(১৭৬)

এই ফিসফাস পড়ার আগে কিন্তু কথা দিতে হবে যে হিন্দিভাষী দিল্লিবাসী কোন বন্ধুকে নাম উল্লেখ করে গল্প করা যাবে না। আসলে কারুর ক্ষতি হোক এমন চাওয়াটা ফিসফাস লেখকের স্বভাব বিরুদ্ধ। কিন্তু বলতেই পারেন, তাহলে এসব গল্পের প্রয়োজন কী! তা বলতে কিন্তু এমন রসালো ব্যাপার স্যাপার যে শেয়ার না করেও পারছি না। আসলে কাল পর্যন্ত ডাল ফ্রাই ছিল। কিন্তু কাল ঠিকঠাক তড়কা পড়ায় একদম স্লার্প মার্কা ডাল মাখনি হয়ে গেছে।
হেঁয়ালি না করে পেড়ে ফেলি ক্ষণ। আসলে ফিসফাস লেখাটা শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই দেখেছি আমার সঙ্গে ঘটা ঘটনার সংখ্যা প্রভূত পরিমাণে বেড়ে গেছে। অবশ্য না হলে এক দুই পেরিয়ে তিন নম্বর বইয়ের যোগান দিতাম কী ভাবে!
তবে অফিসের চৌহদ্দিকে আমি এতকাল ফিসফাসের কানাকানির বাইরেই রাখতাম। হাজার হোক কার্যনির্বাহী দায়িত্ব বলে একটা কথা আছে। তবে সেখানেও কম ঘটনা ঘটছিল না।
এই তো মাস চারেক আগে অফিসের এক ছিটগ্রস্ত মহিলা আমায় ইয়ে নিবেদন করে বসে। এসব ক্ষেত্রে আমার প্রত্যুত্তর হয় রাহুল দ্রাবিড়ের মতো। মানে স্টেনের বাউন্সার বা ওয়ার্নের লেগব্রেক, সবেতেই ইগনোরের ডেড ব্যাট।
আমার দিল্লি জন্মের গোড়ার দিকে অফিসে এরকম এক দীর্ঘাঙ্গীর মনোযোগের স্বীকার হয়েছিলাম। অবশ্য তখন বুঝি নি সেইই। যদিও বুঝে ঘন্টা হতো। আমি তদ্দিনে লটকে পড়েইছি। তাতে কি! বুড়ো বয়সে নাতিনাতনীদের কাছে নিজের দর বাড়াতে এসব গল্প কথা কাজে লাগে। তা সেই দীর্ঘাঙ্গী হিসেব করে আমি যখনই অফিসের টেলিফোনের কাছের কম্পিউটারে বসেছি (সে যুগের এমএস ডস কমপ্যাক কম্পু) তখনই ফোন করে আড্ডা মারতে চাইত আর আমি বেমক্কা ফোন রেখে দিতাম। শেষে একদিন সে বলেই ফেলল, ‘ফোন মাত কাটিয়েগা! আপ বাত কিঁউ নহি করতে হো?’ ল্যাহ! এর জবাব সত্যিই ছিল না। তাই তখনই কেটে দিই এবং খোশগল্পের সেখানেই ইতি। ছ মাস পরে জানলাম ইনিই তিনি! তা ততক্ষণে তো লোহার টোপর পরাও হয়ে গেছে। তাই সে গল্পের সেখানেই কাঁচি হয়ে গেল।

মাঝে এদিক ওদিকে অফিসে খুব একটা সমস্যা সৃষ্টি করি নি, কিন্তু গত বছর ক’মাস ধরে পাঞ্জাবী পরাই আমার কাল হল। সে যাই হোক এখানেও ডেড ডিফেন্স। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হল। সে মহিলা মনে করলেন ‘মৌনং সম্মতিং রামচন্দ্রং’। তা সব কিছু ছেড়ে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে শুরু করলেন। অবশ্য সেটা আমি দেখি নি কারণ তাঁর সমস্ত বাক্যালাপই যাচ্ছিল মেসেজ রিকোয়েস্টে। কোন এক কারণে মাস দুয়েক পরে মেসেজ রিকোয়েস্ট খুলে তো চক্ষু সুপারিগাছে। আইল্যা এ যে পুরো অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড ফেঁদে বসেছে। মোবাইল থেকে ব্লক করতে গিয়ে দিলাম ডিলিট করে। আরও কেলো। আমার কাছে কোন প্রমাণ রইল না। পরের দিন ল্যাপটপ খুলে প্রথমেই ব্লক করলাম। ভাবলাম ঘাড় থেকে নামল। ওম্মা! একদিন পরে, সেক্রেটারির চেম্বার থেকে বেরিয়েছি, আমায় তিনি করিডোরে পাকড়াও করে খুব ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “কাল জো মেরে হাসব্যাণ্ড কো আপনে মেসেজ ভেজা, ও দুবারা করেঙ্গে তো, ম্যায় …… (পার্শবর্তিনীর নাম করে) কো বতা দুঙ্গি!’
লাও গোবিন্দ এবার ডুগডুগি বাজাও। কোতোয়ালকে ধরে চোর নিজেই দাবড়ায় দেখি! করিডোরে নাটক না করে নিজের রুমে এসে দরজা খুলে স্টপার লাগিয়ে মহিলাকে কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ আপ জানতে হো আপ কেয়া বোল রহি হো?’ সে তো তখন হিমালয় লঙ্ঘনের মুডে। আমায় বলে, ‘আপনে জো শুনা ওহি আপকো বতা রহি হুঁ!’ নাহ এর সঙ্গে তর্ক বৃথা। সটাং বিতারণ করে। সামনের হলের দু তিনজন মহিলা কর্মীকে ডেকে নিলাম। সৌভাগ্য যে তাঁরা প্রত্যেকেই এ মহিলার ছিটলেমি সম্পর্কে অবহিত। অতএব, তারা আমার পাশেই দাঁড়াল। কিন্তু যেটা জানলাম সেটা আরও সমস্যাব্যঞ্জক। এ মহিলা নাকি আগের ডিপার্টমেন্টে নিজের বসের উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনে খুব নাঝেহাল করেছেন।
মেরেছে। কোন ঝুঁকি না নিয়ে ডিপার্টমেন্টের যৌন উৎপীড়ন কমিটিতে রিপোর্ট করতে মনস্থ করলাম। ছাতা আমার ডেস্কটপটাও সেদিন বেগড়বাঁই করতে শুরু করেছে। উপায়ন্তর না দেখে দু পাতা হাতে লিখে জমা দিলাম। যৌন উৎপীড়ন কমিটির চেয়ারপার্সন আমার জয়েন্ট সেক্রেটারি মহিলা আবার বাঙালি, তিনি আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি কোন অ্যাকশন নিতে চাইছ?’ আহা! নরম সরম প্রাণ আমার। অ্যাকশন নিতে গেলে যদি মাইকেল জ্যাকসন হয়ে যায়? কারুর ছিটলেমোর জন্য তার কেরিয়ারের ক্ষতি হোক আমার মতো স্বাত্ত্বিক স্বভাবের মানুষের পক্ষে তা হজম করা বাঞ্ছনীয় নয়। তাই বললাম না না। অন্য ডিভিশনে ট্রান্সফার করে দিই, চড়ে খাক। তারপর ফোন থেকে আরম্ভ করে সব কিছু ব্লক করে দিয়ে এখন একটু নিশ্চিন্তি। তবে সেটা কদ্দিন এবং কদ্দুর সেটা সময়ই বলবে।
তবে এই স্বাত্তিক স্বভাবটা আমায় বেশ ভোগাচ্ছে। আরেক উঠতি অফিসারের ছুটির রোগ আছে। তাকে শুধরোবার দায় নিয়েছিলাম। তা সে কদিন আগে অফিস অঞ্চলে জুয়া খেলতে গিয়ে ধরা পড়েছে। এবং তখন নাকি মদ্যপ অবস্থায় ছিল। কেন্দ্রীয় সুরক্ষা সেনার প্রতিনিধিকে অনুরোধ করে তার জেলযাত্রা রদ করে শুধুমাত্র ডিপার্টমেন্টাল অ্যাকশনের মুখোমুখি বসিয়েছি। কিন্তু তাতেও কোন হেলদোল নেই, জাঠবুদ্ধি বলে কথা। বরং আমার সিনিয়র আমাকে একদিন বলেই দিলেন যে আমি নাকি তাকে লাই দিয়ে লাইকা বানিয়ে দিয়েছি।

জাঠ বলতেই মনে হল, ফালতুকা গল্প অনেকদূর টেনে নিয়ে যাচ্ছি। তার থেকে মূল গল্পে আসি।
অবশ্য যাঁরা জানেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, এই যে জাঠ, খাপ পঞ্চায়েত, অনার কিলিং এসব নিয়ে যে সহ কথাবার্তা শোনেন তার একটাও গালগল্প নয়। হরিয়ানার লোকজন গর্ব করে বলেও থাকে যে তারা এমন এক সমাজে বাস করে যা এখনও মহাভারতের যুগে পড়ে আছে।

মহাভারত বলতে মনে পড়ল, মহাভারতও তো জাঠেদের গোষ্ঠী দ্বন্দ বই আর কিছু না। কর্ণের অঙ্গ রাজ্য কর্ণাল। পাণ্ডবদের পাঁচ গ্রাম বাগপত, সোনেপত, তিলপত (ফরিদাবাদ), পানিপত এবং ইন্দরপত বা ইন্দ্রপ্রস্থ। আর হস্তিনাপুর হল বর্তমান মেরঠ। বাদবাকি অন্যত্র শোনাব। জাঠ বিয়েতে ফিরে আসি।

পঞ্চায়েত এবং খাপ বলতে আমরা এই যে খবরের কাগজে যা পড়ি বা টিভিতে যা শুনি সব সত্যি, সঅব সত্যি। ঠুনকো জাতিগত গৌরবের জন্য অন্তজ সন্তানকেও ঝুলিয়ে দিতে তারা পেছপা হয় না।
সোনেপতের এমনই একটা গ্রাম কাম শহরতলির একটি সো কলড শিক্ষিত পরিবারে আমাদের গল্পের নায়কের জন্ম। পরিবারের মধ্যে সবার ছোট, স্মীতহাস, স্বল্পবাক দোহারা চেহারার ছফুট লম্বা ছেলেটি আমি যখন এই ডিপার্টমেন্টে আসি তখন সদ্য সার্ভিসে যোগ দিয়েছে। গত সাড়ে চার বছর ধরে হাতে করে গড়েছি। এখন অফিসার হবার জন্য তৈরী। এমন কি এই যে এবারে ক্রিকেট খেললাম, ছেলেটি বাঁ হাতি পেসার হিসাবে আমার টিমের ওপেনিং বোলারও ছিল। এক কথায় এতদিনে ছোটভাই কাম বড় ছেলের মতো হয়ে গেছে। তবে ভাই হোক বা ছেলে, তাদের ব্যক্তিগত জীবনে আমি নাক গলাই না।
এখন বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে আউটসোর্সড কর্মীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অফিসের মধ্যে একটা রঙিন ভাব চলে এসেছে। এখানে ওখানে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। কপোত কপোতীর সংখ্যা বাড়ছে। আর তা দেখে বেশ ভালোই লাগে। তা আমাদের হিরোর সঙ্গে এক সুদর্শনার মন দেওয়া নেওয়া হয়ে গেল। তাও ঘুরতে ঘুরতে বছর খানেক।
হঠাৎ গত জুন মাসে ছেলেটি একটা কার্ড দিয়ে জানিয়ে গেল তার বিয়ে। কিন্তু দেখলাম সুদর্শনার হাত রাঙা হল না। আরও একটি প্রেমকাহিনির আলাপেই ইতি বলে ধরে নিয়ে কাজকর্ম করতে শুরু করলাম।
এদ্দিন কিস্যুটি হয় নি। হঠাৎ নভেম্বরের মাঝামাঝি সেক্রেটারির অফিসে জানা গেল, আমাদের হিরোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসে হিরোকে এখান থেকে ট্রান্সফার করে দেবার অনুরোধ করেছে।
প্রমাদ গনলাম, হিরো আবার শেষ লীগের ম্যাচেও উপস্থিত হল না। যেদিন এলো জেরা করলাম। আমার সামনে বসে ছেলেটি কেঁদে ফেলল। বলল, তার প্রেয়সীর সঙ্গে বিয়ে হবে না সেটা বুঝেই গেছিল, এবং সেই নিয়ে দুজনের কোন সমস্যা ছিল না। সমস্যা হল হিরোকে ধরে ব্ল্যাকমেল করে তার বাবা মা বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিল। ঠাকুমা দাদুর হৃদয় যেকোনো হৃদয়ব্যঞ্জক গল্পের হৃদয়বিদারক সমাপ্তির পথ প্রশস্ত করে। এক্ষেত্রে ছেলেটা চুপচাপ স্বভাবের বলে আরও সুবিধা হয়েছে।
কিন্তু বিয়ের মাস চারেক পরে সে বুঝতে পেরেছে যে তার স্ত্রী তার জন্য যশ চোপড়ার সিনেমার থিম নিয়ে আসে নি। কোন মিলই নেই দুজনের। আমি কুকুর আর তুমি পুকুর, আমি ঢেউ তো তুমি ফেউ টাইপের কেস। ব্যাস তার সব রাগ ভিসুভিয়সের মতো তার বাড়ির লোকের উপর পড়েছে। কষ্টের শেষ নেই। তার উপর বিষফোঁড়ার মতো প্রাক্তন প্রেয়সীকে দিনরাত অফিসে দেখছে। চলন্ত সাইকেলে লোহার রড ঢুকে একসা কাণ্ড।
বাড়ির লোকজন ডাংগুলি খেলতে ব্যস্ত আর শ্বশুরবাড়ি তো ফুটছে। হিরোর বর্তমান স্ত্রীও নাকি বলেছে, ‘হাত প্যায়ের তুড়ওয়াকে ঘর মে বিঠা দো। মাগর ডিভোর্স কা কোই চান্স নেহি!’ পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ ঘা কিন্তু পণের অভিযোগ ছুঁলে একদম ৪৯৮ ঘা। তার উপর আবার ক্লজ এ। একেবারে সাড়ে তিন বছরের জেল। নো বেল। অনলি ঢং ঢং গরাদ।
কিন্তু ছেলেটি সে সব বোঝার উর্ধে। তারপর গত মাসের একুশ তারিখ থেকে সে দেখি অফিসেও আসছে না। এক সপ্তাহ পরে তার বাবা এক বন্ধুর সঙ্গে এসে হাজির। তিনি রাজ্য সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মী ছিলেন। হিরোর প্রেয়সীর বাড়ি গিয়ে তাদের হুমকি তো দিয়েইছেন, তার উপর আরও বলেছেন আমার নাকি চণ্ডীগড় ট্রান্সফার করে দেবেন। আমাদের সার্ভিসের তিনকুলে কেউ দিল্লি ছেড়ে কোথাও যেতে পারে নি। আর আমি সেই সম্ভাবনায় বেশ উত্তেজনাই উপভোগ করেছি।
তা তিনি প্রথমে জয়েন্ট সেক্রেটারির কাছে গেলেন। আর তিনি সুড়ুত করে তাঁকে আমাদের দিকে ঠেলে দিলেন। আমরা বলতে আমার ডেপুটি সেক্রেটারি ও আমি। এসেই বলেন আমার ছেলেকে ট্রান্সফার করে দাও। ল্যাহ। তাঁকে বোঝালাম সেটা প্রায় অসম্ভব কারণ কার্মিক বিভাগকে যদি এটা লিখি যে ট্রান্সফার না করলে শ্বশুরবাড়ি ঠ্যাঙ ভেঙে দেবে বলেছে, তাহলে ডিওপিটি আমারই ঠ্যাঙ ভেঙে দেবে। এটা কোন কথা হল?
এবার শুরু হল ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলিং। তাঁর ছেলেকে নাকি তিনজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হয়েছে। ছেলের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিতে হয়েছে। লুকিয়ে রাখতে হয়েছে পিসির বাড়িতে। আমি প্রেসকিপশন দেখে বললাম এ তো সব ঘুমের ওষুধ। এসব খেলে কি আপনার ছেলে তার প্রেয়সীকে ভুলে যাবে? নাকি ট্রান্সফার করে দিলে সেটা সম্ভব হবে।
তা কে শোনে কার কথা! আমাকে বোঝাবার চেষ্টা হল এসব হরিয়ানার ব্যাপার, শ্বশুরবাড়ি খুব ‘খতরনাক’ (খতরনাক হলে বিয়ে দিয়েছিলে কেন বাওয়া?), ছেলে পাগল হয়ে যাচ্ছে। যেন হরিয়ানা একাই শুধু পৃথিবীতে আর আমরা আলফা সেঞ্চুরির অধিবাসী।
সে যাই হোক, সে সবে কাজ না হলে ফ্যাঁচফ্যাঁচিয়ে কান্না তো রয়েইছে। আমার ডেপুটি সেক্রেটারির সঙ্গে আমার খুব ভালো তালমিল। সে একবার খুব জোরসে বকে দিল। যে বেশি ত্যাণ্ডাইম্যাণ্ডাই করলে আমরা কিসসু করব না।
এই সময় আমার খচ্চর মাথা থেকে একটা সল্যুশন বেরোল। মাথাটা খচ্চর হলে কি হবে মনটা তো নরম! তাই অনেক কষ্ট দুঃখ নিয়ে প্রস্তাব দিলাম, ‘ছেলেটি পার্মানেন্ট, কিন্তু মেয়েটি নয়। মেয়েটি যে কনট্রাক্টরের মাধ্যমে কর্মরতা, তার মাধ্যমেই অন্যত্র যদি কাজে লাগিয়ে দেওয়া যেতেই পারে। তাতে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না’। হ্যাঁ মেয়েটির যেন কোনমতেই লোকসান না হয়।
খুবই খারাপ লোক পাঠক পাঠিকা। একতা কাপুরের সিরিয়ালের শাশুড়ি অথবা কয়ামত সে কয়ামত তকের গোগা কাপুর নিজেকে ঠিক এরকমই মনে হচ্ছিল। কিন্তু বিধি নাচার। কারুর কিছু হয়ে গেলে কী হবে?
তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটি ঘটবে আশ্বাস দিলাম বটে, তবে এটা জানা যত সহজে সেটা করার কথা ভাবা হচ্চে তত সহজ হবে না। কারণ কন্ট্রাক্টরের তো ইমোশনের ই নেই! তাকে বললে বলবে সার্ভিস টার্মিনেট করে দিন। তবুও পরেরদিন তাকে ডেকে অনুরোধ করলাম যে ভাল দেখে একটা মন্ত্রণালয়ে যেন মেয়েটিকে স্থান দেওয়া হয়। এই সূত্রেই বেরিয়ে এলো নগর উন্নয়ন দপ্তর, যেখানে আমার এবং ডেপুটি সেক্রেটারি উভয়েরই চেনাজানা আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হল বটে কিন্তু কাজ হতে হতে মাস কাবার হয়ে যাবে।
ইতিমধ্যে আবার, হিরোটি নিজের পিসতুতো দাদার ফোন থেকে আমায় ফোন করে জানাল যে সে আর যাই করুক আত্মহত্যা করছে না, যা তার বাবা দাবি করে গেছেন। ও সব নাটক। তাকে একবার বোঝাবার চেষ্টা করলাম বটে যে সব সময়ের উপর ফেলে রাখলে উলটো কেস হবে। আর এখন এসব ভেবে লাভও নেই। ফল হল উলটো। পিসতুতো দাদা তো বুঝলো, পিসি ছিলেন কাছেই। তিনি ভেবে বসলেন যে আমি ফুসলচ্ছি। সে আর কী বলি, পিসতুতো দাদাকে বললাম ছেলেটার দিকে নজর রাখতে হুড়মুড়িয়ে যেন কিছু না করে বসে।
এভাবেই ছিল বেশ। দিন সাতেক কেটেও গেছে। কাল কোন একটি কাজে বাড়ি দ্রুত ফিরে এসেছি। হঠাৎ দেখি হিরোর বাবার ফোন। আমি তো ভদ্রভাবেই কথা বলতে শুরু করলাম। তিনিও ভদ্রভাবে বলতে বলতেই বললেন, ‘হামারে ঘর মে সব ইয়ে সমঝে হ্যায় কে আপ মূল ষড়যন্ত্রকারী হো। ইসলিয়ে আগার হামারে লড়কে কো ইয়া উস লড়কি কো কুছ হোতা হ্যায় তো হাম তো পুলিশ কো আপ হি কে নাম বতায়েঙ্গে’।
অ্যাঁয়! বলে কি রে! সঙ্গে সঙ্গে খুব শক্ত কিন্তু ধীরে ধীরে বললাম যে আমাকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে বিশেষ কাজ নেই। আমি পুলিশকে নিয়ে কবিতা লিখি ( সেই যে লিখেছিলাম না? ‘ওগো আমার পুলিশ, আমায় আলতো করে তুলিস/ শ্যামলা রাতে গামলা হাতে গোবর জল গুলিস/ বৃষ্টি হলে মাঝরাতেতে নিজেরই কান মুলিস।। ইত্যাদি এবং প্রভৃতি) এবং আপনি নিজে একজন ক্লাস ওয়ান অফিসারকে হুমকি দিয়ে অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছেন।
যাই হোক, জাঠদের হাঁটুতে এসব ঢোকে না। তারা বেহালার থেকে তবলা বাজাতে বেশি পছন্দ করে। অতএব তিনিও একই সুরে ‘তুম তানানানা’ করে গেলেন দেখে আমি ফোনটা ‘কাটছি এবং ফের ফোন করবার সাহস দেখাবেন না’ বলে কেটে দিলাম।
তারপর আজ অফিসে গিয়ে সোজাসুজি লিখিত দিলাম। ছেলেটিকে চিঠি পাঠালাম ‘অনেক হয়েছে ভাই, রুস্তম সোরাব শিরি ফারাদ খেলা। এবার মানে মানে কাজে এস না হলে চাকরি খোয়াও’। জয়েন্ট সেক্রেটারির অনুরোধে কনট্রাক্টরকে ডেকে আরেকবার বোঝালাম, যে প্রাণ যায়ে পর মেয়েটার চাকরি বাকরি নিয়ে টানা হিঁচড়া হতে দেব না। সে ইনিয়ে বিনিয়ে টাইম চাইল এই মাসের শেষ অবধি।
শেষে, আইনি পরামর্শ অনুযায়ী আমি হয়তো কালকেই পুলিশে লিখিত জানিয়ে রাখব। এদ্দিন ধরে জাঠ জাঠ ভাট বহুত শুনে এসেছি! বাঙালির মাথায় ক্যারা আছে। একবার চটকে গেলে… না থাক! ওসব বলে কী হবে? করে দেখাতে হবে! কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন । মা কর্ম্ফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি। মানে? মানে কর্ম করতে বাধা দিলে মা কদাচ ফল দেবেন না। বরং মা কর্মফল হেতু নিজ হস্ত কর্মণিতে ভূমা ক্যালাবেন! আমেন!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ একদম শুরুতে বলেছিলাম, হিন্দিভাষী কারুর সঙ্গে এটা আলোচনা করবেন না। একা খাবে্‌ ভাগ করবেন না। কারণ পিকচার আভি বাকি হ্যায়। সেটা যদি না শোনেন? তাহলে আর কী? ওই ‘হেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি’। ভূমা ক্যালানি! আহ দারুণ একটা শব্দবন্ধনী কিন্তু! আহা!

Advertisements

(১৭৫)

নানা পাটেকরের একটা সিনেমা দেখেছিলাম একবার। পার্থ ঘোষ নির্দেশক। পাশের বাড়িতে এক ভদ্রলোক বৌয়ের জন্মদিন উদযাপন করছেন বলে শব্দে নানার ঘুম হচ্ছে না। তা তিনি ইয়াব্বর একটা বন্দুক নিয়ে গিয়ে গুড়ুম করে হাওয়ায় ফায়ার করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইতনা সন্নাটা না না শোরশরাবা কিঁউ হ্যায়?’ আপাদমস্তক ভদ্রলোক বললেন যে তাঁর স্ত্রীর জন্মদিন। তাতে নানা জিজ্ঞাসা করল, ‘তো কৌনসা তীর মার লিয়া উসনে জনম লেকে? অউর ইসমে তুমহারা কেয়া কন্ট্রিবিউশন হ্যায়?’

আসলে ঘটনা হল কিছু কিছু মানুষ জন্মসিনিক। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ তো তাদের চাঁদের আলোয় ঘুম হয় না। বাড়িতে আজ নলেন গুড়ের পায়েস রান্না হয়েছে তো ডায়বেটিস বেড়ে যাবে। শচীন সেঞ্চুরি করেছে তো দেশের গরীব মানুষগুলোর থালায় কী ভাত পড়বে? তাদের কাছে বিয়ে করা মানে খরচ, সন্তান উৎপাদন মানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সৌন্দর্য্যের ব্যাখ্যান মানে সেক্সিস্ট বাক্যাবলী, পদ্মাবতীর নাম পালটে পদ্মাবত হলে তারা ধোনিকে নিয়ে পড়েন।

সে যা হোক, লেখাটার দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফেই একগাদা নেগেটিভ এনার্জি ছড়ানো হয়ে গেল। আসল কথা হল কাল গেছে নতুন বছরের প্রথম দিন। গিনিপিগের মত লোক এণ্ডিগেণ্ডি নিয়ে ইণ্ডিয়া গেটে মোচ্ছব করেছে আর আমার মতো সুরহীন অসুররা সেই নিয়ে সক্কাল সক্কাল আপনাদের সামনে কমপ্লেনের পিটারা খুলে বসেছি।
না না, পাঠক/ পাঠিকারা, ফিসফাস লেখক তেমন নীচমনের কৃমিকীট নয়। আসলে… না থাক! সব কথার জাস্টিফিকেশন দিতে নেই! আসুন গল্পে ফেরা যাক!

তা হয়েছে কি, কাল ছিল সোমবার আর পয়লা জানুয়ারি। অফিসে একটা নিউ ইয়ার্স পার্টি করতে গিয়ে এমনিতেই আমি কালে কালে চলে আসা কালেভা আর বাংলা স্যুইটসের মিষ্টি এবং সামোসার ছুটি করিয়ে দিয়ে লোককে জলভরা তালশাঁস, কেশর ভোগ, ভেজিটেবিল চপ আর ফুলকপির শিঙাড়া খাইয়েছি। তারপর সারাদিনের পাপস্খলনের পরে সন্ধ্যা সোয়া ছটায় নিচে নেমে গাড়ি স্টার্ট করতে গিয়েই দেখি চিত্তির!
আসলে দিল্লি কি সর্দি বলতে যেটা বোঝায় সেটা ৩১শে ডিসেম্বর থেকেই প্রথম মালুম দিতে শুরু করেছে। এতকাল ছিল ধোঁয়াশা আর এখন কুয়াশা! আগেরটা মানবিক পাপ আর এবারেরটা মানসিক চাপ। মানে এবারের ধোঁয়া ধোঁয়া সকালে পল্যুশনের গল্প নেই। নেই ফসল পুড়িয়ে দেওয়ার প্রহর, বা কন্সট্রাকশনের ধূলিমেলা। এ হল আদি অকৃত্রিম দিল্লির কুয়াশা। এক মিটার দূরে যদি একটা পাগলা ষাঁড়ও নিশ্বাস ছাড়তে থাকে তাও তাকে দেখতে পাবেন না। সেই কুয়াশা ঘেরা সকাল কালকে নতুন বছরকে আলিঙ্গন করে দিল্লির বুকে চাদর ছড়িয়ে দিল। অতএব হেডলাইট আর ফগলাইট জ্বালিয়েই প্রভাতি সফর শুরু। আর অনভ্যাসবশতঃ অফিসে পৌঁছে সেটা নেবাতে ভুলে যাওয়া।

আর ফলে, সন্ধ্যায় গাড়ি স্টার্ট করতে গিয়ে ফুসসস! ব্যাটারি ডিসচার্জ করে দিয়েছে। সোয়া ছটায় ফোন লাগালাম ডাটসনের রোডসাইড অ্যাসিস্ট্যান্সে। তারা বলল আপনার কাছে এসএমএস এখুনি আসবে আর অ্যাসিস্ট্যান্স হাজির হবে এক ঘন্টায়। এক ঘন্টা আর মানুষের জীবনে কি এমন ব্যাপার। সে তো গাড়িতে বসে ঘুমিয়ে গেয়ে চলে যাবে। তবে চা তেষ্টাও পেয়েছে মন্দ না। শীতের ধোঁয়া ভরা সন্ধ্যায় ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা মুডটার সারেগামা রাঙিয়ে দেয়। সিজিও কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে টুকটুক করে হেঁটে গেলাম নেহরু স্টেডিয়ামের গায়ে রোড সাইড টি স্টলে। এদের প্রতি আমার বিশেষ অভিযোগ, কড়ক চা বললে ছাতা চিনি দিয়ে ভিজিয়ে দেয়। এখানে এক মহিলা, তাঁর দেড়-দু বছরের ছোট ছেলেটিকে নিয়ে চায়ের দোকান গোটাবার তোড়জোড় করছেন। তা কেটলি রাখা গরম চায়ের মতোই আমার ভাগ্যে জুটল। সে মন্দ না। সুদু এলাচের খোসার টেস্ট নয়, তাতে গুঁড়ো চায়ের খোশবাইও পাওয়া যাচ্ছে। তো তাতে তো মিনিট দশেক। বাকী পঞ্চাশ মিনিট?
এখন আবার মোবাইলে নতুন আপ ডাউনলোড করেছি স্টারমেকার। স্টার ফার গুলি মারুন, ক্যারাওকেতে ক্যাঁত মেরে গাইলে ফুসফুসে অনেকটা অক্সিজেন ঢুকে যায়। তাতেও ‘তুমি যাকে ভালোবাসো স্নানের ঘরে ডিস্কো নাচো’ ইত্যাদি গেয়ে গড়িয়ে দেখি ঘড়ির কাঁটা পৌনে আটটা। একের জায়গায় দেড় ঘন্টা। বেশী এদিক ওদিক করতে পারছি না। সিকিউরিটি গার্ডরা বেশ সন্দেহের চোখেই দেখছে। সন্ধ্যাবেলায় সন্দেহ কাটাতে খামোখা খেজুর জুড়লাম। এর মাঝেই একবার ফোন করে নিয়েছি। এবারে খোদ মেকানিকের সঙ্গে বার্তালাপ ঘটেছে। সে আবার লোদি গার্ডেনের দিকে নাকি চলে যাচ্ছিল। ঠিক সময়ে তাকে ঠিক বুঝিয়ে ভুল বোঝাবুঝি থেকে বিরত করলাম। দশ মিনিটেই সে পৌঁছে যাবে। কী আনন্দ!

এদিকে ঠাণ্ডা তো ক্রমেই জাঁকিয়ে বসছে। টহলদারি প্রহরীদের সঙ্গে তখনও ‘বেইমান দুনিয়া’ নিয়ে বার্তালাপ চলছে। আর ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে আটটা কুড়ি। এরই মধ্যে আমার অফিসের কেয়ারটেকার ছেলেটি হাজির। বাড়ি যাচ্ছিল। মেন গেটের সামনে আমায় দেখে সত্যিকারের চিন্তিত হয়ে পড়ল। আমায় বলল সাড়ে ছটায় বললে কাউকে না কাউকে হাজির করত। চেষ্টা অবশ্য করল। কিন্তু সাড়ে আটটায় যখন তাপমাত্রাই সাড়ে পাঁচ তখন সে সব চেষ্টার দাম থাকে না। আমি নিজেই ফোন লাগালাম অ্যাসিস্ট্যান্সে। সেখান থেকে মেকানিকের সঙ্গে কথা হল। সে এবার সত্যিটা ফাঁস করল- ভয়ানকভাবে ফেঁসে আছি স্যার। ফরিদাবাদ থেকে আসছিলাম, এখনও আধ ঘন্টা লাগবে কম করে, লোকে ঝেঁটিয়ে বেরিয়ে পড়েছে নিউইয়ার্স ডে সেলিব্রেট করতে’। অ্যাই, এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে… জাস্ট কিসসু করার নেই।

কেয়ারটেকার ছেলেটি, নাম তার চন্দন! আহা ‘চন্দন চন্দন! দৃষ্টিকে কী শান্তি দিলে চন্দন চন্দন!’ সে আমার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত থাকল। হাঁটতে আরম্ভ করলাম এক কিমি দূরের বাসস্ট্যাণ্ডের দিকে, ওলা উবারে কল করা হয়ে গেছে। মোচ্ছবের রাত্রে তারা শেয়ার বা পুলেও চাইছে সাড়ে চারশো টাকা। পাগলা না ওমর আবদুল্লা? একটা অটো দেখা যাচ্ছে না? হ্যাঁ তাই তো! চন্দনকে বারবার বলছি পৌনে নটা, বাড়ি যা ভাই! কিন্তু দায়িত্বশীল ছোট ভাইটির মতো আমাকে অটোতে না চড়িয়ে সে যাবে না।

আর অটো? সে এক অটো মহায়। অটো ওলাকে দেখতে ঠিক টিনু আনন্দ আর নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকির ক্রস। সে কিছু বলার আগেই আমি বললাম, ‘একশো কুড়ি লাগে একশো পঞ্চাশ দেব’। আর আমি কিছু বলার আগেই সে ভ্যারভ্যারিয়ে বলল, ‘আপনি যা বলছেন তা সর্বৈব্য সত্যি মি লর্ড, কিন্তু আজকের দিনে বৃষস্কন্ধ জ্যাম লেগেছে জায়গায় জায়গায়। ভারতের জনসংখ্যার নব্বই শতাংশ ইন্ডিয়া গেটে উঠে এসেছে। অতএব স্যার কুড়িটা টাকা বেশী দেবেন’।
তর্ক চলে না মাই ডিয়ার ওয়াটসন। হ্যাঁ বলে বসতে গিয়ে দেখি ব্যাকরেস্টটা নামানো, চলন্ত গাড়িতেই সেটাকে ঠিক করে সবে ঝিমোতে যাব কি যাব না। নওয়াজ শুরু করল তার অটোযাত্রা। যাত্রা মানে? পুরো শান্তিগোপাল! বাসরে। ভোঁ করে গাড়ি চলতে শুরু করল। জ্যাম ছিল তো গুড়ুম করে ফুটপাথে উঠিয়ে ভ্যাঁভুঁ হর্ণ দিতে দিতে ছুটল। ফাঁক পেলেই বিড়ি খাচ্ছে। আর আমার তখন কল্পতরু অবস্থা। শান্ত হয়ে বসে আছি, ঠিক যেন শেষ বিচারের আশায় ইন্দিরা ঠাকুরুণটি।‘ও বৌ দুটো মুড়ি দিবি!’ অটো তখন একটা হোন্ডা অ্যাকর্ড আর একটা মাহিন্দ্রা বোলেরোর মাঝখানের দেড় মানুষ সমান গ্যাপটা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ছুটছে। আর আমি যেন হালকা হয়ে স্লো মোশনে চলছি। মানে আমার তো চলার কোন অবস্থাই নেই যা চালাচ্ছেন, তিনিই চালাচ্ছেন।

আর কি ঠাণ্ডা রে ভাই। কী ভাগ্যিস আমি একখান টুপি গাড়িতে রেখে দিয়েছিলাম আর আসার সময় সেটা নিয়ে এসেছি। তা সেটা দিয়ে কান তো ঢাকা গেল, কিন্তু নাক? অন্ধকারের মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি আমার মুলোর মতো নাক গাজরের মত লাল হয়ে জমে যাচ্ছে, এরপর হয়তো ব্ল্যাক কারান্ট আইসক্রিমের মতোই ভেঙে পড়ত। কিন্তু ঘড়ি ঘুরতে না ঘুরতেই গাজিয়াবাদ বর্ডারে এসে গেলাম পৌনে দশটায়।
তারপর আর কি, এক কিমি রাস্তা গা গরম রাখার জন্য দৌড়েই পৌঁছে গেলাম। তারপরের গল্পটা পরের প্যারাগ্রাফে।

এ গল্পটা আজকের, আজ তাড়াতাড়ি অফিসে এসে গাড়িটিকে গতিশীল করতে হবে, তাই হড়বড়িয়ে হেঁটে মেন রোডে এসে উবারে অ্যাপ লাগালাম। বলে ৯৯ টাকা! এবাবা এ তো পুরো শান্ত শিষ্ট যিশুখ্রিস্ট। হলই নাহয় উবারপুল। তাও ৯৯ টাকায় তো হাতে পাশবালিশ। ফট করে রাজি হয়ে ক্লিক করে দিলাম। এবার শুরু হল আসল খেল, আমি গাজিয়াবাদের বাইরে এসে গেছি। কিন্তু উবার থেকে সমানে গাড়ি দিয়ে যাচ্ছে গাজিয়াবাদের, যারা অতি অবশ্যই দিল্লি আসার জন্য একশো টাকা দেবে এবং আবদার করছে যে সেটা আমাকেই দিতে হবে। ল্যাহ! পরপর পাঁচটাকে বাতিল করে, আবার অটোতে চড়ে অফিসে এলাম হাতের পাতা জমিয়ে। এসেই একটা বিলে সাইন করার জন্য নিয়ে এলো। সাইন করতে গিয়ে ‘এস’ লেখার জায়গায় এস সার্ভিস করে বসলাম। পেন আর পাক খেলো না সোজা পগারপার। হাত পেনটাকেই অনুভব করতে পারছে না।

সে যা হোক, সেই সঞ্জীব ঝা (ওহো বলা হয় নি বুঝি! সেই নিশান/ ডাটসন অ্যাসিস্ট্যান্টের নাম) আমাকে আশ্বস্ত করে ব্যাটারি চার্জ করে দিলেন আর কল ক্লোজ করলেন। আর আমাকে পরে যেতে যেতে বলে দিলেন যে কাল ছেলেপুলেগুলো বলছিল একটু বেড়াতে যেতে, কাজের জন্য যেতে পারি নি। আজ সন্ধ্যা থেকেই থাকব ইন্ডিয়া গেটে, ছেলেপুলেগুলোকে নিয়ে। আপনার গাড়ি স্টার্ট না হলে কল মেরে দেবেন প্লিজ’। আহা ভাগ্যিস কালকে ‘অপোগণ্ড’ বলে গাল পেড়ে অভিযোগ করি নি। লোকটার দিলটা একদম সার্ফ এক্সেল দিয়ে সাফ করা।
এই আর কি! এসব নিয়েই ফিসফাসের গাড়ি চলছে, আর আপনাদের নতুন বছরটাও চলতে থাকুক। ভালোয় মন্দয় মেশানোই হোক, শুধু যেন মন্দর সঙ্গে দ্বন্দ করার আর ভালোকে ভাগ করে নেবার শক্তি থাকে। আবার দেখা হবে। হয়ত কালকেই, একটা জাঠ বিবাহের গল্প নিয়ে। ততক্ষণ পর্যন্ত ঢ্যানটান্যান, ঢিঁচকাও!

(১৬৮)

২০১৪র পরে আর ফিসফাস বই হিসাবে বেরোয় নি। এবারে করলে বইটার কভারের রঙ কালো বা ধূসর রাখব ভাবছি। না মানে শুরুতেই এমন কথা কেন? কে জানে কেন? বুঝতে পারি না! খালি আকাশে বাতাসে ঘাসে ঘাসে দেখি রঙগুলো বদলাচ্ছে। সমানে সমানে বদলাচ্ছে। পথে ঘাটে দূষণেরা ফুসফুস ছেড়ে হৃদয়ে দানা বাঁধছে। আর একটা অদ্ভুত ধরণের ইমোশন (সরি আবেগটা বড়ই কাঁচা লাগছিল ইমোশনের কাছে!) গলার কাছে দানা বাঁধছে।

মনের ভাবটা স্পষ্টভাবে বলে উঠতে পারছি না। মানে এটা ঠিক ভয় লাগা নয়। ভয়টা বরং চলে যাচ্ছে। এটা বিচ্ছিরি লাগাও না। বিচ্ছিরি লাগা এর কাছে কিছুই না। অথবা রাগ ঘৃণা বিদ্বেষ এই শব্দগুলোও ঠিক বসাতে পারছি না। কারণ এই যে ইয়ে লাগা সেটা তো এগুলোকে নিয়েই। রাগ ঘৃণা বিদ্বেষ।

কোথাও কোথাও একেই যেন পুরুষত্ব বা বীরত্বের প্রতীক বলে বোঝানো হয়। বুক দাপিয়ে চিৎকার করে বিজয়ীর উল্লাস। যেন রোনাল্ডো গোল করেছে!

এক এক করে বলে দেখি। আপনারা কী বলেন!

ভাদ্র মাস একটা বিশেষ মাস যা নিয়ে চারপায়ের প্রাণীদের খিল্লির শেষ নেই। তেমনই শ্রাবণ মাস হল ভক্তির মাস। শারদোৎসবে যেগুলো হয় সেগুলোকে ভক্তি দিয়ে মাপা যায় না। হৃদয় দিয়ে মাপতে হয়। কিন্তু শ্রাবণে শৈব উপাসকরা ভক্তিরসে ভগবানকে সিঞ্চিত করেন। আমাদের ছিল তারকেশ্বর আর এখানে হরিদ্বার।

না সেসব নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই। কিন্তু মেঘটা জমতে শুরু করেছে গত কয়েক বছর ধরে। যখন থেকে এই কাহার কাঁধে কাঁওয়াড়িদের জন্য সুযোগসন্ধানীরা এই একান্ত ব্যক্তিগত যাত্রাকে সাংগঠনিক করে দিয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বড় বড় কাটআউটে ঝোপে ঝাড়ে গজানো রাজনৈতিক সুবিদাবাদীদের অভিবাদন জানানো ব্যানার। দেবেন্দ্র দেড়া থেকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কেউ বাকী নেই। কাঁওয়াড়িদের জল পান করানো জন্য গগন বিদারী মিউজিক সিস্টেমে হানি শিঙের চরণে সেবা লাগির রিমিক্স সমেত বড় বড় শামিয়ানা। আর কার্যবিহীন স্বেচ্ছাসেবকদের দল। যারা মনের সুখে মাদক সেবন করে (শিবের চ্যালা! কিচ্ছু বলার নেই!) উত্তুঙ্গ উচ্ছ্বাসে হর হর মহাদেব ধ্বনিতে আকাশ বাতাস ছেয়ে দিয়েছে। আর ইদানীং আবার নতুন ট্রেণ্ড। জাতীয় পতাকা হাত মোছার কাপড়ের মতো যত্র তত্র লাগানো। যেন দেশাত্মবোধ দেখালেই সাত খুন মাফ।

তে এরকমই এক সকালে দেখি একটা নেশায় চুরচুর বিরোধী সমাজের লাগামহীন ষাঁড় হাতে লাঠি নিয়ে গাড়ি শাসনে লেগে পড়েছে। আমার এই গাড়িটা বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই ভাই যাবার পর থেকেই ইমোশন ফিমোশন একটু কম। অন্ততঃ বিয়োগ ব্যথা গুণিতক হয়ে পার্শ্বচর হয় না। কিন্তু লাঠির বাড়ি মারলে তো কথা নেই কোন।

তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি, পাড়ার মধ্যেই সাইকেল নিয়ে যাবার সময় ‘লুচি’ গুণ্ডার চটির পিছনের ভাগ মাড়িয়ে দিই। বাছাবাছা বিশেষণ চড়চাপড় সব হজম করে নিয়েছিলাম ‘বাপের সম্মান’ রক্ষার্থে। (এই বাপের সম্মান কেসটা বহুত গোলমেলে কেস। আপনার ঘেঁটি ধরে একটা তালপাতার সেপাই ক্রমাগত নেড়ে দিয়ে সুভাষিতাবলী ঝেড়ে যাচ্ছে আর আপনি কিসসু করতে পারবেন না!) কিন্তু যেই ব্যাটা ‘শালা আজ সাইকেলই ভেঙে ফেলব’ সাইকেলে হাত দিয়েছে। কোনা মেরে বাঁহাতের দুটো আপার কাট চোখের কোল ফাটিয়ে দিয়েছিল। সেই জোশ আজ আর নেই, তোরঙ্গে বাঁধা। কিন্তু গাড়িতে হাত দিলেই কী থেকে কী হয়ে যেতে পারত সে আর বলতে পারব না। কপাল ভাল (কার কে জানে?) আমি অনেক চেষ্টা করেও গাড়ি আস্তে চালিয়ে, ছেলেটার গা ঘেঁসে চালিয়েও তার লাঠির প্রসাদ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলাম। না হলে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়ার একটা অভিজ্ঞতা থেকে যেত। হয়তো গণ ধোলাইয়েরও।

তা সে সব থাক। দিন পনেরো সবাইকে ভক্তিতে ভাসিয়ে শ্রাবণ মাস বিদায় নিল ভাদ্রের শেষ এসে হাজির। সেদিন গাড়ি না থাকায় উবারের সাহায্য নিয়েছি, দশ মিনিটের রাস্তা যেতে দশ ঘন্টা লাগছে, ড্রাইভার বলল, ‘ম্যায় পচ্চিশ সাল সে দিল্লি মে হুঁ। বাই গড কভভি ইত্নে সারে গণেশজীকে ভক্ত নেহি দেখা।’

আর ট্রেণ্ডটাও এক। মাথায় একটা রঙ না জানা ফেট্টি, পেটে মাল, মুখে আবির, চোখে রঙ আর ঠোঁটে রাজ্যের নৈরাজ্যের প্রদর্শনী। আর অবশ্যই বক্স বাজছে। যার যত বেশী বক্স তার তত বেশী দর। গানের কথা কিসসু বুঝতে পারবেন না, খালি গুম গুম আওয়াজে গাড়ির উইণ্ডস্ক্রিন থেকে আত্মারাম সবাই খাঁচা ছেড়ে পালাবার কথা ভাবছে। যত্র তত্র মূত্র ত্যাগ আর জাতীয় পতাকা নাড়িয়ে বিজয়োল্লাস। ঠিক যে ভাবে আপনার কাজের মাসি ঝুল ঝাড়ু দিয়ে ঘরের কোণের কালো কালো ঝুল সরিয়ে সাফ করেন। ঠিক সেভাবেই এরা দেশভক্তিকে প্রশ্নকারী সুস্থশরীরগুলোকে সাফ করে দিয়ে ব্যস্ত করে ফেলবে।

আর সবাই সেই হ্যামলিনের ইঁদুর। নেতাজি কাল লাল কিলা থেকে আপনাকে ডোকলাম দেখাচ্ছে তো আপনিও অবিশ্বাসীদের বৃন্দাবন দেখাতে রেডি। আর দরকার পড়লে অন্ধকারও। সত্যিই যেন অন্ধকার যুগে এসে পড়লাম। যেখানে বিরোধাভাস মাত্রেই কার্গিলের ঠাণ্ডার চিন্তা জাগিয়ে দেওয়া গরম গরম বুলি আর সে সব ডিঙিয়ে গেলে চাপাতির কোপ বা বন্দুকের নল। আমাদের অবস্থা হচ্ছে সেইসব পতিব্রতা স্ত্রীয়ের মতো, যারা মার খেয়ে মরে গেলেও সিকিউরিটি হারাবার ভয়ে আপাত মানব পরিচয়বহির্ভুত সেই সব রাক্ষসদের বিরুদ্ধে একটাও কথা বলে না। ঠাণ্ডা ঘর ল্যাপটপ স্মার্টফোন আর নিয়ন্ত্রিত জীবন চৌহদ্দি পেরিয়ে একসঙ্গে বিরোধ করা কি চাড্ডিখানি কথা। (দেখবেন এরপর কমি ছাগু তিনো নিয়েও গাল শুনব।)

আসল কথা হল ফাঁপা ঢোল বাজে বেশী। আর আমাদের দেশটা হয়ে উঠছে সে রকমই। আমরা মায়ানমার যাব বলে পরিকল্পিত ভাবে ঘরহীন মানুষগুলোকে দেশছাড়া করে দিতে ছাড়ি না। গাজা ভুলে গিয়ে নেতানেইয়াহুর সঙ্গে ছবি তুলে ফেলি আর আপামর অশ্বেতকায়ের সর্বনাশ মাথায় তুলে ট্রাম্প কার্ড খেলে বসে থাকি কেকেকেকিরণ! (ক্লু ক্লুক্স ক্লান আর কি!)
এত কিছুর মধ্যেও কিন্তু স্বপ্ন দেখতে শখ জাগে জানেন? স্বপ্ন দেখি ধর্ম বলতে মানুষ চিনবে মানুষ শুধু। সালমা খাতুন বা জাভেদ হাবিব তাদের ধর্মের কলাম নিয়ে আমাদের কাছে পরিচিত হবেন না। শুধু মানুষ হিসেবেই যেন পরিচিত হয়ে যাই। সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুকে একটা ডায়লগ ছিল অর্গানাইজড রিলিজিয়ন মানুষ মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে। আর কত বিভেদ বা ফারাক হবে? উপরওলা তো ইতিমধ্যেই, কালো সাদা বাদামী, পুরুষ মহিলা, গুঁফো মাকুন্দ, হিস্প্যানিক এশীয়, লম্বু মোটু এসব ফারাকগুলো দিয়েই পাঠিয়েছেন। কিন্তু সে তো স্বাতন্ত্র্যের খাতিরে। দল পাকিয়ে পাঞ্জা লড়ার জন্য তো নয় সে সব।

মানুষ সবথেকে দুর্বল প্রাণী হয়েও মানবতা আর মানবিকতা দিয়েই তো আজ শ্রেষ্ঠ আসন নিয়েছে। তাহলে আর আলাদা করে আমরাই সেই চামড়া গুটিয়ে নিয়ে অপরের চামড়া গুটিয়ে দিতে তৎপর হয়ে পড়ছি কেন? মানুষ মরে। যে একবার জন্ম নিয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু আমরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাকে অবশ্যম্ভাবী থেকে অমোঘাবস্থায় নিয়ে যাচ্ছি কেন? আসুন না। বিশ্বাসী অবিশ্বাসী নাস্তিক আস্তিক ধনী গরিব সাদা কালো সবাই মিলে পৃথিবীটাকে আরেকবার সবুজ করে তুলি। শুধু গাছ পুঁতেই তো নয়। মানুষের মনটাকে হৃদয়টাকে সবুজ করে তুলতে হবে। কষ্টকর পথ, ধান্দাবাজীর জায়গা নেই, শর্টকাট নেই, মস্তিস্কহীনতা, বিবেকহীনতা, হৃদয়হীনতার জায়গা নেই। যে যতটুকু পেয়েছি তাই নিয়েই সবার কথা ভেবেই কাজ করতে শুরু করি। বাংলায় যাকে বলে হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ। তাহলে হয়তো আপনার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীটাও বাঁচতে পারে। নয়তো কে জানে, সময় কোথায় আমাদের জন্য চাপাতি নিয়ে অপেক্ষা করছে। কল্লা আমাদেরও নামতে পারে ভাই! তাই না?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এই লেখাটা নিয়ে আমরা ওরা করবেন না প্লিজ। সব ধর্মেই কম বেশী নাশকতা রয়েছে। নাহলে বৌদ্ধ ধর্ম বলতে যে অহিংসা বুঝি তারা রোহিঙ্গাদের কেটে পিস পিস করে ফেলতে পারে? রোহিঙ্গাদের জন্য, আশ্রয়হীন মানুষগুলোর জন্য একটু ভাবুন। আপনার দরজা খুলে দিতে হবে না। কিন্তু সামগ্রিক দরজাটা যেন খুলে যায়। আলোচনারও।

প্র পু ১ – নাহ লেখাটা শুরু করার সময় মনটা যে রকম ধূসর ছিল এখন কেমন যেন নীল নীল হতে শুরু করেছে। আকাশের মতো বিস্তৃত নীল। এবারে ফিসফাসের রঙটা নীলই হোক কেমন?

(১৬৭)


আমি ভিক্ষা দিই না। কোন স্পষ্ট লজিক নেই। কিন্তু দিই না। হয়তো মানুষকে কর্মক্ষম দেখতে ভালো লাগে বা অভ্যাস খারাপ করতে দিতে চাই না ইত্যাদি কিছু হবে। অথবা এই যে রাজধানীর রেডলাইটে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে কিছু দেহাতি মহিলা ঘোরাঘুরি করে তারা মাদারি নাকি অন্য কিছু? কয়েকটা বাচ্চা সং সেজে ডিগবাজী কলাবাজী দেখায় আর চুলে লম্বা বিনুনি বেঁধে টাঁই টাঁই করে ঘোরাতে থাকে। বা কয়েকটা বাচ্চা একটা নোংরা কাপড় নিয়ে এসে গাড়ির এখানে ওখানে একটু মুছে দেয়। এরা কারা? কোথা থেকে আসে? শহরবাসী আমরা শুধু সন্দেহ নিয়েই তাকিয়ে থাকি। আর দেখি যে রাজধানীর ক্রমবর্ধমান ফ্লাইওভারগুলি ঠিক নিচে, কাঠের চুল্লি আর পোড়া হাঁড়ি দিয়ে নিশ্চিন্তে সংসার পেতেছে। দশ ফুট বাই দশ ফুটের গণ্ডিটাও তাদের জন্য নেই।

সন্ধ্যা হলেই সন্দেহ বেড়ে যায়। দেহব্যবসা অথবা রাহাজানি। সন্দেহের তীর এদিকেই ঘুরতে থাকে। মাথায় জট, চোখে পিচুটি আর নাকে পোঁটাওলা শৈশবের পরেই এসে হাজির হয় অপুষ্টির যৌবন বা অপক্ক বার্ধক্য। আকাশের দিকে তীর ছুঁড়ে দিয়ে, পৃথিবীর বুকে রুক্ষ পদক্ষেপ ফেলে জীবন কেটে যায়। আদমসুমারি আর আচ্ছে দিন, সরকারি সাহায্য আর গরিবী হটাওয়ের ইমেজে এরা বড় বড় ছোপ। পুলিশ আর সমাজবিরোধীদের সঙ্গে নিত্য হিসেবে নিত্য যাপন। এরাই হল সেই সব মুখ যাদেরকে লুকিয়ে রেখে আমরা আধুনিক ভারতের ছবি তুলে ধরছি বিশ্বপিতার কাছে।

সে যাই হোক, সেই সব লজ্জাই হোক আর নিজেকে মুক্ত পৃথিবীর প্রতিভূ হিসাবে দেখার অভ্যাস থেকেই হোক। আমি ভিক্ষা দিই না। শুধু যখন কোন বয়স্ক লোককে দেখে মনটা উদ্বেল হয়ে ওঠে যাদের সত্যিই হয়তো করার কিছু নেই, সেখানে হাতটা আপনিই পকেটের দিকে চলে যায়। আর নিজের অপারগম্যতায় মাথা নিচু হতে থাকে।

কদিন আগে রবিবার, আইটিও থেকে মানদই হাউসের দিকে গাড়ি ঘোরাবার আগেই দেখলাম এক আপাত অন্তঃসত্ত্বাকে। সেই দেহাতি রূপ আর তার সঙ্গে আরও জনা চারেক কম বেশী বয়সের মহিলা। এরা হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য সাহায্য চাইছে। কিন্তু আমরা শহুরেরা এখন অভিজ্ঞ হয়ে গেছি। সব জানি এর পিছনের গল্প। কিছুদূর নিয়ে গিয়ে যা নয় তাই হয়ে যেতে পারে। পেটের থেকে বেরিয়ে পড়তে পারে পিস্তল অথবা অন্য কোন প্রাণহানি অস্ত্র।

কিন্তু মজার ব্যাপারটা হল, গাড়িটা ঘুরতেই দেখি একদল পুলিশ দাঁড়িয়ে, লালবাতি টপকানোদের জন্য টোপ ফেলে বসে আছে। গল্পটা কেমন যেন ইয়ে লাগল! মানে মেয়েটি যদি সত্যিই অন্তঃসত্ত্বা হয়, তাহলে তো তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো উচিত। আর না হলে শ্রীঘরে।

তাড়া ছিল কিন্তু তাও গাড়িটা থামিয়ে মুখ বার করলাম। দিল্লিতে পুলুশ এসব ব্যাপারে খুব হেল্পফুল। জানে কি জানে না কিন্তু ঠিক দিক দেখিয়ে দিতে ছাড়ে না। বললাম ব্যাপারটা- ব্যাস যেন চোর ধরা পড়েছে এমন মুখ করে বিগলিত হাসি দিয়ে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা দেখতা হুঁ!” যেন আকাশ থেকে বিষ্ণু দেবতা বরাভয় মূর্তি নিয়ে বিশ্বরূপ দর্শন দিচ্ছেন। কিন্তু ঐ যে বললাম ট্যাম। ট্যামই নেহি থা না! তাই নাগরিক কর্তব্যকে নীলটুপিধারীর হাতে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে চললাম পিছনের দিকে না তাকিয়ে। জানি একবার বলায় কিছু হবে না, আর বারবার বলায় হয় তো সেদিনের জন্য ভাত মারা যাবে চৌর্যোপজীবিনীদের।

তবে সব গল্পগুলো ঘেঁটেঘুঁটে গেল কালকে। মানে আমি নিজে আত্মপ্রচারকে খুব একটা পছন্দ না করলেও, এই রোগটা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নই। কোথায় কখন যেন কোন সূক্ষ্ম গণ্ডিটা পেরিয়ে চলে যাই আর রাবণ রূপ ধারণ করে ফেলি, তার হিসাব রাখতে পারি না। তবুও বলছি জানেন।
কাল রাতে পার্শ্ববর্তিনী আর মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। ফর আ চেঞ্জ মেয়েটা আমার পাশের সিটে বসে। সামনেই লালবাতি আর লালবাতি পেরোলেই গাজীয়াবাদে ঢুকব। সামনে একটা এসইউভি। আর আমরা এদিক ওদিক হাবিজাবি বকে যাচ্ছি। যদি করবী ফুলগুলো টুপ করে গাছ থেকে পড়ত গাড়ির জানলার কাঁচ বেয়ে তাহলে রাতের বেলা ফুল পাড়ার কষ্ট থাকত না আর লাল গোলাপি ফুলগুলোও মেয়ের কানে ঠাঁই পেতো! এই সব।

তাকিয়ে দেখলাম লাল বাতির কাছেই দুটি বাচ্চা মেয়ে বেলুন বেচছে। হঠাৎ লাল আলো সবুজ হল আর দেখলাম আমার সামনে দাঁড়ানো গাড়িটা যেটা এগিয়ে গিয়ে গাজীয়াবাদে ঢুকবে তার ড্রাইভারটা হাত বাড়িয়ে যেটি দুটির মধ্যে ছোট সেই মেয়েটির হাত থেকে একটা বেলুন ছিনিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল গন্তব্যের দিকে।

পাঠক/ পাঠিকারা, আমরা তো মানুষ। সবার আগে মানুষ। চকচকে গাড়ি আর ঝকঝকে পোশাকের মোড়ক পেরিয়ে আমরা মানুষ। সামান্য সুকুমারবৃত্তিগুলো কি ষড়রিপুর অধীনে ফেলে রেখে দাঁত নখ বার করে ফেলতে পারি? মনুষ্যত্বের লেশ নিয়ে দুপায়ে হেঁটে যাবার সময় ‘আরে এ তো সামান্য ব্যাপার!’ এই কথাটা না বলে একটু মন নিয়ে ভাবতে পারব না? দাঁত নখ? তোমার মন নাই মানুষ?

হতবাক অবস্থার মধ্যেও এগিয়ে গেলাম গাড়িটা নিয়ে। হাপুস নয়নে কাঁদছে মেয়েটা। কাশছেও। তার দিদি তাকে বুকে জড়িয়ে বোঝাবার চেষ্টা করছে আর মাই বোধহয়, কোথা থেকে ছুটে এসেছে। মেয়ের কান্না থামেও না। পাঠক/ পাঠিকারা, আমরা সামান্য মানুষ! সারা পৃথিবীর সকলের দায়ভার নিই নি। কিন্তু ওই মুহুর্তে যেটা করতে পারলাম সেটা হল, বেলুনের দাম জিজ্ঞাসা করে দুটো দশটাকার নোট ধরালাম। একটা বেলুন নিজের মেয়ের হাতে দিলাম আর আরেকটা সেই অমানুষটার হয়ে ক্ষমা চেয়ে। মেয়েটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ওই দিদিটা বেলুন দিল? দিল হয় তো! হয়তো সমগ্র মানব জাতির পক্ষ থেকে একটা অক্ষম চেষ্টা মনুষ্যত্ব বাঁচিয়ে রাখার।

মাঝে মাঝে মনে হয় ফিসফাসটা ফিসফাস না হয়ে নিজের ঢাক নাম দিলেই হতো। এ তো শুধুমাত্র নিজের কথা বলা। এই করেছি সেই করেছি। বা হয় তো নিজেকে আয়নায় দেখা অথবা আপনাদের নিক্তিতে নিজেকে মেপে নেওয়া। সে যা হোক। মুখ্য হল মানুষ হওয়া। সবরকমভাবে তো হয়ে ওঠা হয় না। এই যেমন মোড় ঘুরে গাজীয়াবাদে ঢুকে যখন দেখলাম দুটো ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে আর তার কিছু দূরে সেই অলপ্পেয়ে এসইউভি। বিশ্বাস করুন হিরো হবার ইচ্ছে থাকলেও নেমে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারি নি তাদের। ঝামেলায় জড়াতে চাই নি বলেই। কিন্তু পার্শ্ববর্তিনী বা আমি কেউই হয়তো বাচ্চাটার কান্নাটা ভুলতে পারি নি। বেলুনটা বাড়িতে খেলতে খেলতে ফেটে গেল আধ ঘন্টার মধ্যেই। কিন্তু তাও বোধহয় অমানুষদের বুদবুদ ফাটল না। ক্ষণিকের মস্তিষ্কহীন ছ্যাবলামোই হয়ে রয়ে গেল মনুষ্যত্বের আলো আঁধারি ঘিরে।

আর আমাকেও ভাবতে বাধ্য করল সময়, ওই কিচ্ছু না পাওয়া লোকগুলোর কথা। যারা পুলিশের লাঠি আর সমাজবিরোধীদের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকে পরের দিনের সূর্যটাকে দেখার আশায়। সেটাও ঠিক করে দেখতে পায় কি না কে জানে?

(১৬৩)

 

উফফ কত্তদিন বাদে দেখা বলুন তো? কেমন আছেন পাঠক/ পাঠিকারা? এর মধ্যে গঙ্গা দিয়ে প্রচুর জল আর যমুনা দিয়ে প্রচুর অ্যাসিড বয়ে চলে গেল! চাঁদের রঙ নীল থেকে বদলাতে বদলাতে হলদেটে হয়ে গেল! আর দু চারটে পাকা চুল মাথায় গালে বংশ বৃদ্ধি করে ফেলল!

আমার খবর? তা খবর বলতে দুটো-
এক) সৃষ্টিসুখ প্রকাশন থেকে একটা গল্পের বই প্রকাশ পেল আমার। ‘ইয়র্কার এবং অন্যান্য গল্প’। দিল্লিতে পুজোয় আর কোলকাতায় বন্ধুদের সঙ্গে তার হইহই করে উন্মোচন হয়েও গেল মোড়ক।
দুই) অবসরে প্রকাশিত ফিসফাস কিচেন এখন কলেবর বাড়িয়ে বই আকারে আসতে চলেছে বইমেলায়!
সবই আপনাদের ভালোবাসা আর কি!

তা যাই হোক, আজ বেশী ফেনাব না! ছোট ছোট গল্পে এতকালের অদেখা যাপন কাটিয়ে নেব আপনাদের সঙ্গে। নম্বর টম্বরের দরকার নেই! কি বলেন?

গাড়িটাকে নিয়ে মাঝে খুব ভুগলাম জানেন! যদিও নব্বই হাজার কিলোমিটার সঙ্গ দিল! এখনও হাজার তিরিশ চল্লিশ আরামসে দিয়ে দেবে! কিন্তু নিজের গুরুত্ব বোঝাবার জন্য মাঝে মাঝেই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে! সেখানেই সমস্যা!

একদিন আইটিও ফ্লাইওভারের পরেই ক্লাচের তার কেটে বসল! আর যাই কোথা! ঠেলতে শুরু করলাম এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে। অভ্যাস নেই। কোন রকমে ঠেলতে ঠেলতে কিছুদূর যাবার পর দিলাম এক গাড়ির সাইডে ঠুকে। সে আমার সেই অবস্থাতেও বেরিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ করে বসল। লাও! ঠাণ্ডা গলায় বললাম, ‘দেখো জি! থককে চুর হো গয়া! ঝগড়া করনে কা একদম মুড নেহি হ্যায়! যাদা বোলোগে তো ও যো পাত্থর পড়া হুয়া হ্যায় আপকে সরপে বইঠা দুঙ্গা! সেও হেবিজোর ঘাবড়ে গিয়ে চেল্লামেল্লি লাগাল! আমি পাত্তা না দিয়ে চলতে শুরু করলাম।

দেড় কিমিটাক চলার পর এক অটো এগিয়ে এল সাহায্যের পা নিয়ে! ড্রাইভারটি একশোটি টাকার বিনিময়ে পা দিয়ে ঠেলে দেবে অটো চালাতে চালাতে! এইভাবে যদি কিছুদূর যাওয়া যায়! গেলামও! তিন কিমি দূরের এক মেকানিক শপের সামনে যখন পৌঁছলাম তখন বাজে সাড়ে ছটা। সেদিন আবার রিহার্সাল। পার্শ্ববর্তিনীকে বললাম ওলা বুলা লো! তার মধ্যে আবার টিপটিপ বারিশ! আর মেকানিক দেখে বলল, ওয়েল্ডিং খুলে গেছে, এখন লাগানো সম্ভব হবে না! লাও ঠ্যালা! অটোটাকেও ছেড়ে দিয়েছি!

কোন অটোই আর অ্যাটলাসের বোঝা বইতে রাজী হচ্ছে না! ক্রসরোড বলে এক দীনবন্ধু কোম্পানির মেম্বারশিপ নেওয়া আছে। যদি বিপদে আপদে সাহায্য করে! তা সে বলল রাত দশটার আগে গাড়ি টেনে নিয়ে যেতে আসবে না! সামনে এদিকে রেললাইনের নীচ দিয়ে যাবার জন্য আণ্ডারপাস। তারও আগে রাস্তা অর্ধেক তৈরী হয়েছে বলে বাঁ দিকে জল জমে আছে! যা থাকে কপালে! ঠেলা লাগালাম। গত আড়াই ঘন্টায় গাড়ি ঠেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ঠিক কায়দা করে জলের উপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে আমি নিজে শুকনোর উপর দিয়ে হেঁটে এলাম। বৃষ্টি তখন থেমেই গেছে। কিন্তু ভিজেই গেছি, ঘামে! তারপর ঢালে দাঁড়িয়ে গাড়ি ঠ্যালা দিয়ে ঠনঠনে হাঁটু নিয়েই লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিতেই গিয়ারে ফেলা গেল! যাক বাবা, বলে আণ্ডারপাস প্রায় পেরিয়ে এনেছি ও বাবা সামনে গাড়ির জ্যাম দেকে উল্টো ঢালেই গেল গাড়ি বন্ধ হয়ে। মাঝ রাস্তায় ব্রেক মেরে চুপচাপ বসে আছি। পিছনে ভঁকভঁক হর্ণ পড়ছে গাড়ির লাইন! কিন্তু বেরব কি করে? ব্রেক থেকে পা সরালেই গাড়ি হড়কাবে পিছনের দিকে। হ্যাণ্ডব্রেকে কাজ হবে না! যাই হোক কয়েকজন অটোওলা ছিল কাছাকাছিই তাড়া ছুটে এসে ধরল পিছনের দিকে তারপর ধাক্কা দিয়ে দিল। আর গাড়িও গিয়ারে মেরে চালু করে দিলাম।

বেশী না, আধ কিমি! তারপরেই রেডলাইট। যাই হোক এগোতে শুরু করলাম। গলির দিকে! সামনে একটা গাড়ি রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়িতে নটা বেজে গেছে। অনুরোধ করতে গেলাম গাড়ি সরাবার। জ্ঞান দিয়ে বসল, অ্যা্যসে থোড়ি হোতা হ্যায়! আপ টো করওয়ানে গাড়ি বুলালো ইত্যাদি! যাই হোক। কোন রকমে ম্যানেজ করে গলির মধ্যে ঢুকতে হেল্প জুটে গেল। পৌনে দশটায় গলির মুখে আরেকটা ঢালে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করলাম এক ঠ্যালা মারুন! দিয়েও দিল! ব্যাস আর দেড়শো মিটার ভোঁ ভাঁ হর্ণ দিয়ে পৌঁছে গেলাম বাড়ির কাছে। তারপর রিহার্সাল (মিউজিক রিহার্সাল ছিল) দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পরের দিন গাড়ি সারিয়ে।

তা বেশ ছিল। সার্ভিসিং করাব করাব ভাবছি তার আগে শনিবার গ্রেটার নয়ডার স্কুল থেকে ছেলেকে আনতে যাচ্ছি। বেশি না, বাড়ি থেকে ৪৫ কিমি। নয়ডার মহামায়া ফ্লাইওভারের পর আরও পঁচিশ। তা মহামায়া ফ্লাইওভার পেরিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে পড়তেই ফটাং করে আওয়াজ! ক্লাচ গায়েব! লাও ঠ্যালা! ভাগ্যিস গাড়ি ফোর্থ গিয়ারে। আমি ক্লাচ ছাড়াই গাড়ি ষাট-আশি গতিতে চালাচ্ছি, বন্ধুকে ফোন করলাম, গ্রেটার নয়ডায় থাকে গাড়ির ঘাঁট ঘোঁট জানে। বলল পঁচিশ কিমির শেষে এক মার্কেটে মেকানিক আছে! গাড়ি টো করতেও পারবে! আমি বললাম আমি মাথা ঠাণ্ডা করে চালাচ্ছি, কোথাও থামব না! বড় কিছু ঝামেলা না হলে পৌঁছিয়েও যাব সেই অব্ধি! কিন্তু তারপরেই দরকার। তো ফোন করে দিলাম। আর আধ ঘন্টা ক্লাচ ছাড়াই কায়দা করে চালিয়ে পৌঁছেও গেলাম। সে অপেক্ষাতেই ছিল। কাদির নাম তার! যত্ন করে ঠিক ঠাক করে দিল। আর পরদিন বাড়ি ফিরেই দিয়ে দিলাম সার্ভিসিং করাতে।

তারপর আর কি! দিন দুয়েকের মধ্যেই “মেরে পেয়ারে দেশবাসীও কাল কুছ যাদাই হো গয়া থাআআ!” ব্যাস গেলো কাণ্ড। পরের দিন গাড়ির ফাইনাল সার্ভিসিং করিয়ে পেমেন্ট করব বলে ব্যাঙ্ক থেকে পাঁচ হাজার ছশো টাকা তুলতে গেছিলাম সেই সন্ধ্যাতেই! তা এটিএম ব্যাটা বলে পঞ্চাশ আর একশো নেই! এগারোটা পাঁচশোর নোট। তার মধ্যে বাজারটাজার করতে একটা চলেই গেছে। ব্যাস হাতে পৌনে চারশো টাকা আর দশটা পাঁচশোর নোট। আমি পথে! তা যা হোক, অনেক ঘাতপ্রতিঘাতের পর নিজেকে শিখিয়েছি যাই হোক বিচলিত হব না! তা পথ পেয়েও যাচ্ছি। দুটো বড় নোট একটু বেশী সব্জি কিনে ভাঙিয়ে ফেললাম। আর তারপর ব্যাঙ্কে দাঁড়িয়ে বার দুয়েক টাকাও তুলে ফেলেছি অচল আটটি পাঁচশো ফেরত দিয়ে। সময় যাচ্ছে বটে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে মজাও হচ্ছে। দুঃখও হচ্ছে। মানব জীবন দেখতে পাচ্ছি যেমন তেমন।

বয়স্ক এবং বিকলাঙ্গদের জায়গা করে দেবার ব্যাপারে দিল্লি অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে মহিলাদের প্রতি ব্যবহারে আবার লাইনেই আসে না। এক ভদ্রমহিলা, সন্তান কোলে আমার দু তিন জনের পিছনে ছিলেন বলে প্রথম দিকে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে অনুরোধ করতে গেলাম। সে বলে খাড়ে রহনে দো! লাও! মনে হচ্ছিল ব্যাটাকে এটিএম-এর মেশিনে ঢুকে পিস পিস করে দিই। কিন্তু মানবজাতি এখন অনেক সভ্য হয়ে গেছে। ভদ্র হয়ে গেছে। এখন আমরা কাউকে বিপন্ন দেখলে ছুটে গিয়ে সাহায্য করি না, রাস্তায় আহত কাউকে দেখলে পাস কাটিয়ে চলে যাই, আর তেড়ে সরকারকে গালাগাল দিই কাজ করার বা না করার জন্য! তাই স্বগতোক্তি করেই রাগ ছাঁটাই করতে হয়। সেইভাবেই আছি। খরচ কমিয়ে হিসাব কষে বেশ ভালোই আছি! বেচাল দেখলে লাফিয়ে পড়ে প্রতিবাদ করে প্রতিকার করার চেষ্টা করি। শুধু জিগির তুলেই ঢেঁকুরের মিঠা স্বাদ গ্রহণ করি না। অসুবিধাকে অসুবিধা বলে না দেখে চ্যালেঞ্জ ধরে নিয়ে হার্ডলস পেরিয়ে যাবার আনন্দ অনুভব করি! ব্যাস এই তো জীবন কালী দা!

তা তার মধ্যেই এক দুটো জোকস আর একটা সত্যি ঘটনা শুনতে পাই। যে বাড়িতে বিয়ে (এটা বলতে আমরা এখনও যে কেন মেয়ের বাড়ি বুঝি কে জানে!) সে বাড়ির একজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশিকা মেনে ব্যাঙ্কে গিয়ে আড়াই লাখ টাকা দাবি করেছেন। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার যতই বলছেন যে আপনার অ্যাকাউন্টে অত টাকাই নেই! কে শোনে কার কথা!

আর এটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক- আমার পরিচিত এক ঘটি বাঙালকে বিয়ে করেছিলেন। মানে এখনও বিবাহিত আছেন কিন্তু করেছিলেন গত শতাব্দীতে। তা বাঙাল ভদ্রলোক আবার প্রবাসী, মানে চেন্নাইতে বড় হয়েছেন। সব বাংলা গান রবীন্দ্রসঙ্গীত পল্লিগীতি ব্যান্ডের গানটান শোনেন নি। তা মহিলা দরদ দিয়ে গাইছিলেন, ‘রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে, দিনের শেষে…’ আর ভদ্রলোক ইনভ্যারিয়েবলি শুনেছেন বাঙাল! আর যায় কোথা! নতুন বিয়ে ভেঙে যাবার উপক্রম হয়েছিল। বাঙালকে জাত তুলকে খোঁটা? তা সে বিয়ে টিকে গেছে সে যাত্রা, কিন্তু সঙ্গে দিয়ে গেছে এই টাইমলেস গল্পগুলোকে!

আমাদের প্রত্যেকের জীবনই তো এক ঝুড়ি গল্পের কথামালা! এতো আনন্দ রাখি কোথায় বলুন তো? কেন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে! সরকার তো আনন্দেরও হিসাব রাখতে শুরু করেছে। আমেন!

(১৫৮)

“You see, the whole country of the system is juxtaposition by the hemoglobin in the atmosphere because you are a sophisticated rhetorician intoxicated by the exuberance of your own verbosity…”

বুইলেন কিছু? আমিও না! আর বুঝে কি হবে। আজ সকালে তো আমি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মতো মুক্ত কচ্ছ হয়ে গেছিলাম কি না! মরেচে! ফিসফাস আবার দিল্লি বেলি ২ হয়ে যাবে নাকি?

খুলেই বলি তাইলে বলুন? না মানে খোলসা করেই বলি! আরে ধুর! মানে ওই ইয়ে আর কি! বিস্তারিত বিবরণ দিই।

হয়েছে কি! চলছে তো দিল্লি বইমেলা! আর বইমেলা মানেই তো মেলা বই আর হইচই আর সৃষ্টিসুখ। তা দিল্লি বইমেলায় কাজ ডবল! আমি টেবিলের ওপারেও আবার এপারেও! তাই গালাগাল খাবার জন্য গাল এগিয়ে দিই আর গালাগাল দেবার সময় মুখে কুলুপ! এমনই হচ্ছে যে যে সে এসে আমায় কয়ে যাচ্ছে “এই একটু হাস না?” আমি আর বলছি না যে পাতি তো কাকও হয়। আর এ তো খাঁচায় পোড়া সিংহ।

সে যাক আনসান বকে কি হবে! আজকের ঘটনায় সোজাসুজি আসছি!

আজ বিকালে বৃত্তের বাইরের বাঙালি (এটা অনিতা অগ্নিহোত্রীর কয়েনেজ আমার এই বৃহৎ বঙ্গ আর বহির্বঙ্গের বাজারে হেব্বি লেগেছে) কবিদের কবিতা ও কাব্যচর্চা নিয়ে আড্ডা। সবাই এক এক করে ঢুকছেন দিল্লিতে! সবার আগে এসেছেন সুকুমার চৌধুরী। কোলকাতার বাইরের কবিদের মধ্যে অন্যতম প্রধান এবং ভীষণ শক্তিশালী কবি! ভীষণ শক্তি বলে ভীষণ? একখানা ব্যাগ এনেছেন ভীমের বাবা দশরথেরও সাধ্যি নেই তোলে! না মানে ইয়ার্কি নয়! তাতে অবশ্য কবিতার বই ভর্তি। আর ভদ্রলোক বড়ই অমায়িক ও ভদ্র।

তা সক্কাল সক্কাল নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে ওঁকে প্রিপেড ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে আমি এপারে এসে নিজের গাড়ি উদ্ধার করতে যাবার আগে। এক কাপ চা খেলাম। আহা কি চা মাইরি! যেন আদার সঙ্গে ঘর্ষণে বাতাসা গলে জল হয়ে গিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

তা সে চা খেয়ে জিন্দেগি গম গাড়ির চাকায় চেপ্টে দিয়ে যতক্ষণে মেন রোডে উঠলাম ততক্ষণে সুকুমার বাবু পৌঁছে গেছেন সিআর পার্ক। বেশ কথা! আমি এগোতে লাগলাম নিজামুদ্দিন হাইওয়ে ধরে এমন সময় সুকুমার বাবুর ফোন।
– এই এরা তো বলছে রুম ১২টার সময় পাওয়া যাবে!
আমি বললাম, ‘সে কী? দিন দেখি লোকটাকে?’ আরে সে লোক তো সকাল থেকেই তেড়িয়া! বলে কোই ভি হো হাম বাত কিঁউ করে! যব হ্যায় তব হি দুঙ্গা! তা তাকে যতই বাবা বাছা করি! সে খেপেই যায়! আর এদিকে হঠাৎ ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক শুনতে শুরু করলাম পেটে! গুড়গুড় গুড়গুড়।

সম্পাদক মশায়কে ফোন করলাম! এমনিতে তিনি আমাদের মধুসূদন দাদা, অমৃত মন্থন না করেও হাতে এনে দিতে তাঁর জুড়ি নেই! কিন্তু সকালে খুব চাপ কেস! কেউ ওঠেই নি! তিনি ফোনের পর ফোন করছেন আর আমিও এদিকে করে যাচ্ছি! সুকুমার বাবু কিন্তু অত্যন্ত অমায়িক! ভাল ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করছেন দরোয়ানকে! যাই হোক ওয়েটিং রুমে একটু বসার সুযোগ করে দেওয়া গেল। কিছুক্ষণের জন্য! আর আমিও ময়ূর বিহার ফেজ টু-র কাছে। ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক এবার ড্রাম নিয়ে হাজির! গুড় গুড় দুম গুড় গুড় দুম। পেটের মধ্যে স্টার ওয়র্স শুরু হয়ে গেছে। লেজার সোর্ড নিয়ে যার যার ব্লিঙ্কস আর হ্যান সোলো আক্রমণ করেছে ডার্থ ভাডেরের গ্রহ।

ভাবলাম একটু থিতিয়ে নিই। সামলে নেব! এদিক আহমেদাবাদ থেকে আরেক মক্কেল এসে হাজির! তাকেও বললাম তুই ওখানে চলে যা ব্যবস্থা হয়ে যাবে! সে তার পরেও এসএমএস করে জিজ্ঞাসা করছে! প্রথমবার একা একা রাজধানীতে। একটু চিন্তা তো হবেই।

আমি আর কি করব! আমার পেটে তখন লঙ্গর রান্না হচ্ছে! ম্যারাথন দৌড়! বব বিমনের লঙ জাম্প! উসাইন বোল্ট! চাক দে ইণ্ডিয়া! ঘুর্ণি পিচ! বাইসাইকেল কিক! আরে থাম থাম! আর বলা যাচ্ছে না! লিখতে গেলেও চাপ লাগছে! ভর সকালে মনোরম বসন্তে আমি দরদর করে ঘামছি! নাকি কুলকুল করে ঘামছি! তাই ঠিক করতে পারছি না!

সম্পাদকের ফোন এল! একজন কর্তাকে ধরা গেছে! সুকুমার দার ফোন এল! আমি তো গরু হারিয়েছি মা!। ভাবলাম দেশের উন্নতি হচ্ছে না কারণ ওপেন ডিফেকশন এখনও কমে নি! চোখ বুলিয়ে দেখলাম রাস্তার ওপাশে পাঁচিলের ওপাশে একটা পার্কে কতগুলো ইয়ং ছেলেপুলে স্লিপের উপর সিট আপ দিয়ে পেটের পেশী শক্ত করছে। আবার পেট! উফ আমারটা পুরো রামদেবের মতো ঢেউ খেলিয়া যায় রে ঢেউ খেলিয়া যায়! একদম বিসমিল্লার মাইহার ব্যাণ্ড! আওয়াজ হচ্ছে সাবসোনিক! কেউ শুনতে পাচ্ছে না কিন্তু আমি এক মনে খালি গোপাল ভাঁড়কে গাল দিয়ে যাচ্ছি!

আর থাকতে না পেরে ইউএন-এর নিকুচি করেছে বলে পাঁচিলের এপারের জঙ্গলের দিকে এগোতে যাব। ও বাবা দেখি এক বেশ রহিস মহিলা নাদুস নুদুস করে তার নেড়ি নিয়ে টুক টুক করে সেখানে যাচ্ছেন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে কুকুর আর মানুষ এক ডাস্টবিন থেকে উচ্ছিষ্ট খেত। আর এখন তো বার করবে! কিন্তু মহিলা কেন রে বাবা! এসব স্থানে তো মহিলাদের যাওয়া বারণ! অন্তত পাবলিকালি! ছাতা কি আর করি নিজেকে নিজেই আরও জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম। এখন নয় মন্টাসোনা! এখানে নয়!

বিপদে পড়লে আমি ধরে নিই যে আমার আয়ু বিরানব্বই! এক্ষুনি টসকাব না! এই সময় দুঃসময় আজকাল বর্তমান সব কেটে যাবে! আবার গাছে গাছে পাখি শাখে শাখে পলাশের সমারোহ দেখা যাবে! আরে সে তো আজকেও দেখা যাচ্ছে। নরনারীরা স্বল্প সংখ্যায় জোড়ায় জোড়ায় বাইক চেপে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছে। আর আমি গাড়ির দরজা খুলে সমানে নিজের মন এবং পেটকে শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছি! যেন পেটের ভিতর দিয়ে টেন কমাণ্ডমেন্টসের রামেসিসের অশ্বারোহী রথ ছুটে যাচ্ছে।

দশ পনেরো তিরিশ! সমস্যার সমাধান দেখা যাচ্ছে! পেটের কষি আলগা করে সিটটাকে হালকা পিছনের দিকে এগিয়ে জয় মা বলে ভাসিয়ে দিলাম তরী। ইয়ে মানে গাড়ি! মানে ভাসাই নি! স্টার্ট দিয়ে দিলাম আর কি!

ময়ূর বিহার পেরিয়ে গাজীপুর ঘুরে আনন্দ বিহার! আরও কত দূরে আনন্দধাম আছে। আমি ইয়ে আমি উয়ে। আমি উরিবাবারে বাবা! আনন্দবিহার বাস আড্ডার সামনে মেট্রো কন্সট্রাকশনের জন্য জ্যাম! আর আমার পেটে রকেট ইঞ্জিনের শব্দ! এবার আরও চিত্তির! গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে ধাক্কা সামলাব তার জো নেই! মাঝ রাস্তায় টুক টুক করে গাড়ি চলছে। আমি আহ্লাদে ট্যারা হয়ে গেছি প্রায়।

চলে যাবে বসন্তের দিন চলে যাবে। দিস ক্লাউড উইল পাস ওভার আওয়ার হেডস। আহা ফাঁকা রাস্তা! উহু বাম্পার! ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে। ঘরের দোরগোড়ায় প্রায়! আমি তো শুয়েই পড়েছি সিটে! একদম ফর্মুলা ওয়ানের মতো শুয়ে গাড়ি চালাচ্ছি! পার্শ্ববর্তিনীকে ফোন করে দিলাম রাস্তা কিলিয়ার রেখো! পার্ক করে! হাই বাই বলে ঘরের ভিতর ঢুকে ঠাকুর ঘরে ঢুকে দরজা দিলাম! আর সশব্দে ফেটে পড়লাম সিংহাসনে! আহা কৃষ্ণ কৃষ্ণ! কৃষ্ণচন্দ্র হে!

বেরিয়ে এসেও আরাম নেই! ঢক ঢক করে দু গ্লাস জল খেয়ে তবে শান্তি! বাওয়া আর যাই হোক! এই শাস্তি যেন শত্তুরকেও না দেওয়া হয়! ওদিকে ম্যানেজারকে বোঝাবার জন্য সুকুমার দার ফোন বার দুই বেজে গেছে। তাকে ফিরে ফোন করলাম। দেশ কা ইজ্জত মা কা ইজ্জত বলে কোনরকমে একটা ঘরে ট্রান্সফার করালাম! সম্পাদক মহাশয়ও ফোনে জানালেন কর্তাব্যক্তিকে ধরা গেছে এবং তিনি তক্ষনি যাচ্ছেন। শান্তি! সব্যসাচীর ফোন এল মেলা কখন! আমি বললাম সে তো একটার পর। কিন্তু এ তো অন্য মেলা! আকাশে আজ রঙের মেলা! কি আনন্দ কি আনন্দ! ক্ষি আনন্দ!

All the world is a stage and you are merely a fellow safaiwala boss! আমেন!

(১৫৪)


কয়েকদিন আগেই টম হ্যাঙ্কসের হোস্টেজ ড্রামা ক্যাপ্টেন ফিলিপ দেখছিলাম। ভারত মহাসাগরে সোমালিয় জলদস্যুদের কবলে পড়ে ক্যাপ্টেন ফিলিপ্স ও তার জাহাজ। তার পর তার থেকে কিভাবে মুক্তি পায় ইত্যাদি! অসম্ভব সুন্দর অভিনয়ে যেন চোখের সামনে ঘটে চলেছে ঘটনাগুলি। তার শেষ দৃশ্য ছিল মুক্তি পাবার পরেও ট্রমাকবলিত টম হ্যাঙ্কসের অনবদ্য অভিনয়। সহজ থাকার চেষ্টা করেও পারছেন না! ট্রমা বা আতঙ্ক! যদিও ট্রমার বৃহত্তর অর্থ বাংলা ভাষায় বোঝানো সম্ভব হয় না! তবু দুর্ঘটনা বা অঘটন সম্পর্কিত ট্রমা আমরা বৈদ্যুতিন মাধ্যমের দৌলতে অহরহ দেখতে পাচ্ছি! দুর্ঘটনা কবলিত প্রিয়জন হারানো রাজধানীর যাত্রীর মুখ থেকে টিভি সাংবাদিকদের দৌলতে তাৎক্ষনিক অনুভূতিও জেনে নিতে পারছি। জানতে পারছি, পেটের দায়ে মানুষের জন্তু হয়ে যাবার, অসংবেদনশীল হয়ে যাবার গল্পও।

পাঠক/ পাঠিকারা, নিজের ঢাক পেটানোর মতো চওড়া বুক যে একেবারেই নেই তা বলব না। কিন্তু মধ্যবিত্ত মানসিকতায় চক্ষুলজ্জাটা কোথাও যেন এখনো আলগা ব্যাণ্ডএইডের মতো ঝুলে রয়েছে। তাই ভেবেছিলাম চেপে যাব। কিন্তু ফিসফাস তো আপনাদের আর আমার মধ্যে সুগম চলাচলের পথ। প্রিয়জনকে আমার নিজের মনের ভাব বোঝাবার সহজ মাধ্যম। যেখানে একান্ত ব্যক্তিগত এবং এহবাহ্য অভিজ্ঞতাগুলি ছাড়া সবই ভাগ করে নেওয়া হয়। পর্দা নেই কোন। তাই খুলে বলতে এলাম আর গৌরচন্দ্রিকা করলাম।

বছর দশেক আগে এক মে মাসের সকালে অফিস যাবার পথে এক পেট্রোল পাম্পের সামনে সদ্য ফেলে যাওয়া পেট্রোলে হড়কে গিয়ে ভয়ানক দুর্ঘটনায় পা উলটে পড়ে হাঁটুর সাড়ে চৌদ্দটা বাজিয়ে ফেলেছিলাম। তখন এক সহৃদয় ব্যবসায়ী আমায় গাড়িতে তুলে শক্করপুরের নিজের দোকানে নিয়ে গিয়ে কোল্ড ড্রিংক্স আর বিস্কুট খাইয়ে পেনকিলার খাইয়ে তারপর কোলে করে সেকেন্ড ফ্লোরে তুলে দিয়ে যান। সেই কথা ভুলি কেমন করে?

তার আগে বা পরেও কেমন করে জানি না, অযাচিত সাহায্য এই মানুষজনের কাছ থেকেই পেয়ে এসেছি। যাদের স্বার্থপরতার কথা আজ সর্বজনবিদিত। আমিও যে সম্মুখীন হই নি তা নয়। এই যেমন ধরুন, উলটো দিক থেকে এক রিক্সা এসে আমার গাড়িতে মেরে উলটে পড়ে যায় পাসে রাখা এক হণ্ডা সিটির উপর, তাতে সামান্য টাল খেয়ে যায় আর আমার গাড়ির হেডলাইট ভেঙে যায়। কিন্তু হণ্ডা সিটির মালিক আমার কাছ থেকে, সাড়ে চারশ (সারাবার খরচ) আদায় করে ছাড়ে। অথবা সেই দশ বছরের পুরনো চোটে আবার লাগার পরে অনুরোধ করা সত্ত্বেও কেউ স্কুটার চালু করে দিতে রাজী না হওয়ায় (তার মাস দুয়েক পরেই), প্রবল বৃষ্টির মধ্যে হ্যান্ড ব্রেকের সাহায্যে পা সোজা রেখে প্রচণ্ড ভিজতে ভিজতে বাড়ি এসে মনের শেষ জোরের বিন্দুটুকু দিয়ে গাড়ি স্ট্যান্ড করে হামাগুড়ি দিয়ে দুতলা চড়ার সময় কাউকে না পাওয়া! কিন্তু সে গুলো তো মামুলি ব্যাপার। এমনিতে কিন্তু উপরওলা বা সহযাত্রীদের কেউ না কেউ কখনো না কখনো সাহায্য করতে উপস্থিত হয়েইছে।

তা আমার সুযোগ এলে কি বিবাগী বৈরাগীর মতো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যাব? নাকি বিপদ বাঁধা দূরে ফেলে ঝড়ের রাতে দামোদরে ঝাঁপিয়ে পড়ব? স্যার হিরো হতে পারব না! কিন্তু মানুষ হওয়া থেকে কে আটকাবে!

দিল্লিতে জম্পেশ ঠাণ্ডা এদ্দিন পরে পড়েছে। না হলে চুল না ভিজিয়েই শীত সাঁতরে পাড়ে উঠে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ কি মনে হওয়ায় মাঝ দরিয়ায় ডুব দিয়েছে। ভালই হয়েছে! শীতকালে শীত না পড়লে তো গরমকালে গরমের চোটে চামড়া খুলে যাবার জোগাড় হবে। তা সক্কাল সক্কাল অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি, থার্মোমিটারের পারদ বলছে সাড়ে তিন। গাজীপুরের মোড়টা ঘুরতেই দেখি জটলা, পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখি একটা লোক সটান মাটিতে লম্বা হয়ে আছে আর বাকি পথচিকিতসকরা তার নিরীক্ষণ করে চলেছে। গাড়িটা থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, একজন এগিয়ে এসে বলল, “আগর হো সকে তো মদত কর দো!” মদত কর দো মানে? আমাদের জীবনই তো পরের জন্য উচ্ছুজ্ঞ করা হয়েছে। আহা এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে? গাড়ি খুলে দিলাম, বললাম কাউকে কিন্তু বসতে হবে সঙ্গে! ওবাবা যে ছেলেটির বাইকে সেই পড়ে থাকা লোকটির সাইকেল ঠোকাঠুকি হয়েছে তাকে ধরে বেঁধে লোকে এগিয়ে দিল। সে তো দেখি ভয়েই সিঁটিয়ে আছে। “জান বুঝকে নেহি মারা! উনহোনেই আগে চলে আয়ে মেরে উপর!” বিশ্বাসযোগ্য বয়ান বটে। কিন্তু একে নিয়ে তো যাওয়া যাবে না! যদি কেটে পড়ে?

অবশ্য কেটে পড়ার হলে সে আগেই পড়ত। তা না করে এগিয়ে এসে বাঁশ নিজেই নিয়েছে! অতএব উটকে কাঁটা বেছে খাওয়ানোর দায়িত্বও তো আমার উপর! ততক্ষণে ১০০-য় ফোন করায় পিসিআর ভ্যান চলে এসেছে। তা তার মধ্যে থেকে একজনকে বললাম যে আমার গাড়িতে বসে মুমুর্ষুর মাথা সোজা করে ধরে থাকতে। তিনি এদিকে হাঁটতে না পারলেও লোকজন জবরদস্তি করে মাথা চেপে হাঁটু টিপে ধরে প্যাকেট করে ঢুকিয়ে দিয়েছে পিছনের সিটে। কিন্তু নাক দিয়ে রক্তর আভা যেন? পিসিআরের পিছনে পিছনে গাড়ি চলতে লাগল। কিছু দূরেই কল্যাণপুরিতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হাসপাতাল। তার ট্রমা সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি স্ট্রেচার আছে কিন্তু ঠেলে আনার কেউ নেই! অগত্যা দুজন পুলিশ আর বাইক চালকের মদতে আহতকে স্ট্রেচারে বসানোর চেষ্টা শুরু হল। ভদ্রলোকের অর্ধেক জ্ঞান হয়েছে। কিছুতেই তিনি নামবেন না গাড়ি থেকে। এদিক দিয়ে নামাতে যাই তো ওদিকে চলে যায় আর ওদিকে গেলে এদিকে! শেষে দুটো তাগড়া কেঁদো বাঘা পুলিশ (দুটোরই বাড়ি কালিকট! আজব কেস! সুদূর কেরালা থেকে দিল্লি এসে দিল্লি পুলিশের চাকরি করছে! যেন কালিকটে কাটাকাটি হয়ই না!) তাকে টেনে নামিয়ে হাঁটিয়ে নিয়েই ভিতরে চলে গেল। তার পিছন পিছন আমি আর বাইক আরোহী গেল।

বাইক আরোহীর নিজেরও চোট লেগেছে। কিন্তু সে পুলিশ কেসের ভয়েই আধমরা! আমি অভয় দিলাম! “আছি তো!” যাই হোক ভিতরে আরেক কেস। ট্রমা সেন্টারে মধ্যে আমরা কেস লেখাচ্ছি আর তার মধ্যেই এক কনস্টেবল একটি কিঞ্চিত অপ্রকৃতস্থ চ্যাংড়াকে ফটাফট থাপ্পড় মেরে চিৎকার করে বলছে, “আবে ইয়ে হসপিটাল হ্যায়! তু চুপ হো যা! নেহি তো মারা যায়গা!” কি অদ্ভুত সমাপতন।

যাই হোক আহতের পকেট থেকে আমার উপস্থিতিতে পুলিশ পকেটমারি করে মোবাইল পার্স এগারোশো টাকা আর আইকার্ড বার করল। এনডিএমসিতে চাকুরী করেন হন্সরাজ রাই। বাড়ি নাকি কাছেই খেড়া গ্রামে! মোবাইল ঘেঁটে ছেলে বা কাউকে একটা ফোন করা হল। তুলল না কেউ! তারপর নম্বর ঘেঁটে মনুকি মাম্মি কে ফোন করে বোঝালাম কেসটা! বারবার বলতে হল এমন কিচ্ছু হয় নি! এদিকে বাইক চালক পঙ্কজেরও মাথা ঘুরতে লেগেছে! তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা করে দেওয়া হল। আবার ফোন এল! এবার মনুর ফোন! তাকে পরিষ্কার করে বলতেই সে একগাদা ধন্যবাদ দিল!

ওদিকে থাপ্পড় খাওয়া চ্যাংড়াটা মিনমিন করে বলার চেষ্টা করছে যে সে গান্ধীবাবার শিষ্য! মারধর তো দূরের কথা কোনদিন অসাবধানে পিঁপড়ে চাপাও দেয় নি! কিন্তু তার বিপরীত দিকের লোকটা তার ভাঙা চশমা আর ফুলে যাওয়া গাল নিয়ে তার বক্তব্যের অসাড়তা প্রমাণ করতে তৎপর। কে যে ট্রমাগ্রস্ত তাই বোঝা মুশকিল।

যাই হোক পুলিশকে নিজের নম্বর, পঙ্কজকে বরাভয় এবং মনুকে আশ্বাস দিয়ে অফিস পৌঁছলাম। মনের ভিতর কোথাও একটা চাপা আনন্দ কাজ করছিল। ভাল কিছু করার আনন্দ! ভেবেছিলাম নিজের মনেই চেপে যাব!

কিন্তু তা হতে দিল না খান সাতেক ফোন। তিনটে ফোন এল মনুর কাছ থেকে। প্রথমে জানতে চাইল কি ভাবে দুর্ঘটনা ঘটল! বাইকওলার দোষ ছিল কি না! বাইকওলা কি পালিয়ে গেছে? হন্সরাজ ইতিমধ্যেই বড় হসপিটালে চলে গেছেন। তাঁর মাথায় আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং বিপদসীমার বাইরে নয়! হাঁটাচলা চেনাশোনা সব হচ্ছে কিন্তু কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে।

শেষে আমায় মনু ফোন করে জিজ্ঞাসা করল বাবার ফোন এবং অন্যান্য জিনিসের কথা! পুলিশের কাছ থেকে কি ভাবে উদ্ধার (?) করা যাবে! আর পুলিশ সেখানে টাকা পয়সা দাবী করবে কি না! তাকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে আমি আছি! কিছু হলে আমি আছি!

এর পর এলো পঙ্কজের ফোন। তাকে ছাড়তে ছাড়তে বিকেল করে দিয়েছে! তার তাও ভয় রয়েছে! কেস খেয়ে যাবার ভয়! তাকেও আশ্বস্ত করলাম! শেষে তার ভিতরকার মনুষ্যত্বের ঝলক দেখলাম মনুর নম্বর চাইবার মধ্যে! নাকি মনুকে আগে থেকে ম্যানেজ করতে চাইছে? যাই হোক মনুকে আমি ইতিমধ্যেই বলেছি কারুর দোষ নয় আগে বাবাকে বাঁচাও! একেও বললাম! পুলিশ ফোন করলে তো আমি আছিই!

তা পুলিশ ফোন করল, খুব রোয়াব নিয়ে শুরু করলেও আমার অবিচল এবং শান্ত গলায় হয়তো কিছুটা অন্যরকম মনে হয়েছিল। শেষ করল খুব সম্ভ্রম নিয়ে! “স্যার জরুরত পড়েগি তো হাম দুবারা আপ কো কষ্ট দেঙ্গে!” ততক্ষণে নিশ্চিত হয়ে গেছি যে মনুর মানিব্যাগ পেতে আর পঙ্কজের ফালতু কেস না খেতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না!

যাই হোক কোথাও একটু নিজের জন্যও ভাল্লাগা এসে ঘর বাঁধল! তাই লজ্জা লজ্জা মুখে আপনাদের বললাম! তবে আরেকটা কারণও আছে! কোথাও যদি পাঁচ ফুট এগারোর সামান্য ভারী চেহারার একটা মানুষকে লাল গাড়ি বা কালো বাইকে দেখেন যে পথে ঘাটে মাটির গন্ধ নিচ্ছে। দয়া করে এগিয়ে আসবেন! মুখটা তো চেনেনই! না চিনলে নিচে দেখে নিন প্লিজঃ
12557157_1017542314970722_1308047321_o

ওই যে বাম দিকের চোঙা হাতে লোকটা! ঐটাই আর কি!