(১২৮)


মাঠ
সবুজ সবুজ ঘন সবুজ ঘাসে ঘাসে পা ফেলে চোখে চোখে হাতে হাত মন মজে যায় মাঠে। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড তখন সবুজের অভিযানে মগ্ন। দিনের মধ্যে মিনিট পাঁচেক সবুজদের দিকে তাকিয়ে বসে থাকুন মন সবুজ হয়ে যাবে পাঠক পাঠিকারা। সবুজের কতই না রঙ, কচি সবুজ পাকা সবুজ, হলদেটে সবুজ, নেড়া সবুজ, ঘন সবুজ, জংলা সবুজ, জলপাই সবুজ। আরে মনটাই তো সবুজ, সবুজ দ্বীপের রাজা!

২২ গজ
ঘন সবুজ হলদেটে ছোপ কোথাও কোথাও এক ফোঁটা টাক তার মাঝখানে একফালি মরূদ্যান সাদাটে স্বর্গের মতো দুপাশে স্বর্গ নরকের গেটে তিনখানি খুঁটি পোঁতা। লাগলে তুক না লাগলে তাক। লাগলেই লাল আলো জ্বলে উঠবে আগুনের। C’mon Man, pitch it on the right spot… সারা জীবন ধরে সঠিক জায়গাটাই খুঁজে গেলাম, যেটা পড়লেই উইকেট বাঁধা, কেউটের ছোবলের মতো স্পিন, বেহালার সুরের মতো স্যুইং, করাতের মতো কাট, স্বপ্নসুন্দরীর মতো ল্যুপ, ব্যাটসম্যানের চোখে মুখে লালা ঝরিয়ে তাকে লক্ষণ রেখার বাইরে টেনে এনে রাবণ বেশধারী ফ্লাইট… Pitch it on the right spot baby!

উইলো
৮৫র সেপ্টেম্বরে গুলমার্গ থেকে একটা পার্চমেন্ট লাগানো কাশ্মীর উইলো কিনেছিলাম। ৬৫টাকা দাম। তারও পরে ৮৭তে ২১০ টাকায় এসজি স্ট্রোকওয়েল। কাশ্মীরি উইলো। ৯২তে এসে প্রথম ইংলিশ উইলো এসজি সেঞ্চুরি। সেটা এখনো রয়ে গেছে মাঝে মাঝেই নেড়ে চেড়ে দেখি, ব্যাট সুইংটা ঠিক আছে কি না। বাবা দেখে বলল, এখন আর কি হবে? অফিসেও তো খেলিস না! স্বপ্নে ম্যকগ্রা আর শোয়েবকে সামলানোর তো হিসাব থাকে না কোন। লাভ ক্ষতি সব স্বপনে মিলিয়ে যায়। Follow the seam Man, নতুন বল পালিশ তোলা অবধি অফস্টাম্পের বাইরে খুচখুচানি নয়। ছাড়া প্র্যাকটিস করো কাকা। ধরার থেকেও ছাড়া বেশী জরুরী। ছাড়তে ছাড়তে সন্ন্যাসী হয়ে গেলেও ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু বিনা যুদ্ধে ক্রিজ ছাড়বে না কখনও। খাড়ুশ! রবি শাস্ত্রী-আর্থারটন-গ্যারি কার্স্টেন!

কিন্তু উইলো তো তুলি! ছবি আঁকতে ডাক পড়ে তাই ভিশি-আজ্জু-মার্ক ওয়া- আর ডেভিড গাওয়ারের। গল্প গাছা যা আছে সব ব্যাটসম্যানদেরই আছে। কজনই বা ইমরান খান হয় বলুন?

চেরি অন দ্য টপ
লাল চামড়ার চারটে টুকরো, ভিতরে কর্ক আর উলের বোনা। তার উপরে ঠিক হিসাব করে ছটা সুতোর সেলাই, লাল সাদা লাল সাদা লাল। গনগনে আগুনের মতো তেড়ে এসে আছড়ে পড়ছে বুকে হেলমেটে হাতে গ্লাভসে প্যাডে বা ব্যাটে। না পারলেই উইকেটকিপারের দস্তানা বা কাঠের কফিন তৈরী গুঁড়িয়ে দেবার জন্য। ফাইট কোনি ফাইট!

রোলার

ছোটবেলায় “তোর বাবা ইডেনে রোলার চালায়” বলে আমায় মাসির বাড়িতে খেপাত। আরও একটু পরে রোলার হেভি রোলার মিডিয়াম রোলার ঘুরে রোলারে মেরে রিফ্লেক্স ক্যাচ প্র্যাকটিস। তার পর দেখতে দেখতে বর্ষা হেমন্ত শীত বসন্ত পেরিয়ে কত যে রোলার বুকের উপর দিয়ে চলে গেল। পিচ তবু অসমান হয়েই রয়ে গেল। লাইফ লাইন- জীবন রেখার মতো। আশির দশকের শেষের দিকে এমকে রায়না আর তনভি আজমি-র একটা সিরিয়াল হতো লাইফলাইন। এখন সেই ধরণের সুন্দর ছোট ছোট আবেগ সিরিয়ালে দেখা যায় না। সকলেই ম্যাক্সওয়েল সকলেই বিগ শো।

আজাহার
আজ হার কিন্তু কাল জিত। ধনুক ভাঙা জ্যা মুক্ত স্কোয়ার ড্রাইভ, জিভ বার করে অ্যাব্রাকাড্যাব্রা লাঠিখেলা, কব্জি মুচড়ে এক্সট্রা কভার থেকে ফাইন লেগ, এক অ্যাকশনে বল ধরে উইকেটে তাক। স্লিপে দুরন্ত রিফ্লেক্স ক্যাচ। কলার তোলা মস্তানি, সঙ্গীতা বিজলানী, আমদানি রপ্তানী। বাঁজারা হিলসে বাড়ি, ফিক্সিং-এ ভাব আড়ি। নিরেনব্বুইয়ে তীরে এসে তরী ডোবে। স্বপ্ন ভাঙতে পনেরো বছর সময় লাগল। পনেরোটা বছর। কৈশোর তখন ক্লিন শেভেন যুবক। কেন কেন কেন? মিয়াঁ কাপ্তান বনোগে?

আক্রম
সাতাশির দুপুর ইমরানের চওড়া বুকের কাপ্তানিতে লম্বা চুলের ব্রণের ক্ষতময় মুখ। অদ্ভুত দুলে এসে আউট স্যুইং ইন স্যুইং অফ কাটার শর্ট আর্ম বাউন্সার, ইয়র্কার আর রিভার্স। পেস বোলিং অন্য ভাবে লেখা হয়ে গেল। শারজায় হোক বা এজবাস্টনে, মেলবোর্ণ বা জর্জটাউন, চেন্নাই বা কেপটাউন- ডায়বেটিস আর ভয়ঙ্করতম কাঁধের অস্ত্রোপচার পেরিয়ে, সীমান্ত পেরিয়ে একজনই বুকে এসে ধাক্কা মারে। ডিউস বলে বাঁহাতি স্পিন হলেও, টেনিস বল ক্রিকেটে পেস, ওয়াসিম আক্রম কপি বুক। বলে বলে ইয়র্কার। পাড়ার ম্যাচ অনভ্যাসের তিনটে ওয়াইডের পরই দুটো দুর্গ ভাঙা ইয়র্কার। ওয়াসিম ভাই জিন্দাবাদ!

এবং শচীন

উননব্বইয়ের এশিয়া কাপের প্র্যাকটিস শেষে ছোট্ট খাট্টো ছোটু বাবু এসে দাঁড়ালেন সামনে। হাতে অটোগ্রাফ খাতা। বাম হাতি শচীনের ডান হাতি ব্যাটিং। ফ্যান না হলেও শ্রদ্ধা কোথায় যায়? মাধুরীও তো পছন্দের অভিনেত্রী নন। তা বলে টুপি কি খুলে সেলাম জানাই না। Respect! Respect!

আরও কত স্মৃতি

৯৬য়ের যে বার বেলায় ধরে নিলাম যে আর হবে না। সেদিন ছিল কোলকাতা কর্পোরেশনের সঙ্গে খেলা বাবার অফিসের। খেলি বছর দুয়েক। অপর দিকে আমার ক্লাব দল হাওড়া ইউনিয়নের অধিনায়ক। সারা মরসুম জুড়ে নিজে ৪০ ওভার বল করে গেল কিন্তু বাম হাতি স্পিনার বলে সুযোগ দিল না। বয়স বাড়ছে। প্রতিশোধ? ব্যাট করতে নেমে তার বলে জীবনের প্রথম রিভার্স স্যুইপ, এক্সট্রা কভারের উপর দিয়ে ছয়। ম্যাচ তবু হাতে আসে না, আউট আম্পায়ারের আঙুল উঠে যায় লেগ বিফোর উইকেট। ঘরবাড়ি ছেড়ে সরে যাবার আগে মাথাটা যদি উঁচু থাকে তো কেয়া বাত মিয়াঁ। স্কুল কলেজ ফার্স্ট সেকেণ্ড ডিভিশন ডিসট্রিক্ট ক্রিকেট ইউনিভার্সিটি সব পেরিয়ে আদিগন্ত ধূসর গোধূলি।

হাউজ দ্যাট
আমার বাবা ইন স্যুইং বল করতেন। মোহন বাগানে যে বছর গেলেন সে বছরই হাঁটু ঘুরল। সালটা ৬৫! তারপর থেকে তিনি সাদা কোট কালো প্যান্ট। স্থানীয় ক্রিকেট পেরিয়ে রঞ্জি দলীপ দেওধর ট্রফি। একবার অরুণ লাল খেলতে খেলতে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, “You are son of Mr. A N Sinha? He is the most sober human being I’ve ever seen on the cricket field. Please remember me with him.” বাবার জন্য গর্বে বুক ফুলে গেল। আমার বাবা! সব সময় পশ্চাৎপটে থাকা আর্ক লাইট থেকে দূরে থাকা বাবা। খেলাটা যিনি আমায় হাতে করে শেখালেন সেই বাবা। সৎ হতে যিনি শেখালেন সেই বাবা। আজ যখন ভুল আম্পায়ারিং-এর জন্য ম্যাচ হেরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এক বন্ধুর দেওয়ালে দেখলাম Son of Umpire=বরাহ নন্দন… কোথায় বাজল বলুন তো?

জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েই তো আমরা জীবনের গাড়ি চালাতে শিখি। উঠতে পড়তে পড়তে উঠতে গড়াতে গড়াতে এগিয়ে যাওয়া। মাথা নিচু না করে সোজা হয়ে বাঁচা। জিততে শেখার থেকেও বড় শেখা হারতে। উফফ আমরা যে কবে হারতে শিখব?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে মুরি মুড়কির মতো করে বিরুদ্ধমতাবলম্বী ব্লগারদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। চারিদিকে প্রতিহিংসা ক্ষোভ বিদ্বেষ আগুন আগুন। উফ এতো বিষ জমে থাকে এই টুকু ক্ষুদ্র মানুষের বুকে?

সেন্সর কাঁচি এবং রোস্টেড হিউমার

খুব ছেলেবেলায় আমি যখন একেবারেই ছেলেমানুষ ছিলাম তখনকার একটা ঘটনা বলিঃ

মহেশ বারিক লেনের খান ৫-৬টা কোঠাবাড়িকে ঘিরে টালির ছাদ আর অ্যাসবেস্টাসের বন্দোবস্ত ছিল। পাশের বাড়ির ছাদে ক্রিকেট খেলতে খেলতে বল যদি সামনের বাড়ির দাওয়ায় পড়ল তখনই বুঝতে পারতাম যে তাদের ডাল রান্না হয় সারা উঠোন জুড়ে। নাহলে বল পড়লেই ডালে? আর তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে বিপ বিপের সমারোহ।

তা তখন তো মন ছিল আয়নার মতো স্বচ্ছ। যা দেখা যেত তারই ছায়া পড়ত। কিন্তু একবার শুধুমাত্র ‘শালা’ শব্দটির উল্লেখ করায় মা জিজ্ঞাসা করল, “তোমার বাবা বলে? কথাটা?” উত্তর ছিল না কোন কারণ ভদ্রলোক হিসাবে আমার বাবার, পাড়ায় এবং নিজস্ব ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুনাম ছিল। আর কে না জানে ভদ্রলোকের বিজ্ঞাপনে চার ছ অক্ষর কেন, দু অক্ষরও থাকে না। তা সেখান থেকেই আমার গণ্ডি কাটা হয়ে গিয়েছিল।

তা তখন মিডল ক্লাস মরালিটির একটা সংজ্ঞা ইতিমধ্যেই ছিল। যেখানে মদ, গাঁজা, জুয়া, সিগারেট এবং পঠন অযোগ্য শব্দের কোন স্থান ছিল না। অবশ্য এখনও মদ বা সিগারেট খাই না শুনলেই লোকে যেভাবে ‘ভালছেলে’ বলে গালাগাল করে তাতে মনে হয় যারা মদ, সিগারেট বর্জন করতে পারেন নি তাদের জন্য নরকের কোণা সংরক্ষিত আছে।

মানব চরিত্র বাহ্যিক আনুষঙ্গিকের মাধ্যমে তো চিত্রণ হয় না, তা হয় তার অন্দরের সৌন্দর্যের মাধ্যমে।

যাই হোক, আরেকটু বড় হয়ে পর্যন্ত পারিপার্শ্বিকে ‘বাপের সম্মান’ রক্ষার দায় ও দায়বদ্ধতা হাঁফ ধরিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল।

তবে কেন জানি না, বাইরে থেকে বিদ্রোহীসুলভ রঙ তামাশা থাকলেও অদৃশ্য গণ্ডি কখনই পার করা হয়ে ওঠে নি।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খোলা বাতাসের মধ্যে শ্বাস নেওয়া শুরু করলেও নিজের মত করে মরালিটির ভূত বেতাল হয়ে চেপে বসেছিল ঘাড়ে। তবে সেটা নিয়ে তো বিশেষ সমস্যা নেই, আমি কি খাব বা পড়ব বা ভাবব সেটা একান্তভাবেই আমার সমস্যা বা অসমস্যা। কিন্তু আমার ভাবনা যখন অপরের ভাবনার সঙ্গে ভাব না করে আড়ি করে এবং সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে ইন্দ্রিয়ের বিবাদভঞ্জনের উদগ্র ইচ্ছা নিজস্বতার চাদর ফাটিয়ে চিৎকার করে ঠিক ভুল নির্ণয় করতে চলে যায় সেখানেই যত গোল বাধে। আপনার ভাবনা যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার সেখানে পেটে গ্যাস ছাড়া কোন কিছু দুষ্ক্রিয়া হবার সম্ভাবনা কম। কিন্তু যেই তা জনসাধারণের হয়ে গেল ব্যাস সেখানেই ব্যক্তিগত চৌহদ্দিতে টান পড়ল।

আমার কাছে যা ঠিক তা আপনার কাছে ভুল মনে হতেই পারে। তার মানে কি আপনিই ঠিক বা আমিই ভুল? তা তো নয় দাদা! স্থান কাল পাত্র এবং পানীয়ের ফেরে সকলেরই নিজস্ব মতামত অজুহাত এবং খয়রাত আছে। ক্ষুদিরাম একশ বছর আগে সন্ত্রাসবাদী হতে পারে কিন্তু পঞ্চাশ বছর পরেই তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীর মর্যাদা পেতে পারেন। এখানে পানীয়ের ফের নেই কিন্তু স্থান কাল তো আছেই।

পাত্রের ফেরের হিসেবও তাহলে দিয়ে দিই, কি বলেন? এই যে ষাটের শেষ আর সত্তরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেই যে কচি কচি তাজা তাজা সবুজের আহ্বানেরা রোমান্সের ডাকে ময়দানের কাকভোরের এনকাউন্টারের শিকার হল, তারা কি ক্ষুদিরামের থেকে বা ভগত সিং-এর থেকে অন্য কিছু ভেবেছিল? সমাজ এবং মানবজীবনে ঊষা ডেকে আনার স্বপ্নে সামান্য দশ বাই দশের জানের পরোয়া করে নি তারাও, যেমন ক্ষুদিরামও করে নি। তাইলে? আজকের যুগে গান্ধী বা সুভাষকে মাইক্রোস্কোপে ফেলতে গেলেও কালের ঝুলন্ত কাটারিটাকে ভুলতে পারি না।

এবারে আসুন মোদ্দা কথায়। কয়েকদিন আগেই সর্বভারতীয় বক্তিমবাজদের একটি পোড়ানো সভা অনুষ্ঠিত হল, তাতে করণ জোহর বরকত্তা হিসাবে এবং রণবীর সিং ও অর্জুন কাপুর বর হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। আর তার কয়েকদিনের মধ্যেই সেন্সর বোর্ডের মহাকর্তা এবং ‘সরকাইলে খাটিয়া’ ‘অঙ্গনা মে বাবা দুয়ারে পে মা’ ইত্যাদি খ্যাত শ্রী পহেলাজ নিহালনীর মোজেসসুলভ দৈববাণী ঘোষিত হল।

যদিও দুটি ঘটনার মধ্যে কোন যোগসূত্র নেই, তবু একটা তৃতীয় ঘটনার আমদানি ঘটল। দেশ জুড়ে, বিশেষত গৌবলয়ের গেরুয়া নামধারীরা ফতোয়া জারি করলেন ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে জোড়ায় দেখা গেলেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে। তা বাবা- মেয়ে, কাকু- ভাইঝি, মা-ছেলে, মাসি-বোনপো অথবা ইতিমধ্যেই বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী যেই হোক না কেন।
তার প্রতিবাদে কয়েকটি ছাত্র সংগঠন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে মিছিল করল, আর কয়েকটি তো একহাত এগিয়ে সিঁদুর, শাঁখা নিয়ে মিছিল করল, যে ‘দাও হে সিঁদুর ভরে দাও’। তা ভারতীয় এবং বিশ্ববাসী এইসব নিয়ে বেশ আছে। তাদের কাছে মহামারী কোন ইস্যু নয়, মারামারিও কোন ইস্যু নয়। এসব তো হামেশাই হয়ে থাকে।

তাইলে? এবার দাদা আমি একটু ঝেড়ে কাশি। প্রথমে দ্বিতীয় ঘটনাটিই নিই। তবে দ্বিতীয় ঘটনাটাকে নিতে গেলে একটু পিছিয়ে যেতে হয়। ঈশ্বরের বার্তাবাহক বলে একটি সিনেমা অবান্তর গল্প আর অদ্ভুতুড়ে হিরোর পাল্লায় পড়ে সেন্সর বোর্ডের দরজার ছিটকিনিতে আটকা পড়ে গেছিল। কিন্তু সিনেমার প্রযোজক, প্রকাশক, নির্দেশক, গায়ক, নায়ক এমন কি দর্শক রামরহিম বাবা আবার লোকসভা নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের হয়ে প্রচার করেছিলেন। শাঁখের করাত হয়ে ওঠার আগেই ভিতরের কলকাঠিতে সেন্সরবোর্ডের গণপদত্যাগ এবং নতুন বিশ্বাসী গোষ্ঠীর আনয়ন ঘটে।

পহলাজ নিহালনী হলেন সকল ‘কা’ ‘কা’ কারীদের প্রধান। তিনি বহুকাল যাবত, সরাসরি বিনোদন জগত থেকে দূরে আছেন। কিন্তু সিনেমার পোকা একবার যাকে কামড়ায় তার রোগ যাবার নয়। ফলে এক কথাতেই রাজী। আর আনুগত্য প্রদর্শন করতে আগ বাড়িয়ে হিটলারি হুকুম দিতে তো এখন কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে। যেমন ‘নির্মল ভারত অভিযান’-এর তাড়ায় সংস্কৃতি মন্ত্রকের থেকে হুকুম হয়েছে যে অনুদান পেতে গেলে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিকেও ঝাড়ু হাতে কিছু না কিছু করে দেখাতে হবে। তা শৈল্পিক এবং সাংস্কৃতিক ভাবে হলেও করতে হবে। তা নিহালনী সাহেব জারি করলেন ছছ্রিশ বেদবাক্যের একটি তালিকা।

সেই তালিকা অনুযায়ী, বসন্তী বিপেদের সামনে নাচবে না। গব্বর চিৎকার করে বলবে, “বিপ, ক্যা সমঝা? কে সর্দার বহুত খুশ হোঙ্গে?” অমরীশ পুরি অধিকাংশ সিনেমায় বিপভাষী হয়ে থাকবেন এবং শক্তি কাপুর পলিগ্যামি ছেড়ে বিপগ্যামি অনুশীলন করবেন। সবথেকে মুশকিল হল তাঁদের যারা ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করে অতীতের গলিতেই ঘুরতে চান তাদের। তারা আর ঘুণাক্ষরেও বোম্বেতে থাকতে পারবেন না। ডালহৌসি, কনট প্লেস, মেরিন ড্রাইভ, সান্তাক্রুজ, কাব্বন পার্ক, জিমখানা, টালীগঞ্জ, গড়িয়ার উপর খাঁড়া নেমে আসত। কিন্তু নিহালনী সাহেব তো আর যশ চোপড়া নন, তাই বোম্বে থুড়ি মুম্বইয়ের রাস্তা ছেড়ে তিনি বহুকাল বাইরে যান নি। তাই তাঁর স্বয়ংক্রিয় খাঁড়া মুম্বইতে এসেই থেমে গেল।

অনেকে অবশ্য এরকম কথা বলছেন যে নব্বই দশকের পর যেহেতু নিহালনী সাহেব ‘সেইরকম’ ছবি বানান নি তাই অতীতের উপর অভিমান করে অস্বীকার করতেই তাঁর এই শুদ্ধিকরণ প্রচেষ্টা। যেমন প্রীত ভারারা, ভারতীয়ত্ব ত্যাগ করে অ্যামেরিকানত্ব গ্রহণ করার তাগিদে ভারতীয় দেখলেই ফাঁসিতে লটকে দিয়ে নগ্নতল্লাশির দাওয়াই দিতে উঠে পড়ে লাগেন আর কি।

তা এর বিরুদ্ধে তো প্রতিবাদ হবেই- সঙ্গত প্রতিবাদ। কেউ কেউ মোদী সাহেবকেও অবগত করাবেন, যে আখেরে দিল্লির আম দরবারে শুকনো খরা চলে এসেছে, এবং আজকের এই লাভ জেহাদ আর চারখান হিঁদু সন্তানের দাবীর মাঝখানে সিনেমার কাঁচি যদি ললিতা পাওয়ারের নজর হয়ে দেখা দেয় তাহলে আখেরে ত্বকের যত্ন নিতে বোরোলীনেও কাজ হবে না। মোদী সাহেব অবশ্য সামনাসামনি কারুর কাজেই ডানহাতের তর্জনী ব্যবহার করতে চান না। আর ভিতরের কলকাঠির খবর কেই বা রাখতে গেছে।

দ্বিতীয়ত আসি প্রথম ঘটনাটিতে, ‘এআইবি’ বা সর্বভারতীয় বক্তিমবাজদের জন্ম হয় বেশ কিছুকাল আগে পশ্চিম থেকে আগত বাবাগনুশ মার্কা স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ানদের অভিযোগ থেকে। মানে পাপা সিজে রাসেল পিটার্স ইত্যাদিরা আমাদের বীর দাসদের সঙ্গে মিলে ভারতীয়দের নিজেদের উপর হাসার অপারগতা নিয়ে কান্নাকাটি করেছিলেন, আর ফল স্বরূপ পাশ্চাত্য ধারণায় মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিয়ে এআইবির উৎপত্তি বা ব্যুৎপত্তি। এখন এআইবি-র যারা সদস্য গুরসিমরণ খাম্বা, রোহণ জোশী, তন্ময় ভাট এবং আশিস শাক্য তাঁরা কয়েকটি ইউটিউব ভিডিও বানিয়ে ভারতীয়দের গাঁট কেটে বেশ খ্যাতিই পেয়েছিলেন। এনাদের কয়েকটি ভিডিও বিশেষত নারী শরীরের বাণিজ্যিকরণ, আলিয়া ভাট, কংগ্রেস বনাম বিজেপি ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয়তাই পেয়েছিল। কিন্তু তালগাছের শখ যাদের থাকে তাদের কলাগাছে দোল খেতে কি ভাল লাগে?

তাই এআইবি রোস্ট এবং বিতর্ক। এখন উপরের অনুচ্ছেদ দেখে এমনিতেই বুঝতে পারছেন যে ভারতীয়দের (অবশ্যই সর্দাররা ছাড়া) নিজেদের উপর ঠাট্টার বিষয়ে মানসিকতা এখনো সেই সিপাহী বিদ্রোহের আগের জমানার। তাই সরাসরি আক্রমণ যদি বেডরুম ছাড়িয়ে বাথরুমে চলে যায় তাহলে কি মানা যায়? বিশেষতঃ সাধারণ ভদ্রতার সীমা গ্রাউণ্ড ফ্লোরে ফেলে চ্যাটার্জী ইন্টারন্যাশনালের ছাদে হাওয়া খেতে উঠে গেলে? ব্যাস এফআইআর- এর লাইন লেগে গেল। এমনিতেই আলিয়া ভাট আর হিরু জোহর দীপিকা পাড়ুকোনের শয্যাদৃশ্য কল্পনা করে একই প্রেক্ষাগৃহে হাসছেন এই দেখতে ভারতীয় দর্শক এখনও তৈরী নয়। তার উপর ধর্ম, বর্ণ এবং সর্বোপরি লিঙ্গভেদ নিয়ে পাতে দেবার অযোগ্য মস্করা।

আসুন দেখি বিদগ্ধ জনেরা কি বলছেন। বোন অর্পিতাকে নিয়ে দুষ্টু চুটকির প্রতিবাদে প্রথমেই সলোমন খান তন্ময় ভাটের অ্যানাটমি বিগড়ে দেবার হুমকি দিয়েছেন। করণ জোহর বলেছেন, যাদের পছন্দ নয় তারা দেখবে না বা শুনবে না। করণ, অর্জুন, রণবীর, দীপিকা, আলিয়া, সোনাক্ষী সহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অশ্লীলতা বা অশালীনতার অভিযোগে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। তাতে আলিয়ার বাবা মহেশ খেপে গিয়েছেন কিন্তু তাঁর মাথায় জল ঢেলে দিয়েছেন সোনাক্ষী এই বলে যে ছেলেপুলেরা বড় হয়েছে এবার নিজেকেই সামলাতে দিন। আর সব নিয়ে যদি মাথা ঘামাতে হবে তো মহেশ ভাটের মতই টাক পড়ে যেতে পারে। ওদিকে ফিল্ম বিশ্বের যুগপুরুষ ‘সত্যমেব জয়তে’র পরিবেশনকারী মহান আমির খান করণ, রণবীর ও অর্জুনকে সেলিব্রিটি হিসাবে আরও দায়িত্ববান হবার পরামর্শ দিয়েছেন। তার উত্তরে এক ব্লগার প্রথম বিষোদ্গার করেন এবং আমিরের একদা সহকর্মী পূজা ভাটও আমিরকে বিখ্যাত ‘দিল্লি বেলী’র কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আমির তাতে একটু চেপে গিয়ে বলেছেন, ‘দিল্লি বেলী’তে তিনি তো সরাসরি গালাগাল কাউকেই করেন নি। তার সিনেমার চরিত্ররা করেছেন। যদিও তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যার পছন্দ হবে না সে দেখবে না!’ তাতে আবার কানাডিয়ান ভারতীয় রাসেল পিটার্স আমির খান কে নিজের চরকায় তেল দিতে বলেছেন, কারণ পিটার্সের নিজের জামাকাপড় চরকায় নয় উলের কাঁটায় হাতে বুনে তৈরী হয় এবং তাতে তেলের কোন দরকার পড়ে না। শেষ মেষ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির স্বনিয়োজিত সাফাইকারী টুইঙ্কল খান্না (রাজীব ভাটিয়ার মতো প্লে বয়কে পনেরো বছর ধরে চাবকে সোজা রেখে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তথা সমগ্র বিশ্ব সমাজের যে উপকার তিনি করেছেন তা সারা বিশ্ব দুশো বছর পরেও মনে রাখবেন), আবার নিজের ব্লগে ঘোষণা করেছেন, ‘যাও যাও সব নিজ কাজে!’ অর্থাৎ সারা বিশ্বে এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আশয় আছে সেখানে গিয়ে নাক পেন্সিল করো হে সব।

সব মিলিয়ে জমজমাট অবস্থা। তবে সাধারণভাবে আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে আমি সামগ্রিক ভাবে মরাল পুলিস নিয়ে আদেখলাপনার বিরোধী। মনে করি যে যা ভাল তা নিজে থেকেই থেকে যাবে, আর যা নিম্নরূচীর বা নিকৃষ্ট তা আপসেই মুছে যাবে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, আমাদের বাকস্বাধীনতাকে বাক…এর শেষ স্টেশনে নিয়ে চলে যাই। আত্মনিয়ন্ত্রণ তখন পরস্মৈপদী শব্দ হয়ে দাঁড়ায়। আর তখনই গোলযোগ। আমার যা ভাল লাগে তা অপরের ভাল নাও লাগতে পারে এই বোধটাই কোথায় যেন চাপা পড়া মানুষ হয়ে যায় আর মস্তিষ্কের রাজপাট রাইটার্স থেকে নবান্নে পাড়ি লাগায়।

সংবেদনশীলতা এবং বাকস্বাধীনতার একটা নমনীয় মোড়ে আমরা দাঁড়িয়ে। না পারি ছাড়তে, না পাড়ি ধরতে। বাকস্বাধীনতা খর্ব করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে গর্জে উঠি কিন্তু নিজগুণে সংবেদনশীলতা না দেখাতে পেরে অপরের ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

চোর চুরি করে বলেই কি না পুলিশের মাহাত্ম্য? সব কি আর অপাপবিদ্ধ উত্তরাঞ্চলী গাঁও? বিশ্বাসের বস্তু তর্কের থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে যাবে? আসল কথা হল ব্যালেন্স বা ভারসাম্য। যা আমাদের জীবন ট্রাপিজের খেলায় পোক্ত সাইকেল চালক করে তুলবে। পরের জুতোয় পা আমরা তা ঝেড়ে দেবার জন্যই গলাব না, তার জায়গায় নিজেকে রেখে নিক্তিতে মেপে পা ফেলতেও কাজে লাগাব।

সেই সকালের কল্পনা করতেই পারি যেখানে টিটকিরিটাকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে নির্মল হাসির দিকে ঝুঁকব। কিন্তু অপ্রাপ্তমনস্কতার নামে খামোখা আমার অপছন্দকে সামনে রেখে মরালিটির বিচারকের ভূমিকা পালন করব না। তাই দাদা, মন খুলে খেলুন, সম্পূর্ণ মাঠটাই আপনার, কিন্তু অপরকেও খেলতে দিন। আপনার বাপের সম্পত্তি হলেও। ভাগ করে নেবার মধ্যেই যে পাবার আনন্দ লুকিয়ে আছে। কি বলেন?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, হিন্দু সেনাদের মুখপাত্র নতুন ক্যাম্পেন শুরু করেছেন, ‘বেটি বাঁচাও, বহু লাও’! সত্যিই, কবে যে এদের নবি হাজির হবেন? ও হো নবি বলতে মনে পড়ল, মোদী সাহেব স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মুখ খুলেছেন, বলেছেনঃ ‘প্রত্যেকেরই অপরিহার্য অধিকার আছে নিজধর্ম বজায় রাখতে ও পালন করতে’। রবি ঠাকুর ও বিবেকানন্দকে সাক্ষী রেখে বলেছেন, স্বাগত জানাবার এবং সম্মান প্রদর্শনের ভারতীয় ঐতিহ্যের কথা। কোথাও না কোথাও তো শুরু করতেই হয়। বলুন?

(আদরের নৌকায় প্রকাশিত)
(কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ সরোজ দরবার)

(১২৭)

বেশ কিছুদিন ফিসফাস থেকে দূরে ছিলাম। কিছুটা ইচ্ছাকৃত আর কিছুটা হয়তো অনিচ্ছা। আসলে ল্যাপটপটি বিগড়ে গিয়ে সব গড়বড় করে দিয়েছিল। আর সত্যি কথা কি সব কিছুতেই ব্লগ লিখতে গেলে ইনস্ট্যান্ট কফির এফেক্ট এসে যেতে পারে। শুধুই ধোঁয়া- স্বাদ গন্ধ আর প্রভাব বলতে কিছুই নেই।
তাই বেশ কিছুদিন চুপচাপ পড়াশুনো চলছিল, বাকি কাজের ফাঁকে ফাঁকে।

দুটি ঘটনা সদ্য সদ্য ঘটে গেল, চিত্তচাঞ্চল্যের জন্য যা যথেষ্ট। প্রথম বাংলাদেশী এবং আমেরিকার নাগরিক তথাকথিত নাস্তিক ব্লগার অভিজিত রায়ের হত্যা এবং লেসলি উডউইন নাম্নী এক তথ্যচিত্রকারের India’s Daughter তথ্যচিত্রটি। এগুলি নিয়ে সকলের ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু যথেষ্ট জোরালো বক্তব্য রয়েইছে। ফিসফাসেরও রয়েছে। কিন্তু এই ফিসফাসে আমি সেই মতামতগুলির থেকে কিছু গল্প এবং ঘটনার উল্লেখ করাটাই শ্রেয় মনে করছি। আদতে ফিসফাসের লেখক নিজের ঢাক পেটাতেই স্বচ্ছন্দ। সাহসী মন্তব্যে নয়।

নটবর সিং-এর One Life is Not Enough-এ উল্লেখ আছে যখন তিনি পাকিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হলেন তখন তিনি দিল্লিতে পাকিস্তানের তদানীন্তন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করে জানতে চাইলেন, “পাকিস্তানে গিয়ে কি বলতে হবে আমি জানি। কিন্তু আমাকে বলুন কি একেবারেই বলা যাবে না!” উত্তর পেয়েছিলেন, “কখনই বলবেন না আমরা আর আপনারা এক। এক নই। এক হলে একসঙ্গেই থাকতাম।”
BL02_Natwarsingh_b_2035170g

আরও এক জায়গায় পড়েছিলাম যে, কোন দেশের যখন ইতিহাস বলে কিছু থাকে না তখন দেশটাকে এক সূত্রে বেঁধে রাখার জন্য অন্যান্য যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়। ধর্ম বা ভাষা হল সেই যন্ত্রপাতি।

পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠিত হবার রাজনীতি আমরা সকলেই জানি। নিজের নিজের মতো করে তাদের উপর দায় চাপিয়েও দিই। কিন্তু আসল ঘটনা হল, পাকিস্তানকে এক রাখা বছর বছর ধরে রাষ্ট্রনায়কদের কাছে এক দুরূহ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের থেকে সে সমস্যাটা একেবারেই আলাদা। ভারতের মধ্যে ভাষা হিসাবে হিন্দিকে চাপিয়ে দেবার একটা চেষ্টা থাকলেও সেটা জোরদার কিছু নয়। কিন্তু পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানে ঊর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চাপিয়ে দেবার প্রচেষ্টাটি বড়ই নিদারুণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিন্তু ঘটনা হল পাকিস্তানেও সমস্যাটি ছিল। পাকিস্তান আসলে পাঞ্জাবী, পুস্তো, সিন্ধি, সড়াইকি ঊর্দু এবং বালোচ ভাষাভাষীর এক অ্যাসর্টমেন্ট। সেখানে মাত্র ৭%-এর ভাষা ঊর্দু হলেও তার বুনিয়াদের কথা ভেবে তাকে রাষ্ট্র ভাষায় পরিবর্তন করার প্রচেষ্টা যথেষ্ট সমাদর পায় নি। তার উপর, পাকিস্তানের তখনকার রাষ্ট্র নায়ক কায়েদ ই আজমই ঊর্দুতে পোক্ত ছিলেন না।

তাই আমদানী হল ভারত বিদ্বেষ এবং ধর্মীয়করণের। আসলে ঐতিহ্য না থাকলে শুধুমাত্র ধর্ম এবং ভাষা এই দুই অন্ধের যষ্টিও দীর্ঘকালীন ইতিহাসে কম পড়ে যায়।

আশা করি বাংলাদেশের গল্পটি আলাদা করে বলতে হবে না। বাংলাদেশের আরও বেশী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দেশের অর্থনীতি। দূর্বল অর্থনীতিকে ধামাচাপা দিতে রাষ্ট্র বরাবর আবেগের সাহায্য নিয়েছে। সে পঞ্চাশের দশকের ইউরোপই হোক, ষাটের দশকের আমেরিকা, সত্তর দশকের ভারত বলুন বা আশির দশকের সোভিয়েত। যে দেশ টিকিয়ে রাখতে গেলে ভাবাবেগের প্রয়োজন হয় তার অবস্থা কহতব্য নয় সে তো বলার কথা নয়। বাংলাদেশের মানুষদের জন্য প্রথমে ধর্ম এবং তারপর ভাষার ভিত্তিতে এই দেশভাগ নতুন করে কোন সৌভাগ্য এনেছে কিনা সেটা সত্যিই ভাবার কথা।

হতে পারি আমি এপার বাংলার মানুষ বলে হয়তো বাংলাদেশকে সহজেই অন্য দেশ বলে মানতে পারি। যদিও ভাষার মিলটা ঠিক উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমি যে ভাষাতে ভাবতে শিখেছি, ঠিক সেই ভাষাতেই কেউ আমার পাশের বাড়িতেই ভাবছে লিখছে বলছে- কোথাও না কোথাও তো একাত্মতা এসেই যায়। তার বাড়িতে সমস্যা হলে ফ্ল্যাটবাড়ির মানসিকতা নিয়ে খিল এঁটে বসে থাকাও কি যায়? রাজীব হায়দার বা অভিজিত রায়ের হত্যা, শাহবাগের আন্দোলন তাই ঘরের পর্দাকে বিনা হাওয়াতেও দুলিয়ে দিয়ে যায়। যে কোন ধরণের মৌলবাদ মানুষকে তার মনুষত্ব হারিয়ে ফেলতে সাহায্য করে।

কিন্তু কোথাও যেন মনে হয় ধর্ম আর মৌলবাদ এক নয়। মৌলবাদে ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে মিশে যায় সামাজিক আচরণ এবং অপরের প্রতি বৈষম্য।

Book of Genesis থেকে একটা গল্প বলি শুনুন। ইজরায়েলি রাজপুত্র অমিতশক্তিধর স্যামসনকে বস করার জন্য ফিলিস্তিনিরা পাঠায় সুন্দরী ডেলাইলাকে, যার দিদি আবার স্যামসনকে ভালবেসে মারা গিয়েছিল। ছলে বলে কৌশলে, ডেলাইলা জেনে যায় যে স্যামসনের ভগবানদত্ত শক্তির পিছনে রয়েছে তার লম্বা লম্বা চুল। তারপর আর কি চুল কেটে ফেলে ফিলিস্তিন সৈন্যদের হাতে তুলে দেয় সে। সৈন্যরা শুরুতেই স্যামসনের চোখ গেলে দেয় বেঁধে নিয়ে যায় গাজায় অবস্থিত মন্দিরে। যেখানে সবাই জড় হয় পরাক্রমী শত্রুর মৃত্যুর খেল দেখার জন্য। কিন্তু চুল ততদিনে একটু একটু বড় হয়েই গেছে। স্যামসন তখন পরম পিতার কাছে একান্তে প্রার্থনা করে শেষবারের মতো তার শরীরে অমিতবিক্রম দিতে। মঞ্জুর হয় প্রার্থনা। বিশাল মন্দিরের মধ্যবর্তী দুই থামে বাঁধা অবস্থায় স্যামসন সর্বশক্তি দিয়ে টান মারে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি সহ স্যামসন বীরের মৃত্যু বরণ করে। (ফিলিস্তিনিরা অবশ্য বীরের মতো মরতে পারে নি বা বাইবেল তার উল্লেখ করে নি। তারা তো উল্লাসের মধ্যেই মৃত্যুভয় অনুভব করে। বাইবেলের শহীদ তো একা স্যামসনই) পরে স্যামসনের ভাই এসে তার মৃতদেহ খুঁজে বের করে কবর দেয় অধুনা ওয়েস্ট ব্যাঙ্কস এলাকায়।

Samson-and-Delilah
ইজরায়েল আর প্যালেস্টাইনের যুগোত্তরীত যুদ্ধের কারণ খুঁজতে তো না হয় এত দূরে চলে গেলাম। কিন্তু হিন্দু মুসলমান বা ভারত পাকিস্তান? তাদের বিভেদের ইতিহাস তো এত পুরনো নয়! সাধারণ হিঁদু আর মোছলমান তাদের বিভেদ নিয়েই তো এতদিন এক হয়ে ছিল। তাহলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনটা কি শুধুমাত্রই রাষ্ট্রনায়কদের প্রয়োজন? বিভেদটাই বিদ্বেষ হয়ে দাঁড়ালো? দেশের রাজধানী আমার কর্মক্ষেত্র আর সাংস্কৃতিক রাজধানী আমার জন্মভূমি। উভয় স্থানেই কি এই বিভেদটা আমরা দেখতে পাই? বা অনুসূচিত জাতি বা জনজাতিদের প্রতি বৈষম্য?

এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই হঠাৎ করে সামনে চলে এল নির্ভয়া ডকুমেন্টারি। আমি জানি না ইউরোপ বা অ্যামেরিকায় কজন বিদেশী ডকুচিত্রকারকে বিচারাধীন বন্দির সাক্ষাতকার নিতে দেওয়া হয়, বা আদৌ হয় কি না। কিন্তু সে সব হয়ে যাবার পর আমাদের ঘুম ভাঙে, আর সরকার এগারোটা পঞ্চাশে উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে ব্যান।

এমনিতেই শিক্ষা সংস্কৃতির গেরুয়াকরণ নিয়েই সবাই শঙ্কিত। যদিও ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায় ক্ষমতাসীনদের গল্পই ভবিষ্যতের দর্পণে ছায়া ফেলে। পরাজিত নিপীড়িতরা ধীরে ধীরে ছায়ায় মিলিয়েই যায়। তাই বিজয় গর্বে ব্যান শব্দের সেন্সরশিপের জরুরী অবতরণ। ইংরাজি সাহিত্যের আমি খুব মনোযোগী পাঠক না হলেও, Fifty Shades of Grey পড়েছিলাম, আরও সোজাসুজি বলতে গেলে পড়তে হয়েছিল। তবে সত্যি বলতে কি বড়লোকি খেলো পর্ণগ্রাফি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় নি। কিন্তু তা বলে তার চলচ্চিত্র রূপান্তরকে ব্যান করতে হবে বলে পহেলাজীয় ফরমান কি মেনে নেওয়া যায়? মানুষকে তার প্রাপ্তমনস্কতার সম্মান তো দিতেই হয়।

কিন্তু এখানেই হঠাৎ চলে আসে তথ্যচিত্রটির প্রসঙ্গ। গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে সকল ভারতীয় পুরুষের দেখা উচিত এবং নিজের নারকীয় রূপ দেখে লজ্জায় মুখ লুকানো উচিত। কিন্তু তারপর? আমার যদি লজ্জা না পায়, আর আমি যদি মনে করি যে মুকেশ বা তার মুখ- এপি সিং যা বলছে তা তো সত্যিই তাহলে? তাহলে কি আমার প্রাপ্তবয়স্কতা আমার প্রাপ্তমনস্কতার প্রতিফলন হচ্ছে? আসলে জমিনি বাস্তব আমাদের দেশে খুবই কঠিন। যেখানে সাধারণ মানুষকে ধর্মীয় আর ঐতিহ্যের আফিম খাইয়ে বুঁদ করে রাখা হয়। নারী দিবসের প্রয়োজন পড়ে অর্ধেক মানবজাতির উপস্থিতি মনে করিয়ে দেবার জন্য। তার সম্মান পথে, প্রবাসে, টিভির পর্দায়, লোকসভার অভ্যন্তরে বারবার লুণ্ঠিত হয়। আর দোষ হয় পথিকেরই। আগে থেকে সাবধান না হলে তো এসবই হবে।

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এক বিদেশিনীর করা তথ্যচিত্র কতটা সংবেদনশীলতা আনতে সক্ষম হবে বলে মনে করি? 91.1 রেডিও সিটিতে তর্ক করতে এসে অধিকাংশ ভারতীয় সমাজের ওকালতি প্রতিভূ নির্ভয়ার চরিত্র নিয়ে স্বচ্ছন্দে প্রশ্ন তুলতে পারেন এবং বুক ঠুকে বলতে পারেন যদি শ্রোতাদের মধ্যে অধিকাংশ তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করে তাহলে তিনি এই মামলা থেকে সরে যাবেন। কিন্তু যিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আইনের মতো এক মহান পেশার প্রতিনিয়ত ধর্ষণ করে চলেছেন, কি মনে হয়, তিনি সরে গেলে আমাদের দেশে ধর্ষণ নাম্নী এই আদিমতর পাপ কমে যাবে? ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দোষীদের শাস্তিপ্রদানের মধ্যেই সুস্থ মানবতার জয় লেখা আছে।

কিন্তু আজকের মিডিয়া ট্রায়াল আর পপ অ্যাক্টিভিজমের যুগে ভয় হয় যে সকলের অবস্থাই ওই ডিমাপুরের ধর্ষণ অভিযুক্তের মতো না হয়ে যায়। প্রমাণিত হবার আগেই গণবিচারে হত্যা। মধ্যযুগীয় বর্বরতার শাস্তি প্রাচীন বর্বরতার মাধ্যমে। আইন আইনের পথে চলুক। প্রয়োজন বিচারব্যবস্থাকে সঠিক গ্লুকোজ প্রদান, যাতে সুষ্ঠু বিচার দ্রুত সম্পন্ন হতে পারে।

শুরু করেছিলাম অভিজিত রায় হত্যা এবং নির্ভয়া ডকুমেন্টারির উল্লেখ করে। কিন্তু এখন যেন মনে হচ্ছে কোথায় যেন উভয় ঘটনাই এক। সংবেদনশীলতার অভাব, বৈষম্য উভয় ক্ষেত্রেই প্রবল। ধর্মকে জীবনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা আর হাজার বছরের পুরনো কিছু ক্ষয়ে যাওয়া ব্যবহারিক প্রয়োগকে ঐতিহ্যের নামে মাথায় তুলে রাখা। শৃঙ্খলটা ভাঙুক, কিন্তু সেটা সার্বিকভাবে ভাঙলেই মঙ্গল। না হলে আবার ফস্কা গেরোর মধ্যে দিয়ে কালনাগিনী ঢুকে বসে থাকবে ছোবলের জন্য।
single2-800x1000

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এবারের ফিসফাসটা একদম ফিসফাসোচিত হল না। ক্ষমা করবেন পাঠক/ পাঠিকারা, আসলে মনের ভার কম হলেই তো ফুরফুরে ফিসফাস আসবে। তার আগে পর্যন্ত স্বপ্ন দেখা চলুক।

চোদ্দই ফেব্রুয়ারী- কিছু বিক্ষিপ্ত বক্তব্য


এই দেখুন, আমি কিন্তু কিছু করি নি। মানে আমায় অভীক মাথায় গোলাপ ফুল ঠেকিয়ে কসম টসম খাইয়ে লিখতে বলেছে। এমনিতে ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে আমি জম্মে কিস্যু লিখে উঠতে পারি নি! না না ভুল বললাম, বেশ বছর চারেক আগে তেরোই ফেব্রুয়ারিতে ‘লা বেলা পারসোনা’ বলে একখান ইংরাজি সাবটাইটেল সহ ফরাসি সিনেমা দেখে চেগে গিয়ে কবতে কপচে ফেলেচিনু “হেই বিউটিফুল” বলে। তা সে কবতের কি হয়েছিল সে দুঃখের কাহিনী আর কোথায় বলব। খালি এটা জানি ষাটের দশকে সনি রামাধিনের সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এক বাঁহাতি স্পিনারের নাম ছিল অ্যালফ ভ্যালেন্টাইন।

আর ওমনিতেও দেখতে গেলে ১৪ই ফেব্রুয়ারী নিয়ে সাহেবদের মাথাব্যথা আমাদের ঘাড় বেয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে সেই ‘দিল তো পাগল হ্যায়’-এর সময় থেকে। গোল বেলুনের মাঝখানে রদ্দা মেরে পানের মতো বানিয়ে তাপ্পর বাণিজ্যিক দর নির্মাণ এবং সব শেষে মুরগী জবাই। তারপর আর্চিস আর কী সব যেন জুড়ে টুরে একদম ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ অবস্থা।

তা আঙুল ফুলে কলাগাছ হলে তার নিদান পুলটিস সবই জুটে যায়। এখানেও মরাল পুলিস কচি কচি থোকা থোকা মেঘেদের ছানাদের মরাল গ্রীবা ধরতে উদ্যত হতে শুরু হল। কিছু অবিশ্বাসী চারকদমে জোরকদমে ঘোষণা করতে শুরু করল যে আমাদের জন্য বছরের ৩৬৫ দিনই প্রেম দিবস তাই বিশেষ দিনের প্রয়োজন নাই। কিন্তু মাঝখান থেকে আপামর শহরাঞ্চলের লাল পান বেলুনদের গাল ফোলা গোবিন্দ হয়ে ব্যবসায় বৃহস্পতি তুঙ্গে উঠল। টাইটান থেকে শুরুর করে পাঁড়ে ফ্লাওয়ারস সবাই রেস্তের ঝনঝনানি বাড়িয়ে ফেলল।

এইবার আমার হল শিরে পৌষ পাব্বন। লিখতে বসেছি ভ্যালেন্টাইন নিয়ে ভয়ানক গদ্য সেখানে পাঁচ পাতা জুড়ে খালি সারে গামা আলাপ করাই সার। তাহলে একটু ইতিহাস বা উইকিপিডিয়ার পাতা উলটে দেখি আসুন, ভ্যালেন্টাইনটা খায় না মাথায় মাখে?

উইকিপিডিয়া সোজা সাপটা বলছে ১৪ ফেব্রুয়ারীটাকে ভ্যালেন্টাইনের দিন বলে ক্যাথলিকরাই মানে। জনশ্রুতি আছে, ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইন’স নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচার-অভিযোগে তৎকালীন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাঁকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছিল। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইন’স স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন’ দিবস ঘোষণা করেন।

পূর্ব ইউরোপীয় অর্থোডক্স চার্চ আবার ভ্যালেন্টাইন্স ডে উদযাপন করে ৬ই জুলাই। এবারে আসুন ভ্যালেন্টাইন্স দিবস সম্পর্কিত অন্যান্য রীতিনীতি ঘেঁটে দেখি। ইংল্যাণ্ডের নরফোকে এখনো সেন্ট নিকোলাসের মতই জ্যাক ভ্যালেন্টাইন্স বলে এক কাল্পনিক চরিত্র বাড়ির পিছনের দরজায় মিষ্টি কেক এবং উপহার রেখে যান।

শ্লোভানিয়ায় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন বা স্থানীয় ভাষায় জ্রাভকোকে বসন্ত এবং বীজবপনের সন্ত হিসাবে বর্তমান। ১৪ই ফেব্রুয়ারী থেকে বসন্ত আগমনের সূচনা হয়। নবজীবনের বার্তা বয়ে আনেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন।

সত্যি কথা বলতে কি ভ্যালেন্টাইন যে কিভাবে প্রেম ভালবাসার সঙ্গে জুড়ে গেল তার কোন প্রাচীন যুগের প্রমাণ নেই। চসারের পদ্যতেই প্রথম প্রেমের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তার আগে তো প্রেম দিবস ছিল ১২ই মার্চ সেন্ট গ্রেগরী দিবসে।

যাই হোক কবিকুলশিরোমণি চসারের দয়ায় ১৪ই ফেব্রুয়ারী লাল বেলুনের মর্যাদা তো লাভ করল। কিন্তু তা এইরকম ভয়ানকভাবে দেশে দেশে ছড়িয়ে গেল কি ভাবে? আসলে সাহিত্যের একটা বিশাল বড় প্রভাব রয়েছে, ভ্যালেন্টাইন্স দিবসের কবিতা দেখতে গেলে চসার পেরিয়ে শেক্সপিয়ার হয়ে জন ডান এমন কি নার্সারি রাইমেও দেখি

গোলাপেরা লাল, ভায়োলেট চুমি
মধু হলে মিঠে মধুভাষী তুমি
আমি তুমি মিলে প্রেমে একাকার-
তোমাকে আমার মেনেছি যে সখী
ভ্যালেন্টাইন লটারিতে দেখি
আহা কি যে শোভা
মন মনলোভা
তুমি যে আমার আমি যে তোমার।।

এহে সেই ‘রোজেস আর রেড’-এর অক্ষম অনুবাদ। ক্ষমা টমা করে দেবেন।

সে যাই হোক অষ্টদশ শতকেই আমরা দেখতে পাই গণহিস্টেরিয়া বিশেষত ইংল্যাণ্ডে উর্ধগামী। তবে গোঁড়া পিউরিটানিজম তো সব জায়গাতেই থাকে। ইংল্যাণ্ড এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশেও কখনো না কখনো প্রেম ভালবাসার নামে তথাকথিত উদ্দাম বেলেল্লাপনার উপর ধর্মের খাঁড়া নেমে এসেছে।

তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রেম দিবস পালনের হিড়িক সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বোধহয় উনবিংশ শতকে এসে। ততদিনে গ্রিটিংস কার্ড চলে এসেছে। বাজারও বুঝে গেছে শুধুমাত্র নাতির অন্যপ্রাশন ছেলের বিয়ে আর মেয়ের সন্ধ্যাহ্নিকের গুটি কয়েক কার্ড বিক্রি করলে তার পেট চলবে না। অতএব চালাও পানসি খালাসিটোলা। ভারত বর্ষ চিরকালই এইসব ব্যাপারে পেটে কথা মুখে লাজ। ঘোমটার আড়ালে প্রিয়তমার মুখই বুঝতে পারে না তো গ্রিটিংস কার্ডে ‘আই লব ইউ’। রোসো বাছা, বয়সটা আরও একটু বাড়ুক না হয়।

কিন্তু ম্যাচিউরিটির চক্করে পরাণ যায় জ্বলিয়া। প্রেম শুনবে কেন। সে এতদিন ধরে নীরবে দুয়ারপ্রান্তে বিদ্যাসাগরের ছাতার মতো পড়ে থেকে থেকে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাই বাণিজ্যিক সাহায্য নিয়ে গর্জে উঠল, ভসভসিয়ে সোডার মতো গ্যাসের মতো ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল। প্রেমহীন সমাজকে। কিন্তু সমাজের প্রাণে তো প্রেম দেয় নি কবি। সে জানে সময়ের গাড়ি চলতে থাকলেও লটবহরকে শতাব্দী প্রাচীন সিন্দুকের ভিতরেই ভোমরার প্রাণের মতো কিভাবে ভরে রাখতে হয়। তাই অচলায়তনে উঠলো বোল, ‘হর হর মহাদেব’ ‘আল্লা হো আকবর’।

ইউরোপ অ্যামেরিকা এসব দেখে দেখেই বড় হয়েছে। তাই তারাও গতি বাড়ালো। বাজারও বাড়ালো চাপ। প্রেম নেই তো কি হয়েছে? প্রেমের জন্য ভ্যালেন্টাইন নাকি ভ্যালেন্টাইনের জন্য প্রেম? আগে দিনটাকে রঙিন করি, জীবন তো বহুদূর পথ, তোমাকে চাইতে এখনো অনেক দেরী।
অন্যদিকেও গোঁসাইপুর সরগরম- ধর তক্তা কর বিয়ে- সুশীল সমাজও ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভ্যালেন্টাইন্স ডেতে দোকা দেখলেই ফেবিকল।

এসবের জাঁতাকলে পড়ে প্রেম কেমন জানি ছটফটিয়ে ওঠে। প্রথম দেখার উজ্জ্বল স্মৃতিটাকে হাতড়ে নিয়ে বিশবছর পরের সকালে একটু ছোঁয়া একটু বিশ্বাস একটু নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু শুকনো বেলুন বাদাম আর চকোলেটে চিঁড়ে ভেজে না। শুল্ক? শুল্ক দিয়েছ? ন্যাহ দাও নি? বিরহহীন জীবন তখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

প্রেমহীন হরিমটর আর বাস্তবের খরকেকাঠি তখন এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় দেখ। এর মধ্যেই পাঁচু বলে ওঠে, “ওরে বাঙালীর ভ্যালেন্টাইন তো সরস্বতী পুজো! সেই লাল পাড় সাদা শাড়ির পেঁচীর জন্য হাজারটা লাল গোলাপ কুরবান, মেহেরবান কদরদান!” সকলে কনুই ধরে টেনে পাঁচুকে বসিয়ে দেয়।

মোলো যা! হচ্ছে খটখটে বাজারের ওঠানামার কথা ইতিহাসের কথা ইতিহাসহীনতার কথা! কোথথেকে নরম সরম মরাল গ্রীবার হংসবাহিনীকে এনে হাজির কল্লি। এখুনি মরাল পুলিশকে ডাকছি।

ব্যাস তার পরেই গেরুয়া, লাল, সাদা, সবুজ আর না জানি কত না ঝাণ্ডা ডাণ্ডা দুলিয়ে শিং নাড়িয়ে এ বলে আমায় গুঁতো ও বলে আমায় গুঁতো। রিয়ালিটি টিভি- একটু চোখের জল, একটু নাক কোঁচকানো, একটু ভ্রুপল্লব, একটু ঠোঁট কামড়ানি আর একটু অন্তঃসারশূন্য বোকা বোকা ‘আই লব ইউ’।

আসলে সবই তো দড়ির উপর ট্রাপিজ খেলা, একটু ধাক্কা দিলেই নীচে ধরে থাকা জালে বন্দী। পালাবার পথটি নেই।

তাই বাপু বলি কি, এদেরকে ভ্যালেন্টাইন ভ্যালেন্টাইন খেলতে দাও, চাই কি একটু শিবসেনা বানরসেনা কুরবানি সেনাও খেলতে পার। দরকার হলে প্রিয়তম বা প্রিয়তমাকে একটা বৃন্তচ্যুত গোলাপ একটা মোমদানি একটু যত্ন দিয়ে দিনটা কাবার করে দাও। কিন্তু বাকি দিনগুলোকেও মাঝে মধ্যে কক্ষচ্যুত করে নিয়ে নিজেদের করে তুলতে ভুলো না।

আর যাদের প্রাণে প্রেম দিলে না তাদের? উৎসবের দিনে তাদেরকেও ভুলো না হে প্রেমিক পাগল। আনন্দ তো ভাগ করলেই বাড়ে। মন্দির মসজিদ গীর্জা গুরুদ্বারে না হলে নিজের হৃদয় মাঝে তাদের জন্যও এক ফোঁটা জল বরাদ্দ রেখ।

শেষপাতে একমুঠো গালিব রেখে যাইঃ
আভি মশরুফ হুঁ কাফি, কভি ফুরসত মে শোচুঙ্গা
কে তুঝকো ইয়াদ রাখনে মে ম্যায় কেয়া কেয়া ভুল যাতা হুঁ

ওয়াহ ওয়াহ!! আর একটা প্লিজঃ
হামকো মালুম হ্যায় জন্নত কি হকিকত লেকিন
দিল কো খুশ করনে কা, গালিব, ইয়ে খয়াল আচ্ছা হ্যায়!!

(আদরের নৌকায় প্রকাশিত)

(১২৫)

বন্ধুর বাড়ি ওপারে

দাঁড়ান দাঁড়ান! আগে কয়েকটা ছবি টাঙিয়ে দিই। বাকি লেখালেখি তো আজকের বাজারে কাগজের পাতা ওলটালেই পেয়ে যাবেন হাই ভোল্টেজ ম্যাচ বলে কথা।
Javed-Miandad-Last-Ball-Six-Against-India-Sharjah-1986

inda-vs-pakistan_enl

Jadeja

236533,xcitefun-world-cup-1996-1

India vs Pakistan 1996,1999,2003 world cup encounters highlights

venkatesh-prasad

sachin-upper-cutting-shaib-for-six-world-cup-2003

victory

237550,xcitefun-world-cup-india
ভারত পাকিস্তান নিয়ে আমার প্রথম স্মৃতি বলতে সেই ১৯৮০তে আসিফ ইকবালের বিদায়ী ম্যাচ। সেই ম্যাচেও কিরমানির হাতে বল থাকা সত্ত্বেও আসিফ ইকবাল আর জাভেদ মিয়াঁদাদ সিঙ্গল চুরি করে নিয়ে চলে গেল।(এই ছবিটা কোথাও খুঁজেও পাই নি) তার পর রথম্যান্স কাপে ভারতের ১২৫এর জবাবে পাকিস্তানের ৮৭তে গুটিয়ে যাওয়া পেরিয়ে অস্ট্রেলেশিয়া কাপে চেতন শর্মার শেষ বলে ছক্কা। ইডেনের বুকে প্রথম সীমিত ওভারের ম্যাচে সেলিম মালিকের অতিমানব হয়ে ওঠা এসব পেরিয়ে ৯২এর বিশ্বকাপে প্রথম দেখা।

তার আগে অবশ্য ৮৭র বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে দুই দলের হেরে গিয়ে ইডেনের ফাইনালে বিরিয়ানির বদলে শুকনো চিঁড়ে চিবনোর মত করে ইংল্যণ্ড অস্ট্রেলিয়া আর ৮৯-র নেহেরু কাপে শেষ ওভারে ভিভ রিচার্ডসের নির্বিশ অফস্পিনে ওয়াসিম আক্রমের বিশাল ছক্কার উৎসবে ড্রেসিংরুম ভরে যাওয়ার গল্পও রয়েছে।

বিরানব্বইয়ে মিয়াঁদাদের নিষ্ফল নাচ, ছিয়ানব্বইতে জাদেজার ওয়াকার ইউনিসকে ক্লাবস্তরের বোলারে নামিয়ে আনা, নিরানব্বইতে বেঙ্কটেশ প্রসাদের পাঁচ উইকেট, দুহাজার তিনে শোয়েবকে শচীনের থার্ডম্যান গ্যালারিতে ফেলে দেবার পর গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের ফিফথ গিয়ারে চাপ না দেওয়া। এর মধ্যে আবার প্রথম টি২০ বিশ্বকাপে মিসবার অকল্পনীয় চামচ ক্যাচও রয়েছে। ভারত পাক ম্যাচ মানেই ‘হর হর মহাদেব’ ‘জিয়ে জিয়ে পাকিস্তান’-এর জিগির আর দেশগৌরবের আমদানি। কালকেও একটা নিউজ রিপোর্ট দেখলাম। অ্যাডিলেডের ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা আবদার করেছে ওয়ার্ল্ড কাপ চাই না কিন্তু পাকিস্তান ম্যাচ হারা চলবে না। কিন্তু এতটা হাই ভোল্টেজ সাস বহুর নাটকের মধ্যে স্বচ্ছন্দে ভুলে যাই যে এটা শুধুমাত্র একটা খেলা। খেলাকে খেলার মাঠে রেখে আসতে আর কবে শিখব কে জানে?

রক্ত… এত রক্ত কেন রাজা?
71349-004-5D04A44D
সেদিন পার্শ্ববর্তিনীর সঙ্গে আড্ডা হচ্ছিল প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব নিয়ে। হানাহানি আর রক্ত যে কেন ১০০ বছর পরেও এত প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে সেটাই অকল্পনীয়।

ভাবতে পারেন, যে পৃথিবী গত শতকের শুরু এবং মাঝামাঝিতে ওই দুটো যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে সে এখনো শিক্ষা নেয় নি? মৃত্যু এখন শুধুমাত্র একটা সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। পৃথিবীতে ঘৃণার পাহাড় দুদিকেই বাড়ছে। শার্লে এবদো, ৯/১১, ৭/৭, আল কায়দা, তালিবান, পেশোয়ার, আইএস, ইজরায়েল-ফিলিস্তিন, ইউরোপ অ্যামেরিকা আর মধ্যপ্রাচ্য। সংখ্যা দিয়ে সংশয় আর ঘৃণার পরিমাপ করা যাবে না।

রক্তক্ষয় বন্ধের সব থেকে শুরুর রাস্তা হল সংবেদনশীলতা। বিভেদকে গ্রহণ করেই তাকে মিলনের অন্তরায় না করে রাখা। আমরা ওরার রাজনীতি বা কূটনীতি মানুষের মাথার দামের হিসাব কসতে কসতেই জীবন কাবার করে দেয়।

বই না ফিশফ্রাই?

পাঠক পাঠিকারা, আমি নিজে ভোজনবিলাসী, তাই খাবার খাবার অদম্য চাহিদাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারি না। তাই হয়তো এই অংশের অবতারণা। ধরুন স্বামী স্ত্রী দুজনের একজন বই ভালবাসেন আর একজন বাসেন না! বইমেলায় উভয়কেই আনতে গেলে তো রকমারি রংচঙে বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে খাবারের স্টলও তো রাখতে হবে। হাজার হোক বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক বইমেলা বলে কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বোধহয় কোথাও একটা অনুপাতের গণ্ডগোল করে ফেলছেন। মানে গুণমানের থেকে সংখ্যাকে আগে রাখতে গিয়েই এটা হয়ে যাচ্ছে। টিভি চ্যানেলগুলোর বুদ্ধিমত্তাকে মাটিতে শুইয়ে দেওয়া প্রচারগুলো দেখে সেটা আরও বেশী করে মনে হল। রোজ পাঁচ কোটি নাহলেও চলবে। সবাই থাক বইয়ের মিলনমেলায়। কিন্তু গুরুত্ব যেন বই বই আর কিছুতে না থাকে। শব্দকল্পদ্রুমের চাপে বইপাঠকের সংবেদনশীল মন চাপা পড়ে গেলে পড়বে কে?

আর যাঁরা পার্কস্ট্রীটের ময়দান নিয়ে হাহুতাশ করেন তাঁদের জন্য বলি। আমার ছেলেবেলায় বাবা দশ টাকা নিয়ে বাজারে গিয়ে ব্যাগভর্তি বাজার করে নিয়ে আসত। দুপুরের অবসরে গল্পের বই, মাঠে নেমে ক্রিকেট খেলা, সবুজের সমারোহ সব ছিল। কিন্তু টিভি ছিল না কম্পিউটার মোবাইল কিচ্ছুটি ছিল না। কিন্তু তারপর একটু বড় হবার পর বইমেলা থেকে ফিরতাম ধূলোভর্তি মাথা নিয়ে। ময়দান কোলকাতার ফুসফুস, সেখানে যদি নিকোটিনের ছোপ লাগিয়ে দিই, শহরটাই তো বাঁচবে না।

তাই মিলনমেলা, কদিন অপেক্ষা করুন না। শহরটাও তো তরতর করে এগোচ্ছে। সব নাগরিক সুযোগ সুবিধা আপনার হাতের কাছেই পাবেন। তখন আর ছেলেভুলানো গল্প, “আমার ছেলেবেলায় এই ছিল ওই ছিল”তে ভরসা করতে হবে না। আপনার ছেলেমেয়ের ছেলেবেলার গল্পও দেখবেনে আপনার ভাল লাগতে শুরু করেছে।

ষোল বছর পরে বইমেলায় এলাম… কোলকাতা বইমেলা। দিল্লিতেও হয় বইমেলা। ওয়র্ল্ড বুক ফেয়ার। বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের ৫০টি স্টল নিয়েও বইমেলা হয়। কিন্তু কোলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার বিশালতার কাছে এরা সব মুসুরডাল। আর উন্মাদনা? কিচ্ছুটি লাগবে না, লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে চলে যান। সমান্তরাল সাহিত্য আজও বুক বেঁধে আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। কুড়ি পনেরো দশ বছরের পুরনো মুখগুলো পেরিয়ে যখন কচিকচি মুখগুলো কপালের ঘাম মুছে, নতুন সংখ্যাটা অন্যদের থেকে কেন আলাদা সেটা বোঝাবে, তখন আশার সঙ্গে ভালবাসাও ছিলর জায়গায় আছে হয়ে দেখা দেবে। তবে ভণ্ডামি যে নেই তা নয়, তা সে সব দেখতে বসলে তো আপনার চলবে না। আপনি উপরের ক্ষীরটা খান। নীচে নোংরা অবশেষের চিন্তা পুরসভার।

একটু সৃষ্টিসুখ

থাক! ফেসবুকের পাতায় গলা কাঁপিয়ে অনেক ভাষণ দিয়েছি। আর দিলে আপনারাই ফিসফাসকে বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলবেন। তবে কি না যাকে নিজের বলে মনে করি তাকে নিয়ে বুক ফুলিয়ে বলতে লজ্জা কিসের। বাংলা প্রকাশনার জগত যখন মেঘে আচ্ছন্ন। বড় প্রকাশকের মৌরসিপাট্টায় ছোটদের নাভিশ্বাস উঠে যাবার অবস্থা। কিন্তু বড়রাও সংখ্যা দিয়ে গুণমানের বিচার করতে গিয়ে ফেলে ছড়িয়ে মেখে একশেষ করে ফেলছেন সেখানে অভিযান, ধানসিঁড়ি, সৃষ্টিসুখ এরাই কিন্তু বিকল্প পথ দেখাচ্ছে। প্রতিভাস পারুল পুনশ্চ এরাও হয়তো আরও এগিয়েছে। তবে লক্ষ্য রাখুন। বই কিন্তু সইয়ের জায়গা ছাড়তে রাজী নয়। নতুনরাও যেমন লিখছি, তেমন পুরনোরাও নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলতে।
P1150313
সৃষ্টিসুখ আমার প্রথম বইয়ের প্রকাশক, আমার দ্বিতীয় বইয়েরও। রোহণ এবং সৃষ্টিসুখের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা তাই ভাষায় ভাবা সম্ভব নয়। ভালবাসার আরেক নাম সৃষ্টিসুখ।

এবং রাজনীতি

রাজনীতি নিয়ে বাঙালীর ছুঁতমার্গ বরাবরই। আমারও যে নেই তা নয়। বাঘের এক আর পুলিশের আঠারো পেরিয়ে রাজনীতির ছত্রিশ ঘা নিয়ে আমরা বড়ই কাতর। মতামত একটা আছে তবে নিরপেক্ষতা যাতে না হারাই সেটা মাথায় রাখতে গিয়ে মন্তব্য করা হয়ে ওঠে না। তবে সাম্প্রতিক দিল্লি নির্বাচনের ফলাফল অনেক কিছুই দেখাচ্ছে। দেখাচ্ছে সাধারণ মানুষও দূর থেকে ঝারি না মেরে যুদ্ধে নামতে পারে সরাসরি। অন্ততঃ আজকের জনতা তাই চাইছে। যে নিজের মতো কেউ আসুক আর সব কিছু সাফাই করে দিক।

তবে ঝাড়ু নিয়ে এখনি আশাবাদী হবার মতো কিছু দেখি নি। নিরাশাও নয়। নির্বাচনী ইস্তেহারে বড় বড় বাতেলা মারা তো রাজনৈতিক দলগুলির একচেটিয়া হতে পারে না। তাই ৫০০ স্কুল, ১০০ কলেজ, শহর জুড়ে ওয়াই ফাই, সিসিটিভি, এসবগুলো জাদুর ছড়িতে হয়ে যাবার আশা না করাই ভাল।

কিন্তু আট নমাস আগেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসার পরেও মুখ থুবড়ে কেন পড়ল একটি দল? তার পিছনে সাবোতাজের গল্প আছে না আত্মম্ভরিতায় অন্ধত্বের গল্প আছে, সেটা মনে হয় দেখার দরকার আছে। আপের জয় তাই সাধারণ মানুষের টনকে টানের মধ্যেই যাতে সীমাবদ্ধ না থাকে এই আশাতেই আরেকবার বুক বাঁধলাম। আসলে ধাক্কা খেতে খেতে আর বিশ্বাসভঙ্গের গল্প শুনতে শুনতে আজও আমরা গরু হারাই নি। পৃথিবীর শেষ স্টেশনের খোঁজটা যে এ জীবনে যাবার নয়। আমেন।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বইমেলার একদিন, বন্ধুর বই নিতে ধানসিঁড়ির স্টলে গেছি, এক ভদ্র সন্তান এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “নজরুলের কবিতার বই আছে?” স্বাভাবিক উত্তর, “না নেই”। এই অবধি কোন সমস্যা নেই। কিন্তু তারপরেই ধেয়ে এল তাঁর স্বগতোক্তি, “নজরুলেরও বই রাখে না এরা!” কি হল কে জানে, সম্পূর্ণ অনধিকার চর্চা করে ভদ্রলোককে ডেকে বললাম, “আপনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার, সাহিত্য অ্যাকাদেমী বা বাংলাদেশের স্টলে পেয়ে যাবেন। আসলে আমরা ছোট প্রকাশক তো! নজরুলকে ঠিক মতো কদর করতে পারব না বলেই রাখি না।”

প্রয়োজনহীন পুনশ্চ২- শান্ত স্বভাবের রোহণ দাঁড়িয়ে আছে সৃষ্টিসুখের স্টলে। তাকে এসে আরেক ভদ্রসন্তান জিজ্ঞাসা করল, “লিটল ম্যাগাজিন?” হাতে তার আনন্দ এবং দেজের ক্যাটালগ। রোহণ ধৈর্য নিয়ে তাকে সৃষ্টিসুখ কি, কি ধরণের বই বের করে তা বোঝালো। সে কি বুঝল কে জানে, “লিটল ম্যাগাজিন না আমি ঠিক বুঝি না!” বলে চলে গেল। লাও ঠ্যালা।
10986511_10153067337550761_105309937910942553_n

(১২৪)

চোখে হারানোর রঙ

বিশ্বাস করুন, ষোলো বচ্ছর কোন সম্পর্ক ছিল না। প্রথম প্রেমও না যে আঁচড় গভীর হবে। এতো অলসো রানেদের দলে ছিল। বেড়ে ওঠার সঙ্গী বই পড়া বই পাড়া মেলা বই বই মেলা। তবে স্বার্থপরের মতো নিজের বই বেরনোর সময় থেকেই খালি আনটান শুরু হলো। গত দু বছর আসতে না পারার দুঃখটা যেন আসার পর বেশী করে বাজছে। বেহালার ছড়ে টান দিলে রেশ থেকে যায়, জাত কফিতে চুমুক দিলে রেশ থেকে যায় আর বইমেলার রেশ চোখ ছড়িয়ে মুখ ছড়িয়ে ছেয়ে যায় বুকে। মাত্র একদিনের জন্য ভিন রাজ্য ভ্রমণ, তাও এখন যেন মনে হচ্ছে কি সব হচ্ছে ওই দশ বাই দশের খুপরিটায়। বুড়ো বয়সের প্রেম, বুঝলেন না?

চার কদম… দুই পা ফেলিয়া

পঁয়তাল্লিশ মিনিটেই স্বর্গের সীমারেখায়। গৌহাটি আসি নি কখনও। শহরটা ঘুরেও দেখা হল না কাজের চক্করে। কিন্তু কামাখ্যা ছুঁয়ে নামতে নামতে মনে হলো তারাদের হাতছানি ওই নীচ থেকেই আসছে। সন্ধ্যার ব্রহ্মপুত্র গড়গড়িয়ে জানান দিয়ে যাচ্ছে আমি আছি। আছি হেথায়। বুকে ভাসা হল না হয়তো কিন্তু ভাষা খুঁজে পাবই এই বিশ্বাস রেখে গেল সে।

ভিন্ন ক্ষমতা- সহানুভূতি নয় সুযোগ চাই

রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল অব ইণ্ডিয়ার সেমিনারে স্পেশাল এডুকেটরদের আশার বাণী শোনাতে শোনাতে বার বার বলতে হল। তারাও একমত। প্রতিবন্ধকতা নয় ভিন্ন ক্ষমতা, সহানুভূতি নয় সুযোগ চাই। বেড়ে ওঠার সুযোগ লালন পালনের সুযোগ আর চাই কাজের সুযোগ। মানুষের সেবায় গ্যাঁটের কড়ি গুনতে গেলেই পকেট ফুটো থেকে যাবার সম্ভাবনা। সমবেদনা নয় সংবেদনা- পরিবর্তন আনুক সমাজে। ডিসেবেল্ড পরিবর্তিত হোক ডিফারেন্টলি এবেল্ডে।

ফিরে যাই ফিরে যাই

বইমেলাটা শুরু থেকেই চমকে দিল আমায়, মাথায় বুকে পায়ে চমক। মেলাপ্রাঙ্গণে ধুলোর অভাব, তো কি হয়েছে! আসাযাওয়ার পথ তো ধুলোমলিন! পরিচয়, পরিচয়। পুরনো পরিচয় নতুন হয়ে দেখা দিচ্ছে। নতুন পরিচয় যেন কত দিনের পুরনো এমন ভাবে বুকে নিচ্ছে। সেই যে সেই ভদ্রলোক এক দুজন বিশিষ্ট লেখক ছাড়া পড়বেনই না। জায়গার বড় অভাব। শুধুমাত্র আন্তরিকতায় ভর করে বন্ধু হয়ে গেলেন। টানে টানে দুদিন চলে এলেন, শুধু মাত্র আড্ডা দিতে।

আরেকজন শুধু বইয়ের লেখক নামায় চেনা, অচিনপুরের বাস থেকে নেমে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটলেন। গল্প দিয়ে চমকে দিলেন। আরে এ তো আমারই মতন ভাবে। আগলে রাখতে হবে দেখছি।

আরেকটি সে তৈরী ছেলে, বছর দুয়েক আগে মনোমালিন্য হয়ে এখন বন্ধুতালিকা ছাড়া, কিন্তু বই আগলে বাণিজ্যে সে তো আমার পথের পথিক। আহা ছোট হোক বড় হোক, গাল টিপে আদর করতে দোষ কোথায়।

আরও যারা সব কোরিয়ায় বসে সাধ করিয়া কবিতা লেখেন বা দেহরাদুন চালের সুগন্ধের মতো অল্প স্বল্প কবিতায় ভাসিয়ে রাখেন বা বরফ বন্দী তাজা প্রাণ বা পথ চলতে চলতে লিখে ফেলে লাইন বা তেরোর গেরোয় আটকে থাকা প্রাণ, গোপন বাঁচায় সুর ধরানো গান, বিনি সুতোয় গেঁথে নেওয়া মালা, এক জীবনে অনেক জীবন মালা। অভিযানের পাতায় পাতায় সুখ, উত্তুরে হাওয়ায় কাঁপাল যে বুক।
আরে রাখুন সাহেব কাব্যি করবেন না, জীবনের থেকে বড় কাব্যি আর দুইখান নেই।
P1150313

বাইটে বাইটে প্রশ্ন পরতে পরতে সৃষ্টি- স্মৃতিতে স্মৃতিতে টুকরো, উপেক্ষিত যে বৃষ্টি। হুই হুই! আবার পদ্য করছে। তুমি বাপু ফিসফাসাও, সেইখানেই তুমি বাঁচবে। আর রোহণ রোহণ রোহণ। আমার এই তরল কলমে তো টালার ট্যাঙ্ক ভরতে পারি না। ছোট্ট কাঁধে এতটা জোয়াল টানার জোর, ছোট্ট বুকে এতটা গভীরতার ব্যাজ। সিরিয়াসলি বলছি অন্ত্যমিল দেব না বলেই বললাম ব্যাজ। আসলে স্তুতিতে শব্দ খতম হবে না। খামোখা বইমেলাটা খতম হয়ে যায়।

স্টপ ওভার

আবার কালকে আসব আবার ঝড়ের কাছে রেখে যাব ঠিকানা। কাল থেকে আর মাত্র তিন দিন তবু তাতে কি? এক সপ্তাহে এক জীবনের গল্প ঝেড়ে বেছে নিলাম। আবার আসতে হবে, তবে সত্যি বলতে কি বাক্স প্যাঁটরা ছাড়া এতদিন ঠিক মন টেকে না। তাদেরকেও কোন না কোন ভাবে ছুঁয়ে থাকতে হবে। ছুঁইয়ে রাখতে হবে। তারাও তো বইয়েই বাঁচে। এক মন না হলে এক প্রাণ থাকব কি করে বলুন তো?

কাল থেকে আবার সেই ৪৫৭ নম্বর স্টলে! আসবেন তো?

10687981_10153059630295763_1247873749102847541_o

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ আরে বিশাল টেনশন… বইমেলা থেকে ফেরার পথে মানি স্কোয়ারে অটোয় উঠেছি গুনগুন করে গান গাইছি। ওমা পাশের একটি অল্প বয়সী মেয়ে বলে, “আপনি সৃষ্টিসুখের সৌরাংশু না?” গেল ধ্যাস্টামোর মোষ জলের মধ্যে… আর গান গাইবি মনা?

প্র পু ২ আরেকজন হেবি ঘ্যাম নিয়ে রান্না বা গানের বই খুঁজতে এসে ফিসফাসের পাতা ওলটালেন। পড়বি তো পড় গানের গুঁতোর পাতায়। তাই দেখে তেনার কি আনন্দ, “আসলে মিউজিকের লাইনের লোক তো! ছবিটা দেখে মন ভালো হয়ে গেল। আচ্ছা ফুডকোর্টটা কোনদিকে বলতে পারেন? ……

(১২৩)

শেষ যে বারে কোলকাতা বইমেলায় এসেছিলাম সেবার আগুন লেগে গিয়েছিল আর আমি মনের সুখে পোড়া কাঠ আসবাব পেরিয়ে পোড়া বইয়ের গন্ধ নেবার জন্য জঞ্জাল ঘেঁটেছিলাম। পুড়ে যাওয়া খালিল গিব্রান তুলে নিয়ে সযত্নে রেখে দিয়েছিলাম যদি কখনো তাকে মনে পড়ে বলে।

তারপর তো গঙ্গার জল যমুনায় এসে শুকিয়ে পালংশাকের ক্ষেত হয়ে গেছে… সেও অনেক বছর হল। ফিসফাস প্রথমবার যখন বার হল। তখনও কবে আসবে কবে আসবের চক্করে আসতে পারি নি। গত বছর তো আমার কন্যাটির ভূমিষ্ঠ হবার সময়, তাই প্রশ্নই নেই। কিন্তু এবারে ছাড় নেই, একে তো দুই নং ফিসফাস মুখ দেখাচ্ছে তার উপর ষোল্লো বছর পর বইমেলায় হাঁটার উত্তেজনা। সব মিলিয়ে একেবারে চলচ্চিত্রচঞ্চরী। দেবজ্যোতিদাকে জানালাম আসছি। দেবজ্যোতি দা আমায় বললেন, “আমার নাম কিন্তু দেবাশিষ নয়, দেবজ্যোতি!” আমি আর কি বলব? গরু হারানোর পর ফিরে পাওয়ার আনন্দে দন্তরুচিকৌমুদী।

তবে সে বত্রিশ পাটি আর বাইরে বেশীক্ষণ থাকল না। কাল অফিস থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরচ্ছি। শিয়ালদা রাজধানী ধরব বলে। নীচে নেমেই দেখি, আমার গাড়ির ঠিক পিছনেই এক সফেদ স্যান্ত্রো বেমালুম হ্যাণ্ডব্রেক সহকারে দাঁড়িয়ে। কি করি? গাড়ি ঘুরিয়ে কাশীর গলি দিয়ে বেরোতে গিয়ে দিয়েছি এক ঠোনা। ব্যাস গাড়ির মালিক সিআরপিএফ-এর সাবইনস্পেক্টর এসে জাঠ ভাষায় তুই তোকারি করে এক ঝটকায় টেনে নামাল। গাড়িতে ঠোনা মারা হয়তো দোষের কিন্তু পাঠক পাঠিকারা নিশ্চয় মানবেন গায়ে হাত তোলাটা অধিক দোষের। আমি তবুও যথেষ্ট সম্ভ্রম দেখিয়েই বললাম ঠিক ভাবে কথা বলতে। কিন্তু সে তো ইউনিফর্মের গরমে ফার্নেস। শেষে আমার নিজের অধিকার এবং আধিকারিক অবস্থান জানাতে আরও দেখি ক্ষেপে গেল। এবং সবথেকে খারাপ হল, যখন সে তার করা প্রতিটি অকাজ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিল। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে ট্রেন ধরার তাড়া, এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের অনুরোধ, “আপ তো পড়ে লিখে হো। মাফি মাঙ্গ লো!” (যেন পড়েলিখে হবার প্রথম শর্তই হল আত্মসমর্পন)

যাই হোক বুকে পাথর চাপিয়ে নিজেকে সিভিলিয়ান রূপী কুকুর ঘোষণা করে জাঠ ভাইকে বললাম যে ভাই শুধু এই কৃতকর্ম নয় সারা পৃথিবীর সমস্ত রকম অন্যায় অবিচার অনাচারের জন্য আমি ক্ষমা চাইলাম। অন্য কথা ভাবতেই পারতাম বিশেষত সে যখন সাদা স্যান্ত্রোর পিছনে আমার লাল স্পার্কের চুম্বনের খরচ নেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল তখন তো প্রায় ভেবেই নিয়েছিলাম ষোলো বছরের বিরহ যাক চুলোর দোরে। পুলিশে এবং সরকারী সামরিক ক্রিয়াকলাপ সম্পূর্ণ করেই তবে নিঃশ্বাস নেব। আমার সরকারী অফিসের চৌহদ্দির মধ্যেই যদি আমারই এমন অবস্থা হয় তাহলে রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষ কি অবস্থার মুখোমুখি হয় দিবারাত্র। সাধে কি আর লোকে কেজরিওয়ালের ওয়ালে নাম লেখাতে উঠে পড়ে লেগেছে? সে যতই তার রাজ্য চালানোর ক্ষমতায় প্রশ্নচিহ্ন থাকুক না কেন। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনউষ্মাকে কাজে লাগিয়ে।

যাই হোক, যে কোনভাবেই হোক, কেটে যাওয়া দুটো কানকে জুড়ে নিয়ে বাড়ি ফিরেই রওনা দিলাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে। বাক্সপ্যাঁটরাদের এতদিনের জন্য ছেড়ে যাব ভেবেই কেমন মনে হচ্ছিল। কিন্তু প্রকাশকের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা বলে কথা।

শিয়ালদা রাজধানীর খাবার দাবারের অবস্থা দিনে দিনে সঙ্গিন হচ্ছে। যাই বলুন না কেন, “সবই ব্যাদে লেখা আছে!” বলে কাটান দেওয়া লেগেই ছিল। সত্যিই ট্রেন সফর যদি এতই হ্যাঙ্গাম হয় তাহলে আর সরকার বদলেই বা কি লাভ হয় বলুন দেখি? সাধারণ মানুষের তো আগাতেও কাটা হয় আর গোড়াতেও!

তবুও সহযাত্রীদের দৌলতে আমার শহরে এসে পৌঁছলাম আর কোনরকমে নাক মুখ চোখে দুটি গুঁজে ছুট লাগালাম সৃষ্টিসুখের স্টলে।

রোহণ আর নিরুপম দা আর রূপঙ্কর দা আর দেবজ্যোতি দা আর ইন্দ্রনীল দা আর অতনু আর অমিতাভ দা, দোয়েলপাখী আর সন্দীপন আর কিশোর দা আর সুমেরু দা, পিনাকী আর অর্ঘ্য দা,আর উল্কা আর বৈজয়ন্ত দা, আর অরুনদা, দীপ্তি দি পেরিয়ে পার্থ, শুদ্ধসত্ত্ব। আহা বইমেলায় মেলা বই থাকলেও চোখ মেলে মন মেলে আড্ডা দেওয়া যায়।

রোহণ আবার নিজের ডাইরি হারিয়ে এর ওর পাতা থেকে নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল কিন্তু শেষ রাতে সেটাও ফিরে পেল। মাহরুফ গল্প শোনালো দিল্লির বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন তাকে নাকি ডিস্কাউন্টের উপর ডিস্কাউন্ট লাগিয়ে বইয়ের চেক নিয়ে যেতে বলেছে। আমি আবার আশ্বস্ত করলাম যে কোথাও কিছু ভুল টুল হয়েছে। মাঝে মাঝেই বেরিয়ে বুড়িয়ে এলাম এপাশ ওপাশ থেকে। মিলন মেলার সর্বোদ্দীপক যজ্ঞে নিজেকে এতদিনে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঙ্গ মনে ভেবে নিতেও ভাল লাগছিল। নিরুপম দা আবার আমায় সেলিব্রেটি বানিয়ে ছেড়ে দিলেন। উল্কা এসে তার বিজিটোনের সমালোচনা পড়ালো। (আমার অবশ্য মনে হল, উল্কার লেখা পড়ে তার ভাল লেগেছে বলে সামনা সামনি দেখবে বলেই গাল পেড়েছে। কিন্তু উল্কার মতে অন্যথা!)

বই আর আলো আর মেলা আর খাবার দাবার। তার মাঝে রসভঙ্গ করতে চোঙা মুখো মাইকরাও আছে। তবে সব মিলিয়ে যে জাঁদরেল পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে তা দেখে মন্দ লাগছে না।

তবে কোলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে অচেনা অজানা লোক ফিসফাস নিয়ে যাচ্ছেন দেখেও আরাম হল। দিল্লি তো নিজের জায়গা। কিন্তু সিংহের গুহায় যদি নেচে আসতে পারি তবেই কি না আমিও সিঙ্গি!

পাঠক পাঠিকারা, ফিসফাস ২ ও ১ ভরপুর কিনুন সঙ্গে কিনুন নতুনদের জন্য নতুন বই। সৃষ্টিসুখে দৃষ্টিসুখ আর মিষ্টিমুখ করতে চলে আসুন মচমচিয়ে ৪৫৭ নং স্টলে। কাল রোববার বন্ধুবান্ধব ক্রেতা বিক্রেতা নিয়ে মোচ্ছব করতে প্রস্তুত হচ্ছি। উফ কি যে উত্তেজনা হচ্ছে মাইরি। পুরো সাতদিন বইয়ের ধুলো চাটব। দিল্লিতেও এই সৌভাগ্য হয় না যে।

প্রয়োজনীয় পুনশ্চঃ দোয়েলপাখী আর অমিতাভ দা আমার হাতে এসে রসাতল দিয়ে গেল। আমার ভাইটার শেষ লেখা ‘রাণীকাহিনী’। কিছু কিছু সুখ- দুঃখ শেষ হয়েও শেষ হয় না যে। কি যে করিস না! রুলায়গা কেয়া পাগলে?