(১৬৩)

 

উফফ কত্তদিন বাদে দেখা বলুন তো? কেমন আছেন পাঠক/ পাঠিকারা? এর মধ্যে গঙ্গা দিয়ে প্রচুর জল আর যমুনা দিয়ে প্রচুর অ্যাসিড বয়ে চলে গেল! চাঁদের রঙ নীল থেকে বদলাতে বদলাতে হলদেটে হয়ে গেল! আর দু চারটে পাকা চুল মাথায় গালে বংশ বৃদ্ধি করে ফেলল!

আমার খবর? তা খবর বলতে দুটো-
এক) সৃষ্টিসুখ প্রকাশন থেকে একটা গল্পের বই প্রকাশ পেল আমার। ‘ইয়র্কার এবং অন্যান্য গল্প’। দিল্লিতে পুজোয় আর কোলকাতায় বন্ধুদের সঙ্গে তার হইহই করে উন্মোচন হয়েও গেল মোড়ক।
দুই) অবসরে প্রকাশিত ফিসফাস কিচেন এখন কলেবর বাড়িয়ে বই আকারে আসতে চলেছে বইমেলায়!
সবই আপনাদের ভালোবাসা আর কি!

তা যাই হোক, আজ বেশী ফেনাব না! ছোট ছোট গল্পে এতকালের অদেখা যাপন কাটিয়ে নেব আপনাদের সঙ্গে। নম্বর টম্বরের দরকার নেই! কি বলেন?

গাড়িটাকে নিয়ে মাঝে খুব ভুগলাম জানেন! যদিও নব্বই হাজার কিলোমিটার সঙ্গ দিল! এখনও হাজার তিরিশ চল্লিশ আরামসে দিয়ে দেবে! কিন্তু নিজের গুরুত্ব বোঝাবার জন্য মাঝে মাঝেই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে! সেখানেই সমস্যা!

একদিন আইটিও ফ্লাইওভারের পরেই ক্লাচের তার কেটে বসল! আর যাই কোথা! ঠেলতে শুরু করলাম এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে। অভ্যাস নেই। কোন রকমে ঠেলতে ঠেলতে কিছুদূর যাবার পর দিলাম এক গাড়ির সাইডে ঠুকে। সে আমার সেই অবস্থাতেও বেরিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ করে বসল। লাও! ঠাণ্ডা গলায় বললাম, ‘দেখো জি! থককে চুর হো গয়া! ঝগড়া করনে কা একদম মুড নেহি হ্যায়! যাদা বোলোগে তো ও যো পাত্থর পড়া হুয়া হ্যায় আপকে সরপে বইঠা দুঙ্গা! সেও হেবিজোর ঘাবড়ে গিয়ে চেল্লামেল্লি লাগাল! আমি পাত্তা না দিয়ে চলতে শুরু করলাম।

দেড় কিমিটাক চলার পর এক অটো এগিয়ে এল সাহায্যের পা নিয়ে! ড্রাইভারটি একশোটি টাকার বিনিময়ে পা দিয়ে ঠেলে দেবে অটো চালাতে চালাতে! এইভাবে যদি কিছুদূর যাওয়া যায়! গেলামও! তিন কিমি দূরের এক মেকানিক শপের সামনে যখন পৌঁছলাম তখন বাজে সাড়ে ছটা। সেদিন আবার রিহার্সাল। পার্শ্ববর্তিনীকে বললাম ওলা বুলা লো! তার মধ্যে আবার টিপটিপ বারিশ! আর মেকানিক দেখে বলল, ওয়েল্ডিং খুলে গেছে, এখন লাগানো সম্ভব হবে না! লাও ঠ্যালা! অটোটাকেও ছেড়ে দিয়েছি!

কোন অটোই আর অ্যাটলাসের বোঝা বইতে রাজী হচ্ছে না! ক্রসরোড বলে এক দীনবন্ধু কোম্পানির মেম্বারশিপ নেওয়া আছে। যদি বিপদে আপদে সাহায্য করে! তা সে বলল রাত দশটার আগে গাড়ি টেনে নিয়ে যেতে আসবে না! সামনে এদিকে রেললাইনের নীচ দিয়ে যাবার জন্য আণ্ডারপাস। তারও আগে রাস্তা অর্ধেক তৈরী হয়েছে বলে বাঁ দিকে জল জমে আছে! যা থাকে কপালে! ঠেলা লাগালাম। গত আড়াই ঘন্টায় গাড়ি ঠেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ঠিক কায়দা করে জলের উপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে আমি নিজে শুকনোর উপর দিয়ে হেঁটে এলাম। বৃষ্টি তখন থেমেই গেছে। কিন্তু ভিজেই গেছি, ঘামে! তারপর ঢালে দাঁড়িয়ে গাড়ি ঠ্যালা দিয়ে ঠনঠনে হাঁটু নিয়েই লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিতেই গিয়ারে ফেলা গেল! যাক বাবা, বলে আণ্ডারপাস প্রায় পেরিয়ে এনেছি ও বাবা সামনে গাড়ির জ্যাম দেকে উল্টো ঢালেই গেল গাড়ি বন্ধ হয়ে। মাঝ রাস্তায় ব্রেক মেরে চুপচাপ বসে আছি। পিছনে ভঁকভঁক হর্ণ পড়ছে গাড়ির লাইন! কিন্তু বেরব কি করে? ব্রেক থেকে পা সরালেই গাড়ি হড়কাবে পিছনের দিকে। হ্যাণ্ডব্রেকে কাজ হবে না! যাই হোক কয়েকজন অটোওলা ছিল কাছাকাছিই তাড়া ছুটে এসে ধরল পিছনের দিকে তারপর ধাক্কা দিয়ে দিল। আর গাড়িও গিয়ারে মেরে চালু করে দিলাম।

বেশী না, আধ কিমি! তারপরেই রেডলাইট। যাই হোক এগোতে শুরু করলাম। গলির দিকে! সামনে একটা গাড়ি রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়িতে নটা বেজে গেছে। অনুরোধ করতে গেলাম গাড়ি সরাবার। জ্ঞান দিয়ে বসল, অ্যা্যসে থোড়ি হোতা হ্যায়! আপ টো করওয়ানে গাড়ি বুলালো ইত্যাদি! যাই হোক। কোন রকমে ম্যানেজ করে গলির মধ্যে ঢুকতে হেল্প জুটে গেল। পৌনে দশটায় গলির মুখে আরেকটা ঢালে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করলাম এক ঠ্যালা মারুন! দিয়েও দিল! ব্যাস আর দেড়শো মিটার ভোঁ ভাঁ হর্ণ দিয়ে পৌঁছে গেলাম বাড়ির কাছে। তারপর রিহার্সাল (মিউজিক রিহার্সাল ছিল) দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পরের দিন গাড়ি সারিয়ে।

তা বেশ ছিল। সার্ভিসিং করাব করাব ভাবছি তার আগে শনিবার গ্রেটার নয়ডার স্কুল থেকে ছেলেকে আনতে যাচ্ছি। বেশি না, বাড়ি থেকে ৪৫ কিমি। নয়ডার মহামায়া ফ্লাইওভারের পর আরও পঁচিশ। তা মহামায়া ফ্লাইওভার পেরিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে পড়তেই ফটাং করে আওয়াজ! ক্লাচ গায়েব! লাও ঠ্যালা! ভাগ্যিস গাড়ি ফোর্থ গিয়ারে। আমি ক্লাচ ছাড়াই গাড়ি ষাট-আশি গতিতে চালাচ্ছি, বন্ধুকে ফোন করলাম, গ্রেটার নয়ডায় থাকে গাড়ির ঘাঁট ঘোঁট জানে। বলল পঁচিশ কিমির শেষে এক মার্কেটে মেকানিক আছে! গাড়ি টো করতেও পারবে! আমি বললাম আমি মাথা ঠাণ্ডা করে চালাচ্ছি, কোথাও থামব না! বড় কিছু ঝামেলা না হলে পৌঁছিয়েও যাব সেই অব্ধি! কিন্তু তারপরেই দরকার। তো ফোন করে দিলাম। আর আধ ঘন্টা ক্লাচ ছাড়াই কায়দা করে চালিয়ে পৌঁছেও গেলাম। সে অপেক্ষাতেই ছিল। কাদির নাম তার! যত্ন করে ঠিক ঠাক করে দিল। আর পরদিন বাড়ি ফিরেই দিয়ে দিলাম সার্ভিসিং করাতে।

তারপর আর কি! দিন দুয়েকের মধ্যেই “মেরে পেয়ারে দেশবাসীও কাল কুছ যাদাই হো গয়া থাআআ!” ব্যাস গেলো কাণ্ড। পরের দিন গাড়ির ফাইনাল সার্ভিসিং করিয়ে পেমেন্ট করব বলে ব্যাঙ্ক থেকে পাঁচ হাজার ছশো টাকা তুলতে গেছিলাম সেই সন্ধ্যাতেই! তা এটিএম ব্যাটা বলে পঞ্চাশ আর একশো নেই! এগারোটা পাঁচশোর নোট। তার মধ্যে বাজারটাজার করতে একটা চলেই গেছে। ব্যাস হাতে পৌনে চারশো টাকা আর দশটা পাঁচশোর নোট। আমি পথে! তা যা হোক, অনেক ঘাতপ্রতিঘাতের পর নিজেকে শিখিয়েছি যাই হোক বিচলিত হব না! তা পথ পেয়েও যাচ্ছি। দুটো বড় নোট একটু বেশী সব্জি কিনে ভাঙিয়ে ফেললাম। আর তারপর ব্যাঙ্কে দাঁড়িয়ে বার দুয়েক টাকাও তুলে ফেলেছি অচল আটটি পাঁচশো ফেরত দিয়ে। সময় যাচ্ছে বটে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে মজাও হচ্ছে। দুঃখও হচ্ছে। মানব জীবন দেখতে পাচ্ছি যেমন তেমন।

বয়স্ক এবং বিকলাঙ্গদের জায়গা করে দেবার ব্যাপারে দিল্লি অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে মহিলাদের প্রতি ব্যবহারে আবার লাইনেই আসে না। এক ভদ্রমহিলা, সন্তান কোলে আমার দু তিন জনের পিছনে ছিলেন বলে প্রথম দিকে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে অনুরোধ করতে গেলাম। সে বলে খাড়ে রহনে দো! লাও! মনে হচ্ছিল ব্যাটাকে এটিএম-এর মেশিনে ঢুকে পিস পিস করে দিই। কিন্তু মানবজাতি এখন অনেক সভ্য হয়ে গেছে। ভদ্র হয়ে গেছে। এখন আমরা কাউকে বিপন্ন দেখলে ছুটে গিয়ে সাহায্য করি না, রাস্তায় আহত কাউকে দেখলে পাস কাটিয়ে চলে যাই, আর তেড়ে সরকারকে গালাগাল দিই কাজ করার বা না করার জন্য! তাই স্বগতোক্তি করেই রাগ ছাঁটাই করতে হয়। সেইভাবেই আছি। খরচ কমিয়ে হিসাব কষে বেশ ভালোই আছি! বেচাল দেখলে লাফিয়ে পড়ে প্রতিবাদ করে প্রতিকার করার চেষ্টা করি। শুধু জিগির তুলেই ঢেঁকুরের মিঠা স্বাদ গ্রহণ করি না। অসুবিধাকে অসুবিধা বলে না দেখে চ্যালেঞ্জ ধরে নিয়ে হার্ডলস পেরিয়ে যাবার আনন্দ অনুভব করি! ব্যাস এই তো জীবন কালী দা!

তা তার মধ্যেই এক দুটো জোকস আর একটা সত্যি ঘটনা শুনতে পাই। যে বাড়িতে বিয়ে (এটা বলতে আমরা এখনও যে কেন মেয়ের বাড়ি বুঝি কে জানে!) সে বাড়ির একজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশিকা মেনে ব্যাঙ্কে গিয়ে আড়াই লাখ টাকা দাবি করেছেন। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার যতই বলছেন যে আপনার অ্যাকাউন্টে অত টাকাই নেই! কে শোনে কার কথা!

আর এটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক- আমার পরিচিত এক ঘটি বাঙালকে বিয়ে করেছিলেন। মানে এখনও বিবাহিত আছেন কিন্তু করেছিলেন গত শতাব্দীতে। তা বাঙাল ভদ্রলোক আবার প্রবাসী, মানে চেন্নাইতে বড় হয়েছেন। সব বাংলা গান রবীন্দ্রসঙ্গীত পল্লিগীতি ব্যান্ডের গানটান শোনেন নি। তা মহিলা দরদ দিয়ে গাইছিলেন, ‘রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে, দিনের শেষে…’ আর ভদ্রলোক ইনভ্যারিয়েবলি শুনেছেন বাঙাল! আর যায় কোথা! নতুন বিয়ে ভেঙে যাবার উপক্রম হয়েছিল। বাঙালকে জাত তুলকে খোঁটা? তা সে বিয়ে টিকে গেছে সে যাত্রা, কিন্তু সঙ্গে দিয়ে গেছে এই টাইমলেস গল্পগুলোকে!

আমাদের প্রত্যেকের জীবনই তো এক ঝুড়ি গল্পের কথামালা! এতো আনন্দ রাখি কোথায় বলুন তো? কেন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে! সরকার তো আনন্দেরও হিসাব রাখতে শুরু করেছে। আমেন!

(১৬২)

 

সাধারণতঃ আমি নাগরিক হিসাবে বেশ ভালো। নিয়মানুবর্তিতা এবং নির্দেশানুসারে চলাটা একদম রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। এতদিনের সরকারি মুটেগিরির এফেক্ট বলতে পারেন। চট করে খাঁই মাই করে প্রতিবাদ না করে আগে দেখার চেষ্টা করি ব্যাপারটা কি। বিশেষতঃ সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্র ভিতরে থাকলে তো বটেই।

১৭ বছর হয়ে গেল সরকারি ঠিকানায়, লোকে বলে সরকারি চাকুরেগুলো নাকি ফ্রিতে বিষ পেলেও তা খেয়ে নেবে! তারা আরও বলে, সরকারি কর্মচারীদের কাজ করতে হয় না! ‘আসি যাই মাইনে পাই, কাজ করলে ওভারটাইম পাই’! একজন সরকারি কর্মচারীর দিনপঞ্জী লিখতে গিয়ে এটাই মোটামুটি ট্র্যাডিশন ধরে নেওয়া হয় যে সে এগারোটায় অফিস যায়, ছেলে হলে দুটো ফাইল নাড়িয়ে চা খেতে বসে মহিলা হলে উল বুনতে বসে। দুপুরে লাঞ্চ দেড় ঘন্টা তার পর এক কাপ চা খেয়ে বাড়ি। ভালো কথা! যুগ যুগ ধরে সরকারি চাকুরেরা ইম্প্রেশনটা সেইরকমই করে রেখেছেন বলেই না এসব কথা!

আবার নদীর এপারের গল্পও আছে, সরকারি চাকর হবার জন্য নাওয়া খাওয়া ভুলে সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা অব্ধি ঘস্টানো, মন্ত্রী বা আমলাদের পা চাটা, ঘাড়টাকে তলপেট পর্যন্ত নুইয়ে তাদের মনমর্জিমাফিক ল্যাজ নেড়ে যাওয়া, না পারলেই কম্ফোর্ট জোনের বাইরে ছুঁড়ে ফেলা। এরপরেও কাজ করলেও একই মাইনে কাজ না করলেও! বরং যারা কাজ করে, ঘাড় সোজা রেখে কাজ করে তাদের ধরে ধরে মাঝেই তুর্কীর ক্যুতে চুকিতকিত খেলতে পাঠানো হয়।

যাকগে পাঠক পাঠিকারা, উপরের হাবিজাবিগুলো স্রেফ ভুলে যান! আসুন কালকের গল্পে নামি! দেখুন হামি গরীব আদমি আছে! তাই ডব্লিউএইচ প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে পারব না। কেন কবে কি বৃত্তান্ত! কিন্তু ঘটনা হল, বিকলাঙ্গ সশক্তিকরণ বিভাগের অ্যাক্সেসেবল ইন্ডিয়া ক্যাম্পেনের জন্য একটা সুপার বাইক র‍্যালি সংঘটিত হল রবিবার। আর তাতে ভর সকালবেলায় সাড়ে চারশো সুপারবাইকার তাদের ন্যুনতম ৫০০ সিসির সুপারবাইকের ১০০০ ওয়াটের হেডলাইট জ্বালিয়ে ঢ্যাকঢ্যাক করতে করতে ইন্ডিয়াগেটে এল আর গেল! আর হুজুগে পাবলিক সেলফি তুলে তুলে হয়রান হয়ে গেল।

ও হ্যাঁ মন্ত্রী আর আমলাদের সঙ্গে ছিলেন দেশের অন্যতম ‘সুপারস্টার’ বিবেক ওবেরয়। সবাই বিশাল বিশাল মানুষ। এদের ভিড়ে আমি থাকি টাকি না! নিজের কাজ করে টুক করে সরে পড়ি। এবারেও আমার দায়িত্ব ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ডঃ হর্ষবর্ধনকে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে ব্রিফ করা এবং তাঁকে অন্ধের যষ্টির মতো এস্কর্ট করে নিয়ে আসা। হর্ষবর্ধন অতীব অমায়িক ব্যক্তি। তাঁকে ব্রিফ করার সময়ও চুপ থাকেন, তাঁকে ক্যাম্পেনের টিশার্ট পরবার জন্য অনুরোধ করলেও মেনে নেন। আর চ্যাংড়া চামচার দল যখন বারফট্টাই করে কাউকে ভোর সাতটায় তার ইয়ার দোস্ত ‘মন্ত্রী’র সঙ্গে দেখা করাতে আনে তখনও হাসিমুখে মেনে নেন। এমনকি অতিরিক্ত উত্তেজিত কোন সহনির্দেশক, অনুষ্ঠান মঞ্চের দিকে ডাক্তারবাবুর যাবার সময় যদি ধাক্কা মেরে চলে যায় তাহলেও কিছু বলেন না এবং সেই সহ নির্দেশককে রীতিমতো বকাঝকা করে যদি ডাক্তার বাবুর এসকর্ট ডাক্তারবাবুর কাছে ক্ষমা চাওয়াতে বাধ্য করে তাহলেও হাসিমুখে তা মেনে নেন।
কিন্তু সকলেই তো সেরকম হয় না! সরকারী ক্ষেত্রে লুকানো কারণ সর্বত্র থাকে! কে কোথায় কার নম্বর বাড়াচ্ছে সে সব জানিয়ে কি করব বলুন! শুধুমাত্রা নিজেকে মাঝে মাঝেই এই পৃথিবীতে বড়ই অপাংক্তেয় বলে মনে হয়। উদ্দেশ্য বিধেয় কিস্যুটি খুঁজে না পেয়ে কেমন যেন ম্যাদামারা ভ্রমণ করছি! উদ্দেশ্যহীন, বিধেয়বিলীন!

সে যাই হোক, তারপর একটা লম্বা মিটিং সামলে বাড়ি ফিরলাম সাড়ে তিনটে। এবারে পার্শ্ববর্তিনীকে নিয়ে একটু ইডলি উডলি উহু করতে গাড়ি নিয়ে বেরোলাম। আনন্দবিহারের দিকে যাচ্ছি! রাস্তা একদম গড়ের মাঠ! ফ্লাইওভার চড়লাম! রেডিওতে একটা বেশ চ্যানেল হয়েছে ১০৭.২ কাছের দূরের পুরনো গান ফান দেয়। তাতে স্বপ্নো কি রাণী চলছে আর পার্শ্ববর্তিনী পাশে বসে। কি ইয়াইয়া মৌসম! ফ্লাইওভার থেকে নামলাম!

হঠাৎ দেখি চার পাঁচটা কচি কচি পুলিশ ছুটে এল! আমি ভাবলাম সিটবেল্ট পরে চালাচ্ছি না বলেই বোধহয়। যাও গচ্চা যাবেই! কিস্যু করার নেই! মুড খারাপ করব না ভেবেও জিগালাম! কি কেস ভাই? বলে কি ওভারস্পিডিং? অ্যাঁহ বলে কি? আমার নাইন্টিন ফর্টি টু আ লাভস্টোরির শেভরোলে স্পার্ক মডেল, যেটা একাশিহাজার কিমি ড্যাংড্যাং করে চলে গেছে সেটা ওভারস্পিড করছে? মেজাজটা একটু ইয়ে হল বটে তাও জিজ্ঞাসা করলাম কত? বলে একাত্তর! লাও গজা! খালি রাস্তায় ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় একাত্তর? জিজ্ঞাসা করলাম স্পিড গান কই? আর লিমিট কত? বলে স্পিড গান ক্যামেরায় লাগিয়ে ফ্লাইওভার থেকে নেমেই লাগানো আছে! আর লিমিট পঞ্চাশ। মাজাকি পায়া হ্যায়! দশ বারোটা পুলিশ আর আমি একা! দে ঝাড় দে ঝাড়! ইয়ে তো জান বুঝকে ফাঁসানে কি তরিকা!

কিছু করার নেই স্যার সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! লাও ব্যাটা যখন সোমবার আটটার সময় আনন্দ বিহার দিয়ে যাবার সময় পাঁচশো অটো আর টুকটুক দাঁড়িয়ে থাকে আর আট লেনের রাস্তাটাও কাশীর পেয়ারের গলি হয়ে যায় তখন তোমাদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ কোথায় যায় হে? উত্তর নেই! আমি বললাম, না হে এগুলো তোমরা বাড়াবাড়ি করছ! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! ইচ্ছে করে ফাঁকা রাস্তায় স্লোপে টঙে তুলে ক্যামেরা লাগিয়েছ। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! সাধারণ মানুষকে বিবস্ত্র করার এটা নতুন পন্থা। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! শেষে বলে কি লাইসেন্স সিজ করবে! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! লাও ঠ্যালা! সু নাগরিক হবার ট্যালা বোঝ! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! ওকে ওকে! বুঝেছি! চিৎকার করছি, এরই মধ্যে পার্শ্ববর্তিনী বেরিয়ে এসেছেন। আর তাঁর সেই বরাভয় মুর্তি দেখে মামারা গেছে ভয় পেয়ে! বলে ‘ম্যাডাম আপ বৈঠিয়ে না কুছ নাহি হুয়া!’ আমি বলি কুছ নাহি হুয়া মতলব? লাইসেন্স তুমি নিয়ে নিচ্ছ আর কুছ নহি হুয়া? তবুও তারা দেখি রা কাড়ে না! তা ম্যাডাম বললেন, যা করার একটু তাড়াতাড়ি করতে! লাও! তারপর তিন পাতার একটা চোথা ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তিন মাস পরে নিয়ে যাবেন! কিস্যু হবে না!

কেমন ভেবলে গেলাম! পুলিশও এমন অমায়িক ভাবে গ্যাঁট কেটে নিল? সাতজন ছিল অধিকাংশ জাঠ গুর্জর! স্বচ্ছন্দে আমাকে মাটি ধরিয়ে দিতে পারত! কিন্তু এমন একটা মাটির মানুষের মত ব্যবহার করল যে আমিই কেমন মাটিতে মিশে গেলাম! ফাইন দিয়ে লাইসেন্স দিয়ে তিনপাতার ক্রোড়পত্র নিয়ে গাড়িতে যখন এলাম পার্শ্ববর্তিনী গচ্চার হিসাব চাইলেন! বিরস বদনে বলিলাম চারশো! কিন্তু বিকেলের মুডটার দফারফা করে চলে গেল শুধু মাত্র লাইসেন্স নিয়ে!

লাইসেন্সের শোক ভোলার জন্য আজ সকালে যখন গ্রেটার নয়ডা হাইওয়ে ধরেছি ছেলেকে স্কুলে পৌঁছোবার জন্য তখনও বাধ্য নাগরিকের মতো ওডোমিটারের কাঁটায় চোখ রেখে চলেছি! ফ্লাইওভার থেকে নামতে গিয়ে পঞ্চাশের নিচে গতি নিয়ে আসতে কালঘাম ছুটে গেল! তাও ছাড়লাম না! তারপর ক্রিকেট মাঠের আম্পায়ারের মতো ব্যাটসম্যানের দিকে নজর দেবার আগে দেখে নিচ্ছি নোবল হচ্ছে কি না!

পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার রাস্তা। প্রতিটি লুকনো ক্যামেরার হিসাব নেওয়া হয়ে গেছে বস! খোঁজ খবর নিয়ে রাহাজানি করতে হলে আমাকে জিজ্ঞাসা করে নেবেন! বিলকুল ফাস্টোকেলাশ গাইডের কাজ করে দেব। তবে কিনা রাহাজানি বাটপাড়ি এসবই বেআইনি কাজ! আর কে না জানে, অন্ততঃ এখন তো জেনেই গেছেন যে। ঘাড়টায় এমন মালিশ হয়েছে, যে আইনের দাস হয়ে নিজেকে সুনাগরিক প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লেগেছি।

তবে কি না এতো পথ দুর্ঘটনা হচ্ছে হামেশাই! না হয় একটা লাইসেন্স তিন মাসের জন্য সরকারি মেহমাননওয়াজির জন্য পাঠিয়েই দিলাম! পুলিশ তো আমায় তুললো না! আমার লাইসেন্সটাকে আলতো করে তুলে নিল! লাইং সেন্সটাই কমে যায় যাতে, আর লাইনে আসার সেন্সটা বাড়ে! আমেন!

(১৫৮)

“You see, the whole country of the system is juxtaposition by the hemoglobin in the atmosphere because you are a sophisticated rhetorician intoxicated by the exuberance of your own verbosity…”

বুইলেন কিছু? আমিও না! আর বুঝে কি হবে। আজ সকালে তো আমি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মতো মুক্ত কচ্ছ হয়ে গেছিলাম কি না! মরেচে! ফিসফাস আবার দিল্লি বেলি ২ হয়ে যাবে নাকি?

খুলেই বলি তাইলে বলুন? না মানে খোলসা করেই বলি! আরে ধুর! মানে ওই ইয়ে আর কি! বিস্তারিত বিবরণ দিই।

হয়েছে কি! চলছে তো দিল্লি বইমেলা! আর বইমেলা মানেই তো মেলা বই আর হইচই আর সৃষ্টিসুখ। তা দিল্লি বইমেলায় কাজ ডবল! আমি টেবিলের ওপারেও আবার এপারেও! তাই গালাগাল খাবার জন্য গাল এগিয়ে দিই আর গালাগাল দেবার সময় মুখে কুলুপ! এমনই হচ্ছে যে যে সে এসে আমায় কয়ে যাচ্ছে “এই একটু হাস না?” আমি আর বলছি না যে পাতি তো কাকও হয়। আর এ তো খাঁচায় পোড়া সিংহ।

সে যাক আনসান বকে কি হবে! আজকের ঘটনায় সোজাসুজি আসছি!

আজ বিকালে বৃত্তের বাইরের বাঙালি (এটা অনিতা অগ্নিহোত্রীর কয়েনেজ আমার এই বৃহৎ বঙ্গ আর বহির্বঙ্গের বাজারে হেব্বি লেগেছে) কবিদের কবিতা ও কাব্যচর্চা নিয়ে আড্ডা। সবাই এক এক করে ঢুকছেন দিল্লিতে! সবার আগে এসেছেন সুকুমার চৌধুরী। কোলকাতার বাইরের কবিদের মধ্যে অন্যতম প্রধান এবং ভীষণ শক্তিশালী কবি! ভীষণ শক্তি বলে ভীষণ? একখানা ব্যাগ এনেছেন ভীমের বাবা দশরথেরও সাধ্যি নেই তোলে! না মানে ইয়ার্কি নয়! তাতে অবশ্য কবিতার বই ভর্তি। আর ভদ্রলোক বড়ই অমায়িক ও ভদ্র।

তা সক্কাল সক্কাল নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে ওঁকে প্রিপেড ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে আমি এপারে এসে নিজের গাড়ি উদ্ধার করতে যাবার আগে। এক কাপ চা খেলাম। আহা কি চা মাইরি! যেন আদার সঙ্গে ঘর্ষণে বাতাসা গলে জল হয়ে গিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

তা সে চা খেয়ে জিন্দেগি গম গাড়ির চাকায় চেপ্টে দিয়ে যতক্ষণে মেন রোডে উঠলাম ততক্ষণে সুকুমার বাবু পৌঁছে গেছেন সিআর পার্ক। বেশ কথা! আমি এগোতে লাগলাম নিজামুদ্দিন হাইওয়ে ধরে এমন সময় সুকুমার বাবুর ফোন।
– এই এরা তো বলছে রুম ১২টার সময় পাওয়া যাবে!
আমি বললাম, ‘সে কী? দিন দেখি লোকটাকে?’ আরে সে লোক তো সকাল থেকেই তেড়িয়া! বলে কোই ভি হো হাম বাত কিঁউ করে! যব হ্যায় তব হি দুঙ্গা! তা তাকে যতই বাবা বাছা করি! সে খেপেই যায়! আর এদিকে হঠাৎ ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক শুনতে শুরু করলাম পেটে! গুড়গুড় গুড়গুড়।

সম্পাদক মশায়কে ফোন করলাম! এমনিতে তিনি আমাদের মধুসূদন দাদা, অমৃত মন্থন না করেও হাতে এনে দিতে তাঁর জুড়ি নেই! কিন্তু সকালে খুব চাপ কেস! কেউ ওঠেই নি! তিনি ফোনের পর ফোন করছেন আর আমিও এদিকে করে যাচ্ছি! সুকুমার বাবু কিন্তু অত্যন্ত অমায়িক! ভাল ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করছেন দরোয়ানকে! যাই হোক ওয়েটিং রুমে একটু বসার সুযোগ করে দেওয়া গেল। কিছুক্ষণের জন্য! আর আমিও ময়ূর বিহার ফেজ টু-র কাছে। ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক এবার ড্রাম নিয়ে হাজির! গুড় গুড় দুম গুড় গুড় দুম। পেটের মধ্যে স্টার ওয়র্স শুরু হয়ে গেছে। লেজার সোর্ড নিয়ে যার যার ব্লিঙ্কস আর হ্যান সোলো আক্রমণ করেছে ডার্থ ভাডেরের গ্রহ।

ভাবলাম একটু থিতিয়ে নিই। সামলে নেব! এদিক আহমেদাবাদ থেকে আরেক মক্কেল এসে হাজির! তাকেও বললাম তুই ওখানে চলে যা ব্যবস্থা হয়ে যাবে! সে তার পরেও এসএমএস করে জিজ্ঞাসা করছে! প্রথমবার একা একা রাজধানীতে। একটু চিন্তা তো হবেই।

আমি আর কি করব! আমার পেটে তখন লঙ্গর রান্না হচ্ছে! ম্যারাথন দৌড়! বব বিমনের লঙ জাম্প! উসাইন বোল্ট! চাক দে ইণ্ডিয়া! ঘুর্ণি পিচ! বাইসাইকেল কিক! আরে থাম থাম! আর বলা যাচ্ছে না! লিখতে গেলেও চাপ লাগছে! ভর সকালে মনোরম বসন্তে আমি দরদর করে ঘামছি! নাকি কুলকুল করে ঘামছি! তাই ঠিক করতে পারছি না!

সম্পাদকের ফোন এল! একজন কর্তাকে ধরা গেছে! সুকুমার দার ফোন এল! আমি তো গরু হারিয়েছি মা!। ভাবলাম দেশের উন্নতি হচ্ছে না কারণ ওপেন ডিফেকশন এখনও কমে নি! চোখ বুলিয়ে দেখলাম রাস্তার ওপাশে পাঁচিলের ওপাশে একটা পার্কে কতগুলো ইয়ং ছেলেপুলে স্লিপের উপর সিট আপ দিয়ে পেটের পেশী শক্ত করছে। আবার পেট! উফ আমারটা পুরো রামদেবের মতো ঢেউ খেলিয়া যায় রে ঢেউ খেলিয়া যায়! একদম বিসমিল্লার মাইহার ব্যাণ্ড! আওয়াজ হচ্ছে সাবসোনিক! কেউ শুনতে পাচ্ছে না কিন্তু আমি এক মনে খালি গোপাল ভাঁড়কে গাল দিয়ে যাচ্ছি!

আর থাকতে না পেরে ইউএন-এর নিকুচি করেছে বলে পাঁচিলের এপারের জঙ্গলের দিকে এগোতে যাব। ও বাবা দেখি এক বেশ রহিস মহিলা নাদুস নুদুস করে তার নেড়ি নিয়ে টুক টুক করে সেখানে যাচ্ছেন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে কুকুর আর মানুষ এক ডাস্টবিন থেকে উচ্ছিষ্ট খেত। আর এখন তো বার করবে! কিন্তু মহিলা কেন রে বাবা! এসব স্থানে তো মহিলাদের যাওয়া বারণ! অন্তত পাবলিকালি! ছাতা কি আর করি নিজেকে নিজেই আরও জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম। এখন নয় মন্টাসোনা! এখানে নয়!

বিপদে পড়লে আমি ধরে নিই যে আমার আয়ু বিরানব্বই! এক্ষুনি টসকাব না! এই সময় দুঃসময় আজকাল বর্তমান সব কেটে যাবে! আবার গাছে গাছে পাখি শাখে শাখে পলাশের সমারোহ দেখা যাবে! আরে সে তো আজকেও দেখা যাচ্ছে। নরনারীরা স্বল্প সংখ্যায় জোড়ায় জোড়ায় বাইক চেপে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছে। আর আমি গাড়ির দরজা খুলে সমানে নিজের মন এবং পেটকে শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছি! যেন পেটের ভিতর দিয়ে টেন কমাণ্ডমেন্টসের রামেসিসের অশ্বারোহী রথ ছুটে যাচ্ছে।

দশ পনেরো তিরিশ! সমস্যার সমাধান দেখা যাচ্ছে! পেটের কষি আলগা করে সিটটাকে হালকা পিছনের দিকে এগিয়ে জয় মা বলে ভাসিয়ে দিলাম তরী। ইয়ে মানে গাড়ি! মানে ভাসাই নি! স্টার্ট দিয়ে দিলাম আর কি!

ময়ূর বিহার পেরিয়ে গাজীপুর ঘুরে আনন্দ বিহার! আরও কত দূরে আনন্দধাম আছে। আমি ইয়ে আমি উয়ে। আমি উরিবাবারে বাবা! আনন্দবিহার বাস আড্ডার সামনে মেট্রো কন্সট্রাকশনের জন্য জ্যাম! আর আমার পেটে রকেট ইঞ্জিনের শব্দ! এবার আরও চিত্তির! গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে ধাক্কা সামলাব তার জো নেই! মাঝ রাস্তায় টুক টুক করে গাড়ি চলছে। আমি আহ্লাদে ট্যারা হয়ে গেছি প্রায়।

চলে যাবে বসন্তের দিন চলে যাবে। দিস ক্লাউড উইল পাস ওভার আওয়ার হেডস। আহা ফাঁকা রাস্তা! উহু বাম্পার! ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে। ঘরের দোরগোড়ায় প্রায়! আমি তো শুয়েই পড়েছি সিটে! একদম ফর্মুলা ওয়ানের মতো শুয়ে গাড়ি চালাচ্ছি! পার্শ্ববর্তিনীকে ফোন করে দিলাম রাস্তা কিলিয়ার রেখো! পার্ক করে! হাই বাই বলে ঘরের ভিতর ঢুকে ঠাকুর ঘরে ঢুকে দরজা দিলাম! আর সশব্দে ফেটে পড়লাম সিংহাসনে! আহা কৃষ্ণ কৃষ্ণ! কৃষ্ণচন্দ্র হে!

বেরিয়ে এসেও আরাম নেই! ঢক ঢক করে দু গ্লাস জল খেয়ে তবে শান্তি! বাওয়া আর যাই হোক! এই শাস্তি যেন শত্তুরকেও না দেওয়া হয়! ওদিকে ম্যানেজারকে বোঝাবার জন্য সুকুমার দার ফোন বার দুই বেজে গেছে। তাকে ফিরে ফোন করলাম। দেশ কা ইজ্জত মা কা ইজ্জত বলে কোনরকমে একটা ঘরে ট্রান্সফার করালাম! সম্পাদক মহাশয়ও ফোনে জানালেন কর্তাব্যক্তিকে ধরা গেছে এবং তিনি তক্ষনি যাচ্ছেন। শান্তি! সব্যসাচীর ফোন এল মেলা কখন! আমি বললাম সে তো একটার পর। কিন্তু এ তো অন্য মেলা! আকাশে আজ রঙের মেলা! কি আনন্দ কি আনন্দ! ক্ষি আনন্দ!

All the world is a stage and you are merely a fellow safaiwala boss! আমেন!

(১৫৬)


পুরাকালের দেবতাদের ফেলে ছড়িয়ে চলাফেরা করার অভ্যাস ছিল। বিশেষত বিষ্ণুর। সতীর মৃত্যুতে শিবের মতিগতি দেখে সন্দিহান হয়ে উনি করলেন কি সতীদেহটিকেই একান্ন অংশে ভাগ করে ফেললেন। আর তারপর এদিক ওদিক ছুঁড়ে টুঁড়ে ফেললেন। ব্যোমভোলা শিব বেচারি বউয়ের বডিপার্ট খুঁজতে খুঁজতেই সব রাগ টাগ ভুলে গেল।

অমৃতভাণ্ড নিয়েও বিষ্ণুবাবু একই কাজ করেছিলেন। ভারত মহাসাগরে দেবতা আর অসুররা মিলে শেষনাগের মুণ্ডু আর লেজ ধরে টানা হ্যাঁচড়া করে অনেক কষ্টে অমৃত উৎপাদন করেছে। আর বিষ্ণুবাবাজীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যে লুকিয়ে লুকিয়ে অমৃতের কলসিটাকে সটান অমর্ত্যলোকে ট্রান্সফার করতে। কিন্তু বাবাজী তো কোন কাজই গুছিয়ে করতে অভ্যস্ত নন! প্রত্যেক যুগে একটা না একটা ঝামেলা বাঁধিয়েছেন। তা সে রাবণই হোক আর দুর্যোধন শকুনি। তাই চার জায়গায় ফেলতে ফুলতে কলসি নিয়ে গিয়ে গ্যারেজ করলেন।

মর্ত্যের মানুষ বরাবরই ন্যালাখ্যাপা! তা সেই সামান্য অমৃতের স্বাদ পেয়েই অমৃত কুম্ভের সন্ধানে শুরু করে দিল খোঁজ প্রয়াস। আর হরিদ্বার আর এলাহাবাদের ত্রিবেণীতে কুম্ভ আর শিপ্রা নদীর তীরে উজ্জ্বয়নীতে এবং গোদাবরী তীরে নাসিকে সিংহ রাশিতে হতে লাগল সিংহস্থ কুম্ভমেলা। নাম মাহাত্ম্য আর স্থানমাহাত্ম্য যাই বলুন। এই স্থানগুলি সাধারণ পর্যটকের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্র। কারণ খুঁজতে গেলে খুব বেশী দূর যেতে হয় না! মানুষ! পুণ্য অর্জন কি আর জল জঙ্গল দেবতায় হয়? সে তো মানুষের হাতেই মানুষেরই বুকেই খুঁজে পাওয়া যায়।

যাই হোক, এবারে ফিসফাসে ফিরে আসা যাক। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ইন্সপেকশনের কাজে মাঝে মাঝেই আমায় আমতলা থেকে বটতলা করতে হয়। এইবারে সুযোগ চলে এসেছিল এলাহাবাদ যাবার। একটা ইন্সপেকশন নোটিস এসেছিল বটে। কিন্তু সে তো কত কিছু আসে যায়। খেয়াল করি নি! ব্যাস এক রাতে হুকুম এলো কালকেই যেতে হবে। খেইচে! আমরা মধ্যবিত্তরা, বেশ হাতপা ছড়িয়ে সংসার করি! বললেই মশক কাঁধে ভিস্তির মত বেরিয়ে পড়তে পারি না! বাক্স প্যাঁটরা সমাজ দায়দায়িত্ব নিয়ে মাকড়সার মতো বাঁচা।

যাই হোক, সক্কাল সক্কাল উড়ে যাবার জন্য তৈরী হলাম। সঙ্গে এলাহাবাদের শুক্লাজি। শহরের ঘাঁট ঘোঁট জানেন বলে তিনিও আমার সঙ্গী হলেন। তা আমাদের জাহাজ হল নাইন্টিন টুয়েন্টির লজঝরে এটিএস। একবার ঢুকেছেন কি দু পা দিয়ে বহিঃপ্রকাশের কোন রকম ইচ্ছা চেপে ঠুসে রেখে দিতে হবে। একটা সবুজ পাতার কানওলা পাঁউরুটি আর আর মিশরীয় মমিদের সঙ্গী চকোলেট কেক দেবে খাবেন তো খান না হলে হাওয়ায় ভেসে যান।

হাওয়ায় ভেসে যাবার কথা বলতে গেলে যে কথাটা প্রথমেই মনে হল সেটা হল ওই প্লেনটা ভাসে কি করে হাওয়ায়? আছে আছে! প্রপেলার আছে! সে তো প্লেনের মুখের থেকেও বড় দুর্গার দশ হাতের মতো। আর লাগানের গোলি-র মতো পাঁই পাঁই করে হাত ঘোরাতে থাকে আর প্লেন লরি হয়ে আকাশে উড়ে যায়। সফর সঙ্গী ছিলেন জেনারেল বক্সি, যিনি কদিন আগেই ন্যাশনাল নিউজ চ্যানেলে সুখেন দাসের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ভাল লোক বোধহয় হবে। সারাক্ষণ ইংরাজিতে কথা বলে গেলেন আর ভারতীয় ব্যবস্থাপনার বাপবাপান্তও। তা যাই হোক। ভাল লোকদের কি আর কথা শুনে বোঝা যায়? দেশের জন্য কেন আমি আমার বউয়ের জন্যও বোধহয় সুখেন দাস হতে পারি না! (আমার কান্নাটা আবার রাজেন্দ্র কুমারের মতো! হেহে)

তা প্লেনটা শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে নামল এলাহাবাদ বিমানবন্দরে। বন্দর কোথায়? এ তো জেটি। ট্যাং ট্যাং করে হেঁটে হেঁটে গিয়ে ঘাটে উঠলাম। আর ব্যাগগুলো আমাদের পিছু পিছু ট্র্যাকটরে করে এসে পৌঁছল তারপর একজন পোর্টার দুহাতে করে দুটো করে ব্যাগ নিয়ে আসছে। আর হরির লুটের মতো সব লাফফ্যে ঝাপ্প্যে নিজের মাল কব্জা করছে। সে একেবারে দেখার মতো ব্যাপার।

ওহ! বক্সী বাবুর জন্য অবশ্য নিজস্ব বাহক ছিল! সে আবার ভারতীয়ই দেখলাম।

তা যাই হোক। সাড়ে তিনশো কম বেশী বয়সের ছেলে মেয়েগুলোর সঙ্গে ঘন্টা দেড়েক আড্ডা মেরে ফিরে এলাম হোটেলে। এই ইন্সপেকশনের এই একটা ভাল দিক আছে। অসাধারণ বাচ্চাগুলোর সঙ্গে সময় কাটানো! আর নিজেকে মানুষ হিসাবে আরও একটু সংবেদনশীল করে তোলা।

আমার সঙ্গের শুক্লাজি অবশ্য একটুতেই উত্তেজিত। ইন্সপেকশনের সময় হুড়ুৎ করে হাউঁমাউ প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন। আর ছেলে মেয়েগুলো ঘাবড়ে গেছে। আমি ওনাকে বুঝিয়ে বললামও! আস্তে লেডিজ! বাচ্চাদের পড়াশুনো জানার জন্য শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রশ্ন করুন! তাও শান্তস্বরে। সম্মানহানী কখনই নয়! হাজার হোক ১৯২৯ থেকে চলে আসা রেপুটেড স্কুল বলে কথা।
রাত্রে খাবার টেবিলেও অর্ডার দেবার পর পুড়ুক করে উঠে পড়লেন ওঁর পরিচিত কেউ ওঁর সঙ্গে এসেছে দেখা করতে বলে! আর আমি চিকেন টিক্কা একাই সাবড়ালাম!

যাই হোক, এ তো গেল কেজো কথা! কিন্তু আসুন এই অভিযানের অন্য পর্বে। যেখানে ভিতেরের চোখ আবার খুলে গেল।

ওই যে শুরুতেই গল্পটা বললাম না? ত্রিবেণী, প্রয়াগ, অমৃত, কুম্ভ, বিষ্ণু এসব? কদিন আগেই তো পৌষ মাসে হয়ে গেল এলাহাবাদের সঙ্গমে। যতই সঙ্গমের দিকে এগোতে থাকি। উত্তেজনার তুঙ্গের মতো খাড়া হয়ে আছে ফেলে যাওয়া তাঁবু আর পূর্বাগমনের স্মৃতিচিহ্ন। এখানে ওখানে রাস্তার ব্যারিকেড। ধুসর লোকারণ্য পেরিয়ে এলাহাবাদ কেল্লার ধারে। কথিত আছে আকবরের তৈরী এই কেল্লাতেই নাকি কোন এক গোপন কুয়োয় সরস্বতীর অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। কথিত কাহাবত তো বিজ্ঞানের ধার ধারে না! লোকায়ত কথন নিয়েই তার কারবার!

নদিতে নামলাম। নৌকায়। এ হল যমুনা নদী! এখানে গভীর হয়েছে তার বুক! ঘোলা জলে গভীর! গভীর কিন্তু স্রোতহীন। দূর থেকে দেখা যায় সঙ্গমের দিকে তীরবেগে এগিয়ে চলেছে সে কিন্তু এলাহাবাদ কেল্লার কাছে নিশ্চল। যেন উত্তুঙ্গ সঙ্গমের আগের দুদণ্ড জিরিয়ে নেওয়া। নৌকো এগোতে লাগল ত্রিবেণীর দিকে! ওদিকের গঙ্গা আর এদিকের যমুনা! সরস্বতী তো থেকেও নেই! না থেকেও আছে। আর আছে, অজস্র সাইবেরীয় সঙ্গমাভিমুখী সাদা ‘গাল’ পাখি। আর তাদের খাওয়ানোর জন্য নৌকায় পসরা সাজিয়ে বিপণী। কিনছেও লোকে ছবি তোলার জন্য। আজকের দিনে ছবি তুলতে তো পারদর্শিতার প্রয়োজন হয় না! শুধু মূল্যবান অ্যাণ্ড্রয়েডেই কাজ চলে যায়।

আর আছে একইমুখি সারি সারি যাত্রী ঠাসা নৌকা! সকলেই চলেছে পুণ্য অর্জনে। আবার একবার জেএনইউ, ক্যাম্পাস, পার্লামেন্ট, মলসংস্কৃতি, হাইরাইজ পার করে ভারতের সুগভীর বিস্তৃতি দেখে নিলাম। শহুরে বুদ্ধিদীপ্ত চাকচিক্যের পিছনে আছে এই আপাত রংহীন কিন্তু ভাবনায় রঙিন জীবনশৈলী! ভারতবর্ষ তো বাস করে গ্রামে গঞ্জে মাঠে ঘাটে এলাহাবাদ হরিদ্বারের সঙ্গমে মন্দির মসজিদে। যতই আমরা শিক্ষার দোহাই দিয়ে এই বিশালতাকে অস্বীকার করি না কেন। এদের কাছ থেকে ক্রমশই দূরে সরে যাওয়া ঘটে চলেছে প্রতিনিয়তই।

তফাত শুধু শিরদাঁড়ায় নয় হে কবি! মানুষে মানুষে ফারাক তার স্থান কাল পাত্র বিছিয়ে ভিন্নতাকে একত্রিত করে দূর থেকে দূরতর দ্বীপ হয়ে চলেছে প্রতিনিয়তই। অর্ধনগ্ন নারী পুরুষ কেশহীন নারী পুরুষ করজোররত নারী পুরুষ দেখে আমরা আত্মশ্লাঘা বোধ করতেই পারি যে এ আমি নই! কিন্তু ভীড় ভেদ করে উঠে দাঁড়িয়ে যদি আবার ভীড়েই মিশে যেতে না পারলাম তাহলে তো অভিমন্যুর শিক্ষা সম্পূর্ণ হল না!

সঙ্গমে পৌঁছে দেখলাম গঙ্গা এখানে অগভীর। যেন যমুনার সঙ্গে মিলনের অপেক্ষায় মাত্র! তারপরেই দ্রুত ছুটে চলেছে লোকালয়ের উপর দিয়ে সাগর সঙ্গমে। পথে কত শত পচাগলা ফুলমালা আবর্জনা বুকে করে বয়ে নিয়ে চলেছে সাগর অভিমুখে। বেশী নয়, দশ মিনিট! চুপ করে প্রত্যক্ষ করলাম উত্তর ভারতের শিরাস্রোতকে! প্রদীপ ভাসানো বা দুধের অঞ্জলি দানের অনুরোধ উপেক্ষা করে। প্রকৃতি আর স্বীয়র মাঝে কোন ফারাক নেই! নেই কোন দূরত্ব! শুধু অপার বিস্ময়!

ফিরে আসার সময় সঙ্গে ছিল এলাহাবাদের বিখ্যাত লাল পেয়ারা! কাশীর পেয়ারার মতো এর সব রঙ ভিতরে নয়! বাহ্যিক লালেই রসনা লালায়িত করে! আর ছিল কাঁচা ছোলা নুনে সেঁকে ছোলাভাজা! আহা আমার মতো ঘোর অঘোড়া যারা তাদেরও লালা নিঃস্বরণ ঘটাল সে।

আবার সেই লরি আর আবার সেই চাঁদমালার মতো প্রপেলার। আর কি আশ্চর্য এবারও সঙ্গে ছিলেন মেজর বক্সী! যাক আরে সবাইকেই তো সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে! এরই নাম তো ভারতবর্ষ! তাই না?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ মেয়েটার নতুন নতুন গানের শখ! সেদিন ভোরে দেখি ‘ওগো পুরবাসী’ গাইছে। কিন্তু ‘পুর’ গেছে ভুলে! তাই ‘ওগো বাসী’ “ওগো বাসী” বলে সুর ধরেছে। কিছুক্ষণ পরে মাঝে একটা ভাই ঢুকিয়ে দিল! ব্যাস তারপর সরগম তানপুরো, বেহালা, পিয়ানো, ঢোল করতাল সব বেজে উঠল একসঙ্গে সুরে সুরে। “ওগো ভাই বাসী” “ওগো ভাই বাসী”!

প্র পু১- ছেলেটা এখন দেখছি শখ করে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে সুর বাঁধছে “এভরি শা লা লা লা লা”। নিজে নিজেই! আহা ওর জীবনটাও যেন এতটাই সুরম্য হয়! আমেন!!
siberian-birds-ganga-3

(১৫৫)

বিশ্বাস করুন! আমি জানি রোববারের সকালে যদি কেউ কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে গল্প করতে আসে! বইমেলার ঘটনা টটনাও আমি চেপে রেখেছিলাম এদ্দিন ধরে! কিন্তু কাল গভীর রাতে যা ঘটল…
কাল পার্শ্ববর্তিনীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সুবোধ বড় গোপাল ছেলের মতো আমি ‘ডেডপুল’ দেখতে গেছিলাম। সিনেমা দেখে বেরিয়েছি! তখন রাত সাড়ে বারোটা। গাড়িটা নিয়ে একটা গোল চক্কর ঘুরতেই ‘ক্যাঁচ’ ‘হুড়মুড়’ ‘আহ আহ!’ আওয়াজ! গাড়ি পার্ক করে ছুটে গিয়ে দেখলাম আমার বেশ কিছু হাত দূরে একটি লোক পড়ে আছে ম্যাগির প্যাকেট, পিজ্জা, পেপসির বোতল আরও কিছুমিছু এদিক ওদিক ছড়ানো! আর তার সামনেই একটা বাইক একা দাঁড়িয়ে আর একটি লোক তাকে তোলার চেষ্টা করছে!

কে কাকে ধাক্কা মেরেছে? নাকি বাইক হড়কেছে? নাকি অন্য কিছু! এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই দৌড়ে গিয়ে সাহায্য করলাম। পেপসির বোতলটা গড়াগড়ি খেতে খেতে শক্ত হয়ে গেছে! পিজ্জাটা অটুট! ম্যাগিটা চানাচুরের মতো ছড়িয়ে গেছে! লোকটা উঠে দাঁড়াল! সঙ্গের লোকটি জিজ্ঞাসা করছে, আমিও জিজ্ঞাসা করছি! লোকটি বলল, পা ঠিক আছে, কিন্তু পশ্চাতে খুব ব্যথা! তারপর বাইকের দিকে তাকিয়ে বলল ব্যাকরেস্ট কিঁউ নেহী হ্যায়?
ততক্ষণে বিষয়টা অনুধাবন করেছি! সিনেমা দেখে ফেরা আরও কয়েকজন লোক এগিয়ে এসেছে! তারাও করেছে! এবারে উৎকণ্ঠার জায়গা নিল, ‘হো হো’ হাসি! আরে! একটা লোক পড়ে গেছে বা আহত হয়েছে আর আমরা হাসছি? কেসটা খুব করুণ মুখে বলতে গিয়ে সঙ্গী লোকটাও হেসে ফেলল! সঙ্গী লোকটি নীল রঙের বাজাজ অ্যাভেঞ্জার চালাচ্ছিল! কেতার বাইক! পিছনের ব্যাকরেস্টটা যে খোলা তা পিছনে বসে থাকা লোকটি খেয়াল করে নি! টার্ণিং-এর মুখে একটু আয়েস করে পিছনে ভার দিতে গিয়ে একদম চারপা তুলে দুম! আর হাতে সব জিনিসপত্র থাকায় ধরতেও পারে নিই কিছু!

আরে লোকের খোরাক! আহা আমারও যে এই অভিজ্ঞতা আছে তা আর বললাম না! সেই সেই ২০০২ সালের ১৯শে জানুয়ারি! তখনোও দু চাকা ঠিক করে চালাতে জানি না! তাই এক বন্ধুকে নিয়ে একটা নতুন স্কুটার কিনতে গেলাম! ১১৫ সিসি ১২৫ কিলোর ফোর স্ট্রোক বাজাজ লেজেণ্ড নেক্সট! তা তারপর সে বাড়ি অবধি পৌঁছিয়ে দিয়ে গেল! মাংস ভাত রান্না করে তাকে খাওয়ালাম! তারপর তাকে টা টা করে স্কুটার নিয়ে ফিরবো! ক্লাচ ব্রেক এক্সিলেরটরের কারিকুরি তখনও ঠিক মত সড়গড় নয়! ব্যাস! ফার্স্ট গিয়ারে নিয়ে এক্সিলেরেটরে রেস দেবার আগেই দিয়েছি ক্লাচ ছেড়ে! ও মা স্কুটার পুরোপুরি ঊর্দ্ধগামী! আর আমি চার পা তুলে মাটিতে! নিজেই হাসছি বটে! কিন্তু পশ্চাৎদেশের বালিশ ফুঁড়ে একেবারে মর্মবিদির্ণ করে ধাক্কা লেগেছে! আইব্বাপ! কি ব্যথা হয়েছিল! দু মিনিট সোজা হাঁটতে পারছিলাম না! কিন্তু যাকে বলছি সেই কুটোপুটি হেসে! বোজো কাণ্ড!
যাই হোক! এখানেই শেষ করে দিতাম! কিন্তু তাহলে আপনারা আমায় ঠ্যাঙাতেন পাঠক/ পাঠিকারা! বইমেলা গেলাম এত সেলফি গ্রুপি আর পোজ! কই গল্প না করেই পালাব নাকি?

তাহলে বইমেলার গল্প হিসাবেই দিই কটা!

সৃষ্টিসুখ থেকে এবার সাড়া জাগানো বই বেরিয়েছে ‘মীর এই পর্যন্ত’ আর তা মিরাক্কেলের স্টেজ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে বিজ্ঞাপন করেছেন স্বয়ং মীর! ব্যাস! আর যায় কোথা! চাহিদার জোগান দিতে দিতে পেরে উঠছি না! এমন হল প্রথম সংস্করণ সব শেষ প্রথম তিনদিনেই! যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পূনর্মুদ্রণের খোঁজ পড়েছে! কিন্তু সময় তো লাগে! তাই মাঝে রবিবার আর সোমবার ‘মীর আছে?’ উত্তর দিচ্ছি ‘মঙ্গলবার পাবেন’ বলে!
এমন হল যে আমরা শিখে গেলাম কে মীরের বই খুঁজতে আসছে! তার মধ্যেই এক ব্যাক ফায়ার! মাটিতে বসে আছি! এক ভদ্রলোক এলেন! আমি জিজ্ঞাসা করলাম! “মীর?” “সে আবার কি? রাশিয়ান বই?” “না না আপনি দেখুন!” “আচ্ছা মীরের বই বললেন? সেটা কি অনুবাদ” “নাহ নাহ মীর আফসার আলির উপর বই বেরিয়েছে!” “সে কে?” “ওই যে মিরাক্কেল?” “অ”। নিষ্ক্রমণ! আমার ইগোর মহাপ্রস্থান!
বাদ বাকি চাহিদা না চাহিদা মিষ্টি খাওয়া আপ্যায়ন নতুন বন্ধু পুরনো বান্ধবী পেরিয়ে মনে থেকে গেল আরেক গল্প।

মানুষ সৌরাংশুকে ফেসবুক এবং অন্যান্য সূত্রে চেনেন অনেকেই! কিন্তু লেখক সৌরাংশুকে দেখে কেউ বাক্যহারা হয়ে বন্ধুকে চুপিচুপি বলছে যে ‘একসঙ্গে একটু সেলফি তুলব! তুই একটু বলবি!’ অনুরোধটা শুনে আমারই মুখ থেকে ইয়াব্বড় ‘অ্যাঁ’ বেরিয়ে গেছিল! যাই হোক! ছোট্ট ব্যাপার কিন্তু আমার লেখক সত্ত্বার কাছে তো ছোট নয়! মানে ফুটপাথজীবীর আর কি বা রোলসরয়েস! তাই মনেই থেকে যায়!
যেমন থেকে গেল, সেই গোলাপ পাতা পানের গল্প! ছেলেটি সদা হাস্যমুখে পানের মধ্যে আমসত্ত্ব, আঙুর, চকোলেট থেকে সব ধরণের খাদ্য সম্পদ দিয়ে রুপোলী তবকে মুড়ে তারপর খাদককে বলছে, ‘Open your mouth’ আর তারপর যে কোথায় সেই পান মিলিয়ে যাচ্ছে মুখে এক অকল্পনীয় স্বাদ রেখে…! রোহণ দেখে বলল, ‘যা সব দিচ্ছে তা দিয়ে জুতোর শুকতলা মুড়ে দিলেও দারুণ খেতে হবে!’
আর কিছু? সবই আছে! সব ভালোবাসা ছবি আদর ডিঙিয়ে কিছু কিছু ঘটনা মনের সদর দরজা দিয়ে ঢুকে চিলেকোঠায় লুকিয়ে থাকে সযত্নে! সেগুলো শুধু আমারই থাকুক না হয়! খালি স্টল ফেলে আসার স্মৃতি আবার তা ভরে দেবার স্বপ্ন নিয়েই বাঁচি কটা মাস! আসছে বছর আবার হয়!

ও হ্যাঁ! ‘দেবাংশু সাহিত্য সম্মাননা’য় যারা উপস্থিত হলেন বা হতে পারলেন না! ফিসফাস লেখকের পক্ষ থেকে একটা ধন্যবাদ না দিলে তো চলেই না! বেশ সুন্দর কাটল সন্ধ্যাটা!

ইম্প্রোভাইজও করতে হল কয়েকবার! যেমন আগের অনুষ্ঠানটি ছিল সেক্সপিয়ার সোসাইটির! তারা বলেই যাচ্ছে বলেই যাচ্ছে! সাতটা পনেরো পেরিয়ে গেছে! আর আমি একটু একটু করে স্টেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি মিডিয়া সেন্টারে! যিনি আয়োজক তিনি বিব্রত! কিন্তু বিদগ্ধ জন্মেদের কবিতা পাঠ আর বক্তৃতা তাও চলেছে সমানে! আরে যেন আর কোথাও কেউ কবিতা পড়তে দেবে না!

তারপর সেই নিচু মাইকে বলতে বলতে তা হাতে তুলে নিয়ে বলতে শুরু করা! বাবা এবং আমার দুই পিসতুতো দাদার হাত দিয়ে সিদ্ধার্থদাকে প্রথম দেবাংশু সাহিত্য সম্মাননা প্রদান! দুদিন পরে বিয়ে বাড়ি যাবার জন্য ট্যাক্সির জন্য ছোটাছুটি! সিঁথির মোড়ের প্রেস থেকে বই নিয়ে আসা! আর বন্ধুদের সান্নিধ্য! এই সব টুকরো স্মৃতি জড়িয়েই তো বইমেলা! আবার আসব বললেই তো আর অঙ্গীকার আর মনের ভালোলাগা বোঝানো যায় না! কিছু কিছু কথা বুঝে নিতে হয়! পাঠক পাঠিকারা, এতদিনের সম্পর্ক! নিশ্চয় বুঝতে পারছেন কি বলতে চাইছি! সব কথা না হয় নাই লিখলাম! সঙ্গে থাকবেন! আরও গল্প হবে! আজীবন! আমেন!

(১৫৪)


কয়েকদিন আগেই টম হ্যাঙ্কসের হোস্টেজ ড্রামা ক্যাপ্টেন ফিলিপ দেখছিলাম। ভারত মহাসাগরে সোমালিয় জলদস্যুদের কবলে পড়ে ক্যাপ্টেন ফিলিপ্স ও তার জাহাজ। তার পর তার থেকে কিভাবে মুক্তি পায় ইত্যাদি! অসম্ভব সুন্দর অভিনয়ে যেন চোখের সামনে ঘটে চলেছে ঘটনাগুলি। তার শেষ দৃশ্য ছিল মুক্তি পাবার পরেও ট্রমাকবলিত টম হ্যাঙ্কসের অনবদ্য অভিনয়। সহজ থাকার চেষ্টা করেও পারছেন না! ট্রমা বা আতঙ্ক! যদিও ট্রমার বৃহত্তর অর্থ বাংলা ভাষায় বোঝানো সম্ভব হয় না! তবু দুর্ঘটনা বা অঘটন সম্পর্কিত ট্রমা আমরা বৈদ্যুতিন মাধ্যমের দৌলতে অহরহ দেখতে পাচ্ছি! দুর্ঘটনা কবলিত প্রিয়জন হারানো রাজধানীর যাত্রীর মুখ থেকে টিভি সাংবাদিকদের দৌলতে তাৎক্ষনিক অনুভূতিও জেনে নিতে পারছি। জানতে পারছি, পেটের দায়ে মানুষের জন্তু হয়ে যাবার, অসংবেদনশীল হয়ে যাবার গল্পও।

পাঠক/ পাঠিকারা, নিজের ঢাক পেটানোর মতো চওড়া বুক যে একেবারেই নেই তা বলব না। কিন্তু মধ্যবিত্ত মানসিকতায় চক্ষুলজ্জাটা কোথাও যেন এখনো আলগা ব্যাণ্ডএইডের মতো ঝুলে রয়েছে। তাই ভেবেছিলাম চেপে যাব। কিন্তু ফিসফাস তো আপনাদের আর আমার মধ্যে সুগম চলাচলের পথ। প্রিয়জনকে আমার নিজের মনের ভাব বোঝাবার সহজ মাধ্যম। যেখানে একান্ত ব্যক্তিগত এবং এহবাহ্য অভিজ্ঞতাগুলি ছাড়া সবই ভাগ করে নেওয়া হয়। পর্দা নেই কোন। তাই খুলে বলতে এলাম আর গৌরচন্দ্রিকা করলাম।

বছর দশেক আগে এক মে মাসের সকালে অফিস যাবার পথে এক পেট্রোল পাম্পের সামনে সদ্য ফেলে যাওয়া পেট্রোলে হড়কে গিয়ে ভয়ানক দুর্ঘটনায় পা উলটে পড়ে হাঁটুর সাড়ে চৌদ্দটা বাজিয়ে ফেলেছিলাম। তখন এক সহৃদয় ব্যবসায়ী আমায় গাড়িতে তুলে শক্করপুরের নিজের দোকানে নিয়ে গিয়ে কোল্ড ড্রিংক্স আর বিস্কুট খাইয়ে পেনকিলার খাইয়ে তারপর কোলে করে সেকেন্ড ফ্লোরে তুলে দিয়ে যান। সেই কথা ভুলি কেমন করে?

তার আগে বা পরেও কেমন করে জানি না, অযাচিত সাহায্য এই মানুষজনের কাছ থেকেই পেয়ে এসেছি। যাদের স্বার্থপরতার কথা আজ সর্বজনবিদিত। আমিও যে সম্মুখীন হই নি তা নয়। এই যেমন ধরুন, উলটো দিক থেকে এক রিক্সা এসে আমার গাড়িতে মেরে উলটে পড়ে যায় পাসে রাখা এক হণ্ডা সিটির উপর, তাতে সামান্য টাল খেয়ে যায় আর আমার গাড়ির হেডলাইট ভেঙে যায়। কিন্তু হণ্ডা সিটির মালিক আমার কাছ থেকে, সাড়ে চারশ (সারাবার খরচ) আদায় করে ছাড়ে। অথবা সেই দশ বছরের পুরনো চোটে আবার লাগার পরে অনুরোধ করা সত্ত্বেও কেউ স্কুটার চালু করে দিতে রাজী না হওয়ায় (তার মাস দুয়েক পরেই), প্রবল বৃষ্টির মধ্যে হ্যান্ড ব্রেকের সাহায্যে পা সোজা রেখে প্রচণ্ড ভিজতে ভিজতে বাড়ি এসে মনের শেষ জোরের বিন্দুটুকু দিয়ে গাড়ি স্ট্যান্ড করে হামাগুড়ি দিয়ে দুতলা চড়ার সময় কাউকে না পাওয়া! কিন্তু সে গুলো তো মামুলি ব্যাপার। এমনিতে কিন্তু উপরওলা বা সহযাত্রীদের কেউ না কেউ কখনো না কখনো সাহায্য করতে উপস্থিত হয়েইছে।

তা আমার সুযোগ এলে কি বিবাগী বৈরাগীর মতো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যাব? নাকি বিপদ বাঁধা দূরে ফেলে ঝড়ের রাতে দামোদরে ঝাঁপিয়ে পড়ব? স্যার হিরো হতে পারব না! কিন্তু মানুষ হওয়া থেকে কে আটকাবে!

দিল্লিতে জম্পেশ ঠাণ্ডা এদ্দিন পরে পড়েছে। না হলে চুল না ভিজিয়েই শীত সাঁতরে পাড়ে উঠে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ কি মনে হওয়ায় মাঝ দরিয়ায় ডুব দিয়েছে। ভালই হয়েছে! শীতকালে শীত না পড়লে তো গরমকালে গরমের চোটে চামড়া খুলে যাবার জোগাড় হবে। তা সক্কাল সক্কাল অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি, থার্মোমিটারের পারদ বলছে সাড়ে তিন। গাজীপুরের মোড়টা ঘুরতেই দেখি জটলা, পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখি একটা লোক সটান মাটিতে লম্বা হয়ে আছে আর বাকি পথচিকিতসকরা তার নিরীক্ষণ করে চলেছে। গাড়িটা থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, একজন এগিয়ে এসে বলল, “আগর হো সকে তো মদত কর দো!” মদত কর দো মানে? আমাদের জীবনই তো পরের জন্য উচ্ছুজ্ঞ করা হয়েছে। আহা এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে? গাড়ি খুলে দিলাম, বললাম কাউকে কিন্তু বসতে হবে সঙ্গে! ওবাবা যে ছেলেটির বাইকে সেই পড়ে থাকা লোকটির সাইকেল ঠোকাঠুকি হয়েছে তাকে ধরে বেঁধে লোকে এগিয়ে দিল। সে তো দেখি ভয়েই সিঁটিয়ে আছে। “জান বুঝকে নেহি মারা! উনহোনেই আগে চলে আয়ে মেরে উপর!” বিশ্বাসযোগ্য বয়ান বটে। কিন্তু একে নিয়ে তো যাওয়া যাবে না! যদি কেটে পড়ে?

অবশ্য কেটে পড়ার হলে সে আগেই পড়ত। তা না করে এগিয়ে এসে বাঁশ নিজেই নিয়েছে! অতএব উটকে কাঁটা বেছে খাওয়ানোর দায়িত্বও তো আমার উপর! ততক্ষণে ১০০-য় ফোন করায় পিসিআর ভ্যান চলে এসেছে। তা তার মধ্যে থেকে একজনকে বললাম যে আমার গাড়িতে বসে মুমুর্ষুর মাথা সোজা করে ধরে থাকতে। তিনি এদিকে হাঁটতে না পারলেও লোকজন জবরদস্তি করে মাথা চেপে হাঁটু টিপে ধরে প্যাকেট করে ঢুকিয়ে দিয়েছে পিছনের সিটে। কিন্তু নাক দিয়ে রক্তর আভা যেন? পিসিআরের পিছনে পিছনে গাড়ি চলতে লাগল। কিছু দূরেই কল্যাণপুরিতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হাসপাতাল। তার ট্রমা সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি স্ট্রেচার আছে কিন্তু ঠেলে আনার কেউ নেই! অগত্যা দুজন পুলিশ আর বাইক চালকের মদতে আহতকে স্ট্রেচারে বসানোর চেষ্টা শুরু হল। ভদ্রলোকের অর্ধেক জ্ঞান হয়েছে। কিছুতেই তিনি নামবেন না গাড়ি থেকে। এদিক দিয়ে নামাতে যাই তো ওদিকে চলে যায় আর ওদিকে গেলে এদিকে! শেষে দুটো তাগড়া কেঁদো বাঘা পুলিশ (দুটোরই বাড়ি কালিকট! আজব কেস! সুদূর কেরালা থেকে দিল্লি এসে দিল্লি পুলিশের চাকরি করছে! যেন কালিকটে কাটাকাটি হয়ই না!) তাকে টেনে নামিয়ে হাঁটিয়ে নিয়েই ভিতরে চলে গেল। তার পিছন পিছন আমি আর বাইক আরোহী গেল।

বাইক আরোহীর নিজেরও চোট লেগেছে। কিন্তু সে পুলিশ কেসের ভয়েই আধমরা! আমি অভয় দিলাম! “আছি তো!” যাই হোক ভিতরে আরেক কেস। ট্রমা সেন্টারে মধ্যে আমরা কেস লেখাচ্ছি আর তার মধ্যেই এক কনস্টেবল একটি কিঞ্চিত অপ্রকৃতস্থ চ্যাংড়াকে ফটাফট থাপ্পড় মেরে চিৎকার করে বলছে, “আবে ইয়ে হসপিটাল হ্যায়! তু চুপ হো যা! নেহি তো মারা যায়গা!” কি অদ্ভুত সমাপতন।

যাই হোক আহতের পকেট থেকে আমার উপস্থিতিতে পুলিশ পকেটমারি করে মোবাইল পার্স এগারোশো টাকা আর আইকার্ড বার করল। এনডিএমসিতে চাকুরী করেন হন্সরাজ রাই। বাড়ি নাকি কাছেই খেড়া গ্রামে! মোবাইল ঘেঁটে ছেলে বা কাউকে একটা ফোন করা হল। তুলল না কেউ! তারপর নম্বর ঘেঁটে মনুকি মাম্মি কে ফোন করে বোঝালাম কেসটা! বারবার বলতে হল এমন কিচ্ছু হয় নি! এদিকে বাইক চালক পঙ্কজেরও মাথা ঘুরতে লেগেছে! তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা করে দেওয়া হল। আবার ফোন এল! এবার মনুর ফোন! তাকে পরিষ্কার করে বলতেই সে একগাদা ধন্যবাদ দিল!

ওদিকে থাপ্পড় খাওয়া চ্যাংড়াটা মিনমিন করে বলার চেষ্টা করছে যে সে গান্ধীবাবার শিষ্য! মারধর তো দূরের কথা কোনদিন অসাবধানে পিঁপড়ে চাপাও দেয় নি! কিন্তু তার বিপরীত দিকের লোকটা তার ভাঙা চশমা আর ফুলে যাওয়া গাল নিয়ে তার বক্তব্যের অসাড়তা প্রমাণ করতে তৎপর। কে যে ট্রমাগ্রস্ত তাই বোঝা মুশকিল।

যাই হোক পুলিশকে নিজের নম্বর, পঙ্কজকে বরাভয় এবং মনুকে আশ্বাস দিয়ে অফিস পৌঁছলাম। মনের ভিতর কোথাও একটা চাপা আনন্দ কাজ করছিল। ভাল কিছু করার আনন্দ! ভেবেছিলাম নিজের মনেই চেপে যাব!

কিন্তু তা হতে দিল না খান সাতেক ফোন। তিনটে ফোন এল মনুর কাছ থেকে। প্রথমে জানতে চাইল কি ভাবে দুর্ঘটনা ঘটল! বাইকওলার দোষ ছিল কি না! বাইকওলা কি পালিয়ে গেছে? হন্সরাজ ইতিমধ্যেই বড় হসপিটালে চলে গেছেন। তাঁর মাথায় আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং বিপদসীমার বাইরে নয়! হাঁটাচলা চেনাশোনা সব হচ্ছে কিন্তু কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে।

শেষে আমায় মনু ফোন করে জিজ্ঞাসা করল বাবার ফোন এবং অন্যান্য জিনিসের কথা! পুলিশের কাছ থেকে কি ভাবে উদ্ধার (?) করা যাবে! আর পুলিশ সেখানে টাকা পয়সা দাবী করবে কি না! তাকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে আমি আছি! কিছু হলে আমি আছি!

এর পর এলো পঙ্কজের ফোন। তাকে ছাড়তে ছাড়তে বিকেল করে দিয়েছে! তার তাও ভয় রয়েছে! কেস খেয়ে যাবার ভয়! তাকেও আশ্বস্ত করলাম! শেষে তার ভিতরকার মনুষ্যত্বের ঝলক দেখলাম মনুর নম্বর চাইবার মধ্যে! নাকি মনুকে আগে থেকে ম্যানেজ করতে চাইছে? যাই হোক মনুকে আমি ইতিমধ্যেই বলেছি কারুর দোষ নয় আগে বাবাকে বাঁচাও! একেও বললাম! পুলিশ ফোন করলে তো আমি আছিই!

তা পুলিশ ফোন করল, খুব রোয়াব নিয়ে শুরু করলেও আমার অবিচল এবং শান্ত গলায় হয়তো কিছুটা অন্যরকম মনে হয়েছিল। শেষ করল খুব সম্ভ্রম নিয়ে! “স্যার জরুরত পড়েগি তো হাম দুবারা আপ কো কষ্ট দেঙ্গে!” ততক্ষণে নিশ্চিত হয়ে গেছি যে মনুর মানিব্যাগ পেতে আর পঙ্কজের ফালতু কেস না খেতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না!

যাই হোক কোথাও একটু নিজের জন্যও ভাল্লাগা এসে ঘর বাঁধল! তাই লজ্জা লজ্জা মুখে আপনাদের বললাম! তবে আরেকটা কারণও আছে! কোথাও যদি পাঁচ ফুট এগারোর সামান্য ভারী চেহারার একটা মানুষকে লাল গাড়ি বা কালো বাইকে দেখেন যে পথে ঘাটে মাটির গন্ধ নিচ্ছে। দয়া করে এগিয়ে আসবেন! মুখটা তো চেনেনই! না চিনলে নিচে দেখে নিন প্লিজঃ
12557157_1017542314970722_1308047321_o

ওই যে বাম দিকের চোঙা হাতে লোকটা! ঐটাই আর কি!

(১৫৩)

পাঠক/ পাঠিকারা, বুইলেন, আইডিয়ালি এই পোস্টটা চলে আসার কথা ছিল সেই ৪ঠা জানুয়ারিতেই। কিন্তু এখন মাথায় পাকাচুলের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ধৈর্যও বেড়েছে বটে। তাই মনে হয়েছিল, আগে শেষ দেখি তারপর না হয়…

তা সেই জানুয়ারিস্য প্রথম প্রভাতে অচেনা দিল্লির কনকনানোহীন ঠাণ্ডার মধ্যে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েই চমকে গেলাম। আরে ওয়াহ এ রাস্তা তো চিনি না বাপ। ছ্যার ছ্যার করে ফোর্থ গিয়ার ফিফথ গিয়ারে গাড়ি গড়াচ্ছে। ফার্স্ট গ্রিয়ার, ক্লাচ, ব্রেক-এর জটিল সমাস নেই। নেই সময়ে অফিস পৌঁছোবার দফারফা অবস্থা। কি ব্যাপার? না অরবিন্দ কেজরিওয়াল বাবু দিল্লিতে ডিক্লেয়ার করেছেন যে বায়ুদূষণ কমাবার জন্য জোড় বিজোড়ের অঙ্ক কষে গাড়ি নামাতে হবে।
জোড়ের দিনে জোড়ের গাড়ি আর বিজোড়ের দিনে বিজোড়। আর অন্য দিনে? বাকি সব মেরে পিছে আও! মানে জোড় না থাকলে জোড়ের দিনে আস্তে লেডিজ! মেট্রো আর বাস আছে! স্কুল বন্ধ তো স্কুল বাস আছে! ধোঁয়া ওঠা সকালে ধোঁয়া ওঠা এক্সহস্টে তা দিয়ে বাড়তি দাম চাওয়া অটো আছে! কিন্তু নিজের গাড়ি নেই!

তা মেট্রো বা বাস তো আছে নিজের জায়গায়! কিন্তু লোক ঠাসার বহরের তো শেষ নেই! একদিন বিকেলে বউকে গোবিন্দপুরি মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে দিতে গিয়ে দেখি সিঁড়ি দিয়ে লাইন চালু হয়েছে। থাক বাবা! তুমি অটোতেই যাও! বেশি টাকা চাইলেও যাও! নইলে যদি জোড় বিজোড়ের চক্করে বউটাই হারিয়ে যায়? কেলেঙ্কারির শেষ থাকবা না!

যাই হোক। খিল্লি বন্ধ হোক! মূল মুদ্দায় ফিরে আসি! আসল কথা হল দূষণ বা পলিউশন! সেটা কি ভাবে কমানো যায়? বায়ু দূষণ, জল দূষণ, শব্দ দূষণ, আলোক দূষণ। সমস্ত কিছুর চক্করে আমরা তো কোন রকমে টেনেটুনে ম্যানেজ ট্যানেজ করে শেষের সেই দিনটাকে ইলাস্টিকের মতো টানটান করে রেখে দিয়েছি। কিন্তু তারপর? আমাদের সন্তান সন্ততিরা? তাদের পর? বা আরও তাদের পর? দুঃখিত পাঠক পাঠিকারা, আরও তাদের পরটা সত্যিই ঝাপ্সা! এই পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করার বদলে আমরা উত্তরাধিকারে রেখে যাব ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ফুসফুস আর আনুষাঙ্গিক রোগের ডিপোগুলোকে। আকাশটাই তো ছোট করে দিচ্ছি! তাহলে আর উড়বে কোন সাহসে তারা?

তো যাই হোক, হুড়মুড়ি প্রতিক্রিয়া (নি জার্ক রিঅ্যাকশন আর কি) বলে অরবিন্দ বাবুকে যতই হ্যাটা করি না কেন, কোন না কোন ভাবে আমাদেরও কিন্তু ভাবতে হবে এই বিষয়ে। মনে আছে সিএনজি বাস করার জন্য শীলা দীক্ষিতকে কতটা বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। সেই তুলনায় আজ পরিস্থিতি অনেক বেশি ঘোরালো! নিঃশ্বাসে বিষ ঢুকে ফুসফুস হৃদয় ফুটিফাটা করে দিচ্ছে।

কিন্তু দিল্লির মানুষও তো পাল্টেছে! গতবছরেই রেকর্ড মার্জিনে (আমার এখনও যেন বিশ্বাস হয় না!) কেজরিকে জিতিয়ে এনেছে, চোখে রঙিন চশমা পরে। আর নিত্ত নৈমিত্তিক নাটকগুলিকেও বড়ভাইয়ের স্নেহ নিয়ে সহ্য করছে। কেন? কেন না পরিবর্তন সবাই চায়! সময় সবাই চায়! একটু অন্য ভাবে পৃথিবীটাকে দেখার! তাই তো সিংহভাগ সফরকারী বিনাবাক্যব্যয়ে নিয়ম মেনে পথে নেমেছে! আর যারা মানছে না? বাবু ২০০০ টাকা গ্যাঁট গচ্চা দিয়ে গাড়ি চালাও! তা দিল্লির মানুষের কাছে টাকার অভাব নাকি? ধুস ২০০০ তো কড়ে আঙুলের ময়লারও সমান নয়!

কিন্তু যাদের দেবার ক্ষমতা নেই? এই যেমন আমি! প্রায় দেড় বছর পর লজঝড়ে বাইকটাকে সার্ভিস করিয়ে চকচকে করিয়ে মাঠে নেমেছি! আরিত্তারা কি তার অভিমান! কি তার আওয়াজ! চেন তো ঘটাং ঘটাং করছেই গিয়ার চেঞ্জ করতে গিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করছে হ্যান্ডেল ঠন ঠন দাঁত কনকন! কিন্তু বয়সটাও যেন এক ঝটকায় কমে গেল দশ বছর! বাইক চেপে জ্যাকেট পরে সানগ্লাস চাপিয়ে শীতের সকালে অফিস তো মুড়কি চিবোবার আগেই পৌঁছে যাচ্ছি। তার উপর মানানসই ঠাণ্ডাও পড়ে নি তেমন। আর পায় কে! তবে যেতে যেতে দেখলাম বাসস্ট্যাণ্ডে মানুষের ঢল রাস্তায় নেমে আসছে আর মেট্রোগুলোর কথা তো কহতব্য নয়!

তবে যে ঘটনাটা না বললেই নয় সেটা হল এক বামা গাড়ির ডানদিকে বসে জোড়ের দিন বিজোড় গাড়ি চালাচ্ছেন আর বাম দিকে এক বামাপদ! তা পুলিশের ব্যারিকেড আসতেই সে বামাপদ নিচু হয়ে সিটের নিচে সেঁধিয়ে গেল। আর মামণি দিব্যি মহিলা ড্রাইভারের সুবন্দোবস্ত নিয়ে গলে বেরিয়ে গেলেন! সিরিয়াসলি বলছি! নিয়ম থাকে তার ফাঁক ফোকর থাকে! ট্রেন বা সিনেমাহলে মহিলাদের অনেক পুরুষই এগিয়ে দেয় যাতে তারা গিয়ে টুক করে লাইন ভেঙে টিকিটখানি কেটে ফেলতে পারে! কিন্তু এ চীজ জিন্দেগিতে দেখতে পেতাম না যদি না অড ইভেনের এই উর্বর ধারণা দশাবতারের মস্তিষ্কে ধারণ না করতেন।

তার মাঝে কে আবার কোর্টে কেস ঠুকে দিয়েছে! এখন তো জনস্বার্থ মামলার হিড়িক পড়ে গেছে! ধোনির ভারত হারলেও জনস্বার্থ আর পাবলিক প্যাঁদালেও জনস্বার্থ! তা কোর্ট বাবাজিও জিজ্ঞাসা করলেন হ্যাঁ ভাই দূষণ বেড়েছে না কমেছে? একদম ইঞ্চিটেপ দিয়ে মাপতে হচ্ছে! হাফ ইঞ্চি বাড়লেও হই হই আর তিন ইঞ্চি কমলে তো কথাই নেই! লোকে মিষ্টি বিলোচ্ছে! কে যে ঠিক আর কে যে ভুল ছাতা বুঝতে বুঝতেই পনেরো দিন কেটে চলে গেল।

প্রথম দিন রাস্তা দিয়ে বিজোড় সংখ্যার গাড়ি চালাতে গিয়ে দেখলাম জোড় সংখ্যার গাড়িগুলো সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাবিয়ে চেয়ে দেখছে। সেই গল্পটা মনে পড়ে গেল! বাজে গল্প যদিও মানে জঙ্গলে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে জননাঙ্গ জমা রাখা হচ্ছে ব্যাঙ্কে পাঁচ বছরের জন্য টোকেনের বিনিময়ে। মনখারাপ নিয়ে এক বাঁদর হেঁটে যাচ্ছিল মাথা হেঁট করে। উপরে তাকিয়ে দেখে তিন চারটে বাঁদরী খিকখিক করে হাসছে। সে বাঁদর বলল, “এখন যত ইচ্ছে হেসে নে! আমি একটা হাতির টোকেন ঝেড়ে রেখে দিয়েছি!” ছিঃ বাজে কথা শুনবেন না, বলবেন না! দেখবেনও না!

নির্মল হাওয়ায় শ্বাস নিতে গিয়ে ঠিক ভরসা করতে পারলাম না যদিও! বাইক আর অটো আর ট্রাকের ধোঁয়া তো আগের মতই আছে! তবে পথ মাতার উপর বোঝা কমে গিয়েছে কদিনের জন্য! আর আবহাওয়াটাও বদলে গেল যেন, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মনোরম হেমন্তের পরিবেশ! ঠাণ্ডা পড়ল, জোড় বিজোড়ের রিপোর্ট কার্ড পেরিয়ে। তাও বেশি দিনের জন্য না! এই আসি এই যাই শীত, হঠাৎ গরম, ভুষভুষে ঘাম! দিল্লির আবহাওয়াটা পাল্টে যাওয়া বন্ধুর মতই অচেনা হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে!

তবুও আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি ক্ষতি কি! স্বপ্ন দেখতে তো ক্ষতি নেই! তবে একটু ভাবনা চিন্তা করে দেখা ভালো!। স্বপ্ন দেখি, দিল্লির চারপাশ দিয়ে বাইপাস তৈরী হয়েছে আর ধূলিধূসর ট্রাকগুলো শহরের বায়ু দূষিত না করে সেই রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে। ডিজেল প্যাসেঞ্জার গাড়ি ব্যান হয়ে গেছে। সরকার থেকে হাইব্রিড আর সিএনজি গাড়ির উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে! নিয়মিত দূষণ পরীক্ষা হচ্ছে! আর মানুষ জন নিজে থেকে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে, পৃথিবীর আয়ু বাড়াবার জন্য! আসলে উত্তরাধিকারের মধ্যে দিয়েই তো আমরা বেঁচে থাকি! আর এই সুন্দর পৃথিবীটা ছেড়ে যাব কোথায় বলুন তো! উত্তরাধিকারীরা তো এই পৃথিবীতেই খেলে পড়ে বড় হচ্ছে! চাঁদে বা মহাকাশে কলোনি তো এখনও ডিস্ট্যান্স ড্রিম!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ উত্তরাধিকারী বলতেই মনে হল ছোটটার কথা! সে আজকাল বহুত ফটর ফটর করে! ঘুমোতে গিয়ে গান শোনার ফরমাশ! তার মা তাকে চাপড়ে ঘুম পাড়াচ্ছে! আর সে নিয়মিত ফরমাস করে যাচ্ছে, ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে’ গাও! ‘আয় আয় ঘুম’ গাও! ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ গাও! ঘুমের তো আটকলা! তা এই সময় দরজা খুলে আমি প্রবেশ করেছি! সে মায়ের কোলে শুয়েই একবার উঁকি মেরে দেখে নিল বাবা ঢুকেছে! বলে উঠলঃ “ও বাবা! এচো! একটা ভাল গান হচ্চে!” পাগলা ঘুমোবি যদি, ঢেঁকুর তুলবি কেমনে!!!