(১৭১)

প্রত্যেকবার লটবহর গুছিয়ে হড়বড় করে কোলকেতা যাই আর ফিরে আসি। এসে দেখি আসার সময় কিছু একটা অবশ্যই ফেলে এসেছি। চিরুনি, ব্রাশ, পেন, মায় পাঞ্জাবী টাঞ্জাবী শুদ্ধু। এভাবেই বোধহয় আমার শহরটাতে উত্তরাধিকার রেখে আসি! এখনও।

পাঞ্জাবী বলতে মনে পড়ল, গত মার্চ মাস থেকে বিশেষ কারণে অফিসে পাঞ্জাবী পাজামা পরিধান করা শুরু করেছিলাম, যা প্রথমে প্রয়োজন ছিল কিন্তু এখন বেশ একটা স্টাইল স্টেটমেন্ট কাম আরাম কা মামলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন কী দুর্গা পুজোর ষষ্ঠীর দিন আমি কপাল ঠুকে ধুতি পরেও চালিয়ে দিয়েছি। প্রথম দিকে যারা এসব নিয়ে টিটকিরি দিত, তাদের জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয় পোশাকের ধুয়ো তুলে ধুয়ে দিতাম। আজকাল দেখছি তারাই আমার ভারতীয়ত্ব এবং ইণ্ডিয়াননেসের (দুটোই এক হয়ে গেল নাকি?) প্রশংসা করছে আর পাঞ্জাবীর ভ্যারাইটির তারিফের সেতুবন্ধন ঘটাচ্ছে।

আমাদের বর্তমানে যিনি বিভাগীয় দায়িত্বে আছেন তিনি আদতে সামাজিক ন্যায় বিভাগের সচিব। মহিলা নিজের ডিপার্টমেন্টে ইনফরমাল পোশাকের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। কিন্তু সেদিন এক রিভিউ মিটিং-এ দিব্যি কালো পাঞ্জাবি আর চুড়িদার পরে তাঁর সামনেই প্রেজেন্টেশন দিয়ে চলে এলাম। ধ্যাতানি না খেয়েই। আর আমাকে পায় কে!

যাকগে যাক, আবার বাপু লাইনে ফিরে আসি। এবারের বার্ষিক শিকড় অন্বেষণ মাত্র দিন নয়েক হবার জন্য অনেক কিছু কাটছাঁট করতে হয়েছে। তবে, এর মধ্যেই একদিন বালি ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। বালিতে আমি বেশ কয়েকবার গেছিই, আমার বাবার প্রায় ২৭ বছরের সহকর্মী কাম বন্ধুর বাড়ি ছিল বালিতে। সেই বন্ধু, যাঁরা একে অপরকে ২৭ বছর ধরে, ‘অতীন দা আপনি’, ‘মনু আপনি’ করে কাটিয়ে দিয়েছেন। আর আজকাল তো নিজের পার্শ্ববর্তিনীকেও তুই মুই করে ফেলি!

তা সেই মনুকাকুর বাড়ি ছিল আদতে মোহন বাগানের আড্ডা। বালির চ্যাটার্জী বাড়ির নাম ৭০-৮০র দশকের মোহনবাগানের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সেখানেই দেখা ৭০-র সুপারস্টার আর আশির নক্ষত্রদের।

এরপর বালির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী হল যখন আমি ৯৭তে পেজার সেলসে মোবিলিঙ্কে ঢুকলাম। সবে গ্র্যাজুয়েশনের পর পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট পড়ে মাস চারেক হুগলী জুটমিলে যাতায়াত করছি। সরকারী চাকুরীর পরীক্ষা দেওয়া প্রায় শেষ। এদিকে গার্লফ্রেণ্ডের বাড়ি থেকে চাপ আসছে বিয়ে করতে হবে। তা আমার মতো সাধারণ একটা ছেলেকে চাকরী কে দেবে? তাই এক অগাস্টে সব দ্বিধা দ্বন্দ ঝেড়ে ফেলে চলে গেলাম মোবিলিঙ্কের অফিসে। ইন্টারভিউ! সাক্ষাতকার! তা ডিঙিয়ে চাকরিও পেয়ে গেলাম ডিলার সেলস এক্সিকিউটিভের।

প্রথম দিনেই ডাইরেক্টর আর সেলস ম্যানেজারের চ্যালেঞ্জ। পেজার বেচে দেখাও। আর আমার তো তিন দিন আগে থেকেই ফিট করা খরিদ্দার। ভাইয়ের বন্ধুর কাকা! পেজার নেব বলছিলেন। তাকে দিন তিনেক আটকানো হয়েছে। আমি দেব বলে। ব্যাস, মঞ্চে উঠে ঠিকঠাক ডায়লগ বলতে দিতেই জুটে গেল চ্যালেঞ্জ বিজয়ীর পুরস্কার পার্কার পেন। তারপর আর কী! আটমাসের মধ্যেই শোঁ শোঁ উত্থান আর দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসাবে ডিএসএ থেকে সোজা কোম্পানির পে রোলে। আর সেই সময় জুটল বালি আর উত্তরপাড়ার দুই ডিলার। উত্তরপাড়ার ডাক্তারবাবু (নাম বলব না) ভাঁওতাবাজ নাম্বার ওয়ান। তাঁর অধীনে রাখা ডিএসএগুলোকে মাইনে দিত না। কিন্তু বালির যে ছেলেটি ডিলার হল, তার সঙ্গে বেশ পটে গেল আমার। দোষ বলতে ছিল বহুত মিথ্যে কথা বলল। কিন্তু আমি আবার সেলিং-এর ক্ষেত্রে রেপুটেশনটাকেই মূলমন্ত্র মনে করি। গাপ্পি দিয়ে সেলিং বন্ধ, কিন্তু তারপরেও কর্পোরেট আর লোকাল মার্কেট ধরে মাস তিনেকের মধ্যেই আমরা টপ সেলার হয়ে গেলাম।

ছিলামও চার মাস একদম সকলের মাথার মণি হয়ে। ইতিমধ্যেই দিল্লিতে সরকারী চাকরির ডাক এসে উপস্থিত। তাই বন্ধন ছিন্ন করতেই হল। তারপরেও কিন্তু বালির ছেলেটি আমার বিয়েতে এসেছিল। আর নিজে নেমন্তন্ন করে বাগদা চিংড়ি খাইয়েছিল। তা সেসব তো নিরেনব্বুইতেই তীরে উঠে গেছে।

এবারে যাওয়া হল এক পারিবারিক গ্রেটার নয়ডাবাসী বন্ধুর আমন্ত্রণে। কালীপুজো পর দিন। আকাশ মুখ ভার করে এসেছে। কিন্তু তার মধ্যেও গুছিয়ে নিয়ে পৌঁছে গেলাম ট্রেন চড়ে তারপর টোটো করে। আর তারপর তো এলাহি ব্যাপার। বাড়ির মহিলারা রান্না বান্না করে রাত তিনটেয় কালীপুজো শেষ করে বিশ্রামও পান নি। সকালের খেতে সবাই হাজির। আর খাওয়া বলে খাওয়া? চিংড়ি মাছ দিয়ে চচ্চড়ি, সিঙ্গি মাছ দিয়ে লাল শাক, পার্সে, বোয়াল আরও কত কী! এত খেলাম যে হজম করার জন্য ট্রেডমিল দরকার পড়ছিল। কিন্তু সে সব ছিল না বলে ভর দুপুরে ভঁসভঁসিয়ে ঘুমলাম।

আর বাড়িটার ব্যাপারই আলাদা। মাসীমার পায়ে ব্যথা বলে উঠে উঠে দরজা খুলতে পারেন না। তাই দরজা খোলাই থাকে আর লোকজন এসে, ‘কেমন আছেন কাকীমা?’ বলে কলাটা মুলোটা তুলে নিয়ে চলে যায়। বন্ধুর ভাই একবার মাসীমাকে ডেকে দেখায় ‘আরে মা, দেখো তোমার শাড়ি পরে ঘুরছে!’ মাসীমা নির্বিকার, ‘আর পরুক না! আমার তো অনেকই আছে!’ ঠাকুর দেবতারা বোধহয় এসব বাড়িতেই অধিষ্ঠান করেন।

সবই ভালো ছিল ঝামেলা বাধালো আকাশ। মুখ তো ভার ছিলই কিন্তু খাওয়া দাওয়ার পর ঝাঁপিয়ে ভিজতে চলে এলো। এক এক করে ট্রেনের সময় কেটে যাচ্ছে আর আমরা প্রস্তুত হচ্ছি। কিন্তু প্রস্তুতি তো নেওয়া হয় নি। তাই সাড়ে সাতটা নাগাদ বেরলাম কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু কিনতে আরে বেরিয়ে দেখি, বৃষ্টি ধরে গেছে আর লোকজন ভ্যানকে ভ্যান কালী ঠাকুর নিয়ে ভাসানে চলেছে। যেন সরস্বতী পুজো। এ আমার নতুন অভিজ্ঞতা। পাঁড় কোলকাতার ছেলে আমি ইন্সটিটিউশনালাইজড কালীপুজো দুর্গাপুজো আর হোমোজেনাইজড লক্ষ্মী সরস্বতী আর কার্তিক পুজো দেখেছি। গণেশ পুজোর রমরমায় আমি ইতোমধ্যেই পাড়ি জমিয়েছি পাথুরে ল্যাণ্ডে। কিন্তু সাইকেল ভ্যানে হাজার হাজার হাজরা ইয়ে কালী বিসর্জন নতুন অভিজ্ঞতা তো বটেই। আর নতুন হল আকাশ ভর্তি আকাশ প্রদীপ। অকালবৃষ্টির হাওয়ায় ভর করে ফানুসদের হইহই করে ভেসে যাওয়া। এসব দেখতে দেখতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যে ফিরে যেতে হবে। বাড়ি। আর যেমন ভাবা তেমন কাজ। আবার সেই টোটোয় টো টো করে স্টেশন আর স্টেশনের আবছায়া বেয়ে স্যাঁতস্যাঁতে সন্ধ্যে।

ট্রেন এল আর আধঘণ্টা ধরে দমদমে চারে ঢুকব না পাঁচে ঢুকব করে কাটিয়ে দিল আর রাত্রে চিরপরিচিত লর্ডসের চাইনিজ খেয়েই বাড়ি ফেরা। সময় হয়ে গেল কোলকাতাকে দৃষ্টির ওপারে করার।

মাঝে এদিক ওদিক, স্যান্টাজ ফ্যান্টাসিয়ায় ঝুপুপিসির মাটন আর বাঁশপোড়া মাটন দিয়ে সরুচাকলি আর সিফুড স্যালাড হলই। কিন্তু যাবার সময় হয়ে গেল।

আর হলই বা কোন দিন। ২২ অক্টোবর! পনেরো বছর আগে ঠিক এগারোটা চল্লিশে একটা পুঁটলিকে বাম কোলে ধরেছিলাম। চল্লিশ সপ্তাহ ভিতরে থাকার পর নখ চুল নিয়ে তার সমগ্র বিরক্তি জানান দিচ্ছিল সে। আর আজ পনেরো বছর পরে ঝড়ঝাপটার সফর পেরিয়ে বয়সপ্রাপ্তির দোরগোড়ায় হাজির। এত বছরে প্রথমবারের জন্য জন্মভূমিতে ফিরে গেছিল দাদু ঠাকুমার সান্যিধ্যে। তাই আদর মেখে আসতে গিয়ে দেরী হল একটু।

কিন্তু চিন্তাটা আগের দিন রাত থেকেই নাড়া দিচ্ছিল। বাড়ির চাবিটা যেন পার্শ্ববর্তিনীকে বলেছিলাম আমার ব্যাগে রাখতে। কিন্তু আমি এবং পার্শ্ববর্তিনী উভয়েই আগাপাশতলা ব্যাগ খুঁজেও পেলাম না কিছু। সারা ফ্লাইটেও চিন্তা ছিল। প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম যে কী ভাবে বারান্দায় নামব। তাও একটা বারান্দায় তালা লাগানো ছিল না। সেই বারান্দায়! উবার করে অফিস। অফিসেই রাখা ছিল আমাদের নীল রঙের নব বাহন। এতক্ষণ ধরে আশার বিপরীতেও বাজি ধরে আসছিলাম যে গাড়িতেই বোধহয় আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুটল লবডঙ্কা। গাড়ি ঘুরিয়ে বারাপুল্লায় চড়ায় সময় মোটামুটি প্রস্তুত। উপরের ফ্ল্যাট থেকেই নামাটা সমীচীন হবে। পাশের ফ্ল্যাট থেকে কার্ণিস ছুঁয়ে একটু বেশিই ঝুঁকি বটে। চাদরও আছে ব্যাগে তাই চিন্তা নেই। আর অন্যদিকে পার্শ্ববর্তিনী মনে মনে নুনের প্যাকেট মানত করছিলেন যদি পাওয়া যায়। আর কি সাংঘাতিক রিগ্রেসিভ কাণ্ড। যার জন্মদিন সেই ব্যাটা পড়াং করে আমার ব্যাগের ভিতর হাত দিয়েই বার করে আনল আরেকটি কাপড়ের ব্যাগ। যার মধ্যে মিটিমিটি হাসছে চাবিসোনাটি। আর পুঁটলি দিদিমণি তখনও তাঁর প্রশ্নের ঝাঁপি ঝাড়পোঁছ করছেন- ‘কেন?’ ‘দাদা চেঁচাল কেন?’ ‘তোমরা চ্যাঁচালে কেন?’
আরে জানিস না? ‘এ ফর বল’ বলে!

তারপর? তারপর আর কী? পরদিন সকাল থেকেই আবার হাঁটু ডোবা যমুনা বেয়ে জীবন জোয়ারে ঝাঁপিয়ে পড়া। আর থোড় দিয়ে বড়ি আর শাকের তরকারি রন্ধ্রণ। এভাবেই চলতে থাক জীবন। সময় আর দূরত্বকে পেরিয়ে। চরৈবেতি!

Advertisements

(১৭০)

বেশী সময় নেই বুইলেন। সদ্য সদ্য কোল্কেতায় এসে পৌঁছেছি, আর এখনই যদি আপনাদের সঙ্গে পিরিত করি তাহলে আমার প্রথম প্রেমিকাই রাগ করবে। সে যাই হোক এয়ার ইণ্ডিয়া আজকাল মানুষজনকে পাক্কা নিমাই সন্নেসী বানাবার ধান্ধা করছে। এমনিতেই কস্টকাটিং-এর চক্করে এয়ার ইণ্ডিয়ার ইস বার শনিবার আব কী বার মঙ্গলবার।

তা গতবারে কোলকাতা আসতে গিয়ে বললাম তো ঘুমের ঘোরে ‘জৈন মিল’ খাইয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেটা ছিল ঘুঘনি আর পরোটা। আর নর্মাল মিল দিয়েছিল ক্যারামের স্ট্রাইকারের সাইজের ইডলি আর মাকড়ির সাইজের বড়া। যে কোন সুস্থ পেটের এবং মস্তিষ্কের মানুষ পরেরটা ছেড়ে আগেরটাই খাবে। আমিও নিজেকে সুস্থ বলেই দাবী করে থাকি! অতএব এবারেও আসার সময় আগ বাড়িয়ে আমি ‘জৈন মিল’ খাব বললাম আর এবারে আমার বাক্স প্যাঁটরারা নর্মাল ভেজ মিলই নিল।

কিন্তু এবারে তো মিলে সুর মেরা তুমহারা হয়ে গেছে। তিন দিন আগেই আমি ময়ূর বিহারের মার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে পাঁচ মশলার ফুচকা খেয়েছি। জিরের জল, ধনেপাতার জল, হিংএর জল, পুদিনার জল আর কেওড়ার জল। নাকের জল চোখের জল না ফেলেই বলছি হিং আর কেওড়াটা আমার মেফিস্টোফিলিস লেগেছিল। এই রে কর্ড লাইন ধরে ফেলেছি!

তা যা বলছিলাম! আমার জৈন মিল খুলতে দেখি ইক্কিরে বাওয়া! এখানে বিয়ের আংটির সাইজের বড়া আর ধনে পাতা দেওয়া পাঁচ সিকের সাইজের সাদা রঙের একটা কিছু যাকে ইডলি বা পরোটা বলতে মন সরে না। সঙ্গে অবশ্য একটা জাঁদরেল লাল লঙ্কা দেওয়া সাম্বারও দিয়েছিল। আর কেলো টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি কেসে দেখি বাক্স প্যাঁটরারা ঘুঘনি পরোটা প্লেটে নিয়ে আমার দিকে মুচকি হেসে চোখ নাচাচ্ছে।

সে যাই হোক সেসব খেয়ে আমার অপাপবিদ্ধ পেটে জেলুসিল গোঁজার অবস্থা হয়েছে। কিন্তু একটা কথা বলতেই হচ্ছে! নেহাত পার্শ্ববর্তিনী সক্কালবেলায় পনেরো মিনিট পরে সবার ঘুম ভাঙা সত্ত্বেও অবিশ্বাস্য তৎপরতায় একটা জবরদস্ত চিজ অমলেট খাইয়ে বাড়ি থেকে বার করেছিল তাই আজ টিকে আছি। কিন্তু তিন দিনের বাসী বড়া আর আধকাঁচা ইডলির মতো কিছুটা এখনও পেটে গজগজ করে যাচ্ছে। যাই হোক, কোলকাতা আমার দুঃখ ভুলিয়ে দেয়, এবারও দেবে বলে আশা রাখছি। আর সেই সব বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আবার দেখা হবে জেনেই পুলক লাগছে, যা পুদিনহরার মতো গলা ছুঁয়ে বুক পেটে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

আজ তাহলে এ পর্যন্তই!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ সকালে তিনটেয় একটা অ্যালার্ম মেরেছিলাম নিজের মোবাইলে আর ব্যাকআপ হিসেবে পার্শ্ববর্তিনীর মোবাইলে তিনটে দশ-এ! আবিষ্কার করলাম যে তিনটে দশের অ্যালার্মটা এখন বাজছে। ভর বিকেলে কোলকাতার বুকে, শান সে! না আসার সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিলাম। কিন্তু কেমন করে জানি না আমার বাক্স প্যাঁটরাদের উৎসাহে এসে পড়েছি বটেক।

(১৬৮)

২০১৪র পরে আর ফিসফাস বই হিসাবে বেরোয় নি। এবারে করলে বইটার কভারের রঙ কালো বা ধূসর রাখব ভাবছি। না মানে শুরুতেই এমন কথা কেন? কে জানে কেন? বুঝতে পারি না! খালি আকাশে বাতাসে ঘাসে ঘাসে দেখি রঙগুলো বদলাচ্ছে। সমানে সমানে বদলাচ্ছে। পথে ঘাটে দূষণেরা ফুসফুস ছেড়ে হৃদয়ে দানা বাঁধছে। আর একটা অদ্ভুত ধরণের ইমোশন (সরি আবেগটা বড়ই কাঁচা লাগছিল ইমোশনের কাছে!) গলার কাছে দানা বাঁধছে।

মনের ভাবটা স্পষ্টভাবে বলে উঠতে পারছি না। মানে এটা ঠিক ভয় লাগা নয়। ভয়টা বরং চলে যাচ্ছে। এটা বিচ্ছিরি লাগাও না। বিচ্ছিরি লাগা এর কাছে কিছুই না। অথবা রাগ ঘৃণা বিদ্বেষ এই শব্দগুলোও ঠিক বসাতে পারছি না। কারণ এই যে ইয়ে লাগা সেটা তো এগুলোকে নিয়েই। রাগ ঘৃণা বিদ্বেষ।

কোথাও কোথাও একেই যেন পুরুষত্ব বা বীরত্বের প্রতীক বলে বোঝানো হয়। বুক দাপিয়ে চিৎকার করে বিজয়ীর উল্লাস। যেন রোনাল্ডো গোল করেছে!

এক এক করে বলে দেখি। আপনারা কী বলেন!

ভাদ্র মাস একটা বিশেষ মাস যা নিয়ে চারপায়ের প্রাণীদের খিল্লির শেষ নেই। তেমনই শ্রাবণ মাস হল ভক্তির মাস। শারদোৎসবে যেগুলো হয় সেগুলোকে ভক্তি দিয়ে মাপা যায় না। হৃদয় দিয়ে মাপতে হয়। কিন্তু শ্রাবণে শৈব উপাসকরা ভক্তিরসে ভগবানকে সিঞ্চিত করেন। আমাদের ছিল তারকেশ্বর আর এখানে হরিদ্বার।

না সেসব নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই। কিন্তু মেঘটা জমতে শুরু করেছে গত কয়েক বছর ধরে। যখন থেকে এই কাহার কাঁধে কাঁওয়াড়িদের জন্য সুযোগসন্ধানীরা এই একান্ত ব্যক্তিগত যাত্রাকে সাংগঠনিক করে দিয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বড় বড় কাটআউটে ঝোপে ঝাড়ে গজানো রাজনৈতিক সুবিদাবাদীদের অভিবাদন জানানো ব্যানার। দেবেন্দ্র দেড়া থেকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কেউ বাকী নেই। কাঁওয়াড়িদের জল পান করানো জন্য গগন বিদারী মিউজিক সিস্টেমে হানি শিঙের চরণে সেবা লাগির রিমিক্স সমেত বড় বড় শামিয়ানা। আর কার্যবিহীন স্বেচ্ছাসেবকদের দল। যারা মনের সুখে মাদক সেবন করে (শিবের চ্যালা! কিচ্ছু বলার নেই!) উত্তুঙ্গ উচ্ছ্বাসে হর হর মহাদেব ধ্বনিতে আকাশ বাতাস ছেয়ে দিয়েছে। আর ইদানীং আবার নতুন ট্রেণ্ড। জাতীয় পতাকা হাত মোছার কাপড়ের মতো যত্র তত্র লাগানো। যেন দেশাত্মবোধ দেখালেই সাত খুন মাফ।

তে এরকমই এক সকালে দেখি একটা নেশায় চুরচুর বিরোধী সমাজের লাগামহীন ষাঁড় হাতে লাঠি নিয়ে গাড়ি শাসনে লেগে পড়েছে। আমার এই গাড়িটা বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই ভাই যাবার পর থেকেই ইমোশন ফিমোশন একটু কম। অন্ততঃ বিয়োগ ব্যথা গুণিতক হয়ে পার্শ্বচর হয় না। কিন্তু লাঠির বাড়ি মারলে তো কথা নেই কোন।

তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি, পাড়ার মধ্যেই সাইকেল নিয়ে যাবার সময় ‘লুচি’ গুণ্ডার চটির পিছনের ভাগ মাড়িয়ে দিই। বাছাবাছা বিশেষণ চড়চাপড় সব হজম করে নিয়েছিলাম ‘বাপের সম্মান’ রক্ষার্থে। (এই বাপের সম্মান কেসটা বহুত গোলমেলে কেস। আপনার ঘেঁটি ধরে একটা তালপাতার সেপাই ক্রমাগত নেড়ে দিয়ে সুভাষিতাবলী ঝেড়ে যাচ্ছে আর আপনি কিসসু করতে পারবেন না!) কিন্তু যেই ব্যাটা ‘শালা আজ সাইকেলই ভেঙে ফেলব’ সাইকেলে হাত দিয়েছে। কোনা মেরে বাঁহাতের দুটো আপার কাট চোখের কোল ফাটিয়ে দিয়েছিল। সেই জোশ আজ আর নেই, তোরঙ্গে বাঁধা। কিন্তু গাড়িতে হাত দিলেই কী থেকে কী হয়ে যেতে পারত সে আর বলতে পারব না। কপাল ভাল (কার কে জানে?) আমি অনেক চেষ্টা করেও গাড়ি আস্তে চালিয়ে, ছেলেটার গা ঘেঁসে চালিয়েও তার লাঠির প্রসাদ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলাম। না হলে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়ার একটা অভিজ্ঞতা থেকে যেত। হয়তো গণ ধোলাইয়েরও।

তা সে সব থাক। দিন পনেরো সবাইকে ভক্তিতে ভাসিয়ে শ্রাবণ মাস বিদায় নিল ভাদ্রের শেষ এসে হাজির। সেদিন গাড়ি না থাকায় উবারের সাহায্য নিয়েছি, দশ মিনিটের রাস্তা যেতে দশ ঘন্টা লাগছে, ড্রাইভার বলল, ‘ম্যায় পচ্চিশ সাল সে দিল্লি মে হুঁ। বাই গড কভভি ইত্নে সারে গণেশজীকে ভক্ত নেহি দেখা।’

আর ট্রেণ্ডটাও এক। মাথায় একটা রঙ না জানা ফেট্টি, পেটে মাল, মুখে আবির, চোখে রঙ আর ঠোঁটে রাজ্যের নৈরাজ্যের প্রদর্শনী। আর অবশ্যই বক্স বাজছে। যার যত বেশী বক্স তার তত বেশী দর। গানের কথা কিসসু বুঝতে পারবেন না, খালি গুম গুম আওয়াজে গাড়ির উইণ্ডস্ক্রিন থেকে আত্মারাম সবাই খাঁচা ছেড়ে পালাবার কথা ভাবছে। যত্র তত্র মূত্র ত্যাগ আর জাতীয় পতাকা নাড়িয়ে বিজয়োল্লাস। ঠিক যে ভাবে আপনার কাজের মাসি ঝুল ঝাড়ু দিয়ে ঘরের কোণের কালো কালো ঝুল সরিয়ে সাফ করেন। ঠিক সেভাবেই এরা দেশভক্তিকে প্রশ্নকারী সুস্থশরীরগুলোকে সাফ করে দিয়ে ব্যস্ত করে ফেলবে।

আর সবাই সেই হ্যামলিনের ইঁদুর। নেতাজি কাল লাল কিলা থেকে আপনাকে ডোকলাম দেখাচ্ছে তো আপনিও অবিশ্বাসীদের বৃন্দাবন দেখাতে রেডি। আর দরকার পড়লে অন্ধকারও। সত্যিই যেন অন্ধকার যুগে এসে পড়লাম। যেখানে বিরোধাভাস মাত্রেই কার্গিলের ঠাণ্ডার চিন্তা জাগিয়ে দেওয়া গরম গরম বুলি আর সে সব ডিঙিয়ে গেলে চাপাতির কোপ বা বন্দুকের নল। আমাদের অবস্থা হচ্ছে সেইসব পতিব্রতা স্ত্রীয়ের মতো, যারা মার খেয়ে মরে গেলেও সিকিউরিটি হারাবার ভয়ে আপাত মানব পরিচয়বহির্ভুত সেই সব রাক্ষসদের বিরুদ্ধে একটাও কথা বলে না। ঠাণ্ডা ঘর ল্যাপটপ স্মার্টফোন আর নিয়ন্ত্রিত জীবন চৌহদ্দি পেরিয়ে একসঙ্গে বিরোধ করা কি চাড্ডিখানি কথা। (দেখবেন এরপর কমি ছাগু তিনো নিয়েও গাল শুনব।)

আসল কথা হল ফাঁপা ঢোল বাজে বেশী। আর আমাদের দেশটা হয়ে উঠছে সে রকমই। আমরা মায়ানমার যাব বলে পরিকল্পিত ভাবে ঘরহীন মানুষগুলোকে দেশছাড়া করে দিতে ছাড়ি না। গাজা ভুলে গিয়ে নেতানেইয়াহুর সঙ্গে ছবি তুলে ফেলি আর আপামর অশ্বেতকায়ের সর্বনাশ মাথায় তুলে ট্রাম্প কার্ড খেলে বসে থাকি কেকেকেকিরণ! (ক্লু ক্লুক্স ক্লান আর কি!)
এত কিছুর মধ্যেও কিন্তু স্বপ্ন দেখতে শখ জাগে জানেন? স্বপ্ন দেখি ধর্ম বলতে মানুষ চিনবে মানুষ শুধু। সালমা খাতুন বা জাভেদ হাবিব তাদের ধর্মের কলাম নিয়ে আমাদের কাছে পরিচিত হবেন না। শুধু মানুষ হিসেবেই যেন পরিচিত হয়ে যাই। সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুকে একটা ডায়লগ ছিল অর্গানাইজড রিলিজিয়ন মানুষ মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে। আর কত বিভেদ বা ফারাক হবে? উপরওলা তো ইতিমধ্যেই, কালো সাদা বাদামী, পুরুষ মহিলা, গুঁফো মাকুন্দ, হিস্প্যানিক এশীয়, লম্বু মোটু এসব ফারাকগুলো দিয়েই পাঠিয়েছেন। কিন্তু সে তো স্বাতন্ত্র্যের খাতিরে। দল পাকিয়ে পাঞ্জা লড়ার জন্য তো নয় সে সব।

মানুষ সবথেকে দুর্বল প্রাণী হয়েও মানবতা আর মানবিকতা দিয়েই তো আজ শ্রেষ্ঠ আসন নিয়েছে। তাহলে আর আলাদা করে আমরাই সেই চামড়া গুটিয়ে নিয়ে অপরের চামড়া গুটিয়ে দিতে তৎপর হয়ে পড়ছি কেন? মানুষ মরে। যে একবার জন্ম নিয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু আমরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাকে অবশ্যম্ভাবী থেকে অমোঘাবস্থায় নিয়ে যাচ্ছি কেন? আসুন না। বিশ্বাসী অবিশ্বাসী নাস্তিক আস্তিক ধনী গরিব সাদা কালো সবাই মিলে পৃথিবীটাকে আরেকবার সবুজ করে তুলি। শুধু গাছ পুঁতেই তো নয়। মানুষের মনটাকে হৃদয়টাকে সবুজ করে তুলতে হবে। কষ্টকর পথ, ধান্দাবাজীর জায়গা নেই, শর্টকাট নেই, মস্তিস্কহীনতা, বিবেকহীনতা, হৃদয়হীনতার জায়গা নেই। যে যতটুকু পেয়েছি তাই নিয়েই সবার কথা ভেবেই কাজ করতে শুরু করি। বাংলায় যাকে বলে হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ। তাহলে হয়তো আপনার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীটাও বাঁচতে পারে। নয়তো কে জানে, সময় কোথায় আমাদের জন্য চাপাতি নিয়ে অপেক্ষা করছে। কল্লা আমাদেরও নামতে পারে ভাই! তাই না?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এই লেখাটা নিয়ে আমরা ওরা করবেন না প্লিজ। সব ধর্মেই কম বেশী নাশকতা রয়েছে। নাহলে বৌদ্ধ ধর্ম বলতে যে অহিংসা বুঝি তারা রোহিঙ্গাদের কেটে পিস পিস করে ফেলতে পারে? রোহিঙ্গাদের জন্য, আশ্রয়হীন মানুষগুলোর জন্য একটু ভাবুন। আপনার দরজা খুলে দিতে হবে না। কিন্তু সামগ্রিক দরজাটা যেন খুলে যায়। আলোচনারও।

প্র পু ১ – নাহ লেখাটা শুরু করার সময় মনটা যে রকম ধূসর ছিল এখন কেমন যেন নীল নীল হতে শুরু করেছে। আকাশের মতো বিস্তৃত নীল। এবারে ফিসফাসের রঙটা নীলই হোক কেমন?

(১৬৭)


আমি ভিক্ষা দিই না। কোন স্পষ্ট লজিক নেই। কিন্তু দিই না। হয়তো মানুষকে কর্মক্ষম দেখতে ভালো লাগে বা অভ্যাস খারাপ করতে দিতে চাই না ইত্যাদি কিছু হবে। অথবা এই যে রাজধানীর রেডলাইটে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে কিছু দেহাতি মহিলা ঘোরাঘুরি করে তারা মাদারি নাকি অন্য কিছু? কয়েকটা বাচ্চা সং সেজে ডিগবাজী কলাবাজী দেখায় আর চুলে লম্বা বিনুনি বেঁধে টাঁই টাঁই করে ঘোরাতে থাকে। বা কয়েকটা বাচ্চা একটা নোংরা কাপড় নিয়ে এসে গাড়ির এখানে ওখানে একটু মুছে দেয়। এরা কারা? কোথা থেকে আসে? শহরবাসী আমরা শুধু সন্দেহ নিয়েই তাকিয়ে থাকি। আর দেখি যে রাজধানীর ক্রমবর্ধমান ফ্লাইওভারগুলি ঠিক নিচে, কাঠের চুল্লি আর পোড়া হাঁড়ি দিয়ে নিশ্চিন্তে সংসার পেতেছে। দশ ফুট বাই দশ ফুটের গণ্ডিটাও তাদের জন্য নেই।

সন্ধ্যা হলেই সন্দেহ বেড়ে যায়। দেহব্যবসা অথবা রাহাজানি। সন্দেহের তীর এদিকেই ঘুরতে থাকে। মাথায় জট, চোখে পিচুটি আর নাকে পোঁটাওলা শৈশবের পরেই এসে হাজির হয় অপুষ্টির যৌবন বা অপক্ক বার্ধক্য। আকাশের দিকে তীর ছুঁড়ে দিয়ে, পৃথিবীর বুকে রুক্ষ পদক্ষেপ ফেলে জীবন কেটে যায়। আদমসুমারি আর আচ্ছে দিন, সরকারি সাহায্য আর গরিবী হটাওয়ের ইমেজে এরা বড় বড় ছোপ। পুলিশ আর সমাজবিরোধীদের সঙ্গে নিত্য হিসেবে নিত্য যাপন। এরাই হল সেই সব মুখ যাদেরকে লুকিয়ে রেখে আমরা আধুনিক ভারতের ছবি তুলে ধরছি বিশ্বপিতার কাছে।

সে যাই হোক, সেই সব লজ্জাই হোক আর নিজেকে মুক্ত পৃথিবীর প্রতিভূ হিসাবে দেখার অভ্যাস থেকেই হোক। আমি ভিক্ষা দিই না। শুধু যখন কোন বয়স্ক লোককে দেখে মনটা উদ্বেল হয়ে ওঠে যাদের সত্যিই হয়তো করার কিছু নেই, সেখানে হাতটা আপনিই পকেটের দিকে চলে যায়। আর নিজের অপারগম্যতায় মাথা নিচু হতে থাকে।

কদিন আগে রবিবার, আইটিও থেকে মানদই হাউসের দিকে গাড়ি ঘোরাবার আগেই দেখলাম এক আপাত অন্তঃসত্ত্বাকে। সেই দেহাতি রূপ আর তার সঙ্গে আরও জনা চারেক কম বেশী বয়সের মহিলা। এরা হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য সাহায্য চাইছে। কিন্তু আমরা শহুরেরা এখন অভিজ্ঞ হয়ে গেছি। সব জানি এর পিছনের গল্প। কিছুদূর নিয়ে গিয়ে যা নয় তাই হয়ে যেতে পারে। পেটের থেকে বেরিয়ে পড়তে পারে পিস্তল অথবা অন্য কোন প্রাণহানি অস্ত্র।

কিন্তু মজার ব্যাপারটা হল, গাড়িটা ঘুরতেই দেখি একদল পুলিশ দাঁড়িয়ে, লালবাতি টপকানোদের জন্য টোপ ফেলে বসে আছে। গল্পটা কেমন যেন ইয়ে লাগল! মানে মেয়েটি যদি সত্যিই অন্তঃসত্ত্বা হয়, তাহলে তো তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো উচিত। আর না হলে শ্রীঘরে।

তাড়া ছিল কিন্তু তাও গাড়িটা থামিয়ে মুখ বার করলাম। দিল্লিতে পুলুশ এসব ব্যাপারে খুব হেল্পফুল। জানে কি জানে না কিন্তু ঠিক দিক দেখিয়ে দিতে ছাড়ে না। বললাম ব্যাপারটা- ব্যাস যেন চোর ধরা পড়েছে এমন মুখ করে বিগলিত হাসি দিয়ে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা দেখতা হুঁ!” যেন আকাশ থেকে বিষ্ণু দেবতা বরাভয় মূর্তি নিয়ে বিশ্বরূপ দর্শন দিচ্ছেন। কিন্তু ঐ যে বললাম ট্যাম। ট্যামই নেহি থা না! তাই নাগরিক কর্তব্যকে নীলটুপিধারীর হাতে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে চললাম পিছনের দিকে না তাকিয়ে। জানি একবার বলায় কিছু হবে না, আর বারবার বলায় হয় তো সেদিনের জন্য ভাত মারা যাবে চৌর্যোপজীবিনীদের।

তবে সব গল্পগুলো ঘেঁটেঘুঁটে গেল কালকে। মানে আমি নিজে আত্মপ্রচারকে খুব একটা পছন্দ না করলেও, এই রোগটা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নই। কোথায় কখন যেন কোন সূক্ষ্ম গণ্ডিটা পেরিয়ে চলে যাই আর রাবণ রূপ ধারণ করে ফেলি, তার হিসাব রাখতে পারি না। তবুও বলছি জানেন।
কাল রাতে পার্শ্ববর্তিনী আর মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। ফর আ চেঞ্জ মেয়েটা আমার পাশের সিটে বসে। সামনেই লালবাতি আর লালবাতি পেরোলেই গাজীয়াবাদে ঢুকব। সামনে একটা এসইউভি। আর আমরা এদিক ওদিক হাবিজাবি বকে যাচ্ছি। যদি করবী ফুলগুলো টুপ করে গাছ থেকে পড়ত গাড়ির জানলার কাঁচ বেয়ে তাহলে রাতের বেলা ফুল পাড়ার কষ্ট থাকত না আর লাল গোলাপি ফুলগুলোও মেয়ের কানে ঠাঁই পেতো! এই সব।

তাকিয়ে দেখলাম লাল বাতির কাছেই দুটি বাচ্চা মেয়ে বেলুন বেচছে। হঠাৎ লাল আলো সবুজ হল আর দেখলাম আমার সামনে দাঁড়ানো গাড়িটা যেটা এগিয়ে গিয়ে গাজীয়াবাদে ঢুকবে তার ড্রাইভারটা হাত বাড়িয়ে যেটি দুটির মধ্যে ছোট সেই মেয়েটির হাত থেকে একটা বেলুন ছিনিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল গন্তব্যের দিকে।

পাঠক/ পাঠিকারা, আমরা তো মানুষ। সবার আগে মানুষ। চকচকে গাড়ি আর ঝকঝকে পোশাকের মোড়ক পেরিয়ে আমরা মানুষ। সামান্য সুকুমারবৃত্তিগুলো কি ষড়রিপুর অধীনে ফেলে রেখে দাঁত নখ বার করে ফেলতে পারি? মনুষ্যত্বের লেশ নিয়ে দুপায়ে হেঁটে যাবার সময় ‘আরে এ তো সামান্য ব্যাপার!’ এই কথাটা না বলে একটু মন নিয়ে ভাবতে পারব না? দাঁত নখ? তোমার মন নাই মানুষ?

হতবাক অবস্থার মধ্যেও এগিয়ে গেলাম গাড়িটা নিয়ে। হাপুস নয়নে কাঁদছে মেয়েটা। কাশছেও। তার দিদি তাকে বুকে জড়িয়ে বোঝাবার চেষ্টা করছে আর মাই বোধহয়, কোথা থেকে ছুটে এসেছে। মেয়ের কান্না থামেও না। পাঠক/ পাঠিকারা, আমরা সামান্য মানুষ! সারা পৃথিবীর সকলের দায়ভার নিই নি। কিন্তু ওই মুহুর্তে যেটা করতে পারলাম সেটা হল, বেলুনের দাম জিজ্ঞাসা করে দুটো দশটাকার নোট ধরালাম। একটা বেলুন নিজের মেয়ের হাতে দিলাম আর আরেকটা সেই অমানুষটার হয়ে ক্ষমা চেয়ে। মেয়েটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ওই দিদিটা বেলুন দিল? দিল হয় তো! হয়তো সমগ্র মানব জাতির পক্ষ থেকে একটা অক্ষম চেষ্টা মনুষ্যত্ব বাঁচিয়ে রাখার।

মাঝে মাঝে মনে হয় ফিসফাসটা ফিসফাস না হয়ে নিজের ঢাক নাম দিলেই হতো। এ তো শুধুমাত্র নিজের কথা বলা। এই করেছি সেই করেছি। বা হয় তো নিজেকে আয়নায় দেখা অথবা আপনাদের নিক্তিতে নিজেকে মেপে নেওয়া। সে যা হোক। মুখ্য হল মানুষ হওয়া। সবরকমভাবে তো হয়ে ওঠা হয় না। এই যেমন মোড় ঘুরে গাজীয়াবাদে ঢুকে যখন দেখলাম দুটো ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে আর তার কিছু দূরে সেই অলপ্পেয়ে এসইউভি। বিশ্বাস করুন হিরো হবার ইচ্ছে থাকলেও নেমে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারি নি তাদের। ঝামেলায় জড়াতে চাই নি বলেই। কিন্তু পার্শ্ববর্তিনী বা আমি কেউই হয়তো বাচ্চাটার কান্নাটা ভুলতে পারি নি। বেলুনটা বাড়িতে খেলতে খেলতে ফেটে গেল আধ ঘন্টার মধ্যেই। কিন্তু তাও বোধহয় অমানুষদের বুদবুদ ফাটল না। ক্ষণিকের মস্তিষ্কহীন ছ্যাবলামোই হয়ে রয়ে গেল মনুষ্যত্বের আলো আঁধারি ঘিরে।

আর আমাকেও ভাবতে বাধ্য করল সময়, ওই কিচ্ছু না পাওয়া লোকগুলোর কথা। যারা পুলিশের লাঠি আর সমাজবিরোধীদের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকে পরের দিনের সূর্যটাকে দেখার আশায়। সেটাও ঠিক করে দেখতে পায় কি না কে জানে?

(১৬৩)

 

উফফ কত্তদিন বাদে দেখা বলুন তো? কেমন আছেন পাঠক/ পাঠিকারা? এর মধ্যে গঙ্গা দিয়ে প্রচুর জল আর যমুনা দিয়ে প্রচুর অ্যাসিড বয়ে চলে গেল! চাঁদের রঙ নীল থেকে বদলাতে বদলাতে হলদেটে হয়ে গেল! আর দু চারটে পাকা চুল মাথায় গালে বংশ বৃদ্ধি করে ফেলল!

আমার খবর? তা খবর বলতে দুটো-
এক) সৃষ্টিসুখ প্রকাশন থেকে একটা গল্পের বই প্রকাশ পেল আমার। ‘ইয়র্কার এবং অন্যান্য গল্প’। দিল্লিতে পুজোয় আর কোলকাতায় বন্ধুদের সঙ্গে তার হইহই করে উন্মোচন হয়েও গেল মোড়ক।
দুই) অবসরে প্রকাশিত ফিসফাস কিচেন এখন কলেবর বাড়িয়ে বই আকারে আসতে চলেছে বইমেলায়!
সবই আপনাদের ভালোবাসা আর কি!

তা যাই হোক, আজ বেশী ফেনাব না! ছোট ছোট গল্পে এতকালের অদেখা যাপন কাটিয়ে নেব আপনাদের সঙ্গে। নম্বর টম্বরের দরকার নেই! কি বলেন?

গাড়িটাকে নিয়ে মাঝে খুব ভুগলাম জানেন! যদিও নব্বই হাজার কিলোমিটার সঙ্গ দিল! এখনও হাজার তিরিশ চল্লিশ আরামসে দিয়ে দেবে! কিন্তু নিজের গুরুত্ব বোঝাবার জন্য মাঝে মাঝেই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে! সেখানেই সমস্যা!

একদিন আইটিও ফ্লাইওভারের পরেই ক্লাচের তার কেটে বসল! আর যাই কোথা! ঠেলতে শুরু করলাম এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে। অভ্যাস নেই। কোন রকমে ঠেলতে ঠেলতে কিছুদূর যাবার পর দিলাম এক গাড়ির সাইডে ঠুকে। সে আমার সেই অবস্থাতেও বেরিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ করে বসল। লাও! ঠাণ্ডা গলায় বললাম, ‘দেখো জি! থককে চুর হো গয়া! ঝগড়া করনে কা একদম মুড নেহি হ্যায়! যাদা বোলোগে তো ও যো পাত্থর পড়া হুয়া হ্যায় আপকে সরপে বইঠা দুঙ্গা! সেও হেবিজোর ঘাবড়ে গিয়ে চেল্লামেল্লি লাগাল! আমি পাত্তা না দিয়ে চলতে শুরু করলাম।

দেড় কিমিটাক চলার পর এক অটো এগিয়ে এল সাহায্যের পা নিয়ে! ড্রাইভারটি একশোটি টাকার বিনিময়ে পা দিয়ে ঠেলে দেবে অটো চালাতে চালাতে! এইভাবে যদি কিছুদূর যাওয়া যায়! গেলামও! তিন কিমি দূরের এক মেকানিক শপের সামনে যখন পৌঁছলাম তখন বাজে সাড়ে ছটা। সেদিন আবার রিহার্সাল। পার্শ্ববর্তিনীকে বললাম ওলা বুলা লো! তার মধ্যে আবার টিপটিপ বারিশ! আর মেকানিক দেখে বলল, ওয়েল্ডিং খুলে গেছে, এখন লাগানো সম্ভব হবে না! লাও ঠ্যালা! অটোটাকেও ছেড়ে দিয়েছি!

কোন অটোই আর অ্যাটলাসের বোঝা বইতে রাজী হচ্ছে না! ক্রসরোড বলে এক দীনবন্ধু কোম্পানির মেম্বারশিপ নেওয়া আছে। যদি বিপদে আপদে সাহায্য করে! তা সে বলল রাত দশটার আগে গাড়ি টেনে নিয়ে যেতে আসবে না! সামনে এদিকে রেললাইনের নীচ দিয়ে যাবার জন্য আণ্ডারপাস। তারও আগে রাস্তা অর্ধেক তৈরী হয়েছে বলে বাঁ দিকে জল জমে আছে! যা থাকে কপালে! ঠেলা লাগালাম। গত আড়াই ঘন্টায় গাড়ি ঠেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ঠিক কায়দা করে জলের উপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে আমি নিজে শুকনোর উপর দিয়ে হেঁটে এলাম। বৃষ্টি তখন থেমেই গেছে। কিন্তু ভিজেই গেছি, ঘামে! তারপর ঢালে দাঁড়িয়ে গাড়ি ঠ্যালা দিয়ে ঠনঠনে হাঁটু নিয়েই লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিতেই গিয়ারে ফেলা গেল! যাক বাবা, বলে আণ্ডারপাস প্রায় পেরিয়ে এনেছি ও বাবা সামনে গাড়ির জ্যাম দেকে উল্টো ঢালেই গেল গাড়ি বন্ধ হয়ে। মাঝ রাস্তায় ব্রেক মেরে চুপচাপ বসে আছি। পিছনে ভঁকভঁক হর্ণ পড়ছে গাড়ির লাইন! কিন্তু বেরব কি করে? ব্রেক থেকে পা সরালেই গাড়ি হড়কাবে পিছনের দিকে। হ্যাণ্ডব্রেকে কাজ হবে না! যাই হোক কয়েকজন অটোওলা ছিল কাছাকাছিই তাড়া ছুটে এসে ধরল পিছনের দিকে তারপর ধাক্কা দিয়ে দিল। আর গাড়িও গিয়ারে মেরে চালু করে দিলাম।

বেশী না, আধ কিমি! তারপরেই রেডলাইট। যাই হোক এগোতে শুরু করলাম। গলির দিকে! সামনে একটা গাড়ি রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়িতে নটা বেজে গেছে। অনুরোধ করতে গেলাম গাড়ি সরাবার। জ্ঞান দিয়ে বসল, অ্যা্যসে থোড়ি হোতা হ্যায়! আপ টো করওয়ানে গাড়ি বুলালো ইত্যাদি! যাই হোক। কোন রকমে ম্যানেজ করে গলির মধ্যে ঢুকতে হেল্প জুটে গেল। পৌনে দশটায় গলির মুখে আরেকটা ঢালে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করলাম এক ঠ্যালা মারুন! দিয়েও দিল! ব্যাস আর দেড়শো মিটার ভোঁ ভাঁ হর্ণ দিয়ে পৌঁছে গেলাম বাড়ির কাছে। তারপর রিহার্সাল (মিউজিক রিহার্সাল ছিল) দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পরের দিন গাড়ি সারিয়ে।

তা বেশ ছিল। সার্ভিসিং করাব করাব ভাবছি তার আগে শনিবার গ্রেটার নয়ডার স্কুল থেকে ছেলেকে আনতে যাচ্ছি। বেশি না, বাড়ি থেকে ৪৫ কিমি। নয়ডার মহামায়া ফ্লাইওভারের পর আরও পঁচিশ। তা মহামায়া ফ্লাইওভার পেরিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে পড়তেই ফটাং করে আওয়াজ! ক্লাচ গায়েব! লাও ঠ্যালা! ভাগ্যিস গাড়ি ফোর্থ গিয়ারে। আমি ক্লাচ ছাড়াই গাড়ি ষাট-আশি গতিতে চালাচ্ছি, বন্ধুকে ফোন করলাম, গ্রেটার নয়ডায় থাকে গাড়ির ঘাঁট ঘোঁট জানে। বলল পঁচিশ কিমির শেষে এক মার্কেটে মেকানিক আছে! গাড়ি টো করতেও পারবে! আমি বললাম আমি মাথা ঠাণ্ডা করে চালাচ্ছি, কোথাও থামব না! বড় কিছু ঝামেলা না হলে পৌঁছিয়েও যাব সেই অব্ধি! কিন্তু তারপরেই দরকার। তো ফোন করে দিলাম। আর আধ ঘন্টা ক্লাচ ছাড়াই কায়দা করে চালিয়ে পৌঁছেও গেলাম। সে অপেক্ষাতেই ছিল। কাদির নাম তার! যত্ন করে ঠিক ঠাক করে দিল। আর পরদিন বাড়ি ফিরেই দিয়ে দিলাম সার্ভিসিং করাতে।

তারপর আর কি! দিন দুয়েকের মধ্যেই “মেরে পেয়ারে দেশবাসীও কাল কুছ যাদাই হো গয়া থাআআ!” ব্যাস গেলো কাণ্ড। পরের দিন গাড়ির ফাইনাল সার্ভিসিং করিয়ে পেমেন্ট করব বলে ব্যাঙ্ক থেকে পাঁচ হাজার ছশো টাকা তুলতে গেছিলাম সেই সন্ধ্যাতেই! তা এটিএম ব্যাটা বলে পঞ্চাশ আর একশো নেই! এগারোটা পাঁচশোর নোট। তার মধ্যে বাজারটাজার করতে একটা চলেই গেছে। ব্যাস হাতে পৌনে চারশো টাকা আর দশটা পাঁচশোর নোট। আমি পথে! তা যা হোক, অনেক ঘাতপ্রতিঘাতের পর নিজেকে শিখিয়েছি যাই হোক বিচলিত হব না! তা পথ পেয়েও যাচ্ছি। দুটো বড় নোট একটু বেশী সব্জি কিনে ভাঙিয়ে ফেললাম। আর তারপর ব্যাঙ্কে দাঁড়িয়ে বার দুয়েক টাকাও তুলে ফেলেছি অচল আটটি পাঁচশো ফেরত দিয়ে। সময় যাচ্ছে বটে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে মজাও হচ্ছে। দুঃখও হচ্ছে। মানব জীবন দেখতে পাচ্ছি যেমন তেমন।

বয়স্ক এবং বিকলাঙ্গদের জায়গা করে দেবার ব্যাপারে দিল্লি অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে মহিলাদের প্রতি ব্যবহারে আবার লাইনেই আসে না। এক ভদ্রমহিলা, সন্তান কোলে আমার দু তিন জনের পিছনে ছিলেন বলে প্রথম দিকে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে অনুরোধ করতে গেলাম। সে বলে খাড়ে রহনে দো! লাও! মনে হচ্ছিল ব্যাটাকে এটিএম-এর মেশিনে ঢুকে পিস পিস করে দিই। কিন্তু মানবজাতি এখন অনেক সভ্য হয়ে গেছে। ভদ্র হয়ে গেছে। এখন আমরা কাউকে বিপন্ন দেখলে ছুটে গিয়ে সাহায্য করি না, রাস্তায় আহত কাউকে দেখলে পাস কাটিয়ে চলে যাই, আর তেড়ে সরকারকে গালাগাল দিই কাজ করার বা না করার জন্য! তাই স্বগতোক্তি করেই রাগ ছাঁটাই করতে হয়। সেইভাবেই আছি। খরচ কমিয়ে হিসাব কষে বেশ ভালোই আছি! বেচাল দেখলে লাফিয়ে পড়ে প্রতিবাদ করে প্রতিকার করার চেষ্টা করি। শুধু জিগির তুলেই ঢেঁকুরের মিঠা স্বাদ গ্রহণ করি না। অসুবিধাকে অসুবিধা বলে না দেখে চ্যালেঞ্জ ধরে নিয়ে হার্ডলস পেরিয়ে যাবার আনন্দ অনুভব করি! ব্যাস এই তো জীবন কালী দা!

তা তার মধ্যেই এক দুটো জোকস আর একটা সত্যি ঘটনা শুনতে পাই। যে বাড়িতে বিয়ে (এটা বলতে আমরা এখনও যে কেন মেয়ের বাড়ি বুঝি কে জানে!) সে বাড়ির একজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশিকা মেনে ব্যাঙ্কে গিয়ে আড়াই লাখ টাকা দাবি করেছেন। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার যতই বলছেন যে আপনার অ্যাকাউন্টে অত টাকাই নেই! কে শোনে কার কথা!

আর এটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক- আমার পরিচিত এক ঘটি বাঙালকে বিয়ে করেছিলেন। মানে এখনও বিবাহিত আছেন কিন্তু করেছিলেন গত শতাব্দীতে। তা বাঙাল ভদ্রলোক আবার প্রবাসী, মানে চেন্নাইতে বড় হয়েছেন। সব বাংলা গান রবীন্দ্রসঙ্গীত পল্লিগীতি ব্যান্ডের গানটান শোনেন নি। তা মহিলা দরদ দিয়ে গাইছিলেন, ‘রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে, দিনের শেষে…’ আর ভদ্রলোক ইনভ্যারিয়েবলি শুনেছেন বাঙাল! আর যায় কোথা! নতুন বিয়ে ভেঙে যাবার উপক্রম হয়েছিল। বাঙালকে জাত তুলকে খোঁটা? তা সে বিয়ে টিকে গেছে সে যাত্রা, কিন্তু সঙ্গে দিয়ে গেছে এই টাইমলেস গল্পগুলোকে!

আমাদের প্রত্যেকের জীবনই তো এক ঝুড়ি গল্পের কথামালা! এতো আনন্দ রাখি কোথায় বলুন তো? কেন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে! সরকার তো আনন্দেরও হিসাব রাখতে শুরু করেছে। আমেন!

(১৬২)

 

সাধারণতঃ আমি নাগরিক হিসাবে বেশ ভালো। নিয়মানুবর্তিতা এবং নির্দেশানুসারে চলাটা একদম রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। এতদিনের সরকারি মুটেগিরির এফেক্ট বলতে পারেন। চট করে খাঁই মাই করে প্রতিবাদ না করে আগে দেখার চেষ্টা করি ব্যাপারটা কি। বিশেষতঃ সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্র ভিতরে থাকলে তো বটেই।

১৭ বছর হয়ে গেল সরকারি ঠিকানায়, লোকে বলে সরকারি চাকুরেগুলো নাকি ফ্রিতে বিষ পেলেও তা খেয়ে নেবে! তারা আরও বলে, সরকারি কর্মচারীদের কাজ করতে হয় না! ‘আসি যাই মাইনে পাই, কাজ করলে ওভারটাইম পাই’! একজন সরকারি কর্মচারীর দিনপঞ্জী লিখতে গিয়ে এটাই মোটামুটি ট্র্যাডিশন ধরে নেওয়া হয় যে সে এগারোটায় অফিস যায়, ছেলে হলে দুটো ফাইল নাড়িয়ে চা খেতে বসে মহিলা হলে উল বুনতে বসে। দুপুরে লাঞ্চ দেড় ঘন্টা তার পর এক কাপ চা খেয়ে বাড়ি। ভালো কথা! যুগ যুগ ধরে সরকারি চাকুরেরা ইম্প্রেশনটা সেইরকমই করে রেখেছেন বলেই না এসব কথা!

আবার নদীর এপারের গল্পও আছে, সরকারি চাকর হবার জন্য নাওয়া খাওয়া ভুলে সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা অব্ধি ঘস্টানো, মন্ত্রী বা আমলাদের পা চাটা, ঘাড়টাকে তলপেট পর্যন্ত নুইয়ে তাদের মনমর্জিমাফিক ল্যাজ নেড়ে যাওয়া, না পারলেই কম্ফোর্ট জোনের বাইরে ছুঁড়ে ফেলা। এরপরেও কাজ করলেও একই মাইনে কাজ না করলেও! বরং যারা কাজ করে, ঘাড় সোজা রেখে কাজ করে তাদের ধরে ধরে মাঝেই তুর্কীর ক্যুতে চুকিতকিত খেলতে পাঠানো হয়।

যাকগে পাঠক পাঠিকারা, উপরের হাবিজাবিগুলো স্রেফ ভুলে যান! আসুন কালকের গল্পে নামি! দেখুন হামি গরীব আদমি আছে! তাই ডব্লিউএইচ প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে পারব না। কেন কবে কি বৃত্তান্ত! কিন্তু ঘটনা হল, বিকলাঙ্গ সশক্তিকরণ বিভাগের অ্যাক্সেসেবল ইন্ডিয়া ক্যাম্পেনের জন্য একটা সুপার বাইক র‍্যালি সংঘটিত হল রবিবার। আর তাতে ভর সকালবেলায় সাড়ে চারশো সুপারবাইকার তাদের ন্যুনতম ৫০০ সিসির সুপারবাইকের ১০০০ ওয়াটের হেডলাইট জ্বালিয়ে ঢ্যাকঢ্যাক করতে করতে ইন্ডিয়াগেটে এল আর গেল! আর হুজুগে পাবলিক সেলফি তুলে তুলে হয়রান হয়ে গেল।

ও হ্যাঁ মন্ত্রী আর আমলাদের সঙ্গে ছিলেন দেশের অন্যতম ‘সুপারস্টার’ বিবেক ওবেরয়। সবাই বিশাল বিশাল মানুষ। এদের ভিড়ে আমি থাকি টাকি না! নিজের কাজ করে টুক করে সরে পড়ি। এবারেও আমার দায়িত্ব ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ডঃ হর্ষবর্ধনকে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে ব্রিফ করা এবং তাঁকে অন্ধের যষ্টির মতো এস্কর্ট করে নিয়ে আসা। হর্ষবর্ধন অতীব অমায়িক ব্যক্তি। তাঁকে ব্রিফ করার সময়ও চুপ থাকেন, তাঁকে ক্যাম্পেনের টিশার্ট পরবার জন্য অনুরোধ করলেও মেনে নেন। আর চ্যাংড়া চামচার দল যখন বারফট্টাই করে কাউকে ভোর সাতটায় তার ইয়ার দোস্ত ‘মন্ত্রী’র সঙ্গে দেখা করাতে আনে তখনও হাসিমুখে মেনে নেন। এমনকি অতিরিক্ত উত্তেজিত কোন সহনির্দেশক, অনুষ্ঠান মঞ্চের দিকে ডাক্তারবাবুর যাবার সময় যদি ধাক্কা মেরে চলে যায় তাহলেও কিছু বলেন না এবং সেই সহ নির্দেশককে রীতিমতো বকাঝকা করে যদি ডাক্তার বাবুর এসকর্ট ডাক্তারবাবুর কাছে ক্ষমা চাওয়াতে বাধ্য করে তাহলেও হাসিমুখে তা মেনে নেন।
কিন্তু সকলেই তো সেরকম হয় না! সরকারী ক্ষেত্রে লুকানো কারণ সর্বত্র থাকে! কে কোথায় কার নম্বর বাড়াচ্ছে সে সব জানিয়ে কি করব বলুন! শুধুমাত্রা নিজেকে মাঝে মাঝেই এই পৃথিবীতে বড়ই অপাংক্তেয় বলে মনে হয়। উদ্দেশ্য বিধেয় কিস্যুটি খুঁজে না পেয়ে কেমন যেন ম্যাদামারা ভ্রমণ করছি! উদ্দেশ্যহীন, বিধেয়বিলীন!

সে যাই হোক, তারপর একটা লম্বা মিটিং সামলে বাড়ি ফিরলাম সাড়ে তিনটে। এবারে পার্শ্ববর্তিনীকে নিয়ে একটু ইডলি উডলি উহু করতে গাড়ি নিয়ে বেরোলাম। আনন্দবিহারের দিকে যাচ্ছি! রাস্তা একদম গড়ের মাঠ! ফ্লাইওভার চড়লাম! রেডিওতে একটা বেশ চ্যানেল হয়েছে ১০৭.২ কাছের দূরের পুরনো গান ফান দেয়। তাতে স্বপ্নো কি রাণী চলছে আর পার্শ্ববর্তিনী পাশে বসে। কি ইয়াইয়া মৌসম! ফ্লাইওভার থেকে নামলাম!

হঠাৎ দেখি চার পাঁচটা কচি কচি পুলিশ ছুটে এল! আমি ভাবলাম সিটবেল্ট পরে চালাচ্ছি না বলেই বোধহয়। যাও গচ্চা যাবেই! কিস্যু করার নেই! মুড খারাপ করব না ভেবেও জিগালাম! কি কেস ভাই? বলে কি ওভারস্পিডিং? অ্যাঁহ বলে কি? আমার নাইন্টিন ফর্টি টু আ লাভস্টোরির শেভরোলে স্পার্ক মডেল, যেটা একাশিহাজার কিমি ড্যাংড্যাং করে চলে গেছে সেটা ওভারস্পিড করছে? মেজাজটা একটু ইয়ে হল বটে তাও জিজ্ঞাসা করলাম কত? বলে একাত্তর! লাও গজা! খালি রাস্তায় ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় একাত্তর? জিজ্ঞাসা করলাম স্পিড গান কই? আর লিমিট কত? বলে স্পিড গান ক্যামেরায় লাগিয়ে ফ্লাইওভার থেকে নেমেই লাগানো আছে! আর লিমিট পঞ্চাশ। মাজাকি পায়া হ্যায়! দশ বারোটা পুলিশ আর আমি একা! দে ঝাড় দে ঝাড়! ইয়ে তো জান বুঝকে ফাঁসানে কি তরিকা!

কিছু করার নেই স্যার সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! লাও ব্যাটা যখন সোমবার আটটার সময় আনন্দ বিহার দিয়ে যাবার সময় পাঁচশো অটো আর টুকটুক দাঁড়িয়ে থাকে আর আট লেনের রাস্তাটাও কাশীর পেয়ারের গলি হয়ে যায় তখন তোমাদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ কোথায় যায় হে? উত্তর নেই! আমি বললাম, না হে এগুলো তোমরা বাড়াবাড়ি করছ! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! ইচ্ছে করে ফাঁকা রাস্তায় স্লোপে টঙে তুলে ক্যামেরা লাগিয়েছ। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! সাধারণ মানুষকে বিবস্ত্র করার এটা নতুন পন্থা। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! শেষে বলে কি লাইসেন্স সিজ করবে! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! লাও ঠ্যালা! সু নাগরিক হবার ট্যালা বোঝ! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! ওকে ওকে! বুঝেছি! চিৎকার করছি, এরই মধ্যে পার্শ্ববর্তিনী বেরিয়ে এসেছেন। আর তাঁর সেই বরাভয় মুর্তি দেখে মামারা গেছে ভয় পেয়ে! বলে ‘ম্যাডাম আপ বৈঠিয়ে না কুছ নাহি হুয়া!’ আমি বলি কুছ নাহি হুয়া মতলব? লাইসেন্স তুমি নিয়ে নিচ্ছ আর কুছ নহি হুয়া? তবুও তারা দেখি রা কাড়ে না! তা ম্যাডাম বললেন, যা করার একটু তাড়াতাড়ি করতে! লাও! তারপর তিন পাতার একটা চোথা ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তিন মাস পরে নিয়ে যাবেন! কিস্যু হবে না!

কেমন ভেবলে গেলাম! পুলিশও এমন অমায়িক ভাবে গ্যাঁট কেটে নিল? সাতজন ছিল অধিকাংশ জাঠ গুর্জর! স্বচ্ছন্দে আমাকে মাটি ধরিয়ে দিতে পারত! কিন্তু এমন একটা মাটির মানুষের মত ব্যবহার করল যে আমিই কেমন মাটিতে মিশে গেলাম! ফাইন দিয়ে লাইসেন্স দিয়ে তিনপাতার ক্রোড়পত্র নিয়ে গাড়িতে যখন এলাম পার্শ্ববর্তিনী গচ্চার হিসাব চাইলেন! বিরস বদনে বলিলাম চারশো! কিন্তু বিকেলের মুডটার দফারফা করে চলে গেল শুধু মাত্র লাইসেন্স নিয়ে!

লাইসেন্সের শোক ভোলার জন্য আজ সকালে যখন গ্রেটার নয়ডা হাইওয়ে ধরেছি ছেলেকে স্কুলে পৌঁছোবার জন্য তখনও বাধ্য নাগরিকের মতো ওডোমিটারের কাঁটায় চোখ রেখে চলেছি! ফ্লাইওভার থেকে নামতে গিয়ে পঞ্চাশের নিচে গতি নিয়ে আসতে কালঘাম ছুটে গেল! তাও ছাড়লাম না! তারপর ক্রিকেট মাঠের আম্পায়ারের মতো ব্যাটসম্যানের দিকে নজর দেবার আগে দেখে নিচ্ছি নোবল হচ্ছে কি না!

পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার রাস্তা। প্রতিটি লুকনো ক্যামেরার হিসাব নেওয়া হয়ে গেছে বস! খোঁজ খবর নিয়ে রাহাজানি করতে হলে আমাকে জিজ্ঞাসা করে নেবেন! বিলকুল ফাস্টোকেলাশ গাইডের কাজ করে দেব। তবে কিনা রাহাজানি বাটপাড়ি এসবই বেআইনি কাজ! আর কে না জানে, অন্ততঃ এখন তো জেনেই গেছেন যে। ঘাড়টায় এমন মালিশ হয়েছে, যে আইনের দাস হয়ে নিজেকে সুনাগরিক প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লেগেছি।

তবে কি না এতো পথ দুর্ঘটনা হচ্ছে হামেশাই! না হয় একটা লাইসেন্স তিন মাসের জন্য সরকারি মেহমাননওয়াজির জন্য পাঠিয়েই দিলাম! পুলিশ তো আমায় তুললো না! আমার লাইসেন্সটাকে আলতো করে তুলে নিল! লাইং সেন্সটাই কমে যায় যাতে, আর লাইনে আসার সেন্সটা বাড়ে! আমেন!

(১৫৮)

“You see, the whole country of the system is juxtaposition by the hemoglobin in the atmosphere because you are a sophisticated rhetorician intoxicated by the exuberance of your own verbosity…”

বুইলেন কিছু? আমিও না! আর বুঝে কি হবে। আজ সকালে তো আমি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মতো মুক্ত কচ্ছ হয়ে গেছিলাম কি না! মরেচে! ফিসফাস আবার দিল্লি বেলি ২ হয়ে যাবে নাকি?

খুলেই বলি তাইলে বলুন? না মানে খোলসা করেই বলি! আরে ধুর! মানে ওই ইয়ে আর কি! বিস্তারিত বিবরণ দিই।

হয়েছে কি! চলছে তো দিল্লি বইমেলা! আর বইমেলা মানেই তো মেলা বই আর হইচই আর সৃষ্টিসুখ। তা দিল্লি বইমেলায় কাজ ডবল! আমি টেবিলের ওপারেও আবার এপারেও! তাই গালাগাল খাবার জন্য গাল এগিয়ে দিই আর গালাগাল দেবার সময় মুখে কুলুপ! এমনই হচ্ছে যে যে সে এসে আমায় কয়ে যাচ্ছে “এই একটু হাস না?” আমি আর বলছি না যে পাতি তো কাকও হয়। আর এ তো খাঁচায় পোড়া সিংহ।

সে যাক আনসান বকে কি হবে! আজকের ঘটনায় সোজাসুজি আসছি!

আজ বিকালে বৃত্তের বাইরের বাঙালি (এটা অনিতা অগ্নিহোত্রীর কয়েনেজ আমার এই বৃহৎ বঙ্গ আর বহির্বঙ্গের বাজারে হেব্বি লেগেছে) কবিদের কবিতা ও কাব্যচর্চা নিয়ে আড্ডা। সবাই এক এক করে ঢুকছেন দিল্লিতে! সবার আগে এসেছেন সুকুমার চৌধুরী। কোলকাতার বাইরের কবিদের মধ্যে অন্যতম প্রধান এবং ভীষণ শক্তিশালী কবি! ভীষণ শক্তি বলে ভীষণ? একখানা ব্যাগ এনেছেন ভীমের বাবা দশরথেরও সাধ্যি নেই তোলে! না মানে ইয়ার্কি নয়! তাতে অবশ্য কবিতার বই ভর্তি। আর ভদ্রলোক বড়ই অমায়িক ও ভদ্র।

তা সক্কাল সক্কাল নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে ওঁকে প্রিপেড ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে আমি এপারে এসে নিজের গাড়ি উদ্ধার করতে যাবার আগে। এক কাপ চা খেলাম। আহা কি চা মাইরি! যেন আদার সঙ্গে ঘর্ষণে বাতাসা গলে জল হয়ে গিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

তা সে চা খেয়ে জিন্দেগি গম গাড়ির চাকায় চেপ্টে দিয়ে যতক্ষণে মেন রোডে উঠলাম ততক্ষণে সুকুমার বাবু পৌঁছে গেছেন সিআর পার্ক। বেশ কথা! আমি এগোতে লাগলাম নিজামুদ্দিন হাইওয়ে ধরে এমন সময় সুকুমার বাবুর ফোন।
– এই এরা তো বলছে রুম ১২টার সময় পাওয়া যাবে!
আমি বললাম, ‘সে কী? দিন দেখি লোকটাকে?’ আরে সে লোক তো সকাল থেকেই তেড়িয়া! বলে কোই ভি হো হাম বাত কিঁউ করে! যব হ্যায় তব হি দুঙ্গা! তা তাকে যতই বাবা বাছা করি! সে খেপেই যায়! আর এদিকে হঠাৎ ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক শুনতে শুরু করলাম পেটে! গুড়গুড় গুড়গুড়।

সম্পাদক মশায়কে ফোন করলাম! এমনিতে তিনি আমাদের মধুসূদন দাদা, অমৃত মন্থন না করেও হাতে এনে দিতে তাঁর জুড়ি নেই! কিন্তু সকালে খুব চাপ কেস! কেউ ওঠেই নি! তিনি ফোনের পর ফোন করছেন আর আমিও এদিকে করে যাচ্ছি! সুকুমার বাবু কিন্তু অত্যন্ত অমায়িক! ভাল ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করছেন দরোয়ানকে! যাই হোক ওয়েটিং রুমে একটু বসার সুযোগ করে দেওয়া গেল। কিছুক্ষণের জন্য! আর আমিও ময়ূর বিহার ফেজ টু-র কাছে। ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক এবার ড্রাম নিয়ে হাজির! গুড় গুড় দুম গুড় গুড় দুম। পেটের মধ্যে স্টার ওয়র্স শুরু হয়ে গেছে। লেজার সোর্ড নিয়ে যার যার ব্লিঙ্কস আর হ্যান সোলো আক্রমণ করেছে ডার্থ ভাডেরের গ্রহ।

ভাবলাম একটু থিতিয়ে নিই। সামলে নেব! এদিক আহমেদাবাদ থেকে আরেক মক্কেল এসে হাজির! তাকেও বললাম তুই ওখানে চলে যা ব্যবস্থা হয়ে যাবে! সে তার পরেও এসএমএস করে জিজ্ঞাসা করছে! প্রথমবার একা একা রাজধানীতে। একটু চিন্তা তো হবেই।

আমি আর কি করব! আমার পেটে তখন লঙ্গর রান্না হচ্ছে! ম্যারাথন দৌড়! বব বিমনের লঙ জাম্প! উসাইন বোল্ট! চাক দে ইণ্ডিয়া! ঘুর্ণি পিচ! বাইসাইকেল কিক! আরে থাম থাম! আর বলা যাচ্ছে না! লিখতে গেলেও চাপ লাগছে! ভর সকালে মনোরম বসন্তে আমি দরদর করে ঘামছি! নাকি কুলকুল করে ঘামছি! তাই ঠিক করতে পারছি না!

সম্পাদকের ফোন এল! একজন কর্তাকে ধরা গেছে! সুকুমার দার ফোন এল! আমি তো গরু হারিয়েছি মা!। ভাবলাম দেশের উন্নতি হচ্ছে না কারণ ওপেন ডিফেকশন এখনও কমে নি! চোখ বুলিয়ে দেখলাম রাস্তার ওপাশে পাঁচিলের ওপাশে একটা পার্কে কতগুলো ইয়ং ছেলেপুলে স্লিপের উপর সিট আপ দিয়ে পেটের পেশী শক্ত করছে। আবার পেট! উফ আমারটা পুরো রামদেবের মতো ঢেউ খেলিয়া যায় রে ঢেউ খেলিয়া যায়! একদম বিসমিল্লার মাইহার ব্যাণ্ড! আওয়াজ হচ্ছে সাবসোনিক! কেউ শুনতে পাচ্ছে না কিন্তু আমি এক মনে খালি গোপাল ভাঁড়কে গাল দিয়ে যাচ্ছি!

আর থাকতে না পেরে ইউএন-এর নিকুচি করেছে বলে পাঁচিলের এপারের জঙ্গলের দিকে এগোতে যাব। ও বাবা দেখি এক বেশ রহিস মহিলা নাদুস নুদুস করে তার নেড়ি নিয়ে টুক টুক করে সেখানে যাচ্ছেন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে কুকুর আর মানুষ এক ডাস্টবিন থেকে উচ্ছিষ্ট খেত। আর এখন তো বার করবে! কিন্তু মহিলা কেন রে বাবা! এসব স্থানে তো মহিলাদের যাওয়া বারণ! অন্তত পাবলিকালি! ছাতা কি আর করি নিজেকে নিজেই আরও জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম। এখন নয় মন্টাসোনা! এখানে নয়!

বিপদে পড়লে আমি ধরে নিই যে আমার আয়ু বিরানব্বই! এক্ষুনি টসকাব না! এই সময় দুঃসময় আজকাল বর্তমান সব কেটে যাবে! আবার গাছে গাছে পাখি শাখে শাখে পলাশের সমারোহ দেখা যাবে! আরে সে তো আজকেও দেখা যাচ্ছে। নরনারীরা স্বল্প সংখ্যায় জোড়ায় জোড়ায় বাইক চেপে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছে। আর আমি গাড়ির দরজা খুলে সমানে নিজের মন এবং পেটকে শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছি! যেন পেটের ভিতর দিয়ে টেন কমাণ্ডমেন্টসের রামেসিসের অশ্বারোহী রথ ছুটে যাচ্ছে।

দশ পনেরো তিরিশ! সমস্যার সমাধান দেখা যাচ্ছে! পেটের কষি আলগা করে সিটটাকে হালকা পিছনের দিকে এগিয়ে জয় মা বলে ভাসিয়ে দিলাম তরী। ইয়ে মানে গাড়ি! মানে ভাসাই নি! স্টার্ট দিয়ে দিলাম আর কি!

ময়ূর বিহার পেরিয়ে গাজীপুর ঘুরে আনন্দ বিহার! আরও কত দূরে আনন্দধাম আছে। আমি ইয়ে আমি উয়ে। আমি উরিবাবারে বাবা! আনন্দবিহার বাস আড্ডার সামনে মেট্রো কন্সট্রাকশনের জন্য জ্যাম! আর আমার পেটে রকেট ইঞ্জিনের শব্দ! এবার আরও চিত্তির! গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে ধাক্কা সামলাব তার জো নেই! মাঝ রাস্তায় টুক টুক করে গাড়ি চলছে। আমি আহ্লাদে ট্যারা হয়ে গেছি প্রায়।

চলে যাবে বসন্তের দিন চলে যাবে। দিস ক্লাউড উইল পাস ওভার আওয়ার হেডস। আহা ফাঁকা রাস্তা! উহু বাম্পার! ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে। ঘরের দোরগোড়ায় প্রায়! আমি তো শুয়েই পড়েছি সিটে! একদম ফর্মুলা ওয়ানের মতো শুয়ে গাড়ি চালাচ্ছি! পার্শ্ববর্তিনীকে ফোন করে দিলাম রাস্তা কিলিয়ার রেখো! পার্ক করে! হাই বাই বলে ঘরের ভিতর ঢুকে ঠাকুর ঘরে ঢুকে দরজা দিলাম! আর সশব্দে ফেটে পড়লাম সিংহাসনে! আহা কৃষ্ণ কৃষ্ণ! কৃষ্ণচন্দ্র হে!

বেরিয়ে এসেও আরাম নেই! ঢক ঢক করে দু গ্লাস জল খেয়ে তবে শান্তি! বাওয়া আর যাই হোক! এই শাস্তি যেন শত্তুরকেও না দেওয়া হয়! ওদিকে ম্যানেজারকে বোঝাবার জন্য সুকুমার দার ফোন বার দুই বেজে গেছে। তাকে ফিরে ফোন করলাম। দেশ কা ইজ্জত মা কা ইজ্জত বলে কোনরকমে একটা ঘরে ট্রান্সফার করালাম! সম্পাদক মহাশয়ও ফোনে জানালেন কর্তাব্যক্তিকে ধরা গেছে এবং তিনি তক্ষনি যাচ্ছেন। শান্তি! সব্যসাচীর ফোন এল মেলা কখন! আমি বললাম সে তো একটার পর। কিন্তু এ তো অন্য মেলা! আকাশে আজ রঙের মেলা! কি আনন্দ কি আনন্দ! ক্ষি আনন্দ!

All the world is a stage and you are merely a fellow safaiwala boss! আমেন!