১৮১

কী আর করা যাবে। ক্লাস টু থ্রিতে পড়ার সময়, আমার কেন জানিনা মনে হয়েছিল ‘পার্টি-পলিটিক্স’ নিয়ে আলোচনা করা আমাদের মতো কচিকাঁচাদের নিষিদ্ধ কাজ। বাবা-মা ভোট দিতে যেত, কিন্তু এসে কিচ্ছুটি বলত না কাকে দিয়েছে। আটাত্তর সেভাবে মনে নেই, কিন্তু আশিতে ছিল সুনীল মৈত্র আর অজিত পাঁজা। আর পার্টি বলতে তো দুটো ‘সিপিএম’ আর ‘কংগ্রেস’।

তারপর চুরাশি, উননব্বই একানব্বই ঘুরে ভোট দেবার অধিকার পেলাম যখন, তখন ভোট ফোট কিচ্ছু ছিল না। জীবনের প্রথম ভোট দিই চুরানব্বইতে এসে। ভোটার আইডি কার্ড হচ্ছিল। কী ভাগ্যি আমার আইডি কার্ডে আমার একটা হ্যাণ্ডসাম ছবি ওঠে। পাশের বাড়ির ‘বড়দা’র বয়স তাঁর বাবার থেকে তিন বেশী ছিল আর এক কাকিমার কার্ডে ছবি তাঁর পিসিমার লাগানো ছিল। তখন সবাই জানত যে একবার ভোটার কার্ডে যে ছবি লেগে গেছে তা আর পালটাবার নয়। যে কাকিমার তাঁর পিসিমার ছবি লেগে গিয়েছিল। তিনিও বিফল মনোরথ হয়ে সেইরকম সাজপোশাক পরতে শুরু করে দিয়েছিলেন। অবশ্য বড়দা নিজের বাবাকে প্রাণে ধরে নাম ধরে ডাকতে পারেনি।

সে থাক, তারপর দিল্লি চলে এলাম। নিরেনব্বুইতে। কার্গিল আর তেরোদিনের সরকার পেরিয়ে বাজপেয়ী তখন ফুল স্যুইং-এ। দিল্লিতে এসেই ভোটার কার্ডের জন্য আবেদন করলাম। ওদিকে শেষপ্রান্তের বামপন্থীরাও আমার কলকাতার পাড়ায় ফুল স্যুইং-এ। আমি দিল্লিতে আসার তিনমাসের মধ্যেই ‘কমপ্লেন’ করে আমার ভোটার লিস্ট থেকে নাম কাট। প্যান কার্ড আসতে আসতে ওয়াইটুকে। অর্থাৎ, মাঝের মাস ছয়েক অফিসের আইডেন্টিটি কার্ড ছাড়া আমার কোন পরিচয় ছিল না।

আর ছিল ফর্ম সিক্স। এদিকে ইলেকশন ডিউটি পড়ছে সরকারি অফিসার হিসাবে, আর ওদিকে ফর্ম সিক্স বার চারেক ভর্তি করেও ইলেক্টোরাল রোলে নামের জায়গায় ফাঁকাই থেকে যাচ্ছে। শেসে হাল ছেড়ে দিয়ে বাড়ি কিনে ফেললাম। গাজিয়াবাদে।

গিয়েই ফর্ম সিক্স, আবার। কিন্তু এবারে ফিল করে জানলাম আমার নাম ইতিমধ্যেই দিল্লির ভাড়া থাকা এলাকায় উঠে গেছে। সেখান থেকে নতুন বাড়িতে চলে আসার দিন পনেরো পরে।

এর মধ্যেই আবার পদাধিকার বলে প্রিসাইডিং অফিসার হয়ে দিল্লির নজফগড় এলাকায় ভোট করে এসেছি, ঠাঁট সে। সে কী দারুণ ভোট। একদিকে সাড়ে ছফিটের জাঠ হিন্দু আর আরেকদিকে সাড়ে ছফিটের দেওবন্ধী মুসলিম। এরা বলে আমায় দেখ আর ওরা বলে আমায়। আমি প্রিসাইডিং অফিসার বলে কী খাতির! এ আলু পরাঠা আনে তো সে আনে তন্দুরি চিকেন। কিন্তু প্রিসাইডিং অফিসার। কোনটাই খাব না। শেষে সময় করে রাত দুটোয় করে আনা শুকনো স্যান্ডুইচ চিবোতে চিবোতে বিকেল তিনটে।

ছাপ্পা চলছে। কিন্তু তার একটা প্যাটার্ন দেখতে পাচ্ছি। কংগ্রেসের ছাপ্পা দেওয়াতে নিয়ে এলে বিজেপি তার হয়ে সালিশি করছে আর বিজেপির ক্ষেত্রে কংগ্রেসি পোলিং এজেন্ট। মায়াবতীর হাতিপার্টিকে কেউ পোছে না। তাই তার হয়ে ছাপ্পা দিতে আসা লোকের কেউ মাইবাপ নেই।

কিন্তু ছাপ্পা কতক্ষণ চলতে পারে? একটাকে আমি নিজেই ধরলাম। চুর হয়ে আছে, ধেনো খেয়ে। আমায় চ্যালেঞ্জ করে বলল, ‘কেয়া কর লোগে, ইয়েল্লো পোঁছ ডালা। ফির আউঙ্গা!’ আরেচ্ছাতা। মুঝসে পাঙ্গা! ইনডেলিবল ইঙ্কের দোয়াতটা নিজে নিয়ে বললাম, ‘দোনো হাত নিকাল শালে!’ তারপর পুরো দুহাতের মধ্যমার নখ থেকে কবজি পর্যন্ত টেনে দিলাম। ডানহাতে ঘড়ি পরা ছিল। তার উপরেই দিলাম ঘুচিমুচি করে। ‘লেহ, এবার কত ওঠাবি ওঠা!’

তা ছাপ্পার চক্করে অজ্জিনাল ভোটার এসে হাজির। আর আমার তো মাথায় হাত। তখন সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ করে দিল। বোরখা পরা ছিল। ঘাঁটাইনি। এখন আসল এসে বলে ‘আমার ভোট কই?’ ল্যাহ! এ যদি কমপ্লেন ঠোকে পাঁচ কপ্লি করে তিনবার ফর্ম ফিলআপ করাতে হবে। শুনোয়াই, জাজমেন্ট। খেয়েছে। পোলিং এজেন্টগুলো মাইডিয়ার মাইরি। এই ক্ষেত্রে কংগ্রেস বিজেপি বিএসপি সব এককাট্টা হয়ে বলল, আন্টিজি আইয়ে প্লিজ। আমার দিকে বরাভয় মূর্তি দেখাল। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর। মিনিট পাঁচেক। তারপর জানলা দিয়ে দেখি আন্টিজি খুশী মনে ভোট না দিয়েই বাড়ি যাচ্ছেন।

তা এসব করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর চারটে। কিন্তু তাতে কী, অভিজ্ঞতাই তো!

তারপর? তারপর আর কী, পদোন্নতি হয়ে গেল। পোলিং ডিউটির যাঁতাকলের বাইরে।

কিন্তু ভোটদান বেশ চলছিল। বাধ সাধল ২০১৩র কর্পোরেশন ইলেকশন। রুলিং পার্টির হঠাৎ মনে হয়েছিল, অ্যাপার্টমেন্টবাসীরা তাদের ভোট দেয় না। ব্যাস আর কী, ফচাং করে নাম উড়িয়ে দিয়েছে। আবার ফর্ম সিক্সের চক্করে। আবার নাম ওঠে ফোটেহ না।

আর এর মধ্যেই আশেপাশের সূর্য মাটি ঘাসের রঙ কেমন গেরুয়া হয়ে গেল। পাশের ফ্ল্যাটে এক টেটিয়া বাঙালি ছিলেন। আর আমি। অ্যাপার্ট্মেন্টের গেটে লাগানো ফুলের পতাকা উপরিয়ে ফেলে দিতে দু সেকেন্ড লাগেনি। যেমন লাগেনি ফুলছাপ প্রত্যাশী কর্পোরেটরকে এটা বলতে, ‘আমার তো ভোটই নেই। আগে ভোট করান তারপর না হয় ভাবব দেব কি না’।

পাশের বাঙালি আবার আমার থেকেও দর। বলে বসলেন, ‘ভোট নেই, থাকলেও ফুলে দিতাম না!’ কর্পোরেটর আর কী করবে, আমতা আমতা করে এদিক ওদিক করে কেটে পড়ল।

তা এরই মধ্যে চলে এলাম দিল্লিতে। তবুও টান তো থেকেই যায়। তেরোবছরের টান। নাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ছিঁড়ি বললেই কি ছাড়ে। তাই মাস দেড়েক আগে এক বন্ধুর দেওয়া লিঙ্কে আধার কার্ড ছবি সহ আবেদন করে দিলাম। দিলাম তো দিলাম, ভাবিওনি।

হঠাৎ দিন দুয়েক আগে গাজীয়াবাদের অ্যাপার্ট্মেন্টের সেক্রেটারি হোয়াটসঅ্যাপ করলেন, ‘সিনহা জী, আপকা ভোটার আইডি মেরে পাস হ্যায়! লে লিজিয়ে গা।’

ভেবেই নিয়েছিলাম, দেশ গড়ায় আর অংশীদার এবারেও হওয়া হল না বোধহয়। কিন্তু কপালের নাম গব্বর সিং। আজ তাই সক্কাল সক্কাল গিয়ে দিয়ে এসেছি ভোট। হ্যাঁ এ বলতেই পারেন তাতে কী হল? যে আসবে সেই তো সামনে পিছনে দু দিকেই চুনকালি মাখিয়ে দিয়ে যাবে। কিন্তু তার উত্তরে আমিও বলতে পারি, ‘কিন্তু দশ বছর পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এটা তো বলতে পারব যে এমন তো নয় চেষ্টা করিনি।’ উই ডিজার্ভ দ্য লিডার অ্যান্ড পলিটিশিয়ান্স উই হ্যাভ। বাট চলন্ত বাসে হাত দেখিয়ে একবার ওঠার চেষ্টা করেই দেখি না, হয়তো আমার জন্য দাঁড়াল বাসটা। কোন না কোনদিন। গণতন্ত্রে যে লোকটা ভাবনাচিন্তা করে আর যে মস্তিষ্ক জমা রাখে দুজনেরই ভোটের দাম এক। কিন্তু ভাবনাচিন্তার লোকেরাই যদি কুলুপ এঁটে বসে থাকে তখন জোতদার, মহাজনদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পায়। তাই না?

আর ইয়ে কাকে দিলাম বলতে বলবেন না কিন্তু! গরমেন্ট সার্ভেন্টদের প্রকাশ্যে রঙ দেখাতে নেই। তার চেয়ে বরং মধ্যমা দেখাই! ‘কিসসু হবার নয়’ চিন্তাভাবনাটাকে! কী বলেন! দিয়েই দিলাম ছবিটা! 😁😄

আর দ্বিতীয় ছবিটা, ‘মা যা ছিলেন আর মা যা হইচেন!’

Advertisements

(১৮০)

কেমন যেন সিনিক হয়ে যাচ্ছি বলে মনে হয়। রঙের উৎসব এলেই চালচলনে তা স্পষ্ট হয়ে যায় আমার। এই যেমন ধরুন তিন চার কদম দুম করে দ্রুত হেঁটে গেলাম। আর তারপরেই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লাম। লোকজন ফিরে ফিরে দেখে। কিন্তু আমি তো জানি! হুঁ হুঁ বাওয়া। একটা বেলুনও যদি গায়ে পড়ে।

ট্র্যাপ বা স্কিট শ্যুটিং দেখেছেন? একটা ক্লে পিজন ছুঁড়ে দেওয়া হয় আর সে নিজস্ব পথে শ্যুটারের সামনে দিয়ে পরিভ্রমণ করে। আর শ্যুটার ঠিকঠাক অনুমান করে ‘ঠাঁই’ করে বন্দুক ফাটিয়ে দেয়। আমাদের বেলুন শিকারিদের অবস্থাও তথৈবচ। আসলে আমাদের সংস্কৃতিতেই ঢুকে গেছে। ছিল বটে আগে বাঁদুরে রঙ, সিলভার বা সোনালি! রাস্তার পাঁক, আর না জানি হাবিজাবি কত কী ভয়ঙ্কর। কিন্তু তাও ভীমের মতো সামনাসামনি যুদ্ধ হত। তারপর দিনের শেষে কুরুক্ষেত্রে পাশাপাশি বসে দুজ্জুধনের গা ছোবড়া দিয়ে ঘষে দেওয়া।

এক একটা বেলুন আসলে এক একটা পার্সেল। আপনার সুপ্ত ইচ্ছাগুলোকে গিঁট বেঁধে পেটে জল ভরে নিয়ে চলে যায় টলমল অবস্থায়। এক সেকেন্ড, সেকেন্ড দুই! তারপরেই ঠিক-বেঠিক জায়গায় গিয়ে ফেলে ছড়িয়ে লাট করে।

ছেলেপুলেদের রঙ মাখানোর ইচ্ছে হলে পিঠ পেতে দিই। যত খুশী মার ভাই, গান্ধীজীর গাল আর আমার পিঠ। গাল দুটো থাকায় এগিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু পিঠ? পিঠে খাই পেটে তো সয়ই। পিঠেও সয়।

তবে সোশাল মিডিয়া এসে থেকে মেঘনাদদের বাড়বাড়ন্ত। অর্জুনও তো আড়াল থেকে মেরেছিল। দ্রৌপদী যেমন হাসির ছররা ছুঁড়ে দিয়েছিল দুজ্জুধনের অপমানের রাজতিলকে। ঠিক সেভাবে, খলবলিয়ে পাঁচতলার উপরে উঠে যাও। পুরসভার ট্যাঙ্কি খালি কর। আর ফটাস ফটাস করে মারো আড়াল থেকে। একটা ভাগ্যহত, দুটো হতভাগ্য, তিনটে, চারটে, পাঁচটা হতভাগা! কেউ কান চেপে কেউ, ‘মাগো’ বলে পিঠ চেপে কাতরাতে কাতরাতে যাচ্ছে।

সব সোশাল মিডিয়ার মতো কেস। সেই ফিসফাসে লিখেছিলাম না, সোশাল মিডিয়া এসে যাওয়ায়, পাঁচফুট পাঁচের শিড়িঙ্গে বাঙালি, ছফুট ছয়ের বটগাছ জাটগুর্জরকে অনায়াসে বলতে পারে, ‘আরে … দম হ্যায় তো বাহার নিকল’। আর জাটগুর্জররা ছিঁচকেমি জানে না। তারাও পট করে লিখে দিয়েই খালাস, ‘আইব্বাপ, ম্যায় তো ডর গয়া!’

এখানেও তাই। ক্লাস টিচার কানমুলে দিচ্ছে, (ও আজকাল তো আবার গায়ে হাত তোলা বারণ। গায়ে হাত ‘দেওয়া’ অবশ্য নয়!) গার্লফ্রেণ্ড গাল (অ্যাজ ইন চিক অ্যাবিউসেস) দিচ্ছে অথবা গাল (অ্যাস ইন চিক ডাসন্ট গিভ চিক) দিচ্ছে না, বাবা-মা পকেট মানি দিচ্ছে না, মেকানিক বাইক ডেলিভারি দিচ্ছে না (পরশু দুটো কুকুর ছানাকে বাইক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করার পর)। সব রাগ গিয়ে ফেল, পথচারীদের উপর।

অথচ সামনাসামনি এলে আমিও আদর করে ‘মুনুমুনু’ করে দিতাম। সেই ধৈর্য নেই।

কালকেই যেমন। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আমি চলতে চলতেই দেখলাম সামনে ছোটখাটো এলোপাথাড়ি জলের দাগ। ব্যাস টনক টানটান! সেই চলা শুরু করলাম। হুস করে দু কদম, মেরেই গদাই লস্করি। খপাখপ তিন কদমে হঠাৎ থামা। ব্যাস শিলাবৃষ্টি শুরু হল, খান তিনেক তিন কদম পিছনে পড়ল খান দুয়েক দু কদম আগে। আসলে টার্গেট হচ্ছে না তো। গতবছর বাইক নিয়ে গুজিয়া কিনতে বেরিয়েছিলাম। এমন জোর বেলুন উড়ে এসে কানের কাছে ফাটে যে…। নাহ, টাল সামলে নিয়েছিলাম। কিন্তু কখনও কখনও নেওয়া যায় না। দশ মিনিট ধরে কানে পোঁ।

তাই বলছি, মহায়! শিকে রাকুন! টেঁড়বেঁকিয়ে হাঁটবেন। বেলুনওলা বালাকোটের জায়গায় ট্যালাফোট-এ ফেলবে ‘পেলোড’। ছাতি আপনার ছাপ্পান্ন না হলেও ছেচল্লিশ হতে বাধ্য। কেমন? হ্যাপি হোলি, গাজিয়াবাদ ফাজিয়াবাদে আবার হোলির দিন খুনখারাপি হয়।

আমার আবার ইচ্ছুক ব্যক্তি সামনে এসে কলকলিয়ে রঙ লাগাতে এলে ভালোই লাগে। হর্মোনের ব্যাপার স্যাপার আর কি! আমি নিজে খুব বেশি কারুর উপর জুলুম করি না। বছর পাঁচেক আগে, পাশের অ্যাপার্টমেন্টের ধাড়িগুলো এসে আমাদের বাচ্চাগুলোর উপর ট্রাম্পসুলভ বম্বিং করছিল বলে রে রে করে পুতিন হয়ে তেড়ে যেতেই, দামড়াগুলো ‘মাম্মি’ বলে নিজেদের বড়গুলোকে টেনে আনে। একজনের মা এসে বললও, ‘শরম নেহি আতি ভাইসাব, বাচ্চো কে সাথ!’ আমি হেসে বললাম, ‘আন্টি দিল তো বাচ্চা হ্যায় জি, আপ ভি আ যাও!’ রঙ লাগানো ছিল বলে বুঝলাম না কী মনে হল তাঁর।

যাই হোক দুষ্টুমি করবেন না। বয়স হচ্ছে, এমন ভাববেন না যে আপনার হোঁদল কুতকুতে চেহারায়, পাশের বাড়ির চকিতচপলা চঞ্চরী মরে বসে আছেন। তিনি কিন্তু মনে মনে হৃত্বিককেই জল ঢালেন। আপনি আজ না হয় একটু ‘ডামি’ হবেন। ভাং টাং? চালান পান্সি বেলভিউ রোড। খালি বড়দের যদি একটু পায়ে আবির আর ছোটদের গালে দিতে পারেন ফাগুনের রঙ। হার্বাল কিন্তু। কেমিক্যালে দেশ ভরে যাচ্ছে। আপনার মনটাকে তো পোস্কার রাখুন! হোলির রঙে সব মালিন্য ঘুচে যাক। বারান্দার গাছটায় নতুন পাতা এসেছে। আশেপাশের কুকুরগুলো, বেড়াল, পাখিগুলো ভয়ে ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষ যেন মানুষ হয়ে মলিন বস্ত্র ছাড়তে পারে। সামান্য পশুপাখিগুলোকেও ছাড় দিতে পারে। এই আশা নিয়েই শুভেচ্ছা জানালাম, দোলে দুলুন দোলনায়। দোনলায় নয়!

হ্যাপি হোলি, শুভ দোলযাত্রা, শুভ বসন্ত উৎসব। আনন্দে থাকুন।

(১৭৯)

বহু বহু যুগ পরে ফিসফাস লিখছি। আসলে রম্যরচনার ‘গত’ থেকে বেরোবার একটা তাল বহুদিন ধরে করছিলাম যাতে ফিকশনে ফেরা যায়। আর এ ছাড়াও অন্যধরণের ব্যক্তিগত গদ্য চলছিল লেখা। তাই নো ফিসফাস। বরং কানাকানি চলছিল অন্য।

কিন্তু এমন কিছু ঘটে যখন এই ব্লগটারই শরণাপন্ন হতে হয়।

যাই হোক, ঘটনাটা হল, আমার উচ্চতা পাঁচ ফুট এগারো। এই কালকেই বাসু দা আমায় দীর্ঘদেহী বলল। কিন্তু সত্যি বলতে কি, কেন এক ইঞ্চি আর হল না সেই নিয়ে বড়ই দুঃখ ছিল। পাঁচ ফুট এগারো ছুঁয়েছি সেই ক্লাস টেনেই। তারপরে এক ছুঁচও বাড়িনি। খালি মনে হত, আমার থেকে লম্বা যারা তারা লম্বা। আর আমার থেকে বেঁটে যারা, তারা বেঁটেই।

কিন্তু ধীরে ধীরে উপলব্ধি করলাম যে ঘটনাটা তা নয়। ভারতবর্ষের গড় উচ্চতা বলতে হরিয়ানা, পাঞ্জাব বা কেরলা বোঝায় না। আর আম বাঙালির গড়পড়তা হাইট খুব বেশী হলে পাঁচ ছয়। সমগ্র ভারতের ক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই সত্যি। তাই তো ট্রেনের সাইড স্লিপারগুলো পাঁচ দশ হয় আর নর্মাল স্লিপার ছ’ফুটেই শেষ।

মিডল বার্থে কতবার দম বন্ধ হয়ে উঠতে পারছি না আটকে যাচ্ছি টাইপের ফিলিং হয়েছে। তাই যে করেই হোক মিডল বার্থ অ্যাভয়েড করতাম। বর্তমানে অধিকাংশ সফর উড়োজাহাজে করেও সমস্যা। বাজেট এয়ারলাইন্সে লেগস্পেস বড়ই কম হয়। গাড়ি কিনতে গিয়েও ওইজন্য সাধারণ মারুতি অল্টো কাট করতে হয়েছিল। শুধু এসব কেন? বাসে টাসে সর্বত্র আপনাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে এ দেশে লম্বা হওয়া অপরাধ।

মারওয়াড়ের প্যালেস বা দুর্গের দরজা নিচু হত যাতে শত্রু বুক চিতিয়ে ঢুকতে না পারে, আর মাথা নিচু করে ঢুকলে এক কোপে ঘ্যাচাং ফু!

কিন্তু বর্তমান যুগে সে সমস্যা তো নেই। মানে হুট বলতেই মানুষকে এক কোপে নামাবার গল্প অন্ততঃ সভ্য মানুষের করা উচিত নয়। তবু যে কেন গাড়ি থেকে নিয়ে অফিস বিল্ডিং, ফ্ল্যাট বাড়ি, দেশলাই বাক্সের উচ্চতা কম হয় কে জানে? আমার বাবার একবার সিজিএইচ ডিসপেনসারিতে বছর দুয়েক আগে হাত তুলতে গিয়ে বড় পাখায় হাত কেটে একশা কাণ্ড হয়।

সে সব থাক, আসল গল্পে আসি। আসলে সে গল্পটা এতটাই ছোট্ট যে ধানাই পানাই না হলে দাঁড়াচ্ছেই না।

এই যে বইমেলায় গেছিলাম, সেখানে সব ব্যবস্থাই অতীব সুন্দর ছিল। শুধু অ্যাক্সেসেবল টয়লেট ছাড়া। তা সে কথা তো আগেই লিখেছি দিল্লি Lively ব্লগে। এটা ওই টয়লেট সম্পর্কিতই। হয়েছে কী, ফুড কোর্টের পিছনে যে টয়লেট আছে, সেটা বানানো হয়েছে আম গড়পড়তা উচ্চতার বাঙালির জন্য। ফলে হিসু করার জন্য আমাকে বারবার বেছে নিতে হচ্ছিল, যে দিকটা উঁচু আছে সেই দিকের টয়লেট।

গত রবিবার গোধূলি বেলায় দেখলাম প্রায় ভরে গেছে আর আমার না হালকা হলেই নয়। তাই ফুডকোর্টের দিকে মুখ করা টয়লেটে দাঁড়ালাম। সন্ধ্যে তো হয়েই গেছিল, বাঘ আর দূরে থাকে কেন? সম্বিত বসু। বর্তমান তরুণ সম্ভাবনাময় গদ্যকারদের মধ্যে একদম প্রথম সারির ছেলে। এমনিতে আমার মতো মানুষকে চেনার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু ছেলেটি ভালো। আর এখনও ট্যাঁশ হয়ে যায়নি। তাই যা হবার তা হল। পড়াং করে ডেকে বসল, ‘সৌরাংশু দা!’ আর যায় কোথা, আমিও নাচার হয়ে বললাম, ‘সম্বিত’! সঙ্গে সঙ্গে যারা যারা ছিল বা ছিলেন তার মধ্যে এক দুজন রমণীও ছিলেন, ঘটাং করে একসঙ্গে ঘাড় ঘোরাল বা ঘোরালেন। মেয়েটি বা দুটি সঙ্গে সঙ্গে অবস্থা বুঝতে পেরেই ঘাড় ফিরিয়ে নিল। কিন্তু মধ্যবিত্ত মেন্টালিটির অপ্রস্তুত অবস্থার তো আর বাকি কিছু রইল না।

নেমে আসতেই সম্বিত গল্প করল- একবার মীরকেও এরকম অবস্থায় ডেকে ফেলেছিল। আর মীর বলেছিলেন, ‘এভাবে না চিনলেও পারতে!’ আমাকে তখন অন্য গল্প করতে হবে। তাই সেই কথাটাই বললাম, যা আপনাদের বলছি। প্রথমবার নয়, কিন্তু অনুভব করলাম গড়পড়তা উচ্চতার অধিক হবার ঠেলাখানা। সাধে কি আর বিশেষ ধর্মপ্রাণ কিছু লোক উবু হয়ে বসে কাজখানা করে!

আজ তাহলে এপর্যন্তই! আবার এরকম কিছু হলে আসব বরং। তবে সেবারে আশা করি এতটা এম্বারাস্মেন্ট নিয়ে আসব না!

ফিসফাস ৩ এখন অনলাইনেও উপলভ্য

আগের দুটির মতো ফিসফাস ৩-ও এবারে অনলাইন উপলভ্য হয়ে গেল। কেনার জন্য ক্লিক করুনঃ

https://goo.gl/CHX7ce

(১৭৮)

গলায় ঝোলানো ওয়াটার বটল স্কুলে পড়তে গিয়ে দেদার হারিয়েছি। ঠিক যেভাবে স্লোয়ার বলে জাভাগাল শ্রীনাথ ছয় মারার সুযোগ হারাতেন।

সেই ট্র‍্যাডিশন এখনও চলেছে। গাড়িতে রাখা জলের বোতল যাও বা গাড়িতে থেকে যায়, ব্যাগের বোতল টেবিলে বেরোলেই বেড়াল হয়ে কেটে পড়ে। এখন তাও কেবিন পেয়েছি। তাদের পরদিন সকালে ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায় বড়জোর ডাস্টবিনের দোরগোড়ায়।

তা এসব প্লাস্টিকের বোতল ফোতলে বেশিদিন নাকি জল খাওয়া উচিত নয়, ইন্টেস্টাইন ইন্টেন্সিভ কেয়ারে ঝিমোতে পারে অচিরেই। তাই হাজির হল প্লাস্টিকের পাউচ ওয়াটার। দাঁতের কোন দিয়ে কুট করে ছিঁড়ে নিয়ে ধীরে ধীরে চাপ দেবেন আর পোঁ শব্দে প্যাকেটের ভিতরের জল আপনার মুখের ভিতর।

বইমেলা কর্তৃপক্ষ আমাদের সুবিধার জন্য ভালোবেসে ডেকচি ভর্তি পাউচ যত্রতত্র ছড়িয়ে রেখে দিয়েছেন। কিন্তু পোড়া মন এসব হজম করতে পারলে হয়।

একে তো বসন্তে কুহুকোকিলের ডাকে জলের ডাক বেশি শোনা যায় না। অন্যথা হলে প্রকৃতির ডাক আসে। কিন্তু তবুও মানব শরীরের জলের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাউচ দাঁতে কাটতেই হয়।

আর তাতেই চিত্তির। একে তো এই সময়ে দুশো মিলি জল এক ঢোঁকে মেরে দেওয়া সমস্যার। তাই অর্ধেক খেয়ে বাকিটা স্টেপল করে আপনি টেবিলে রাখলে সে ইনভ্যারিয়েবলি গড়িয়ে পড়বে। আর তারপর মাটিতে পায়ের চাপে বা চেয়ারে তসরীফের চাপে পাস্কেলের সূত্র প্রমাণে তৎপর হয়ে ওঠে।

এসব সবই সামলে নিয়েছি সতর্কতার সঙ্গে। কিন্তু একটা কেস কিছুতেই সামলাতে পারছি না। সেটা হল পাউচ দাঁতে কেটে মুখটা সামান্য খুলে তাক করে মাপমতো চাপ দিলেই ছাতা, জিভে কাতুকুতু লাগছে। আর জিভ পেরিয়ে কিছু করতে গেলেই বিষম ফিষম খেয়ে ক্যাটাভোরাস কাণ্ড! কী করি বলুন দেখি!

(১৭৭)

আজকাল আমার পনেরো ক্রসিত ছেলেটি মাঝে মাঝেই জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবা, ব্লেড মারব?’ তারপর পজ নিয়ে বলে, ‘ঠোঁটের উপর!’ বস্তুতঃ বয়ঃসন্ধির ছেলেদের lack of facial hair এক বিরাট বড় সমস্যা। সে আমার আপনারও হয় নি কি?

আর এই সব ছেলেপুলেরাই চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিনকে অমর করে দিয়ে যায়। প্রথম গোঁফ কাটাটা আদি অনন্তকাল ধরে একই থেকে যাচ্ছে, ‘সেলুনে গোঁফ শেপে আনতে গিয়ে বা নিজেই ছাঁটতে গিয়ে চার্লি চ্যাপলিন হয়ে গিয়েছিল। তাই…’

সে আমারও ক্লাস ইলেভেনে হয়েছিল। তখন বাবা রঞ্জি ম্যাচ খেলাতে হিঙ্গনঘাট বলে এক অখাদ্য জায়গায় গেছে আর মা দেখলাম আমার ব্যাখ্যায় কনভিন্সড হয়ে গেল সহজেই, কিন্তু মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। গোঁফ কাটা আমি কলকাতা দাপিয়ে আই এম বিজয়ন হয়ে ঘুরে বেড়ালাম। আর বাবা এসেই ধরে ফেলল আমার ফানুস। কিন্তু আর কিছুই বলল না।

তারও বছর খানেক পর থেকে আরেক নতুন সমস্যা এসে উপস্থিত হল। আমার খোমাখানার আকৃতি এমনই যে আলমগির দাড়িতে পাক্কা ভিলেন লাগে। আর কে না জানেন মুখাবয়বই মনের আয়না। অতএব সেসময়ই যত কূটবুদ্ধি মাথায় আসে। সে যা হোক, সেই রিস্কে না গিয়ে ফরাসি কাটেই মন মজালাম। ঠোঁটের উপর কালো শ্যাওলা আর ঠোঁটের দুপাশ দিয়ে ঢল নেমে নিচে কালো জলার সৃষ্টি করেছে। মাঝ বরাবর একটা ফোয়ারা। এতেই কিস্তিমাত। কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। ব্যাটা দিন কুড়ি যেতেই ভুলে যাই মাকুন্দ আমিকে দেখতে কেমন ছিল! তাই যে কে সেই।

তারপর তো রাজ্য জুড়ে শৈত্য প্রবাহ শুরু হয়েই গেল আর সরোবরে বরফ পড়া শুরু হল। সে এমনিতেই আমি একুশ বছর ধরে বেয়াল্লিশে আটকে ছিলাম। গত বছর মুক্তি পেয়েছি।

কিন্তু গার্লফ্রেণ্ডই বলুন বা বউ। তাদেরও তো একটা মানইজ্জত আছে না কি! ঠ্যালায় পরে আজহারুদ্দিনকেও গোঁফ রাখতে হয়েছিল আর আমি তো সামান্য রৌদ্ররূপ সাঁপুই। আমার নাকি নাক আর ঠোঁটের মধ্যে ব্যবধান কম তাই গোঁফ রাখলে রাঙাকাকার মতো লাগে। একটা কথা বলেই রাখি আমার থেকে কম বয়সীদের আমি ঠিক প্রেয়সী ক্যাটাগরি ভুক্ত করতে পারি না। মেন্টাল ব্লক। তাই সলিড সলিড প্রেমের সুযোগ হারিয়েছি (তবে যা পেয়েছি একজন্মে তাই বা কম কিসের!) আর পাকা দাড়ির বয়ফ্রেণ্ড থাকলে নিজের বয়স ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা। অতএব…।

অবশ্য আমার পার্শ্ববর্তিনীর কথা আলাদা। সারা পৃথিবীতে ওয়ান পিস এক্সিস্টেন্স। তাঁর মতে ‘এজ ইস জাস্ট আ নাম্বাহ আর পাকাচুল আর জাস্ট আ ফিউ ডিজিটস!’ তাই এখন ফোয়ার শিকড় বরফে ডুবে গেলেও ফ্রেঞ্চ রাখার ছাড় পেয়ে গেছি। তবে ওই আরকি, স্ট্র দিয়ে সব কিছু খাওয়া যায় না। আর উদ্ভিদাবস্থায় ফোয়ারা বড্ড খোঁচা মারে। তাই গঞ্জনা আরর প্রাণে সয় না।

কিন্তু গত মাস থেকেই দেখছি, ফুলঝুরির মতো শেষবার একটা ঝিলকি মারার অদম্য ইচ্ছাটা চেপে বসেছে মাথায়। স্টাইল সর্বস্ব দুনিয়ায় একেবারে ফ্রেঞ্চহীন জীবনেই নর্থপোলে চলে যাব? তা আর হয় নাকি। তাই সকাল বিকেলে দাড়ি ঝুলিয়ে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে নারকেল তেলে চুবিয়ে গোটিসাধনা।

কিন্তু সত্যিটা হল, হ্রদের বরফ ফোয়ারা বেয়ে কার্নীশে উপরের শ্যাওলার ঝাড়েও পৌঁছচ্ছে। তাই ঠিক করলাম আ লা আলকাতরা ট্রিটমেন্ট মারতে হবে। বছর ছয়েক আগেও চুলের যত্নে লহার কড়াইতে চায়ের জলে ভেজানো মেহেন্দি (আমার ছেলে আবার ছেলেবেলায় তাকে ‘বেহেনজি’ বলত!) লাগাতাম। হালকা বাদামি একটা উড়ুউড়ু আভা আসত। তারপর বিয়ে হয়ে গেল।

আর হলও বটে সেই ওয়ানপিসের সঙ্গে যিনি বয়স পাকাচুল এসব ইস্যুকে ফুঁকে উড়িয়ে দেয়। অতএব চুলচর্চার সেখানেই ইতি ঘটে।

কিন্তু দাড়ির শৈত্যপ্রবাহের ফলে রাজকাপুরের অসমাপ্ত ছবির প্রয়োগেচ্ছা প্রবলভাবে উপস্থিত হল। তাই তিথি দেখে পণ্ডিত ডেকে ‘হেনা’ কিনে আনলাম। লোহার কড়াই কবেই গেছে। তাই যা পাই তাই সই করে কফি দিয়ে হেনা গুলে ঢ্যাঙ করে মারলাম চামচ দিয়ে কয়েক পোঁচ চুলে আর এক খাবলা দাড়িতে। সন্দেহটা আগেই হচ্ছিল, কিন্তু মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই প্রবল হল। খলবলিয়ে জলশ্যাম্পু মেরে দেখি যা ভেবেছি… মাথায় তো তবু আগুন লেগেছে। কিন্তু দাড়ি বিরিয়ানি হয়ে গেছে। খাপছাড়াভাবে সাদা কালোর সঙ্গে হলুদ, কমলার রামধনু। কেলোর নাম জগতগোপাল! পার্শ্ববর্তিনী পরামর্শ দিলেন, আর তার সঙ্গে ঠোনাও। ‘গরীবের কথা বাসি হলে’ টলে বলে সেন্টুতে বেহালা বাজালেন। শেষে উপায়ান্তর না দেখে দিলাম ছুট। দিশি সেলুনে। নাপিত বাবাজি এক্সপেরিয়েন্সড হ্যাণ্ড। তিনি রায় দিলেন এক পোঁচ বার্গেন্ডির সঙ্গে দেড় পোঁচ ডার্ক ব্রাউন। আমার তখন ক্যাটাভরাস অবস্থা। হরি প্রেম নিবি তো খাবলা খাবলা! যা করবি কর খালি আগুন নেভা আর বিরিয়ানি দাড়ি থেকে উদ্ধার কর। অভিজ্ঞ মানুষ মিনিট পনেরোতেই হাতের কামাল দেখিয়ে দিলেন। আর কী, ব্যাস এই পর্যন্তই। দাড়িটা কালো হওয়ার ফলে মুখে অপ্রত্যাশিত কাট চলে এসেছে আর লোকজন ‘রোগা হয়েছ’ বলে ছোলার মাচায় চড়াচ্ছে। কিন্তু পার্শ্ববর্তিনী ঝানু জিনিস, তিনি কেসটা অনায়াসেই সলভ করে ফেলেছেন। চর্বিটা কোমরেই, মনে নয়। কিন্তু সেটা কমাবার আমার যে প্রাণপাত প্রচেষ্টা তা তাঁর নজরাগত বলে কিছু বলছেন না।

আর ইয়ে, আমিও একটা ছোট মতো ‘নো অ্যামোনিয়া লাইট ব্রাউন কিনে রেখেছি। মাঝেসাঝে চলতে ফিরতে ব্রাশের একটা স্ট্রোক দাড়িতে ওয়েসিস নিয়ে আসছে। চলুক না হয় হাওয়ায় ভাসা কিছুদিন। অক্সিজেন তো অপ্রতুল হচ্ছে না!

(১৭৬)

এই ফিসফাস পড়ার আগে কিন্তু কথা দিতে হবে যে হিন্দিভাষী দিল্লিবাসী কোন বন্ধুকে নাম উল্লেখ করে গল্প করা যাবে না। আসলে কারুর ক্ষতি হোক এমন চাওয়াটা ফিসফাস লেখকের স্বভাব বিরুদ্ধ। কিন্তু বলতেই পারেন, তাহলে এসব গল্পের প্রয়োজন কী! তা বলতে কিন্তু এমন রসালো ব্যাপার স্যাপার যে শেয়ার না করেও পারছি না। আসলে কাল পর্যন্ত ডাল ফ্রাই ছিল। কিন্তু কাল ঠিকঠাক তড়কা পড়ায় একদম স্লার্প মার্কা ডাল মাখনি হয়ে গেছে।
হেঁয়ালি না করে পেড়ে ফেলি ক্ষণ। আসলে ফিসফাস লেখাটা শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই দেখেছি আমার সঙ্গে ঘটা ঘটনার সংখ্যা প্রভূত পরিমাণে বেড়ে গেছে। অবশ্য না হলে এক দুই পেরিয়ে তিন নম্বর বইয়ের যোগান দিতাম কী ভাবে!
তবে অফিসের চৌহদ্দিকে আমি এতকাল ফিসফাসের কানাকানির বাইরেই রাখতাম। হাজার হোক কার্যনির্বাহী দায়িত্ব বলে একটা কথা আছে। তবে সেখানেও কম ঘটনা ঘটছিল না।
এই তো মাস চারেক আগে অফিসের এক ছিটগ্রস্ত মহিলা আমায় ইয়ে নিবেদন করে বসে। এসব ক্ষেত্রে আমার প্রত্যুত্তর হয় রাহুল দ্রাবিড়ের মতো। মানে স্টেনের বাউন্সার বা ওয়ার্নের লেগব্রেক, সবেতেই ইগনোরের ডেড ব্যাট।
আমার দিল্লি জন্মের গোড়ার দিকে অফিসে এরকম এক দীর্ঘাঙ্গীর মনোযোগের স্বীকার হয়েছিলাম। অবশ্য তখন বুঝি নি সেইই। যদিও বুঝে ঘন্টা হতো। আমি তদ্দিনে লটকে পড়েইছি। তাতে কি! বুড়ো বয়সে নাতিনাতনীদের কাছে নিজের দর বাড়াতে এসব গল্প কথা কাজে লাগে। তা সেই দীর্ঘাঙ্গী হিসেব করে আমি যখনই অফিসের টেলিফোনের কাছের কম্পিউটারে বসেছি (সে যুগের এমএস ডস কমপ্যাক কম্পু) তখনই ফোন করে আড্ডা মারতে চাইত আর আমি বেমক্কা ফোন রেখে দিতাম। শেষে একদিন সে বলেই ফেলল, ‘ফোন মাত কাটিয়েগা! আপ বাত কিঁউ নহি করতে হো?’ ল্যাহ! এর জবাব সত্যিই ছিল না। তাই তখনই কেটে দিই এবং খোশগল্পের সেখানেই ইতি। ছ মাস পরে জানলাম ইনিই তিনি! তা ততক্ষণে তো লোহার টোপর পরাও হয়ে গেছে। তাই সে গল্পের সেখানেই কাঁচি হয়ে গেল।

মাঝে এদিক ওদিকে অফিসে খুব একটা সমস্যা সৃষ্টি করি নি, কিন্তু গত বছর ক’মাস ধরে পাঞ্জাবী পরাই আমার কাল হল। সে যাই হোক এখানেও ডেড ডিফেন্স। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হল। সে মহিলা মনে করলেন ‘মৌনং সম্মতিং রামচন্দ্রং’। তা সব কিছু ছেড়ে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে শুরু করলেন। অবশ্য সেটা আমি দেখি নি কারণ তাঁর সমস্ত বাক্যালাপই যাচ্ছিল মেসেজ রিকোয়েস্টে। কোন এক কারণে মাস দুয়েক পরে মেসেজ রিকোয়েস্ট খুলে তো চক্ষু সুপারিগাছে। আইল্যা এ যে পুরো অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড ফেঁদে বসেছে। মোবাইল থেকে ব্লক করতে গিয়ে দিলাম ডিলিট করে। আরও কেলো। আমার কাছে কোন প্রমাণ রইল না। পরের দিন ল্যাপটপ খুলে প্রথমেই ব্লক করলাম। ভাবলাম ঘাড় থেকে নামল। ওম্মা! একদিন পরে, সেক্রেটারির চেম্বার থেকে বেরিয়েছি, আমায় তিনি করিডোরে পাকড়াও করে খুব ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “কাল জো মেরে হাসব্যাণ্ড কো আপনে মেসেজ ভেজা, ও দুবারা করেঙ্গে তো, ম্যায় …… (পার্শবর্তিনীর নাম করে) কো বতা দুঙ্গি!’
লাও গোবিন্দ এবার ডুগডুগি বাজাও। কোতোয়ালকে ধরে চোর নিজেই দাবড়ায় দেখি! করিডোরে নাটক না করে নিজের রুমে এসে দরজা খুলে স্টপার লাগিয়ে মহিলাকে কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ আপ জানতে হো আপ কেয়া বোল রহি হো?’ সে তো তখন হিমালয় লঙ্ঘনের মুডে। আমায় বলে, ‘আপনে জো শুনা ওহি আপকো বতা রহি হুঁ!’ নাহ এর সঙ্গে তর্ক বৃথা। সটাং বিতারণ করে। সামনের হলের দু তিনজন মহিলা কর্মীকে ডেকে নিলাম। সৌভাগ্য যে তাঁরা প্রত্যেকেই এ মহিলার ছিটলেমি সম্পর্কে অবহিত। অতএব, তারা আমার পাশেই দাঁড়াল। কিন্তু যেটা জানলাম সেটা আরও সমস্যাব্যঞ্জক। এ মহিলা নাকি আগের ডিপার্টমেন্টে নিজের বসের উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনে খুব নাঝেহাল করেছেন।
মেরেছে। কোন ঝুঁকি না নিয়ে ডিপার্টমেন্টের যৌন উৎপীড়ন কমিটিতে রিপোর্ট করতে মনস্থ করলাম। ছাতা আমার ডেস্কটপটাও সেদিন বেগড়বাঁই করতে শুরু করেছে। উপায়ন্তর না দেখে দু পাতা হাতে লিখে জমা দিলাম। যৌন উৎপীড়ন কমিটির চেয়ারপার্সন আমার জয়েন্ট সেক্রেটারি মহিলা আবার বাঙালি, তিনি আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি কোন অ্যাকশন নিতে চাইছ?’ আহা! নরম সরম প্রাণ আমার। অ্যাকশন নিতে গেলে যদি মাইকেল জ্যাকসন হয়ে যায়? কারুর ছিটলেমোর জন্য তার কেরিয়ারের ক্ষতি হোক আমার মতো স্বাত্ত্বিক স্বভাবের মানুষের পক্ষে তা হজম করা বাঞ্ছনীয় নয়। তাই বললাম না না। অন্য ডিভিশনে ট্রান্সফার করে দিই, চড়ে খাক। তারপর ফোন থেকে আরম্ভ করে সব কিছু ব্লক করে দিয়ে এখন একটু নিশ্চিন্তি। তবে সেটা কদ্দিন এবং কদ্দুর সেটা সময়ই বলবে।
তবে এই স্বাত্তিক স্বভাবটা আমায় বেশ ভোগাচ্ছে। আরেক উঠতি অফিসারের ছুটির রোগ আছে। তাকে শুধরোবার দায় নিয়েছিলাম। তা সে কদিন আগে অফিস অঞ্চলে জুয়া খেলতে গিয়ে ধরা পড়েছে। এবং তখন নাকি মদ্যপ অবস্থায় ছিল। কেন্দ্রীয় সুরক্ষা সেনার প্রতিনিধিকে অনুরোধ করে তার জেলযাত্রা রদ করে শুধুমাত্র ডিপার্টমেন্টাল অ্যাকশনের মুখোমুখি বসিয়েছি। কিন্তু তাতেও কোন হেলদোল নেই, জাঠবুদ্ধি বলে কথা। বরং আমার সিনিয়র আমাকে একদিন বলেই দিলেন যে আমি নাকি তাকে লাই দিয়ে লাইকা বানিয়ে দিয়েছি।

জাঠ বলতেই মনে হল, ফালতুকা গল্প অনেকদূর টেনে নিয়ে যাচ্ছি। তার থেকে মূল গল্পে আসি।
অবশ্য যাঁরা জানেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, এই যে জাঠ, খাপ পঞ্চায়েত, অনার কিলিং এসব নিয়ে যে সহ কথাবার্তা শোনেন তার একটাও গালগল্প নয়। হরিয়ানার লোকজন গর্ব করে বলেও থাকে যে তারা এমন এক সমাজে বাস করে যা এখনও মহাভারতের যুগে পড়ে আছে।

মহাভারত বলতে মনে পড়ল, মহাভারতও তো জাঠেদের গোষ্ঠী দ্বন্দ বই আর কিছু না। কর্ণের অঙ্গ রাজ্য কর্ণাল। পাণ্ডবদের পাঁচ গ্রাম বাগপত, সোনেপত, তিলপত (ফরিদাবাদ), পানিপত এবং ইন্দরপত বা ইন্দ্রপ্রস্থ। আর হস্তিনাপুর হল বর্তমান মেরঠ। বাদবাকি অন্যত্র শোনাব। জাঠ বিয়েতে ফিরে আসি।

পঞ্চায়েত এবং খাপ বলতে আমরা এই যে খবরের কাগজে যা পড়ি বা টিভিতে যা শুনি সব সত্যি, সঅব সত্যি। ঠুনকো জাতিগত গৌরবের জন্য অন্তজ সন্তানকেও ঝুলিয়ে দিতে তারা পেছপা হয় না।
সোনেপতের এমনই একটা গ্রাম কাম শহরতলির একটি সো কলড শিক্ষিত পরিবারে আমাদের গল্পের নায়কের জন্ম। পরিবারের মধ্যে সবার ছোট, স্মীতহাস, স্বল্পবাক দোহারা চেহারার ছফুট লম্বা ছেলেটি আমি যখন এই ডিপার্টমেন্টে আসি তখন সদ্য সার্ভিসে যোগ দিয়েছে। গত সাড়ে চার বছর ধরে হাতে করে গড়েছি। এখন অফিসার হবার জন্য তৈরী। এমন কি এই যে এবারে ক্রিকেট খেললাম, ছেলেটি বাঁ হাতি পেসার হিসাবে আমার টিমের ওপেনিং বোলারও ছিল। এক কথায় এতদিনে ছোটভাই কাম বড় ছেলের মতো হয়ে গেছে। তবে ভাই হোক বা ছেলে, তাদের ব্যক্তিগত জীবনে আমি নাক গলাই না।
এখন বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে আউটসোর্সড কর্মীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অফিসের মধ্যে একটা রঙিন ভাব চলে এসেছে। এখানে ওখানে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। কপোত কপোতীর সংখ্যা বাড়ছে। আর তা দেখে বেশ ভালোই লাগে। তা আমাদের হিরোর সঙ্গে এক সুদর্শনার মন দেওয়া নেওয়া হয়ে গেল। তাও ঘুরতে ঘুরতে বছর খানেক।
হঠাৎ গত জুন মাসে ছেলেটি একটা কার্ড দিয়ে জানিয়ে গেল তার বিয়ে। কিন্তু দেখলাম সুদর্শনার হাত রাঙা হল না। আরও একটি প্রেমকাহিনির আলাপেই ইতি বলে ধরে নিয়ে কাজকর্ম করতে শুরু করলাম।
এদ্দিন কিস্যুটি হয় নি। হঠাৎ নভেম্বরের মাঝামাঝি সেক্রেটারির অফিসে জানা গেল, আমাদের হিরোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসে হিরোকে এখান থেকে ট্রান্সফার করে দেবার অনুরোধ করেছে।
প্রমাদ গনলাম, হিরো আবার শেষ লীগের ম্যাচেও উপস্থিত হল না। যেদিন এলো জেরা করলাম। আমার সামনে বসে ছেলেটি কেঁদে ফেলল। বলল, তার প্রেয়সীর সঙ্গে বিয়ে হবে না সেটা বুঝেই গেছিল, এবং সেই নিয়ে দুজনের কোন সমস্যা ছিল না। সমস্যা হল হিরোকে ধরে ব্ল্যাকমেল করে তার বাবা মা বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিল। ঠাকুমা দাদুর হৃদয় যেকোনো হৃদয়ব্যঞ্জক গল্পের হৃদয়বিদারক সমাপ্তির পথ প্রশস্ত করে। এক্ষেত্রে ছেলেটা চুপচাপ স্বভাবের বলে আরও সুবিধা হয়েছে।
কিন্তু বিয়ের মাস চারেক পরে সে বুঝতে পেরেছে যে তার স্ত্রী তার জন্য যশ চোপড়ার সিনেমার থিম নিয়ে আসে নি। কোন মিলই নেই দুজনের। আমি কুকুর আর তুমি পুকুর, আমি ঢেউ তো তুমি ফেউ টাইপের কেস। ব্যাস তার সব রাগ ভিসুভিয়সের মতো তার বাড়ির লোকের উপর পড়েছে। কষ্টের শেষ নেই। তার উপর বিষফোঁড়ার মতো প্রাক্তন প্রেয়সীকে দিনরাত অফিসে দেখছে। চলন্ত সাইকেলে লোহার রড ঢুকে একসা কাণ্ড।
বাড়ির লোকজন ডাংগুলি খেলতে ব্যস্ত আর শ্বশুরবাড়ি তো ফুটছে। হিরোর বর্তমান স্ত্রীও নাকি বলেছে, ‘হাত প্যায়ের তুড়ওয়াকে ঘর মে বিঠা দো। মাগর ডিভোর্স কা কোই চান্স নেহি!’ পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ ঘা কিন্তু পণের অভিযোগ ছুঁলে একদম ৪৯৮ ঘা। তার উপর আবার ক্লজ এ। একেবারে সাড়ে তিন বছরের জেল। নো বেল। অনলি ঢং ঢং গরাদ।
কিন্তু ছেলেটি সে সব বোঝার উর্ধে। তারপর গত মাসের একুশ তারিখ থেকে সে দেখি অফিসেও আসছে না। এক সপ্তাহ পরে তার বাবা এক বন্ধুর সঙ্গে এসে হাজির। তিনি রাজ্য সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মী ছিলেন। হিরোর প্রেয়সীর বাড়ি গিয়ে তাদের হুমকি তো দিয়েইছেন, তার উপর আরও বলেছেন আমার নাকি চণ্ডীগড় ট্রান্সফার করে দেবেন। আমাদের সার্ভিসের তিনকুলে কেউ দিল্লি ছেড়ে কোথাও যেতে পারে নি। আর আমি সেই সম্ভাবনায় বেশ উত্তেজনাই উপভোগ করেছি।
তা তিনি প্রথমে জয়েন্ট সেক্রেটারির কাছে গেলেন। আর তিনি সুড়ুত করে তাঁকে আমাদের দিকে ঠেলে দিলেন। আমরা বলতে আমার ডেপুটি সেক্রেটারি ও আমি। এসেই বলেন আমার ছেলেকে ট্রান্সফার করে দাও। ল্যাহ। তাঁকে বোঝালাম সেটা প্রায় অসম্ভব কারণ কার্মিক বিভাগকে যদি এটা লিখি যে ট্রান্সফার না করলে শ্বশুরবাড়ি ঠ্যাঙ ভেঙে দেবে বলেছে, তাহলে ডিওপিটি আমারই ঠ্যাঙ ভেঙে দেবে। এটা কোন কথা হল?
এবার শুরু হল ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলিং। তাঁর ছেলেকে নাকি তিনজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হয়েছে। ছেলের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিতে হয়েছে। লুকিয়ে রাখতে হয়েছে পিসির বাড়িতে। আমি প্রেসকিপশন দেখে বললাম এ তো সব ঘুমের ওষুধ। এসব খেলে কি আপনার ছেলে তার প্রেয়সীকে ভুলে যাবে? নাকি ট্রান্সফার করে দিলে সেটা সম্ভব হবে।
তা কে শোনে কার কথা! আমাকে বোঝাবার চেষ্টা হল এসব হরিয়ানার ব্যাপার, শ্বশুরবাড়ি খুব ‘খতরনাক’ (খতরনাক হলে বিয়ে দিয়েছিলে কেন বাওয়া?), ছেলে পাগল হয়ে যাচ্ছে। যেন হরিয়ানা একাই শুধু পৃথিবীতে আর আমরা আলফা সেঞ্চুরির অধিবাসী।
সে যাই হোক, সে সবে কাজ না হলে ফ্যাঁচফ্যাঁচিয়ে কান্না তো রয়েইছে। আমার ডেপুটি সেক্রেটারির সঙ্গে আমার খুব ভালো তালমিল। সে একবার খুব জোরসে বকে দিল। যে বেশি ত্যাণ্ডাইম্যাণ্ডাই করলে আমরা কিসসু করব না।
এই সময় আমার খচ্চর মাথা থেকে একটা সল্যুশন বেরোল। মাথাটা খচ্চর হলে কি হবে মনটা তো নরম! তাই অনেক কষ্ট দুঃখ নিয়ে প্রস্তাব দিলাম, ‘ছেলেটি পার্মানেন্ট, কিন্তু মেয়েটি নয়। মেয়েটি যে কনট্রাক্টরের মাধ্যমে কর্মরতা, তার মাধ্যমেই অন্যত্র যদি কাজে লাগিয়ে দেওয়া যেতেই পারে। তাতে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না’। হ্যাঁ মেয়েটির যেন কোনমতেই লোকসান না হয়।
খুবই খারাপ লোক পাঠক পাঠিকা। একতা কাপুরের সিরিয়ালের শাশুড়ি অথবা কয়ামত সে কয়ামত তকের গোগা কাপুর নিজেকে ঠিক এরকমই মনে হচ্ছিল। কিন্তু বিধি নাচার। কারুর কিছু হয়ে গেলে কী হবে?
তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটি ঘটবে আশ্বাস দিলাম বটে, তবে এটা জানা যত সহজে সেটা করার কথা ভাবা হচ্চে তত সহজ হবে না। কারণ কন্ট্রাক্টরের তো ইমোশনের ই নেই! তাকে বললে বলবে সার্ভিস টার্মিনেট করে দিন। তবুও পরেরদিন তাকে ডেকে অনুরোধ করলাম যে ভাল দেখে একটা মন্ত্রণালয়ে যেন মেয়েটিকে স্থান দেওয়া হয়। এই সূত্রেই বেরিয়ে এলো নগর উন্নয়ন দপ্তর, যেখানে আমার এবং ডেপুটি সেক্রেটারি উভয়েরই চেনাজানা আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হল বটে কিন্তু কাজ হতে হতে মাস কাবার হয়ে যাবে।
ইতিমধ্যে আবার, হিরোটি নিজের পিসতুতো দাদার ফোন থেকে আমায় ফোন করে জানাল যে সে আর যাই করুক আত্মহত্যা করছে না, যা তার বাবা দাবি করে গেছেন। ও সব নাটক। তাকে একবার বোঝাবার চেষ্টা করলাম বটে যে সব সময়ের উপর ফেলে রাখলে উলটো কেস হবে। আর এখন এসব ভেবে লাভও নেই। ফল হল উলটো। পিসতুতো দাদা তো বুঝলো, পিসি ছিলেন কাছেই। তিনি ভেবে বসলেন যে আমি ফুসলচ্ছি। সে আর কী বলি, পিসতুতো দাদাকে বললাম ছেলেটার দিকে নজর রাখতে হুড়মুড়িয়ে যেন কিছু না করে বসে।
এভাবেই ছিল বেশ। দিন সাতেক কেটেও গেছে। কাল কোন একটি কাজে বাড়ি দ্রুত ফিরে এসেছি। হঠাৎ দেখি হিরোর বাবার ফোন। আমি তো ভদ্রভাবেই কথা বলতে শুরু করলাম। তিনিও ভদ্রভাবে বলতে বলতেই বললেন, ‘হামারে ঘর মে সব ইয়ে সমঝে হ্যায় কে আপ মূল ষড়যন্ত্রকারী হো। ইসলিয়ে আগার হামারে লড়কে কো ইয়া উস লড়কি কো কুছ হোতা হ্যায় তো হাম তো পুলিশ কো আপ হি কে নাম বতায়েঙ্গে’।
অ্যাঁয়! বলে কি রে! সঙ্গে সঙ্গে খুব শক্ত কিন্তু ধীরে ধীরে বললাম যে আমাকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে বিশেষ কাজ নেই। আমি পুলিশকে নিয়ে কবিতা লিখি ( সেই যে লিখেছিলাম না? ‘ওগো আমার পুলিশ, আমায় আলতো করে তুলিস/ শ্যামলা রাতে গামলা হাতে গোবর জল গুলিস/ বৃষ্টি হলে মাঝরাতেতে নিজেরই কান মুলিস।। ইত্যাদি এবং প্রভৃতি) এবং আপনি নিজে একজন ক্লাস ওয়ান অফিসারকে হুমকি দিয়ে অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছেন।
যাই হোক, জাঠদের হাঁটুতে এসব ঢোকে না। তারা বেহালার থেকে তবলা বাজাতে বেশি পছন্দ করে। অতএব তিনিও একই সুরে ‘তুম তানানানা’ করে গেলেন দেখে আমি ফোনটা ‘কাটছি এবং ফের ফোন করবার সাহস দেখাবেন না’ বলে কেটে দিলাম।
তারপর আজ অফিসে গিয়ে সোজাসুজি লিখিত দিলাম। ছেলেটিকে চিঠি পাঠালাম ‘অনেক হয়েছে ভাই, রুস্তম সোরাব শিরি ফারাদ খেলা। এবার মানে মানে কাজে এস না হলে চাকরি খোয়াও’। জয়েন্ট সেক্রেটারির অনুরোধে কনট্রাক্টরকে ডেকে আরেকবার বোঝালাম, যে প্রাণ যায়ে পর মেয়েটার চাকরি বাকরি নিয়ে টানা হিঁচড়া হতে দেব না। সে ইনিয়ে বিনিয়ে টাইম চাইল এই মাসের শেষ অবধি।
শেষে, আইনি পরামর্শ অনুযায়ী আমি হয়তো কালকেই পুলিশে লিখিত জানিয়ে রাখব। এদ্দিন ধরে জাঠ জাঠ ভাট বহুত শুনে এসেছি! বাঙালির মাথায় ক্যারা আছে। একবার চটকে গেলে… না থাক! ওসব বলে কী হবে? করে দেখাতে হবে! কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন । মা কর্ম্ফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি। মানে? মানে কর্ম করতে বাধা দিলে মা কদাচ ফল দেবেন না। বরং মা কর্মফল হেতু নিজ হস্ত কর্মণিতে ভূমা ক্যালাবেন! আমেন!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ একদম শুরুতে বলেছিলাম, হিন্দিভাষী কারুর সঙ্গে এটা আলোচনা করবেন না। একা খাবে্‌ ভাগ করবেন না। কারণ পিকচার আভি বাকি হ্যায়। সেটা যদি না শোনেন? তাহলে আর কী? ওই ‘হেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি’। ভূমা ক্যালানি! আহ দারুণ একটা শব্দবন্ধনী কিন্তু! আহা!