(১৬১)

ফিসফাসের বাজার এখন বেশ খারাপ। কিছু না ঘটলে ফিসফাস আসে না, আর ঘটনার জন্য চাতক পাখির মত হা পিত্যেশ করে বসে থাকতে হয়। না হলে জীবন একদম বর্ষাকালের নালার জলের মতন চলেছে। নড়েও না চড়েও না! ড্যাব ড্যাব করে একই ভাবে তাকিয়ে থাকে।

সে যাই হোক, আমি সাধারণতঃ কোন বিরূপ অবস্থায় পড়লে খুব বিচলিত হই না বলেই মনে হয়। খৃস্টজন্মের আগে একটা জোক চালু ছিল সেটা খুব খুব ইন্সেনসিটিভ এবং সেক্সিস্ট। তবে মোদ্দা কথা হল যখন উপরঅলার মার পড়ে তখন চুপ চাপ হজম করে যান, পারেন তো এনজয় করুন! চিল্লিয়েছেন কি মরেছেন! তখন জ্বালা বেড়ে জালা বেয়ে গড়িয়ে পড়ার সামিল হবে।

যাই হোক, সরকারি আদেশে যেতে হল হায়দ্রাবাদ, তাও ভর রবিবারে। টু পাইসের জিন্দেগী। তাতেও যদি শনি রবিবার মারা পড়ে তাহলে তো কেয়াব্বাত। কিন্তু কা করস্মি! পেট কা সওয়াল বাওয়া। যাই হোক দেখে শুনে ঠিক করেছিলাম যে সন্ধ্যায় যেটা যায় সেটা মনে হয় ড্রিমলাইনার! কম সে কম ভাল ছিনিমা টিনিমা দেখা যায়। নিজের পছন্দমতো! কিন্তু সে গুড়ে উচ্ছের রস! কৈসে?

তাইলে শুনুন! নির্দিষ্ট সময়ে বেশ কিছু আগে গিয়ে টপাটপ সিট বেছে বসার বাঞ্ছায় চেকিন করতে গেলাম! বললাম উইন্ডো দে, নাই! বললাম ফ্র্যাজাইল ট্যাগ লাগা, নাই! আছেটা কি মামা? আছে আছে, টেলিপ্যাথির জোর আছে। ড্রিমলাইনারে উঠে গেনু ৩৩ ডি সিট! বসে সবে দু চারটে ফাস্টোক্লাস ফিলিমকে ঝারি মেরে রেখেছি! ওবাবা আম্রিগি তেলেগু হরেকিষ্ণো পার্টি হাজির হল! তাদের মোট সাতজন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে! আমাকে বলল দয়া করে উয়াপানে উঠে যাবা? আমি আর কি বলি! আসলে মনটা আমার ভালো! তা সরে গিয়ে বসলাম ৩৩এইচে! এক পাশে একটা কচি হরেকিষ্ণো আর ডান দিকে এক ঘুমন্ত ভদ্রলোক। কিন্তু গে দেকি ও বাবা! স্ক্রিন চলে না! লাও! কচি হরেকিষ্ণোর স্ক্রিনটাও চলছিল না! কিন্তু প্লেন ছাড়তেই শুরু হল চলা! আমারটা সেই ট্যালট্যালে পদ্মপাতার জল! নড়েও না চড়েও না! কচিটি আমার সঙ্গে চোস্ত আম্রিগা উচ্চারণে গপ্প করল! (আমারটা অবশ্যই পাতি ইণ্ডিয়ান বাঙালি ইংলিশ) আর মাঝে মাঝে চিল্লিয়ে মা মাসি পিসিদের সঙ্গে ট্যান তেলেগুতেও গপ্প করল। কিন্তু আমার নজর তো তার স্ক্রিনের দিকে তাতে কষে টম আর জেরি চলছে কিন্তু সে গড়াচ্ছে সিটময়। কি আর করব একখান বই নিয়ে গেছিলাম, তাই খুলেই টাইম পাস করতে লাগলাম। ঘুমিয়েও পড়লাম!

ঘুম ভাঙলে দেখি এক ঘন্টা হয়ে গেছে আর খাবার সার্ভ হচ্ছে! স্লার্প করে জিভ শুকিয়ে নিয়ে বললাম ‘ননভেজ’! বিমান ললনা বলে, ‘নেই’! কেমন ভিতরটা আমসি মতো হয়ে গেল! খুব গম্ভীর মুখ করে বললাম, স্ক্রিনটার সঙ্গে চিকেনটাও নিয়ে নিলে মা! (মা? বলেছি নাকি? না মনে হয়!) দয়ার শরীর! ছুটে গিয়ে কোথা থেকে একটা এনভি লেখা প্যাকেট এনে ধরিয়ে দিল! তাতে চিকেন টিক্কা আর খান তিনেক সাইলেন্সার লাগানো প্যাটিস আর সিঙ্গারা! খাবি কি চুষেই হড়কে যাবি!

কিন্তু বিপদ হল অন্যত্র। পাশের তেলেগু বৈষ্ণব বাচ্চাটি খাচ্ছিল জৈন ফুড। মানে শুকনো আলু টিক্কি আর ঘুঘনি! সে আমার চিকেন টিক্কা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, হোয়াটস দিস? আমি বললাম! জিজ্ঞাসা করল কেমন খেতে! সত্যি বলছি মায়া লাগল! বললাম অতি জঘন্য! কিন্তু নন ভেজিটেরিয়ান বলেই চিবোতে হচ্ছে! আমার দিকে করুণার চোখে তাকালো!

খাবার শেষের পরে বসেই রইলাম বসেই রইলাম! চল্লিশ মিনিট পড়ে এসে থালা ফালা সাফ করে নিয়ে চলে গেল! কফি বা চা? বাপি বাড়ি যা! কফির কাপটা বোধহয় ডিজাইনার পারপাসে রেখেছিল।

শেষে আধপেটা খেয়ে এয়ারপোর্টে নামলাম কিন্তু গাড়ি কিছুদূর গড়াতেই হেইসান খিদে পেয়ে গেল যে, দ্রুতগামী রাস্তা পেরিয়ে আটার বিস্কুট নিয়ে এসে চিবোতে হল।

সত্যি বলতে কি অভিযোগ খুব যে করি তা নয়! তবে এয়ার ইণ্ডিয়াকে বছর পাঁচেক আগে যিনি গাধার গুহ্যদেশে ঢুকিয়ে দিয়েছেন তাঁর জন্য অনেক চেষ্টা করেও আশীর্বাণী বর্ষণ করতে পারলাম না! এয়ার ইণ্ডিয়া ছেড়ে এখন আবার তিনি ভারতীয় ফুটবল সংরক্ষণের কাজে লেগেছেন। মিউজিয়ামে পাঠাবার জন্য আর কি!

যাই হোক, দুই দিন কাজের কাজ সেরে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছি! তবে দুখানা ছিনিমা যা ঝারি মেরে রেখেছিলাম, তা ডাউনলোডে বসিয়ে এসেছি! কাল পরশু ছুটি আছে! সদ্ব্যবহার করতে হবে না?

ও হ্যাঁ! একটা প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ খুব দ্বিধায় আছি জানেন, একজন সংবেদনহীন অনাদিঅপ্রাপ্তবয়স্ক হাফসেঞ্চুরিসম্পূর্ণকৃত বৃষস্কন্ধ নিজের ইগো এবং বুদ্ধিহীনতা দিয়ে আমাদের মোহিত করে রেখেছেন। কিন্তু বক্স অফিসে তো তাঁরই জয়জয়কার! আলপিন টু এলিফ্যান্ট যে কোন বিষয়ে তিনি যথেষ্ট মন্তব্য করে পার পেয়ে যান! আর আমরা শুকনো ছোলাভাজা চিবিয়ে হরেকৃষ্ণ গাই! তবে কি জানেন তো! আরামকেদারার সামাজিক ক্রিয়াকলাপকে বাস্তবে নামাবার সময় বোধহয় এসেছে। অন্ততঃ নিজ জীবনে, তাই চিনি খাওয়া কম করছি মশাই! ক্রীড়া সংক্রান্ত সিনেমা খুবই পছন্দ হলেও দু-তিনশো কোটিতে আরও একটা দুশো টাকা যেন কিছুতেই যুক্ত করতে মন চাইছে না! তাই বেবি কো বেস পসন্দ নেহি হ্যায়! বিলকুল নেহি হ্যায়!

Advertisements

(৯৫)

হলুদ ক্যাম্বিস ছেড়ে লাল বল ধরেছি তা বেশ কিছুদিন হল। তখনই আলাপ হল মহম্মদ আজহারউদ্দিন নামক একজন রোগাপাতলা শিল্পীর সঙ্গে। আলাপ বলতে তার কাজকর্ম আর কি! সবুজ ক্যানভাসে পাতলা তুলির মোচড়ে একই বিন্দুকে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট থেকে ফাইন লেগ বাউন্ডারির সুতো ছোঁয়ানো আঁচড়। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট বা স্লিপ বা কভারে ক্ষুধার্ত চিতাবাঘের মত বলকে পাখির চোখ করা ফিল্ডিং। কত কিছুই তো ভারতীয়দের কাছে রোমান্সের মত নতুন স্বপ্ন নিয়ে এসে হাজির করেছিলেন। তারপর খ্যাতি তাঁকে নিয়ে কি করেছিল সেই হৃদয়ভঙ্গের ইতিহাসে গেলে এখনও গলার কাছটা টনটন করে।

তারপর তো ছিলই পরাধীন ভারতের আমার সবথেকে প্রিয় রেবেলিয়াস চরিত্র হায়দার আলি! যার নামে এই শহরের নাম। গদ্দাররা তাতে রাজ করেও নামটাকে মুছে ফেলতে পারে নি ইনশাল্লাহ!

সে যাই হোক, অতিরিক্ত ধানাই পানাই মূল বক্তব্যটির ক্ষতি করে। তাই সোজা কথায় আসি। দেড় দশক ধরে আজহার বাবুর শিল্পী সত্তায় ম্যারিনেটেড হয়ে এমনিতেই মজে ছিলাম তার পরে যোগ হয় ছিয়ানব্বইয়ের হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানির তড়কা আহা সে কি জিনিস ছিল বলে আর বোঝাই কাকে!

সেই ছিয়ানব্বইয়ের চারমিনারের পাশের নূরজাহান রেস্তোরাঁর ডিমের আকারের বাটিতে চুরচুর হলুদ সাদা ভাতের উপর অর্দ্ধেক হওয়া সিদ্ধ ডিমের উপুড় হয়ে আঁচ পোহানো, এ ডাল সে ডাল হয়ে উঁকি ঝুঁকি মারা চিকেনের লালচে হলুদ টুকরো আর ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধের ভিতর দিয়ে দারুচিনিএলাচলবঙ্গ পিস্তাবাদামকাজু এবং আদাজুলিয়েনপুদিনাপাতার ফুলঝুরি রংমশাল। প্রতিটি গ্রাসে আপনি স্বর্গের নন্দন কাননে দোদুল দুলতে শুরু করবেন। আহা আঠারো বছর ধরে সযত্নে লালন করে এসেছি সেই প্রেম। হায়দারের প্রেম, হায়দ্রাবাদের প্রেম, আজহার-লক্ষ্মণের প্রেম, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানির প্রেম।

আমার অতি প্রিয় দুই চরিত্র টাটকা টাটকা হায়দ্রাবাদবাসী। তাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ তো ছিলই তার সঙ্গে ছিল পুরনো প্রেম ঝালিয়ে নেবার লোভ। তাই ঝোপ বুঝে কোপ মেরে টোপ গিলে নিলাম অফিসের কাজে নিজামি শহরে আসার অফারটা। এমনিতেই অবশ্য এই শহরটা গত বেশ কয়েকটা বছর ধরে ঘটি বাঙাল যুদ্ধ করে ক্লান্ত। যে যার ভাগ বুঝে নেবার জন্য একটা অকৃত্রিম রাজ্যের উপর দিয়ে র্যাঁেদা চালিয়ে দিয়েছে। সে যা হোক রাজনীতি তো সকলের পছন্দের স্যুপ হয় না তাই। সোজাসুজি মেন কোর্সে।

ভোরবেলা সাতটায় বেরোতে হবে, এই ভেবে যথা সময়ে অ্যালার্ম দিলাম বটে কিন্তু নবাগতা অতিথি দিলেন সব চটকে! ক দিন ধরে এমনিতেই বেশ ছুটোছুটি হচ্ছিল বটে, তাই কন্যারত্নটির ট্যাঁ টুঁ সামলে, রাত্রি তিনটেয় যখন ঘণ্টা আড়াইয়ের জন্য শুতে গেলাম তখন গত আড়াই সপ্তাহের ঘুম চুমো খেয়ে চলে গেল চোখে। ফলস্বরূপ ঘুম ভাঙল সকাল সাতটা কুড়িতে।

আনন্দময়ী মা আমার নিরানন্দ তুমি কবেই বা করেছ? ঝটাপট পার্শ্ববর্তিনীকে ডেকে তুলে দিয়ে নিজে বাথরুমে গিয়ে দেখি লোডশেডিং। গিজার পিরামিড বন্ধ! গরম জলের স্নানের মধুরেণ অবলুপ্তিপ্রাপ্তং। সে যা হোক বাড়িশুদ্ধু লোকের সমবেত সহযোগিতার মধ্যে বাদ বাকি জিনিসপত্র ভুলে না ভুলে প্রাতরাশের ধারে কাছ দিয়ে প্রায় না হেঁটে বেরোলাম! তবে ক্যাব ট্যাব না ডেকে সরাসরি নিজের গাড়ি এক্সিলারেটরে চাপ দিলাম যখন তখন স্টুডিওর ঘড়িতে সাতটা চল্লিশ।

গাড়ি গড়াতে শুরু করল আর আমার মস্তিষ্ক শুরু করল হিসেব নিকেশ। একটা রেডলাইট নব্বই সেকেণ্ড তো ওদিকে হাতে দেড় মিনিট কমল। এই ভাবে পৌঁছে গেলাম শাস্ত্রী ভবনে- গিয়ে গাড়িটিকে সঠিক স্থানে পার্ক করেই মার দৌড় অটো। সাধারণ ক্ষেত্রে আমি এখান থেকে শিবাজী স্টেডিয়াম এয়ারপোর্ট মেট্রো স্টেশনে গিয়ে মেট্রো ধরি। কিন্তু আমার মস্তিষ্কের ঘড়ি বলছে যে তাতে ব্যালেন্সের দড়িটা বড় বেশী সরু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। অগত্যা চালাও পানসি ধৌলাকুঁয়া। সক্কাল সক্কাল খালি রাস্তা ধরে অটো যতক্ষণে ধৌলাকুঁয়া নিয়ে যাবে ততক্ষণে মেট্রো পৌঁছতে পারবে না!

মেট্রোতে যখন চড়ে বসলাম তখন বাজে আটটা পঁয়ত্রিশ। এদিকে ক্রমাগত যথাক্রমে দিল্লী ও হায়দ্রাবাদে ধারাবিবরণী চলছে। ‘চড়ে পড়েছি- টাইমে ঢুকে যাব!’ ইত্যাদি আর কি! এদিকে পেট চুঁই চুঁই- ছুঁচো ইঁদুর সবাই শারীরিক কসরৎ ছেড়ে কেতরে পড়ে আছে। ঘড়ি বলছে হয়তো হবে হয়তো হবে না! মন বলছে গেছি রে!

যাই হোক পৌঁছে সিকিউরিটি চেকিং টেকিং করে একটা ফিলে ও ফিশে যেই কামড় বসিয়েছি অমনি ফাইনাল কল কানে এসে পৌঁছল। ব্যাস মেয়োনিজের মাথা ও কফি যথাক্রমে ঠাণ্ডা ও গরম রেখে উপস্থিত হলাম আমার প্লেনের দুয়ারে। ফোন চলে গেল যথাক্রমে দিল্লী ও হায়দ্রাবাদে- শেষপর্যন্ত যথাক্রমে যাচ্ছি এবং আসছি।

এবং নির্দিষ্ট সময়ের মিনিট দশেক আগেই এসে পৌঁছলাম প্রেমের শহর হায়দ্রাবাদে। হ্যাঁ সেই ছিয়ানব্বইতেও দেখেছিলাম যে সন্ধ্যায় হুসেন সাগর লেকের ধারের বেঞ্চিতে বসে কপোতকপোতিরা কত সহজে নিজেদের দুনিয়ায় হারিয়ে যেতে পারে এবং তাতে পাড়াপ্রতিবেশী বা ছ্যাতাপড়া সমাজের কিচ্ছুটি যায় আসে না।

হায়দ্রাবাদ আমাকে স্বাগত জানালোও রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশে এক মুখ হাসি নিয়ে। ব্যাস তারপর আধুনিক শহরের শিরাউপশিরা জুড়ে তৈরী হওয়া ফ্লাইওভার ধরে চল্লিশ কিমি দূরে যমজ শহরের আমার গন্তব্যে গিয়ে হাজির হলাম এবং কাজকর্ম সময় মতই শেষ করে আমার স্বজনদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করে বেশ মজে ছিলাম বটে। কিন্তু মন সেই পড়েছিল, পুরনো প্রেম হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানীতেই।

হায়দ্রাবাদ নাকি বিরিয়ানী বানাতেই ভুলে গেছে? এমন কথা শুনলেও পাপ লাগবে! আরে একটা গোটা ক্যুজিন আমার খানদানের পাতার রকমারি ছবি সাঁটাবার জন্য প্রিয়তম হবি তৈরী করে দিল রন্ধ্রণকে, আর সেটা ভুলে গেলে চলে?

তাই শেষ দিনের সকালে সময় টময় বার করে ছুট লাগালাম ওল্ড সিটি- চারমিনারের সুখটানে! তা সে টান আর কি টান বলব। কোন শহরের দিল আছে কি না বুঝতে গেলে তার ভরকেন্দ্রে পৌঁছতে হয়। আর হায়দ্রাবাদ যতই আজ আধুনিকতার স্বপ্নবিলাসে মুড়ে যাক তার চ্যাহেল প্যাহেল আর শোরগোল তো সেই চারমিনার এবং তৎসংলগ্ন ওল্ড সিটিতেই। মক্কা মসজিদ ছুঁয়ে বাজার সরকারি দুলকি চালে হাজির হলাম সাদাব-এ। প্রোটিন সহ সুগন্ধি চালের রোমান্স জিইয়ে রাখার সেরা বাজি। হুকুম করলাম কাচ্চি বিরিয়ানী এবং চিকেন সিক্সটি ফাইভ। ঠিক আঠারো বছর আগে যা খেয়েছিলাম।

কিন্তু স্বপ্ন কি সবসময় পূরণ হয়? কাচ্চি বিরিয়ানী যাও বা টেনেটুনে পাশ করল চিকেন সিক্সটি ফাইভটা মার্ডার করে দিয়ে চলে গেল। খুনি পাঞ্জায় খাবার পরেও বহু ঘণ্টা ধরে রক্তের মত গানপাউডারের দাগ লেগে রইল। কিন্তু দিলটাই তো খান খান হয়ে গেল। বেরহম সময় রোমান্সের পৌনে তেরটা বাজিয়ে ছেড়ে দিল। শেষ পাতে খুবানি কি মিঠা তাও একটু মুখ রক্ষা করল বটে, কিন্তু ততক্ষণে ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেছে।
আমি দেখেছি যার উপর যত আশা করে থাকবে সে তত বেশী ঝটকা দেবে। সে মানুষই হোক বা জায়গা, স্মৃতিই হোক বা ভোজন। বারে বারে তো একই রূপে এসে হাজির হয় না।

বৃন্দাবন গার্ডেন নিয়েও আমার এরকমই চোখ বড় বড় করা রোমান্স ছিল যা এক ঝটকায় ভূপতিত হয়েছিল ছ বছর পর ট্রেনিং-এর সময় দু হাজার একে এসে। দুহাজার নয়ে আবার গিয়েও সেই পুরনো তুমিকে খুঁজে পাই নি! শচীন কত্তা কি কষ্টেই না গেয়ে গেছেন গো ‘তুমি আর নেই সে তুমি’।

সে যাই হোক গে গিয়া, দিল ছোটা না করো বেটা। ও সুবহা কভি তো আয়েগি। ইসবার নহি তো আগলি বার সহি অউর তব ভি নহি তো আপনা হাত জগন্নাথ। নিজের হাতেই নিজের স্বপ্নের মহল গড়ে নেব নিজের রান্না ঘরে।

মন ঘুরিয়ে নিয়ে ইতিউতি বৈচিত্রের সান্নিধ্যে ডুব দিলাম। ওল্ড সিটির রোমান্স থেকে বেরিয়ে গিয়ে হাই রাইজের ঝলকানিতে চোখ রাঙিয়ে নিলাম। মনে হল, শহরটায় জান এখনো আছে হে। কিছু কিছু নব্যমহানগরীর মতো একেবারে কংক্রিটের বর্ম পরে হৃদয় বিদীর্ণ করে নেয় নি সে এখনো। তাই তো তেলেঙ্গানা আর অন্ধ্র নিয়ে টেনশনেও এর রক্তচলাচল বন্ধ হয়ে যায় না। শুধু সার্বিক অবিশ্বাসের বাতাবরণ আশা আশঙ্কার দোলায় ভাসতে ভাসতে পুরনো পৃথিবীর তেহজিবের ওড়না ঢেকে স্বাগত জানায় ভবিষ্যতের বৈভবকে। ট্র্যাডিশন আর মডার্নাইজেশন হাত ধরাধরি করে ছড়িয়ে দিতে থাকে শহরটাকে।

নাহ কিছু কিছু প্রেমকাহিনী ঠিক জীবনের মতই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাওয়া পাওয়া পালটে নিতে হয়। তাহলেই দেখবেন জীবনের গাড়ি গড়গড়িয়ে চলতে থাকে হাইওয়ে ধরে। কলকাত্তাইয়া দিল দিল্লীর পাকওয়ানে ডুব দিয়ে বুঁদ হয়ে থাকলেও তা এই শহরটার জন্য কখনও না কখনও এক আধবার ধকধক করবেই। হাজার হোক প্রেম যেখানে সহনশীলতা শেখায়, যেখানে এগিয়ে চলতে শেখায়। সেখানে কি আর দেবদাসী দিল মরে যেতে পারে? আবার আসব আর সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাদ গ্রহণ করব এই অঙ্গীকারেই ছোড় চলে হায়দ্রাবাদ নগরী। আদিউ~~

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ দুই প্রিয় চরিত্র বলে উল্লেখ করার জন্য আমার ঘাড় যেতে বসেছিল বটেক। তাই নাম উল্লেখ করাটা অ্যাভয়েড করা গেল না। পিয়ালী সিং চক্কোরবক্কোর আর বড়ি সিং বকরবকর! হায়দ্রাবাদ বোধহয় এদের জন্যই এখনও প্রাণবন্ত আছে।