশ চিংড়ি এসব ছাড়া এখন খেতে চান না কোন মাছ। বাবার হয়েছে মুশকিল, এক টুকরো পোনা মাছ আর কে দেবে! সে যাই হোক। ইলিশের মরসুম না হলেও দিল্লিতে একবার যদি জুত করে খাওয়াতেই না পারলাম তাহলে আর প্রথম সন্তান হলাম কি করতে!

খুঁজতে খুঁজতে এক ইয়া পেটানো জোয়ান গোঁফ তার উর্দ্ধমুখি আড়তদারের সামনে গিয়ে দেখি একদম মাকুর মতো একটা ইয়াব্বড় ইলিশ রয়েছে এক্সট্রা অভিনেতাদের ভিড়ে। বাবা আর আমার কথার মধ্যেই সেই ভদ্রলোক বিশুদ্ধ বাংলায় বলে উঠলেন, “দাদা এটা পদ্মাপারের, নিয়ে যান একটু বেশী দাম হবে বটে! তবু সমঝদারকে খাইয়েও সুখ! নিয়ে যান!” নাম বললেন চিন্ময় রায়! আহা বল বল আমায় উত্তম কুমার বল! কে যে কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন আর বাহুবলীর নাম চিন্ময় রায় রাখে!

আর কি নেবেন? চিংড়ি ছাড়ুন কোলেস্টেরল আছে। ওদিকের ভেটকিগুলো একবার দেখুন তো! কি কাকু? কেমন? নিয়ে যান নিয়ে যান!

তারপর পরিচিত এক কোচবিহারের ছেলেকে বঁটিতে ধরিয়ে দিলেন তিনি, ছেলে পাঠিয়ে। আর ছেলেটি অভ্যস্ত হাতে পটাপট কেটে সাফসুতরো করে দিল। বাবাকে বললাম, দিল্লিতে তিনরকমভাবে মাছ কাটা হয়। বাঙালীরা সব কিছু রেখে গাদা পেটি করে নেয়। উত্তর ভারতীয়রা চোখ নাক মুখ ল্যাজ বাদ দিয়ে বরফি বানিয়ে নেয় আর দক্ষিণীরা ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে কচি শসা বানায়! তবে কোলকাতায় যেমন ছোট মাছ কাঁচি দিয়ে ছেঁটে দেয় সেটাও অভিনব কেস।

তা যাই হোক, দুদিন ধরে বেশ বিনমরসুমি ইলিশ আর ভেটকি পেটানো হল বটে। কিন্তু চমকটা লাগল অন্যত্র! লালকৃষ্ণ আদবানি যখন গৃহমন্ত্রী ছিলেন তখন এফবিআই কায়দায় একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা বানিয়ে তার হাতে দেশের আভ্যন্তরীণ সুরক্ষার ভার তুলে দেবার কথা বলে হেব্বি সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। ব্যক্তি স্বাধীনতায় হাত পড়ে যাবে যেমন এফবিআই অপরাধী নিরপরাধী নির্বিশেষে চরিত্র চিত্রণ করে, এই বলে ঢিঢি পড়ে যায়।

সে যাহোক সেটা হয় নি বটে কিন্তু ইন্টারনেট আর স্নোডেনের উইকিলিক্সের পরে সেই জিনিসটাই যে হচ্ছে না তা কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলা যায় না! ফেবুতে তো আবার ইন্টারনেটডট ওআরজি নিয়ে উথালপাথাল কেস। ডাল মে তো কুছ কালা জরুর হ্যায়। নাহলে এমন হয় বলুন? আরে সেই শনিবার মাছ কিনলাম আর সোমবার দেখি ফেবু আমায় সাজেস্ট করছে যে আমি জনৈক ‘চিন্ময় রায়’-এর বন্ধু হয়ে যাই! কি কেস! এই সেই ভিকো বজ্রদন্তী গোঁফবিশিষ্ট চিন্ময় রায়! কিম আশ্চর্যম! কাল রাতেই তিনি বন্ধু প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন! কিন্তু কি করে ফেবু ব্যাটা পেরেছে জানতে… সেটাই বুইলাম না দাদা! রোজ কত কি ঘটে যাহা তাহা আহা…!

10357816_593240844132714_2970673643453627726_n