(১৩২)

যখন ফিসফাসের একখান পোস্ট লেখার জন্য সকাল থেকে কম্পু মুখে করে বসতে হয় পড়াশুনোর জন্য তখন কেমন মনে হয় না যে ফিসফাস জাতে উঠছে? বেশ একটা রাশভারী বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব জাগে আর বইটাও পেপারব্যাক ছেড়ে হার্ড বাউণ্ডের রাস্তায় ঘুরপাক খায়।

যাক সে কথা, প্রথমে কিছু ইতিহাস ঘেঁটে ঘ করি। তিব্বত গেছেন তিব্বত? আরে এই কোলকাতা হয়ে ডায়মণ্ডহারবার হয়ে তিব্বত। এমা হযবরল পড়েন নি? নিশ্চয় পড়েছেন? কিন্তু তিব্বতের কেসটা কি বলুন তো? ছোটবেলায় পড়া সাধারণ জ্ঞান উগড়ে দিই বরং! তিব্বতের রাজধানীর নাম লাসা। তিব্বতকে পৃথিবীর ছাদ বলা হয় কারণ বিশ্বের সর্বোচ্চ মালভূমি তিব্বতেই। আর লাসাকে আবার নিষিদ্ধ শহর বলা হয়। সে সব মেলা ব্যাপার স্যাপার।

তিব্বতের কথা আসলেই আসে দলাই লামা আর ধরমশালার ম্যাকলিওডগঞ্জের কথা। এক ভদ্রলোক ১৯৫৯ থেকে নিজের দেশ থেকে পালিয়ে এসে ভারতে বসে আছেন আর ১৯৮৯তে নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়ে গেছেন। কিন্তু দলাই লামা কে আর কি? এসব ঘাঁটতে বসে দেখা গেল দলাই লামা হল তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু। বর্তমান দলাই লামা ১৯৩৭ থেকে দলাই লামার আসন গ্রহণ করেছেন এবং ওনার আসল নাম ‘জেতসুন জাম্পেন নগাওয়াং লবসাং ইয়েসে তেনজিং গ্যাতসো’ বা সংক্ষেপে তেনজিং গ্যাতসো। উনি যখন দলাই লামার আসন গ্রহণ করছেন তখন ইতিমধ্যেই তিব্বত চীনের অভ্যন্তরস্থ ধরি মাছ না ছুঁই পানি মার্কা জায়গা হয়ে আছে।

আসলে হয় কি, তিব্বতিদের বিশ্বাস অনুযায়ী দলাই লামা এবং সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড পানচেন লামা দুজনেই যুগে যুগে পুনর্জন্মের মাধ্যমে ফিরে ফিরে আসেন। সে এক এলাহি ব্যাপার দলাই লামা মারা গেলে কিছু অলৌকিক সূত্রের মাধ্যমে স্থান নির্ণয় করে সেই এলাকার বাচ্চা কাচ্চাদের কাছে দলাই লামার খেলনাপাতি আরও কিছু ফলস মার্কা খেলনাপাতি নিয়ে যাওয়া হয়। পূনর্জন্ম প্রাপ্ত লামা ঠিক নিজেরটা চিনতে পারেন। আরে সেই যে আমাদের অন্নপ্রাশনে যেমন টাকা, মাটি আর পেন দেওয়া হয় থালা ভরে আর বাচ্চাগুলো নিজের নিজের ভবিষ্যৎ ছোট ছোট দু হাতে নির্ধারণ করে সেই রকম ব্যাপার।

তা তেনজিং গ্যাতসোও নাকি নিজের খেলনা চিনতে পেরেছিলেন। ব্যাস আর যায় কোথা। তাকে তুলে এনে ঠিক মতো পড়াশুনো করিয়ে একদম মাথায় তুলে দেওয়া হয়। সেই যে এক হ্যাভেলসের বিজ্ঞাপন মনে আছে? ‘রিনপোছে’ ‘রিনপোছে’? সেই রকম।

তা বর্তমান দলাই লামার আগের ভদ্রলোক তো ১৯১৩ সালে মওকা বুঝে তিব্বতকে স্বাধীন ঘোষণা করে দেন ১৯৩৩এ তাঁর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত। এর মাঝে ১৯২৪এ সিমলাতে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার, তিব্বত ও চীনের মধ্যে চুক্তি সম্পূর্ণ হয় নি চীন মাঝ পথে চলে যাওয়ায়। তার পরে প্রায় দশ বছর চীনকে তিব্বতে ঢুকতে দেওয়া হত না। কিন্তু তিব্বতেও সমস্যা লেগে ছিল।

তার প্রধান কারণ ধর্মকে হাতিয়ার করে সামন্ত্রতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। যার ফলে ছুটকো ছাটকা বিদ্রোহ শুরু হয়। আর চিয়াং কাই সেকের হাত ধরে ১৯৪২এ আর শেষে মাও সে তুং-এর হাত ধরে ১৯৪৯এ তিব্বত দখলের প্রয়াস শুরু হয়। শেষমেষ ১৯৫০এ চীন তিব্বতকে চীনের অংশ বলে ঘোষণা করে কিন্তু লাসা সহ আর আশেপাশের অঞ্চলকে স্বশাসিত প্রদেশ হিসাবে চিহ্নিত করে রাখা হয়।

কিন্তু দড়ি টানাটানি চলছিলই। শেষে ১৯৫৯ সালে লাসার বিদ্রোহকে হাতিয়ার করে চিন পাকাপাকিভাবে লাসা দখল করে এবং দলাই লামা তার সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে নিয়ে ম্যাকলিওডগঞ্জে আশ্রয় নেন। আর বহু তিব্বতি দিল্লি এবং কর্ণাটকের বিভিন্ন জায়গায় রিফিউজি হিসাবে থাকতে শুরু করে।

তিব্বতিদের যে উপনিবেশ দিল্লিতে আছে সেটি মজনু কা টিলা এবং কাশ্মীরী গেটের বৌদ্ধ বিহারের আশেপাশে। ভোজনবিলাসীদের জন্য সেগুলি স্বর্গরাজ্য। হালকা অন্ধকার গলির মধ্য দিয়ে সুসজ্জিত এবং সাংস্কৃতিকভাবে উজ্জ্বল রেস্তোরাঁগুলিতে খাবার দাবাড়ের দামও অবিশ্বাস্য রকমের কম। কাশ্মীরী গেটের বৌদ্ধ বিহারে বার কয়েক গেলেও মজনু কা টিলায় যাওয়া হয়ে ওঠে নি কিছুটা কুঁড়েমি আর কিছুটা অজ্ঞানতা বশতঃ।
তা কালকের দিনটা একটু অন্যরকম ছিল। হয়েছে কি? ছেলের তায়কোয়ণ্ডো প্রতিযোগিতার দিনই আমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠক। অনেক কাকুতি মিনতিতেও ছুটির চিঁড়ে ভেজে নি। তাই ভাবলাম একটু নিয়ে টিয়ে যাব কোথাও খেতে। তাই জোম্যাটো ডট কম ঘেঁটে ঘুঁটে গবেষণা করে রেখে দিয়েছি। তার মধ্যেই পার্শ্ববর্তিনী খবর পাঠালেন যে তাঁর বাল্যবন্ধুর পেণ্টিং-এর প্রদর্শনীতে তিনি যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু মানুষ ইচ্ছা পোষণ করে আর উপর ওলা নিজের ইচ্ছা মতো তাতে কাঠি করেন। তাই সাতটার মধ্যে শেষ হওয়া প্রদর্শনীতে পৌঁছনো দিল্লির ট্র্যাফিক জ্যামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হল।

কিন্তু বাড়ি থেকে তাম ঝাম নিয়ে বেরিয়েছি কি ল্যাজ গুটিয়ে ফিরে আসার জন্য? তাই হিসেব কষে রিগো রেস্তোরাঁ মজনু কা টিলা যাব বলে ঠিক করলাম। একটা কোরিয়ান রেস্তোরাঁর কথা ভাবা হয়েছিল বটে পাহাড়গঞ্জে, কিন্তু দুর্গমতার কারণে তা বাতিল হল। গাড়িটাকে সবুজ ওভারব্রিজের কাছে রেখে পায়ে হেঁটে ব্রিজ পেরিয়ে গেলাম। ছেলে তো মহা উৎসাহী হয়ে তিব্বতি ভাষা পড়ার চেষ্টা করতে লাগল। চাইনিজ প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি আগমনে তিব্বতিদের প্রতিবাদ নিয়েও উৎসাহিত রিপোর্তাজ পেশ করতে শুরু করল। তারপর আমাদের শুরু হল গলিখুঁজি।

খুঁজে খুঁজে হাজির হলাম রিগো রেস্তোরাঁয়। যেই বসতে যাব, ওমা পরিবেশনকারী এসে বোমাটা ফেললেন। ‘আজ কিন্তু নিরামিষ’।

খেলে যা! নিরামিষ কেন রে বাওয়া? আবার চল চল। ততক্ষণে পার্শ্ববর্তিনী তাঁর মঙ্গোলিয়ান বন্ধুর সঙ্গে এই প্রান্তরের এক রেস্তোরাঁয় বিফ খাবার গল্প বলছেন। সেই রেস্তোরাঁও এসে পড়ল কিন্তু নিরামিষ আজ বলে বোর্ড গলায় ঝুলিয়ে সে দাঁড়িয়ে। শেষে আ-মা রেস্তোরাঁয় এসে হাজির হলাম। ততক্ষণে নিশ্চিত জেনে গেছি তিব্বতি কলোনিতে আজ সর্বত্র নিরামিষ। কিন্তু এসে না খেয়ে চলে যাব? তাই রেস্তোরার পরিবেশকের স্মরণাপন্ন হলাম। সেও দেখলাম নিরামিষ তিব্বতি খাবারের বিষয়ে অন্ধকারে। বলে কি না উত্তরভারতীয় খান। আমাদের পাশের টেবিলে অবশ্য কয়েকটি মনিপুরী ছেলে মেয়ে তাই খাচ্ছিল।

কিন্তু নাইতে নেমে গা ভেজাব না বললে চলবে? সাবান না থাকলেই বা কি? বেছে বেছে উটকো নামের জিনিষপত্র অর্ডার করলাম। আলু ফিং মাশরুম ভেজ থানটুক আর টিগমা। আলু ফিং-এর আলু হচ্ছে বাংলায় আলু আর ফিংটা বুঝলাম না। কিন্তু চাইনিজ রাইস ওয়াইন দেওয়া নুডলস আলু ও মাশরুমের সুরুয়া আমাদের সামনে উপস্থিত করা হল। আর ছিল থানটুক। যা আবার তিব্বতি সুরুয়া। বান রুটির মতো টিগমাও ছিল। তা তাই দিয়ে স্যুপের বন্যা বইয়ে দিয়ে শেষে ফ্রুট বিয়ার দিয়ে শেষ করব কি? ইচ্ছা হল সুইট ডিশ খাই! তা ব্যানানা টফি ছাড়া কিচ্ছুটি নেই। তাই সই! তার কলা চটকে তার উপর তিল আর মধুর ক্যারামেলাইজড কোটিং দিয়ে চিবিয়ে পেট ঢকঢকিয়ে বাড়ি এলাম।
b5ced35548efb53fc17fd484bef32070_200_thumb

টিগমা

টিগমা


আসার পথে ছেলে আবিষ্কার করল, নিরামিষি বুধবারের কারণ। বুধবারকে খুব পুণ্যবান দিন হিসাবে দেখা হয় দলাই লামার জীবনে। তাই গত অগাস্টে এক বছরের জন্য মজনু কা টিলার তিব্বতি বাসিন্দারা বুধবার নিরামিষ খাবার অঙ্গীকার করেছে। অজ্ঞানীরা আর কি করবে? আবার কোন নতুন সূর্যাস্তের অপেক্ষায় থাকবে, গিয়ে একটু বিফ, ল্যাম্ব, পর্ক, চিকেন বা ফিশের তিব্বতি সংস্করণে যাতে দাঁত ফোটানো যায়। তদ্দিন না হয়, পেটের মধ্যে স্যুপের সাম্রাজ্য ঢক ঢক করুক!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বেরিয়ে আসার সময় বিশ্বের সর্ব কনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্দির ছবি দেখলাম। পানচেন লামা নির্বাচিত হবার পর গেধুন চৈকি নেইমাকে ১৯৯৫ থেকেই চীনা সরকার কোন অচেনা জায়গায় সরিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং তিব্বতি জনগণের আবেদনের পরেও তাঁর বর্তমান অবস্থান প্রকাশিত হয় নি। ছেলেটি এখন প্রায় ২৫ বছরের হয়ে গেল। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বা বিরুদ্ধ মতকে রাষ্ট্রযন্ত্র বরাবর ভয় পেয়ে এসেছে। চীন তো আরও বেশীই। তিয়েন আন মেনেরও তো পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেল।
300px-Save_the_Panchen-lama
প্রয়োজনহীন পুনশ্চ১- কালকেই দেখলাম সলমন খানের পাঁচ বছর জেলযাত্রা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। বিশেষত ফেসবুকে উপচে পড়ছে সলমনের জন্য “ঠিক হয়েছে” আর তার সমর্থনকারী (পড়ুন অভিজিত ভট্টাচার্য্য ও ফারহা খান আলি)-দের জন্য “ছিছিক্কার”। জনগণ একবার ভেবে দেখুন আপনার বাড়ির ছেলেটি এরকম বিচারবিবেচনাহীন কাজ করলে আপনারা কি তাকে বিবেকের কাছে আত্মসমর্পণ করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে জেলে পাঠাবেন? না কি আপনারাও মনগড়া গল্প তৈরী করে তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করবেন? প্রথমটা হলে তো আপনাকে স্যালুট আর যা করছেন তা চালিয়ে যান। আর দ্বিতীয়টা হলে? আপনিও কিন্তু অভিজিত কিংবা ফারহা খান আলি (ইনি সঞ্জয় খানের কন্যা) কিংবা অর্জুন কাপুর হয়ে পড়ছেন।

অভিজিৎ ভট্টাচার্যকে নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই, ভদ্রলোক এর আগেও পাকিস্তানী গায়ক বা ইত্যাদির উপর নিজের অকালে ঝরে যাওয়া জ্ঞান বর্ষণ করেছেন। এখানেও ব্যতিক্রম নয়। বাকিরা স্রেফ নিজেদের পরিচিতকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে। দুঃখের বিষয় হল আমরা এতদিন ধরে কিন্তু সেই রাত্রে হতভাগ্য নুরউল্লাহ মেহবুব শরীফ (নামটা আমিও জানতাম না স্বীকার করছি) বা সলমনের পুলিশি দেহরক্ষী রবীন্দ্র পাতিল (যিনি প্রথম এফআইআর করেছিলেন কিন্তু অদ্ভুত অবস্থায় সাত বছর পর সহায় সম্বলহীন অবস্থায় যক্ষ্মাগ্রস্থ হয়ে মারা গেছিলেন)-এর কোন খবর নিই নি। তাই বলি কি, শুধু চুপ করে খবরটা দেখি, বাক্যবাণের অধিকার বোধহয় আমরা হারিয়েছি! আমেন!
Junior-Car-Designer-Car-Drawing-For-Kids-Made-Very-Easy-SUV-Front-View-6

(১৩১)


গত বৃহস্পতিবার গেছিলাম গাজীপুর মণ্ডিতে। মণ্ডি হল যেখানে গেলে মন ভালো হয়ে যায় এমন জায়গা। অবিশ্বাসীদের কাছে অবশ্য মণ্ডির ইংরাজি অর্থ হল পাইকারি মার্কেট বা আড়ত। তার উপর গাজীপুর মণ্ডির এক বিশাল নাম আছে। যারা জানেন না তাদের জন্য জানাই গাজীপুর-এ মোট পাঁচটি মণ্ডি। ফুল মণ্ডি (নাকি full monty?), সবজি মণ্ডি, ডিম ও চিকেন মণ্ডি, ঈদগাহ আর মচ্ছি মণ্ডি।

হ্যাঁ, কোলকাতার লোককে মাছের গল্প শোনাতে গেলেই তো চিত্তির। আরে শুনুনই না। কোলকাতায় প্রচুর মাছ পাওয়া যায় বটে, কিন্তু এক জায়গায় এতো মাছ তো পাওয়া যায় না! তাই চুপটি করে শুনুন পাঠক পাঠিকারা।

হয়েছে কি, গত রবিবার বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন আয়োজন করেছিল বাংলা ফুড ফেস্টিভ্যাল-এর। খাবার দাবারের বিষয়ে আমি দুই পায়ে খাড়া। তার উপর বাংলা ফুড ফেস্টিভ্যাল। এর আগে আমার অভিজ্ঞতা বলতে দুগগো পুজোর আনন্দমেলা। কিন্তু এত বড় স্কেলে কোনদিনই কিছু করি নি বলে একটু চিন্তাভাবনা করছিলাম। তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খোঁচানোয় ক্ষুদিরাম হতে রাজি হলাম।

রামপুরী চত্বরে দেখতে দেখতে আমার নয় পেরিয়ে দশ বছর প্রায় হয়ে গেল। কিন্তু বাড়ির সামনের এই বিস্ময় বালককে চাক্ষুষ কোন দিনই করা হয় নি। মানে গাজীপুর মণ্ডিতে গিয়ে মাছ কেন মাংসও কেনা হয় নি। কিনবই বা কেন। মধ্যবিত্ত ঘরের ২৩০ লিটার ফ্রিজে এক কিলোর বেশী তো মাছ ধরে না। আর সেখানে শুনেছি কুইন্টালে হিসাব হয়।

তাও বড় বড় শহরে এরকম ছোট ছোট ভুল ত্রুটি হয়েই থাকে। রবীন্দ্রনাথও তো আজন্ম ধানের শীষে শিশির বিন্দুর জন্য হেদিয়ে রইলেন।

যাই হোক সক্কালবেলা উঠে ছেলেকেও টেনে তুললাম। ‘চল আজ তোকে একটা জায়গা দেখিয়ে আনি’! ‘কোথায় বাবা?’ ‘চলই না!’

তারপর দুচাকায় করে জিজ্ঞাসা করতে করতে পৌঁছিয়ে গেলাম মণ্ডি রাজ্যে। গাজীপুরকে একটু দূর থেকে দেখলে একদম আমাদের কাদাপাড়া লেকের পাশটা মনে হবে। সেই একই রকম আবর্জনা জমিয়ে পাহাড় করে সুসজ্জিত রাখার চেষ্টা চোখের পীড়া কম করে।

তা গাড়ি পার্ক করে ভিতরে ঢুকে চোখ সওয়াতে সওয়াতেই পনেরো মিনিট চলে গেল। তারপর এদিক ওদিক জিজ্ঞাসা করতে করতে সামুদ্রিক মাছের আড়তে। “বাবা ওটা কি?” “শঙ্কর মাছ” “ঊরিত্তারা স্টিং রে? আর ওটা কি?” “হাঙর” “ হ্যামারহেড?” বাপরে বাপ! সে সব অদ্ভুত অদ্ভুত নাম না জানা মাছের পেট থকে বের হওয়া দানাদারের সাইজের এক একটা ডিম। খাব কি মিউজিয়ামে রাখব তাই জানি না।

20150430_090152

বহুকাল আগে দীঘায় গিয়ে টাটকা বাগদা চিংড়ি দেখে চিত্তচাঞ্চল্য অনুভব করেছিলাম। এখানে বরফবন্দি মাছ দেখেও একইরকম আনন্দ হল বটে। কাতারে কাতারে সামুদ্রিক আর অসামুদ্রিক মাছ ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে আছে খরিদ্দার কখন তাদের তুলে নিয়ে গিয়ে ঝালে ঝোলে অম্বলে ফেলে মুক্তি দেবে বলে।

আমার দরকার খুব সীমিত ছিল, তাই খুঁজে খুঁজে হাজির হলাম বাগদা চিংড়ির এক পাইকারি বিক্রেতার কাছে। বাগদার ব্যাপার আবার একটু সেনসিটিভ। একদম তাজা না হলেই মুড়ো ছাড়তে শুরু করে। আর এ কি আর আপনার কোলকাতার মানিকতলা বা শিয়ালদা বাজার পেয়েছেন? পুকুর থেকে তুলে এনে মার্কেটে ফেলে বলবে কেমন দিলাম? এখানে বাবা অনেক সাধ্য সাধনার পর গুজরাট বা অন্ধ্র থেকে মাছ আসে। তার তাজা থাকার সম্ভাবনা আর দিল্লির রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে বিনা ঝঞ্ঝাটে গন্তব্যে পৌঁছনো একই রকমের অসম্ভব প্রায়।

তাও হিসেব টিসেব করে বললাম আড়াই কিলো! সর্দারজি আড়তদার বলল তিনশো কুড়ি। আমি যেন হাতের কাছে ঝুড়ি ভরতি চাঁদ পেয়েছি! আহা তিনশো কুড়িতে প্রায় তাজা বাগদা? রয়াল বেঙ্গল টাইগারের হাসিও এর থেকে দূর্লভ বস্তু। সময় নষ্ট না করেই বস্তা বন্দি করে হাঁটা লাগালাম।

একটু দূরেই দেখি, আহা, দিনের বেলায় রূপালি চাঁদ উঁকি দিচ্ছে থরে থরে বরফের মেঘ থেকে। দিল্লির বাজারে প্রথম গঙ্গার ইলিশ। সেদিনই। পাইকারি দাম হাজার আর আমাদের মত খুচরো পাপীদের জন্য এগারশো! আহা জন্নত তো একবারই যাব বাওয়া! কিন্তু আমিও হেমলক খেয়েছি আর অপ্সরাদের নাচ দেখেছি বলার সৌভাগ্য কি ছেড়ে দেওয়া যায়? শোনা কথা যে সমুদ্র মন্থনে প্রথমে উঠেছিল বিষ। তা মহাদেব গলায় ধারণ করে নীলকণ্ঠ হয়েছিলেন- বেঁচেছিলেন দূর্গার আশ্রয়ে। আরে সে সব দেবাদেবীর ব্যাপার বাপু। আমি সামান্য মানুষ, একই সঙ্গে ঘটি বাঙালের স্বর্গজাত পারিজাত দু হাতে ধরার সৌভাগ্য হাতছানি দিয়ে ডাকছে দেখে সামলাতে পারলাম না।

বললাম দিন দাদা এক খান কিলো খানেক। শেষে পেট টিপে টুপে চ্যাপ্টা কিন্তু রাগবি বলের মতো চওড়া পেট ওলা এক চাঁদপানাকে হস্তগত করে হেঁটে এলাম পেশাদারি কাটিয়েদের কাছে। কোলকাতার বিভিন্ন বাজারে মাছ দোকানিরা সাধারণত কেটে দেয় না। কাঁচি আর বঁটির সাহায্য এইসব কাটিয়েরা শির কলাম করে। দিল্লিতে মাছের দোকানিরাই সাধারণত কেটে দেয়। কিন্তু এ তো পাইকারি বাজার। তাই এখানেও ব্যাপার স্যাপার আলাদা। মুঘলাই কাটিয়েরা ইয়া ইয়া বড় আরবি তলোয়ারের মতো দেখতে বঁটি নিয়ে বসে থাকে আর ছুরি দিয়ে ফাইন সে ফাইন ফাইল ‘ফিলে’কেটে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে “জিলেট”।

ইলিশ দেখেই তারা গল্প জুড়ে দিল। কুড়ি বছর আগেও দশ টাকা কিলো পাওয়া যেত। দশ বছর আগেও একশো টাকা করে না পেলে খরিদ্দার ফেলে রেখে চলে যেত। হঠাৎ করে যে কবে রূপালি অমৃতগুলো আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেল কে জানে?

যাই হোক, অমৃত একা খেলে অমর হওয়া যায় না। তাই ভাগ করে নিয়েই খেলাম। পোস্ত সর্ষে আর দই বাটা দিয়ে মাখিয়ে একটু সরষের তেল আর কাঁচা লংকা চিরে ভাপা আহা ভাত কে ভাত উড়ে চলে গেল হাঁড়ি সাফ করে দিয়ে। আর মুড়ো দিয়ে তেঁতুলের টক। আহা কচুশাকগুলো যে কোথায় গজাচ্ছে কে জানে?

20150430_213932

আর চিংড়ি? আহা বাঘের বাচ্চার মতো সেও রাজ করল রবিবার বাংলা ফুড ফেস্টিভ্যালে। সঙ্গে খোদ মালদা থেকে আনা আমসত্ত্বের খেজুর দিয়ে চাটনি। আহা ল্যাংড়ার গন্ধেই বেণুবন মাতাল হয়ে গেল।

IMG_20150504_203512

স্বর্গের সন্ধানে স্বপ্নসন্ধানীরা বারবার ফিরে ফিরে আসে আর আমরা তো সামান্য বাঙালী। রসনার বাসনায় বুঁদ হয়ে মজে থাকি। আহা রাখিস মা রসে বসে।
প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ সাধারণতঃ ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো ব্যক্তিগতই থাকে। কিন্তু আজকে তার জন্মদিন ছিল। এই নিয়ে দুটো জন্মদিন হয়ে গেল সে নেই। মানুষ এগিয়ে চলে কিন্তু ফাঁকগুলো ফাঁকই থেকে যায়। আমার ভাইটা আমারই মতো খেতে ভালবাসত কি না!!

(১৩০)

আরে গত এপিসোডে একটা কথা বলতে ভুলেই গেছিলাম। আসলে আমার এই তিতকুটে পারসোনালিটির মূল ভিত্তিই হল আমার তেঁতো প্রীতি। মানে উচ্ছে , করলা, নিমপাতা, পলতা আমার রসনার লাভা স্রোতে লালা বর্ষণ করে, সেই ছোট বেলা থেকেই। কালমেঘ আমার প্রথম বর্ষার মেঘ। নিম বেগুনে মনে আগুন লাগে। পলতার বড়ায় সলতেয় সেঁকে সিক্ত হয় হৃদয়। (আহা কদ্দিন যে পলতার বড়া খাই না! এই পোড়া দিল্লিতে ম্যাপল পাতা এমন কি চিনার পাতাও পাওয়া যায় কিন্তু পলতা পাতার দেখা? নৈব নৈব চ!)

আমার সারা পরিবারকে পইপই করে বলেও বোঝাতে পারি নি যে তেঁতোটা বাদ দিলে করলার মতো স্বাদু সবজি আর নেই। চেষ্টা করে দেখবেন! করলা কাটার পর ঈষদুষ্ণ গরম জলে একটু নুন দিনে করলা ভিজিয়ে রাখলে তেঁতো ভাবটা অনেকটাই চলে যায়। তারপর কোপ্তা কালিয়া রেঁধে দেখুন না ইচ্ছে মতো!

যদিও আমাদের বাড়িতে তেঁতো খাওয়া হয়, কিন্তু তা রসনার বাসনায় নয়। আয়ুর্বেদিক রেসিপি হিসাবে। আমার ছেলেটাও করলা দেখলে এখন নাক সিঁটকোয়। (উদাসী উত্তমকুমারের ইমোটিকন)

কিন্তু ধর্মের কল বোধহয় উলটোবার সময় হয়েছে। আয় দিন আমার মেয়েটি তার গুটগুটে দুই পায়ে হেঁটে এসে খাবার সময় কোলে বসে আমার থালা থেকে মণিমাণিক্য অর্ডার করে। যদিও তাকে বেশ তরিবৎ খাবার দাবারই দেওয়া হয়। কিন্তু তার বোধহয় বিশ্বেস হয় না যে সেগুলোও ভালো হতে পারে। নদীর এপার আর ওপার আর কি! তা সেদিন কাছের পার্ক থেকে কচি কচি বাদামী নিমপাতা বাড়িমুখো হয়েছে। আর ডুমো ডুমো বেগুন কাটা রয়েছে। অফিস থেকে ফিরে এসব দেখে আর সামলাতে না পেরে নিজেই দায়িত্ব সহকারে কম তেলে কুড়কুড়ে করে ভেজে সবে নিয়ে বসেছিলাম। সে মহারাণী এসে সেই খান থেকেই হুকুম করল।

সব বাপ মায়ের সুপ্ত বা ব্যক্ত ইচ্ছা থাকে যে সন্তান যেন নিজের কিছু ভালোলাগাকে আপন করে নেয়। এই নিয়েই মাত্রাছাড়া ঝঞ্ঝাট বা ঝটাপটির শুরুয়াত হয়ে যায়। তা আমার ভালো লাগার নিম বেগুন যদি আর কেউ খেতে চায় তাহলে সত্যিকারের ফ্যানের মতো হাওয়া বিতরণ করেই সুখ অনুভব করতে চাইবই, এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তা মহারাণী চাইতেই হুজুর খিদমতগার হাজির করল, একদা সবুজ অধুনা কালচে কড়কড়ে নিমপাতা! মুখে দিতে এক মুহুর্তের জন্য তাঁর মুখভঙ্গিমা পালটে গেল। কিন্তু অপাপবিদ্ধ মন, কালো কে কালো, তেঁতোকে তেঁতো বলতে শেখে নি। সে কুড়মুড়ে অন্য স্বাদের খাবার পেয়েই খুশী। এক গাল হেসে ঘাড় বেঁকিয়ে বলল, “ভাও”! আবার দাও!

আর কি বলব মহায়! পুলকে আমার হৃদয়ের কলমে প্রেমসংগীত লেখা চালু হয়ে গেল। তার মাকে এক গাল হেসে বললাম, “দেখলে? বাপ কা বেটি!” পার্শ্ববর্তিনী তাল ভঙ্গ করলেন খাবার প্রসঙ্গ পাল্টে। কিন্তু তাতে কি? মিশ্র কাফির দরবারি কানাড়া তখনো বুকের মধ্যে তান তুলে রেখেছে। জিয়োহ বেটি।

ছেলেবেলায় আমার বোর্ড গেমের মধ্যে দারুণ লাগত চাইনিজ চেকার খেলতে। তা সেটা কারণ কি না বলতে পারব না। তবে কোলকাতার রাস্তায় প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া লাল বাস বা সরকারি বাসের ততোধিক বিলুপ্ত প্রায় টিকিট চেকারদের মুখোমুখি কখনই হই নি। তাল কাটল কলেজে উঠে।

এক বন্ধুর মা অসুস্থ, তাঁকে দেখতে যাব বলে বারুইপুরের ট্রেন কখন আছে তা দেখতে কোলাপসিবল পেরিয়ে সবে বোর্ডের কাছে গেছি। আর যাই কোথা? ক্যাঁক করে ধরে সোজা নিয়ে গেল আরপিএফ থানায়। তা যাই হোক, তখনকার দিনের টিউশনির মার্কেটে তিরিশটি কড়কড়ে টাকা দিয়ে মুক্তি পেয়েছিলাম বটে।

আর তারপর দিল্লিতে এসে একবার দুশো টাকা চেকারকে ফাইন দিতে হয়েছিল দু টাকার জন্য। তখনও দিল্লিতে সামান্য দূরত্বের জন্য দু টাকার টিকিট পাওয়া যেত। দিল্লির বাসগুলিতে কন্ডাক্টর আপনার ঘাড়ের কাছে ‘টিকিট টিকিট’ করে টোকা মারে না। তারা বহাল তবিয়তে নিজের সরকারি সিংহাসনে বসে থাকে আর আপনাকেই যাত্রী স্রোতের বিপরীতে গিয়ে টিকিট কেটে ফিরে আসতে হয় ঝাণ্ডা উঁচিয়ে। তা অন্য একটা ঘটনায় রুমাল রেখে টিকিট কাটতে গেছি আর ফিরে এসে দেখি এক জাঠ তনয় রুমালটিকে জানলার উপর রেখে নিজে বেশ আগলে বসেছেন। আমার গা থেকে কোলকাতার জলের গন্ধ তখনও যায় নি। তাই তর্ক জুড়েছিলাম বটে। কিন্তু ষাঁড়ের সামনে লাল শালু নেড়ে বিশেষ ফল হয় না সে ষাঁড় যদি তখন তার প্রিয় বিচুলির সন্ধান পেয়ে যায়।

তা যাই হোক আগের গল্পটায় ফিরে আসি, আর কে পুরম থেকে বসন্ত বিহার চারটি স্টপেজ। তার মধ্যে একটি অতিবাহিত, তা আমি ঝটপট দুটি টাকা বার করে কন্ডাকটরকে দিতে যাব আর ও মা সে জানলা দিয়ে মুখ বার করে কি যেন দেখে হাত সরিয়ে নিল। আর মুর্তিমান অমঙ্গলের মতো খান চারেক ধূসর পোশাক পরিহিত চেকার উঠেই ক্যাঁক করে আমায় ধরল। তাদের যত বলি যে আমি টিকিট কাটতে যাচ্ছিলাম, কিছুতেই বিশ্বাস করে না। তবে বিশ্বাস না করার কারণ বোধহয় কোটা সম্পূর্ণ করা। মানে তাদের সারা দিন ধরে তমুক সংখ্যক লঙ্ঘনকারীকে ধরা এবং অমুক সংখ্যক অর্থ জরিমানা হিসাবে সংগ্রহ করার হুকুম থাকে বোধহয়। সেই প্যাঁচে দুটাকার বদলে দুশো টাকা দিয়ে পাসপোর্ট উদ্ধার হল।

তবে এবার যে গল্পটি বলব (বা সত্য ঘটনাটি বলব), সেটি কলেবরে এই সকল গল্পের মধ্যে ভীম ভবানী। এটি আমার সঙ্গে হয় নি, জয়পুরের সেই ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধুর সঙ্গে ঘটেছিল।

কলেজে পড়ার সময় কোন কারণে সে ও তার বন্ধু দুজনে কোলকাতা এসেছিল। সে বর্ধমানের আর তার বন্ধুটি দুর্গাপুরবাসী। তা একইভাবে টিকিট না কেটে ট্রেন কখন আছে দেখার জন্য তারা হাওড়া মেন স্টেশনে ঢুকে পড়েছিল। আর ঠিক একইভাবে তাদেরকেও পরীক্ষকরা ক্যঁক করে ধরে। তা দুজনেই নাকি একটু শান্তশিষ্ট ভিতু প্রকৃতির ছিল। আর তাদের ভয়ার্ত চেহারায় আরও দু তিনটি বলিরেখা যুক্ত হল যখন তারা আরপিএফ থানার ভিতরে বসে থেকে পাশের ঘর থেকে শুনতে পাচ্ছিল ‘বাবা রে, মা রে মেরে ফেলল রে’ চিৎকার। তাদের সন্দেহ নিরসনের দায়িত্ব সেই চেকারই নিলেন। তিনি বললেন, “ও কিছু না পকেটমার ধরা পড়েছে তো!” তা পকেটমারের পকেটে কে আর দেখতে গেছে কোন পরিচয়পত্র আছে কি না পকেটমার বলে। তাই বন্ধুটি ঘাবড়ে গিয়ে বলল, যে দেখুন আমার কাছে একশো টাকা আছে। বাড়ি পৌঁছত হবে তো! তাই পঞ্চাশ দিই?

কিন্তু তার বন্ধুটার হঠাৎ কি হয় কে জানে? সে ছুট লাগালো সেখান থেকে, কিন্তু উসেইন বোলট না হোক সে নিদেন পক্ষে আদিল সুমারিওয়ালাও ছিল না। তাই চড় চাপড়ের মাঝে উভয়ে মিলে একশো টাকা দিয়ে তবে রফা হয়। তারপর হুড়মুড়িয়ে দেখে শুনে একটি ট্রেনে তারা উঠে পড়ে। নির্দিষ্ট সময় বন্ধুটি বর্ধমান আসায় নেমে পড়ে আর তার বন্ধুকে বলে তুই দুর্গাপুর পৌঁছে খবর দিস। কিন্তু ততক্ষণে নটা বেজে যাওয়ায় আর একে সারাদিনের ধকলে আমার বন্ধুটি অচিরেই খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

পরদিন সকালে টেলিফোনের চিল চিৎকারে ঘুম ভাঙে। সেই বন্ধুটি নাকি সারা রাত ঝড় ঝাপটা সামলে বাড়ি পৌঁছে কোনরকমে রাত কাটিয়েই বেইমান বন্ধুর উপর হামলে পড়ে ফোন করে।

কিছুই না, আমার বন্ধুটি নেমে যাবার পর তার বন্ধুটি ফুরফুরে হাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিল এই ভেবে যে দুর্গাপুরে তো ট্রেন আপসেই থেমে যাবে। কিন্তু যখন তার ঘুম ভাঙে ততক্ষণে দশটা বেজে গেছে, আর ট্রেনটা নাকি দুর্গাপুর যায় নি এবং শান্তিনিকেতনের পথে চলছিল। ছেলেটি কিছু না বুঝতে পেরে ক্রমশ ফরসা হয়ে আসা সহযাত্রীকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে যে তারা ভুল ট্রেনে উঠে পড়েছে। তারপর কোন রকমে পরের স্টেশনে নামে। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ অপর একটি লোকাল ট্রেন ধরে সে ফিরে আসে বর্ধমানে। দুর্গাপুর যাবার ট্রেন তখন পাশের প্ল্যাটফর্মে আসব আসব করছে। সে লাইন পেরিয়ে সেই প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে সামনে সাদা শার্ট পরিহিত এক ভদ্রলোককে বলে “দাদা হাতটা ধরুন!” ভদ্রলোক তাকে প্ল্যাটফর্মে তুলে নিজের কালো কোটটি পরে বলে, ‘টিকিট?’ আর যা হবার তাই হয়! সে রাতে কে আর গল্প শোনে। শেষে কপর্দক শূন্য অবস্থায় দুর্গাপুর এসে রাতের অন্ধকারে লাইটহাউসের মতো জেগে থাকা একমাত্র পরিচিত এসটিডি বুথ থেকে সে কাঁদোকাঁদো অবস্থায় বাড়ি ফোন করে বাবাকে অনুরোধ করে গাড়ি পাঠাতে! বাবা গাড়ির ব্যবস্থা করে তাকে বাড়ি নিয়ে যখন পৌঁছন ততক্ষণে স্টুডিওর ঘড়িতে ছোট কাঁটাটি দুইয়ের ঘরে ঘোরাফেরা করছে।

পাঠক/পাঠিকারা যত পারেন হাসুন, কিন্তু সেই বেদনাহত ছেলেটির সঙ্গে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এমনই কোন ঘটনা বা দুর্ঘটনার কথা মনে করে একটু দীর্ঘশ্বাস অন্ততঃ ফেলবেন। ছেলেটি অজান্তেই একটু শান্তি পাবে! আমেন!
being-gratuitous
প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বর্তমান ভারতীয় একদিনের ও টি২০ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক শ্রী মহেন্দ্র সিং ধোনি একদা দক্ষিণ পূর্ব রেলের টিকিট কালেক্টর ছিলেন। তবে সে অন্য কোন জীবনের গল্প বটে।

ফিসফাস-২ এখন আমাজনেও পাওয়া যাচ্ছে। সংগ্রহ করতে ক্লিক করুনঃ

(১২৯)

একটা লোক একজায়গায় বেশী দিন থাকলে হেদিয়ে মরে। কবে বাহিরিব কবে মেলিব পাখা ইত্যাদি করে। সেই রকমই ফিসফাস বেশীদিন কোলকাতা আর মুম্বই করলে অক্সিজেনের অভাব বোধ করে। আর যেখানে চারদিনের ছুটি একসঙ্গে সেখানে? আরে থাক না সর্বভারতীয় বঙ্গ সম্মেলন, নিজের কাজটা ঠিকমতো করে কেটে পড় রে মামা।

তা সেই মতই আগে থেকে ভেবে রেখেছিলাম যে ৩রা এপ্রিল বিকেলেই বেরিয়ে পড়ব জয়পুরের উদ্দেশ্যে। গাড়িও সার্ভিসিং টার্ভিসিং করে তৈরী। তেল ভরা হয়ে গেছে- স্যান্ডউইচ- জলের বোতল সব কিছু নিয়ে ছেলে মেয়ে নিয়ে বেরোতে বেরোতে ছটা। এ বাড়ি ও বাড়ি কোন বাড়িতেই বেরোবার সময় জানানো হল না। তাহলেই চিন্তা শুরু বলে।

জয়পুরের যে ভাইয়ের বাড়ি উঠব তারা আগে থেকেই বলে দিয়েছিল যে মানেসর পর্যন্ত জ্যাম লেগে থাকতেই পারে কিন্তু তারপর থেকে সহজ রাস্তা। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় এক। মানেসর পর্যন্ত বরং ফুঃ ফাঃ বেরিয়ে এলাম তারপর একটু হাত পা ছড়াতেই হয়। চা আনো রে। জল আনো রে। মেয়ের খাবার বার করো রে। সেদিন আবার চতুর্দশী। আকাশ জুড়ে চাঁদ মামা টি দিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যে নেমে এসেছে রাস্তাও পরিষ্কার নীমরানা পর্যন্ত।

নীমরানায় এসে আমরা চতুর্থ রাজ্যে পড়লাম। উত্তর প্রদেশ থেকে শুরু করে দিল্লি হরিয়ানা পেরিয়ে রাজস্থান।

তা এতক্ষণ পর্যন্ত টোল গেটে সরকারী ট্যাগ বেমালুম কাজ করেছে। রাজস্থান হরিয়ানার সীমান্তের চেকপোস্টে তা দেখাতেই সেটা নিয়ে টোল গেটের ছেলেটা সামনে কাউকে দেখাতে গেল। দেখিয়ে এসে নম্বর টুকে আমায় মনে হয় যেন হাতের ইশারায় বলল ঠিক হ্যায়। অন্তত তাই তো মনে হল।

তা আমি সেই মতো টুক টুক করে গাড়ি নিয়ে পঞ্চাশ মিটার এগোতেই দেখি সামনের ব্যারিকেডে হাত দেখাচ্ছে লোক। ভাবলাম কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে বটে। তা সে বলে কি না আমি টোল জাম্প করেছি। বোজো কাণ্ড! তা তাকে বললাম না ভাই জাম্প করি নি। আমাকে যেতে বলায় এসেছি। সে উলটে বলে “ব্যাগ চেক করুঁ?” আমি ভাবলাম ব্যাগে কিই বা আছে, হ্যাঁ চেক করো বাবা! তা ব্যাগ খুলতে নেমে একবার জিজ্ঞাসা করলাম কেস কি? সে বলল টোল জাম্প করেছি আমাকে ফিরে গিয়ে টোল দিতে হবে।

তা সে কথা তো গোদা হিন্দিতে বললেই হয়। আধা হরিয়ানভি আর আধা রাজস্থানিতে লস্ট ইন ট্রান্সলেশন।

ফিরে গিয়ে টোল দিতে গিয়েও দেখি হম্বি তম্বি করছে। আমি ঠাণ্ডা মাথায় ম্যানেজ করে ফিরে এলাম গাড়িতে গড়াতে শুরু করল গাড়ি। আর ঘড়িও টুক টুক করে নটার ঘরে ঢুকে পড়ল। মেয়েটার খাবার সময় হয়ে গেছে বলে রাস্তার ধারে একটা সভ্য ভদ্র ধাবা দেখে দাঁড়ালাম। হাল্কা হবার কাজ কম্মও হয়ে গেল। বাড়িতে ফোন করে জানানোও হল যে প্রায় পৌঁছে গেছি। ধাবায় জিজ্ঞাসা করলাম আর কত দূর জয়পুর? উত্তর এল ৭৬ কিমি! বাহ বাহ। রাতের আয়নায় আলতো হিসাবে চালালেও তো মেরে কেটে দেড় ঘন্টা।

কিন্তু অন্ধকার আকাশে মাঝে মাঝেই যে ঝলকানি দেখি। ঊষর মরুভূমিতে আর কতোটাই বা বৃষ্টি হতে পারে। বলতে বলতেই টিপটাপ শুরু। দ্রুত গাড়ি গুটিয়ে ছুট লাগালাম জয়পুরি রাস্তায়।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাও উঁচু নিচু হতে শুরু করল, আর পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল বৃষ্টির তোড়। শেষে মুষলধারা। অন্ধকার রাস্তা। কিন্তু আশেপাশের ছোট খাটো টিলা থেকে বড় বড় পাহাড়ের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছে বজ্রবিদ্যুৎ তার ডাক দিয়ে।

বৃষ্টি গতি বাড়াচ্ছে। সামনের চলন্ত ট্রাকগুলোর এ পাশ ওপাশ দিয়ে উড়ে উড়ে আসছে। অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ আলোর ফুলঝুরির মতো আছড়ে পড়ছে উইণ্ডস্ক্রিনে। ভয়াবহ পরিবেশ। ট্রাকগুলোর ধোঁয়া একদম ব্যোমকেশ বক্সীর নতুন সিনেমার মতো রোমাঞ্চে ভরপুর কিন্তু অচেনা আবহের সৃষ্টি করছে।

রাস্তার হদিশ দশ মিটার দূর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। উইণ্ডস্ক্রিনে ঘাম রুমাল দিয়ে মুছে মুছেও পরিষ্কার হচ্ছে না। গোয়েন্দা স্বপন কুমার তাঁর এক হাতে স্টিয়ারিং হুইল আরেক হাতে মুঠোর রুমাল আর তৃতীয় হাতে ভবিতব্যকে সম্বল করে একাগ্র চিত্তে এগিয়ে চলেছেন অন্ধকারের উদ্দেশ্য। পিছনের সিটে সকলেই ঘুমে মগ্ন। পার্শ্ববর্তিনী শুধু এক মনে সহায়তার রাস্তা খুঁজে যাচ্ছেন- “হ্যালো হ্যালো! ওয়াচ টাওয়ার! ট্যাঙ্গো কলিং চার্লি!” “হ্যালো চার্লি স্পিকিং! খাবার দাবার সব রেডি আছে তোমরা ধীরে ধীরে সোজা রাস্তা ধরে এগিয়ে এসে সিন্ধি ক্যাম্প ছুঁয়ে সিকার রোড ধরে অম্বা বাড়ি থেকে বিরিয়ানি কলেজে পৌঁছও।“

ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে এক সময় বৃষ্টিও শেষ হয়ে আসে হুড়মুড় দুমদাম দুড়দাড় ছুঁয়ে টিপ টাপ টুপ টুপ। সামনের নির্বাক স্টিরিওর ঘড়ি তখন সময় দেখাচ্ছে এগারোটা চল্লিশ। ওয়েলকাম টু জয়পুর। তারপরেও পথ ফুরোয় না! শেষে জাগরণের মঞ্চে গিয়ে পাওয়া গেল সিকার রোডের খোঁজ। কিন্তু সেও তো চলেছে তো চলেছেই। বৃষ্টিও হাল্কা যেন বেড়ে গেছে। ওই তো! রাস্তায় একটা লোক দেখা গেছে। মাথায় একটা প্লাস্টিকের ফোল্ডার দিয়ে কোন রকমে আড়াল করে রাত সোয়া বারোটায় ছুটছে। “ভাই সাব, অম্বাবাড়ি কিধার হ্যায়?” “সামনে থোড়ি দূর যাকে ফির ডাইনে! ম্যায় উধারই যা রাহা থা!”

চলে এসো ভাই সাব! রাত্রি বেলা বিপদের ঝুঁকি অমান্য করে মানবিকতার ডাক। সেও ফোন করে কাকে যেন বলে দিল। ম্যায় থোড়ি দের পৌঁছুঙ্গা। অভি কিসিকো রাস্তা দিখা রাহা হুঁ।

মানবিকতার জয়। বিরিয়ানি কলেজের হাঁড়ির মাথায় সে পৌঁছে দিয়ে ফিরে গেল আধা কিমি! গলির ভিতরে। আমরাও হাঁচড়াতে পাঁচড়াতে গিয়ে উঠলাম গন্তব্যে। আবার কাল শুরু হবে জয়পুর ভ্রমণ।

একটাই দিন উটকো পরিশ্রম পেরিয়ে শুধুমাত্র সিটি প্যালেসই সময় করে দিল। গুগল ম্যাপসের ভরসায় সবাইকে নিয়ে চললাম রাজপুতানার সব থেকে বন্ধু রাজার প্যালেসে। জয়পুরের রাজারা বিশেষ ঝগড়াঝাঁটি করে নি। এ ব্যাপারে মাড়োয়ার মেবারের একেবারেই বিপরীত। মুখ থাকতে হাত কেন। তা তাদের বৈভব আর ভয়ঙ্কর অস্ত্রশালার কড়কড়ে আওয়াজই শুনলাম। এ শুধু গর্জায় বর্ষায় না। বর্শায় তাই মরচে ধরে গেছে। খঞ্জর, বন্দুক কামান সাজানো থাকে কাঁচের শো কেসে। গল্পের ভাঁড়ারে খালি একশো পাঁচ লিটার গঙ্গাজলের ঠনঠনে জালা।

গায়ত্রী দেবীর সৌন্দর্য্যের কাহিনীতে ঢাকা পরে যায় ছুটকো ছাটকা শিকার কাহিনী। যুদ্ধের দেওয়ালে মহাভারতের চক্রব্যূহ শোভা পায়। আর মুঘল তথা ইংরেজদের পদলেহনের লালা শুকিয়ে গিয়েছে সেই কবেই। পাণ্ডুর পৃথিবীতে গোলাপি বাগিচা।

প্রসঙ্গতঃ কদিন আগেই কোলকাতা হাইকোর্টে সরকারী কৌঁসুলি জয়পুরের গোলাপি শহরের উদাহরণ দিয়েছেন কোলকাতার আর্জেন্টিনাকরণের কারণ হিসাবে। কিন্তু বিচারক মশায় ভূগোলে পারদর্শী। গোলাপি মার্বেলকে তাই অনুকরণ করতে পারে নি রাজনৈতিক নীল সাদা।

বিকালে চাঁদপোলের মহম্মদী রেস্তোরায় আবার চমক। মালদার চাঁচোলের ইশফাক সাদা বাংলায় আমাদের মাটন চাঁপ আর চিকেন চাঙ্গিজী পেশ করল খামেরি রুটি আর ক্ষীরের সকাশে। ফিরে আসার সময় টিপস পেয়ে মিষ্টি হাসিটা তো ফাউ।

পরের দিন একটু কেনাকাটা করে বিকালের গাড়ি পাড়ি। ফোন ভেসে এল, “চার্লি কলিং ট্যাঙ্গো! তোমরা বই আর কিছু মিছু সব ফেলে গেছ!” আসলে তো আবার একটু সময় বাড়াবার ছল। দুশো নব্বই কিমির দূরত্ব কি পাঁচ মিনিটে মেটে? তাই আবার আসিব ফিরে বলে ফিরে এলাম নিজ গৃহে।

মাঝখানে মেয়ের সঙ্গে মোলাকাত হল ইয়াব্বড় উটের। মেয়ে তো এক কাঠি বাড়া। পার্লে জি নিয়ে উটকে খাওয়াতে যায়। উটের চালক, “ঘরমে খাতা হ্যায় জি!” বলে এক লাফে উটের গাড়ির উপর উঠে মার ছুট। মেয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে! বিস্কুট খেতে দিলে কেউ পালায় নাকি?

মানেসর পেরিয়ে কিছু দূর এসেই গৌ মাতা সেবা ধাবায় চা সহযোগে মিক্সড পরোটা মেরে রাত সাড়ে দশটার মধ্যেই নিজ খুপরিতে। কাল থেকেই তো ছেলের স্কুল আর আমার ঘোড়দৌড় শুরু।

আবার বসে থাকা কবে একটা শুক্র বা সোম শনিরবির লেজুড় হয়ে হাজির হবে। তদ্দিন অপেক্ষায়!

(১২৮)


মাঠ
সবুজ সবুজ ঘন সবুজ ঘাসে ঘাসে পা ফেলে চোখে চোখে হাতে হাত মন মজে যায় মাঠে। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড তখন সবুজের অভিযানে মগ্ন। দিনের মধ্যে মিনিট পাঁচেক সবুজদের দিকে তাকিয়ে বসে থাকুন মন সবুজ হয়ে যাবে পাঠক পাঠিকারা। সবুজের কতই না রঙ, কচি সবুজ পাকা সবুজ, হলদেটে সবুজ, নেড়া সবুজ, ঘন সবুজ, জংলা সবুজ, জলপাই সবুজ। আরে মনটাই তো সবুজ, সবুজ দ্বীপের রাজা!

২২ গজ
ঘন সবুজ হলদেটে ছোপ কোথাও কোথাও এক ফোঁটা টাক তার মাঝখানে একফালি মরূদ্যান সাদাটে স্বর্গের মতো দুপাশে স্বর্গ নরকের গেটে তিনখানি খুঁটি পোঁতা। লাগলে তুক না লাগলে তাক। লাগলেই লাল আলো জ্বলে উঠবে আগুনের। C’mon Man, pitch it on the right spot… সারা জীবন ধরে সঠিক জায়গাটাই খুঁজে গেলাম, যেটা পড়লেই উইকেট বাঁধা, কেউটের ছোবলের মতো স্পিন, বেহালার সুরের মতো স্যুইং, করাতের মতো কাট, স্বপ্নসুন্দরীর মতো ল্যুপ, ব্যাটসম্যানের চোখে মুখে লালা ঝরিয়ে তাকে লক্ষণ রেখার বাইরে টেনে এনে রাবণ বেশধারী ফ্লাইট… Pitch it on the right spot baby!

উইলো
৮৫র সেপ্টেম্বরে গুলমার্গ থেকে একটা পার্চমেন্ট লাগানো কাশ্মীর উইলো কিনেছিলাম। ৬৫টাকা দাম। তারও পরে ৮৭তে ২১০ টাকায় এসজি স্ট্রোকওয়েল। কাশ্মীরি উইলো। ৯২তে এসে প্রথম ইংলিশ উইলো এসজি সেঞ্চুরি। সেটা এখনো রয়ে গেছে মাঝে মাঝেই নেড়ে চেড়ে দেখি, ব্যাট সুইংটা ঠিক আছে কি না। বাবা দেখে বলল, এখন আর কি হবে? অফিসেও তো খেলিস না! স্বপ্নে ম্যকগ্রা আর শোয়েবকে সামলানোর তো হিসাব থাকে না কোন। লাভ ক্ষতি সব স্বপনে মিলিয়ে যায়। Follow the seam Man, নতুন বল পালিশ তোলা অবধি অফস্টাম্পের বাইরে খুচখুচানি নয়। ছাড়া প্র্যাকটিস করো কাকা। ধরার থেকেও ছাড়া বেশী জরুরী। ছাড়তে ছাড়তে সন্ন্যাসী হয়ে গেলেও ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু বিনা যুদ্ধে ক্রিজ ছাড়বে না কখনও। খাড়ুশ! রবি শাস্ত্রী-আর্থারটন-গ্যারি কার্স্টেন!

কিন্তু উইলো তো তুলি! ছবি আঁকতে ডাক পড়ে তাই ভিশি-আজ্জু-মার্ক ওয়া- আর ডেভিড গাওয়ারের। গল্প গাছা যা আছে সব ব্যাটসম্যানদেরই আছে। কজনই বা ইমরান খান হয় বলুন?

চেরি অন দ্য টপ
লাল চামড়ার চারটে টুকরো, ভিতরে কর্ক আর উলের বোনা। তার উপরে ঠিক হিসাব করে ছটা সুতোর সেলাই, লাল সাদা লাল সাদা লাল। গনগনে আগুনের মতো তেড়ে এসে আছড়ে পড়ছে বুকে হেলমেটে হাতে গ্লাভসে প্যাডে বা ব্যাটে। না পারলেই উইকেটকিপারের দস্তানা বা কাঠের কফিন তৈরী গুঁড়িয়ে দেবার জন্য। ফাইট কোনি ফাইট!

রোলার

ছোটবেলায় “তোর বাবা ইডেনে রোলার চালায়” বলে আমায় মাসির বাড়িতে খেপাত। আরও একটু পরে রোলার হেভি রোলার মিডিয়াম রোলার ঘুরে রোলারে মেরে রিফ্লেক্স ক্যাচ প্র্যাকটিস। তার পর দেখতে দেখতে বর্ষা হেমন্ত শীত বসন্ত পেরিয়ে কত যে রোলার বুকের উপর দিয়ে চলে গেল। পিচ তবু অসমান হয়েই রয়ে গেল। লাইফ লাইন- জীবন রেখার মতো। আশির দশকের শেষের দিকে এমকে রায়না আর তনভি আজমি-র একটা সিরিয়াল হতো লাইফলাইন। এখন সেই ধরণের সুন্দর ছোট ছোট আবেগ সিরিয়ালে দেখা যায় না। সকলেই ম্যাক্সওয়েল সকলেই বিগ শো।

আজাহার
আজ হার কিন্তু কাল জিত। ধনুক ভাঙা জ্যা মুক্ত স্কোয়ার ড্রাইভ, জিভ বার করে অ্যাব্রাকাড্যাব্রা লাঠিখেলা, কব্জি মুচড়ে এক্সট্রা কভার থেকে ফাইন লেগ, এক অ্যাকশনে বল ধরে উইকেটে তাক। স্লিপে দুরন্ত রিফ্লেক্স ক্যাচ। কলার তোলা মস্তানি, সঙ্গীতা বিজলানী, আমদানি রপ্তানী। বাঁজারা হিলসে বাড়ি, ফিক্সিং-এ ভাব আড়ি। নিরেনব্বুইয়ে তীরে এসে তরী ডোবে। স্বপ্ন ভাঙতে পনেরো বছর সময় লাগল। পনেরোটা বছর। কৈশোর তখন ক্লিন শেভেন যুবক। কেন কেন কেন? মিয়াঁ কাপ্তান বনোগে?

আক্রম
সাতাশির দুপুর ইমরানের চওড়া বুকের কাপ্তানিতে লম্বা চুলের ব্রণের ক্ষতময় মুখ। অদ্ভুত দুলে এসে আউট স্যুইং ইন স্যুইং অফ কাটার শর্ট আর্ম বাউন্সার, ইয়র্কার আর রিভার্স। পেস বোলিং অন্য ভাবে লেখা হয়ে গেল। শারজায় হোক বা এজবাস্টনে, মেলবোর্ণ বা জর্জটাউন, চেন্নাই বা কেপটাউন- ডায়বেটিস আর ভয়ঙ্করতম কাঁধের অস্ত্রোপচার পেরিয়ে, সীমান্ত পেরিয়ে একজনই বুকে এসে ধাক্কা মারে। ডিউস বলে বাঁহাতি স্পিন হলেও, টেনিস বল ক্রিকেটে পেস, ওয়াসিম আক্রম কপি বুক। বলে বলে ইয়র্কার। পাড়ার ম্যাচ অনভ্যাসের তিনটে ওয়াইডের পরই দুটো দুর্গ ভাঙা ইয়র্কার। ওয়াসিম ভাই জিন্দাবাদ!

এবং শচীন

উননব্বইয়ের এশিয়া কাপের প্র্যাকটিস শেষে ছোট্ট খাট্টো ছোটু বাবু এসে দাঁড়ালেন সামনে। হাতে অটোগ্রাফ খাতা। বাম হাতি শচীনের ডান হাতি ব্যাটিং। ফ্যান না হলেও শ্রদ্ধা কোথায় যায়? মাধুরীও তো পছন্দের অভিনেত্রী নন। তা বলে টুপি কি খুলে সেলাম জানাই না। Respect! Respect!

আরও কত স্মৃতি

৯৬য়ের যে বার বেলায় ধরে নিলাম যে আর হবে না। সেদিন ছিল কোলকাতা কর্পোরেশনের সঙ্গে খেলা বাবার অফিসের। খেলি বছর দুয়েক। অপর দিকে আমার ক্লাব দল হাওড়া ইউনিয়নের অধিনায়ক। সারা মরসুম জুড়ে নিজে ৪০ ওভার বল করে গেল কিন্তু বাম হাতি স্পিনার বলে সুযোগ দিল না। বয়স বাড়ছে। প্রতিশোধ? ব্যাট করতে নেমে তার বলে জীবনের প্রথম রিভার্স স্যুইপ, এক্সট্রা কভারের উপর দিয়ে ছয়। ম্যাচ তবু হাতে আসে না, আউট আম্পায়ারের আঙুল উঠে যায় লেগ বিফোর উইকেট। ঘরবাড়ি ছেড়ে সরে যাবার আগে মাথাটা যদি উঁচু থাকে তো কেয়া বাত মিয়াঁ। স্কুল কলেজ ফার্স্ট সেকেণ্ড ডিভিশন ডিসট্রিক্ট ক্রিকেট ইউনিভার্সিটি সব পেরিয়ে আদিগন্ত ধূসর গোধূলি।

হাউজ দ্যাট
আমার বাবা ইন স্যুইং বল করতেন। মোহন বাগানে যে বছর গেলেন সে বছরই হাঁটু ঘুরল। সালটা ৬৫! তারপর থেকে তিনি সাদা কোট কালো প্যান্ট। স্থানীয় ক্রিকেট পেরিয়ে রঞ্জি দলীপ দেওধর ট্রফি। একবার অরুণ লাল খেলতে খেলতে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, “You are son of Mr. A N Sinha? He is the most sober human being I’ve ever seen on the cricket field. Please remember me with him.” বাবার জন্য গর্বে বুক ফুলে গেল। আমার বাবা! সব সময় পশ্চাৎপটে থাকা আর্ক লাইট থেকে দূরে থাকা বাবা। খেলাটা যিনি আমায় হাতে করে শেখালেন সেই বাবা। সৎ হতে যিনি শেখালেন সেই বাবা। আজ যখন ভুল আম্পায়ারিং-এর জন্য ম্যাচ হেরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এক বন্ধুর দেওয়ালে দেখলাম Son of Umpire=বরাহ নন্দন… কোথায় বাজল বলুন তো?

জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েই তো আমরা জীবনের গাড়ি চালাতে শিখি। উঠতে পড়তে পড়তে উঠতে গড়াতে গড়াতে এগিয়ে যাওয়া। মাথা নিচু না করে সোজা হয়ে বাঁচা। জিততে শেখার থেকেও বড় শেখা হারতে। উফফ আমরা যে কবে হারতে শিখব?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে মুরি মুড়কির মতো করে বিরুদ্ধমতাবলম্বী ব্লগারদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। চারিদিকে প্রতিহিংসা ক্ষোভ বিদ্বেষ আগুন আগুন। উফ এতো বিষ জমে থাকে এই টুকু ক্ষুদ্র মানুষের বুকে?

সেন্সর কাঁচি এবং রোস্টেড হিউমার

খুব ছেলেবেলায় আমি যখন একেবারেই ছেলেমানুষ ছিলাম তখনকার একটা ঘটনা বলিঃ

মহেশ বারিক লেনের খান ৫-৬টা কোঠাবাড়িকে ঘিরে টালির ছাদ আর অ্যাসবেস্টাসের বন্দোবস্ত ছিল। পাশের বাড়ির ছাদে ক্রিকেট খেলতে খেলতে বল যদি সামনের বাড়ির দাওয়ায় পড়ল তখনই বুঝতে পারতাম যে তাদের ডাল রান্না হয় সারা উঠোন জুড়ে। নাহলে বল পড়লেই ডালে? আর তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে বিপ বিপের সমারোহ।

তা তখন তো মন ছিল আয়নার মতো স্বচ্ছ। যা দেখা যেত তারই ছায়া পড়ত। কিন্তু একবার শুধুমাত্র ‘শালা’ শব্দটির উল্লেখ করায় মা জিজ্ঞাসা করল, “তোমার বাবা বলে? কথাটা?” উত্তর ছিল না কোন কারণ ভদ্রলোক হিসাবে আমার বাবার, পাড়ায় এবং নিজস্ব ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুনাম ছিল। আর কে না জানে ভদ্রলোকের বিজ্ঞাপনে চার ছ অক্ষর কেন, দু অক্ষরও থাকে না। তা সেখান থেকেই আমার গণ্ডি কাটা হয়ে গিয়েছিল।

তা তখন মিডল ক্লাস মরালিটির একটা সংজ্ঞা ইতিমধ্যেই ছিল। যেখানে মদ, গাঁজা, জুয়া, সিগারেট এবং পঠন অযোগ্য শব্দের কোন স্থান ছিল না। অবশ্য এখনও মদ বা সিগারেট খাই না শুনলেই লোকে যেভাবে ‘ভালছেলে’ বলে গালাগাল করে তাতে মনে হয় যারা মদ, সিগারেট বর্জন করতে পারেন নি তাদের জন্য নরকের কোণা সংরক্ষিত আছে।

মানব চরিত্র বাহ্যিক আনুষঙ্গিকের মাধ্যমে তো চিত্রণ হয় না, তা হয় তার অন্দরের সৌন্দর্যের মাধ্যমে।

যাই হোক, আরেকটু বড় হয়ে পর্যন্ত পারিপার্শ্বিকে ‘বাপের সম্মান’ রক্ষার দায় ও দায়বদ্ধতা হাঁফ ধরিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল।

তবে কেন জানি না, বাইরে থেকে বিদ্রোহীসুলভ রঙ তামাশা থাকলেও অদৃশ্য গণ্ডি কখনই পার করা হয়ে ওঠে নি।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খোলা বাতাসের মধ্যে শ্বাস নেওয়া শুরু করলেও নিজের মত করে মরালিটির ভূত বেতাল হয়ে চেপে বসেছিল ঘাড়ে। তবে সেটা নিয়ে তো বিশেষ সমস্যা নেই, আমি কি খাব বা পড়ব বা ভাবব সেটা একান্তভাবেই আমার সমস্যা বা অসমস্যা। কিন্তু আমার ভাবনা যখন অপরের ভাবনার সঙ্গে ভাব না করে আড়ি করে এবং সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে ইন্দ্রিয়ের বিবাদভঞ্জনের উদগ্র ইচ্ছা নিজস্বতার চাদর ফাটিয়ে চিৎকার করে ঠিক ভুল নির্ণয় করতে চলে যায় সেখানেই যত গোল বাধে। আপনার ভাবনা যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার সেখানে পেটে গ্যাস ছাড়া কোন কিছু দুষ্ক্রিয়া হবার সম্ভাবনা কম। কিন্তু যেই তা জনসাধারণের হয়ে গেল ব্যাস সেখানেই ব্যক্তিগত চৌহদ্দিতে টান পড়ল।

আমার কাছে যা ঠিক তা আপনার কাছে ভুল মনে হতেই পারে। তার মানে কি আপনিই ঠিক বা আমিই ভুল? তা তো নয় দাদা! স্থান কাল পাত্র এবং পানীয়ের ফেরে সকলেরই নিজস্ব মতামত অজুহাত এবং খয়রাত আছে। ক্ষুদিরাম একশ বছর আগে সন্ত্রাসবাদী হতে পারে কিন্তু পঞ্চাশ বছর পরেই তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীর মর্যাদা পেতে পারেন। এখানে পানীয়ের ফের নেই কিন্তু স্থান কাল তো আছেই।

পাত্রের ফেরের হিসেবও তাহলে দিয়ে দিই, কি বলেন? এই যে ষাটের শেষ আর সত্তরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেই যে কচি কচি তাজা তাজা সবুজের আহ্বানেরা রোমান্সের ডাকে ময়দানের কাকভোরের এনকাউন্টারের শিকার হল, তারা কি ক্ষুদিরামের থেকে বা ভগত সিং-এর থেকে অন্য কিছু ভেবেছিল? সমাজ এবং মানবজীবনে ঊষা ডেকে আনার স্বপ্নে সামান্য দশ বাই দশের জানের পরোয়া করে নি তারাও, যেমন ক্ষুদিরামও করে নি। তাইলে? আজকের যুগে গান্ধী বা সুভাষকে মাইক্রোস্কোপে ফেলতে গেলেও কালের ঝুলন্ত কাটারিটাকে ভুলতে পারি না।

এবারে আসুন মোদ্দা কথায়। কয়েকদিন আগেই সর্বভারতীয় বক্তিমবাজদের একটি পোড়ানো সভা অনুষ্ঠিত হল, তাতে করণ জোহর বরকত্তা হিসাবে এবং রণবীর সিং ও অর্জুন কাপুর বর হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। আর তার কয়েকদিনের মধ্যেই সেন্সর বোর্ডের মহাকর্তা এবং ‘সরকাইলে খাটিয়া’ ‘অঙ্গনা মে বাবা দুয়ারে পে মা’ ইত্যাদি খ্যাত শ্রী পহেলাজ নিহালনীর মোজেসসুলভ দৈববাণী ঘোষিত হল।

যদিও দুটি ঘটনার মধ্যে কোন যোগসূত্র নেই, তবু একটা তৃতীয় ঘটনার আমদানি ঘটল। দেশ জুড়ে, বিশেষত গৌবলয়ের গেরুয়া নামধারীরা ফতোয়া জারি করলেন ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে জোড়ায় দেখা গেলেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে। তা বাবা- মেয়ে, কাকু- ভাইঝি, মা-ছেলে, মাসি-বোনপো অথবা ইতিমধ্যেই বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী যেই হোক না কেন।
তার প্রতিবাদে কয়েকটি ছাত্র সংগঠন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে মিছিল করল, আর কয়েকটি তো একহাত এগিয়ে সিঁদুর, শাঁখা নিয়ে মিছিল করল, যে ‘দাও হে সিঁদুর ভরে দাও’। তা ভারতীয় এবং বিশ্ববাসী এইসব নিয়ে বেশ আছে। তাদের কাছে মহামারী কোন ইস্যু নয়, মারামারিও কোন ইস্যু নয়। এসব তো হামেশাই হয়ে থাকে।

তাইলে? এবার দাদা আমি একটু ঝেড়ে কাশি। প্রথমে দ্বিতীয় ঘটনাটিই নিই। তবে দ্বিতীয় ঘটনাটাকে নিতে গেলে একটু পিছিয়ে যেতে হয়। ঈশ্বরের বার্তাবাহক বলে একটি সিনেমা অবান্তর গল্প আর অদ্ভুতুড়ে হিরোর পাল্লায় পড়ে সেন্সর বোর্ডের দরজার ছিটকিনিতে আটকা পড়ে গেছিল। কিন্তু সিনেমার প্রযোজক, প্রকাশক, নির্দেশক, গায়ক, নায়ক এমন কি দর্শক রামরহিম বাবা আবার লোকসভা নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের হয়ে প্রচার করেছিলেন। শাঁখের করাত হয়ে ওঠার আগেই ভিতরের কলকাঠিতে সেন্সরবোর্ডের গণপদত্যাগ এবং নতুন বিশ্বাসী গোষ্ঠীর আনয়ন ঘটে।

পহলাজ নিহালনী হলেন সকল ‘কা’ ‘কা’ কারীদের প্রধান। তিনি বহুকাল যাবত, সরাসরি বিনোদন জগত থেকে দূরে আছেন। কিন্তু সিনেমার পোকা একবার যাকে কামড়ায় তার রোগ যাবার নয়। ফলে এক কথাতেই রাজী। আর আনুগত্য প্রদর্শন করতে আগ বাড়িয়ে হিটলারি হুকুম দিতে তো এখন কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে। যেমন ‘নির্মল ভারত অভিযান’-এর তাড়ায় সংস্কৃতি মন্ত্রকের থেকে হুকুম হয়েছে যে অনুদান পেতে গেলে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিকেও ঝাড়ু হাতে কিছু না কিছু করে দেখাতে হবে। তা শৈল্পিক এবং সাংস্কৃতিক ভাবে হলেও করতে হবে। তা নিহালনী সাহেব জারি করলেন ছছ্রিশ বেদবাক্যের একটি তালিকা।

সেই তালিকা অনুযায়ী, বসন্তী বিপেদের সামনে নাচবে না। গব্বর চিৎকার করে বলবে, “বিপ, ক্যা সমঝা? কে সর্দার বহুত খুশ হোঙ্গে?” অমরীশ পুরি অধিকাংশ সিনেমায় বিপভাষী হয়ে থাকবেন এবং শক্তি কাপুর পলিগ্যামি ছেড়ে বিপগ্যামি অনুশীলন করবেন। সবথেকে মুশকিল হল তাঁদের যারা ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করে অতীতের গলিতেই ঘুরতে চান তাদের। তারা আর ঘুণাক্ষরেও বোম্বেতে থাকতে পারবেন না। ডালহৌসি, কনট প্লেস, মেরিন ড্রাইভ, সান্তাক্রুজ, কাব্বন পার্ক, জিমখানা, টালীগঞ্জ, গড়িয়ার উপর খাঁড়া নেমে আসত। কিন্তু নিহালনী সাহেব তো আর যশ চোপড়া নন, তাই বোম্বে থুড়ি মুম্বইয়ের রাস্তা ছেড়ে তিনি বহুকাল বাইরে যান নি। তাই তাঁর স্বয়ংক্রিয় খাঁড়া মুম্বইতে এসেই থেমে গেল।

অনেকে অবশ্য এরকম কথা বলছেন যে নব্বই দশকের পর যেহেতু নিহালনী সাহেব ‘সেইরকম’ ছবি বানান নি তাই অতীতের উপর অভিমান করে অস্বীকার করতেই তাঁর এই শুদ্ধিকরণ প্রচেষ্টা। যেমন প্রীত ভারারা, ভারতীয়ত্ব ত্যাগ করে অ্যামেরিকানত্ব গ্রহণ করার তাগিদে ভারতীয় দেখলেই ফাঁসিতে লটকে দিয়ে নগ্নতল্লাশির দাওয়াই দিতে উঠে পড়ে লাগেন আর কি।

তা এর বিরুদ্ধে তো প্রতিবাদ হবেই- সঙ্গত প্রতিবাদ। কেউ কেউ মোদী সাহেবকেও অবগত করাবেন, যে আখেরে দিল্লির আম দরবারে শুকনো খরা চলে এসেছে, এবং আজকের এই লাভ জেহাদ আর চারখান হিঁদু সন্তানের দাবীর মাঝখানে সিনেমার কাঁচি যদি ললিতা পাওয়ারের নজর হয়ে দেখা দেয় তাহলে আখেরে ত্বকের যত্ন নিতে বোরোলীনেও কাজ হবে না। মোদী সাহেব অবশ্য সামনাসামনি কারুর কাজেই ডানহাতের তর্জনী ব্যবহার করতে চান না। আর ভিতরের কলকাঠির খবর কেই বা রাখতে গেছে।

দ্বিতীয়ত আসি প্রথম ঘটনাটিতে, ‘এআইবি’ বা সর্বভারতীয় বক্তিমবাজদের জন্ম হয় বেশ কিছুকাল আগে পশ্চিম থেকে আগত বাবাগনুশ মার্কা স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ানদের অভিযোগ থেকে। মানে পাপা সিজে রাসেল পিটার্স ইত্যাদিরা আমাদের বীর দাসদের সঙ্গে মিলে ভারতীয়দের নিজেদের উপর হাসার অপারগতা নিয়ে কান্নাকাটি করেছিলেন, আর ফল স্বরূপ পাশ্চাত্য ধারণায় মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিয়ে এআইবির উৎপত্তি বা ব্যুৎপত্তি। এখন এআইবি-র যারা সদস্য গুরসিমরণ খাম্বা, রোহণ জোশী, তন্ময় ভাট এবং আশিস শাক্য তাঁরা কয়েকটি ইউটিউব ভিডিও বানিয়ে ভারতীয়দের গাঁট কেটে বেশ খ্যাতিই পেয়েছিলেন। এনাদের কয়েকটি ভিডিও বিশেষত নারী শরীরের বাণিজ্যিকরণ, আলিয়া ভাট, কংগ্রেস বনাম বিজেপি ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয়তাই পেয়েছিল। কিন্তু তালগাছের শখ যাদের থাকে তাদের কলাগাছে দোল খেতে কি ভাল লাগে?

তাই এআইবি রোস্ট এবং বিতর্ক। এখন উপরের অনুচ্ছেদ দেখে এমনিতেই বুঝতে পারছেন যে ভারতীয়দের (অবশ্যই সর্দাররা ছাড়া) নিজেদের উপর ঠাট্টার বিষয়ে মানসিকতা এখনো সেই সিপাহী বিদ্রোহের আগের জমানার। তাই সরাসরি আক্রমণ যদি বেডরুম ছাড়িয়ে বাথরুমে চলে যায় তাহলে কি মানা যায়? বিশেষতঃ সাধারণ ভদ্রতার সীমা গ্রাউণ্ড ফ্লোরে ফেলে চ্যাটার্জী ইন্টারন্যাশনালের ছাদে হাওয়া খেতে উঠে গেলে? ব্যাস এফআইআর- এর লাইন লেগে গেল। এমনিতেই আলিয়া ভাট আর হিরু জোহর দীপিকা পাড়ুকোনের শয্যাদৃশ্য কল্পনা করে একই প্রেক্ষাগৃহে হাসছেন এই দেখতে ভারতীয় দর্শক এখনও তৈরী নয়। তার উপর ধর্ম, বর্ণ এবং সর্বোপরি লিঙ্গভেদ নিয়ে পাতে দেবার অযোগ্য মস্করা।

আসুন দেখি বিদগ্ধ জনেরা কি বলছেন। বোন অর্পিতাকে নিয়ে দুষ্টু চুটকির প্রতিবাদে প্রথমেই সলোমন খান তন্ময় ভাটের অ্যানাটমি বিগড়ে দেবার হুমকি দিয়েছেন। করণ জোহর বলেছেন, যাদের পছন্দ নয় তারা দেখবে না বা শুনবে না। করণ, অর্জুন, রণবীর, দীপিকা, আলিয়া, সোনাক্ষী সহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অশ্লীলতা বা অশালীনতার অভিযোগে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। তাতে আলিয়ার বাবা মহেশ খেপে গিয়েছেন কিন্তু তাঁর মাথায় জল ঢেলে দিয়েছেন সোনাক্ষী এই বলে যে ছেলেপুলেরা বড় হয়েছে এবার নিজেকেই সামলাতে দিন। আর সব নিয়ে যদি মাথা ঘামাতে হবে তো মহেশ ভাটের মতই টাক পড়ে যেতে পারে। ওদিকে ফিল্ম বিশ্বের যুগপুরুষ ‘সত্যমেব জয়তে’র পরিবেশনকারী মহান আমির খান করণ, রণবীর ও অর্জুনকে সেলিব্রিটি হিসাবে আরও দায়িত্ববান হবার পরামর্শ দিয়েছেন। তার উত্তরে এক ব্লগার প্রথম বিষোদ্গার করেন এবং আমিরের একদা সহকর্মী পূজা ভাটও আমিরকে বিখ্যাত ‘দিল্লি বেলী’র কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আমির তাতে একটু চেপে গিয়ে বলেছেন, ‘দিল্লি বেলী’তে তিনি তো সরাসরি গালাগাল কাউকেই করেন নি। তার সিনেমার চরিত্ররা করেছেন। যদিও তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যার পছন্দ হবে না সে দেখবে না!’ তাতে আবার কানাডিয়ান ভারতীয় রাসেল পিটার্স আমির খান কে নিজের চরকায় তেল দিতে বলেছেন, কারণ পিটার্সের নিজের জামাকাপড় চরকায় নয় উলের কাঁটায় হাতে বুনে তৈরী হয় এবং তাতে তেলের কোন দরকার পড়ে না। শেষ মেষ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির স্বনিয়োজিত সাফাইকারী টুইঙ্কল খান্না (রাজীব ভাটিয়ার মতো প্লে বয়কে পনেরো বছর ধরে চাবকে সোজা রেখে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তথা সমগ্র বিশ্ব সমাজের যে উপকার তিনি করেছেন তা সারা বিশ্ব দুশো বছর পরেও মনে রাখবেন), আবার নিজের ব্লগে ঘোষণা করেছেন, ‘যাও যাও সব নিজ কাজে!’ অর্থাৎ সারা বিশ্বে এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আশয় আছে সেখানে গিয়ে নাক পেন্সিল করো হে সব।

সব মিলিয়ে জমজমাট অবস্থা। তবে সাধারণভাবে আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে আমি সামগ্রিক ভাবে মরাল পুলিস নিয়ে আদেখলাপনার বিরোধী। মনে করি যে যা ভাল তা নিজে থেকেই থেকে যাবে, আর যা নিম্নরূচীর বা নিকৃষ্ট তা আপসেই মুছে যাবে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, আমাদের বাকস্বাধীনতাকে বাক…এর শেষ স্টেশনে নিয়ে চলে যাই। আত্মনিয়ন্ত্রণ তখন পরস্মৈপদী শব্দ হয়ে দাঁড়ায়। আর তখনই গোলযোগ। আমার যা ভাল লাগে তা অপরের ভাল নাও লাগতে পারে এই বোধটাই কোথায় যেন চাপা পড়া মানুষ হয়ে যায় আর মস্তিষ্কের রাজপাট রাইটার্স থেকে নবান্নে পাড়ি লাগায়।

সংবেদনশীলতা এবং বাকস্বাধীনতার একটা নমনীয় মোড়ে আমরা দাঁড়িয়ে। না পারি ছাড়তে, না পাড়ি ধরতে। বাকস্বাধীনতা খর্ব করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে গর্জে উঠি কিন্তু নিজগুণে সংবেদনশীলতা না দেখাতে পেরে অপরের ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

চোর চুরি করে বলেই কি না পুলিশের মাহাত্ম্য? সব কি আর অপাপবিদ্ধ উত্তরাঞ্চলী গাঁও? বিশ্বাসের বস্তু তর্কের থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে যাবে? আসল কথা হল ব্যালেন্স বা ভারসাম্য। যা আমাদের জীবন ট্রাপিজের খেলায় পোক্ত সাইকেল চালক করে তুলবে। পরের জুতোয় পা আমরা তা ঝেড়ে দেবার জন্যই গলাব না, তার জায়গায় নিজেকে রেখে নিক্তিতে মেপে পা ফেলতেও কাজে লাগাব।

সেই সকালের কল্পনা করতেই পারি যেখানে টিটকিরিটাকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে নির্মল হাসির দিকে ঝুঁকব। কিন্তু অপ্রাপ্তমনস্কতার নামে খামোখা আমার অপছন্দকে সামনে রেখে মরালিটির বিচারকের ভূমিকা পালন করব না। তাই দাদা, মন খুলে খেলুন, সম্পূর্ণ মাঠটাই আপনার, কিন্তু অপরকেও খেলতে দিন। আপনার বাপের সম্পত্তি হলেও। ভাগ করে নেবার মধ্যেই যে পাবার আনন্দ লুকিয়ে আছে। কি বলেন?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, হিন্দু সেনাদের মুখপাত্র নতুন ক্যাম্পেন শুরু করেছেন, ‘বেটি বাঁচাও, বহু লাও’! সত্যিই, কবে যে এদের নবি হাজির হবেন? ও হো নবি বলতে মনে পড়ল, মোদী সাহেব স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মুখ খুলেছেন, বলেছেনঃ ‘প্রত্যেকেরই অপরিহার্য অধিকার আছে নিজধর্ম বজায় রাখতে ও পালন করতে’। রবি ঠাকুর ও বিবেকানন্দকে সাক্ষী রেখে বলেছেন, স্বাগত জানাবার এবং সম্মান প্রদর্শনের ভারতীয় ঐতিহ্যের কথা। কোথাও না কোথাও তো শুরু করতেই হয়। বলুন?

(আদরের নৌকায় প্রকাশিত)
(কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ সরোজ দরবার)