(১৬৩)

 

উফফ কত্তদিন বাদে দেখা বলুন তো? কেমন আছেন পাঠক/ পাঠিকারা? এর মধ্যে গঙ্গা দিয়ে প্রচুর জল আর যমুনা দিয়ে প্রচুর অ্যাসিড বয়ে চলে গেল! চাঁদের রঙ নীল থেকে বদলাতে বদলাতে হলদেটে হয়ে গেল! আর দু চারটে পাকা চুল মাথায় গালে বংশ বৃদ্ধি করে ফেলল!

আমার খবর? তা খবর বলতে দুটো-
এক) সৃষ্টিসুখ প্রকাশন থেকে একটা গল্পের বই প্রকাশ পেল আমার। ‘ইয়র্কার এবং অন্যান্য গল্প’। দিল্লিতে পুজোয় আর কোলকাতায় বন্ধুদের সঙ্গে তার হইহই করে উন্মোচন হয়েও গেল মোড়ক।
দুই) অবসরে প্রকাশিত ফিসফাস কিচেন এখন কলেবর বাড়িয়ে বই আকারে আসতে চলেছে বইমেলায়!
সবই আপনাদের ভালোবাসা আর কি!

তা যাই হোক, আজ বেশী ফেনাব না! ছোট ছোট গল্পে এতকালের অদেখা যাপন কাটিয়ে নেব আপনাদের সঙ্গে। নম্বর টম্বরের দরকার নেই! কি বলেন?

গাড়িটাকে নিয়ে মাঝে খুব ভুগলাম জানেন! যদিও নব্বই হাজার কিলোমিটার সঙ্গ দিল! এখনও হাজার তিরিশ চল্লিশ আরামসে দিয়ে দেবে! কিন্তু নিজের গুরুত্ব বোঝাবার জন্য মাঝে মাঝেই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে! সেখানেই সমস্যা!

একদিন আইটিও ফ্লাইওভারের পরেই ক্লাচের তার কেটে বসল! আর যাই কোথা! ঠেলতে শুরু করলাম এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে। অভ্যাস নেই। কোন রকমে ঠেলতে ঠেলতে কিছুদূর যাবার পর দিলাম এক গাড়ির সাইডে ঠুকে। সে আমার সেই অবস্থাতেও বেরিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ করে বসল। লাও! ঠাণ্ডা গলায় বললাম, ‘দেখো জি! থককে চুর হো গয়া! ঝগড়া করনে কা একদম মুড নেহি হ্যায়! যাদা বোলোগে তো ও যো পাত্থর পড়া হুয়া হ্যায় আপকে সরপে বইঠা দুঙ্গা! সেও হেবিজোর ঘাবড়ে গিয়ে চেল্লামেল্লি লাগাল! আমি পাত্তা না দিয়ে চলতে শুরু করলাম।

দেড় কিমিটাক চলার পর এক অটো এগিয়ে এল সাহায্যের পা নিয়ে! ড্রাইভারটি একশোটি টাকার বিনিময়ে পা দিয়ে ঠেলে দেবে অটো চালাতে চালাতে! এইভাবে যদি কিছুদূর যাওয়া যায়! গেলামও! তিন কিমি দূরের এক মেকানিক শপের সামনে যখন পৌঁছলাম তখন বাজে সাড়ে ছটা। সেদিন আবার রিহার্সাল। পার্শ্ববর্তিনীকে বললাম ওলা বুলা লো! তার মধ্যে আবার টিপটিপ বারিশ! আর মেকানিক দেখে বলল, ওয়েল্ডিং খুলে গেছে, এখন লাগানো সম্ভব হবে না! লাও ঠ্যালা! অটোটাকেও ছেড়ে দিয়েছি!

কোন অটোই আর অ্যাটলাসের বোঝা বইতে রাজী হচ্ছে না! ক্রসরোড বলে এক দীনবন্ধু কোম্পানির মেম্বারশিপ নেওয়া আছে। যদি বিপদে আপদে সাহায্য করে! তা সে বলল রাত দশটার আগে গাড়ি টেনে নিয়ে যেতে আসবে না! সামনে এদিকে রেললাইনের নীচ দিয়ে যাবার জন্য আণ্ডারপাস। তারও আগে রাস্তা অর্ধেক তৈরী হয়েছে বলে বাঁ দিকে জল জমে আছে! যা থাকে কপালে! ঠেলা লাগালাম। গত আড়াই ঘন্টায় গাড়ি ঠেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ঠিক কায়দা করে জলের উপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে আমি নিজে শুকনোর উপর দিয়ে হেঁটে এলাম। বৃষ্টি তখন থেমেই গেছে। কিন্তু ভিজেই গেছি, ঘামে! তারপর ঢালে দাঁড়িয়ে গাড়ি ঠ্যালা দিয়ে ঠনঠনে হাঁটু নিয়েই লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিতেই গিয়ারে ফেলা গেল! যাক বাবা, বলে আণ্ডারপাস প্রায় পেরিয়ে এনেছি ও বাবা সামনে গাড়ির জ্যাম দেকে উল্টো ঢালেই গেল গাড়ি বন্ধ হয়ে। মাঝ রাস্তায় ব্রেক মেরে চুপচাপ বসে আছি। পিছনে ভঁকভঁক হর্ণ পড়ছে গাড়ির লাইন! কিন্তু বেরব কি করে? ব্রেক থেকে পা সরালেই গাড়ি হড়কাবে পিছনের দিকে। হ্যাণ্ডব্রেকে কাজ হবে না! যাই হোক কয়েকজন অটোওলা ছিল কাছাকাছিই তাড়া ছুটে এসে ধরল পিছনের দিকে তারপর ধাক্কা দিয়ে দিল। আর গাড়িও গিয়ারে মেরে চালু করে দিলাম।

বেশী না, আধ কিমি! তারপরেই রেডলাইট। যাই হোক এগোতে শুরু করলাম। গলির দিকে! সামনে একটা গাড়ি রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়িতে নটা বেজে গেছে। অনুরোধ করতে গেলাম গাড়ি সরাবার। জ্ঞান দিয়ে বসল, অ্যা্যসে থোড়ি হোতা হ্যায়! আপ টো করওয়ানে গাড়ি বুলালো ইত্যাদি! যাই হোক। কোন রকমে ম্যানেজ করে গলির মধ্যে ঢুকতে হেল্প জুটে গেল। পৌনে দশটায় গলির মুখে আরেকটা ঢালে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করলাম এক ঠ্যালা মারুন! দিয়েও দিল! ব্যাস আর দেড়শো মিটার ভোঁ ভাঁ হর্ণ দিয়ে পৌঁছে গেলাম বাড়ির কাছে। তারপর রিহার্সাল (মিউজিক রিহার্সাল ছিল) দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পরের দিন গাড়ি সারিয়ে।

তা বেশ ছিল। সার্ভিসিং করাব করাব ভাবছি তার আগে শনিবার গ্রেটার নয়ডার স্কুল থেকে ছেলেকে আনতে যাচ্ছি। বেশি না, বাড়ি থেকে ৪৫ কিমি। নয়ডার মহামায়া ফ্লাইওভারের পর আরও পঁচিশ। তা মহামায়া ফ্লাইওভার পেরিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে পড়তেই ফটাং করে আওয়াজ! ক্লাচ গায়েব! লাও ঠ্যালা! ভাগ্যিস গাড়ি ফোর্থ গিয়ারে। আমি ক্লাচ ছাড়াই গাড়ি ষাট-আশি গতিতে চালাচ্ছি, বন্ধুকে ফোন করলাম, গ্রেটার নয়ডায় থাকে গাড়ির ঘাঁট ঘোঁট জানে। বলল পঁচিশ কিমির শেষে এক মার্কেটে মেকানিক আছে! গাড়ি টো করতেও পারবে! আমি বললাম আমি মাথা ঠাণ্ডা করে চালাচ্ছি, কোথাও থামব না! বড় কিছু ঝামেলা না হলে পৌঁছিয়েও যাব সেই অব্ধি! কিন্তু তারপরেই দরকার। তো ফোন করে দিলাম। আর আধ ঘন্টা ক্লাচ ছাড়াই কায়দা করে চালিয়ে পৌঁছেও গেলাম। সে অপেক্ষাতেই ছিল। কাদির নাম তার! যত্ন করে ঠিক ঠাক করে দিল। আর পরদিন বাড়ি ফিরেই দিয়ে দিলাম সার্ভিসিং করাতে।

তারপর আর কি! দিন দুয়েকের মধ্যেই “মেরে পেয়ারে দেশবাসীও কাল কুছ যাদাই হো গয়া থাআআ!” ব্যাস গেলো কাণ্ড। পরের দিন গাড়ির ফাইনাল সার্ভিসিং করিয়ে পেমেন্ট করব বলে ব্যাঙ্ক থেকে পাঁচ হাজার ছশো টাকা তুলতে গেছিলাম সেই সন্ধ্যাতেই! তা এটিএম ব্যাটা বলে পঞ্চাশ আর একশো নেই! এগারোটা পাঁচশোর নোট। তার মধ্যে বাজারটাজার করতে একটা চলেই গেছে। ব্যাস হাতে পৌনে চারশো টাকা আর দশটা পাঁচশোর নোট। আমি পথে! তা যা হোক, অনেক ঘাতপ্রতিঘাতের পর নিজেকে শিখিয়েছি যাই হোক বিচলিত হব না! তা পথ পেয়েও যাচ্ছি। দুটো বড় নোট একটু বেশী সব্জি কিনে ভাঙিয়ে ফেললাম। আর তারপর ব্যাঙ্কে দাঁড়িয়ে বার দুয়েক টাকাও তুলে ফেলেছি অচল আটটি পাঁচশো ফেরত দিয়ে। সময় যাচ্ছে বটে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে মজাও হচ্ছে। দুঃখও হচ্ছে। মানব জীবন দেখতে পাচ্ছি যেমন তেমন।

বয়স্ক এবং বিকলাঙ্গদের জায়গা করে দেবার ব্যাপারে দিল্লি অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে মহিলাদের প্রতি ব্যবহারে আবার লাইনেই আসে না। এক ভদ্রমহিলা, সন্তান কোলে আমার দু তিন জনের পিছনে ছিলেন বলে প্রথম দিকে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে অনুরোধ করতে গেলাম। সে বলে খাড়ে রহনে দো! লাও! মনে হচ্ছিল ব্যাটাকে এটিএম-এর মেশিনে ঢুকে পিস পিস করে দিই। কিন্তু মানবজাতি এখন অনেক সভ্য হয়ে গেছে। ভদ্র হয়ে গেছে। এখন আমরা কাউকে বিপন্ন দেখলে ছুটে গিয়ে সাহায্য করি না, রাস্তায় আহত কাউকে দেখলে পাস কাটিয়ে চলে যাই, আর তেড়ে সরকারকে গালাগাল দিই কাজ করার বা না করার জন্য! তাই স্বগতোক্তি করেই রাগ ছাঁটাই করতে হয়। সেইভাবেই আছি। খরচ কমিয়ে হিসাব কষে বেশ ভালোই আছি! বেচাল দেখলে লাফিয়ে পড়ে প্রতিবাদ করে প্রতিকার করার চেষ্টা করি। শুধু জিগির তুলেই ঢেঁকুরের মিঠা স্বাদ গ্রহণ করি না। অসুবিধাকে অসুবিধা বলে না দেখে চ্যালেঞ্জ ধরে নিয়ে হার্ডলস পেরিয়ে যাবার আনন্দ অনুভব করি! ব্যাস এই তো জীবন কালী দা!

তা তার মধ্যেই এক দুটো জোকস আর একটা সত্যি ঘটনা শুনতে পাই। যে বাড়িতে বিয়ে (এটা বলতে আমরা এখনও যে কেন মেয়ের বাড়ি বুঝি কে জানে!) সে বাড়ির একজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশিকা মেনে ব্যাঙ্কে গিয়ে আড়াই লাখ টাকা দাবি করেছেন। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার যতই বলছেন যে আপনার অ্যাকাউন্টে অত টাকাই নেই! কে শোনে কার কথা!

আর এটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক- আমার পরিচিত এক ঘটি বাঙালকে বিয়ে করেছিলেন। মানে এখনও বিবাহিত আছেন কিন্তু করেছিলেন গত শতাব্দীতে। তা বাঙাল ভদ্রলোক আবার প্রবাসী, মানে চেন্নাইতে বড় হয়েছেন। সব বাংলা গান রবীন্দ্রসঙ্গীত পল্লিগীতি ব্যান্ডের গানটান শোনেন নি। তা মহিলা দরদ দিয়ে গাইছিলেন, ‘রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে, দিনের শেষে…’ আর ভদ্রলোক ইনভ্যারিয়েবলি শুনেছেন বাঙাল! আর যায় কোথা! নতুন বিয়ে ভেঙে যাবার উপক্রম হয়েছিল। বাঙালকে জাত তুলকে খোঁটা? তা সে বিয়ে টিকে গেছে সে যাত্রা, কিন্তু সঙ্গে দিয়ে গেছে এই টাইমলেস গল্পগুলোকে!

আমাদের প্রত্যেকের জীবনই তো এক ঝুড়ি গল্পের কথামালা! এতো আনন্দ রাখি কোথায় বলুন তো? কেন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে! সরকার তো আনন্দেরও হিসাব রাখতে শুরু করেছে। আমেন!

(১৩৯)


ধরা যাক রাত সাড়ে নটার সময় একটি চারলেনের রাস্তায় আপনি একা একা হাঁটছেন। আপনার একশো হাতের মধ্যে কোন জনমনিষ্যি দেখতে পাচ্ছেন না। গ্যাসলাইটের আলো মাঝে মাঝেই ব্রেক দিচ্ছে অন্ধকারকে জায়গা করে দিতে। পাশের জানকী দেবী কলেজের গেট পেরিয়ে জঙ্গলের মতো মাঠ উঁকি দিচ্ছে। রাস্তাটা একটু গিয়ে বাঁক নিয়েছে সেখানে হয়তো বেশ কিছু লোক রয়েছে। ডানদিকের রাস্তার ওপারের বাড়িগুলোর জানলাগুলো সবই এসি মেশিনের খাঁচা দিয়ে ঢাকা।

এমন সময় একটা পাঠান টাইপের দেখতে গুঁফো মস্তান মতো লোক কাঁধে ঝোলা ফেলে পাশের গলি থেকে ঠিক আপনার পিছনের দশ পা দূরে আপনার সঙ্গী হল। এমনিতে আপনার গায়ে যে খুব একটা কম জোর তাও নয়। তবুও পরিবেশ আর আবহাওয়া শক্তির প্রায় তিরিশ শতাংশ শুষে নিয়েছে। শহরের রাস্তা, চিৎকার করলেও একটা ঝিঁঝিঁ পোকাও আপনাকে দেখতে আসবে না। সাহায্য করা তো দূরের কথা।

আপনি গতি বাড়ালেন, সেও বাড়ালো। দশ পা ক্রমে ক্রমে নয় আট সাত করে চারে! আপনি আরও জোরে হাঁটলেন। চার বেড়ে ছয় হল কিন্তু আবার কমে দুই। মোড়টা দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের আউট গেট- গেট কিপার- দুটো টোটো রিক্সা- একটা চায়ের দোকান- আরও কিছু লোকজন! আপনি পড়ি কি মরি করে দৌড় লাগালেন! লোকটা হাঁটছে, কিন্তু বড় বড় পায়ে যেন আপনার ঘাড়ের কাছে উঠে আসছে। নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন আপনি। গরম গরম নিঃশ্বাস আপনার ঘাড়ে পড়ে ঠাণ্ডা বরফ ছাপ হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের গেটের দিকে আপনি ঘুরে গেলেন লোকটাও ঘুরল। সামনেই সিকিউরিটি রুম, কিন্তু লোকটা যেন সব কিছু অগ্রাহ্য করেছে আজ। আপনার দমে টান পড়ছে। সিকিউরিটি রুমটা পেরিয়েই ক্যান্টিন। চোখ বুজে ছুটে ঢুকে পড়লেন আলো মিলিয়ে। কি আশ্চর্য লোকটাও ঢুকে পড়েছে। ভয় ডর বলে কিছু নেই না কি?

জল একটু জল চাই! দৌড়ে গিয়ে ওয়াটার কুলারটার উপরে রাখা প্লাস্টিকের জলের গ্লাসটা নিয়ে কল খুলে দিলেন আর তার তিন সেকেণ্ড পরেই গ্লাসের সমস্ত ঠাণ্ডাটা গলা বেয়ে শিরদাঁড়া চুঁইয়ে নামতে লাগল। আর আপনি পরম বিস্ময়ে দেখলেন, লোকটা আপনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ক্যান্টিনের কাউন্টার থেকে দু কাপ চা নিয়ে হাসপাতালের মেন বিল্ডিং-এর দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। যাক বাবা খুব জোর বাঁচা গেছে!

এদিকে লোকটা বিল্ডিং-এর চার তলায় নির্দিষ্ট ঘরে গিয়ে পূর্বপরিচিত দুজনের হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে ফিচ ফিচ করে হাসতে হাসতে ঘটনাটা বলতে লাগল। অবশ্য আপনি সেটা শুনতে বা দেখতে পেলেন না। কিন্তু মনে মনে ভাবলেন খুব বাঁচান বেঁচেছেন আজ! অবশ্য আপনি এটাও বুঝতে পারলেন না পরের দিন দুপুরে লোকটা ফিসফাস বলে একটা ব্লগে আপনার ভয় পেয়ে গলা শুকিয়ে যাবার ঘটনাটা রসিয়ে রসিয়ে লিখেও দিল। যান খুব কমের উপর দিয়ে গেছে যখন তখন আপনাকে আর ঘাঁটাব না। বরং আসুন লোকটা কি বলছে দেখি।

কি আর বলব মশাই! রাত বিরেতে জনমনিষ্যিহীন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ যদি খেয়াল করেন যে আপনার ঠিক আগের লোকটা আপনার সঙ্গে রেস লাগাচ্ছে, তাহলে খাবার হজম করার ফিকিরে আপনিও কি তাল মেলাবেন না? মেল ইগো বলে কথা! আমেন!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এমনিতে মাঝেসাঝেই বিখ্যাত ব্যক্তিদের সফর সঙ্গী হবার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তা আর এমন কি? তবে কদিনের আগে লণ্ডন যেতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আমার সফর সঙ্গী হলেন। মানে আমি লণ্ডন যাচ্ছিলাম না, দিল্লি যাচ্ছিলাম। (প্রয়োজন ছিল না বলার! কিন্তু প্রঃ পুঃ বলে কথা!!) তা তিনি দেখলাম লাইন দিয়ে চেক ইন করলেন, এবং ইকোনমি ক্লাসে ঢুকে সকলকে নমস্কার জানিয়ে বলবার চেষ্টা করলেন, “আমরা সকলে তাহলে দিল্লি যাচ্ছি!” টাইপের কিছু একটা। কিন্তু ব্যাপারটা এতই অবভিয়স যে কেউ আর বিশেষ সাড়া দিল না। তিনিও নিজের সিটে গিয়ে বসে পড়লেন। সোশাল মিডিয়া খুললেই যেখানে ভদ্রমহিলার খিল্লি ও মেমেতে ভরপুর, সেখানে এই ধরণের ব্যবহার (যদি অভিনয় হয় তাও হোক না!) বেশ চমক জাগানো। আমি যে ভদ্রমহিলার বিশাল বড় পাখা সেটা আমার বৃহত্তম শত্রুও বলবে না। খারাপটাকে খারাপ যখন দিল খুলে বলি, ভাল জিনিসকে ভাল বলতেই হয়। দিল্লির ভিআইপি কালচারে গত ষোল বছর ধরে দিন গুজরান করেই বলছি, এটা সত্যিই বিরল। এক মনোহর পারিক্কর ছাড়া কাউকেই বিশেষ দেখি টেখি নি! ভুল হলে শুধরে দেবেন পাঠক পাঠিকারা।

প্রঃ পুঃ ২- গত কয়েকদিনের কয়েকটি মৃত্যু এবং ততসম্বন্ধীয় ঘটনায় মনে হয়েছে সমালোচনা করার অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব বলেও একটা ব্যাপার আমাদের ঘাড়ে অদৃশ্যভাবে চেপে বসে। যত তাড়াতাড়ি আমরা সেটাকে পাকড়াও করতে পারি ততই মঙ্গল। দেশের, দশের কিম্বা একের!

(১১৮)

মাঝে মাঝে কিছু দিন একে দুইয়ে মিশে গিয়ে এক দিন হয়ে যায়।

এই যেমন শনিবারের কথাই ধরুন। পিকে নিয়ে বেশ হাইপ্স অ্যাণ্ড হুপলা শুনছিলাম এবং সমালোচনাগুলো আস্তে আস্তে আসতে শুরু করেছিল।

তা শনিবার সকালে এমনিতেই গোল্লা চোখ নিয়ে ভারত অস্ট্রেলিয়া দেখার কথা ছিল। কিন্তু সে দেখা কি যে দেখা। বুকমাইশোতে একটা করে ক্লিক করি আর একটা করে উইকেট পড়ে। কুড়ুমের কম্পিউটার কোথাকার।

যাই হোক পিকে দেখতে সকাল সকাল হাজির হয়ে গেলাম কাছাকাছি একটি মাল্টিপ্লেক্সে। কেমন সিনেমা, ব্যাকগ্রাউণ্ড স্কোর, সিনেমাটোগ্রাফি ইত্যাদি গুলি মেরে আসল কথায় আসি।

দেখুন পাঠক পাঠিকারা, একটু আধটু বইটই, বিশেষত কবিতার বইটই পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে যে সহজভাবে যদি কিছু কঠিন কথা কম সময়ে হাসতে খেলতে বলে দেওয়া যায় তার যা প্রভাব ও প্রসার তা বোধহয় গম্ভীর কথা নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে হুম হাম সহযোগে বলার থেকে কিঞ্চিত বেশীই হবে। তার জন্যে প্রয়োজনে ক্লিশে ব্যবহার করুন চমক দিন। কিন্তু ট্রেন যেন সর্দারজীর খোঁজে বেলাইনে না যায়।

আমি সমান্তরাল সিনেমার যে বিশাল ভক্ত তা তো নয়। এই তো আগের ফিসফাসেই ডিডিএলজে নিয়ে বলতে গিয়ে ভালো খারাপের প্রভেদ করতে পারলাম না। তবে কি জানেন, পরিবর্তিত সময়ে যদি গোডো বাবুর জন্য অপেক্ষাতেই জীবন অতিবাহিত করি তাহলে বাপু আমার মাহেন্দ্রক্ষণ মাছরাঙার মুখেই ধরা পড়ে যাবে আর আমার ছিপ থেকে যাবে খালি। বিশেষতঃ এই সব বাবাজীদের আসল রূপটা যখন সমাজের ঘুণের প্রতিচ্ছবিগুলোকে আরও স্পষ্ট করতে শুরু করেছে তখন তাদের ঘেঁটি ধরে তর্কের সরলতা দিয়ে আম কে আম আর আঁটির দাম করে দিলেই তো সাধারণ মানুষের কাছে তার সাফল্য। আর এইখানেই পিকে জিতে গেল বলে আমার মনে হল।

প্রচুর রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। আমির খানকে নগ্ন করে হাজির করানোর মধ্যে দিয়ে দেখানো যে খালি মনে যদি প্রশ্ন করা শুরু করা হয় তবেই সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছয়। পিকে যেখানে এসে নামল সেটাও একদম জনমনুষ্যহীন স্থান। একই রূপক। তারপর বলিউডি চেজ যখন চলছে তখন দিল্লির সঠিক মানচিত্রের শব ব্যবচ্ছেদ করার মাধ্যমে এটা দেখানো যে এটা আসলে একটা গল্প। ম্যাজিক রিয়েলিজম? পরাবাস্তবতা?

ভগবান বানায় কে? আপনি আমি না তিনি নিজে। নাস্তিকতা আর আস্তিকতার মধ্যে যে রাজপথটা গেছে তার মধ্যে মাঝে মাঝে স্বল্পবিরামের মত ডিভাইডার- যে জায়গাটা খালি চোখে দেখা যায় না সেটাই তো বিশ্বাসের পথ। বাকিদুটো তো বিশ্বাসহীনতা এবং বিশ্বাস ভঙ্গের পথ। ধর্ম ও ধর্মীয়তা। রিলিজিয়ন ও রিলিজিয়াসনেস। আজকের খালি চোখে এই শব্দগুলো তো মিলে মিশে এক হয়ে গেছে। কিন্তু প্রাসঙ্গিকতা না বুঝে কান মাথা বন্ধ করে ধার্মিক শীতে যবুথবু হয়ে জিগির তুলে বাঁচার মধ্যেই তো এই ভেদাভেদের বীজ লুকিয়ে।

পাকিস্তানের ক্লিশেটা তো সেই কারণেই ব্যবহার করেছে। “ঠাপ্পা আছে কোথাও? ঠাপ্পা?” আমি পাকিস্তানি তুমি ভারতীয়, আমি মুসলিম তুমি হিন্দু? দেখ দেখ ইয়ে হ্যায় হিন্দুকা খুন অউর ইয়ে হ্যায় মুসলমানকা খুন। আব মিলা দিয়া। আব বতা কোনসা হিন্দুকা অউর কোন সা মুসলমানকা।

ভিতর থেকে কেউ বলতে পারল না। আর বাইরে থেকে একটা ভিনগ্রহী এসে সাদা মনে কাদা দেখিয়ে দিল। কারণ তার মন ছিল অমলিন। আনকোরাপ্ট। এটাই তো পিকের সাফল্য। রাজন্যবর্গ, ধর্মীয় বেহালা আর যুদ্ধের দামামা মিলে পাশের দেশটাকে শত্রু করেছে। আমাদের যারপরনায় ক্ষতি করাই এখন তাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের দোষ কোথায় বলুন দিকি? আমার দ্বিতীয় প্রিয় ক্রিকেটার পাকিস্তানি, প্রিয় গায়ক পাকিস্তানি। নুসরত আর ওয়াসিমদের নিয়ে কি করি বলুন দেখি। না আমি সব ভুলে পাকিস্তানকে আলিঙ্গন করার পক্ষপাতী নই। যতক্ষণ বিভেদীশক্তি আমার দেশকে ছিন্নভিন্ন করছে ততক্ষণ তো নইই। কিন্তু তা বলে শুধুমাত্র পাকিস্তানি বলে কাউকে দূরে ঠেলে দেব? আহা কানাকে কানা বলিও না, খোঁড়াকে খোঁড়া বলিও না, শুধু পাকিস্তানিকে পাকিস্তানি বল।

আরে কোই হ্যায়। এক টিউবওয়েল লেকে আ রে! পুরা পাকিস্তানপে গাড়না হ্যায়।

ও দাদা যুদ্ধে যাবেন কামান গোলা বন্দুক নিয়ে হাতে
তার চেয়ে নয় মুখেই মারুন পাকিস্তানকে ভাতে…
পেশোয়ারের ছবিগুলো আমাদের বুকে হাত দিয়ে ভাবায় নি বলুন? বলতে পারব ঠিক হয়েছে? আরও উগ্রপন্থাকে দুধ কলা খাওয়াও! পারব না! কারণ ওরা আমাদের সন্তানও তো হতে পারত!

পরের দিনই ২৬/১১-র মাস্টারমাইণ্ড প্রমাণের অভাবে জামিন পেয়ে গেলে হ্যাসট্যাগ পাকিস্তানেই তৈরী হয়ে যায় তার বিরুদ্ধে। আরে মানুষ তো! যতই জন্ম থেকে জন্মদাগ নিয়ে জন্মে থাকি না কেন। একই সময়ে আধঘণ্টার ওদিক এদিকে একই হাওয়ায় শ্বাস তো নিই। বিভেদকামীরা উচ্ছন্নে যাক, আমার দেশ আমার মাথায় থাকুক। কিন্তু জাত ধর্ম বিভেদ নিঃশ্বাসে বিষ ভরে দেয়। পিকেকে জিজ্ঞাসা করুন।

একবারই শ্লেষ ব্যবহৃত হয় তার বক্তব্যে, “তুম বাঁচাওগে ভগোয়ান কো? তুম? জিসনে সারে জাহান বানায়া উসকো বাঁচাওগে তুম? আরে ও আপনা বাচাও খুদ কর সকতে হ্যায়?”

আরে রবি ঠাকুরই কি সত্যি কথাটাই না বলে গেছেন, সহজ কথা যায় না বলা সহজে… পিকে সেটাই করে দেখায়। আর সেখানেই পিকের সাফল্য। যখন সিনেমার টাইটেলকার্ড চলছে তখন পরিক্ষিত সাহনীর মতই আমার ছেলেও সিটি দিচ্ছে প্রথমবার বাপ-মার সামনেই। সেখানেই পিকের সাফল্য!
রিভিউয়ের খাতায় লাল কালিতে কাটাছেঁড়া পরে করবেন। আগে মানুষ একটু বেঁচে নিক না হয়! কি বলেন?

কিন্তু শুধু মানুষ বাঁচলেই হবে? এই যে শীত থেকে দূরে থাকতে শুকনো পাতা পোড়ানো হয়, তাতে পরিবেশ বাঁচবে? আর ওই যে ফিরে আসার সময় চোখের সামনে একটা ইনোভা পনেরো দিনের একটা কুকুর ছানাকে চাপা দিয়ে চলে গেল। আর আমি তাকে কোলের মধ্যে তুলে নিয়ে রক্তাক্ত মুখটায় একটু জল দেবার চেষ্টা করলাম আর সে আমার হাতের মধ্যেই গরম থেকে ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আর তার বাবা মা ভাই বোন মাসি পিসি অদ্ভুত সম্মানে আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল। বাচ্চাদের দূরে রাখল। আর ফেরার সময় একটু লাফিয়ে আমার হাঁটুর কাছটা চেটে দিল। তাতে মানুষ কি হেরে গেল না? ওই মরা কুকুরছানাটা আর তার পরিবার হারিয়ে তো জিতে গেল বাওয়া। হারকে জিতনেওয়ালো কো বাজীগর কহতে হ্যায়।

ও হ্যাঁ, শেষে শনিবারের শেষ কিন্তু শেষ নয় ঘটনাটা দিয়ে আজকের মতো শেষ করি। মঙ্গলবার থেকে দিল্লিতে বইমেলা শুরু। তার প্রস্তুতি সেরে রাতে আইটিও দিয়ে ফিরছিলাম। সাড়ে নটার সময়। তিলক ব্রিজের দিকে টার্ণ নিয়ে দেখি একটি ওয়াগন আর আর একটি ইন্ডিকা ভিস্তা জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। ওয়াগন আরের দুই লোক হেই মারি কি সেই মারি। আর ভিস্তাও কম যায় না। গাড়ি ডিভাইডারের সামনে সাবধানে রেখে দৌড়ে এলাম থামাতে। ওয়াগন আরকে থামানো গেল নরমে গরমে। কিন্তু এবার ভিস্তা চড়ে বসে আছে। দেশী গন্ধে মজলিশ বেইমান কিন্তু ১০০ ফোন করা থেকে কে আটকায়। বাধ্য হয়ে কাছের পুলিশ বিটের কচি ঘুমন্ত পুলিশটাকে ডাকলাম। সে আর আমি মিলে ভিস্তাকে বোঝালাম যে ভাই উভয়ের দোষেই হয়েছে। বেশী ট্যাণ্ডাই ম্যাণ্ডাই করলে উভয়েই জেলে ঢুকবা। তা সে ঝাজ্জড়বাসী জাঠপুঙ্গব শুনবে কেন। সে তো খরচা পানি নিয়েই ছাড়বে। এর পর কচি পুলিশটা ময়দানে নামলো। কাটাকাটা জাঠ কণ্ঠে বোঝালো, “তন্নে ভি মরোগে অউর মন্নে ভি রাত কা নিন্দ খরাব করনা হ্যায়।” দেশোয়ালি ভাষা শুনে ভিস্তা সম্মত হল। তখন আবার কচি পুলিশের অন্য চিন্তা শুরু হল। “আরে তু তো ইহা হাঁ বোল রেয়া হ্যায়। দোশো মিটার দূর যা কে আগর ফোন ঘুমা লিয়া তো মন্নে তো নোকরি গয়ই।” শেষে আমাকে বটঠাকুর বানাবার জন্য নম্বর নিয়ে ছাড়ল। ওয়াগন আর তো তখন গোপাল বড় সুবোধ ছেলে…!

রাত্রে যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখন দেখলাম বড় কুকুরগুলো এসে দাঁড়িয়েছে। চোখগুলো দেখতে পেলাম না, কিন্তু অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছিল তা বুঝলাম। কিন্তু এই নিস্তব্ধতাটাই বা কম কিসের।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ পেশোয়ার নিয়ে কি আর বলি বলুন! ছবির অ্যালবামটা শেষ করতে পারলাম না বাচ্চাগুলোর। আর প্রিন্সিপালের জন্য একশো আটবার গান স্যালুট (স্যালুটটাতেও gun আনতে হল, গান নয়!)। গত কয়েক হাজার বছরেও মানুষ হয়ে উঠতে পারলাম না আমরা। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে প্রাগৈতিহাসিক বইকে দুষ্কর্মের বটঠাকুর হিসাবে খাড়া করি! বিভেদ রুটির জায়গায় হাতে বন্দুক ধরিয়ে দেয়। তাতে পেট ভরে না- বুক ভরে, বিষে।

প্রপূ ২ঃ কাল থেকে দিল্লি বইমেলায় ফিসফাসের মুখ দেখানোর শুরু! সবার শেষে তো পেটটাই থেকে যায়। প্রকাশকের জন্য আমার জন্য ভালো রম্যরচনার জন্য বইটা কিনুন! পড়ুন! উপহার দিন! এই আবেদন রাখলাম। দায় বদ্ধতার কান কাটা হয় না।

(১১০)


লেখাটা লিখতে একটু দেরী হয়ে গেল বলে পাঠক পাঠিকারা মার্জনা করবেন। আসলে একটু অন্যরকম করে শুরু করব ভেবেছিলাম। হয়তো একটা কবিতা টবিতা। সৃষ্টির আদিকালে আমি খান কতক কবিতা পাড়ার চেষ্টা করেছিলাম বটে, কিন্তু সেটা খচ্চরের ডিমের থেকে বেশী দূর এগোয় নি। তাই লিখেতে বসে,

মেঘের আদর
গোলাপি চাদর
আমিও বাঁদর
তুমিও বাঁদর

এর বেশী এগোন গেল না। তাই আর কি এট্টু দেরী হয়ে গেল। আসলে বাঁদর সেই রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের কাল থেকে বাংলা সাহিত্যের মানবর্দ্ধন ও মানভঞ্জন করে আসছে। সেই যে কবিগুরুর অমোঘ উক্তি- ‘এই ঘরে একটি বাঁদর (বাঁ দোর) আছে’ সেই থেকে শুরু। তারপর সেই ‘হুলা হুলা গান আর ট্যাঙো ট্যাঙো নাচ’। প্রেমেন মিত্র। এ ছাড়া বিশেষ পড়েছি কি না মনে পড়ছে না। পাঠক পাঠিকারা একটু স্মরণ করিয়ে দিলে বাধিত থাকব।

সংস্কৃত সাহিত্যে তো বাঁদরদের গুরুত্ব অপরিসীম, তারা তখন রাম নাম লিখতে পারত রাবণকে ল্যাজে বেঁধে তিন ভুবনের পারে আলুকাবলি খাওয়াতে পারত। প্রযুক্তি বিদ্যাতেও তাদের গুণগান ছিল। প্রথম উল্লেখযোগ্য সেতু বন্ধন বাঁদর ইঞ্জিনিয়ারের হাতেই হয়েছিল। আর হনুমানের কথা তো বললামই না। এতই প্রতিভাবান ছিল যে উপযুক্ত পাত্রী পাওয়া গেল না। সারাজীবন হরিমটর আর রামকথাতেই চালাতে হল।

সে যাই হোক, আমাদের মধ্যেও একটা বাঁদরামির প্রবণতা কম বেশী দেখা যায় বলে বদনাম আছে নাকি আমরা বাঁদরের বংশধর। তবে কি না বাঁদর না হলে তো আর মানুষ হিসাবে গণ্যও করা যায় না। তা আমি খান দুই বাঁদরামির গল্প বলব। আপনারা ধৈর্য ধরে শুনতে পারেন।

প্রথমটি গত বুধবার সংঘটিত হল! এর সঙ্গে বাঁদরের প্রত্যক্ষ কোন যোগাযোগ নেই, কিন্তু বাঁদরামির আছে। মানে বাঁদরদের মতো সক্ষমতা তো মানুষের থাকে না, আমরা খালি চেষ্টা করতে পারি। আর্বান রানিং বলে একটা বস্তু হয়েছিল যেটা অক্ষয়কুমার থামস আপের বিজ্ঞাপনে প্রভূত প্রচার করেছিলেন। সে কিছু না, জানলার কার্নিশ, সিঁড়ির রেলিং, ম্যাজেনাইন ফ্লোর, ঝুলন্ত বাদুড় ইত্যাদি ছুঁয়ে লাফিয়ে গড়িয়ে বালীগঞ্জীয়ে নিজের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো।

তা এক কালে সে সব আমারও খুব মজাই লাগত। খুব যে করতে পারতাম তা নয় তবুও চেষ্টার তো কমতি ছিল না। বর্তমানে কোমর বেড়ে ৩৫, ফিটনেসের অবস্থাও খুব দারুণ কিছু না আর চটকানো হাঁটু তো আছেই। তো সে সব দিকে খুব যে মাড়াই তা নয়। আরে বাবা বয়সটাকে তো বোতলবন্দি রাখা যায় না।

কিন্তু মাঝে মাঝে উপায়ান্তর থাকে না যে। দুর্গাপূজা নিকটবর্তী হতে যত আরম্ভ করেছে। রিহার্সালের বহরও ততই বাড়ছে। তো বুধবার সপরিবারে রিহার্সাল বেড়াতে বেরোচ্ছিলাম। কিন্তু আমার পার্শ্ববর্তিনী কিছুতেই আর নীচে এসে পৌঁছতে পারছেন না। অন্যান্য বহু মহিলার মতো ওনার সাজুগুজুর প্রতি জেন্ডার বায়াস নেই বলে বেশ নিশ্চিন্তেই থাকি। তাই লিপস্টিকে যে সময় নষ্ট হচ্ছে না সে বিষয়ে নিশ্চিত। ফোনও এনগেজড। তাইলে?

এলেন তিনি মিনিট দশেক পর। এসে জানালেন, যে সামনের বাড়ির ছোট মেয়েটি বাড়ির ভিতর লোহার দরজা বন্ধ করে আপাত ঘুমোচ্ছে। বড় মেয়েটি প্রথমে আর তার পর তার মা এসে ফোন করে করে বেল বাজিয়ে বাজিয়ে হদ্দ হয়ে পড়ছে। পার্শ্ববর্তিনীর ফোনটিও এতক্ষণ উদ্ধারকার্যে মগ্ন ছিল।

এসব শুনলে কোন বিবেকবান বা রবীন্দ্রবান পুরুষই কি চুপ করে থাকতে পারে? আর আমার তো বনের মোষ তাড়াবার প্রবল তাড়না। ছুটলাম উপরে। গিয়ে পত্রপাঠ তিন তলার সিঁড়ির জানলা দিয়ে শরীর গলিয়ে কার্নিশের উপর পা রাখলাম। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, কার্নিশের উপর খুলে রাখা একটা জানলার গ্রিল সামনের বাড়ির ব্যালকনিটি ফুট চারেক দূরে। নীচে মেয়ের কান্না আর পিছে সামনের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলার ক্রমাগত সাবধান বাণী। সব মিলিয়ে বেশ দোলাচলে।

আসল কথাটা হল ফিটনেস! বছর দুয়েক আগে হলেও এসব নিয়ে ভাবতাম না। কিন্তু এখন তো ওজন এবং বয়স পাল্লা দিয়েই বেড়েছে। ভদ্রমহিলাও দেখলাম বলছেন, “সিনহা জী, ছোড় দিজিয়ে! ও সো রহি হ্যায়। নিন্দ টুটনে কি বাদ হি খুলেগি!” আমি ভাবলাম হিরোগিরি দেখাবার সুযোগ কেই বা ছাড়ে। এক হাতে জানলার পাল্লার গোড়াটা শক্ত করে ধরে অপর হাত বাড়িয়ে চার ফুট দূরের ব্যালকনির কার্নিশে রাখা টবের চুলের মুঠি ধরে তুলে আনলাম অতীব সাবধানে। তারপর হস্তান্তরিত করলাম ভিতরে। খোলা গ্রিলটাও পায়ের তলা থেকে সরিয়ে একই গন্তব্যে পাঠালাম। তারপর যা থাকে কপালে বলে ষাট ডিগ্রি কোণাকুণি এক পায়ে লাফ মারলাম। ডান হাঁটুর শুবানাল্লাহ অবস্থার জন্য লাফ টাফ একটু সাবধানেই মারতে হয়। সেই হরিদার অমোঘ উক্তি, “সাবধানের বাবার মুখ ভর্তি দাড়ি আছে, সাবধানের মার নেই।” তাই এক পা।

নেমেই নিজেকে এবং নীচে দাঁড়ানো বাক্স প্যাঁটরাকে জানিয়ে হাঁক দিলাম, “পৌঁছ গয়ে।”

তারপর শুরু কসরত। দুটো দরজার লোহার আবরণ বন্ধ। কিন্তু ছোট ঘরের জানলাটা খোলা। সেখান দিয়ে ওয়াইপার দিয়ে প্রথমে কাঠের দরজার ছিটকিনি এবং তার পর লোহার দরজার আবরণ সরিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরে সেই হাচ-এর কুকুরটা “খ্যাউ খ্যাউ” করে তেড়ে এল। আমি ওসবে বিশেষ পাত্তা টাত্তা না দিয়ে এগিয়ে গেলাম বেডরুমের দিকে। দেখি ভর সন্ধ্যা বেলায় গান চালিয়ে এসি চালিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ত্রয়োদশী কন্যাটি পাড়ি দিয়েছেন মালাবার হিলের ওপাড়ে।

বেশী না ঘাঁটিয়ে সদর দরজা খুলে দিয়ে “হেঁ হেঁ” হাসি নিয়ে গাড়ির পানে ছুটলাম। পিছনে ম্যাণ্ডেটরী ‘থ্যাঙ্কু ট্যাঙ্কু’র বহমানতাকে উপেক্ষাই করে নিলাম। রিহার্সালে দেরী করা আমার নিয়ম বিরুদ্ধ। গুরুর বারণ আছে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি পরশু অফিসের। এমনিতে মোদীবাবুর আগমনে সরকারী বাবুগিরির আলতামাসি আরামের দিন কেটে পড়েছে। তার উপর বায়োমেট্রিক, ফিঙ্গার প্রিন্ট আই বল ম্যাচিং ইত্যাদিন হাইটেক ব্যাপার স্যাপার নিয়ে একদম ২২১ বেকার স্ট্রিট। তার উপর তিনি আবার বাউণ্ডারী সীমানা বেঁধে দিয়েছেন ১০০ দিন।

দাও ব্যাটা ১০০ দিনে কে কত গাল গল্প লিখেছ তার হিসাব কিতাব। তা গল্প উপন্যাস লিখতে আমার প্রতিভা তো অপরিসীম মূলো। যখন তখন গুঁজে দেওয়া যায়। তাই যুগ্ম সচিবের ঘরে নিজের ডিভিশনের হাল হকিকত পৌঁছতে যেতেই তিনি যুতে দিলেন অর্ধপক্ক ব্যঞ্জনের সঙ্গে। এখানে যাও সেখানে যাও শেষে সচিবের কাছে যাও। সচিব মহোদয়া অত্যন্ত মিশুকে এবং এক্সপ্রেসিভ। সব কিছুই ওনার মুখে চলে আসে। গুরু গম্ভীর মিটিং-এ বসে কোন মহিলা সহকর্মী যদি পুরুষ সহকর্মীর প্রায় গায়ের উপর পড়ে যাবার মতো অবস্থা হয় তাতেও তিনি ফুট কাটতে ছাড়েন না, “আরে দাস সাহাব, কোই সুন্দর লড়কি (পড়ুন পঞ্চান্ন বছরের মহিলা) আপকি উপর গির রহি হ্যায়, থোড়া তো হাস দিজিয়ে।”

তা তিনি দেখলাম তাঁর এবং যুগ্ম সচিবের পি এসের উপর মাথার উপর দাঁড়িয়ে হাঁউ মাউ করতে শুরু করেছেন আর পি এস যুগল বেচারা ১০ লাখের জায়গায় ১৫ কোটি লিখতে গিয়ে হোঁচট বিষম আর খাবি একসঙ্গে খাচ্ছে। আমাকে দেখেও তিনি বেশ বকা ঝকা করে দিলেন। আমি ওনাকে কিছু বলার আগেই। তারপর বলে দিলেন, “শরম আনে চাহিয়ে তুম লোগোকো, ইতনে ইয়ং অউর ইনটেলিজেন্ট হো মাগর কাম নেহি করতে হো অউর আভি হাস রহে হো।” ব্যাখ্যা করতে গেলাম না যে আমার কাজটা আমি করেই দিয়েছি। যার সমন্বয়ের কাজ তিনি দূর থেকে তখন গুলতির টিপ প্র্যাকটিস করছিলেন। মুখ দিয়ে বেরলো অমোঘ বাণী, “শরম তো আ রহি হ্যায় ম্যাডাম, ইসিলিয়ে আপনে আপ পে হাস রহা হুঁ।” এর পর আর কোন কথা হয় না।

যাই হোক কাজে লেগে পড়লাম, কিন্তু সন্ধ্যা ছটা নাগাদ পেটের ছুঁচো একটু নড়ে চড়ে বসলে চাড্ডি মুড়ির বন্দোবস্ত করতে সেকেন্ড ফ্লোরে গেছিলাম। গোলমালটা বাঁধল ফেরার সময়। স্বাভাবিক উদর বৃদ্ধি রোধ করতে এবং সক্ষমতা বজায় রাখতে আমি এলিভেটরের ব্যবহার করি না। সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছিলাম ষষ্ঠ তলে তৃতীয় তলেই দেখলাম অফিস সময় পেরিয়ে গেছে বলে ল্যাজ বিশিষ্ট বানর কূলের কনসার্ট শুরু হয়ে গেছে। বছর চারেক আগে এক উচ্চ পদস্থ অফিসারকে এই বানরকূলই বাথরুমের মধ্যে বন্ধ করে রেখেছিল ঘণ্টা চারেক। শেষে কেয়ারটেকার কয়েক জনকে নিয়ে এসে তারপর উদ্ধার করে।

আমার বরাবরের স্ট্র্যাটেজী, যা ফিসফাস-১এর পাঠক পাঠিকারা জানেন, তা হল ‘ইগনোর কর, ইগনোর কর মনা’। এখনও করছিলাম। কিন্তু দেখলাম তিনখানা বাঁদর আমার সহযাত্রী হল। পঞ্চম তলে গিয়ে দেখি আরও চারটে বসে এবং তার মধ্যে খান দুই বেশ বাছুরের সাইজের। ষষ্ঠ তলের দিকে পা বাড়াতে যাব, হঠাৎ নীচ থেকে উঠে আসা একটি বিচ্ছু বাঁদর কপাৎ করে লাফিয়ে আমার ঘাড়ে চড়ে ফেলল। আর আরেকটি ধেড়ে আমার পিঠে একটা আলতো করে থাবড়া লাগালো। আরেকটি তখন আমার পায়ের ডিম ম্যাসেজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পাঠক পাঠিকারা, সত্যি বলছি। মেরুদণ্ড বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে আসছিল। কিন্তু ডর কে আগে জিত হ্যায় না? তাই কোন রকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সোজা পঞ্চমতলের দরজায় ঢুকে গেলাম। তার একটু নিশ্বাস নিয়ে ভাবলাম নাহ, ঘাবড়ালে চলবে না। বাঁদরগুলো বোধহয় মাটি পরীক্ষা করছিল। কিন্তু এ মাটি বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বাঁদরের চাঁটি, চলো যাই হাঁটি। ফিরে এলাম ফেলে আসা পথে। বানরকূল সসম্ভ্রমে রাস্তা ছেড়ে দিল। বিচ্ছুটির হয়তো ইচ্ছা ছিল আমাকে পথ দেখাবে। কিন্তু বড়রা বারণ করল বোধহয়। যে পথে যুধিষ্ঠির করেছে গমন সে পথ কখনই নয় যে কমন। ফিরে এলাম এক বুক নিশ্বাস আর বিজয় গর্ব সঙ্গে করে। জিজ্ঞাসা করলে বললাম, হাঁ ঝপকি তো লাগায়া থা! মাগর উসকো রিয়্যাক্ট নেহি করনা! সবাই বেশ চোখ বড় বড় করে শুনলো বানর বিজয় কাহিনী আর আমি আবার ছুটলাম সচিব এবং যুগ্ম সচিবের হৃদয় জয় করতে। যা সে দিন রাত দশটা পেরিয়ে পরের দিন চারটেয় শেষ হল বটে। কিন্তু সে আরেক হিমালয় ডিঙোবার গল্প।

স্প্রাইট কিন্তু সত্যিই একটা দারুণ ক্যাচফ্রেস বানিয়েছে। ডরের পরে জিত অবশ্যই আছে। অবশ্যম্ভাবী…

ফিসফাস-১ কলকাতা বইমেলায় ৪৬৫ নং স্টলে পাবেন

দেখুন পাঠক পাঠিকারা,
একটা ব্লগ সেই ২০০৯ থেকে চালিয়ে আসছি শত্তুরের মুখে ছাই আর আপনাদের মুখে দুধপুলি দিয়ে! সব কটা বলে ছয় না মারতে পারলেও টুকটুক করে শতরানের দিকে এগোচ্ছে! বইটার পিছনে রোহণ কুদ্দুস মহাশয় খেটেছেনও খুব। ব্লগের বেসন আর কার্টুনের বেগুন দিয়ে একটা মুচমুচে তেলেভাজা বই তৈরী করেছে! গত দিল্লী বইমেলায় লক্ষ্মী নারায়ণ চপের দোকানকেও হার মানিয়েছিল। তা এমত অবস্থায় গত বারের বইমেলায় ডুমুরের ফুল বইটি এবার একেবারে গাঁদা ফুল হয়ে যেখানে সেখানে যাতে ফুটে থাকতে আসে তার দায়িত্ব আপনাদের। শুধু ব্লগ পড়লেই চলবে? বাড়িতে রেখে যেখানে সেখানে মুড়ি, সরষের তেল কাঁচা লংকা সহযোগে খেতে হবে না?

তাই ২৯শে জানুয়ারি থেকে ৯ই ফেব্রুয়ারি কোলকাতা বইমেলায় উপরের ঠিকানায় চলে যাবেন, একটা নিরীহ দেখতে বুদ্ধিদীপ্ত ছেলে- যে দিন রাত এক করে বই ছেপে ছেপে রোগা হয়ে গেল তাকে গিয়েই বলবেন, “আমি কেন ফিসফাস খাই? দারুণ লাগে!!”

ব্যাস! ওটাই সংকেত! আর ছেলেটি হল একমেবদ্বিতীয়ম রোহণ কুদ্দুস! তুড়ুক করে হাতে ধরিয়ে দেবে ফিসফাস-১!

আরে বাবা! লেখক উপস্থিত না থাকলে পাঠকপাঠিকাদের একটা বাড়তি দায়িত্ব থেকে যায় না, বই বিক্রি করার?
485972_481181441940148_704175585_n