(১৬১)

ফিসফাসের বাজার এখন বেশ খারাপ। কিছু না ঘটলে ফিসফাস আসে না, আর ঘটনার জন্য চাতক পাখির মত হা পিত্যেশ করে বসে থাকতে হয়। না হলে জীবন একদম বর্ষাকালের নালার জলের মতন চলেছে। নড়েও না চড়েও না! ড্যাব ড্যাব করে একই ভাবে তাকিয়ে থাকে।

সে যাই হোক, আমি সাধারণতঃ কোন বিরূপ অবস্থায় পড়লে খুব বিচলিত হই না বলেই মনে হয়। খৃস্টজন্মের আগে একটা জোক চালু ছিল সেটা খুব খুব ইন্সেনসিটিভ এবং সেক্সিস্ট। তবে মোদ্দা কথা হল যখন উপরঅলার মার পড়ে তখন চুপ চাপ হজম করে যান, পারেন তো এনজয় করুন! চিল্লিয়েছেন কি মরেছেন! তখন জ্বালা বেড়ে জালা বেয়ে গড়িয়ে পড়ার সামিল হবে।

যাই হোক, সরকারি আদেশে যেতে হল হায়দ্রাবাদ, তাও ভর রবিবারে। টু পাইসের জিন্দেগী। তাতেও যদি শনি রবিবার মারা পড়ে তাহলে তো কেয়াব্বাত। কিন্তু কা করস্মি! পেট কা সওয়াল বাওয়া। যাই হোক দেখে শুনে ঠিক করেছিলাম যে সন্ধ্যায় যেটা যায় সেটা মনে হয় ড্রিমলাইনার! কম সে কম ভাল ছিনিমা টিনিমা দেখা যায়। নিজের পছন্দমতো! কিন্তু সে গুড়ে উচ্ছের রস! কৈসে?

তাইলে শুনুন! নির্দিষ্ট সময়ে বেশ কিছু আগে গিয়ে টপাটপ সিট বেছে বসার বাঞ্ছায় চেকিন করতে গেলাম! বললাম উইন্ডো দে, নাই! বললাম ফ্র্যাজাইল ট্যাগ লাগা, নাই! আছেটা কি মামা? আছে আছে, টেলিপ্যাথির জোর আছে। ড্রিমলাইনারে উঠে গেনু ৩৩ ডি সিট! বসে সবে দু চারটে ফাস্টোক্লাস ফিলিমকে ঝারি মেরে রেখেছি! ওবাবা আম্রিগি তেলেগু হরেকিষ্ণো পার্টি হাজির হল! তাদের মোট সাতজন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে! আমাকে বলল দয়া করে উয়াপানে উঠে যাবা? আমি আর কি বলি! আসলে মনটা আমার ভালো! তা সরে গিয়ে বসলাম ৩৩এইচে! এক পাশে একটা কচি হরেকিষ্ণো আর ডান দিকে এক ঘুমন্ত ভদ্রলোক। কিন্তু গে দেকি ও বাবা! স্ক্রিন চলে না! লাও! কচি হরেকিষ্ণোর স্ক্রিনটাও চলছিল না! কিন্তু প্লেন ছাড়তেই শুরু হল চলা! আমারটা সেই ট্যালট্যালে পদ্মপাতার জল! নড়েও না চড়েও না! কচিটি আমার সঙ্গে চোস্ত আম্রিগা উচ্চারণে গপ্প করল! (আমারটা অবশ্যই পাতি ইণ্ডিয়ান বাঙালি ইংলিশ) আর মাঝে মাঝে চিল্লিয়ে মা মাসি পিসিদের সঙ্গে ট্যান তেলেগুতেও গপ্প করল। কিন্তু আমার নজর তো তার স্ক্রিনের দিকে তাতে কষে টম আর জেরি চলছে কিন্তু সে গড়াচ্ছে সিটময়। কি আর করব একখান বই নিয়ে গেছিলাম, তাই খুলেই টাইম পাস করতে লাগলাম। ঘুমিয়েও পড়লাম!

ঘুম ভাঙলে দেখি এক ঘন্টা হয়ে গেছে আর খাবার সার্ভ হচ্ছে! স্লার্প করে জিভ শুকিয়ে নিয়ে বললাম ‘ননভেজ’! বিমান ললনা বলে, ‘নেই’! কেমন ভিতরটা আমসি মতো হয়ে গেল! খুব গম্ভীর মুখ করে বললাম, স্ক্রিনটার সঙ্গে চিকেনটাও নিয়ে নিলে মা! (মা? বলেছি নাকি? না মনে হয়!) দয়ার শরীর! ছুটে গিয়ে কোথা থেকে একটা এনভি লেখা প্যাকেট এনে ধরিয়ে দিল! তাতে চিকেন টিক্কা আর খান তিনেক সাইলেন্সার লাগানো প্যাটিস আর সিঙ্গারা! খাবি কি চুষেই হড়কে যাবি!

কিন্তু বিপদ হল অন্যত্র। পাশের তেলেগু বৈষ্ণব বাচ্চাটি খাচ্ছিল জৈন ফুড। মানে শুকনো আলু টিক্কি আর ঘুঘনি! সে আমার চিকেন টিক্কা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, হোয়াটস দিস? আমি বললাম! জিজ্ঞাসা করল কেমন খেতে! সত্যি বলছি মায়া লাগল! বললাম অতি জঘন্য! কিন্তু নন ভেজিটেরিয়ান বলেই চিবোতে হচ্ছে! আমার দিকে করুণার চোখে তাকালো!

খাবার শেষের পরে বসেই রইলাম বসেই রইলাম! চল্লিশ মিনিট পড়ে এসে থালা ফালা সাফ করে নিয়ে চলে গেল! কফি বা চা? বাপি বাড়ি যা! কফির কাপটা বোধহয় ডিজাইনার পারপাসে রেখেছিল।

শেষে আধপেটা খেয়ে এয়ারপোর্টে নামলাম কিন্তু গাড়ি কিছুদূর গড়াতেই হেইসান খিদে পেয়ে গেল যে, দ্রুতগামী রাস্তা পেরিয়ে আটার বিস্কুট নিয়ে এসে চিবোতে হল।

সত্যি বলতে কি অভিযোগ খুব যে করি তা নয়! তবে এয়ার ইণ্ডিয়াকে বছর পাঁচেক আগে যিনি গাধার গুহ্যদেশে ঢুকিয়ে দিয়েছেন তাঁর জন্য অনেক চেষ্টা করেও আশীর্বাণী বর্ষণ করতে পারলাম না! এয়ার ইণ্ডিয়া ছেড়ে এখন আবার তিনি ভারতীয় ফুটবল সংরক্ষণের কাজে লেগেছেন। মিউজিয়ামে পাঠাবার জন্য আর কি!

যাই হোক, দুই দিন কাজের কাজ সেরে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছি! তবে দুখানা ছিনিমা যা ঝারি মেরে রেখেছিলাম, তা ডাউনলোডে বসিয়ে এসেছি! কাল পরশু ছুটি আছে! সদ্ব্যবহার করতে হবে না?

ও হ্যাঁ! একটা প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ খুব দ্বিধায় আছি জানেন, একজন সংবেদনহীন অনাদিঅপ্রাপ্তবয়স্ক হাফসেঞ্চুরিসম্পূর্ণকৃত বৃষস্কন্ধ নিজের ইগো এবং বুদ্ধিহীনতা দিয়ে আমাদের মোহিত করে রেখেছেন। কিন্তু বক্স অফিসে তো তাঁরই জয়জয়কার! আলপিন টু এলিফ্যান্ট যে কোন বিষয়ে তিনি যথেষ্ট মন্তব্য করে পার পেয়ে যান! আর আমরা শুকনো ছোলাভাজা চিবিয়ে হরেকৃষ্ণ গাই! তবে কি জানেন তো! আরামকেদারার সামাজিক ক্রিয়াকলাপকে বাস্তবে নামাবার সময় বোধহয় এসেছে। অন্ততঃ নিজ জীবনে, তাই চিনি খাওয়া কম করছি মশাই! ক্রীড়া সংক্রান্ত সিনেমা খুবই পছন্দ হলেও দু-তিনশো কোটিতে আরও একটা দুশো টাকা যেন কিছুতেই যুক্ত করতে মন চাইছে না! তাই বেবি কো বেস পসন্দ নেহি হ্যায়! বিলকুল নেহি হ্যায়!

(৭৭)

যদিও তারাপদ রায় আমার খুব প্রিয় রম্যরচনাকার এবং তাঁর ‘দুই মাতালের গপপো’ আমার প্রথম কেনা তাঁর বই, তবুও এরকম একেবারেই ভাবতে যাবেন না যে পরবর্তী কিছু সময়ে যে বিবরণ আপনারা কিছুটা মুচকি হাসি, কিছুটা হা হা হাসি, কিছুটা হ্যাঁ হ্যাঁ হাসি এবং অধিকাংশটাই ‘ধুত্তেরিকি নিকুচি করেছে… আবার ফিস ফাস?’ সহযোগে পড়বেন তার মধ্যে কোথাও কিন্তু গাপ্পিবাজি নেই।
শুরুটা দেখেই পাঠক পাঠিকারা নিশ্চয় বুঝে নিয়েছেন (এটা ধরতে দোষ কোথায় যে আমার পাঠক/ পাঠিকারা সকলেই বুদ্ধিমান… একদম রাইটার পে গয়া হ্যায়!!) যে এবারের গল্পটি মাতাল বা মাতলামো সম্পর্কিত। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের তুরীয় মার্গের প্রতি আকর্ষণবোধ যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের তা অনুধাবন করতে কোন নিউটনের দরকার হয় না। সেই কবে কার অনুরোধে আসরে কবি গেয়ে গেছেন… পিনে কি কসম ডাল দি, পিউঙ্গা কিস তরহা… ইয়ে না সোচা তু নে ইয়ার ম্যায় জিউঙ্গা কিস তরহা…
প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চাটুজ্জের টলটলায়মান বড়লোকের বেহায়া সন্তানকে নিয়ে নিতান্ত অযত্নে লেখা উপন্যাসটি তো বেষ্ট সেলারের নতুন সংজ্ঞা রচনা করেছে। আমাদের নিজেদের অল্পবিস্তর পা হড়কাবার ঘটনাটা এতই সাধারণ যে আজকের দিনে দাঁড়িয়েও সিধে চকের দাগের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অক্ষমতাটাকে ট্যাবুর ভিতরে ঢুকিয়ে বাক্সবন্দি করে ফেলা হয়।
একটা ফালতুকা শের ঝাড়ি এখানে, কবি বলেছেনঃ কোন কমবখত শ্বাস লেনে কে লিয়ে পিতা হ্যায়, দর অসল শরাবই বদনাম হো গয়া হ্যায় অ্যায়সে…
এই প্রসঙ্গে একটা পি জে মনে পড়ল। পুরুষ হিন্দিতে পিতা হ্যায় তো মহিলা কি মাতা হ্যায়? পানি মাতা হ্যায়, দারু মাতা হ্যায়… আহা, শুনলেই কেমন ভক্তির ভাব আসে। (যদিও ওটা পিতি হ্যায় হবে… তবুও ফোকটে খিল্লি করতে আর খরচ কোথায়?)
যাই হোক অনেক সলতে পাকানো হয়েছে। এবার সোজা সুজি আগুন ধরাই। কিছুই না, বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে হুট বলতে দুম করে চলে গেলাম বুঁদি। তা এক অতীব ভ্রমণ পিপাসু (Glutton tourist বলা যেতে পারে) বন্ধুর পরামর্শেই কোটা থেকে আসার পথে ঢুঁ মেরে আসতে চলে গেলাম গাড়ি চালিয়ে। রাস্তা খুব খারাপ কিছু নয় সময়েই পৌঁছে আরএসটিডিসি-র হোটেলে থাকব বলে হাজির হলাম। জেত সায়র লেকের ধারে, ছিম ছাম ব্যবস্থা। অতিরিক্ত বাহুল্য নেই, আবার অসুবিধাও এদিকে নাক সিঁটকোয় না।
তা সারাদিন ধরে ছোট্ট শহরটাকে চষে ফেলে, রাতে লাল মাস (লাল লংকা ফোড়নে মাটির হাঁড়িতে বানানো পাঁঠা) সহযোগে রুটি সাঁটিয়ে কম্বলের আশ্রয়ে চলে গেলাম যাতে সকালে উঠেই বড় প্রিয় এই চচ্চড়ি জিন্দেগিটায় ফিরে আসতে পারি।
সারা দিনের উৎসাহ আর পরিশ্রম মিলে মিশে চোখে মালাইয়ের পরতের মতো নেমে এল ঘুম। এমন ঘুম, যা স্বপ্ন রাজ্যেও জারি করে দেয় ১৪৪ ধারা। কিন্তু বিধির বোধহয় অন্য ইচ্ছা- হঠাৎ প্রচণ্ড চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম গেল ভেঙে। কোন রকমে উঠে হাত পা ঠিক কোন কোন জায়গায় তা ঠাহর করতেই কেটে গেলে আধা মিনিট। শব্দকল্পদ্রুমের তো নিরবিচ্ছিন্ন তরজা চলেইছে।
নিজের মধ্যে ফিরে এসে শব্দের উৎস খুঁজে পেতে দেখলাম, আমাদের পাশের রুমটা থেকে (হোটেলের ঘরকে রুম বলে হে ভাগ্নে!)। বেশ বাওয়ালের শব্দ ভেসে আসছে। ছোঁড়াছুঁড়ি চেল্লামেল্লি হই হল্লা সব মিলিয়ে নরক একেবারে জাভেদ আখতার।
একে বিদেশ বিভুঁই, অচেনা জায়গায় কে আবার কখন চেম্বার বার করে কে জানে? তাই কান চেপে ঘুমোতে গিয়েও দেখলাম যে বাক্স প্যাঁটরাগুলোর উপর বড়ই না ইনসাফি হচ্ছে। পদবীর মান রাখতে উঠে গেলাম বুক ফুলিয়ে।
দরজাটা খুলতেই এক ঝলক লেকের হাওয়া বুকের মধ্যে চেপে বসল, আর আমিও নেহাত বলতেই হবে বলে পাশের ঘরে উঁকি দিয়েই আমার চক্ষু তালগাছে উঠে গেল… সারা ঘরে মেট্রো রেলের কাজ চলছে যেন। বাঁদিকের কাঠের সোফাটায় একটা আধবুড়ি মহিলা,(এটা বোধহয় সেই ‘মাতা হ্যায়’) জড়ানো গলায় চিৎকার করে যাচ্ছে, “আরে মীণাজি রোটি খিলা দো…”। মীণার হয়তো সে ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সে তখন গিরগিটির মতো শুঁটকো বন্ধুর নাগপাশে বন্দি। সে বন্ধু খেপে গিয়ে এক হাতে মীণা নাম্নী কেয়ারটেকারের গলা চেপে ধরে দ্বিতীয় হাত দিয়ে প্রাণপণে তা টেপার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু হায়রে কামবখত নেশা… জোরই আসছে না যুত করে। আর মীণার কথা কি বলি, সে যেমন কর্তব্য পরায়ণ, তেমনই বন্ধুবৎসল। সেও দুলে দুলে বলে যাচ্ছে, “দাবাদে দাবাদে! তু দোস্ত হ্যায় মেরা!”
এদের বয়স এবং চেহারা দেখে যে সব বল পাঁজরার নীচ থেকে এদিক ওদিক গড়িয়ে গেছিল, সে গুলো একটা দুটো ফিরে এলো। তবুও মাতালকে বিশ্বাস নেই। তাই মীণাকে ডেকে গলায় পিনাট বাটার লাগিয়ে বললাম, যা করবে বাবা দরজা বন্ধ করে করো… ঘুমোতে দাও হে বাবা, কাল সকালে কাটবো যে”।
সেও দেখলাম বাধ্য ছেলের মতো দরজা বন্ধ করল, আর আমিও অবশিষ্ট বলগুলি তুলে নিয়ে, বুক ফুলিয়ে ঘরে ঢুকে হাজির হলাম।
কিন্তু আওয়াজ কমেই না… চলেছে তো চলেছেই… পাঁচ, দশ, বিশ… ঘড়ির কাঁটা বিশ মিনিট পেরিয়ে গেলে আর ধৈর্য রাখা গেল না। ও দিকে ততক্ষণে দরজার উপর ধুপধাপ শব্দ। ঘটাং করে উঠে আমাদের দরজা খুলে পাশের দরজায় গিয়ে “গুড়ুম গুড়ুম” করে মারলাম ধাক্কা। আওয়াজ যেন একটু গেল কমে, কিন্তু তারপরেও চলতে থাকল, আমিও আমার সশব্দ উপস্থিতি দিলাম জানান।। মাথায় কিছু একটা বন বন করে আওয়াজ করেই চলেছে। দরজা খুলতেই দেখি বুড়ি আর দোস্ত আমার দিকে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে। মীণার দেখা নাই।
আমি বেশ রাগত স্বরে বলে উঠলাম, “মীণা কাঁহা?” উভয়েই পত্রপাট দরজার পিছনে দেখিয়ে দিল। মীণা বেটা ভয়ে কিংবা লজ্জায় (ঠিক নিশ্চিত নই) দরজার পিছনেই টুকি করছে। যেন বাজ পড়ল, গর্জে উঠলাম, “ইয়ে কেয়া হো রাহা হ্যায়? শোনে নেহি দো গে কেয়া? যাও ঘর যাও?”
মীণা মিন মিন করে বলার চেষ্টা করল, “ম্যায় তো কেয়ারটেকার হুঁ, ইহা হি রহতা হুঁ”।
আমার গলায় তখন বোসের সাউন্ড সিস্টেম ভর করেছে! ডেকে উঠলাম, “ফির বাকিও কো যানে বোলো!” মীণার বন্ধু এক পায়ে খাড়া… বুড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “চল তুঝে ছোড়কে আয়ুঁ!” মীণাও দেখলাম হাঁ হাঁ করে বেরিয়ে পড়ল, বুড়ি তখনো পুনপুনে পোকার মত বলে যাচ্ছে, “আরে রোটি তো খিলা দে তে…”! কিন্তু জলদমন্দ্র স্বরের সামনে পড়ে তিনজনেই পথের কাঁটা পায়ে দলে সাগর গিরি লঙ্ঘিয়া ছুট লাগালো, যাবার পথে আবার টলটলায়মান জনতার চাপে রিসেপশনের পাখা গেল চালু হয়ে।
আমিও গেলাম পিছন পিছন, গিয়ে দেখি মীণা নিজের বাইকটাকে স্টার্ট দেবার চেষ্টা করে যাচ্ছে বাইকের হ্যান্ডেল ধরে বাইক থেকে ঠিক ছ ইঞ্চি দূরে ক্রমাগত কিক মেরে। রে রে করে উঠলাম, “মরনা হ্যায় কেয়া? যাও পয়দল যাও!” বলে ফিরে এসে সবে কম্বল দিতে যাব মুড়ি, ও মা ঠিক যেন হোটেলের বাইরেই ক্যাঁচ করে ট্রাকের বিশাল ব্রেক মারার শব্দ আর “ঘং ঘং” করে অ্যাক্সিলারেটরের আওয়াজ।
দৌড়ে গিয়ে দেখি ট্রাকটা একটু ঘুরে চলে যাচ্ছে, আর রাস্তায় তিন মূর্তি বাইক নিয়ে উলটে পড়ে। কাছে গিয়ে শুনি বুড়ি চেঁচিয়ে লেক মাত করছে, “আরে মেরা প্যায়ের টুট গয়া রে, কাশী রে ইত্যাদি রে…” আর দুই বন্ধু মিলে রাস্তায় উঠে বসে একে অপরকে বলে বোঝাচ্ছে, “আরে তেরা চড় গয়া! মুঝে চালানে দে!” আর “নেহি ম্যায় তো ঠিক হুঁ, তেরাহি চড় গয়া বোলকে ব্যাল্যান্স ঠিক নহি রাখ পায়া!”
আবার গিয়ে হাঁক পাড়লাম, “মনা করনে কে বাবযুদ ভি বাইক লেকে নিকলা?” মীণাকে ধমক লাগালাম বাইককো প্যায়দল চলাকে লে যাও। আর তার বন্ধুকে বললাম “আরে বুঢঢিকো পৌঁছা দো জলদি!!” সে বন্ধুও আবার বাধ্য ছেলের মতো বলল, “হাঁ হাঁ ঠিক বাত, চল তুঝে ছোড় কে আতা হুঁ!” বলেই বসে থাকা বুড়ির গা থেকে টেনে চাদর নিয়ে জড়িয়ে নিয়ে বলল, “আরে চল না ঠণ্ড লাগ রহি হ্যায় মুঝে…” বুড়িও কি বুঝে খচর মচর করে উঠে তার সঙ্গে রওনা দিল।
এদিকে মীণাকে এক গাদা বর্ণপরিচয় পড়িয়ে আমি ফিরে এলাম বাইক আর মীণা সঙ্গে। তারপর বাইক স্ট্যান্ড করিয়ে তাকে বললাম, “দরওয়াজা বন্ধ করো ঘর কা!” “জী সাব” “পাঙ্খা বন্ধ করো” “জী সাব” “হাঁ আব যাও শো যাও!” “জী সাব” বলে সে তো গেল শুতে।
দরজা খুলে আলতো করে ভিতরে ঢোকার আগে দেখে গেলাম, মীণা খাটের গলার দিকে বসে শোবার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কি ভাবে যেন তার মুণ্ডুটা খাটিয়ার মাথার দিকের দেওয়ালে যাচ্ছে আটকে বারবার। আরও কিছুক্ষণ রবার্ট ব্রুসের চেষ্টা সে চালিয়ে যেতে লাগল। আমি দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই দেখি পার্শ্ববর্তিনী ফ্যা ফ্যা করে হেসে যাচ্ছেন। তেনার কানে সবই গেছে। পুরোটা বর্ণনা করতেই আখাম্বা খাট কাঁপিয়ে হাসতে লাগল। আমি কি রকম ঘাবড়ে গিয়ে কম্বলের তলায় পুট করে সেঁধিয়ে গেলাম।
সকালে উঠে বর্ণপরিচয়ের দ্বিতীয়ভাগ পড়াতে যেতেই মীণা পায়ের গোড়ায়। “হুজুর মাইবাপ”!! কি আর বলি! আরেক প্রস্থ কিশলয় টিশলয় পড়িয়ে উঠে ভাবতে বসলাম, “মাইবাপ” তো না হয় হল। মীণা নিজেকে গালাগালি দেয় নি তো “এর বাচ্চা” “তার বাচ্চা” বলে? তবে সকালের আদর আপ্যায়নে আর গায়ে পড়ে দেঁতো হাসি দেখে তো সেটা মনে হল না।
মাতালের গল্পে তারাপদ রায়ের উল্লেখ থাকবে না তা কি করে হয়? একবার তারাপদ রায়ের এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে শুঁড়িখানায় বসে বলেছিল, “তুই আর খাস না, তোর মুখটা কেমন কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে!” তবে সময়টা শীতকাল আর শহরটা উত্তরভারতের কোথাও ছিল কি না তা নিয়ে লেখক নির্বাক। আমেন!

(৭১)

বিয়ে খাওয়া… পাঠক পাঠিকা আবার এ রকম কল্পনা করে ফেলবেন না যে আমি দজ্জাল শাশুড়িদের মতো কিছু করার প্ল্যান করছি। গোদা বাংলায় পরিস্ফুট করে লিখলে হয়, “বিয়ে বাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়ে ভোজ খাওয়া”। তা সে সব তো কিশোর বয়সের স্বপ্ন, যুবা বয়সের উন্মাদনা, পরিণত বয়সের লুকোচুরি আর বার্দ্ধকের দীর্ঘশ্বাস। তখন পাত পেড়ে বসে মানুষ গল্প করে, “খেয়েছিলাম বটে ন্যাপলার দিদির বিয়েতে…” বলে অতীত জাবর কাটা আর বর্তমানের শসা আর পেঁয়াজ কুঁচির দিকে তাকিয়ে কুম্ভীরাশ্রু মোচন।

যাই হোক, আমি এখনো সেই সিংহাসনে উপবিষ্ট হতে পারি নি বলে বেশী কথা বলব না। দু চারটে স্কোয়ার পাস খেলে গোলে বল দাগব। এক জমানায় রসগোল্লা খাবার খুব বদনাম ছিল বটে, একটা উচ্চিংড়ের মতো বন্ধু টপাটপ হজমির গুলির মতো রসগোল্লা খাচ্ছে দেখে আমি তার এক কাঠি বাড়া হয়ে শেষে বেলেঘাটা থেকে এক ঘন্টা হেঁটে ফিরে হজম করে ফেলেছিলাম অত্তোগুলো রসসোগোল্লা। বা আরেক নিমন্ত্রণে এমন খেতে শুরু করলাম যে আমার সঙ্গে জগঝম্প দিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে এক অলপ্পেয়ে সমুদ্রের মতো সব রসগোল্লা থালাকে ফিরিয়ে দিয়ে (তখন তো আর মেলামাইন বা ঝুঠো কাঁচ ছিল না… কলাপাতায় নূপুর বাজিয়ে বানভাসি হয়েছিল অবশ্য) উঠে চলে গিয়েছিলেন নিজের বুকে দাড়ি লাগাবার প্র্যাকটিস করে। সে তো আকবর বাদশার জমানার গল্প।

এখন তো ওই শসা আর অ্যান্টাসিডের ভিতর লুকোচুরির স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকি। তবু ভুলিতে পারিনা সেদিন বিজনে কি জানি কি হয়েছিল। তাই কেউ ডাকলে যারপরনাই আহ্লাদিত হই, নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করে ঊর্ধ্বগগনে মাদল বাজিয়ে ঢেঁকুর তুলে ফিরে আসি, যাতে বেশী হড়কাতে না হয়।

তবে দিল্লীর বিয়ের নিমন্ত্রণের একখান ঝুঁকি আছে। এখানকার খান্না গুপ্তা টুটেজা পাকরেজারা বাস্তব জীবনে যতই চিকেন আর মানুষের ঠ্যাং চিবোক না কেন, অনুষ্ঠান বাড়িতে আশ্চর্যজনক ভাবে ভণ্ড তপস্বী হয়ে ভাজা মাছটিকে তেলের ডোবায় ফেলে ঘাসফুস চিবোয়। আর আমার অবস্থা রবি শাস্ত্রী খুব সুন্দর বর্ণনা করেন, “আমাকে কেউ খেয়ে ফেলার আগেই তাকে খেয়ে ফেলি”। সেই সব বিয়ে বাড়িগুলোতে আমি আমার মিষ্টি দাঁতের ভুষ্টিনাশ করি এখনো। যদিও কোথায় লাগে রসগোল্লা, গুড়ের সন্দেশ আর কোথায় লাগে গুলাব জামুন আর পেঁড়া। তবুও সামাজিক দায়িত্ব আর পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা কি ফেলে দেওয়া যায়? না চাইলেও গতি করতে হয়।

তা তেমনই এক পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা বিয়েতে যাবার হুকুম ছিল কাল। এমনিতে আমি খুবই বাধ্য, মন না মানলেও আমি মেনে যাই। তাই আমার ভালোমানুষি আর বাক্স প্যাঁটরা সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম বৃহত্তর নয়ডার উদ্দেশ্যে।

এখন একখান নতুন ট্রেন্ড হয়েছে। সবাইকে বুকে নিয়ে হাম সব এক হ্যায় পোষ্টার লাগানো। শহরে বাস করার জায়গা নেই? তো চলো সবাই রাজার হাটে তাঁবু গাড়ি আর পার্কের বেঞ্চি বা মেট্রোর সিটে বসে একটু একটু করে সাইডে সরে গিয়ে সুন্দরীর কোলে বসে পড়ার মতো করে শহরটাকে বাড়িয়ে নিয়ে ইয়েভি নিয়ে নিলাম আর উয়োভি ট্যাঁকে গুঁজলামের মানসিকতা। গ্রেটার নয়ডা আমার বাড়ি থেকে পাক্কা ৪৫ কিমি, তাও তাকে বর্ধিত দিল্লী ধরে যেতে হবে।

বার ছয়েক গেছি। একবার তো বাইকে করে যেতে গিয়ে সাঁ সাঁ ১৪০ কিমির মাঝে ৮০ কিমির স্যান্ডউইচ হয়ে ভাবতে ভাবতে গেছি, “কেন? কেন? কেন?” তা প্রত্যেকবারই মনে হয় পাকিস্তানে যাচ্ছি বা নিদেন পক্ষে ভিন রাজ্য রাজস্থান। গাড়ি চলছে তো চলছেই থেমেছ কি মরেছ। এ যেন জীবন যুদ্ধের ঘোড়া বা ইঁদুর (নিজ নিজ আকৃতি অনুসারে শূন্যস্থান পূরণ করে নিন)।

তা কাল বাক্স প্যাঁটরা সমেত আটটার সময় রওনা হলাম, মনে সাধ একঘণ্টায় উড়ে গিয়ে কালো মেঘ ফুঁড়ে গিয়ে পেটে কিছু জুড়ে নিয়ে (ঘাস পাতা খাওয়ার থেকে সেলোটেপ দিয়ে স্যাঁটাই ভালো) টুক করে ফিরে আসব।

তা তার জন্য, দিন দুয়েক আগে একটি দীর্ঘসময় ধরে ডিউ সার্ভিস টুকু করিয়ে নিয়েছিলাম গত নরশু (নাকি তরশু… কে জানে? ধরে নিন না কিছু একটা!)। তখনই কেমন যেন সামনের বাম দিকের চাকার মতিগতি ঠিক লাগছিল না। এমনিতেই টিউবহীন টায়ারের গর্ভাবস্থা বোঝা মুশকিল হয়, তাই সার্ভিসকারী রজার ফেডেরারকে বলেছিলাম, “ভাই, তেমন বুঝলে স্টেপনিটিকে ময়দানে নামিয়ে হাওয়া ভরে দিও”। তা সে ত্রিকালজ্ঞ বরাভয় মূর্তি হয়ে বলে দিল, “আরে সাব টায়ার ঠিক হ্যায়, বদল নে কি জরুরত নেহি”।

আমরা তো আজকাল বাবাদের বাণীকেই জীবনের শেষ কথা বলে ধরে নিই। তাই বেদবাক্য মেনেই উড়তে শুরু করেছি। “জিন্দেগী এক সফর হাস্নুহানা” গান চলছে। কানে হাওয়া না লাগলেও তালা লাগে নি- মনে হতে শুরু করেছে, এই তো পৌঁছে গেলাম বলে তখনই হল ব্যাপারটা!

ঠাঁই ঠাঁই দুমদাম শুনে লাগে খটকা
খালি পেটে তাই বলে আমি ভাবি ভোঁটকা…।

কিন্তু সে গুড়ে জেলুসিল… কর্ণের রথের চাকা, মাঝ দরিয়ায় ডুবিল। জীবনটাকে ফুটবলের মত গড়িয়েছি বলেই বোধহয় কিছুতেই বিশেষ চুপসে যাই না, আর বাক্সটাও মজবুত, সব সময় ভার বওয়ার জন্য প্রস্তুত। তাই জোর কদমে নেমে পড়লাম স্যুট বুট পরে, রথের চাকা তুলতে।

তবে জনমনিষ্যিহীন কুরুক্ষেত্র (যুদ্ধের নোটিশ না দিলে আজকালকার প্রফেশনালরা খোঁয়াড়ি ভাঙেন না যে), একটুআধটু যে বুক দুরু দুরু করছিল না তা নয়। তার উপরে সঙ্গের তিনি তো গাণ্ডিব তুলে কাণ্ডারী হুঁশিয়ার করেই আছেন।

যাই হোক চুক্তির প্রথম শর্ত অনুযায়ী, নিজের পেশী শক্তির উপর বিপুল আস্থা রেখে ডিকিতে রাখা চাকা প্রবল বিক্রমে তুলতে গিয়েই ফুসসসসসসসস। অঙ্গদের জানুর মতো আটকে আছে। না পারি নড়াতে না পারে চড়াতে। তারপর অবশ্য তিনিই মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে পথ দেখালেন যে রথের পরিবর্ত চাকা ইস্ক্রুপ আঁটা হয়ে মিটিমিটি চাইছে। তারপর কসরত টসরত করে তাকে খোলা গেল।

তার পর এল জ্যাকের পর্ব।

জ্যাক অ্যান্ড জিল
ওয়েন্ট আপ দ্য হিল
টু ক্যাচ অ্যা গ্লিম্পস অফ দ্য গ্লাইডার
দ্য রবার ওয়াজ ব্রোকেন
অ্যান্ড দ্য গ্লিম্পস ওয়াজ অ্যা টোকেন
হুইচ ব্রট জ্যাক ডাউন বাই দা স্লাইডার…

এটা ছিল পি পি, মানে পুওর পোয়েম বা পচা পদ্য (আবার এ সব কেন? এবারের ফিসফাসটাতো দুম দাম হচ্ছে!)। ফিরে আসি রাস্তায়, জ্যাক ঘুরিয়ে গাড়ির গাত্রোতপাটন করতে কালঘাম ছুটে গেল। এক নম্বর কারণ, কখনো ঘোরাই নি ঘানি- দুই নম্বর কারণ, জ্যাকটি একটি লজঝড়ে কানি- আর তিন নম্বর কোথায় লাগাতে হয় কি জানি?

যাই হোক মন ও পেট পরিষ্কার থাকতে শিখতে কতক্ষণ? ততক্ষণে অবশ্য বিয়ের কনে (যে নিমন্ত্রক ছিলেন আর কি) ও রাস্তা ঘাটে হাতিকে কাদা থেকে টেনে তোলা ব্যাং ‘রেস’ কোম্পানিকে ফোন করা হয়ে গেছে। কনেটি বড়ই ভালো- অত ঝামেলার মধ্যেও (পাঞ্জাবী বিয়েতে ল্যাজ বিশিষ্ট ব্যাপার স্যাপার কমই হয়!) সে তাদের গাড়ির ড্রাইভারের নম্বর দিয়ে দিয়েছিল নির্দেশ সহ। তা সেই ডোনাল্ড ডাকের ডাক বিশিষ্ট মিকি মাউস বলল যে পারি চক (নদীর পাড় আর কি) পৌঁছে যান, তাইলে ব্যবস্থা করে দেব! (ইল্লি আর কি! সেখানে গেলে তোকে ডাকতে হবে কেন রে মুখ পোড়া মিনসে?)। আর রেস বলল, এখন দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ পেতে চলেছে তাই এক ঘন্টা লাগবে। (তারপর শেফালী খান এসে বলবে, ‘ওয়াও, পাঞ্চার? ক্যায়সে?’ ইত্যাদি টিত্যাদি)।

যাই হোক আমি ঠাণ্ডা শীতের রাতে লেপের আদরে না থেকে তারাদের চাদর মুড়ে নিয়ে যথাক্রমে জ্যাক, পথপাশের ইঁট এবং প্রস্তর খণ্ড সহযোগে রথ তুলতে শুরু করলাম। দু কদম যাই তো এককদম থামি আর হাজার কথা ভাঁট বকি। আরেকজন শিবের মত সমস্ত গরল পান করে সমন্বয় সাধন করেই যাচ্ছেন।

তার পর এলো সেই ফ্রেমে বাঁধানো মূহুর্ত। হুড়ুৎ করে জ্যাক ও পাথর এবং ইঁট সঠিক উচ্চতায় পৌঁছে গেল আর চার পাঁচবার লাফালাফি করে বসে যাওয়া চাকাটিও ধড় থেকে আলগা করে ফেললাম। এই সময় পুত্র বলল, “বাবা রেসের গাড়ি চলে গেল, পাশ দিয়ে!” আমি বললাম “যেতে দাও গেল যারা, আমি দ্রুত জুড়ে নিই আছে তাড়া! (কে জানে, শুধু মাত্র খবরদারি করার জন্য যদি ফি চেয়ে বসে?)

আর কি, নতুন টায়ার লাগানো তো সময়ের অপেক্ষা, তা সেও হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যে। কিন্তু দেখা গেল বহুদিনের অযত্নে সেও চুপসে আছে। তাই কোনরকমে গাড়ির ডান দিকে চেপে বসে সবাই মিলে টুকুস টুকুস করে পৌঁছে গেলাম।

ও হো এ তো দেখি ‘ছিল বেড়াল আর হয়ে গেল রুমাল’! বিয়ে বাড়ির গল্প হবে না? সে আর কি বলি ঝাঁচকচকে বিয়েবাড়ির, ধবধবে সাদা প্লেটে, ততোধিক সাদা খাবার দাবার খেয়ে টেয়ে (যতটা পারলাম আর কি!) ফিরে আসার সময় দেখলাম বিয়ের পুরুত গো বেচারা বর পেয়ে হাতে ও গাঁটে কাটছে। বলুন দেখি, অন্য পোশাক আনে নি শীতের রাতে বিয়ে করবে বলে, গো দান করতে হবে- আর না পারলে প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ সর্বঘাটে কাঁঠালি কলা অর্থদান। তা সে ভালোমানুষের পো আবার এক তাড়া নোট হাতে নিয়ে বসেছে, তার কপালে তো ধ্রুপদ খেয়াল আর শূন্য দেওয়ালই লেখা থাকবে।

তা সে যাকগে, যে যার নিজের কর্মফল ভোগ করে। জ্ঞানত অজ্ঞানত আমরা কত রকম কাজ করেই তো বলে ফেলি, “এ মা বুঝতে পারি নি!” তা তার ফল যাবে কোথায়, এ জন্মেই তা খেয়ে যেতে হবে… বাজারের যা অগ্নিমূল্য হচ্ছে! আমেন।

(৪৮)


সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বসে আলোচনা চলছিল… একটা মানুষ দুটো বিয়ে করলে বা বিয়ে না করে দুজনে একসঙ্গে থাকলে কি হয়? এক অপাংক্তেয় বলল, “কিসসু না, শুধু বাচ্চাকাচ্চাগুলোর সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে পব্লেম হতে পারে”। বাকি MIyas and Biwis are রাজি তো কেয়া করেগা কাজি?

না না, পণ্ডিত পাঠক এবং পন্ডিতিয়া পাঠিকারা আবার এটা ভেবে বসবেন না যে আমি দেশাচার, কুলাচার, আমাচার নিয়ে amateurদের মতো জ্ঞান দেবার ধৃষ্টতা করছি। অবশ্য রসালো আলোচনা যে বাঙালি কেন, কাঙালিরও বৈঠকখানার আড্ডার প্রাণ সে কি আর বিদগ্ধদের বলে দিতে হবে। ওসব কিছু না, খালি দুটো ঘটনা share করে নিতে চাই…

কদিন আগে বাংলা দৈনিকে পড়লাম যে “স্ত্রীর সামনে স্বামীকে সপাটে চড় মারলেন স্ত্রী”। না না লেখার ভুল নয় ঠিকই পড়েছেন… ‘কা তব কান্তা কস্তে বাপ ভাই’ মার্কা ছেলেগুলোর এরকমই হওয়া উচিত। লোক ঠকানোটা খুন করার থেকেও বেশী ক্ষতিকর।

তা সেদিনই বাজারে গিয়ে কুমড়ো কিনতে গিয়ে একটা ঘটনা চাক্ষুষ করলাম। উঁহু, Group Sex বা The Last Emperor টাইপের ঘটনা বাজারেই ঘটে বলে কষ্টকল্পনা করতে যাবেন না। অধৈর্য বড়ই বিষম বস্তু। ঘটনাটা শুনুন।

দাঁড়িয়ে আছি কুমড়োওলার সামনে। হঠাৎ একটি সদ্যপ্রাক্তন গ্রাহক এসে বলল, “শা… তুই পনেরো টাকা নিলি কেন রে? ও দিকে দশ টাকা নিচ্ছে তো!” ভাবলাম বাঙালির স্বভাব, দুটাকা বাঁচিয়েও ‘কেমন দিলাম’ মার্কা হাব ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাই ঠকে গিয়ে উজার করে ভালোবাসা দিতে এসেছে। আরও ভাবলাম, (বেশী ভাবাটাও বাঙালিরই স্বভাব। বাঙালি স্বভাবতই ভাবুক জাতি।) সদ্য প্রাক্তন বিক্রেতা এবার তার পণ্যের গুনবত্ত্বা নিয়ে সারবত্ত্বা সম্পন্ন বক্তৃতা দেবেন টেবেন।

কিন্তু স্মার্ট ছেলেটি সে সব কিছুই করল না। অম্লানবদনে উত্তর দিল, “আমার তো দুটো বিয়ে কি না, দুটো সংসার চালাতে হয়, তাই…”

জীবনযুদ্ধে জর্জরিত বা অপাপবিদ্ধ যেই হন না কেন আপনারাই বলুন, এর পর আর কোনো কথা চলে?
আমিও আর কিছু ভাবি নি… এবং যে সকল পুরুষ, সম্ভাবনার কথা ভেবে পুলকিত হচ্ছেন তাদের বলে রাখি, মহিলারা কিন্তু কোনো অংশে কমতি নন অতএব… এবং মহিলারা যাঁরা হাতের কাছে উদাহরণ না পেয়ে দ্রৌপদীর স্মরণাপন্ন হচ্ছেন তাদেরও বলে রাখি, দ্রৌপদীর কিন্তু স্বেচ্ছা বা স্বেচ্ছাচারের জায়গা ছিল না… একদল কামুক এবং একজন উদাসীন প্রেমিকের প্রেমে পরে সমাজাচারই তাঁকে উদাহরণের দলে এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ত্ব বানিয়ে ছেড়েছিল। সারা জীবন একজনকেই ভালবেসেছিলেন তিনি। ভীমের অফুরাণ ভালোবাসা সত্ত্বেও সেই উদাসীন প্রেমিককে কখনই ফেলে দিতে পারেন নি। শা… অর্জুন কি আঁখ! চললাম, ভালো থাকবেন।