(১৬৩)

 

উফফ কত্তদিন বাদে দেখা বলুন তো? কেমন আছেন পাঠক/ পাঠিকারা? এর মধ্যে গঙ্গা দিয়ে প্রচুর জল আর যমুনা দিয়ে প্রচুর অ্যাসিড বয়ে চলে গেল! চাঁদের রঙ নীল থেকে বদলাতে বদলাতে হলদেটে হয়ে গেল! আর দু চারটে পাকা চুল মাথায় গালে বংশ বৃদ্ধি করে ফেলল!

আমার খবর? তা খবর বলতে দুটো-
এক) সৃষ্টিসুখ প্রকাশন থেকে একটা গল্পের বই প্রকাশ পেল আমার। ‘ইয়র্কার এবং অন্যান্য গল্প’। দিল্লিতে পুজোয় আর কোলকাতায় বন্ধুদের সঙ্গে তার হইহই করে উন্মোচন হয়েও গেল মোড়ক।
দুই) অবসরে প্রকাশিত ফিসফাস কিচেন এখন কলেবর বাড়িয়ে বই আকারে আসতে চলেছে বইমেলায়!
সবই আপনাদের ভালোবাসা আর কি!

তা যাই হোক, আজ বেশী ফেনাব না! ছোট ছোট গল্পে এতকালের অদেখা যাপন কাটিয়ে নেব আপনাদের সঙ্গে। নম্বর টম্বরের দরকার নেই! কি বলেন?

গাড়িটাকে নিয়ে মাঝে খুব ভুগলাম জানেন! যদিও নব্বই হাজার কিলোমিটার সঙ্গ দিল! এখনও হাজার তিরিশ চল্লিশ আরামসে দিয়ে দেবে! কিন্তু নিজের গুরুত্ব বোঝাবার জন্য মাঝে মাঝেই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে! সেখানেই সমস্যা!

একদিন আইটিও ফ্লাইওভারের পরেই ক্লাচের তার কেটে বসল! আর যাই কোথা! ঠেলতে শুরু করলাম এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে। অভ্যাস নেই। কোন রকমে ঠেলতে ঠেলতে কিছুদূর যাবার পর দিলাম এক গাড়ির সাইডে ঠুকে। সে আমার সেই অবস্থাতেও বেরিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ করে বসল। লাও! ঠাণ্ডা গলায় বললাম, ‘দেখো জি! থককে চুর হো গয়া! ঝগড়া করনে কা একদম মুড নেহি হ্যায়! যাদা বোলোগে তো ও যো পাত্থর পড়া হুয়া হ্যায় আপকে সরপে বইঠা দুঙ্গা! সেও হেবিজোর ঘাবড়ে গিয়ে চেল্লামেল্লি লাগাল! আমি পাত্তা না দিয়ে চলতে শুরু করলাম।

দেড় কিমিটাক চলার পর এক অটো এগিয়ে এল সাহায্যের পা নিয়ে! ড্রাইভারটি একশোটি টাকার বিনিময়ে পা দিয়ে ঠেলে দেবে অটো চালাতে চালাতে! এইভাবে যদি কিছুদূর যাওয়া যায়! গেলামও! তিন কিমি দূরের এক মেকানিক শপের সামনে যখন পৌঁছলাম তখন বাজে সাড়ে ছটা। সেদিন আবার রিহার্সাল। পার্শ্ববর্তিনীকে বললাম ওলা বুলা লো! তার মধ্যে আবার টিপটিপ বারিশ! আর মেকানিক দেখে বলল, ওয়েল্ডিং খুলে গেছে, এখন লাগানো সম্ভব হবে না! লাও ঠ্যালা! অটোটাকেও ছেড়ে দিয়েছি!

কোন অটোই আর অ্যাটলাসের বোঝা বইতে রাজী হচ্ছে না! ক্রসরোড বলে এক দীনবন্ধু কোম্পানির মেম্বারশিপ নেওয়া আছে। যদি বিপদে আপদে সাহায্য করে! তা সে বলল রাত দশটার আগে গাড়ি টেনে নিয়ে যেতে আসবে না! সামনে এদিকে রেললাইনের নীচ দিয়ে যাবার জন্য আণ্ডারপাস। তারও আগে রাস্তা অর্ধেক তৈরী হয়েছে বলে বাঁ দিকে জল জমে আছে! যা থাকে কপালে! ঠেলা লাগালাম। গত আড়াই ঘন্টায় গাড়ি ঠেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ঠিক কায়দা করে জলের উপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে আমি নিজে শুকনোর উপর দিয়ে হেঁটে এলাম। বৃষ্টি তখন থেমেই গেছে। কিন্তু ভিজেই গেছি, ঘামে! তারপর ঢালে দাঁড়িয়ে গাড়ি ঠ্যালা দিয়ে ঠনঠনে হাঁটু নিয়েই লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিতেই গিয়ারে ফেলা গেল! যাক বাবা, বলে আণ্ডারপাস প্রায় পেরিয়ে এনেছি ও বাবা সামনে গাড়ির জ্যাম দেকে উল্টো ঢালেই গেল গাড়ি বন্ধ হয়ে। মাঝ রাস্তায় ব্রেক মেরে চুপচাপ বসে আছি। পিছনে ভঁকভঁক হর্ণ পড়ছে গাড়ির লাইন! কিন্তু বেরব কি করে? ব্রেক থেকে পা সরালেই গাড়ি হড়কাবে পিছনের দিকে। হ্যাণ্ডব্রেকে কাজ হবে না! যাই হোক কয়েকজন অটোওলা ছিল কাছাকাছিই তাড়া ছুটে এসে ধরল পিছনের দিকে তারপর ধাক্কা দিয়ে দিল। আর গাড়িও গিয়ারে মেরে চালু করে দিলাম।

বেশী না, আধ কিমি! তারপরেই রেডলাইট। যাই হোক এগোতে শুরু করলাম। গলির দিকে! সামনে একটা গাড়ি রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়িতে নটা বেজে গেছে। অনুরোধ করতে গেলাম গাড়ি সরাবার। জ্ঞান দিয়ে বসল, অ্যা্যসে থোড়ি হোতা হ্যায়! আপ টো করওয়ানে গাড়ি বুলালো ইত্যাদি! যাই হোক। কোন রকমে ম্যানেজ করে গলির মধ্যে ঢুকতে হেল্প জুটে গেল। পৌনে দশটায় গলির মুখে আরেকটা ঢালে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করলাম এক ঠ্যালা মারুন! দিয়েও দিল! ব্যাস আর দেড়শো মিটার ভোঁ ভাঁ হর্ণ দিয়ে পৌঁছে গেলাম বাড়ির কাছে। তারপর রিহার্সাল (মিউজিক রিহার্সাল ছিল) দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পরের দিন গাড়ি সারিয়ে।

তা বেশ ছিল। সার্ভিসিং করাব করাব ভাবছি তার আগে শনিবার গ্রেটার নয়ডার স্কুল থেকে ছেলেকে আনতে যাচ্ছি। বেশি না, বাড়ি থেকে ৪৫ কিমি। নয়ডার মহামায়া ফ্লাইওভারের পর আরও পঁচিশ। তা মহামায়া ফ্লাইওভার পেরিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে পড়তেই ফটাং করে আওয়াজ! ক্লাচ গায়েব! লাও ঠ্যালা! ভাগ্যিস গাড়ি ফোর্থ গিয়ারে। আমি ক্লাচ ছাড়াই গাড়ি ষাট-আশি গতিতে চালাচ্ছি, বন্ধুকে ফোন করলাম, গ্রেটার নয়ডায় থাকে গাড়ির ঘাঁট ঘোঁট জানে। বলল পঁচিশ কিমির শেষে এক মার্কেটে মেকানিক আছে! গাড়ি টো করতেও পারবে! আমি বললাম আমি মাথা ঠাণ্ডা করে চালাচ্ছি, কোথাও থামব না! বড় কিছু ঝামেলা না হলে পৌঁছিয়েও যাব সেই অব্ধি! কিন্তু তারপরেই দরকার। তো ফোন করে দিলাম। আর আধ ঘন্টা ক্লাচ ছাড়াই কায়দা করে চালিয়ে পৌঁছেও গেলাম। সে অপেক্ষাতেই ছিল। কাদির নাম তার! যত্ন করে ঠিক ঠাক করে দিল। আর পরদিন বাড়ি ফিরেই দিয়ে দিলাম সার্ভিসিং করাতে।

তারপর আর কি! দিন দুয়েকের মধ্যেই “মেরে পেয়ারে দেশবাসীও কাল কুছ যাদাই হো গয়া থাআআ!” ব্যাস গেলো কাণ্ড। পরের দিন গাড়ির ফাইনাল সার্ভিসিং করিয়ে পেমেন্ট করব বলে ব্যাঙ্ক থেকে পাঁচ হাজার ছশো টাকা তুলতে গেছিলাম সেই সন্ধ্যাতেই! তা এটিএম ব্যাটা বলে পঞ্চাশ আর একশো নেই! এগারোটা পাঁচশোর নোট। তার মধ্যে বাজারটাজার করতে একটা চলেই গেছে। ব্যাস হাতে পৌনে চারশো টাকা আর দশটা পাঁচশোর নোট। আমি পথে! তা যা হোক, অনেক ঘাতপ্রতিঘাতের পর নিজেকে শিখিয়েছি যাই হোক বিচলিত হব না! তা পথ পেয়েও যাচ্ছি। দুটো বড় নোট একটু বেশী সব্জি কিনে ভাঙিয়ে ফেললাম। আর তারপর ব্যাঙ্কে দাঁড়িয়ে বার দুয়েক টাকাও তুলে ফেলেছি অচল আটটি পাঁচশো ফেরত দিয়ে। সময় যাচ্ছে বটে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে মজাও হচ্ছে। দুঃখও হচ্ছে। মানব জীবন দেখতে পাচ্ছি যেমন তেমন।

বয়স্ক এবং বিকলাঙ্গদের জায়গা করে দেবার ব্যাপারে দিল্লি অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে মহিলাদের প্রতি ব্যবহারে আবার লাইনেই আসে না। এক ভদ্রমহিলা, সন্তান কোলে আমার দু তিন জনের পিছনে ছিলেন বলে প্রথম দিকে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে অনুরোধ করতে গেলাম। সে বলে খাড়ে রহনে দো! লাও! মনে হচ্ছিল ব্যাটাকে এটিএম-এর মেশিনে ঢুকে পিস পিস করে দিই। কিন্তু মানবজাতি এখন অনেক সভ্য হয়ে গেছে। ভদ্র হয়ে গেছে। এখন আমরা কাউকে বিপন্ন দেখলে ছুটে গিয়ে সাহায্য করি না, রাস্তায় আহত কাউকে দেখলে পাস কাটিয়ে চলে যাই, আর তেড়ে সরকারকে গালাগাল দিই কাজ করার বা না করার জন্য! তাই স্বগতোক্তি করেই রাগ ছাঁটাই করতে হয়। সেইভাবেই আছি। খরচ কমিয়ে হিসাব কষে বেশ ভালোই আছি! বেচাল দেখলে লাফিয়ে পড়ে প্রতিবাদ করে প্রতিকার করার চেষ্টা করি। শুধু জিগির তুলেই ঢেঁকুরের মিঠা স্বাদ গ্রহণ করি না। অসুবিধাকে অসুবিধা বলে না দেখে চ্যালেঞ্জ ধরে নিয়ে হার্ডলস পেরিয়ে যাবার আনন্দ অনুভব করি! ব্যাস এই তো জীবন কালী দা!

তা তার মধ্যেই এক দুটো জোকস আর একটা সত্যি ঘটনা শুনতে পাই। যে বাড়িতে বিয়ে (এটা বলতে আমরা এখনও যে কেন মেয়ের বাড়ি বুঝি কে জানে!) সে বাড়ির একজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশিকা মেনে ব্যাঙ্কে গিয়ে আড়াই লাখ টাকা দাবি করেছেন। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার যতই বলছেন যে আপনার অ্যাকাউন্টে অত টাকাই নেই! কে শোনে কার কথা!

আর এটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক- আমার পরিচিত এক ঘটি বাঙালকে বিয়ে করেছিলেন। মানে এখনও বিবাহিত আছেন কিন্তু করেছিলেন গত শতাব্দীতে। তা বাঙাল ভদ্রলোক আবার প্রবাসী, মানে চেন্নাইতে বড় হয়েছেন। সব বাংলা গান রবীন্দ্রসঙ্গীত পল্লিগীতি ব্যান্ডের গানটান শোনেন নি। তা মহিলা দরদ দিয়ে গাইছিলেন, ‘রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে, দিনের শেষে…’ আর ভদ্রলোক ইনভ্যারিয়েবলি শুনেছেন বাঙাল! আর যায় কোথা! নতুন বিয়ে ভেঙে যাবার উপক্রম হয়েছিল। বাঙালকে জাত তুলকে খোঁটা? তা সে বিয়ে টিকে গেছে সে যাত্রা, কিন্তু সঙ্গে দিয়ে গেছে এই টাইমলেস গল্পগুলোকে!

আমাদের প্রত্যেকের জীবনই তো এক ঝুড়ি গল্পের কথামালা! এতো আনন্দ রাখি কোথায় বলুন তো? কেন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে! সরকার তো আনন্দেরও হিসাব রাখতে শুরু করেছে। আমেন!

Advertisements

(১৩৫)


11402381_10153397736595763_8016975454157146210_o
ব্লেড আর কলম ব্যবহার না করলে মরচে ধরে যায়। আবার অতিরিক্ত ব্যবহারেও এই দুটি ভোঁতা হয়ে যায়। তাই মধ্যপন্থা খুঁজে বার করা খুব জরুরী। কিন্তু সাম্যের গান গাহিয়া ভারসাম্য রক্ষা করতে তো সমগ্র মানবজাতিকে ভগা শেখান নি। তাই পা হড়কে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। ক্রিকেটে বোলারদের অধিনায়ক করলে তারা হয় বেশী বোলিং করে নয় তো কম বোলিং। বলি ভারসাম্যের বলি তো যত্র তত্র সর্বত্রই দেখা যায়। তাহলে আর আলাদা করে ফিসফাসের লেখককে দোষ দিয়ে কি করবেন বলুন? তারচেয়ে বরং সদ্য সমাপ্ত জামশেদপুর-কোলকাতা-দীঘা ত্রিকোণ প্রেম সফর নিয়ে কিছু মুখরোচক আর কিছু মিইয়ে যাওয়া গল্প বলি।

কথায় আছে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। সারা বছর ধরে স্বচ্ছতা নিয়ে মাতামাতি করে হঠাৎ করে মোদী সরকারের যোগের নামে হুটোপাটি করে ল্যাজে গোবর অবস্থা। সরকারি কর্মচারীদের কিসসু করার নেই হ্যাঁতে যদি হ্যাঁ মেলাতেই না পারলে তাইলে আর আমলা হলে কেন? সাধারণ মানুষের অবস্থা তো আরও করুণ।

কোনও এক অজ্ঞাত কারণে টিকিট বুকিং দু মাসের জায়গায় চার মাস আগে থেকেই করা যাবে। আরে বাবা সফর সূচী প্রধানমন্ত্রীরই চার মাস আগে পাকা হয়ে ওঠে না আর আমরা তো নশ্বর মানুষ। তাই প্রাপ্তি ওয়েটিং লিস্ট আর উৎকণ্ঠা। আর সকলের মতই ততকাল বুকিং-এর টোটকা এখনো ফিসফাস লেখক বার করে উঠতে পারে নি বলে জনসমুদ্রেই বিলীন হন।

এবারের গরমের ছুটি কাটাবার শুরু করার কথা ছিল জামশেদপুর থেকে, কিন্তু টিকিট কাটছি কাটব করে সময় কেটে যায়। আর লাইন সংরক্ষিত টিকিট পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় ওয়েটিং লিস্টে। প্রথমে বিশেষ পাত্তা না দেওয়া, “ও হয়ে যাবে” ভেবে। তারপর ধীরে ধীরে যখন সময় দাঁত নখ বার করতে শুরু করে তখন, দাদা ধরার তাড়া। সাধারণ ক্ষেত্রে নিজের জন্য কখনই ভিআইপি কোটার ব্যবহার করি না। কিন্তু এবার তো চাপ বাপ বাপ বলে ডাক দিয়েছে। শ্বশুরবাড়ির দেশে যাব আর টিকিট কনফার্মড না হলে মুখ পুড়বে। তাই বাধ্য হয়েই পিএনআর নম্বর দিয়ে পাঠালাম যথাস্থানে। যাত্রার ঠিক দুদিন আগে খবর এল, নাও হতে পারে।

মরেছে! জামশেদপুর থেকে কোলকাতা, কোলকাতা থেকে দীঘা, দীঘা থেকে কোলকাতা এমন কি যাবার আগের আগের দিন কোলকাতা থেকে ফেরার টিকিট যা কিনা শতাধিক ওয়েটিং লিস্টে ছিল তাও কনফার্মড হয়ে গেল। অথচ শ্রী গণেশই গোঁসা করে বসে। তাও তদ্বির তকদির লাগিয়ে ব্যাগ গুছোতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

তারপর আমার অফিসের বড় বস আবার বলে বসলেন যাবার আগের দিন নাকি পাটনা যেতে হতে পারে। আমি অনেক করে বোঝালাম যে প্যাকিং ট্যাকিং কিসসু হয় নি। ছোট বাচ্চা নিয়ে যাওয়া টাওয়া চাপ হয়ে যাবে। শেষে নিরস্ত্র করা গেল। পরে অবশ্য জানা গেল যে অনুষ্ঠানের পূর্বালোকনের জন্য আমাকে পাঠানো হচ্ছিল সেই অনুষ্ঠানটিই বাতিল হয়ে গেছে আদর্শ আচার সংহিতার পাল্লায়। বিধানসভা নির্বাচন বলে কথা। হুঁ হুঁ বাওয়া সবার উপরে কমিশন সত্য তাহার উপরে নাই।

তবুও আশায় বুক বেঁধে বাক্স প্যাঁটরা বেঁধে আগের দিন ট্যাক্সি ফর সিওরে বুক করলাম। মেল এল স্টেশনে যাবার ট্যাক্সি আসবে অথচ মেসেজ এল আসবে না। দ্বিধা কাটাতে যাত্রার দিন সকালে তাদের গ্রাহক পরিষেবার ফোন করলাম। তারা আশঙ্কা সত্যি করে দিল। শেষে ওলা ক্যাবস বুক করলাম। যাবার ঠিক ১৫ মিনিট আগে ড্রাইভারের বিস্তৃত বর্ণনা এল, সেই অনুযায়ী ফোন করলাম। সে বলে আমার গাজিয়াবাদ ঢোকার পারমিট নেই। খেলে যা। তার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই রিগ্রেট এসএমএস এসে গেল। ওলা অপারগ।

শেষে চার্ট তৈরী হবার আগেই যাত্রা শুরু করলাম অটো করে। যেতে যেতে এসএমএস এল দুটি টিকিট কনফার্মড হয়েছে আর আমার ছেলেরটি হয় নি। সে তো বিদ্রোহ করে বসল। তাকে ছাড়া আমরা যেতে পারিই না। তাকে বুঝিয়ে বাঝিয়ে ফোন ধরলাম বিশেষজ্ঞদের। অনলাইন বুকিং-এ তো আবার ওয়েট লিস্টেড টিকিট সরাসরি রিফাণ্ড হয়ে যায়। তা নানা মুনির নানা মত! একজন বলে, “সুপারফাস্টের জেনারেল টিকিট কেটে চড়ে পড়” ভাল কথা। তা রাজধানীর তো জেনারেল থাকে না। কে বোঝায় কাকে! আরেক গন্যিমান্যি বলেন, “এমনি এমনি চড়ে পড়ো, টিটিকে বলবে তুমি জানতে না”। ইল্লি আর কি, টিটি তো বোকা পাঁঠা আর আমরা চকিত চপলা হরিণী।

তা শেষে সেই বাতলে দিল, যদি হেড অফিস কোটা থেকে হয়ে থাকে তাহলে কিচ্ছু করতে হবে না। অতিরিক্ত চাহিদা থাকায় সবগুলো হয় নি। তা টিটি এসেও দেখলাম সেই কথাই বলল। এক দিক দিয়ে নিশ্চিন্ত। কিন্তু ভুবনেশ্বর রাজধানীর বার্থগুলি আবার ছোট ছোট। একটায় পার্শ্ববর্তিনী মেয়েকে নিয়ে আর একটায় আমি আর ছেলে। দুজনেই দুজনকে কষে লাথি গোঁত্তা মরে গত বারো বছরের যত রাগ আছে মিটিয়ে নিলাম। আর মেয়ে সেই ফাঁকে পুরো কামরা জুড়ে জমিদারী পরখ করে শেষমেশ বই খাতা পেন্সিল নিয়ে ট্রেনের মেঝেতে উবু হয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করতে লাগল। এই ভাবেই পৌঁছে গেলাম জামশেদপুর।

অবশ্য রাজধানীর খাবার দাবারের অবস্থা কহতব্য নয়। শিয়ালদা রাজধানী আগে অন্তত পুঁটি মাছের ফ্রাই দিত। ভুবনেশ্বর রাজধানীতে তো রাতের কন্টিনেটালে ভেজিটেবল সেদ্ধই দিয়ে দেয়। ব্রেডের কথা জিজ্ঞাসা করলে বলে সাড়ে দশটায় কানপুর এলে ব্রেড দিতে পারবে। শেষে স্যুট বুটের সঙ্গে তিলক কেটে সাদা দই খেয়েই পেট ভরাই।

জামশেদপুরের পুরনো তারগুলির সঙ্গে এবার জোড়া লাগল নতুন তার বারিন দার সঙ্গে দেখা। তারপর অবশ্য বিশেষ ভোগান্তির গল্প হল না, শুধু মাত্র যে রাতে হাওড়া তার দুয়ার খুলে দিল ঝড়ে সে রাতে ভিজে ভিজে বাড়ি এসে পৌঁছলাম সাড়ে দশটায়। আহা কোলকাতা আমার, ছেড়ে দিলেও শহরটা আমায় ছাড়ে না। কোথাও না কোথাও আস্টেপিস্টে জড়িয়ে রাখে অর্জুন গাছের মত।

তাই আমি এলে সৃষ্টিসুখের বইপ্রকাশ, পুরনো কূট সাহিত্যের বন্ধুদের সঙ্গে জিটি আর স্কুলের সহপাঠী পাঠিনীদের সঙ্গে আড্ডা তো বাঁধাই থাকে। সঙ্গে কিছু নতুন বন্ধুর পুরনো হয়ে যাওয়া আর পুরনো বন্ধুদের নতুন করে ফিরে পাওয়া। এর সঙ্গেই থাকে আমাদের শিকড়ের টান। যে সব শিকড়গুলো আমাদেরকে ঘিরে ধরে বড় করে তুললো তাদের বৎসরান্তে একটা সন্ধ্যা, একটা সকাল বা একটা বিকেল দিয়ে জোরদার করে তোলা। বলে যাওয়া আবার আসব আমরা আবার একসঙ্গে বসে কিছুটা সময় জীবন কাটাব আমরা।

রূপঙ্কর দা-র সঙ্গে গল্প লেখা গদ্য লেখা নিয়ে হুল্লাট আড্ডা, কিশোর দা, কৌশিক দা, তমাল, অতনু, ইন্দ্রনীলদা, সুবীরদা, সোমা, রাজা দা, বাসু দা, শুদ্ধ, ইন্দ্রাণী, হরি দা, কোয়েলি, সুস্মিতা দি, অমিতাভ, বক্সী, কেয়ার বইপ্রকাশ, সামরানদির পুরস্কার প্রাপ্তি, সরোজ, সিদ্ধার্থ- মিঠুন পেরিয়ে স্কুলের গণ্ডির এক্কা দোক্কা।

এর মধ্যেই মনে থাকে অ্যাকাদেমি চত্বরে রূপঙ্কর দার সঙ্গে আড্ডার সময় হঠাৎ পেনের দরকার পড়লে পাশের টেবিলের সদ্য তরুণীটি বলে ওঠে আমার বই পড়তে খুব ভালো লাগে। আর বই উপহার পেয়ে কিশোরীর মত খুশীতে ভরে ওঠে সে। বলে, আমি নিশ্চয় জানাবো কেমন লাগল। আমার বই কাউকে দিই না। আগলে রাখি! বইয়ের গন্ধটাই যে আলাদা হয়।

এর মাঝে প্রিয়জনের অসুস্থতা আবার সেই বয়স্কদের অসহায়তা সামনে এনে দেয়। কথায় বলে সরকারী পেনশনপ্রাপকরা নাকি সবথেকে সুখী সরকার তাদের জন্য পেনশন দিচ্ছে, স্বাস্থ্য সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু কোলকাতা ছেড়ে পরবর্তী প্রজন্ম যে প্রবাসে পাড়ি জমায় তখন তাদের সঙ্গ কে দেয়? আর সরকারী স্বাস্থ্য পরিষেবার পেয়ারায় যে পোকাগুলো বাস করে, সেগুলোকে যত্ন করে সরিয়ে দেবার লোকের বড়ই অভাব। খোঁজ নিন পাঠক পাঠিকারা, খোঁজ নিন আমাদের আগের প্রজন্ম কেমন আছেন? আমাদের মুখের দিকে তাকিয়েই তাদের জীবন কাটছে নাকি সেখানেও অন্ধকার?

ফিরে আসার সময়, ট্রেনের মধ্যেই দুটো ঘটনা মনে থেকে যাবে। শিয়ালদায় নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বার্থে গিয়ে দেখি সেখানে সর্দারনি হাজার খানেক বাক্স প্যাঁটরা আর খান দশেক কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে বসে আছে। বড় গলায় বললেন তাদের নাকি চারটে বার্থ আছে। আমি বললাম আমাদেরই তিনটে আছে তো তাঁদের চারটে কি করে হয়? হয় হয় zaনতি পার না। দুই আর দুইয়ে পাঁচ হলে চার আর তিনে ছয় হবে না কেন? সন্দেহ হতে চার্টে গিয়ে দেখি কোন এক মহাপাত্র এবং পুরকায়স্থ আছেন আর আছেন এক মালাকার, তিনি আবার দূর্গাপুর থেকে উঠবেন। সে কথা বলতে সর্দারনি বললেন তিনি জানেন, তাঁদের বার্থ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে বলে সর্দারগুলো সেগুলো খুঁজতে গেছে। আমি বললাম সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন “তো?” “ধিরজ রাখো, অন্দর অন্দর নিকল জায়েঙ্গে!” আমি বললাম “আর আমরা?” তিনি তেড়িয়া হয়ে বললেন, দশ মিনিট রুকনে সে কেয়া ট্রেন নিকল জায়গা?” অকাট্য সর্দারি যুক্তি। নীচে নেমে ওদের মধ্যেই যে একটু পাগড়ি খোলা মুক্ত হাওয়া ছিল তাকে বলতেই পরিষ্কার হল কেসটা। এদের বুকিং বি ১ এবং ২য়ে। অতটা পথ পেরতে গেলে হাঁপিয়ে যাবে বলে সর্দারনি ইচ্ছে মতো জায়গা দখল করে বসে আছে। শেষে কামরা শুদ্ধ লোককে রেহাই দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়ে সর্দারকুল বিদায় নিল। মহাপাত্রবাবু বললেন, যে তিনি বেজায় ঘাবড়ে গেছিলেন। তিনি নিজের জায়গায় বসতে যেতেই নাকি সর্দারনি তাকে হুকুম করেছিলেন যে তাদের বার্থ বি১এ আছে এবং মহাপাত্র বাবুকে সেখানেই যেতে হবে। শেষে আমি মিষ্টি কথায় বলতে নাকি তিনি একটু সাহস পেলেন।

আর দুটি বিজাতীয় বাচ্চা চৌবাচ্চার মতো বাঁদরামো করে যাচ্ছিল। তাদের মা এক একবার বকছে আবার তারপরেই তারা কান্না জুড়লে ভোলাতে গিয়ে বলছে মার মুঝে। বোজো ঠ্যালা। তাদের মা একবার আমায় বললেন, “ভাইয়া ডাঁট দিজিয়ে জোরসে! নেহি তো শুনেগা নেহি!” তা সে আমার কেন। এক আরপিএফ জোয়ান বন্দুক দেখালেও তারা হ্যা হ্যা করে। শেষে রাত দশটায় পার্শ্ববর্তিনীর সিংহি নাদে তারা চুপ করে।

তারপর? তারপর আর কি? ট্রেন ফেরার পথে তুমুল বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে পড়ে সাহিবাবাদে, নেমে পড়ে ট্যাক্সি সার্ভিস থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সময়ের আগেই বাড়ি। কিন্তু পৌঁছতে পার্শ্ববর্তিনীর বৃষ্টিবাবদ নতুন মোবাইল হারানো এবং তারপর বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের রক্তদান শিবিরে রক্তদান করে পাকাপাকি দিল্লি মোডে ফিরে আসা।

সেদিন আবার যোগা দিবস। সারা জীবন ধরে যারা লাভ ক্ষতির হিসেব রাখতে পারে না সেই চল্লিশ হাজার ভারতীয় রাজপথে জড় হয়ে সুস্থ শরীরকে ব্যস্ত করে তোলে। প্রায় সত্তর বছর পেরিয়েও দেশের মেরুদণ্ড সোজা হল না। স্টান্টবাজদের পাল্লায় যেন এক একুশে জুনেই হয়ে যাবে! যাই হোক স্বপ্ন দেখতে তো স্বচ্ছ ভারত সেস লাগে না। তাই এই আকালেও চলতে থাকুক স্বপ্ন দেখা আর চলতে থাকুক ফি বছর শিকড়ের কাছাকাছি ফিরে যাওয়া। শিকড়ের টানটাই তো আমাদের উড়তে দেয় আকাশে ঘুড়ির মতো। লাটাই গোটাতে গোটাতে যেন সুতো ছিঁড়ে না যায়। মাঞ্জাটা ভাল হওয়া চাই মামা! বৃষ্টি আসবেই…
11402381_10153397736595763_8016975454157146210_o

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ সারা ময়দান মার্কেট ঘুরেও একটা দরের মোহনবাগান জার্সি পেলাম না। ক্লাবগুলোর এবার ভাবার সময় হয়েছে মার্চেন্ডাইজিং নিয়ে।