(১৩৯)


ধরা যাক রাত সাড়ে নটার সময় একটি চারলেনের রাস্তায় আপনি একা একা হাঁটছেন। আপনার একশো হাতের মধ্যে কোন জনমনিষ্যি দেখতে পাচ্ছেন না। গ্যাসলাইটের আলো মাঝে মাঝেই ব্রেক দিচ্ছে অন্ধকারকে জায়গা করে দিতে। পাশের জানকী দেবী কলেজের গেট পেরিয়ে জঙ্গলের মতো মাঠ উঁকি দিচ্ছে। রাস্তাটা একটু গিয়ে বাঁক নিয়েছে সেখানে হয়তো বেশ কিছু লোক রয়েছে। ডানদিকের রাস্তার ওপারের বাড়িগুলোর জানলাগুলো সবই এসি মেশিনের খাঁচা দিয়ে ঢাকা।

এমন সময় একটা পাঠান টাইপের দেখতে গুঁফো মস্তান মতো লোক কাঁধে ঝোলা ফেলে পাশের গলি থেকে ঠিক আপনার পিছনের দশ পা দূরে আপনার সঙ্গী হল। এমনিতে আপনার গায়ে যে খুব একটা কম জোর তাও নয়। তবুও পরিবেশ আর আবহাওয়া শক্তির প্রায় তিরিশ শতাংশ শুষে নিয়েছে। শহরের রাস্তা, চিৎকার করলেও একটা ঝিঁঝিঁ পোকাও আপনাকে দেখতে আসবে না। সাহায্য করা তো দূরের কথা।

আপনি গতি বাড়ালেন, সেও বাড়ালো। দশ পা ক্রমে ক্রমে নয় আট সাত করে চারে! আপনি আরও জোরে হাঁটলেন। চার বেড়ে ছয় হল কিন্তু আবার কমে দুই। মোড়টা দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের আউট গেট- গেট কিপার- দুটো টোটো রিক্সা- একটা চায়ের দোকান- আরও কিছু লোকজন! আপনি পড়ি কি মরি করে দৌড় লাগালেন! লোকটা হাঁটছে, কিন্তু বড় বড় পায়ে যেন আপনার ঘাড়ের কাছে উঠে আসছে। নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন আপনি। গরম গরম নিঃশ্বাস আপনার ঘাড়ে পড়ে ঠাণ্ডা বরফ ছাপ হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের গেটের দিকে আপনি ঘুরে গেলেন লোকটাও ঘুরল। সামনেই সিকিউরিটি রুম, কিন্তু লোকটা যেন সব কিছু অগ্রাহ্য করেছে আজ। আপনার দমে টান পড়ছে। সিকিউরিটি রুমটা পেরিয়েই ক্যান্টিন। চোখ বুজে ছুটে ঢুকে পড়লেন আলো মিলিয়ে। কি আশ্চর্য লোকটাও ঢুকে পড়েছে। ভয় ডর বলে কিছু নেই না কি?

জল একটু জল চাই! দৌড়ে গিয়ে ওয়াটার কুলারটার উপরে রাখা প্লাস্টিকের জলের গ্লাসটা নিয়ে কল খুলে দিলেন আর তার তিন সেকেণ্ড পরেই গ্লাসের সমস্ত ঠাণ্ডাটা গলা বেয়ে শিরদাঁড়া চুঁইয়ে নামতে লাগল। আর আপনি পরম বিস্ময়ে দেখলেন, লোকটা আপনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ক্যান্টিনের কাউন্টার থেকে দু কাপ চা নিয়ে হাসপাতালের মেন বিল্ডিং-এর দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। যাক বাবা খুব জোর বাঁচা গেছে!

এদিকে লোকটা বিল্ডিং-এর চার তলায় নির্দিষ্ট ঘরে গিয়ে পূর্বপরিচিত দুজনের হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে ফিচ ফিচ করে হাসতে হাসতে ঘটনাটা বলতে লাগল। অবশ্য আপনি সেটা শুনতে বা দেখতে পেলেন না। কিন্তু মনে মনে ভাবলেন খুব বাঁচান বেঁচেছেন আজ! অবশ্য আপনি এটাও বুঝতে পারলেন না পরের দিন দুপুরে লোকটা ফিসফাস বলে একটা ব্লগে আপনার ভয় পেয়ে গলা শুকিয়ে যাবার ঘটনাটা রসিয়ে রসিয়ে লিখেও দিল। যান খুব কমের উপর দিয়ে গেছে যখন তখন আপনাকে আর ঘাঁটাব না। বরং আসুন লোকটা কি বলছে দেখি।

কি আর বলব মশাই! রাত বিরেতে জনমনিষ্যিহীন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ যদি খেয়াল করেন যে আপনার ঠিক আগের লোকটা আপনার সঙ্গে রেস লাগাচ্ছে, তাহলে খাবার হজম করার ফিকিরে আপনিও কি তাল মেলাবেন না? মেল ইগো বলে কথা! আমেন!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এমনিতে মাঝেসাঝেই বিখ্যাত ব্যক্তিদের সফর সঙ্গী হবার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তা আর এমন কি? তবে কদিনের আগে লণ্ডন যেতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আমার সফর সঙ্গী হলেন। মানে আমি লণ্ডন যাচ্ছিলাম না, দিল্লি যাচ্ছিলাম। (প্রয়োজন ছিল না বলার! কিন্তু প্রঃ পুঃ বলে কথা!!) তা তিনি দেখলাম লাইন দিয়ে চেক ইন করলেন, এবং ইকোনমি ক্লাসে ঢুকে সকলকে নমস্কার জানিয়ে বলবার চেষ্টা করলেন, “আমরা সকলে তাহলে দিল্লি যাচ্ছি!” টাইপের কিছু একটা। কিন্তু ব্যাপারটা এতই অবভিয়স যে কেউ আর বিশেষ সাড়া দিল না। তিনিও নিজের সিটে গিয়ে বসে পড়লেন। সোশাল মিডিয়া খুললেই যেখানে ভদ্রমহিলার খিল্লি ও মেমেতে ভরপুর, সেখানে এই ধরণের ব্যবহার (যদি অভিনয় হয় তাও হোক না!) বেশ চমক জাগানো। আমি যে ভদ্রমহিলার বিশাল বড় পাখা সেটা আমার বৃহত্তম শত্রুও বলবে না। খারাপটাকে খারাপ যখন দিল খুলে বলি, ভাল জিনিসকে ভাল বলতেই হয়। দিল্লির ভিআইপি কালচারে গত ষোল বছর ধরে দিন গুজরান করেই বলছি, এটা সত্যিই বিরল। এক মনোহর পারিক্কর ছাড়া কাউকেই বিশেষ দেখি টেখি নি! ভুল হলে শুধরে দেবেন পাঠক পাঠিকারা।

প্রঃ পুঃ ২- গত কয়েকদিনের কয়েকটি মৃত্যু এবং ততসম্বন্ধীয় ঘটনায় মনে হয়েছে সমালোচনা করার অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব বলেও একটা ব্যাপার আমাদের ঘাড়ে অদৃশ্যভাবে চেপে বসে। যত তাড়াতাড়ি আমরা সেটাকে পাকড়াও করতে পারি ততই মঙ্গল। দেশের, দশের কিম্বা একের!

(১৩৮)

মোমিন কামড়েছে!!

অ্যাঁহ? ফিসফাসের শুরুতেই এরকম ভয়ঙ্কর হেডলাইন বা পাঞ্চলাইন? পাঠক পাঠিকা কেন লেখককেই নড়ে চড়ে বসতে হয়!

সেই ছোটবেলায় আমি যখন খুব ছোট ছিলাম না। বাজুও মে দম আসতে শুরু করেছে। সেই সময় খেলা নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে মারামারি হয়ে যায়। তা সে ছিল পাঁচ ফুট আর আমি বর্তমান পাঁচ এগারোতে ততক্ষণে ল্যাণ্ড করে গেছি। তাই সে অমিতশক্তিধর হলেও শুধুমাত্র ‘রিচ’-এর ফায়দা নিয়ে তাকে বগলদাবা করতে দেরী হয় নি। তা সে বগলদাবা বলে বগলদাবা? একেবারে বালির বগলে রাবণের ছটপটানি অবস্থা। অবিশ্রান্ত বুকে পিঠে ঘুষি খেয়েও সে আলগা হয় নি। তবে কিনা কচ্ছপের কামড় ছাড়ে বিদ্যুৎ গর্জনে। আমার ক্ষেত্রে উল্টো ঘটল। সে বন্ধুই হঠাৎ ক্ষেপে মেপে (অথবা না মেপে) “সৌরানশু” বলে খ্যাঁক করে আমার থুতনিতে দিল কামড়ে। মানে সেটাই ছিল আয়ত্ত্বের মধ্যে। ফলে হল হিতে বিপরীত। মারপিট রাগ দুঃখ ভুলে আমি খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে শুরু করলাম। আর সে বন্ধুও গেল আরও চটে। যাই হোক ততক্ষণে বাকিরা এসে যাওয়ায় সে মারপিট বেশি দূর গড়ায় নি।

তারপর বেশ কয়েকবার কুকুর, বিড়াল এমন কি সাপের কামড় থেকে স্রেফ রিফ্লেক্সের জোরে বেঁচে গিয়েও শেষ রক্ষা হল না। কাল মোমিন কামড়ে দিল!

হ্যাঁ পাঠক পাঠিকারা! ঠিকই শুনেছেন! মোমিন কামড়েছে!

তাহলে খোলসা করেই বলি! কি বলেন? আমার অত্যন্ত আপনজন মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে দিল্লির গঙ্গারাম হাসপাতালে ভর্তি আছেন। সেই সুকুমার গঙ্গারাম শুধু মাত্র পিলের জ্বর আর পাণ্ডু রোগে ভুগত। কিন্তু এই গঙ্গারাম হাসপাতাল হিসাবে এক ঘর এবং বেসরকারি হাসপাতাল হবার পরেও তার বাণিজ্যিক বদগুণ কিছুটা হলেও কম। গত সতেরো দিনে আমরা পরিবারের সবাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পাহারাদারের ভূমিকা নিচ্ছি। উনি সুস্থ হচ্ছেন ধীরে ধীরে। তাই এখন আইসিইউ-এর পরিবর্তে এইচডিইউ বা হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে রয়েছেন। যেখানে ২৪ ঘন্টা একজন অ্যাটেন্ডেন্ট থাকা বাধ্যতামূলক।

কাল ছিল আমার পালা। শুনছিলাম গত দু-তিন দিন ধরেই এবং তাকে সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে থাকতে দেখে সন্দেহই হচ্ছিল। রাত্রিবেলায় সমস্ত ক্রিয়াকর্ম সাধন করে তারপর পাশের গদিটায় গুছিয়ে নিজেকে লম্বা করেছি। আমাদের পাশের বেডটিতে যে ভদ্রমহিলা আছেন, তিনি মস্তিষ্কে শর্করার পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে ঘুম ছাড়া সর্বক্ষণ একঘেয়ে “অ্যাহ অ্যাহ” করে যান, তিনিও ঘুমিয়েছেন।

হঠাৎ গভীর রাত্রে গেল ঘুম ভেঙে। ঘড়ি দেখলাম তিনটে বাজে। আর সামনের বাবাজী, যার নাম নথিভুক্ত আছে ‘মোমিন’ তিনি উঠে পড়েছেন। তাঁর একটি বিশাল নিইরোলজিকাল অস্ত্রোপচার হয়েছে। ফলে উৎকট উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। তাঁর খালি মনে হচ্ছে যে তিনি সুস্থ এবং রাত্রে তলপেটে বেগ এলে তাকে করতে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ক্যাথেটার ফ্যাথেটার মারও গোলি! পায়ে লাগানো গ্লুকোজ এবং অন্যান্য ওষুধের ড্রিপ ছিঁড়ে ফ্যাল। ‘মুঝে পিসাব করনা হ্যায়’। তিনজন নার্স এবং মোমিনের দুইজন বেঁটেখাটো কিন্তু শক্ত সমর্থ অ্যাটেন্ড্যান্ট নাঝেহাল। গালাগাল আর হাত পা চালানোর তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এইসব ক্ষেত্রে আমার ভিতরের বনের মোষ তাড়ানো রাখালটা ঝাঁপিয়ে পড়ে পরোপকারে। এই অবলা নারীপুরুষদের কে বাঁচাবে? আমি ছাড়া?
ময়দানে নামলাম। প্রথমে নরমে হল না গরমেও না। আমাকেও চার অক্ষর থেকে শুরু করে ছয় অক্ষরে ভাসিয়ে দিল। “মুঝে পিসাব করনা হ্যায়”! ওদিকে ডিউটিতে থাকা কোন ডাক্তারকেও তক্ষনি পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে নার্সরাই সিডেটিভ ইনজেকশন নিয়ে প্রস্তুত হল। কিন্তু লাগায় কার সাধ্য। শেষে আমিঃ তার উর্ধ্ববাহুর অংশ দুটো চেপ্পে ধরলাম। আর এক নার্স তাকে ঘোরাবার চেষ্টা করতে লাগল। তার দুই অ্যাটেন্ড্যান্ট তার দুপা চেপে ধরল। সে কিছু করতে না পেরে, ডেকে উঠল, ‘ডি কে বোস, হাত ছোড় মেরে, পিসাব করনা হ্যায়!’ ডেকেই ঘ্যাঁক করে দিল কামড়ে আমার ডান হাতের অনামিকার গাঁটে। রক্তপাতের মাঝেও আমি মাথা ঠাণ্ডা রেখে বললাম “ইসকা ক্যাথেটার নিকাল দো” দুই মালায়লি নার্স ভাসা ভাসা হিন্দিতে, “আউই নিকাউল রয়ে অ্যায়” বলে প্যাঁট করে পিছনে দিল ইনজেকশন ফুটিয়ে। “লাগ গয়া, লাগ গয়া!” বলতে বলতে এদিক ওদিক করতে করতে তারপর শুয়ে পড়ল। আর আমি বেটাডিন লাগিয়ে ছুটলাম এমার্জেন্সিতে।

সেখানে আর এক ঘটনা! গিয়ে বললাম, টেটভ্যাক নেব! জিজ্ঞাসা করল, কেন? আমি বললাম, মোমিন কামড়েছে! এমার্জেন্সির উপস্থিত ডাক্তারটা চমকে আমার মুখের দিকে তাকাল। তারপর বিপজ্জনকভাবে আমার মুখের সামনে এসে জিজ্ঞাসা করল, “ফিরসে বোলিয়ে কেয়া হুয়া?” আমি তখন বললাম, “এক নিউরো পেসেন্টনে কাট দিয়া!” ততক্ষণে সে মুখের কাছে শুঁকে টুকে বুঝে গেছে আমি গোপাল বা তমাল নই! তা এক স্টুয়ার্ডকে বলল টিটেনাস দিয়ে দিতে। তারপর বলল, “নিউরো ডিপার্ট্মেন্টমে পেসেন্টকে যাদা পাস মত যাইয়ে”।

আমিও মাথা নেড়ে ফিরে এলাম। এসে দেখি মোমিনের তেজ কমে এসেছে। সে মাঝে মাঝে উঠে বসছে “মুঝে পিসাব করনা হ্যায়” বলে। তারপর আবার শুয়ে পড়ছে। কিন্তু এদিকের বেডের ভদ্রমহিলা উঠে পড়ে, এক ঘেয়ে সুরে “অ্যাহ অ্যাহ” গান গাইতে লেগেছেন। ওদিকের এক ভদ্রলোক অসহ্য যন্ত্রণায় “আম্মা! উঠালে! উঠালে!” করে ডাকতে লেগেছেন। এর মধ্যেই কোনের দিকের এক ভদ্রলোকের আবার ইয়ে হয়ে গেল। তিনি হাঁক ডাক করতে লাগলেন পরিষ্কার করে দেবার জন্য। যাই হোক এরকম করতে করতে সকাল হয়ে গেল। আর সূর্যের ডাক শুনে আমরাও উঠে পড়লাম। ডাক্তার রাউণ্ডে এলেন, তাঁকে বলতে গেলে তিনিই খ্যাঁক করে উঠলেন, “হোয়াই ডিড ইউ গো দেয়ার? হি ইজ অ্যা নিউরো পেসেন্ট অ্যান্ড ডেঞ্জারাস!” যাই হোক তাকেও বোঝানো গেল। নার্সিং ইন চার্জকেও বললাম যে রাতে এই বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলোর সাথে একটা শক্ত সমর্থ অ্যাটেন্ড্যান্ট বয়ের থাকা প্রয়োজন। সেই নার্সগুলোও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আগ বাড়িয়ে বেশি বেশি কাজ করে দিত লাগল।
এই আর কি! চলে আসার সময় দেখি মোমিনকে আজ ডিসচার্জ করে দেওয়া হবে। কারণ বেচারি সব্জিওলার কাছে কতই বা টাকা থাকবে এবং এখন তার শুধু ওষুধ চলবে তা কোন সস্তা হাসপাতালেও চলতে পারে। ততক্ষণে অবশ্য মেট্রন টাইপের নার্সরা এসে গেছেন এবং মোমিনকে ধমকে ধামকে ব্ল্যাক টি খাইয়ে দিচ্ছেন।

দিন শুরু করার আগে পার্শ্ববর্তিনীকে ফোন করে জানলাম, “মোমিন কামড়েছে!” তিনি না বুঝতে পেরে বললেন, একটা গুড নাইট রাখা উচিত ছিল! আমেন… ইয়ে… মোমিন কামড়েছে।

ফিসফাস ২-এর ওয়েবসাইট ও বিজ্ঞাপন

সৃষ্টিসুখের ওয়েবসাইটে ফিসফাস-২
Fullscreen capture 13-07-2015 131050.bmp

(১৩৭)


শেক্ষপীর বলে গেছেন, “বাবুমশায়, ইয়ে দুনিয়া এক রঙ্গমঞ্চ হ্যায়, অউর হাম সব কাঠপুতলিয়া…” উল্লাস করুন পাঠক/ পাঠিকারা, আপনাদের ফিসফাস লেখক তাঁর জীবনে প্রথমবার জীবনদায়ীর ভূমিকায় অভিনয় করল। অবশ্য কারুরই জীবন সে দান করে নি বা ফিরিয়ে আনে নি। তবু অভিনয় তো! কেউ যে মুখ ফুটে তাকে
“ডাক্তার সাব” বলে ডেকেছে, তাই বা কম কি?

অতিরিক্ত ভ্যানত্যারা না মেরে সোজাসুজি কথায় আসি। হয়েছে কি গতকাল বিকেলের দিকে ফিসফাস লেখক পার্শ্ববর্তিনীর সঙ্গে দিল্লির গঙ্গারাম হাসপাতালের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। তালকাটোরা স্টেডিয়াম পেরিয়ে সবে সে শঙ্কর রোডে ঢুকবে, তখন দেখল, সার বেঁধে পুলুশ টুলুশ দাঁড়িয়ে আছে আর জেব্রা ক্রশিং-এ কিছু লোক জবরদস্তি রাস্তা পার হবার চেষ্টা করছে।

রাস্তা তুমি কার?
যার যত বেশী চাকা আমি তার!!

পদযাত্রীদের তো ভাগ্যের চাকা- তাও যে ঘোরেও না। মাঝে সাঝে ইচ্ছে হলে দু পা এগিয়েও এক পা পিছিয়ে আসে। তাই পথ পেরোতে চারচাকা যে অগ্রাধিকার পাবে সে কথা আর বলতে নয়। তবে দিল্লি পুলুশ মাঝে মধ্যেই বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে কিন্তু চালান না কাটলে খরচ বাড়ে। তাই সপ্তাহান্তের ব্যবহারিক প্রক্রিয়া।

আমাদের অবশ্য চিন্তা নেই, দ্বিপ্রাহরিক ভাতঘুমের পর গাড়ি চালাচ্ছি, বেল্ট পরিহিত, বীমার কাগজ এখনো তার গুরুত্ব হারায় নি। অতএব আমার আবার চিন্তা কি? বিশ্বের সকল পুলুশই আমার মাতুলক্রমঃ।
তা সেই মাতুলতুতো ভালবাসা মাঝে মধ্যেই প্রবল হয়ে ওঠে, জানেনই তো। এখানেও আমায় ডাকল ধারে। একেবারে কর্ডলেস মাইকে করে। তাপ্পর বলে কি না, একশো টাকা বার কর, চালান কাটা হবে। কেন? জেব্রা ক্রসিং-এ পদযাত্রীর অগ্রাধিকার, সে কান চুলকোতে চুলকোতে, ব্যাঁও সহ ঢেকুর তুলতে তুলতে চু কিত কিত খেলতে খেলতে পথ পেরবে জেব্রা ক্রসিং বেয়ে। আর আপনি চল্লিশ-ষাট-আশি ছুঁয়ে ঝট করে গাড়িকে শূন্যে নামিয়ে নিয়ে চলে আসবেন তাঁর অনুগ্রহের ভরসায়।

অন্ততঃ সেইটাই আমায় বলা হল, সেই আগে বলেছিলাম পুলুশ শুনলেই কান মাথা ভোঁ ভোঁ করে মাথার চারদিকে আলো হয়ে যায় আর দিব্যদৃষ্টি আসে। এখানেও তাই হল! কি হল কে জানে, হেঁটে গিয়ে দেখতে গেলাম জেব্রা ক্রসিং পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে কি না, নেগেটিভ। ব্লিঙ্কার রেড লাইট আছে কি না, নেগেটিভ। পুলুশের কোটা পূর্ণ করার তাড়া আছে কি না, এইটায় কেমন যেন সন্দেহ বদ্ধমূল হল। ব্যাস আর যাবি কোথায়, হেড কনস্টেবলকে বেশ চড়া গলায় বললাম, “আপলোগ ইয়ে সাজিশ রচ কে ফাঁসা রহে হো, লাইন্সেন্স লে লো! ফাইন ম্যায় দুঙ্গা নহি! কনটেস্ট করনা হ্যায়!”

হেডকনস্টেবল রামপাল গেল ক্ষেপে, বলে, “দিজিয়ে লাইসেন্স!” কেলো, এক ঝটকায় ম্যায় কাহাঁ হুঁ!! কিন্তু এই সময় চট করে হার মানলে তো প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন! হঠাত দেখলাম আরেক পুলুশ আমার দিকে এগিয়ে আসছে এই বলতে বলতে, “আপ চিল্লা কে কিঁউ বাত কর রহে হো?” সত্যিই তো! কিন্তু আমি তো রজনীকান্ত নই, বন্দুকের গুলি একবার বেরিয়ে গেলে তাকে হাজার চেষ্টাতেও ফেরানো যায় না। টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলেছেন, কিন্তু বল গেছে দু টুকরো হয়ে, কোন টুকরোটা ধরলে আউট হবে? হবে না দাদা এটা ডেড বল। হঠাৎ দেখলাম, একটু আশার আলো, নতুন যে পুলুশ আমার দিকে এগিয়ে এলো তার ডান হাতের কব্জির উপর থেকে কনুই পর্যন্ত বেশ অনেকটা ছড়ে যাবার চিহ্ন। ঘা দগদগ করছে, তারউপর ঘাম পড়ে ডুবন্ত সূর্যয় চকচকে হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিস্যু না ভেবে বললাম, “ইয়ে কেয়া হ্যায়? বাইকসে গির গয়ে থে?” সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। রামপাল ততক্ষণে দোর্দণ্ডপ্রতাপ। কিন্তু তাকে একেবারে অমোঘ হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে নতুন পুলুশকে বললাম, উঁহু! গলত কাম হ্যায় ইয়ে! খোলকে কিঁউ রাখখে হো?” সে বলে শুকিয়ে যাবে বলে। তাকে বেশ বকাঝকার মতো করেই বললাম, ধুল মিট্টি আর ঘাম লেগে সেরে ওঠার জায়গায় হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। (কথাটা সত্যি যদিও!!) তার সঙ্গে একদম চেরি অন দ্য টপ লাগিয়ে দিলাম। গম গম করে বলে উঠলাম, “ম্যায় ডক্টর হো কে ইয়ে বাত কহ রাহা হুঁ!” বিশ্বাস করুন পাঠক পাঠিকারা, মাটি চিড়ে দু ফাঁক হল না। মন্দিরের ঘণ্টা, মসজিদের আজান ধ্বনি গীর্জার ঢং ঢং সারা আকাশ বাতাস ভরিয়ে দিল না! এমন কি আমার জিভটাও খসে পড়ল না। খালি নতুন পুলুশ জিজ্ঞাসা করল, কোথাকার ডাক্তার? অম্লান বদনে বলে ফেললাম, “গঙ্গারাম”!

তার চোখমুখই পালটে গেল, সে সম্ভ্রমের সঙ্গে বলে উঠল, “ডক্টর সাব”। আরে হট পাগলে, কাঁদাবি নাকি? আরও বলল, তবে এবার রামপালকে, “ডাক্তার সাব কো ছোড় দো, কোই নহি! ডক্টর সাব দো মিনিট রুক যাও! সব লগ দেখ রহে হ্যায়! রামপাল জী লাইসেন্স ওয়াপস করো!” অ্যাঁ? ছোঁড়া বলে কি? কিন্তু রামপালের তো ডাইরেক্ট ঝামেলা হয়েছে। সে ছাড়বে কেন, তখনো সে তড়পাচ্ছে, “পেয়ার সে বোলতে, সরকারী অফসর, ডক্টর পেয়ার সে বোলতে তো ছোড় নেহি দেতে?”

ধুর পাগলা, এখন আমি দশাবতার, বিনয় অবতার, কাঁটাতার, প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার…। তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “রামপাল জী দেখিয়ে, আব তো আপ চিল্লাকে বাত কর রহে হ্যায় অউর ম্যায় হাস রাহা হুঁ! কেয়া ফায়দা? চলিয়ে সরি বোল দিয়ে! হো গয়ে?” নতুন পুলুশও তখন আমার নতুন উকিল। রামপাল আর কতক্ষণ চালাবে? আসার সময় লাইসেন্সটা নিয়ে রামপালের পিঠ চাপড়ে দিয়ে চালকের আসনে ফিরে এলাম। হায়দ্রাবাদ থেকে আমার বোন বলল, “এটা সফট স্কিল!” হেঁহেঁ ডুবন্ত সূর্যটা তখন বেশ রাঙা হয়ে উঠেছে।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বলছি ফ্রিজ সারাতে পারেন? কাল আমার শ্বশুরবাড়িতে ফ্রিজ সারাতে এসেছিল কোম্পানি থেকে। আমার মেয়ে গিয়ে সটান তার জালির দরজা খুলে দিয়ে তাকে “অ্যাও” বলে হাত বাড়িয়ে দিল। সে লোকটা তো হেসেই খুন। তারপর ফ্রিজ টিজ সারিয়ে যখন বিলের কপিটা আমার শ্বাশুড়ি মাকে দিতে গেছে, মেয়ে গিয়ে তার হাত থেকে সেটা নিয়ে বলল, “তাঙ্কু” তারপর বলল, “টাটা”! লোকটা হাসতে হাসতে চলে গেল। ফিজটা নিয়েছিল কি না সেটা জানা নেই। তবে যেটা পেল সেটা আমি দিন রাত পাই বলেই জানি কতটা ধনী আমি! আমেন!

(১৩৬)


TH09_TAGORE_GRI4R8_1077687e
সব ফিসফাস হাঁউমাউ সাইজের হতে নেই পাঠক পাঠিকা। তবে মূক অন্ধত্ব নিয়ে কিছু কথা বলে চলে যাব। কাল হেলেন কেলারের ১৩৫তম জন্মদিন। ভদ্রমহিলা কি করেছিলেন সে তো ইতিহাসের পাতায় ব্রেইলাক্ষরে রচিত আছে। আজ ডিসএবিলিটি বিভাগে সেন্স ইন্টারন্যাশনাল থেকে এসে ছোট্ট এক ঘন্টার প্রেজেন্টেশন দিয়ে গেলেন তার কর্তারা। একটা সিমুলেশন প্র্যাক্টিকাল গেমও ছিল। একজনের চোখ বন্ধ থাকবে এবং তাকে কিছু না বলে চিরকুটে লেখা প্রশ্নটি বোঝাতে হবে। আমরা যারা পঞ্চেন্দ্রিয় নিয়ে দাঁত ছরকুটে পড়ে থাকি। আর সারা দিন রাত খালি ব্যর্থতার গান গাই, “কিসসু হচ্ছে না, কিসসু হবে না”, তাদের চোখ খুলে দেবার জন্য যথেষ্ট। যে যেখানে যতটুকু পারেন করুন। সহনাগরিকদের জন্য। কে কি পাচ্ছে না পাচ্ছে নিয়ে ঝগড়া বিবাদ না করে আপনি কি দিচ্ছেন সেখানে কান পাতুন। দেখবেন দুনিয়াটাই বদলে গেছে।
0083034b9d766fb2d7d83e930c7a15ac2bccc65f

ছবিতেঃ আজকের অনুষ্ঠানের কিছু অংশ এবং সঞ্জয়, যিনি রানী ও অমিতাভ বচ্চনকে স্পর্শের ভাষা শিখিয়েছিলেন তার বক্তব্য রাখার মুহুর্ত ধরা আছে। মাল্টিপল ডিসএবিলিটির মধ্যে ডেফব্লাইণ্ডনেস বা মূক অন্ধত্ব একটি জটিলতর অবস্থা। কোশিশ মনে করে দেখুন পাঠক পাঠিকারা।
11660092_10153436578915763_1610985825_o
11642153_10153436581370763_316347587_o

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এটা ফেবুতেও দিয়েছি। তবুও আরও বড় পাঠককুলের সঙ্গে শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারলাম না। প্রতিদিন সকালে আমাদের জন্য বরাদ্দ থাকে টাটকা ফুল। গতকাল ছিল রজনীগন্ধা আর হাবিজাবির সময়। আজ সকালে মালী ছেলেটি যখন না ফোটা বাসি রজনীগন্ধাগুলো ফেলে দিতে যাচ্ছিল, আটকালাম। বাকি অফিসারদের আর আমার টেবিলের ফুলগুলোকে এক বোতলে ভরে রেখে দিয়েছি। গন্ধগুলো ধীরে ধীরে ফুটছে। আরাম… আঃ
11663920_10153436480630763_902344946_o

(১৩৫)


11402381_10153397736595763_8016975454157146210_o
ব্লেড আর কলম ব্যবহার না করলে মরচে ধরে যায়। আবার অতিরিক্ত ব্যবহারেও এই দুটি ভোঁতা হয়ে যায়। তাই মধ্যপন্থা খুঁজে বার করা খুব জরুরী। কিন্তু সাম্যের গান গাহিয়া ভারসাম্য রক্ষা করতে তো সমগ্র মানবজাতিকে ভগা শেখান নি। তাই পা হড়কে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। ক্রিকেটে বোলারদের অধিনায়ক করলে তারা হয় বেশী বোলিং করে নয় তো কম বোলিং। বলি ভারসাম্যের বলি তো যত্র তত্র সর্বত্রই দেখা যায়। তাহলে আর আলাদা করে ফিসফাসের লেখককে দোষ দিয়ে কি করবেন বলুন? তারচেয়ে বরং সদ্য সমাপ্ত জামশেদপুর-কোলকাতা-দীঘা ত্রিকোণ প্রেম সফর নিয়ে কিছু মুখরোচক আর কিছু মিইয়ে যাওয়া গল্প বলি।

কথায় আছে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। সারা বছর ধরে স্বচ্ছতা নিয়ে মাতামাতি করে হঠাৎ করে মোদী সরকারের যোগের নামে হুটোপাটি করে ল্যাজে গোবর অবস্থা। সরকারি কর্মচারীদের কিসসু করার নেই হ্যাঁতে যদি হ্যাঁ মেলাতেই না পারলে তাইলে আর আমলা হলে কেন? সাধারণ মানুষের অবস্থা তো আরও করুণ।

কোনও এক অজ্ঞাত কারণে টিকিট বুকিং দু মাসের জায়গায় চার মাস আগে থেকেই করা যাবে। আরে বাবা সফর সূচী প্রধানমন্ত্রীরই চার মাস আগে পাকা হয়ে ওঠে না আর আমরা তো নশ্বর মানুষ। তাই প্রাপ্তি ওয়েটিং লিস্ট আর উৎকণ্ঠা। আর সকলের মতই ততকাল বুকিং-এর টোটকা এখনো ফিসফাস লেখক বার করে উঠতে পারে নি বলে জনসমুদ্রেই বিলীন হন।

এবারের গরমের ছুটি কাটাবার শুরু করার কথা ছিল জামশেদপুর থেকে, কিন্তু টিকিট কাটছি কাটব করে সময় কেটে যায়। আর লাইন সংরক্ষিত টিকিট পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় ওয়েটিং লিস্টে। প্রথমে বিশেষ পাত্তা না দেওয়া, “ও হয়ে যাবে” ভেবে। তারপর ধীরে ধীরে যখন সময় দাঁত নখ বার করতে শুরু করে তখন, দাদা ধরার তাড়া। সাধারণ ক্ষেত্রে নিজের জন্য কখনই ভিআইপি কোটার ব্যবহার করি না। কিন্তু এবার তো চাপ বাপ বাপ বলে ডাক দিয়েছে। শ্বশুরবাড়ির দেশে যাব আর টিকিট কনফার্মড না হলে মুখ পুড়বে। তাই বাধ্য হয়েই পিএনআর নম্বর দিয়ে পাঠালাম যথাস্থানে। যাত্রার ঠিক দুদিন আগে খবর এল, নাও হতে পারে।

মরেছে! জামশেদপুর থেকে কোলকাতা, কোলকাতা থেকে দীঘা, দীঘা থেকে কোলকাতা এমন কি যাবার আগের আগের দিন কোলকাতা থেকে ফেরার টিকিট যা কিনা শতাধিক ওয়েটিং লিস্টে ছিল তাও কনফার্মড হয়ে গেল। অথচ শ্রী গণেশই গোঁসা করে বসে। তাও তদ্বির তকদির লাগিয়ে ব্যাগ গুছোতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

তারপর আমার অফিসের বড় বস আবার বলে বসলেন যাবার আগের দিন নাকি পাটনা যেতে হতে পারে। আমি অনেক করে বোঝালাম যে প্যাকিং ট্যাকিং কিসসু হয় নি। ছোট বাচ্চা নিয়ে যাওয়া টাওয়া চাপ হয়ে যাবে। শেষে নিরস্ত্র করা গেল। পরে অবশ্য জানা গেল যে অনুষ্ঠানের পূর্বালোকনের জন্য আমাকে পাঠানো হচ্ছিল সেই অনুষ্ঠানটিই বাতিল হয়ে গেছে আদর্শ আচার সংহিতার পাল্লায়। বিধানসভা নির্বাচন বলে কথা। হুঁ হুঁ বাওয়া সবার উপরে কমিশন সত্য তাহার উপরে নাই।

তবুও আশায় বুক বেঁধে বাক্স প্যাঁটরা বেঁধে আগের দিন ট্যাক্সি ফর সিওরে বুক করলাম। মেল এল স্টেশনে যাবার ট্যাক্সি আসবে অথচ মেসেজ এল আসবে না। দ্বিধা কাটাতে যাত্রার দিন সকালে তাদের গ্রাহক পরিষেবার ফোন করলাম। তারা আশঙ্কা সত্যি করে দিল। শেষে ওলা ক্যাবস বুক করলাম। যাবার ঠিক ১৫ মিনিট আগে ড্রাইভারের বিস্তৃত বর্ণনা এল, সেই অনুযায়ী ফোন করলাম। সে বলে আমার গাজিয়াবাদ ঢোকার পারমিট নেই। খেলে যা। তার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই রিগ্রেট এসএমএস এসে গেল। ওলা অপারগ।

শেষে চার্ট তৈরী হবার আগেই যাত্রা শুরু করলাম অটো করে। যেতে যেতে এসএমএস এল দুটি টিকিট কনফার্মড হয়েছে আর আমার ছেলেরটি হয় নি। সে তো বিদ্রোহ করে বসল। তাকে ছাড়া আমরা যেতে পারিই না। তাকে বুঝিয়ে বাঝিয়ে ফোন ধরলাম বিশেষজ্ঞদের। অনলাইন বুকিং-এ তো আবার ওয়েট লিস্টেড টিকিট সরাসরি রিফাণ্ড হয়ে যায়। তা নানা মুনির নানা মত! একজন বলে, “সুপারফাস্টের জেনারেল টিকিট কেটে চড়ে পড়” ভাল কথা। তা রাজধানীর তো জেনারেল থাকে না। কে বোঝায় কাকে! আরেক গন্যিমান্যি বলেন, “এমনি এমনি চড়ে পড়ো, টিটিকে বলবে তুমি জানতে না”। ইল্লি আর কি, টিটি তো বোকা পাঁঠা আর আমরা চকিত চপলা হরিণী।

তা শেষে সেই বাতলে দিল, যদি হেড অফিস কোটা থেকে হয়ে থাকে তাহলে কিচ্ছু করতে হবে না। অতিরিক্ত চাহিদা থাকায় সবগুলো হয় নি। তা টিটি এসেও দেখলাম সেই কথাই বলল। এক দিক দিয়ে নিশ্চিন্ত। কিন্তু ভুবনেশ্বর রাজধানীর বার্থগুলি আবার ছোট ছোট। একটায় পার্শ্ববর্তিনী মেয়েকে নিয়ে আর একটায় আমি আর ছেলে। দুজনেই দুজনকে কষে লাথি গোঁত্তা মরে গত বারো বছরের যত রাগ আছে মিটিয়ে নিলাম। আর মেয়ে সেই ফাঁকে পুরো কামরা জুড়ে জমিদারী পরখ করে শেষমেশ বই খাতা পেন্সিল নিয়ে ট্রেনের মেঝেতে উবু হয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করতে লাগল। এই ভাবেই পৌঁছে গেলাম জামশেদপুর।

অবশ্য রাজধানীর খাবার দাবারের অবস্থা কহতব্য নয়। শিয়ালদা রাজধানী আগে অন্তত পুঁটি মাছের ফ্রাই দিত। ভুবনেশ্বর রাজধানীতে তো রাতের কন্টিনেটালে ভেজিটেবল সেদ্ধই দিয়ে দেয়। ব্রেডের কথা জিজ্ঞাসা করলে বলে সাড়ে দশটায় কানপুর এলে ব্রেড দিতে পারবে। শেষে স্যুট বুটের সঙ্গে তিলক কেটে সাদা দই খেয়েই পেট ভরাই।

জামশেদপুরের পুরনো তারগুলির সঙ্গে এবার জোড়া লাগল নতুন তার বারিন দার সঙ্গে দেখা। তারপর অবশ্য বিশেষ ভোগান্তির গল্প হল না, শুধু মাত্র যে রাতে হাওড়া তার দুয়ার খুলে দিল ঝড়ে সে রাতে ভিজে ভিজে বাড়ি এসে পৌঁছলাম সাড়ে দশটায়। আহা কোলকাতা আমার, ছেড়ে দিলেও শহরটা আমায় ছাড়ে না। কোথাও না কোথাও আস্টেপিস্টে জড়িয়ে রাখে অর্জুন গাছের মত।

তাই আমি এলে সৃষ্টিসুখের বইপ্রকাশ, পুরনো কূট সাহিত্যের বন্ধুদের সঙ্গে জিটি আর স্কুলের সহপাঠী পাঠিনীদের সঙ্গে আড্ডা তো বাঁধাই থাকে। সঙ্গে কিছু নতুন বন্ধুর পুরনো হয়ে যাওয়া আর পুরনো বন্ধুদের নতুন করে ফিরে পাওয়া। এর সঙ্গেই থাকে আমাদের শিকড়ের টান। যে সব শিকড়গুলো আমাদেরকে ঘিরে ধরে বড় করে তুললো তাদের বৎসরান্তে একটা সন্ধ্যা, একটা সকাল বা একটা বিকেল দিয়ে জোরদার করে তোলা। বলে যাওয়া আবার আসব আমরা আবার একসঙ্গে বসে কিছুটা সময় জীবন কাটাব আমরা।

রূপঙ্কর দা-র সঙ্গে গল্প লেখা গদ্য লেখা নিয়ে হুল্লাট আড্ডা, কিশোর দা, কৌশিক দা, তমাল, অতনু, ইন্দ্রনীলদা, সুবীরদা, সোমা, রাজা দা, বাসু দা, শুদ্ধ, ইন্দ্রাণী, হরি দা, কোয়েলি, সুস্মিতা দি, অমিতাভ, বক্সী, কেয়ার বইপ্রকাশ, সামরানদির পুরস্কার প্রাপ্তি, সরোজ, সিদ্ধার্থ- মিঠুন পেরিয়ে স্কুলের গণ্ডির এক্কা দোক্কা।

এর মধ্যেই মনে থাকে অ্যাকাদেমি চত্বরে রূপঙ্কর দার সঙ্গে আড্ডার সময় হঠাৎ পেনের দরকার পড়লে পাশের টেবিলের সদ্য তরুণীটি বলে ওঠে আমার বই পড়তে খুব ভালো লাগে। আর বই উপহার পেয়ে কিশোরীর মত খুশীতে ভরে ওঠে সে। বলে, আমি নিশ্চয় জানাবো কেমন লাগল। আমার বই কাউকে দিই না। আগলে রাখি! বইয়ের গন্ধটাই যে আলাদা হয়।

এর মাঝে প্রিয়জনের অসুস্থতা আবার সেই বয়স্কদের অসহায়তা সামনে এনে দেয়। কথায় বলে সরকারী পেনশনপ্রাপকরা নাকি সবথেকে সুখী সরকার তাদের জন্য পেনশন দিচ্ছে, স্বাস্থ্য সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু কোলকাতা ছেড়ে পরবর্তী প্রজন্ম যে প্রবাসে পাড়ি জমায় তখন তাদের সঙ্গ কে দেয়? আর সরকারী স্বাস্থ্য পরিষেবার পেয়ারায় যে পোকাগুলো বাস করে, সেগুলোকে যত্ন করে সরিয়ে দেবার লোকের বড়ই অভাব। খোঁজ নিন পাঠক পাঠিকারা, খোঁজ নিন আমাদের আগের প্রজন্ম কেমন আছেন? আমাদের মুখের দিকে তাকিয়েই তাদের জীবন কাটছে নাকি সেখানেও অন্ধকার?

ফিরে আসার সময়, ট্রেনের মধ্যেই দুটো ঘটনা মনে থেকে যাবে। শিয়ালদায় নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বার্থে গিয়ে দেখি সেখানে সর্দারনি হাজার খানেক বাক্স প্যাঁটরা আর খান দশেক কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে বসে আছে। বড় গলায় বললেন তাদের নাকি চারটে বার্থ আছে। আমি বললাম আমাদেরই তিনটে আছে তো তাঁদের চারটে কি করে হয়? হয় হয় zaনতি পার না। দুই আর দুইয়ে পাঁচ হলে চার আর তিনে ছয় হবে না কেন? সন্দেহ হতে চার্টে গিয়ে দেখি কোন এক মহাপাত্র এবং পুরকায়স্থ আছেন আর আছেন এক মালাকার, তিনি আবার দূর্গাপুর থেকে উঠবেন। সে কথা বলতে সর্দারনি বললেন তিনি জানেন, তাঁদের বার্থ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে বলে সর্দারগুলো সেগুলো খুঁজতে গেছে। আমি বললাম সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন “তো?” “ধিরজ রাখো, অন্দর অন্দর নিকল জায়েঙ্গে!” আমি বললাম “আর আমরা?” তিনি তেড়িয়া হয়ে বললেন, দশ মিনিট রুকনে সে কেয়া ট্রেন নিকল জায়গা?” অকাট্য সর্দারি যুক্তি। নীচে নেমে ওদের মধ্যেই যে একটু পাগড়ি খোলা মুক্ত হাওয়া ছিল তাকে বলতেই পরিষ্কার হল কেসটা। এদের বুকিং বি ১ এবং ২য়ে। অতটা পথ পেরতে গেলে হাঁপিয়ে যাবে বলে সর্দারনি ইচ্ছে মতো জায়গা দখল করে বসে আছে। শেষে কামরা শুদ্ধ লোককে রেহাই দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়ে সর্দারকুল বিদায় নিল। মহাপাত্রবাবু বললেন, যে তিনি বেজায় ঘাবড়ে গেছিলেন। তিনি নিজের জায়গায় বসতে যেতেই নাকি সর্দারনি তাকে হুকুম করেছিলেন যে তাদের বার্থ বি১এ আছে এবং মহাপাত্র বাবুকে সেখানেই যেতে হবে। শেষে আমি মিষ্টি কথায় বলতে নাকি তিনি একটু সাহস পেলেন।

আর দুটি বিজাতীয় বাচ্চা চৌবাচ্চার মতো বাঁদরামো করে যাচ্ছিল। তাদের মা এক একবার বকছে আবার তারপরেই তারা কান্না জুড়লে ভোলাতে গিয়ে বলছে মার মুঝে। বোজো ঠ্যালা। তাদের মা একবার আমায় বললেন, “ভাইয়া ডাঁট দিজিয়ে জোরসে! নেহি তো শুনেগা নেহি!” তা সে আমার কেন। এক আরপিএফ জোয়ান বন্দুক দেখালেও তারা হ্যা হ্যা করে। শেষে রাত দশটায় পার্শ্ববর্তিনীর সিংহি নাদে তারা চুপ করে।

তারপর? তারপর আর কি? ট্রেন ফেরার পথে তুমুল বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে পড়ে সাহিবাবাদে, নেমে পড়ে ট্যাক্সি সার্ভিস থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সময়ের আগেই বাড়ি। কিন্তু পৌঁছতে পার্শ্ববর্তিনীর বৃষ্টিবাবদ নতুন মোবাইল হারানো এবং তারপর বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের রক্তদান শিবিরে রক্তদান করে পাকাপাকি দিল্লি মোডে ফিরে আসা।

সেদিন আবার যোগা দিবস। সারা জীবন ধরে যারা লাভ ক্ষতির হিসেব রাখতে পারে না সেই চল্লিশ হাজার ভারতীয় রাজপথে জড় হয়ে সুস্থ শরীরকে ব্যস্ত করে তোলে। প্রায় সত্তর বছর পেরিয়েও দেশের মেরুদণ্ড সোজা হল না। স্টান্টবাজদের পাল্লায় যেন এক একুশে জুনেই হয়ে যাবে! যাই হোক স্বপ্ন দেখতে তো স্বচ্ছ ভারত সেস লাগে না। তাই এই আকালেও চলতে থাকুক স্বপ্ন দেখা আর চলতে থাকুক ফি বছর শিকড়ের কাছাকাছি ফিরে যাওয়া। শিকড়ের টানটাই তো আমাদের উড়তে দেয় আকাশে ঘুড়ির মতো। লাটাই গোটাতে গোটাতে যেন সুতো ছিঁড়ে না যায়। মাঞ্জাটা ভাল হওয়া চাই মামা! বৃষ্টি আসবেই…
11402381_10153397736595763_8016975454157146210_o

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ সারা ময়দান মার্কেট ঘুরেও একটা দরের মোহনবাগান জার্সি পেলাম না। ক্লাবগুলোর এবার ভাবার সময় হয়েছে মার্চেন্ডাইজিং নিয়ে।

(১৩৪)

 আমাদের সূর্য মেরুন ,
নাড়ির যোগ সবুজ ঘাসে ,
আমাদের খুঁজলে পাবে –
সোনায় লেখা ইতিহাসে ..
আমাদের রক্তে খেলা ,
খেলার ছলে বিপ্লবীদের –
আমরাই কখনও বুক ,
কখনও দল ,
কখনও দেশ …..
জন্মেছি মাথায় নিয়ে খেলয়ারি পরোয়ানা ,
বুকের এই কলজে বলে লড়াই করো হার না মানা ,
আমাদের বুকের ভেতর ,
সবুজ মেরুন এক ঝাঁক বান ,
আমরাই মোহনবাগান ,
মোহনবাগান।।
326997-mohun-bagan-logo ‘এগারো’ সিনেমাটা দেখতে গিয়ে সিনেমার গুণাগুণ বিচার না করে একবার আবেগ দিয়ে ভাবতে গেলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। স্পাইক বুট পরিহিত বড় বড় চেহারার গোরা দল ইস্ট ইয়র্কের সঙ্গে ১৯১১ সালের ফাইনালে শিবদাস ভাদুড়ির নেতৃত্বে মোহনবাগানের জয়টা জাতীয় গৌরবগাথায় পর্যবাসিত হয়েছে। যদিও পরবর্তী সাফল্য আসতে আসতে ১৯৩৯ হয়ে যায় মোহনবাগানের। তবু মোহনবাগান আর তার চির প্রতিদ্বন্দ্বী ইস্ট বেঙ্গলের ইতিহাস বাঙালীর বুকের খুব কাছাকাছি। যে কোন বাঙালীকে জিজ্ঞাসা করুন, যার তারুণ্য বা যুবাবস্থা কেটেছে ৭০এর দশকে। নিদেনপক্ষে আশির দশকেও যারা হামাগুড়ি দিয়েছে তারা পর্যন্ত মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল , ঘটি বাঙাল, ইলিশ চিংড়ি নিয়ে নরক গুলজার করতে ছাড়বে না।

একটা বেড়ে সিনেমা এসেছিল, ‘মোহনবাগানের মেয়ে’ তার ফিরতি জবাব হল ‘ইস্টবেঙ্গলের ছেলে’। দ্বিতীয় সিনেমাটার কথা জানেন না বুঝি? একটু ঘেঁটে দেখুন আর্কাইভ, চিরঞ্জিতের এই বেওয়ারিশ ফিলিমটা আপনার নজরে পড়েই যাবে।

আমার বাড়িতে ক্রিকেট টা যতটা ছিল ফুটবলটা অতটা না হলেও বেশ ছিল। অন্তত মোহন বাগান তো ভাল ভাবেই ছিল।

সেই কোন ষাটের দশকে আমার বাবা মোহন বাগানে ক্রিকেট খেলেছিলেন সেই ঘিয়ের গন্ধ আমার ছোটবেলায় খুব ভালকরেই গরম ভাতে ঘোরাফেরা করত। আমার ভাই যখন হয় নি তখন বাবার হাত ধরে মোহনবাগান তাঁবুতে যে কতবার গেছি তার ইয়ত্তা নেই। সেই যে সেই তাঁবু, যার গেটে যেদিন মোহনবাগান মাঠে খেলা থাকত। এক কালো চশমা স্যুট বুট পরিহিত ভদ্রলোক আগলে দাঁড়িয়ে থাকতেন যাতে যে কেউ তাঁবুতে ঢুকে পড়তে না পারেন। ধীরেন দে।

কিন্তু ১৯৮০ সালের ১৬ই আগস্ট ইডেন গার্ডেনের সেই অভিশপ্ত ইব্লকের গ্যালারি আমার ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান ম্যাচ মাঠে গিয়ে দেখার ব্যাপারে অলিখিত গণ্ডি টেনে দিয়েছিল। আর সেই গণ্ডি অতিক্রমের দূর্মতি আমার হয় নি। খেলাটা আমি টিভিতে দেখেছিলাম। টিকিট বণ্টনে গড়বড় ছিল। এক লাখ দর্শকের চিৎকারের মধ্যে ইস্টবেঙ্গলের দিলিপ পালিত বিদেশ বসুকে একটা জঘন্য ফাউল করে বসে। তার পর থেকেই গ্যালারিতে আগুন জ্বলতে শুরু করে যা দাবানলের রূপ নেয় খেলা শেষে। ১৬টা তাজা প্রাণ… হাজার লোকের পায়ের চাপে হারিয়ে গেল খোকা… মান্না দের গানটায় চোখ ভিজে যেত পাঠক পাঠিকারা… বয়স তখন অল্প হলেও।

মোহন বাগান দলের আমার প্রথম প্রিয় খেলোয়াড় ছিল এক মালায়লি। না বিজয়ন নয়, বিজয়নের আগে যে মালায়লি বাংলা জয় করেছিল সে হল জেভিয়ার পায়াস। পায়ে বল পড়লেই উদ্বেল হয়ে পড়ত মোহনবাগান জনতা। কিন্তু ক্রিকেট খেলাটা শুরু করার আগে স্বপ্ন দেখতাম শিবাজী ব্যানার্জি হবার। ৭৭এর পেলের পেনাল্টি বাঁচাবার পর থেকেই শিবাজী ব্যানার্জি লেজেন্ড। প্রশান্ত সিনহার টেকনিক, ভাস্কর ব্যানার্জীর সাহস বা তরুণ বসুর গ্যাদারিং না থাকলেও পেনাল্টি হলেই শিবাজী উঠে আসতেন সকলের হৃদয়ে। সেই একটা পোস্ট ছেড়ে রেখে সে দিকে মারতে বাধ্য করা আর অবধারিত সেভ।

তিরাশি সালের এক বিকালে টাইব্রেকারে মোহনবাগান শিল্ড সেমিফাইনালে হেরে গেল এরিয়ানের কাছে। বড়মাসির বাড়িতে রেডিও শুনছিলাম। ছুটে গিয়ে চৌকাঠে মাথা ঠুকে মাথা ফুলিয়ে ফেলেছিলাম বলে যে বকা জুটেছিল তা হেরে যাবার দুঃখের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

আশির সেই অভিশপ্ত বিকেল আর বিরাশির বিশ্বকাপ ফুটবল সরাসরি টিভিতে দেখার পর থেকেই কেন জানি না স্থানীয় ফুটবল নিয়ে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের একটা বিরাট অংশের ক্রেজ কমতে শুরু করে। আশির দশকের শেষের দিকে পিকে ব্যানার্জি শুরু করলেন সিরিয়া এ-র খেলা দেখানো। ব্যাস আর যায় কোথা। মোহন বাগান ইস্টবেঙ্গলের পাগলামিটা প্রান্তিক হয়ে দাঁড়ালো। আমিও যে খুব বেশী মাঠে যেতাম তা নয়।

ততদিনে তো যুবভারতীও ছন্নছাড়া হতে শুরু করেছে। তারপর সেই পর্ব এল। যখন আমারই ভাইটা বড় হচ্ছে আর তার চারপাশে ইস্টবেঙ্গলের স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছে। মোহন বাগান তলিয়ে যাচ্ছে। এমন কি প্রথম জাতীয় লিগেই স্থান হল না মোহনবাগানের। আবিষ্কার করলাম ঘরের মধ্যেই বিভীষণ ইস্টবেঙ্গল সমর্থক। কি যন্ত্রণা হয়েছিল বলে বোঝাতে পারব না।

তার পর আর কি তিনটে জাতীয় লিগ জয়। আমি তখন দিল্লিতে। শেষবার বাবলু দার কোচিং-এ মনে আছে দল দুর্দান্ত না হলেও প্রচুর অ্যাওয়ে ম্যাচ এক গোলে জিতে যাচ্ছিল ব্যারেটো আর জেদের উপর ভর করে। শেষ ম্যাচে চার্চিল ড্র করলেই চ্যাম্পিয়ন আর আমাদের জিততে হবে। স্যালিউ ব্রহ্মতালু দিয়ে গোল করল। আমি অফিস থেকে ফিরে এসে বাংলা চ্যানেল খুলে জানলাম। অবিশ্বাস্য আনন্দ। উপভোগ করার জন্য আশেপাশে তো কেউ নেই। খালি আমার তদানীন্তন বাড়িওলা মোহনবাগানী। ফোন কর বাড়িতে ফোন কর বাড়িওলাকে। ব্যাস ওইটুকুই।

তাই ১৩ বছরের আই লিগের খরা আর ৫ বছরের ট্রফির খরা কাটিয়ে উঠতে যখন তীরে এসে তরী ডোবার অবস্থা হচ্ছে। তখন শুনলাম দিল্লির মেরিনাররা আহায় বুক বেঁধে চিত্তরঞ্জন ভবনে এক সঙ্গে খেলা দেখার জন্য বড় স্ক্রিন প্রোজেক্টরের ব্যবস্থা করছে। যা থাকে কপালে, অমিতাভ দাকে বললাম ছেলেকে নিয়ে যাব। ছেলে তো আই লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়া দেখতেই পায় নি তার জীবনে। যেমন ব্রাজিল বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন তার হবার বছরেই হয়েছিল। বাবার দেখাদেখি সেও যে ব্রাজিল আর মোহনবাগান। যেমন আমার ভাইটা ছিল আজহার আর বরিস বেকার আর ব্রাজিল।

অমিতাভ দা জানালেন। ফিসফ্রাই আর চা আর বিরিয়ানিও থাকছে। আমি বললাম দেখবেন যেন সব উৎসব মাটি না হয় তাহলে হবিষ্যি খেতে হবে। দুপুরে বাড়ি থেকে বেরোবার আগে কি পরি কি পরি। মেরুন আর সবুজ একসঙ্গে কিছুই নেই। তো মার গুলি মেরুন ধুতি আর সবুজ পাঞ্জাবী। ছেলে বলল তার খালি সবুজ টি শার্ট আছে। তাই সই। গালে সবুজ মেরুন কপেল সবুজ মেরুন তিলক কেটে দিয়ে হাজির হলাম চিত্তরঞ্জন পার্কে চিত্তরঞ্জন ভবনে। এবার খেলা শুরু পালা।

এদিক ওদিক অচেনা মুখের ভিড়ে চেনা মুখও হাজির। তার আবার সহধর্মিনীর জন্মদিন। তা ঘটনাটা পরে শুনেছিলাম। মিয়া বিবির তর্ক চলছে, বউয়ের জন্মদিন বছরে একবার আসে আর মোহনবাগানের আইলিগ/ জাতীয় লিগ তেরোবছরে একবার! এ যে মহাকুম্ভেরও এক কাঠি বাড়া। সাতটার সময় ফেরা যাবে না! কথা বন্ধ তো বিকালে তনু ওয়েডস মনু হি সই! কিন্তু সেটাও কায়দা করে চিত্তরঞ্জন পার্কের কাছাকাছি সাড়ে চারটেয় রাখা গেলে কেমন হয়? সিনেমা তো সাড়ে ছটায় শেষ! হ্যাঁ রে তুই বলছিলি না কোথায় যেন মোহনবাগানের খেলা দেখাবে! আহা এই জন্যই তো রাজযোটক মামা। বাই ডিজাইন আর বাই হুক অর ক্রুক! এই সুযোগ কি মিস করা যায়? তাই চিত্তরঞ্জন ভবন! 11209415_10153373088970763_26967760107449995_n
এদিকে ব্যাঙ্গালুরুতে প্রবল বৃষ্টি, খেলা শুরু সময়ও টিপটাপ চলছে। ভাষ্যকার বললেন কুড়ি বছরে নাকি এরকম বৃষ্টি দেখেন নি ব্যাঙ্গালুরুতে। বড় স্ক্রিনে মাঠে বসে খেলা দেখার শখ ঘোলে মেটাচ্ছি। কিন্তু সবই তো ব্যাঙ্গালুরুর দর্শকদের দেখায়। মোহন বাগান সমর্থকরা যে টিভি স্ক্রিনের বাম দিকে বসে আছে তাদের তো কই একবারও পাত্তা দিচ্ছে না ক্যামেরা? তবে তাতে কি? খেলা মাঝমাঠে তুল্যমূল্য। বল নিয়ন্ত্রণে রাখা সমস্যা হচ্ছে। ব্যাঙ্গালুরু চাপে বোঝা যাচ্ছে আর তাদের কোচ অ্যাসলে ওয়েস্টউড সেরা খেলোয়াড় সুনীল ছেত্রীকে বাইরে রেখে বোধহয় হাত কামড়াচ্ছেন। গলার শির কাঁধের মাসল ফুলিয়ে চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছেন। উল্টো দিকে সঞ্জয় সেন নির্বিকার। সোনি নর্ডের শট বার কাঁপিয়ে ফিরে এল। আশঙ্কা! উল্টোদিকে জন জনসন লিংডোর কর্ণার থেকে মাপা হেডে গোল। আমরা হায় হায় করে উঠলাম। কিন্তু তারপরেও আশা ছাড়া নেই।

মাঝে ফিশফ্রাই আর লেবু চা চলছে। কিন্তু তাতে মন নেই কারুর। হাফটাইমে হাডল। সংকল্প শপথ বোয়া কাতসুমি সোনি প্রীতম শিলটনদের। হাফটাইমে বাসু দাকে ফোনে ধরলাম। এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার মুখোমুখি হওয়া থেকে খুব ঘনিষ্ঠ কেউ কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে। সারাদিন হাসপাতালে থেকে সন্ধ্যায় ফিরেছেন ক্লান্ত মন নিয়ে। বললেন, ‘আর বোধহয় হল না!’ বললাম ‘দেখই না কি হয়?’ খেলা শুরু হল আর ব্যাঙ্গালুরুতে বর্ষারও। বল নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। তাও মোহনবাগান খেলা নিয়ন্ত্রণ করছে, মুহুর্মুহু আক্রমণ। মিসের পর মিস মাথা চাপড়ানি হা হুতাশ। কিন্তু মনে হচ্ছে হয়ে যাবে। টেনশন ধীরে ধীরে বুকের পাঁজর বেয়ে গলার কাছে। আশি মিনিট, বলবন্তের পরিবর্তে জেজে। পঁচাশি মিনিট, সোনির শট দুই ডিফেন্ডার ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁচাল। পর মুহূর্তেই ধনচন্দ্রের হেড ব্যাঙ্গালুরুর গোলকিপার বাঁচাল। সাতাশি মিনিট আবার কর্ণার এবার মাপা কর্ণার সোনির, বেলো রজাক, যার উচ্চতা প্রশ্নাতীত নয় সবার থেকে লম্বা হয়ে গিয়ে সেদিন হেড করল দ্বিতীয় পোস্টের মাটিতে। বল জালে জড়িয়ে যেতেই উত্তাল কোলকাতা উত্তাল দর্শক উত্তাল আমরা। দৌড়োদৌড়িতে কেবলের সেটটপ বক্সই গেল পড়ে। কোনরকমে আবার লাগিয়ে শুরু হল। ৫ মিনিট ইনজুরি টাইম। অমিতাভ দা বাইরে পায়চারি করছেন। যে যেখানে সেখান থেকে যেন না নড়ে। কার্তিক কোথায়? তুকতাক কার্তিক? আরে সবাই আমরা কার্তিক হয়ে গেছি। জলের বোতল চেয়ারে নয় মাটিতে নামাও কাকা। উঠে দাঁড়িও না। বসে থাক যেখানে ছিলে। বাইরে গেছ তো ভিতরে নয় বৌদি। বল শিলটনের গোলকিক থেকে মাঝমাঠে রেফারির হাত উঠছে। আমাদেরও হাত… ‘পিপ পিপ পিইইইইইইইইইইইইইইইই’ উল্লাসে ফেটে পড়ছি সবাই। দৌড়ে গিয়ে সবুজ মেরুন পতাকাটা ধরে নিজেকে শান্ত করছি। 1620752_10153373089090763_8048590252821093025_n 11390227_10153373089055763_2705089799655946378_n
এত আবেগ নিজে খেলার সময় তো থাকে না! শুধু বস্তাপচা ভারতের বস্তাপচা ফুটবলে মোহনবাগানের জন্য আবেগ? না সে আবেগ ভারতের জন্যও হয়, ব্রাজিলের জন্যও হয়। কিন্তু ১৩ বছর বনবাসের যন্ত্রণা নিয়ে শুধু ক্লাবের জন্য আবেগ যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল সেদিন। বাসুদা, হরিদা, পবিত্র সবার উপরে বাবাকে ফোন করে আনন্দ ভাগ করে নিলাম। এ আনন্দ তো একা খাওয়া যায় না। উপস্থিত সবাই মিলেই বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে বাড়ি ফিরছি। ভেসে যাক আদরের নৌকা। চিংড়ির মালাইকারি আর দইপোনা থাক খাবার টেবিলে।

ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের দুঃখটা বুঝি, কিন্তু ভাই হিংসে কোর না তোমারও হবে! তখন না হয় আমরাও অভিনন্দন জানাবো। ততদিন বরং এই গানটা আরেকবার গাইঃ https://www.youtube.com/watch?v=Dw97-ZNaSEs