(১৬৭)


আমি ভিক্ষা দিই না। কোন স্পষ্ট লজিক নেই। কিন্তু দিই না। হয়তো মানুষকে কর্মক্ষম দেখতে ভালো লাগে বা অভ্যাস খারাপ করতে দিতে চাই না ইত্যাদি কিছু হবে। অথবা এই যে রাজধানীর রেডলাইটে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে কিছু দেহাতি মহিলা ঘোরাঘুরি করে তারা মাদারি নাকি অন্য কিছু? কয়েকটা বাচ্চা সং সেজে ডিগবাজী কলাবাজী দেখায় আর চুলে লম্বা বিনুনি বেঁধে টাঁই টাঁই করে ঘোরাতে থাকে। বা কয়েকটা বাচ্চা একটা নোংরা কাপড় নিয়ে এসে গাড়ির এখানে ওখানে একটু মুছে দেয়। এরা কারা? কোথা থেকে আসে? শহরবাসী আমরা শুধু সন্দেহ নিয়েই তাকিয়ে থাকি। আর দেখি যে রাজধানীর ক্রমবর্ধমান ফ্লাইওভারগুলি ঠিক নিচে, কাঠের চুল্লি আর পোড়া হাঁড়ি দিয়ে নিশ্চিন্তে সংসার পেতেছে। দশ ফুট বাই দশ ফুটের গণ্ডিটাও তাদের জন্য নেই।

সন্ধ্যা হলেই সন্দেহ বেড়ে যায়। দেহব্যবসা অথবা রাহাজানি। সন্দেহের তীর এদিকেই ঘুরতে থাকে। মাথায় জট, চোখে পিচুটি আর নাকে পোঁটাওলা শৈশবের পরেই এসে হাজির হয় অপুষ্টির যৌবন বা অপক্ক বার্ধক্য। আকাশের দিকে তীর ছুঁড়ে দিয়ে, পৃথিবীর বুকে রুক্ষ পদক্ষেপ ফেলে জীবন কেটে যায়। আদমসুমারি আর আচ্ছে দিন, সরকারি সাহায্য আর গরিবী হটাওয়ের ইমেজে এরা বড় বড় ছোপ। পুলিশ আর সমাজবিরোধীদের সঙ্গে নিত্য হিসেবে নিত্য যাপন। এরাই হল সেই সব মুখ যাদেরকে লুকিয়ে রেখে আমরা আধুনিক ভারতের ছবি তুলে ধরছি বিশ্বপিতার কাছে।

সে যাই হোক, সেই সব লজ্জাই হোক আর নিজেকে মুক্ত পৃথিবীর প্রতিভূ হিসাবে দেখার অভ্যাস থেকেই হোক। আমি ভিক্ষা দিই না। শুধু যখন কোন বয়স্ক লোককে দেখে মনটা উদ্বেল হয়ে ওঠে যাদের সত্যিই হয়তো করার কিছু নেই, সেখানে হাতটা আপনিই পকেটের দিকে চলে যায়। আর নিজের অপারগম্যতায় মাথা নিচু হতে থাকে।

কদিন আগে রবিবার, আইটিও থেকে মানদই হাউসের দিকে গাড়ি ঘোরাবার আগেই দেখলাম এক আপাত অন্তঃসত্ত্বাকে। সেই দেহাতি রূপ আর তার সঙ্গে আরও জনা চারেক কম বেশী বয়সের মহিলা। এরা হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য সাহায্য চাইছে। কিন্তু আমরা শহুরেরা এখন অভিজ্ঞ হয়ে গেছি। সব জানি এর পিছনের গল্প। কিছুদূর নিয়ে গিয়ে যা নয় তাই হয়ে যেতে পারে। পেটের থেকে বেরিয়ে পড়তে পারে পিস্তল অথবা অন্য কোন প্রাণহানি অস্ত্র।

কিন্তু মজার ব্যাপারটা হল, গাড়িটা ঘুরতেই দেখি একদল পুলিশ দাঁড়িয়ে, লালবাতি টপকানোদের জন্য টোপ ফেলে বসে আছে। গল্পটা কেমন যেন ইয়ে লাগল! মানে মেয়েটি যদি সত্যিই অন্তঃসত্ত্বা হয়, তাহলে তো তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো উচিত। আর না হলে শ্রীঘরে।

তাড়া ছিল কিন্তু তাও গাড়িটা থামিয়ে মুখ বার করলাম। দিল্লিতে পুলুশ এসব ব্যাপারে খুব হেল্পফুল। জানে কি জানে না কিন্তু ঠিক দিক দেখিয়ে দিতে ছাড়ে না। বললাম ব্যাপারটা- ব্যাস যেন চোর ধরা পড়েছে এমন মুখ করে বিগলিত হাসি দিয়ে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা দেখতা হুঁ!” যেন আকাশ থেকে বিষ্ণু দেবতা বরাভয় মূর্তি নিয়ে বিশ্বরূপ দর্শন দিচ্ছেন। কিন্তু ঐ যে বললাম ট্যাম। ট্যামই নেহি থা না! তাই নাগরিক কর্তব্যকে নীলটুপিধারীর হাতে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে চললাম পিছনের দিকে না তাকিয়ে। জানি একবার বলায় কিছু হবে না, আর বারবার বলায় হয় তো সেদিনের জন্য ভাত মারা যাবে চৌর্যোপজীবিনীদের।

তবে সব গল্পগুলো ঘেঁটেঘুঁটে গেল কালকে। মানে আমি নিজে আত্মপ্রচারকে খুব একটা পছন্দ না করলেও, এই রোগটা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নই। কোথায় কখন যেন কোন সূক্ষ্ম গণ্ডিটা পেরিয়ে চলে যাই আর রাবণ রূপ ধারণ করে ফেলি, তার হিসাব রাখতে পারি না। তবুও বলছি জানেন।
কাল রাতে পার্শ্ববর্তিনী আর মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। ফর আ চেঞ্জ মেয়েটা আমার পাশের সিটে বসে। সামনেই লালবাতি আর লালবাতি পেরোলেই গাজীয়াবাদে ঢুকব। সামনে একটা এসইউভি। আর আমরা এদিক ওদিক হাবিজাবি বকে যাচ্ছি। যদি করবী ফুলগুলো টুপ করে গাছ থেকে পড়ত গাড়ির জানলার কাঁচ বেয়ে তাহলে রাতের বেলা ফুল পাড়ার কষ্ট থাকত না আর লাল গোলাপি ফুলগুলোও মেয়ের কানে ঠাঁই পেতো! এই সব।

তাকিয়ে দেখলাম লাল বাতির কাছেই দুটি বাচ্চা মেয়ে বেলুন বেচছে। হঠাৎ লাল আলো সবুজ হল আর দেখলাম আমার সামনে দাঁড়ানো গাড়িটা যেটা এগিয়ে গিয়ে গাজীয়াবাদে ঢুকবে তার ড্রাইভারটা হাত বাড়িয়ে যেটি দুটির মধ্যে ছোট সেই মেয়েটির হাত থেকে একটা বেলুন ছিনিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল গন্তব্যের দিকে।

পাঠক/ পাঠিকারা, আমরা তো মানুষ। সবার আগে মানুষ। চকচকে গাড়ি আর ঝকঝকে পোশাকের মোড়ক পেরিয়ে আমরা মানুষ। সামান্য সুকুমারবৃত্তিগুলো কি ষড়রিপুর অধীনে ফেলে রেখে দাঁত নখ বার করে ফেলতে পারি? মনুষ্যত্বের লেশ নিয়ে দুপায়ে হেঁটে যাবার সময় ‘আরে এ তো সামান্য ব্যাপার!’ এই কথাটা না বলে একটু মন নিয়ে ভাবতে পারব না? দাঁত নখ? তোমার মন নাই মানুষ?

হতবাক অবস্থার মধ্যেও এগিয়ে গেলাম গাড়িটা নিয়ে। হাপুস নয়নে কাঁদছে মেয়েটা। কাশছেও। তার দিদি তাকে বুকে জড়িয়ে বোঝাবার চেষ্টা করছে আর মাই বোধহয়, কোথা থেকে ছুটে এসেছে। মেয়ের কান্না থামেও না। পাঠক/ পাঠিকারা, আমরা সামান্য মানুষ! সারা পৃথিবীর সকলের দায়ভার নিই নি। কিন্তু ওই মুহুর্তে যেটা করতে পারলাম সেটা হল, বেলুনের দাম জিজ্ঞাসা করে দুটো দশটাকার নোট ধরালাম। একটা বেলুন নিজের মেয়ের হাতে দিলাম আর আরেকটা সেই অমানুষটার হয়ে ক্ষমা চেয়ে। মেয়েটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ওই দিদিটা বেলুন দিল? দিল হয় তো! হয়তো সমগ্র মানব জাতির পক্ষ থেকে একটা অক্ষম চেষ্টা মনুষ্যত্ব বাঁচিয়ে রাখার।

মাঝে মাঝে মনে হয় ফিসফাসটা ফিসফাস না হয়ে নিজের ঢাক নাম দিলেই হতো। এ তো শুধুমাত্র নিজের কথা বলা। এই করেছি সেই করেছি। বা হয় তো নিজেকে আয়নায় দেখা অথবা আপনাদের নিক্তিতে নিজেকে মেপে নেওয়া। সে যা হোক। মুখ্য হল মানুষ হওয়া। সবরকমভাবে তো হয়ে ওঠা হয় না। এই যেমন মোড় ঘুরে গাজীয়াবাদে ঢুকে যখন দেখলাম দুটো ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে আর তার কিছু দূরে সেই অলপ্পেয়ে এসইউভি। বিশ্বাস করুন হিরো হবার ইচ্ছে থাকলেও নেমে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারি নি তাদের। ঝামেলায় জড়াতে চাই নি বলেই। কিন্তু পার্শ্ববর্তিনী বা আমি কেউই হয়তো বাচ্চাটার কান্নাটা ভুলতে পারি নি। বেলুনটা বাড়িতে খেলতে খেলতে ফেটে গেল আধ ঘন্টার মধ্যেই। কিন্তু তাও বোধহয় অমানুষদের বুদবুদ ফাটল না। ক্ষণিকের মস্তিষ্কহীন ছ্যাবলামোই হয়ে রয়ে গেল মনুষ্যত্বের আলো আঁধারি ঘিরে।

আর আমাকেও ভাবতে বাধ্য করল সময়, ওই কিচ্ছু না পাওয়া লোকগুলোর কথা। যারা পুলিশের লাঠি আর সমাজবিরোধীদের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকে পরের দিনের সূর্যটাকে দেখার আশায়। সেটাও ঠিক করে দেখতে পায় কি না কে জানে?

Advertisements

(১৬৩)

 

উফফ কত্তদিন বাদে দেখা বলুন তো? কেমন আছেন পাঠক/ পাঠিকারা? এর মধ্যে গঙ্গা দিয়ে প্রচুর জল আর যমুনা দিয়ে প্রচুর অ্যাসিড বয়ে চলে গেল! চাঁদের রঙ নীল থেকে বদলাতে বদলাতে হলদেটে হয়ে গেল! আর দু চারটে পাকা চুল মাথায় গালে বংশ বৃদ্ধি করে ফেলল!

আমার খবর? তা খবর বলতে দুটো-
এক) সৃষ্টিসুখ প্রকাশন থেকে একটা গল্পের বই প্রকাশ পেল আমার। ‘ইয়র্কার এবং অন্যান্য গল্প’। দিল্লিতে পুজোয় আর কোলকাতায় বন্ধুদের সঙ্গে তার হইহই করে উন্মোচন হয়েও গেল মোড়ক।
দুই) অবসরে প্রকাশিত ফিসফাস কিচেন এখন কলেবর বাড়িয়ে বই আকারে আসতে চলেছে বইমেলায়!
সবই আপনাদের ভালোবাসা আর কি!

তা যাই হোক, আজ বেশী ফেনাব না! ছোট ছোট গল্পে এতকালের অদেখা যাপন কাটিয়ে নেব আপনাদের সঙ্গে। নম্বর টম্বরের দরকার নেই! কি বলেন?

গাড়িটাকে নিয়ে মাঝে খুব ভুগলাম জানেন! যদিও নব্বই হাজার কিলোমিটার সঙ্গ দিল! এখনও হাজার তিরিশ চল্লিশ আরামসে দিয়ে দেবে! কিন্তু নিজের গুরুত্ব বোঝাবার জন্য মাঝে মাঝেই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে! সেখানেই সমস্যা!

একদিন আইটিও ফ্লাইওভারের পরেই ক্লাচের তার কেটে বসল! আর যাই কোথা! ঠেলতে শুরু করলাম এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে। অভ্যাস নেই। কোন রকমে ঠেলতে ঠেলতে কিছুদূর যাবার পর দিলাম এক গাড়ির সাইডে ঠুকে। সে আমার সেই অবস্থাতেও বেরিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ করে বসল। লাও! ঠাণ্ডা গলায় বললাম, ‘দেখো জি! থককে চুর হো গয়া! ঝগড়া করনে কা একদম মুড নেহি হ্যায়! যাদা বোলোগে তো ও যো পাত্থর পড়া হুয়া হ্যায় আপকে সরপে বইঠা দুঙ্গা! সেও হেবিজোর ঘাবড়ে গিয়ে চেল্লামেল্লি লাগাল! আমি পাত্তা না দিয়ে চলতে শুরু করলাম।

দেড় কিমিটাক চলার পর এক অটো এগিয়ে এল সাহায্যের পা নিয়ে! ড্রাইভারটি একশোটি টাকার বিনিময়ে পা দিয়ে ঠেলে দেবে অটো চালাতে চালাতে! এইভাবে যদি কিছুদূর যাওয়া যায়! গেলামও! তিন কিমি দূরের এক মেকানিক শপের সামনে যখন পৌঁছলাম তখন বাজে সাড়ে ছটা। সেদিন আবার রিহার্সাল। পার্শ্ববর্তিনীকে বললাম ওলা বুলা লো! তার মধ্যে আবার টিপটিপ বারিশ! আর মেকানিক দেখে বলল, ওয়েল্ডিং খুলে গেছে, এখন লাগানো সম্ভব হবে না! লাও ঠ্যালা! অটোটাকেও ছেড়ে দিয়েছি!

কোন অটোই আর অ্যাটলাসের বোঝা বইতে রাজী হচ্ছে না! ক্রসরোড বলে এক দীনবন্ধু কোম্পানির মেম্বারশিপ নেওয়া আছে। যদি বিপদে আপদে সাহায্য করে! তা সে বলল রাত দশটার আগে গাড়ি টেনে নিয়ে যেতে আসবে না! সামনে এদিকে রেললাইনের নীচ দিয়ে যাবার জন্য আণ্ডারপাস। তারও আগে রাস্তা অর্ধেক তৈরী হয়েছে বলে বাঁ দিকে জল জমে আছে! যা থাকে কপালে! ঠেলা লাগালাম। গত আড়াই ঘন্টায় গাড়ি ঠেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ঠিক কায়দা করে জলের উপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে আমি নিজে শুকনোর উপর দিয়ে হেঁটে এলাম। বৃষ্টি তখন থেমেই গেছে। কিন্তু ভিজেই গেছি, ঘামে! তারপর ঢালে দাঁড়িয়ে গাড়ি ঠ্যালা দিয়ে ঠনঠনে হাঁটু নিয়েই লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিতেই গিয়ারে ফেলা গেল! যাক বাবা, বলে আণ্ডারপাস প্রায় পেরিয়ে এনেছি ও বাবা সামনে গাড়ির জ্যাম দেকে উল্টো ঢালেই গেল গাড়ি বন্ধ হয়ে। মাঝ রাস্তায় ব্রেক মেরে চুপচাপ বসে আছি। পিছনে ভঁকভঁক হর্ণ পড়ছে গাড়ির লাইন! কিন্তু বেরব কি করে? ব্রেক থেকে পা সরালেই গাড়ি হড়কাবে পিছনের দিকে। হ্যাণ্ডব্রেকে কাজ হবে না! যাই হোক কয়েকজন অটোওলা ছিল কাছাকাছিই তাড়া ছুটে এসে ধরল পিছনের দিকে তারপর ধাক্কা দিয়ে দিল। আর গাড়িও গিয়ারে মেরে চালু করে দিলাম।

বেশী না, আধ কিমি! তারপরেই রেডলাইট। যাই হোক এগোতে শুরু করলাম। গলির দিকে! সামনে একটা গাড়ি রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়িতে নটা বেজে গেছে। অনুরোধ করতে গেলাম গাড়ি সরাবার। জ্ঞান দিয়ে বসল, অ্যা্যসে থোড়ি হোতা হ্যায়! আপ টো করওয়ানে গাড়ি বুলালো ইত্যাদি! যাই হোক। কোন রকমে ম্যানেজ করে গলির মধ্যে ঢুকতে হেল্প জুটে গেল। পৌনে দশটায় গলির মুখে আরেকটা ঢালে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করলাম এক ঠ্যালা মারুন! দিয়েও দিল! ব্যাস আর দেড়শো মিটার ভোঁ ভাঁ হর্ণ দিয়ে পৌঁছে গেলাম বাড়ির কাছে। তারপর রিহার্সাল (মিউজিক রিহার্সাল ছিল) দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পরের দিন গাড়ি সারিয়ে।

তা বেশ ছিল। সার্ভিসিং করাব করাব ভাবছি তার আগে শনিবার গ্রেটার নয়ডার স্কুল থেকে ছেলেকে আনতে যাচ্ছি। বেশি না, বাড়ি থেকে ৪৫ কিমি। নয়ডার মহামায়া ফ্লাইওভারের পর আরও পঁচিশ। তা মহামায়া ফ্লাইওভার পেরিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে পড়তেই ফটাং করে আওয়াজ! ক্লাচ গায়েব! লাও ঠ্যালা! ভাগ্যিস গাড়ি ফোর্থ গিয়ারে। আমি ক্লাচ ছাড়াই গাড়ি ষাট-আশি গতিতে চালাচ্ছি, বন্ধুকে ফোন করলাম, গ্রেটার নয়ডায় থাকে গাড়ির ঘাঁট ঘোঁট জানে। বলল পঁচিশ কিমির শেষে এক মার্কেটে মেকানিক আছে! গাড়ি টো করতেও পারবে! আমি বললাম আমি মাথা ঠাণ্ডা করে চালাচ্ছি, কোথাও থামব না! বড় কিছু ঝামেলা না হলে পৌঁছিয়েও যাব সেই অব্ধি! কিন্তু তারপরেই দরকার। তো ফোন করে দিলাম। আর আধ ঘন্টা ক্লাচ ছাড়াই কায়দা করে চালিয়ে পৌঁছেও গেলাম। সে অপেক্ষাতেই ছিল। কাদির নাম তার! যত্ন করে ঠিক ঠাক করে দিল। আর পরদিন বাড়ি ফিরেই দিয়ে দিলাম সার্ভিসিং করাতে।

তারপর আর কি! দিন দুয়েকের মধ্যেই “মেরে পেয়ারে দেশবাসীও কাল কুছ যাদাই হো গয়া থাআআ!” ব্যাস গেলো কাণ্ড। পরের দিন গাড়ির ফাইনাল সার্ভিসিং করিয়ে পেমেন্ট করব বলে ব্যাঙ্ক থেকে পাঁচ হাজার ছশো টাকা তুলতে গেছিলাম সেই সন্ধ্যাতেই! তা এটিএম ব্যাটা বলে পঞ্চাশ আর একশো নেই! এগারোটা পাঁচশোর নোট। তার মধ্যে বাজারটাজার করতে একটা চলেই গেছে। ব্যাস হাতে পৌনে চারশো টাকা আর দশটা পাঁচশোর নোট। আমি পথে! তা যা হোক, অনেক ঘাতপ্রতিঘাতের পর নিজেকে শিখিয়েছি যাই হোক বিচলিত হব না! তা পথ পেয়েও যাচ্ছি। দুটো বড় নোট একটু বেশী সব্জি কিনে ভাঙিয়ে ফেললাম। আর তারপর ব্যাঙ্কে দাঁড়িয়ে বার দুয়েক টাকাও তুলে ফেলেছি অচল আটটি পাঁচশো ফেরত দিয়ে। সময় যাচ্ছে বটে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে মজাও হচ্ছে। দুঃখও হচ্ছে। মানব জীবন দেখতে পাচ্ছি যেমন তেমন।

বয়স্ক এবং বিকলাঙ্গদের জায়গা করে দেবার ব্যাপারে দিল্লি অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে মহিলাদের প্রতি ব্যবহারে আবার লাইনেই আসে না। এক ভদ্রমহিলা, সন্তান কোলে আমার দু তিন জনের পিছনে ছিলেন বলে প্রথম দিকে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে অনুরোধ করতে গেলাম। সে বলে খাড়ে রহনে দো! লাও! মনে হচ্ছিল ব্যাটাকে এটিএম-এর মেশিনে ঢুকে পিস পিস করে দিই। কিন্তু মানবজাতি এখন অনেক সভ্য হয়ে গেছে। ভদ্র হয়ে গেছে। এখন আমরা কাউকে বিপন্ন দেখলে ছুটে গিয়ে সাহায্য করি না, রাস্তায় আহত কাউকে দেখলে পাস কাটিয়ে চলে যাই, আর তেড়ে সরকারকে গালাগাল দিই কাজ করার বা না করার জন্য! তাই স্বগতোক্তি করেই রাগ ছাঁটাই করতে হয়। সেইভাবেই আছি। খরচ কমিয়ে হিসাব কষে বেশ ভালোই আছি! বেচাল দেখলে লাফিয়ে পড়ে প্রতিবাদ করে প্রতিকার করার চেষ্টা করি। শুধু জিগির তুলেই ঢেঁকুরের মিঠা স্বাদ গ্রহণ করি না। অসুবিধাকে অসুবিধা বলে না দেখে চ্যালেঞ্জ ধরে নিয়ে হার্ডলস পেরিয়ে যাবার আনন্দ অনুভব করি! ব্যাস এই তো জীবন কালী দা!

তা তার মধ্যেই এক দুটো জোকস আর একটা সত্যি ঘটনা শুনতে পাই। যে বাড়িতে বিয়ে (এটা বলতে আমরা এখনও যে কেন মেয়ের বাড়ি বুঝি কে জানে!) সে বাড়ির একজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশিকা মেনে ব্যাঙ্কে গিয়ে আড়াই লাখ টাকা দাবি করেছেন। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার যতই বলছেন যে আপনার অ্যাকাউন্টে অত টাকাই নেই! কে শোনে কার কথা!

আর এটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক- আমার পরিচিত এক ঘটি বাঙালকে বিয়ে করেছিলেন। মানে এখনও বিবাহিত আছেন কিন্তু করেছিলেন গত শতাব্দীতে। তা বাঙাল ভদ্রলোক আবার প্রবাসী, মানে চেন্নাইতে বড় হয়েছেন। সব বাংলা গান রবীন্দ্রসঙ্গীত পল্লিগীতি ব্যান্ডের গানটান শোনেন নি। তা মহিলা দরদ দিয়ে গাইছিলেন, ‘রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে, দিনের শেষে…’ আর ভদ্রলোক ইনভ্যারিয়েবলি শুনেছেন বাঙাল! আর যায় কোথা! নতুন বিয়ে ভেঙে যাবার উপক্রম হয়েছিল। বাঙালকে জাত তুলকে খোঁটা? তা সে বিয়ে টিকে গেছে সে যাত্রা, কিন্তু সঙ্গে দিয়ে গেছে এই টাইমলেস গল্পগুলোকে!

আমাদের প্রত্যেকের জীবনই তো এক ঝুড়ি গল্পের কথামালা! এতো আনন্দ রাখি কোথায় বলুন তো? কেন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে! সরকার তো আনন্দেরও হিসাব রাখতে শুরু করেছে। আমেন!

(১৫৪)


কয়েকদিন আগেই টম হ্যাঙ্কসের হোস্টেজ ড্রামা ক্যাপ্টেন ফিলিপ দেখছিলাম। ভারত মহাসাগরে সোমালিয় জলদস্যুদের কবলে পড়ে ক্যাপ্টেন ফিলিপ্স ও তার জাহাজ। তার পর তার থেকে কিভাবে মুক্তি পায় ইত্যাদি! অসম্ভব সুন্দর অভিনয়ে যেন চোখের সামনে ঘটে চলেছে ঘটনাগুলি। তার শেষ দৃশ্য ছিল মুক্তি পাবার পরেও ট্রমাকবলিত টম হ্যাঙ্কসের অনবদ্য অভিনয়। সহজ থাকার চেষ্টা করেও পারছেন না! ট্রমা বা আতঙ্ক! যদিও ট্রমার বৃহত্তর অর্থ বাংলা ভাষায় বোঝানো সম্ভব হয় না! তবু দুর্ঘটনা বা অঘটন সম্পর্কিত ট্রমা আমরা বৈদ্যুতিন মাধ্যমের দৌলতে অহরহ দেখতে পাচ্ছি! দুর্ঘটনা কবলিত প্রিয়জন হারানো রাজধানীর যাত্রীর মুখ থেকে টিভি সাংবাদিকদের দৌলতে তাৎক্ষনিক অনুভূতিও জেনে নিতে পারছি। জানতে পারছি, পেটের দায়ে মানুষের জন্তু হয়ে যাবার, অসংবেদনশীল হয়ে যাবার গল্পও।

পাঠক/ পাঠিকারা, নিজের ঢাক পেটানোর মতো চওড়া বুক যে একেবারেই নেই তা বলব না। কিন্তু মধ্যবিত্ত মানসিকতায় চক্ষুলজ্জাটা কোথাও যেন এখনো আলগা ব্যাণ্ডএইডের মতো ঝুলে রয়েছে। তাই ভেবেছিলাম চেপে যাব। কিন্তু ফিসফাস তো আপনাদের আর আমার মধ্যে সুগম চলাচলের পথ। প্রিয়জনকে আমার নিজের মনের ভাব বোঝাবার সহজ মাধ্যম। যেখানে একান্ত ব্যক্তিগত এবং এহবাহ্য অভিজ্ঞতাগুলি ছাড়া সবই ভাগ করে নেওয়া হয়। পর্দা নেই কোন। তাই খুলে বলতে এলাম আর গৌরচন্দ্রিকা করলাম।

বছর দশেক আগে এক মে মাসের সকালে অফিস যাবার পথে এক পেট্রোল পাম্পের সামনে সদ্য ফেলে যাওয়া পেট্রোলে হড়কে গিয়ে ভয়ানক দুর্ঘটনায় পা উলটে পড়ে হাঁটুর সাড়ে চৌদ্দটা বাজিয়ে ফেলেছিলাম। তখন এক সহৃদয় ব্যবসায়ী আমায় গাড়িতে তুলে শক্করপুরের নিজের দোকানে নিয়ে গিয়ে কোল্ড ড্রিংক্স আর বিস্কুট খাইয়ে পেনকিলার খাইয়ে তারপর কোলে করে সেকেন্ড ফ্লোরে তুলে দিয়ে যান। সেই কথা ভুলি কেমন করে?

তার আগে বা পরেও কেমন করে জানি না, অযাচিত সাহায্য এই মানুষজনের কাছ থেকেই পেয়ে এসেছি। যাদের স্বার্থপরতার কথা আজ সর্বজনবিদিত। আমিও যে সম্মুখীন হই নি তা নয়। এই যেমন ধরুন, উলটো দিক থেকে এক রিক্সা এসে আমার গাড়িতে মেরে উলটে পড়ে যায় পাসে রাখা এক হণ্ডা সিটির উপর, তাতে সামান্য টাল খেয়ে যায় আর আমার গাড়ির হেডলাইট ভেঙে যায়। কিন্তু হণ্ডা সিটির মালিক আমার কাছ থেকে, সাড়ে চারশ (সারাবার খরচ) আদায় করে ছাড়ে। অথবা সেই দশ বছরের পুরনো চোটে আবার লাগার পরে অনুরোধ করা সত্ত্বেও কেউ স্কুটার চালু করে দিতে রাজী না হওয়ায় (তার মাস দুয়েক পরেই), প্রবল বৃষ্টির মধ্যে হ্যান্ড ব্রেকের সাহায্যে পা সোজা রেখে প্রচণ্ড ভিজতে ভিজতে বাড়ি এসে মনের শেষ জোরের বিন্দুটুকু দিয়ে গাড়ি স্ট্যান্ড করে হামাগুড়ি দিয়ে দুতলা চড়ার সময় কাউকে না পাওয়া! কিন্তু সে গুলো তো মামুলি ব্যাপার। এমনিতে কিন্তু উপরওলা বা সহযাত্রীদের কেউ না কেউ কখনো না কখনো সাহায্য করতে উপস্থিত হয়েইছে।

তা আমার সুযোগ এলে কি বিবাগী বৈরাগীর মতো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যাব? নাকি বিপদ বাঁধা দূরে ফেলে ঝড়ের রাতে দামোদরে ঝাঁপিয়ে পড়ব? স্যার হিরো হতে পারব না! কিন্তু মানুষ হওয়া থেকে কে আটকাবে!

দিল্লিতে জম্পেশ ঠাণ্ডা এদ্দিন পরে পড়েছে। না হলে চুল না ভিজিয়েই শীত সাঁতরে পাড়ে উঠে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ কি মনে হওয়ায় মাঝ দরিয়ায় ডুব দিয়েছে। ভালই হয়েছে! শীতকালে শীত না পড়লে তো গরমকালে গরমের চোটে চামড়া খুলে যাবার জোগাড় হবে। তা সক্কাল সক্কাল অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি, থার্মোমিটারের পারদ বলছে সাড়ে তিন। গাজীপুরের মোড়টা ঘুরতেই দেখি জটলা, পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখি একটা লোক সটান মাটিতে লম্বা হয়ে আছে আর বাকি পথচিকিতসকরা তার নিরীক্ষণ করে চলেছে। গাড়িটা থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, একজন এগিয়ে এসে বলল, “আগর হো সকে তো মদত কর দো!” মদত কর দো মানে? আমাদের জীবনই তো পরের জন্য উচ্ছুজ্ঞ করা হয়েছে। আহা এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে? গাড়ি খুলে দিলাম, বললাম কাউকে কিন্তু বসতে হবে সঙ্গে! ওবাবা যে ছেলেটির বাইকে সেই পড়ে থাকা লোকটির সাইকেল ঠোকাঠুকি হয়েছে তাকে ধরে বেঁধে লোকে এগিয়ে দিল। সে তো দেখি ভয়েই সিঁটিয়ে আছে। “জান বুঝকে নেহি মারা! উনহোনেই আগে চলে আয়ে মেরে উপর!” বিশ্বাসযোগ্য বয়ান বটে। কিন্তু একে নিয়ে তো যাওয়া যাবে না! যদি কেটে পড়ে?

অবশ্য কেটে পড়ার হলে সে আগেই পড়ত। তা না করে এগিয়ে এসে বাঁশ নিজেই নিয়েছে! অতএব উটকে কাঁটা বেছে খাওয়ানোর দায়িত্বও তো আমার উপর! ততক্ষণে ১০০-য় ফোন করায় পিসিআর ভ্যান চলে এসেছে। তা তার মধ্যে থেকে একজনকে বললাম যে আমার গাড়িতে বসে মুমুর্ষুর মাথা সোজা করে ধরে থাকতে। তিনি এদিকে হাঁটতে না পারলেও লোকজন জবরদস্তি করে মাথা চেপে হাঁটু টিপে ধরে প্যাকেট করে ঢুকিয়ে দিয়েছে পিছনের সিটে। কিন্তু নাক দিয়ে রক্তর আভা যেন? পিসিআরের পিছনে পিছনে গাড়ি চলতে লাগল। কিছু দূরেই কল্যাণপুরিতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হাসপাতাল। তার ট্রমা সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি স্ট্রেচার আছে কিন্তু ঠেলে আনার কেউ নেই! অগত্যা দুজন পুলিশ আর বাইক চালকের মদতে আহতকে স্ট্রেচারে বসানোর চেষ্টা শুরু হল। ভদ্রলোকের অর্ধেক জ্ঞান হয়েছে। কিছুতেই তিনি নামবেন না গাড়ি থেকে। এদিক দিয়ে নামাতে যাই তো ওদিকে চলে যায় আর ওদিকে গেলে এদিকে! শেষে দুটো তাগড়া কেঁদো বাঘা পুলিশ (দুটোরই বাড়ি কালিকট! আজব কেস! সুদূর কেরালা থেকে দিল্লি এসে দিল্লি পুলিশের চাকরি করছে! যেন কালিকটে কাটাকাটি হয়ই না!) তাকে টেনে নামিয়ে হাঁটিয়ে নিয়েই ভিতরে চলে গেল। তার পিছন পিছন আমি আর বাইক আরোহী গেল।

বাইক আরোহীর নিজেরও চোট লেগেছে। কিন্তু সে পুলিশ কেসের ভয়েই আধমরা! আমি অভয় দিলাম! “আছি তো!” যাই হোক ভিতরে আরেক কেস। ট্রমা সেন্টারে মধ্যে আমরা কেস লেখাচ্ছি আর তার মধ্যেই এক কনস্টেবল একটি কিঞ্চিত অপ্রকৃতস্থ চ্যাংড়াকে ফটাফট থাপ্পড় মেরে চিৎকার করে বলছে, “আবে ইয়ে হসপিটাল হ্যায়! তু চুপ হো যা! নেহি তো মারা যায়গা!” কি অদ্ভুত সমাপতন।

যাই হোক আহতের পকেট থেকে আমার উপস্থিতিতে পুলিশ পকেটমারি করে মোবাইল পার্স এগারোশো টাকা আর আইকার্ড বার করল। এনডিএমসিতে চাকুরী করেন হন্সরাজ রাই। বাড়ি নাকি কাছেই খেড়া গ্রামে! মোবাইল ঘেঁটে ছেলে বা কাউকে একটা ফোন করা হল। তুলল না কেউ! তারপর নম্বর ঘেঁটে মনুকি মাম্মি কে ফোন করে বোঝালাম কেসটা! বারবার বলতে হল এমন কিচ্ছু হয় নি! এদিকে বাইক চালক পঙ্কজেরও মাথা ঘুরতে লেগেছে! তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা করে দেওয়া হল। আবার ফোন এল! এবার মনুর ফোন! তাকে পরিষ্কার করে বলতেই সে একগাদা ধন্যবাদ দিল!

ওদিকে থাপ্পড় খাওয়া চ্যাংড়াটা মিনমিন করে বলার চেষ্টা করছে যে সে গান্ধীবাবার শিষ্য! মারধর তো দূরের কথা কোনদিন অসাবধানে পিঁপড়ে চাপাও দেয় নি! কিন্তু তার বিপরীত দিকের লোকটা তার ভাঙা চশমা আর ফুলে যাওয়া গাল নিয়ে তার বক্তব্যের অসাড়তা প্রমাণ করতে তৎপর। কে যে ট্রমাগ্রস্ত তাই বোঝা মুশকিল।

যাই হোক পুলিশকে নিজের নম্বর, পঙ্কজকে বরাভয় এবং মনুকে আশ্বাস দিয়ে অফিস পৌঁছলাম। মনের ভিতর কোথাও একটা চাপা আনন্দ কাজ করছিল। ভাল কিছু করার আনন্দ! ভেবেছিলাম নিজের মনেই চেপে যাব!

কিন্তু তা হতে দিল না খান সাতেক ফোন। তিনটে ফোন এল মনুর কাছ থেকে। প্রথমে জানতে চাইল কি ভাবে দুর্ঘটনা ঘটল! বাইকওলার দোষ ছিল কি না! বাইকওলা কি পালিয়ে গেছে? হন্সরাজ ইতিমধ্যেই বড় হসপিটালে চলে গেছেন। তাঁর মাথায় আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং বিপদসীমার বাইরে নয়! হাঁটাচলা চেনাশোনা সব হচ্ছে কিন্তু কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে।

শেষে আমায় মনু ফোন করে জিজ্ঞাসা করল বাবার ফোন এবং অন্যান্য জিনিসের কথা! পুলিশের কাছ থেকে কি ভাবে উদ্ধার (?) করা যাবে! আর পুলিশ সেখানে টাকা পয়সা দাবী করবে কি না! তাকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে আমি আছি! কিছু হলে আমি আছি!

এর পর এলো পঙ্কজের ফোন। তাকে ছাড়তে ছাড়তে বিকেল করে দিয়েছে! তার তাও ভয় রয়েছে! কেস খেয়ে যাবার ভয়! তাকেও আশ্বস্ত করলাম! শেষে তার ভিতরকার মনুষ্যত্বের ঝলক দেখলাম মনুর নম্বর চাইবার মধ্যে! নাকি মনুকে আগে থেকে ম্যানেজ করতে চাইছে? যাই হোক মনুকে আমি ইতিমধ্যেই বলেছি কারুর দোষ নয় আগে বাবাকে বাঁচাও! একেও বললাম! পুলিশ ফোন করলে তো আমি আছিই!

তা পুলিশ ফোন করল, খুব রোয়াব নিয়ে শুরু করলেও আমার অবিচল এবং শান্ত গলায় হয়তো কিছুটা অন্যরকম মনে হয়েছিল। শেষ করল খুব সম্ভ্রম নিয়ে! “স্যার জরুরত পড়েগি তো হাম দুবারা আপ কো কষ্ট দেঙ্গে!” ততক্ষণে নিশ্চিত হয়ে গেছি যে মনুর মানিব্যাগ পেতে আর পঙ্কজের ফালতু কেস না খেতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না!

যাই হোক কোথাও একটু নিজের জন্যও ভাল্লাগা এসে ঘর বাঁধল! তাই লজ্জা লজ্জা মুখে আপনাদের বললাম! তবে আরেকটা কারণও আছে! কোথাও যদি পাঁচ ফুট এগারোর সামান্য ভারী চেহারার একটা মানুষকে লাল গাড়ি বা কালো বাইকে দেখেন যে পথে ঘাটে মাটির গন্ধ নিচ্ছে। দয়া করে এগিয়ে আসবেন! মুখটা তো চেনেনই! না চিনলে নিচে দেখে নিন প্লিজঃ
12557157_1017542314970722_1308047321_o

ওই যে বাম দিকের চোঙা হাতে লোকটা! ঐটাই আর কি!

(১৫৩)

পাঠক/ পাঠিকারা, বুইলেন, আইডিয়ালি এই পোস্টটা চলে আসার কথা ছিল সেই ৪ঠা জানুয়ারিতেই। কিন্তু এখন মাথায় পাকাচুলের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ধৈর্যও বেড়েছে বটে। তাই মনে হয়েছিল, আগে শেষ দেখি তারপর না হয়…

তা সেই জানুয়ারিস্য প্রথম প্রভাতে অচেনা দিল্লির কনকনানোহীন ঠাণ্ডার মধ্যে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েই চমকে গেলাম। আরে ওয়াহ এ রাস্তা তো চিনি না বাপ। ছ্যার ছ্যার করে ফোর্থ গিয়ার ফিফথ গিয়ারে গাড়ি গড়াচ্ছে। ফার্স্ট গ্রিয়ার, ক্লাচ, ব্রেক-এর জটিল সমাস নেই। নেই সময়ে অফিস পৌঁছোবার দফারফা অবস্থা। কি ব্যাপার? না অরবিন্দ কেজরিওয়াল বাবু দিল্লিতে ডিক্লেয়ার করেছেন যে বায়ুদূষণ কমাবার জন্য জোড় বিজোড়ের অঙ্ক কষে গাড়ি নামাতে হবে।
জোড়ের দিনে জোড়ের গাড়ি আর বিজোড়ের দিনে বিজোড়। আর অন্য দিনে? বাকি সব মেরে পিছে আও! মানে জোড় না থাকলে জোড়ের দিনে আস্তে লেডিজ! মেট্রো আর বাস আছে! স্কুল বন্ধ তো স্কুল বাস আছে! ধোঁয়া ওঠা সকালে ধোঁয়া ওঠা এক্সহস্টে তা দিয়ে বাড়তি দাম চাওয়া অটো আছে! কিন্তু নিজের গাড়ি নেই!

তা মেট্রো বা বাস তো আছে নিজের জায়গায়! কিন্তু লোক ঠাসার বহরের তো শেষ নেই! একদিন বিকেলে বউকে গোবিন্দপুরি মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে দিতে গিয়ে দেখি সিঁড়ি দিয়ে লাইন চালু হয়েছে। থাক বাবা! তুমি অটোতেই যাও! বেশি টাকা চাইলেও যাও! নইলে যদি জোড় বিজোড়ের চক্করে বউটাই হারিয়ে যায়? কেলেঙ্কারির শেষ থাকবা না!

যাই হোক। খিল্লি বন্ধ হোক! মূল মুদ্দায় ফিরে আসি! আসল কথা হল দূষণ বা পলিউশন! সেটা কি ভাবে কমানো যায়? বায়ু দূষণ, জল দূষণ, শব্দ দূষণ, আলোক দূষণ। সমস্ত কিছুর চক্করে আমরা তো কোন রকমে টেনেটুনে ম্যানেজ ট্যানেজ করে শেষের সেই দিনটাকে ইলাস্টিকের মতো টানটান করে রেখে দিয়েছি। কিন্তু তারপর? আমাদের সন্তান সন্ততিরা? তাদের পর? বা আরও তাদের পর? দুঃখিত পাঠক পাঠিকারা, আরও তাদের পরটা সত্যিই ঝাপ্সা! এই পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করার বদলে আমরা উত্তরাধিকারে রেখে যাব ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ফুসফুস আর আনুষাঙ্গিক রোগের ডিপোগুলোকে। আকাশটাই তো ছোট করে দিচ্ছি! তাহলে আর উড়বে কোন সাহসে তারা?

তো যাই হোক, হুড়মুড়ি প্রতিক্রিয়া (নি জার্ক রিঅ্যাকশন আর কি) বলে অরবিন্দ বাবুকে যতই হ্যাটা করি না কেন, কোন না কোন ভাবে আমাদেরও কিন্তু ভাবতে হবে এই বিষয়ে। মনে আছে সিএনজি বাস করার জন্য শীলা দীক্ষিতকে কতটা বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। সেই তুলনায় আজ পরিস্থিতি অনেক বেশি ঘোরালো! নিঃশ্বাসে বিষ ঢুকে ফুসফুস হৃদয় ফুটিফাটা করে দিচ্ছে।

কিন্তু দিল্লির মানুষও তো পাল্টেছে! গতবছরেই রেকর্ড মার্জিনে (আমার এখনও যেন বিশ্বাস হয় না!) কেজরিকে জিতিয়ে এনেছে, চোখে রঙিন চশমা পরে। আর নিত্ত নৈমিত্তিক নাটকগুলিকেও বড়ভাইয়ের স্নেহ নিয়ে সহ্য করছে। কেন? কেন না পরিবর্তন সবাই চায়! সময় সবাই চায়! একটু অন্য ভাবে পৃথিবীটাকে দেখার! তাই তো সিংহভাগ সফরকারী বিনাবাক্যব্যয়ে নিয়ম মেনে পথে নেমেছে! আর যারা মানছে না? বাবু ২০০০ টাকা গ্যাঁট গচ্চা দিয়ে গাড়ি চালাও! তা দিল্লির মানুষের কাছে টাকার অভাব নাকি? ধুস ২০০০ তো কড়ে আঙুলের ময়লারও সমান নয়!

কিন্তু যাদের দেবার ক্ষমতা নেই? এই যেমন আমি! প্রায় দেড় বছর পর লজঝড়ে বাইকটাকে সার্ভিস করিয়ে চকচকে করিয়ে মাঠে নেমেছি! আরিত্তারা কি তার অভিমান! কি তার আওয়াজ! চেন তো ঘটাং ঘটাং করছেই গিয়ার চেঞ্জ করতে গিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করছে হ্যান্ডেল ঠন ঠন দাঁত কনকন! কিন্তু বয়সটাও যেন এক ঝটকায় কমে গেল দশ বছর! বাইক চেপে জ্যাকেট পরে সানগ্লাস চাপিয়ে শীতের সকালে অফিস তো মুড়কি চিবোবার আগেই পৌঁছে যাচ্ছি। তার উপর মানানসই ঠাণ্ডাও পড়ে নি তেমন। আর পায় কে! তবে যেতে যেতে দেখলাম বাসস্ট্যাণ্ডে মানুষের ঢল রাস্তায় নেমে আসছে আর মেট্রোগুলোর কথা তো কহতব্য নয়!

তবে যে ঘটনাটা না বললেই নয় সেটা হল এক বামা গাড়ির ডানদিকে বসে জোড়ের দিন বিজোড় গাড়ি চালাচ্ছেন আর বাম দিকে এক বামাপদ! তা পুলিশের ব্যারিকেড আসতেই সে বামাপদ নিচু হয়ে সিটের নিচে সেঁধিয়ে গেল। আর মামণি দিব্যি মহিলা ড্রাইভারের সুবন্দোবস্ত নিয়ে গলে বেরিয়ে গেলেন! সিরিয়াসলি বলছি! নিয়ম থাকে তার ফাঁক ফোকর থাকে! ট্রেন বা সিনেমাহলে মহিলাদের অনেক পুরুষই এগিয়ে দেয় যাতে তারা গিয়ে টুক করে লাইন ভেঙে টিকিটখানি কেটে ফেলতে পারে! কিন্তু এ চীজ জিন্দেগিতে দেখতে পেতাম না যদি না অড ইভেনের এই উর্বর ধারণা দশাবতারের মস্তিষ্কে ধারণ না করতেন।

তার মাঝে কে আবার কোর্টে কেস ঠুকে দিয়েছে! এখন তো জনস্বার্থ মামলার হিড়িক পড়ে গেছে! ধোনির ভারত হারলেও জনস্বার্থ আর পাবলিক প্যাঁদালেও জনস্বার্থ! তা কোর্ট বাবাজিও জিজ্ঞাসা করলেন হ্যাঁ ভাই দূষণ বেড়েছে না কমেছে? একদম ইঞ্চিটেপ দিয়ে মাপতে হচ্ছে! হাফ ইঞ্চি বাড়লেও হই হই আর তিন ইঞ্চি কমলে তো কথাই নেই! লোকে মিষ্টি বিলোচ্ছে! কে যে ঠিক আর কে যে ভুল ছাতা বুঝতে বুঝতেই পনেরো দিন কেটে চলে গেল।

প্রথম দিন রাস্তা দিয়ে বিজোড় সংখ্যার গাড়ি চালাতে গিয়ে দেখলাম জোড় সংখ্যার গাড়িগুলো সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাবিয়ে চেয়ে দেখছে। সেই গল্পটা মনে পড়ে গেল! বাজে গল্প যদিও মানে জঙ্গলে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে জননাঙ্গ জমা রাখা হচ্ছে ব্যাঙ্কে পাঁচ বছরের জন্য টোকেনের বিনিময়ে। মনখারাপ নিয়ে এক বাঁদর হেঁটে যাচ্ছিল মাথা হেঁট করে। উপরে তাকিয়ে দেখে তিন চারটে বাঁদরী খিকখিক করে হাসছে। সে বাঁদর বলল, “এখন যত ইচ্ছে হেসে নে! আমি একটা হাতির টোকেন ঝেড়ে রেখে দিয়েছি!” ছিঃ বাজে কথা শুনবেন না, বলবেন না! দেখবেনও না!

নির্মল হাওয়ায় শ্বাস নিতে গিয়ে ঠিক ভরসা করতে পারলাম না যদিও! বাইক আর অটো আর ট্রাকের ধোঁয়া তো আগের মতই আছে! তবে পথ মাতার উপর বোঝা কমে গিয়েছে কদিনের জন্য! আর আবহাওয়াটাও বদলে গেল যেন, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মনোরম হেমন্তের পরিবেশ! ঠাণ্ডা পড়ল, জোড় বিজোড়ের রিপোর্ট কার্ড পেরিয়ে। তাও বেশি দিনের জন্য না! এই আসি এই যাই শীত, হঠাৎ গরম, ভুষভুষে ঘাম! দিল্লির আবহাওয়াটা পাল্টে যাওয়া বন্ধুর মতই অচেনা হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে!

তবুও আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি ক্ষতি কি! স্বপ্ন দেখতে তো ক্ষতি নেই! তবে একটু ভাবনা চিন্তা করে দেখা ভালো!। স্বপ্ন দেখি, দিল্লির চারপাশ দিয়ে বাইপাস তৈরী হয়েছে আর ধূলিধূসর ট্রাকগুলো শহরের বায়ু দূষিত না করে সেই রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে। ডিজেল প্যাসেঞ্জার গাড়ি ব্যান হয়ে গেছে। সরকার থেকে হাইব্রিড আর সিএনজি গাড়ির উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে! নিয়মিত দূষণ পরীক্ষা হচ্ছে! আর মানুষ জন নিজে থেকে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে, পৃথিবীর আয়ু বাড়াবার জন্য! আসলে উত্তরাধিকারের মধ্যে দিয়েই তো আমরা বেঁচে থাকি! আর এই সুন্দর পৃথিবীটা ছেড়ে যাব কোথায় বলুন তো! উত্তরাধিকারীরা তো এই পৃথিবীতেই খেলে পড়ে বড় হচ্ছে! চাঁদে বা মহাকাশে কলোনি তো এখনও ডিস্ট্যান্স ড্রিম!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ উত্তরাধিকারী বলতেই মনে হল ছোটটার কথা! সে আজকাল বহুত ফটর ফটর করে! ঘুমোতে গিয়ে গান শোনার ফরমাশ! তার মা তাকে চাপড়ে ঘুম পাড়াচ্ছে! আর সে নিয়মিত ফরমাস করে যাচ্ছে, ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে’ গাও! ‘আয় আয় ঘুম’ গাও! ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ গাও! ঘুমের তো আটকলা! তা এই সময় দরজা খুলে আমি প্রবেশ করেছি! সে মায়ের কোলে শুয়েই একবার উঁকি মেরে দেখে নিল বাবা ঢুকেছে! বলে উঠলঃ “ও বাবা! এচো! একটা ভাল গান হচ্চে!” পাগলা ঘুমোবি যদি, ঢেঁকুর তুলবি কেমনে!!!

(১৩২)

যখন ফিসফাসের একখান পোস্ট লেখার জন্য সকাল থেকে কম্পু মুখে করে বসতে হয় পড়াশুনোর জন্য তখন কেমন মনে হয় না যে ফিসফাস জাতে উঠছে? বেশ একটা রাশভারী বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব জাগে আর বইটাও পেপারব্যাক ছেড়ে হার্ড বাউণ্ডের রাস্তায় ঘুরপাক খায়।

যাক সে কথা, প্রথমে কিছু ইতিহাস ঘেঁটে ঘ করি। তিব্বত গেছেন তিব্বত? আরে এই কোলকাতা হয়ে ডায়মণ্ডহারবার হয়ে তিব্বত। এমা হযবরল পড়েন নি? নিশ্চয় পড়েছেন? কিন্তু তিব্বতের কেসটা কি বলুন তো? ছোটবেলায় পড়া সাধারণ জ্ঞান উগড়ে দিই বরং! তিব্বতের রাজধানীর নাম লাসা। তিব্বতকে পৃথিবীর ছাদ বলা হয় কারণ বিশ্বের সর্বোচ্চ মালভূমি তিব্বতেই। আর লাসাকে আবার নিষিদ্ধ শহর বলা হয়। সে সব মেলা ব্যাপার স্যাপার।

তিব্বতের কথা আসলেই আসে দলাই লামা আর ধরমশালার ম্যাকলিওডগঞ্জের কথা। এক ভদ্রলোক ১৯৫৯ থেকে নিজের দেশ থেকে পালিয়ে এসে ভারতে বসে আছেন আর ১৯৮৯তে নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়ে গেছেন। কিন্তু দলাই লামা কে আর কি? এসব ঘাঁটতে বসে দেখা গেল দলাই লামা হল তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু। বর্তমান দলাই লামা ১৯৩৭ থেকে দলাই লামার আসন গ্রহণ করেছেন এবং ওনার আসল নাম ‘জেতসুন জাম্পেন নগাওয়াং লবসাং ইয়েসে তেনজিং গ্যাতসো’ বা সংক্ষেপে তেনজিং গ্যাতসো। উনি যখন দলাই লামার আসন গ্রহণ করছেন তখন ইতিমধ্যেই তিব্বত চীনের অভ্যন্তরস্থ ধরি মাছ না ছুঁই পানি মার্কা জায়গা হয়ে আছে।

আসলে হয় কি, তিব্বতিদের বিশ্বাস অনুযায়ী দলাই লামা এবং সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড পানচেন লামা দুজনেই যুগে যুগে পুনর্জন্মের মাধ্যমে ফিরে ফিরে আসেন। সে এক এলাহি ব্যাপার দলাই লামা মারা গেলে কিছু অলৌকিক সূত্রের মাধ্যমে স্থান নির্ণয় করে সেই এলাকার বাচ্চা কাচ্চাদের কাছে দলাই লামার খেলনাপাতি আরও কিছু ফলস মার্কা খেলনাপাতি নিয়ে যাওয়া হয়। পূনর্জন্ম প্রাপ্ত লামা ঠিক নিজেরটা চিনতে পারেন। আরে সেই যে আমাদের অন্নপ্রাশনে যেমন টাকা, মাটি আর পেন দেওয়া হয় থালা ভরে আর বাচ্চাগুলো নিজের নিজের ভবিষ্যৎ ছোট ছোট দু হাতে নির্ধারণ করে সেই রকম ব্যাপার।

তা তেনজিং গ্যাতসোও নাকি নিজের খেলনা চিনতে পেরেছিলেন। ব্যাস আর যায় কোথা। তাকে তুলে এনে ঠিক মতো পড়াশুনো করিয়ে একদম মাথায় তুলে দেওয়া হয়। সেই যে এক হ্যাভেলসের বিজ্ঞাপন মনে আছে? ‘রিনপোছে’ ‘রিনপোছে’? সেই রকম।

তা বর্তমান দলাই লামার আগের ভদ্রলোক তো ১৯১৩ সালে মওকা বুঝে তিব্বতকে স্বাধীন ঘোষণা করে দেন ১৯৩৩এ তাঁর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত। এর মাঝে ১৯২৪এ সিমলাতে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার, তিব্বত ও চীনের মধ্যে চুক্তি সম্পূর্ণ হয় নি চীন মাঝ পথে চলে যাওয়ায়। তার পরে প্রায় দশ বছর চীনকে তিব্বতে ঢুকতে দেওয়া হত না। কিন্তু তিব্বতেও সমস্যা লেগে ছিল।

তার প্রধান কারণ ধর্মকে হাতিয়ার করে সামন্ত্রতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। যার ফলে ছুটকো ছাটকা বিদ্রোহ শুরু হয়। আর চিয়াং কাই সেকের হাত ধরে ১৯৪২এ আর শেষে মাও সে তুং-এর হাত ধরে ১৯৪৯এ তিব্বত দখলের প্রয়াস শুরু হয়। শেষমেষ ১৯৫০এ চীন তিব্বতকে চীনের অংশ বলে ঘোষণা করে কিন্তু লাসা সহ আর আশেপাশের অঞ্চলকে স্বশাসিত প্রদেশ হিসাবে চিহ্নিত করে রাখা হয়।

কিন্তু দড়ি টানাটানি চলছিলই। শেষে ১৯৫৯ সালে লাসার বিদ্রোহকে হাতিয়ার করে চিন পাকাপাকিভাবে লাসা দখল করে এবং দলাই লামা তার সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে নিয়ে ম্যাকলিওডগঞ্জে আশ্রয় নেন। আর বহু তিব্বতি দিল্লি এবং কর্ণাটকের বিভিন্ন জায়গায় রিফিউজি হিসাবে থাকতে শুরু করে।

তিব্বতিদের যে উপনিবেশ দিল্লিতে আছে সেটি মজনু কা টিলা এবং কাশ্মীরী গেটের বৌদ্ধ বিহারের আশেপাশে। ভোজনবিলাসীদের জন্য সেগুলি স্বর্গরাজ্য। হালকা অন্ধকার গলির মধ্য দিয়ে সুসজ্জিত এবং সাংস্কৃতিকভাবে উজ্জ্বল রেস্তোরাঁগুলিতে খাবার দাবাড়ের দামও অবিশ্বাস্য রকমের কম। কাশ্মীরী গেটের বৌদ্ধ বিহারে বার কয়েক গেলেও মজনু কা টিলায় যাওয়া হয়ে ওঠে নি কিছুটা কুঁড়েমি আর কিছুটা অজ্ঞানতা বশতঃ।
তা কালকের দিনটা একটু অন্যরকম ছিল। হয়েছে কি? ছেলের তায়কোয়ণ্ডো প্রতিযোগিতার দিনই আমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠক। অনেক কাকুতি মিনতিতেও ছুটির চিঁড়ে ভেজে নি। তাই ভাবলাম একটু নিয়ে টিয়ে যাব কোথাও খেতে। তাই জোম্যাটো ডট কম ঘেঁটে ঘুঁটে গবেষণা করে রেখে দিয়েছি। তার মধ্যেই পার্শ্ববর্তিনী খবর পাঠালেন যে তাঁর বাল্যবন্ধুর পেণ্টিং-এর প্রদর্শনীতে তিনি যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু মানুষ ইচ্ছা পোষণ করে আর উপর ওলা নিজের ইচ্ছা মতো তাতে কাঠি করেন। তাই সাতটার মধ্যে শেষ হওয়া প্রদর্শনীতে পৌঁছনো দিল্লির ট্র্যাফিক জ্যামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হল।

কিন্তু বাড়ি থেকে তাম ঝাম নিয়ে বেরিয়েছি কি ল্যাজ গুটিয়ে ফিরে আসার জন্য? তাই হিসেব কষে রিগো রেস্তোরাঁ মজনু কা টিলা যাব বলে ঠিক করলাম। একটা কোরিয়ান রেস্তোরাঁর কথা ভাবা হয়েছিল বটে পাহাড়গঞ্জে, কিন্তু দুর্গমতার কারণে তা বাতিল হল। গাড়িটাকে সবুজ ওভারব্রিজের কাছে রেখে পায়ে হেঁটে ব্রিজ পেরিয়ে গেলাম। ছেলে তো মহা উৎসাহী হয়ে তিব্বতি ভাষা পড়ার চেষ্টা করতে লাগল। চাইনিজ প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি আগমনে তিব্বতিদের প্রতিবাদ নিয়েও উৎসাহিত রিপোর্তাজ পেশ করতে শুরু করল। তারপর আমাদের শুরু হল গলিখুঁজি।

খুঁজে খুঁজে হাজির হলাম রিগো রেস্তোরাঁয়। যেই বসতে যাব, ওমা পরিবেশনকারী এসে বোমাটা ফেললেন। ‘আজ কিন্তু নিরামিষ’।

খেলে যা! নিরামিষ কেন রে বাওয়া? আবার চল চল। ততক্ষণে পার্শ্ববর্তিনী তাঁর মঙ্গোলিয়ান বন্ধুর সঙ্গে এই প্রান্তরের এক রেস্তোরাঁয় বিফ খাবার গল্প বলছেন। সেই রেস্তোরাঁও এসে পড়ল কিন্তু নিরামিষ আজ বলে বোর্ড গলায় ঝুলিয়ে সে দাঁড়িয়ে। শেষে আ-মা রেস্তোরাঁয় এসে হাজির হলাম। ততক্ষণে নিশ্চিত জেনে গেছি তিব্বতি কলোনিতে আজ সর্বত্র নিরামিষ। কিন্তু এসে না খেয়ে চলে যাব? তাই রেস্তোরার পরিবেশকের স্মরণাপন্ন হলাম। সেও দেখলাম নিরামিষ তিব্বতি খাবারের বিষয়ে অন্ধকারে। বলে কি না উত্তরভারতীয় খান। আমাদের পাশের টেবিলে অবশ্য কয়েকটি মনিপুরী ছেলে মেয়ে তাই খাচ্ছিল।

কিন্তু নাইতে নেমে গা ভেজাব না বললে চলবে? সাবান না থাকলেই বা কি? বেছে বেছে উটকো নামের জিনিষপত্র অর্ডার করলাম। আলু ফিং মাশরুম ভেজ থানটুক আর টিগমা। আলু ফিং-এর আলু হচ্ছে বাংলায় আলু আর ফিংটা বুঝলাম না। কিন্তু চাইনিজ রাইস ওয়াইন দেওয়া নুডলস আলু ও মাশরুমের সুরুয়া আমাদের সামনে উপস্থিত করা হল। আর ছিল থানটুক। যা আবার তিব্বতি সুরুয়া। বান রুটির মতো টিগমাও ছিল। তা তাই দিয়ে স্যুপের বন্যা বইয়ে দিয়ে শেষে ফ্রুট বিয়ার দিয়ে শেষ করব কি? ইচ্ছা হল সুইট ডিশ খাই! তা ব্যানানা টফি ছাড়া কিচ্ছুটি নেই। তাই সই! তার কলা চটকে তার উপর তিল আর মধুর ক্যারামেলাইজড কোটিং দিয়ে চিবিয়ে পেট ঢকঢকিয়ে বাড়ি এলাম।
b5ced35548efb53fc17fd484bef32070_200_thumb

টিগমা

টিগমা


আসার পথে ছেলে আবিষ্কার করল, নিরামিষি বুধবারের কারণ। বুধবারকে খুব পুণ্যবান দিন হিসাবে দেখা হয় দলাই লামার জীবনে। তাই গত অগাস্টে এক বছরের জন্য মজনু কা টিলার তিব্বতি বাসিন্দারা বুধবার নিরামিষ খাবার অঙ্গীকার করেছে। অজ্ঞানীরা আর কি করবে? আবার কোন নতুন সূর্যাস্তের অপেক্ষায় থাকবে, গিয়ে একটু বিফ, ল্যাম্ব, পর্ক, চিকেন বা ফিশের তিব্বতি সংস্করণে যাতে দাঁত ফোটানো যায়। তদ্দিন না হয়, পেটের মধ্যে স্যুপের সাম্রাজ্য ঢক ঢক করুক!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বেরিয়ে আসার সময় বিশ্বের সর্ব কনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্দির ছবি দেখলাম। পানচেন লামা নির্বাচিত হবার পর গেধুন চৈকি নেইমাকে ১৯৯৫ থেকেই চীনা সরকার কোন অচেনা জায়গায় সরিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং তিব্বতি জনগণের আবেদনের পরেও তাঁর বর্তমান অবস্থান প্রকাশিত হয় নি। ছেলেটি এখন প্রায় ২৫ বছরের হয়ে গেল। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বা বিরুদ্ধ মতকে রাষ্ট্রযন্ত্র বরাবর ভয় পেয়ে এসেছে। চীন তো আরও বেশীই। তিয়েন আন মেনেরও তো পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেল।
300px-Save_the_Panchen-lama
প্রয়োজনহীন পুনশ্চ১- কালকেই দেখলাম সলমন খানের পাঁচ বছর জেলযাত্রা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। বিশেষত ফেসবুকে উপচে পড়ছে সলমনের জন্য “ঠিক হয়েছে” আর তার সমর্থনকারী (পড়ুন অভিজিত ভট্টাচার্য্য ও ফারহা খান আলি)-দের জন্য “ছিছিক্কার”। জনগণ একবার ভেবে দেখুন আপনার বাড়ির ছেলেটি এরকম বিচারবিবেচনাহীন কাজ করলে আপনারা কি তাকে বিবেকের কাছে আত্মসমর্পণ করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে জেলে পাঠাবেন? না কি আপনারাও মনগড়া গল্প তৈরী করে তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করবেন? প্রথমটা হলে তো আপনাকে স্যালুট আর যা করছেন তা চালিয়ে যান। আর দ্বিতীয়টা হলে? আপনিও কিন্তু অভিজিত কিংবা ফারহা খান আলি (ইনি সঞ্জয় খানের কন্যা) কিংবা অর্জুন কাপুর হয়ে পড়ছেন।

অভিজিৎ ভট্টাচার্যকে নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই, ভদ্রলোক এর আগেও পাকিস্তানী গায়ক বা ইত্যাদির উপর নিজের অকালে ঝরে যাওয়া জ্ঞান বর্ষণ করেছেন। এখানেও ব্যতিক্রম নয়। বাকিরা স্রেফ নিজেদের পরিচিতকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে। দুঃখের বিষয় হল আমরা এতদিন ধরে কিন্তু সেই রাত্রে হতভাগ্য নুরউল্লাহ মেহবুব শরীফ (নামটা আমিও জানতাম না স্বীকার করছি) বা সলমনের পুলিশি দেহরক্ষী রবীন্দ্র পাতিল (যিনি প্রথম এফআইআর করেছিলেন কিন্তু অদ্ভুত অবস্থায় সাত বছর পর সহায় সম্বলহীন অবস্থায় যক্ষ্মাগ্রস্থ হয়ে মারা গেছিলেন)-এর কোন খবর নিই নি। তাই বলি কি, শুধু চুপ করে খবরটা দেখি, বাক্যবাণের অধিকার বোধহয় আমরা হারিয়েছি! আমেন!
Junior-Car-Designer-Car-Drawing-For-Kids-Made-Very-Easy-SUV-Front-View-6

(১৩০)

আরে গত এপিসোডে একটা কথা বলতে ভুলেই গেছিলাম। আসলে আমার এই তিতকুটে পারসোনালিটির মূল ভিত্তিই হল আমার তেঁতো প্রীতি। মানে উচ্ছে , করলা, নিমপাতা, পলতা আমার রসনার লাভা স্রোতে লালা বর্ষণ করে, সেই ছোট বেলা থেকেই। কালমেঘ আমার প্রথম বর্ষার মেঘ। নিম বেগুনে মনে আগুন লাগে। পলতার বড়ায় সলতেয় সেঁকে সিক্ত হয় হৃদয়। (আহা কদ্দিন যে পলতার বড়া খাই না! এই পোড়া দিল্লিতে ম্যাপল পাতা এমন কি চিনার পাতাও পাওয়া যায় কিন্তু পলতা পাতার দেখা? নৈব নৈব চ!)

আমার সারা পরিবারকে পইপই করে বলেও বোঝাতে পারি নি যে তেঁতোটা বাদ দিলে করলার মতো স্বাদু সবজি আর নেই। চেষ্টা করে দেখবেন! করলা কাটার পর ঈষদুষ্ণ গরম জলে একটু নুন দিনে করলা ভিজিয়ে রাখলে তেঁতো ভাবটা অনেকটাই চলে যায়। তারপর কোপ্তা কালিয়া রেঁধে দেখুন না ইচ্ছে মতো!

যদিও আমাদের বাড়িতে তেঁতো খাওয়া হয়, কিন্তু তা রসনার বাসনায় নয়। আয়ুর্বেদিক রেসিপি হিসাবে। আমার ছেলেটাও করলা দেখলে এখন নাক সিঁটকোয়। (উদাসী উত্তমকুমারের ইমোটিকন)

কিন্তু ধর্মের কল বোধহয় উলটোবার সময় হয়েছে। আয় দিন আমার মেয়েটি তার গুটগুটে দুই পায়ে হেঁটে এসে খাবার সময় কোলে বসে আমার থালা থেকে মণিমাণিক্য অর্ডার করে। যদিও তাকে বেশ তরিবৎ খাবার দাবারই দেওয়া হয়। কিন্তু তার বোধহয় বিশ্বেস হয় না যে সেগুলোও ভালো হতে পারে। নদীর এপার আর ওপার আর কি! তা সেদিন কাছের পার্ক থেকে কচি কচি বাদামী নিমপাতা বাড়িমুখো হয়েছে। আর ডুমো ডুমো বেগুন কাটা রয়েছে। অফিস থেকে ফিরে এসব দেখে আর সামলাতে না পেরে নিজেই দায়িত্ব সহকারে কম তেলে কুড়কুড়ে করে ভেজে সবে নিয়ে বসেছিলাম। সে মহারাণী এসে সেই খান থেকেই হুকুম করল।

সব বাপ মায়ের সুপ্ত বা ব্যক্ত ইচ্ছা থাকে যে সন্তান যেন নিজের কিছু ভালোলাগাকে আপন করে নেয়। এই নিয়েই মাত্রাছাড়া ঝঞ্ঝাট বা ঝটাপটির শুরুয়াত হয়ে যায়। তা আমার ভালো লাগার নিম বেগুন যদি আর কেউ খেতে চায় তাহলে সত্যিকারের ফ্যানের মতো হাওয়া বিতরণ করেই সুখ অনুভব করতে চাইবই, এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তা মহারাণী চাইতেই হুজুর খিদমতগার হাজির করল, একদা সবুজ অধুনা কালচে কড়কড়ে নিমপাতা! মুখে দিতে এক মুহুর্তের জন্য তাঁর মুখভঙ্গিমা পালটে গেল। কিন্তু অপাপবিদ্ধ মন, কালো কে কালো, তেঁতোকে তেঁতো বলতে শেখে নি। সে কুড়মুড়ে অন্য স্বাদের খাবার পেয়েই খুশী। এক গাল হেসে ঘাড় বেঁকিয়ে বলল, “ভাও”! আবার দাও!

আর কি বলব মহায়! পুলকে আমার হৃদয়ের কলমে প্রেমসংগীত লেখা চালু হয়ে গেল। তার মাকে এক গাল হেসে বললাম, “দেখলে? বাপ কা বেটি!” পার্শ্ববর্তিনী তাল ভঙ্গ করলেন খাবার প্রসঙ্গ পাল্টে। কিন্তু তাতে কি? মিশ্র কাফির দরবারি কানাড়া তখনো বুকের মধ্যে তান তুলে রেখেছে। জিয়োহ বেটি।

ছেলেবেলায় আমার বোর্ড গেমের মধ্যে দারুণ লাগত চাইনিজ চেকার খেলতে। তা সেটা কারণ কি না বলতে পারব না। তবে কোলকাতার রাস্তায় প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া লাল বাস বা সরকারি বাসের ততোধিক বিলুপ্ত প্রায় টিকিট চেকারদের মুখোমুখি কখনই হই নি। তাল কাটল কলেজে উঠে।

এক বন্ধুর মা অসুস্থ, তাঁকে দেখতে যাব বলে বারুইপুরের ট্রেন কখন আছে তা দেখতে কোলাপসিবল পেরিয়ে সবে বোর্ডের কাছে গেছি। আর যাই কোথা? ক্যাঁক করে ধরে সোজা নিয়ে গেল আরপিএফ থানায়। তা যাই হোক, তখনকার দিনের টিউশনির মার্কেটে তিরিশটি কড়কড়ে টাকা দিয়ে মুক্তি পেয়েছিলাম বটে।

আর তারপর দিল্লিতে এসে একবার দুশো টাকা চেকারকে ফাইন দিতে হয়েছিল দু টাকার জন্য। তখনও দিল্লিতে সামান্য দূরত্বের জন্য দু টাকার টিকিট পাওয়া যেত। দিল্লির বাসগুলিতে কন্ডাক্টর আপনার ঘাড়ের কাছে ‘টিকিট টিকিট’ করে টোকা মারে না। তারা বহাল তবিয়তে নিজের সরকারি সিংহাসনে বসে থাকে আর আপনাকেই যাত্রী স্রোতের বিপরীতে গিয়ে টিকিট কেটে ফিরে আসতে হয় ঝাণ্ডা উঁচিয়ে। তা অন্য একটা ঘটনায় রুমাল রেখে টিকিট কাটতে গেছি আর ফিরে এসে দেখি এক জাঠ তনয় রুমালটিকে জানলার উপর রেখে নিজে বেশ আগলে বসেছেন। আমার গা থেকে কোলকাতার জলের গন্ধ তখনও যায় নি। তাই তর্ক জুড়েছিলাম বটে। কিন্তু ষাঁড়ের সামনে লাল শালু নেড়ে বিশেষ ফল হয় না সে ষাঁড় যদি তখন তার প্রিয় বিচুলির সন্ধান পেয়ে যায়।

তা যাই হোক আগের গল্পটায় ফিরে আসি, আর কে পুরম থেকে বসন্ত বিহার চারটি স্টপেজ। তার মধ্যে একটি অতিবাহিত, তা আমি ঝটপট দুটি টাকা বার করে কন্ডাকটরকে দিতে যাব আর ও মা সে জানলা দিয়ে মুখ বার করে কি যেন দেখে হাত সরিয়ে নিল। আর মুর্তিমান অমঙ্গলের মতো খান চারেক ধূসর পোশাক পরিহিত চেকার উঠেই ক্যাঁক করে আমায় ধরল। তাদের যত বলি যে আমি টিকিট কাটতে যাচ্ছিলাম, কিছুতেই বিশ্বাস করে না। তবে বিশ্বাস না করার কারণ বোধহয় কোটা সম্পূর্ণ করা। মানে তাদের সারা দিন ধরে তমুক সংখ্যক লঙ্ঘনকারীকে ধরা এবং অমুক সংখ্যক অর্থ জরিমানা হিসাবে সংগ্রহ করার হুকুম থাকে বোধহয়। সেই প্যাঁচে দুটাকার বদলে দুশো টাকা দিয়ে পাসপোর্ট উদ্ধার হল।

তবে এবার যে গল্পটি বলব (বা সত্য ঘটনাটি বলব), সেটি কলেবরে এই সকল গল্পের মধ্যে ভীম ভবানী। এটি আমার সঙ্গে হয় নি, জয়পুরের সেই ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধুর সঙ্গে ঘটেছিল।

কলেজে পড়ার সময় কোন কারণে সে ও তার বন্ধু দুজনে কোলকাতা এসেছিল। সে বর্ধমানের আর তার বন্ধুটি দুর্গাপুরবাসী। তা একইভাবে টিকিট না কেটে ট্রেন কখন আছে দেখার জন্য তারা হাওড়া মেন স্টেশনে ঢুকে পড়েছিল। আর ঠিক একইভাবে তাদেরকেও পরীক্ষকরা ক্যঁক করে ধরে। তা দুজনেই নাকি একটু শান্তশিষ্ট ভিতু প্রকৃতির ছিল। আর তাদের ভয়ার্ত চেহারায় আরও দু তিনটি বলিরেখা যুক্ত হল যখন তারা আরপিএফ থানার ভিতরে বসে থেকে পাশের ঘর থেকে শুনতে পাচ্ছিল ‘বাবা রে, মা রে মেরে ফেলল রে’ চিৎকার। তাদের সন্দেহ নিরসনের দায়িত্ব সেই চেকারই নিলেন। তিনি বললেন, “ও কিছু না পকেটমার ধরা পড়েছে তো!” তা পকেটমারের পকেটে কে আর দেখতে গেছে কোন পরিচয়পত্র আছে কি না পকেটমার বলে। তাই বন্ধুটি ঘাবড়ে গিয়ে বলল, যে দেখুন আমার কাছে একশো টাকা আছে। বাড়ি পৌঁছত হবে তো! তাই পঞ্চাশ দিই?

কিন্তু তার বন্ধুটার হঠাৎ কি হয় কে জানে? সে ছুট লাগালো সেখান থেকে, কিন্তু উসেইন বোলট না হোক সে নিদেন পক্ষে আদিল সুমারিওয়ালাও ছিল না। তাই চড় চাপড়ের মাঝে উভয়ে মিলে একশো টাকা দিয়ে তবে রফা হয়। তারপর হুড়মুড়িয়ে দেখে শুনে একটি ট্রেনে তারা উঠে পড়ে। নির্দিষ্ট সময় বন্ধুটি বর্ধমান আসায় নেমে পড়ে আর তার বন্ধুকে বলে তুই দুর্গাপুর পৌঁছে খবর দিস। কিন্তু ততক্ষণে নটা বেজে যাওয়ায় আর একে সারাদিনের ধকলে আমার বন্ধুটি অচিরেই খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

পরদিন সকালে টেলিফোনের চিল চিৎকারে ঘুম ভাঙে। সেই বন্ধুটি নাকি সারা রাত ঝড় ঝাপটা সামলে বাড়ি পৌঁছে কোনরকমে রাত কাটিয়েই বেইমান বন্ধুর উপর হামলে পড়ে ফোন করে।

কিছুই না, আমার বন্ধুটি নেমে যাবার পর তার বন্ধুটি ফুরফুরে হাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিল এই ভেবে যে দুর্গাপুরে তো ট্রেন আপসেই থেমে যাবে। কিন্তু যখন তার ঘুম ভাঙে ততক্ষণে দশটা বেজে গেছে, আর ট্রেনটা নাকি দুর্গাপুর যায় নি এবং শান্তিনিকেতনের পথে চলছিল। ছেলেটি কিছু না বুঝতে পেরে ক্রমশ ফরসা হয়ে আসা সহযাত্রীকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে যে তারা ভুল ট্রেনে উঠে পড়েছে। তারপর কোন রকমে পরের স্টেশনে নামে। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ অপর একটি লোকাল ট্রেন ধরে সে ফিরে আসে বর্ধমানে। দুর্গাপুর যাবার ট্রেন তখন পাশের প্ল্যাটফর্মে আসব আসব করছে। সে লাইন পেরিয়ে সেই প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে সামনে সাদা শার্ট পরিহিত এক ভদ্রলোককে বলে “দাদা হাতটা ধরুন!” ভদ্রলোক তাকে প্ল্যাটফর্মে তুলে নিজের কালো কোটটি পরে বলে, ‘টিকিট?’ আর যা হবার তাই হয়! সে রাতে কে আর গল্প শোনে। শেষে কপর্দক শূন্য অবস্থায় দুর্গাপুর এসে রাতের অন্ধকারে লাইটহাউসের মতো জেগে থাকা একমাত্র পরিচিত এসটিডি বুথ থেকে সে কাঁদোকাঁদো অবস্থায় বাড়ি ফোন করে বাবাকে অনুরোধ করে গাড়ি পাঠাতে! বাবা গাড়ির ব্যবস্থা করে তাকে বাড়ি নিয়ে যখন পৌঁছন ততক্ষণে স্টুডিওর ঘড়িতে ছোট কাঁটাটি দুইয়ের ঘরে ঘোরাফেরা করছে।

পাঠক/পাঠিকারা যত পারেন হাসুন, কিন্তু সেই বেদনাহত ছেলেটির সঙ্গে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এমনই কোন ঘটনা বা দুর্ঘটনার কথা মনে করে একটু দীর্ঘশ্বাস অন্ততঃ ফেলবেন। ছেলেটি অজান্তেই একটু শান্তি পাবে! আমেন!
being-gratuitous
প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বর্তমান ভারতীয় একদিনের ও টি২০ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক শ্রী মহেন্দ্র সিং ধোনি একদা দক্ষিণ পূর্ব রেলের টিকিট কালেক্টর ছিলেন। তবে সে অন্য কোন জীবনের গল্প বটে।

(১২৮)


মাঠ
সবুজ সবুজ ঘন সবুজ ঘাসে ঘাসে পা ফেলে চোখে চোখে হাতে হাত মন মজে যায় মাঠে। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড তখন সবুজের অভিযানে মগ্ন। দিনের মধ্যে মিনিট পাঁচেক সবুজদের দিকে তাকিয়ে বসে থাকুন মন সবুজ হয়ে যাবে পাঠক পাঠিকারা। সবুজের কতই না রঙ, কচি সবুজ পাকা সবুজ, হলদেটে সবুজ, নেড়া সবুজ, ঘন সবুজ, জংলা সবুজ, জলপাই সবুজ। আরে মনটাই তো সবুজ, সবুজ দ্বীপের রাজা!

২২ গজ
ঘন সবুজ হলদেটে ছোপ কোথাও কোথাও এক ফোঁটা টাক তার মাঝখানে একফালি মরূদ্যান সাদাটে স্বর্গের মতো দুপাশে স্বর্গ নরকের গেটে তিনখানি খুঁটি পোঁতা। লাগলে তুক না লাগলে তাক। লাগলেই লাল আলো জ্বলে উঠবে আগুনের। C’mon Man, pitch it on the right spot… সারা জীবন ধরে সঠিক জায়গাটাই খুঁজে গেলাম, যেটা পড়লেই উইকেট বাঁধা, কেউটের ছোবলের মতো স্পিন, বেহালার সুরের মতো স্যুইং, করাতের মতো কাট, স্বপ্নসুন্দরীর মতো ল্যুপ, ব্যাটসম্যানের চোখে মুখে লালা ঝরিয়ে তাকে লক্ষণ রেখার বাইরে টেনে এনে রাবণ বেশধারী ফ্লাইট… Pitch it on the right spot baby!

উইলো
৮৫র সেপ্টেম্বরে গুলমার্গ থেকে একটা পার্চমেন্ট লাগানো কাশ্মীর উইলো কিনেছিলাম। ৬৫টাকা দাম। তারও পরে ৮৭তে ২১০ টাকায় এসজি স্ট্রোকওয়েল। কাশ্মীরি উইলো। ৯২তে এসে প্রথম ইংলিশ উইলো এসজি সেঞ্চুরি। সেটা এখনো রয়ে গেছে মাঝে মাঝেই নেড়ে চেড়ে দেখি, ব্যাট সুইংটা ঠিক আছে কি না। বাবা দেখে বলল, এখন আর কি হবে? অফিসেও তো খেলিস না! স্বপ্নে ম্যকগ্রা আর শোয়েবকে সামলানোর তো হিসাব থাকে না কোন। লাভ ক্ষতি সব স্বপনে মিলিয়ে যায়। Follow the seam Man, নতুন বল পালিশ তোলা অবধি অফস্টাম্পের বাইরে খুচখুচানি নয়। ছাড়া প্র্যাকটিস করো কাকা। ধরার থেকেও ছাড়া বেশী জরুরী। ছাড়তে ছাড়তে সন্ন্যাসী হয়ে গেলেও ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু বিনা যুদ্ধে ক্রিজ ছাড়বে না কখনও। খাড়ুশ! রবি শাস্ত্রী-আর্থারটন-গ্যারি কার্স্টেন!

কিন্তু উইলো তো তুলি! ছবি আঁকতে ডাক পড়ে তাই ভিশি-আজ্জু-মার্ক ওয়া- আর ডেভিড গাওয়ারের। গল্প গাছা যা আছে সব ব্যাটসম্যানদেরই আছে। কজনই বা ইমরান খান হয় বলুন?

চেরি অন দ্য টপ
লাল চামড়ার চারটে টুকরো, ভিতরে কর্ক আর উলের বোনা। তার উপরে ঠিক হিসাব করে ছটা সুতোর সেলাই, লাল সাদা লাল সাদা লাল। গনগনে আগুনের মতো তেড়ে এসে আছড়ে পড়ছে বুকে হেলমেটে হাতে গ্লাভসে প্যাডে বা ব্যাটে। না পারলেই উইকেটকিপারের দস্তানা বা কাঠের কফিন তৈরী গুঁড়িয়ে দেবার জন্য। ফাইট কোনি ফাইট!

রোলার

ছোটবেলায় “তোর বাবা ইডেনে রোলার চালায়” বলে আমায় মাসির বাড়িতে খেপাত। আরও একটু পরে রোলার হেভি রোলার মিডিয়াম রোলার ঘুরে রোলারে মেরে রিফ্লেক্স ক্যাচ প্র্যাকটিস। তার পর দেখতে দেখতে বর্ষা হেমন্ত শীত বসন্ত পেরিয়ে কত যে রোলার বুকের উপর দিয়ে চলে গেল। পিচ তবু অসমান হয়েই রয়ে গেল। লাইফ লাইন- জীবন রেখার মতো। আশির দশকের শেষের দিকে এমকে রায়না আর তনভি আজমি-র একটা সিরিয়াল হতো লাইফলাইন। এখন সেই ধরণের সুন্দর ছোট ছোট আবেগ সিরিয়ালে দেখা যায় না। সকলেই ম্যাক্সওয়েল সকলেই বিগ শো।

আজাহার
আজ হার কিন্তু কাল জিত। ধনুক ভাঙা জ্যা মুক্ত স্কোয়ার ড্রাইভ, জিভ বার করে অ্যাব্রাকাড্যাব্রা লাঠিখেলা, কব্জি মুচড়ে এক্সট্রা কভার থেকে ফাইন লেগ, এক অ্যাকশনে বল ধরে উইকেটে তাক। স্লিপে দুরন্ত রিফ্লেক্স ক্যাচ। কলার তোলা মস্তানি, সঙ্গীতা বিজলানী, আমদানি রপ্তানী। বাঁজারা হিলসে বাড়ি, ফিক্সিং-এ ভাব আড়ি। নিরেনব্বুইয়ে তীরে এসে তরী ডোবে। স্বপ্ন ভাঙতে পনেরো বছর সময় লাগল। পনেরোটা বছর। কৈশোর তখন ক্লিন শেভেন যুবক। কেন কেন কেন? মিয়াঁ কাপ্তান বনোগে?

আক্রম
সাতাশির দুপুর ইমরানের চওড়া বুকের কাপ্তানিতে লম্বা চুলের ব্রণের ক্ষতময় মুখ। অদ্ভুত দুলে এসে আউট স্যুইং ইন স্যুইং অফ কাটার শর্ট আর্ম বাউন্সার, ইয়র্কার আর রিভার্স। পেস বোলিং অন্য ভাবে লেখা হয়ে গেল। শারজায় হোক বা এজবাস্টনে, মেলবোর্ণ বা জর্জটাউন, চেন্নাই বা কেপটাউন- ডায়বেটিস আর ভয়ঙ্করতম কাঁধের অস্ত্রোপচার পেরিয়ে, সীমান্ত পেরিয়ে একজনই বুকে এসে ধাক্কা মারে। ডিউস বলে বাঁহাতি স্পিন হলেও, টেনিস বল ক্রিকেটে পেস, ওয়াসিম আক্রম কপি বুক। বলে বলে ইয়র্কার। পাড়ার ম্যাচ অনভ্যাসের তিনটে ওয়াইডের পরই দুটো দুর্গ ভাঙা ইয়র্কার। ওয়াসিম ভাই জিন্দাবাদ!

এবং শচীন

উননব্বইয়ের এশিয়া কাপের প্র্যাকটিস শেষে ছোট্ট খাট্টো ছোটু বাবু এসে দাঁড়ালেন সামনে। হাতে অটোগ্রাফ খাতা। বাম হাতি শচীনের ডান হাতি ব্যাটিং। ফ্যান না হলেও শ্রদ্ধা কোথায় যায়? মাধুরীও তো পছন্দের অভিনেত্রী নন। তা বলে টুপি কি খুলে সেলাম জানাই না। Respect! Respect!

আরও কত স্মৃতি

৯৬য়ের যে বার বেলায় ধরে নিলাম যে আর হবে না। সেদিন ছিল কোলকাতা কর্পোরেশনের সঙ্গে খেলা বাবার অফিসের। খেলি বছর দুয়েক। অপর দিকে আমার ক্লাব দল হাওড়া ইউনিয়নের অধিনায়ক। সারা মরসুম জুড়ে নিজে ৪০ ওভার বল করে গেল কিন্তু বাম হাতি স্পিনার বলে সুযোগ দিল না। বয়স বাড়ছে। প্রতিশোধ? ব্যাট করতে নেমে তার বলে জীবনের প্রথম রিভার্স স্যুইপ, এক্সট্রা কভারের উপর দিয়ে ছয়। ম্যাচ তবু হাতে আসে না, আউট আম্পায়ারের আঙুল উঠে যায় লেগ বিফোর উইকেট। ঘরবাড়ি ছেড়ে সরে যাবার আগে মাথাটা যদি উঁচু থাকে তো কেয়া বাত মিয়াঁ। স্কুল কলেজ ফার্স্ট সেকেণ্ড ডিভিশন ডিসট্রিক্ট ক্রিকেট ইউনিভার্সিটি সব পেরিয়ে আদিগন্ত ধূসর গোধূলি।

হাউজ দ্যাট
আমার বাবা ইন স্যুইং বল করতেন। মোহন বাগানে যে বছর গেলেন সে বছরই হাঁটু ঘুরল। সালটা ৬৫! তারপর থেকে তিনি সাদা কোট কালো প্যান্ট। স্থানীয় ক্রিকেট পেরিয়ে রঞ্জি দলীপ দেওধর ট্রফি। একবার অরুণ লাল খেলতে খেলতে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, “You are son of Mr. A N Sinha? He is the most sober human being I’ve ever seen on the cricket field. Please remember me with him.” বাবার জন্য গর্বে বুক ফুলে গেল। আমার বাবা! সব সময় পশ্চাৎপটে থাকা আর্ক লাইট থেকে দূরে থাকা বাবা। খেলাটা যিনি আমায় হাতে করে শেখালেন সেই বাবা। সৎ হতে যিনি শেখালেন সেই বাবা। আজ যখন ভুল আম্পায়ারিং-এর জন্য ম্যাচ হেরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এক বন্ধুর দেওয়ালে দেখলাম Son of Umpire=বরাহ নন্দন… কোথায় বাজল বলুন তো?

জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েই তো আমরা জীবনের গাড়ি চালাতে শিখি। উঠতে পড়তে পড়তে উঠতে গড়াতে গড়াতে এগিয়ে যাওয়া। মাথা নিচু না করে সোজা হয়ে বাঁচা। জিততে শেখার থেকেও বড় শেখা হারতে। উফফ আমরা যে কবে হারতে শিখব?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে মুরি মুড়কির মতো করে বিরুদ্ধমতাবলম্বী ব্লগারদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। চারিদিকে প্রতিহিংসা ক্ষোভ বিদ্বেষ আগুন আগুন। উফ এতো বিষ জমে থাকে এই টুকু ক্ষুদ্র মানুষের বুকে?