(১৫৪)


কয়েকদিন আগেই টম হ্যাঙ্কসের হোস্টেজ ড্রামা ক্যাপ্টেন ফিলিপ দেখছিলাম। ভারত মহাসাগরে সোমালিয় জলদস্যুদের কবলে পড়ে ক্যাপ্টেন ফিলিপ্স ও তার জাহাজ। তার পর তার থেকে কিভাবে মুক্তি পায় ইত্যাদি! অসম্ভব সুন্দর অভিনয়ে যেন চোখের সামনে ঘটে চলেছে ঘটনাগুলি। তার শেষ দৃশ্য ছিল মুক্তি পাবার পরেও ট্রমাকবলিত টম হ্যাঙ্কসের অনবদ্য অভিনয়। সহজ থাকার চেষ্টা করেও পারছেন না! ট্রমা বা আতঙ্ক! যদিও ট্রমার বৃহত্তর অর্থ বাংলা ভাষায় বোঝানো সম্ভব হয় না! তবু দুর্ঘটনা বা অঘটন সম্পর্কিত ট্রমা আমরা বৈদ্যুতিন মাধ্যমের দৌলতে অহরহ দেখতে পাচ্ছি! দুর্ঘটনা কবলিত প্রিয়জন হারানো রাজধানীর যাত্রীর মুখ থেকে টিভি সাংবাদিকদের দৌলতে তাৎক্ষনিক অনুভূতিও জেনে নিতে পারছি। জানতে পারছি, পেটের দায়ে মানুষের জন্তু হয়ে যাবার, অসংবেদনশীল হয়ে যাবার গল্পও।

পাঠক/ পাঠিকারা, নিজের ঢাক পেটানোর মতো চওড়া বুক যে একেবারেই নেই তা বলব না। কিন্তু মধ্যবিত্ত মানসিকতায় চক্ষুলজ্জাটা কোথাও যেন এখনো আলগা ব্যাণ্ডএইডের মতো ঝুলে রয়েছে। তাই ভেবেছিলাম চেপে যাব। কিন্তু ফিসফাস তো আপনাদের আর আমার মধ্যে সুগম চলাচলের পথ। প্রিয়জনকে আমার নিজের মনের ভাব বোঝাবার সহজ মাধ্যম। যেখানে একান্ত ব্যক্তিগত এবং এহবাহ্য অভিজ্ঞতাগুলি ছাড়া সবই ভাগ করে নেওয়া হয়। পর্দা নেই কোন। তাই খুলে বলতে এলাম আর গৌরচন্দ্রিকা করলাম।

বছর দশেক আগে এক মে মাসের সকালে অফিস যাবার পথে এক পেট্রোল পাম্পের সামনে সদ্য ফেলে যাওয়া পেট্রোলে হড়কে গিয়ে ভয়ানক দুর্ঘটনায় পা উলটে পড়ে হাঁটুর সাড়ে চৌদ্দটা বাজিয়ে ফেলেছিলাম। তখন এক সহৃদয় ব্যবসায়ী আমায় গাড়িতে তুলে শক্করপুরের নিজের দোকানে নিয়ে গিয়ে কোল্ড ড্রিংক্স আর বিস্কুট খাইয়ে পেনকিলার খাইয়ে তারপর কোলে করে সেকেন্ড ফ্লোরে তুলে দিয়ে যান। সেই কথা ভুলি কেমন করে?

তার আগে বা পরেও কেমন করে জানি না, অযাচিত সাহায্য এই মানুষজনের কাছ থেকেই পেয়ে এসেছি। যাদের স্বার্থপরতার কথা আজ সর্বজনবিদিত। আমিও যে সম্মুখীন হই নি তা নয়। এই যেমন ধরুন, উলটো দিক থেকে এক রিক্সা এসে আমার গাড়িতে মেরে উলটে পড়ে যায় পাসে রাখা এক হণ্ডা সিটির উপর, তাতে সামান্য টাল খেয়ে যায় আর আমার গাড়ির হেডলাইট ভেঙে যায়। কিন্তু হণ্ডা সিটির মালিক আমার কাছ থেকে, সাড়ে চারশ (সারাবার খরচ) আদায় করে ছাড়ে। অথবা সেই দশ বছরের পুরনো চোটে আবার লাগার পরে অনুরোধ করা সত্ত্বেও কেউ স্কুটার চালু করে দিতে রাজী না হওয়ায় (তার মাস দুয়েক পরেই), প্রবল বৃষ্টির মধ্যে হ্যান্ড ব্রেকের সাহায্যে পা সোজা রেখে প্রচণ্ড ভিজতে ভিজতে বাড়ি এসে মনের শেষ জোরের বিন্দুটুকু দিয়ে গাড়ি স্ট্যান্ড করে হামাগুড়ি দিয়ে দুতলা চড়ার সময় কাউকে না পাওয়া! কিন্তু সে গুলো তো মামুলি ব্যাপার। এমনিতে কিন্তু উপরওলা বা সহযাত্রীদের কেউ না কেউ কখনো না কখনো সাহায্য করতে উপস্থিত হয়েইছে।

তা আমার সুযোগ এলে কি বিবাগী বৈরাগীর মতো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যাব? নাকি বিপদ বাঁধা দূরে ফেলে ঝড়ের রাতে দামোদরে ঝাঁপিয়ে পড়ব? স্যার হিরো হতে পারব না! কিন্তু মানুষ হওয়া থেকে কে আটকাবে!

দিল্লিতে জম্পেশ ঠাণ্ডা এদ্দিন পরে পড়েছে। না হলে চুল না ভিজিয়েই শীত সাঁতরে পাড়ে উঠে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ কি মনে হওয়ায় মাঝ দরিয়ায় ডুব দিয়েছে। ভালই হয়েছে! শীতকালে শীত না পড়লে তো গরমকালে গরমের চোটে চামড়া খুলে যাবার জোগাড় হবে। তা সক্কাল সক্কাল অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি, থার্মোমিটারের পারদ বলছে সাড়ে তিন। গাজীপুরের মোড়টা ঘুরতেই দেখি জটলা, পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখি একটা লোক সটান মাটিতে লম্বা হয়ে আছে আর বাকি পথচিকিতসকরা তার নিরীক্ষণ করে চলেছে। গাড়িটা থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, একজন এগিয়ে এসে বলল, “আগর হো সকে তো মদত কর দো!” মদত কর দো মানে? আমাদের জীবনই তো পরের জন্য উচ্ছুজ্ঞ করা হয়েছে। আহা এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে? গাড়ি খুলে দিলাম, বললাম কাউকে কিন্তু বসতে হবে সঙ্গে! ওবাবা যে ছেলেটির বাইকে সেই পড়ে থাকা লোকটির সাইকেল ঠোকাঠুকি হয়েছে তাকে ধরে বেঁধে লোকে এগিয়ে দিল। সে তো দেখি ভয়েই সিঁটিয়ে আছে। “জান বুঝকে নেহি মারা! উনহোনেই আগে চলে আয়ে মেরে উপর!” বিশ্বাসযোগ্য বয়ান বটে। কিন্তু একে নিয়ে তো যাওয়া যাবে না! যদি কেটে পড়ে?

অবশ্য কেটে পড়ার হলে সে আগেই পড়ত। তা না করে এগিয়ে এসে বাঁশ নিজেই নিয়েছে! অতএব উটকে কাঁটা বেছে খাওয়ানোর দায়িত্বও তো আমার উপর! ততক্ষণে ১০০-য় ফোন করায় পিসিআর ভ্যান চলে এসেছে। তা তার মধ্যে থেকে একজনকে বললাম যে আমার গাড়িতে বসে মুমুর্ষুর মাথা সোজা করে ধরে থাকতে। তিনি এদিকে হাঁটতে না পারলেও লোকজন জবরদস্তি করে মাথা চেপে হাঁটু টিপে ধরে প্যাকেট করে ঢুকিয়ে দিয়েছে পিছনের সিটে। কিন্তু নাক দিয়ে রক্তর আভা যেন? পিসিআরের পিছনে পিছনে গাড়ি চলতে লাগল। কিছু দূরেই কল্যাণপুরিতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হাসপাতাল। তার ট্রমা সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি স্ট্রেচার আছে কিন্তু ঠেলে আনার কেউ নেই! অগত্যা দুজন পুলিশ আর বাইক চালকের মদতে আহতকে স্ট্রেচারে বসানোর চেষ্টা শুরু হল। ভদ্রলোকের অর্ধেক জ্ঞান হয়েছে। কিছুতেই তিনি নামবেন না গাড়ি থেকে। এদিক দিয়ে নামাতে যাই তো ওদিকে চলে যায় আর ওদিকে গেলে এদিকে! শেষে দুটো তাগড়া কেঁদো বাঘা পুলিশ (দুটোরই বাড়ি কালিকট! আজব কেস! সুদূর কেরালা থেকে দিল্লি এসে দিল্লি পুলিশের চাকরি করছে! যেন কালিকটে কাটাকাটি হয়ই না!) তাকে টেনে নামিয়ে হাঁটিয়ে নিয়েই ভিতরে চলে গেল। তার পিছন পিছন আমি আর বাইক আরোহী গেল।

বাইক আরোহীর নিজেরও চোট লেগেছে। কিন্তু সে পুলিশ কেসের ভয়েই আধমরা! আমি অভয় দিলাম! “আছি তো!” যাই হোক ভিতরে আরেক কেস। ট্রমা সেন্টারে মধ্যে আমরা কেস লেখাচ্ছি আর তার মধ্যেই এক কনস্টেবল একটি কিঞ্চিত অপ্রকৃতস্থ চ্যাংড়াকে ফটাফট থাপ্পড় মেরে চিৎকার করে বলছে, “আবে ইয়ে হসপিটাল হ্যায়! তু চুপ হো যা! নেহি তো মারা যায়গা!” কি অদ্ভুত সমাপতন।

যাই হোক আহতের পকেট থেকে আমার উপস্থিতিতে পুলিশ পকেটমারি করে মোবাইল পার্স এগারোশো টাকা আর আইকার্ড বার করল। এনডিএমসিতে চাকুরী করেন হন্সরাজ রাই। বাড়ি নাকি কাছেই খেড়া গ্রামে! মোবাইল ঘেঁটে ছেলে বা কাউকে একটা ফোন করা হল। তুলল না কেউ! তারপর নম্বর ঘেঁটে মনুকি মাম্মি কে ফোন করে বোঝালাম কেসটা! বারবার বলতে হল এমন কিচ্ছু হয় নি! এদিকে বাইক চালক পঙ্কজেরও মাথা ঘুরতে লেগেছে! তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা করে দেওয়া হল। আবার ফোন এল! এবার মনুর ফোন! তাকে পরিষ্কার করে বলতেই সে একগাদা ধন্যবাদ দিল!

ওদিকে থাপ্পড় খাওয়া চ্যাংড়াটা মিনমিন করে বলার চেষ্টা করছে যে সে গান্ধীবাবার শিষ্য! মারধর তো দূরের কথা কোনদিন অসাবধানে পিঁপড়ে চাপাও দেয় নি! কিন্তু তার বিপরীত দিকের লোকটা তার ভাঙা চশমা আর ফুলে যাওয়া গাল নিয়ে তার বক্তব্যের অসাড়তা প্রমাণ করতে তৎপর। কে যে ট্রমাগ্রস্ত তাই বোঝা মুশকিল।

যাই হোক পুলিশকে নিজের নম্বর, পঙ্কজকে বরাভয় এবং মনুকে আশ্বাস দিয়ে অফিস পৌঁছলাম। মনের ভিতর কোথাও একটা চাপা আনন্দ কাজ করছিল। ভাল কিছু করার আনন্দ! ভেবেছিলাম নিজের মনেই চেপে যাব!

কিন্তু তা হতে দিল না খান সাতেক ফোন। তিনটে ফোন এল মনুর কাছ থেকে। প্রথমে জানতে চাইল কি ভাবে দুর্ঘটনা ঘটল! বাইকওলার দোষ ছিল কি না! বাইকওলা কি পালিয়ে গেছে? হন্সরাজ ইতিমধ্যেই বড় হসপিটালে চলে গেছেন। তাঁর মাথায় আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং বিপদসীমার বাইরে নয়! হাঁটাচলা চেনাশোনা সব হচ্ছে কিন্তু কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে।

শেষে আমায় মনু ফোন করে জিজ্ঞাসা করল বাবার ফোন এবং অন্যান্য জিনিসের কথা! পুলিশের কাছ থেকে কি ভাবে উদ্ধার (?) করা যাবে! আর পুলিশ সেখানে টাকা পয়সা দাবী করবে কি না! তাকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে আমি আছি! কিছু হলে আমি আছি!

এর পর এলো পঙ্কজের ফোন। তাকে ছাড়তে ছাড়তে বিকেল করে দিয়েছে! তার তাও ভয় রয়েছে! কেস খেয়ে যাবার ভয়! তাকেও আশ্বস্ত করলাম! শেষে তার ভিতরকার মনুষ্যত্বের ঝলক দেখলাম মনুর নম্বর চাইবার মধ্যে! নাকি মনুকে আগে থেকে ম্যানেজ করতে চাইছে? যাই হোক মনুকে আমি ইতিমধ্যেই বলেছি কারুর দোষ নয় আগে বাবাকে বাঁচাও! একেও বললাম! পুলিশ ফোন করলে তো আমি আছিই!

তা পুলিশ ফোন করল, খুব রোয়াব নিয়ে শুরু করলেও আমার অবিচল এবং শান্ত গলায় হয়তো কিছুটা অন্যরকম মনে হয়েছিল। শেষ করল খুব সম্ভ্রম নিয়ে! “স্যার জরুরত পড়েগি তো হাম দুবারা আপ কো কষ্ট দেঙ্গে!” ততক্ষণে নিশ্চিত হয়ে গেছি যে মনুর মানিব্যাগ পেতে আর পঙ্কজের ফালতু কেস না খেতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না!

যাই হোক কোথাও একটু নিজের জন্যও ভাল্লাগা এসে ঘর বাঁধল! তাই লজ্জা লজ্জা মুখে আপনাদের বললাম! তবে আরেকটা কারণও আছে! কোথাও যদি পাঁচ ফুট এগারোর সামান্য ভারী চেহারার একটা মানুষকে লাল গাড়ি বা কালো বাইকে দেখেন যে পথে ঘাটে মাটির গন্ধ নিচ্ছে। দয়া করে এগিয়ে আসবেন! মুখটা তো চেনেনই! না চিনলে নিচে দেখে নিন প্লিজঃ
12557157_1017542314970722_1308047321_o

ওই যে বাম দিকের চোঙা হাতে লোকটা! ঐটাই আর কি!

ফিসফাস ১ ও ২ পাওয়া যাবে কোলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় ২৭শে জানুয়ারি-৭ই ফেব্রুয়ারি ২০১৬- সৃষ্টিসুখের স্টল নং ৪৯৩-এ (থিম প্যাভিলিয়ন বলিভিয়ার পাশে)

Fullscreen capture 20-01-2016 103833.bmp

(১৫৩)

পাঠক/ পাঠিকারা, বুইলেন, আইডিয়ালি এই পোস্টটা চলে আসার কথা ছিল সেই ৪ঠা জানুয়ারিতেই। কিন্তু এখন মাথায় পাকাচুলের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ধৈর্যও বেড়েছে বটে। তাই মনে হয়েছিল, আগে শেষ দেখি তারপর না হয়…

তা সেই জানুয়ারিস্য প্রথম প্রভাতে অচেনা দিল্লির কনকনানোহীন ঠাণ্ডার মধ্যে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েই চমকে গেলাম। আরে ওয়াহ এ রাস্তা তো চিনি না বাপ। ছ্যার ছ্যার করে ফোর্থ গিয়ার ফিফথ গিয়ারে গাড়ি গড়াচ্ছে। ফার্স্ট গ্রিয়ার, ক্লাচ, ব্রেক-এর জটিল সমাস নেই। নেই সময়ে অফিস পৌঁছোবার দফারফা অবস্থা। কি ব্যাপার? না অরবিন্দ কেজরিওয়াল বাবু দিল্লিতে ডিক্লেয়ার করেছেন যে বায়ুদূষণ কমাবার জন্য জোড় বিজোড়ের অঙ্ক কষে গাড়ি নামাতে হবে।
জোড়ের দিনে জোড়ের গাড়ি আর বিজোড়ের দিনে বিজোড়। আর অন্য দিনে? বাকি সব মেরে পিছে আও! মানে জোড় না থাকলে জোড়ের দিনে আস্তে লেডিজ! মেট্রো আর বাস আছে! স্কুল বন্ধ তো স্কুল বাস আছে! ধোঁয়া ওঠা সকালে ধোঁয়া ওঠা এক্সহস্টে তা দিয়ে বাড়তি দাম চাওয়া অটো আছে! কিন্তু নিজের গাড়ি নেই!

তা মেট্রো বা বাস তো আছে নিজের জায়গায়! কিন্তু লোক ঠাসার বহরের তো শেষ নেই! একদিন বিকেলে বউকে গোবিন্দপুরি মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে দিতে গিয়ে দেখি সিঁড়ি দিয়ে লাইন চালু হয়েছে। থাক বাবা! তুমি অটোতেই যাও! বেশি টাকা চাইলেও যাও! নইলে যদি জোড় বিজোড়ের চক্করে বউটাই হারিয়ে যায়? কেলেঙ্কারির শেষ থাকবা না!

যাই হোক। খিল্লি বন্ধ হোক! মূল মুদ্দায় ফিরে আসি! আসল কথা হল দূষণ বা পলিউশন! সেটা কি ভাবে কমানো যায়? বায়ু দূষণ, জল দূষণ, শব্দ দূষণ, আলোক দূষণ। সমস্ত কিছুর চক্করে আমরা তো কোন রকমে টেনেটুনে ম্যানেজ ট্যানেজ করে শেষের সেই দিনটাকে ইলাস্টিকের মতো টানটান করে রেখে দিয়েছি। কিন্তু তারপর? আমাদের সন্তান সন্ততিরা? তাদের পর? বা আরও তাদের পর? দুঃখিত পাঠক পাঠিকারা, আরও তাদের পরটা সত্যিই ঝাপ্সা! এই পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করার বদলে আমরা উত্তরাধিকারে রেখে যাব ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ফুসফুস আর আনুষাঙ্গিক রোগের ডিপোগুলোকে। আকাশটাই তো ছোট করে দিচ্ছি! তাহলে আর উড়বে কোন সাহসে তারা?

তো যাই হোক, হুড়মুড়ি প্রতিক্রিয়া (নি জার্ক রিঅ্যাকশন আর কি) বলে অরবিন্দ বাবুকে যতই হ্যাটা করি না কেন, কোন না কোন ভাবে আমাদেরও কিন্তু ভাবতে হবে এই বিষয়ে। মনে আছে সিএনজি বাস করার জন্য শীলা দীক্ষিতকে কতটা বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। সেই তুলনায় আজ পরিস্থিতি অনেক বেশি ঘোরালো! নিঃশ্বাসে বিষ ঢুকে ফুসফুস হৃদয় ফুটিফাটা করে দিচ্ছে।

কিন্তু দিল্লির মানুষও তো পাল্টেছে! গতবছরেই রেকর্ড মার্জিনে (আমার এখনও যেন বিশ্বাস হয় না!) কেজরিকে জিতিয়ে এনেছে, চোখে রঙিন চশমা পরে। আর নিত্ত নৈমিত্তিক নাটকগুলিকেও বড়ভাইয়ের স্নেহ নিয়ে সহ্য করছে। কেন? কেন না পরিবর্তন সবাই চায়! সময় সবাই চায়! একটু অন্য ভাবে পৃথিবীটাকে দেখার! তাই তো সিংহভাগ সফরকারী বিনাবাক্যব্যয়ে নিয়ম মেনে পথে নেমেছে! আর যারা মানছে না? বাবু ২০০০ টাকা গ্যাঁট গচ্চা দিয়ে গাড়ি চালাও! তা দিল্লির মানুষের কাছে টাকার অভাব নাকি? ধুস ২০০০ তো কড়ে আঙুলের ময়লারও সমান নয়!

কিন্তু যাদের দেবার ক্ষমতা নেই? এই যেমন আমি! প্রায় দেড় বছর পর লজঝড়ে বাইকটাকে সার্ভিস করিয়ে চকচকে করিয়ে মাঠে নেমেছি! আরিত্তারা কি তার অভিমান! কি তার আওয়াজ! চেন তো ঘটাং ঘটাং করছেই গিয়ার চেঞ্জ করতে গিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করছে হ্যান্ডেল ঠন ঠন দাঁত কনকন! কিন্তু বয়সটাও যেন এক ঝটকায় কমে গেল দশ বছর! বাইক চেপে জ্যাকেট পরে সানগ্লাস চাপিয়ে শীতের সকালে অফিস তো মুড়কি চিবোবার আগেই পৌঁছে যাচ্ছি। তার উপর মানানসই ঠাণ্ডাও পড়ে নি তেমন। আর পায় কে! তবে যেতে যেতে দেখলাম বাসস্ট্যাণ্ডে মানুষের ঢল রাস্তায় নেমে আসছে আর মেট্রোগুলোর কথা তো কহতব্য নয়!

তবে যে ঘটনাটা না বললেই নয় সেটা হল এক বামা গাড়ির ডানদিকে বসে জোড়ের দিন বিজোড় গাড়ি চালাচ্ছেন আর বাম দিকে এক বামাপদ! তা পুলিশের ব্যারিকেড আসতেই সে বামাপদ নিচু হয়ে সিটের নিচে সেঁধিয়ে গেল। আর মামণি দিব্যি মহিলা ড্রাইভারের সুবন্দোবস্ত নিয়ে গলে বেরিয়ে গেলেন! সিরিয়াসলি বলছি! নিয়ম থাকে তার ফাঁক ফোকর থাকে! ট্রেন বা সিনেমাহলে মহিলাদের অনেক পুরুষই এগিয়ে দেয় যাতে তারা গিয়ে টুক করে লাইন ভেঙে টিকিটখানি কেটে ফেলতে পারে! কিন্তু এ চীজ জিন্দেগিতে দেখতে পেতাম না যদি না অড ইভেনের এই উর্বর ধারণা দশাবতারের মস্তিষ্কে ধারণ না করতেন।

তার মাঝে কে আবার কোর্টে কেস ঠুকে দিয়েছে! এখন তো জনস্বার্থ মামলার হিড়িক পড়ে গেছে! ধোনির ভারত হারলেও জনস্বার্থ আর পাবলিক প্যাঁদালেও জনস্বার্থ! তা কোর্ট বাবাজিও জিজ্ঞাসা করলেন হ্যাঁ ভাই দূষণ বেড়েছে না কমেছে? একদম ইঞ্চিটেপ দিয়ে মাপতে হচ্ছে! হাফ ইঞ্চি বাড়লেও হই হই আর তিন ইঞ্চি কমলে তো কথাই নেই! লোকে মিষ্টি বিলোচ্ছে! কে যে ঠিক আর কে যে ভুল ছাতা বুঝতে বুঝতেই পনেরো দিন কেটে চলে গেল।

প্রথম দিন রাস্তা দিয়ে বিজোড় সংখ্যার গাড়ি চালাতে গিয়ে দেখলাম জোড় সংখ্যার গাড়িগুলো সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাবিয়ে চেয়ে দেখছে। সেই গল্পটা মনে পড়ে গেল! বাজে গল্প যদিও মানে জঙ্গলে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে জননাঙ্গ জমা রাখা হচ্ছে ব্যাঙ্কে পাঁচ বছরের জন্য টোকেনের বিনিময়ে। মনখারাপ নিয়ে এক বাঁদর হেঁটে যাচ্ছিল মাথা হেঁট করে। উপরে তাকিয়ে দেখে তিন চারটে বাঁদরী খিকখিক করে হাসছে। সে বাঁদর বলল, “এখন যত ইচ্ছে হেসে নে! আমি একটা হাতির টোকেন ঝেড়ে রেখে দিয়েছি!” ছিঃ বাজে কথা শুনবেন না, বলবেন না! দেখবেনও না!

নির্মল হাওয়ায় শ্বাস নিতে গিয়ে ঠিক ভরসা করতে পারলাম না যদিও! বাইক আর অটো আর ট্রাকের ধোঁয়া তো আগের মতই আছে! তবে পথ মাতার উপর বোঝা কমে গিয়েছে কদিনের জন্য! আর আবহাওয়াটাও বদলে গেল যেন, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মনোরম হেমন্তের পরিবেশ! ঠাণ্ডা পড়ল, জোড় বিজোড়ের রিপোর্ট কার্ড পেরিয়ে। তাও বেশি দিনের জন্য না! এই আসি এই যাই শীত, হঠাৎ গরম, ভুষভুষে ঘাম! দিল্লির আবহাওয়াটা পাল্টে যাওয়া বন্ধুর মতই অচেনা হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে!

তবুও আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি ক্ষতি কি! স্বপ্ন দেখতে তো ক্ষতি নেই! তবে একটু ভাবনা চিন্তা করে দেখা ভালো!। স্বপ্ন দেখি, দিল্লির চারপাশ দিয়ে বাইপাস তৈরী হয়েছে আর ধূলিধূসর ট্রাকগুলো শহরের বায়ু দূষিত না করে সেই রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে। ডিজেল প্যাসেঞ্জার গাড়ি ব্যান হয়ে গেছে। সরকার থেকে হাইব্রিড আর সিএনজি গাড়ির উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে! নিয়মিত দূষণ পরীক্ষা হচ্ছে! আর মানুষ জন নিজে থেকে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে, পৃথিবীর আয়ু বাড়াবার জন্য! আসলে উত্তরাধিকারের মধ্যে দিয়েই তো আমরা বেঁচে থাকি! আর এই সুন্দর পৃথিবীটা ছেড়ে যাব কোথায় বলুন তো! উত্তরাধিকারীরা তো এই পৃথিবীতেই খেলে পড়ে বড় হচ্ছে! চাঁদে বা মহাকাশে কলোনি তো এখনও ডিস্ট্যান্স ড্রিম!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ উত্তরাধিকারী বলতেই মনে হল ছোটটার কথা! সে আজকাল বহুত ফটর ফটর করে! ঘুমোতে গিয়ে গান শোনার ফরমাশ! তার মা তাকে চাপড়ে ঘুম পাড়াচ্ছে! আর সে নিয়মিত ফরমাস করে যাচ্ছে, ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে’ গাও! ‘আয় আয় ঘুম’ গাও! ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ গাও! ঘুমের তো আটকলা! তা এই সময় দরজা খুলে আমি প্রবেশ করেছি! সে মায়ের কোলে শুয়েই একবার উঁকি মেরে দেখে নিল বাবা ঢুকেছে! বলে উঠলঃ “ও বাবা! এচো! একটা ভাল গান হচ্চে!” পাগলা ঘুমোবি যদি, ঢেঁকুর তুলবি কেমনে!!!

(১৫২)

ছেলে বড় হয়ে গেলে মায়েদের সঙ্গে সম্পর্কটা বদলে ফেলা দরকার হয়। আজকের পরমাণু পরিবারের মার স্বপ্নভঙ্গের জীবনে একমাত্র স্বপ্নের নাম হয় ছেলে। তা সে ছেলে যখন মায়ের আঁচল ছেড়ে সংসারে পা রাখে কড়ায় গণ্ডায় হিসাব বুঝে নিতে। মায়ের হৃদয়ের মড়মড়ানি যেন মরমিয়া ধুনে বাজে। সমাজ সংসার তখন তুচ্ছ হয়ে যায়। দুরদর্শিতা মুছে যায় অপত্য স্নেহের আদলে।

কোলকাতা আর আমার সম্পর্কটাও ঠিক যেন এই রকম। কোলকাতা ছেড়ে ষোল বছরের উপর হয়ে গেল পাকাপাকি দিল্লিতে মন বসিয়েছি, কিন্তু কাজে অকাজে সুতোর টানে ঠিক ফিরে যেতে হয়। মনটাও দেখি কুড় কুড় করে লেজ গুটিয়ে সঙ্গ নেয়। শহর কোলকাতার সঙ্গে আমার বাঙালিয়ানা জড়িয়ে নেই। বরং বাঙালির কোলকাতা সর্বস্বতা দেখলে আমার টিউবলাইটের চোকে স্পার্ক মারতে থাকে! বাংলা শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি তারকাটার সীমানা পেরিয়ে ওপার বাংলা হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে তবুও কোলকাতার বাঙালিরই নার্শিসাসি লক্ষণ যাবার নয়!

তবুও কেন জানি না ফিরে যেতে হয়, বার বার! কদিন আগেই যেমন পিয়ারলেস হাসপাতালের কাছে পরিপূর্ণতা হাফওয়ে হোম পরিদর্শনে যেতে হল। মানসিক অপারগতা পেরিয়ে সমাজের বুকে ফিরে যাবার জন্য তৈরী মেয়েদের মাঝপথের বিরামঘর, জীবনের মোগলসরাই! দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ পেরিয়ে যোগ বিয়োগের অঙ্কে উৎরে যাবার স্থান। তবুও কেন জানি না সমাজ মেনে নিতে পারে না! যেমন পারে না জেল খাটা আসামিকে ফিরে আসার পথ বাতলাতে। কিছু কিছু কথা ভাষা পেয়ে গান হয়ে ওঠে আর কিছু কিছু প্রাণ সমাজচ্যুতির ভেঙে যাওয়া আয়না জোড়া না লাগাতে পেরে থেকে যায় ছায়াহীন হয়ে।

উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা বছর বাইশের সাফিনা আমার দিকে আকুল নয়নে প্রশ্ন করে, “আঙ্কল, ইয়াঁহ রহনে দেগা না মুঝে? দো ভাই হ্যায়। ঘর সে নিকাল দিয়া আঙ্কল, পাগলি হুঁ না ম্যায়!” মাথায় হাত বোলানো ছাড়া মুখের ভাষা খুঁজে পাওয়ার মত আতস কাঁচ পাই না তখন।

পরিপূর্ণতা পাক সকলে

পরিপূর্ণতা পাক সকলে


বিষণ্ণতা নিয়ে শহর কলকাতা খুঁড়ে ফেলি চেনামুখের খোঁজে। নতুন পুরনো মুখ নিয়ে শহরটা আবার আমায় আগলে ধরে।

সময় কাটতে থাকে, কলের যন্ত্রের মতো ধীরে ধীরে। বাস্তবে ফিরে আসতে হয় নিজে থেকেই! সন্ধ্যায় যাবার ছিল এক বিয়েবাড়ির ভোজে! আর তার আগে আমার নতুন পূজার মন্দির, কলেজ স্ট্রীট। বিয়ের ধুতি পাঞ্জাবী পরেই হাজির হলাম কাজ সারলাম কলেজ স্ট্রীটের। কিন্তু তারপর আর ট্যাক্সি পাই না!

এই এক ব্যামো হয়েছে বটে শহরের! আগের দিন রাতে আমার চেন্নাই প্রবাসী পিসতুতো দাদা, ট্যাক্সি না পেয়ে প্রায় আধ ঘন্টা অপেক্ষা করে হেঁটে গিরিশ পার্ক গিয়ে একটা অটোকে একশো টাকা দিয়ে কোন রকমে হাওড়া পৌঁছেছিলেন। আমি যাব টালা পার্কে কিন্তু নো ট্যাক্সি! সবাই উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে চলেছে। যাত্রীর গন্তব্যে নয়, যাত্রীকে নিজের মতো করে মানিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে! হলুদ আর সাদা ট্যাক্সিগুলোর গায়ে ‘নো রিফিউজাল’ লেখাটা কেমন জোকারের মতো জিভ বার করে ভেঙচি কেটে চলেছে যেন।

শেষে ধুতি পাঞ্জাবী আর বিদ্যাসাগরী চটি পরে আর জি কর অবধি হেঁটে শেষে একটা ফাঁকা বাসে উঠে টালা পার্কে নেমে বিয়েবাড়িতে মুখ দেখালাম! আহ বিয়ে বাড়ি আর বাহ বিয়ে বাড়ি!

কি বলব প্রবাসীদের দুঃখ! প্রবাসী বাঙালী গিরগিটির মতো আজকাল ছোলে চাওল, নবরতন কোর্মা আর লাউয়ের কোফতায় হাত গন্ধ করছে! বাঙালী খুব সহজেই মানিয়ে নিতে পারে বটে, তবে তা নিজের আত্মপরিচয় গচ্ছিত রেখে হলেই মুশকিল। উত্তরভারতীয় আগ্রাসনে মাথা নত তো কোলকাতার বিয়েগুলোও করতে লেগেছে, সেখানেও দেখি বর্ণহীন পনিরের চৌখুপি চেকনাই।

আহা নিরামিষেও কি বাঙালির তুলনাহীনতা ছিল না? ধোকা আর শুক্তো, কাঁকরোল বড়া আর মোচা, পালং ঘণ্ট আর ছানার ডালনা! সব তো বুড়ি গঙ্গার জলে ভেসে গেছে যেন। রাধাবল্লভী আর ছোলার ডালের জায়গা নিয়েছে কম্বলের মতো ভাটুরে আর ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা কৃষ্ণবর্ণের ছোলে। মনের মধ্যে আশা রাখি, কোথাও কোন খানে নিশ্চয় কোন না কোন বিপ্লবী মায়ের কোলে, বাবার চওড়া বুকে রন্ধ্রণ বিপ্লবী বাঙালী বেড়ে উঠছে। সুনামির মত ঠিক সময়ে আছড়ে পড়বে।

তবে যে বিয়ে বাড়িটা গেলাম সেখানে তো মাসাল্লাহ আয়োজন! ছোট্ট অথচ বুকে ধাক্কা মারা ব্যঞ্জন! একটা মাছের কচুরি দিয়ে নামমাত্র আলুরদম সাবড়ে দিয়েই ঝটকা খেলাম! খেলে যাহ! এ কেউ একটা খায় নাকি? তারপর আবার অধুনালুপ্ত ব্রেস্ট কাটলেট আর পাঁঠার কষা! কচুরি তু ফুচকা বন যা গুরু! আর ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ পেটের ভিতরে সেঁধিয়ে যা! তারপর আবার গুড়ের রসমালাই আর তপ্ত মাখা সন্দেশে নলেন গুড়ের টাকনা! আহা কি বোর্ডটা মোছার জন্য কাপড়টা কোথা গেল যে কে জানে! গৃহস্বামীকে বললাম, “সেই আমার নিজের বিয়েতে খেয়েছিলাম আর এই তোমার মেয়ের বিয়েতে খাচ্ছি! নিজের বিবাহবার্ষিকীটাও ফটাফট করে ফেল! আর ডেকে দিও!”

কোলকাতায় আসা সার্থক করে বিয়েবাড়িটা বিদায় নিল সময়ের চাদরে। হালকা আমেজে বন্ধুর বাইকে বসে আসার সময় পালটে যাওয়া শহরটাকে শুষে নিলাম আবার যতটা পারা যায়! পরের দিন সকালেই ফিরে আসার পালা। আহা ভাল থেকো কোলকাতা! পালটে যাওয়া সমীকরণে ভাল থেকো!

গুগল থেকে নেওয়া

গুগল থেকে নেওয়া


প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ আমার মেয়েটি এখন বহুত বকতে শিখেছে। ফটর ফটর করে গান গাইছে! সে বাতাসাকে বলে ‘বাতাস’, লেবুকে বলে ‘টকটক’। নিজেই সেদিন শুনে শুনে গাইতে লেগেছে, “আলোবাতাস পেলাম শুধু আলোবাতাস বুজলাম না! (ভালোবাসা)” আর গাইতে গাইতেই চেঁচিয়ে উঠেছে, “বাতাস কাবে, মুই দিয়ে বাতাস কাবে!” আর আগের দিন সুকুমার রায় এসেছিল তার মুখে, “আকাশের গায়ে নাকি টক টক গন্ধ!” আর যায় কোথা! গাড়ি চালাতে চালাতেই খোঁজ নিতে হল বাড়িতে ফ্রিজে লেবু আছে কি না! উফ! বাতাস ইয়ে ইয়ে মানে হাওয়া আনে দে!

(১৫১)

শুরুর দিকে ফিসফাস শুধুমাত্র লেখকের সঙ্গে কি ঘটছে বা না ঘটছে তাই নিয়ে ছিল। তারপর তো এনসাইক্লোপিডিয়া হয়ে গেল। ফিসফাসের লেখক তার পাঠক পাঠিকার সঙ্গে আলপিন থেকে এলিফ্যান্ট, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, মেফিস্টোফিলিস থেকে মশলা ধোসা সবই আলোচনা করে চলেন। আসলে খবরে টিকে থাকতে হবে তো!

সে যাই হোক এখন যে মন্ত্রণালয়ে আছি তা হল বিকলাঙ্গজন সশক্তিকরণ বিভাগ। তা সেখানে হোমও হয় যজ্ঞও। এই তো সে দিন ন্যাশনাল ফিল্ম ডিভিশনের সঙ্গে মিলিয়ে প্রথম বিকলাঙ্গজনের জন্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হয়ে গেল সিরি ফোর্টে। দেশ বিদেশ থেকে ৪০টি পূর্ণ দৈর্ঘ্য, স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচিত্র এবং ডকুমেন্টারি হাজির ছিল। যার মধ্যে বাংলায় কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘ছোটদের ছবি’ও ছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন গুলজার ও সঞ্জনা কাপুর। একজন শ্বেত কপোত আর আর একজন সবুজ প্রান্তরের মতো নীল। কিন্তু সেসব ছেড়ে দিয়ে মন কেড়ে নিল দৃষ্টিবাধিত, মনোবিকৃত ও শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ বাচ্চাদের অনিন্দ্য সুন্দর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

দিবাকর বলে ছেলেটা প্রথম সারেগামাপা লিটল চ্যাম্প-এর পর কোথায় যেন হারিয়ে গেছিল। তাকে আবার পাওয়া গেল। আর পাওয়া গেল, ‘সাইস্বয়ম’, ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর ব্লাইণ্ড আর শেষে অমরজ্যোতি ট্রাস্টের শিশু কিশোরদের হৃদয় রাঙানো পারফরম্যান্স। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল জীবনে বাধা না থাকলে অতিক্রমের সাহস থাকে না!

সামাজিক ন্যায় ও সশক্ততা মন্ত্রণালয়তে আছি বলে কি না জানি না এখন বেশ মাঝে মাঝেই সোশাল এক্সপেরিমেন্ট করতে ইচ্ছে হয়। এই যে দিন চারেক আগে যে দিন বিকলাঙ্গ দিবসে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বিতরণ হল সেদিন চোখে কালো চশমা আর সাদা শার্টে কালো টাই মেরে ডিজাইনার গোটি নিয়ে ছবি দিলাম ফেবুতে। কমেন্টের ঢল নামল। এবং প্রত্যাশিত কমেন্টাবলীই।

কিন্তু আমার ধান্দা ছিল অন্য। গোটির দু পাশের দুটি দাঁড়া কেটে একদম শায়ের শায়ের ভঙ্গিমার দাড়ি রাখা। কাল সকালেই নিউ দিল্লি স্টেশনে যাবার ছিল যে! তা সেই দাড়ি নিয়ে ভোর বেলা সাড়ে ছটায় গিয়ে হাজির হলাম স্টেশন চত্বরে। কাউকে ট্রেনে তুলে দেওয়া ছাড়াও একবার চোখ খুলে দেখা দাড়ি সম্বলিত আমিকে কোন ক্যাটাগরাইজেশনে ফেলা হয় না কি।

তার উপর বিশেষ দাড়ি। যা দেখলেই মুখ থেকে আপনা আপনি উর্দু বেরিয়ে যায় আর মাথার পিছনে ট্যাঁও ট্যাঁও করে সেতার বাজতে থাকে।

গিয়েই দেখলাম ভোরের আলো ফোটার ঠিক মোক্ষম মুহুর্তে শিকার ধরার জন্য একদল টিটিই ঘোরাঘুরি করছে। বিনা বাক্য ব্যয়ে আমি গিয়ে প্ল্যাটফর্ম টিকিট কেটে আনলাম। তারপর যাত্রীকে ঠিক ঠাক ট্রেনে তুলে দিয়ে বেশ ধীর কদমে উঠলাম ওভারব্রীজে। এবং টিটিদের মোটামুটি দূরত্ব থেকে হঠাৎ সোজা তাকিয়ে জোর হাঁটতে আরম্ভ করলাম। যা ভেবেছিলাম, দুই টিটি আমাকে ক্যাঁক করে ধরল, “টিকিট?” আমি বললাম, “আই কার্ড?” ঘাবড়ে গেল। কারণ কালো কোট তো ছিল না। তাও একজন একটু গরম দেখিয়ে বলতে গেল, “কিউ?” আমি অম্লান বদনে বললাম, “কিঁউ কি মুঝে দেখনা হ্যায়!” “আপ হো কোউন?” ‘কোই নেহি, পর দেখনা হ্যায়!”

এটা আর বললাম না, যে সব বেটাকে ছেড়ে দিয়ে দেড়ে ব্যাটাকেই ধরলি কেন মামা? বিশেষ রকমের দাড়ি দেখলেই এক বিশেষ জাতকে মনে হয় না? আর আজকাল তো তার সগ্নে উগ্রপন্থাকে মিশিয়ে দিয়ে দারুণ একটা কক্টেল তৈরী হচ্ছে।

যাই হোক কিছু একটা সমস্যা নিশ্চয় ছিল, তাই তারা একযোগে বলে উঠল, “কোই বাত নেহি যাইয়ে!” আমি তো তখন জিতে গেছি! তাই পকেট থেকে ট্যাঙস করে প্ল্যাটফর্ম টিকিট বার করে দেখিয়ে, “আই কার্ড দিখানে কা জরুরত নেহি” বলে ট্যাং ট্যাং করে হাঁটা দিলাম হতভম্ব মুখগুলোর সামনে দিয়ে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবার পরেও দেখি দিবাস্বপ্নের চটকা তাদের তখনও ভাঙে নি। ভোরের স্বপ্ন তো নাকি সত্যিও হয়। সূর্য তখন ভোরের আলোর জ্যামিতি এঁকে চলেছে একমনে।

12324970_10153784469695763_749557157_n

আসলে, এই সাংস্কৃতিক ভিন্নতা বা অজ্ঞতা সম্পর্কিত ভয়টা শুধুমাত্র ইউরোপীয় দেশগুলিতেই চেপে বসে নি। যেখানে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী রাজধানী ক্ষতবিক্ষত হবার কিছু দিনের মধ্যেই অভিযুক্তের নাম ‘করিম’ (বেঞ্জিমা) হবার জন্য তাঁকে দেশদ্রোহী ঘোষণা করে দেন বিচার শেষ হবার আগেই। সাংস্কৃতিক পরিচয় বাঁচিয়ে রাখা যেমন জরুরী তেমনই জরুরী বহুমাত্রিক সমাজে অপরের পরিচয়কে গুরত্ব দেওয়া বা স্বীকার করা।

এই ধরুন আমরা বাঙালীরা যারা বেশ কিছুকাল যাবৎ প্রবাসে রয়েছি। সন্তান সন্ততি এবং বিশেষ করে নিজের মধ্যে বঙ্গ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা করে যাচ্ছি। শিকড়টাকে ধরে রাখার চেষ্টা। এর সঙ্গে কিন্তু কসমোপলিটানিজম বা আন্তর্জাতিক সার্বিক মতবাদের কোন বিভেদ নেই। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে বহুরূপীও হতে হয় না আবার অন্য রঙ লেগে গেলেও চোখ গেল চোখ গেল করে চিৎকার করার দরকার পড়ে না। অনায়াসে পরিবর্তনকে বুকে করে ধ্বসে যাওয়া থেকে পা বাঁচিয়ে সন্তপর্ণে বেঁচে থাকা যায়। একেবারে দিল্লিরও হতে হবে না আর কোলকাতায় স্বপ্ন হন্টন মারারও দরকার নেই। মধ্যপন্থাটা জরুরী। সেটা কেন জানি না, যারা এক নৌকায় ইতিমধ্যেই সওয়ার তাদের বোঝানো সম্ভব হয় না। তাদের মাল্টিটাস্কিং হৃদয় নয় বোধহয়।

এই যে দেখুন কোলকাতার বিয়েবাড়িগুলোতে, বেবাক ব্ল্যাণ্ড হয়েও ছোলে মশালা, নবরতন কোর্মা বা বেবি নান ঢুকে চলে গেছে। অথচ শুক্তো, মোচা, পাতুরি, ধোকার ডালনা দাদু ঠাকুমার গল্পে বা রেসিপির বইতে ঠাঁই পেয়েছে। বাঙালি আসলে জাত হিসেবে বিশাল এক্সপেরিমেন্টাল। সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্যের ঝোল নিজের গায়ে টানতে লাগবে। অথচ নিজের হেঁশেলে রত্নের অভাব নেই।

অবশ্য দিল্লিতে থাকার জন্য এমনও বাঙালি দেখাও হয়ে গেছে, যারা নিজের রঙ ছেড়ে হরবোলা হয়ে গেছে। মুখে বাংলা সংস্কৃতির বারফট্টাই মেরে নিমন্ত্রণ বাড়িতে সর্ষো কি সাগ আর মক্কে দি রোটি অথবা মালাই কোফতা আর পনীর মশালা দিয়ে কাজ সারে। একদম উত্তরভারতীয় আন্দাজ। বাড়িতে বা বাইরে চিকেনের ঠ্যাং ভেঙে ভিতরের রস সুররর সুররর করে টানবে কিন্তু অনুষ্ঠানে বিড়াল তপস্বী সাত্বিক সাজ। কে জানে, ছেলেপুলেগুলোর জন্য আমরা কি রেখে যাচ্ছি? হায় হায় না বাই বাই?

ওহ পনির বলতে মনে হল একটা ইন্টারভিউয়ের কথা। যেখানে এক আন্তর্জাতিক গোয়ানিজ শেফ পনীরকে ভারতীয় নিরামিষ খাবারের অভিশাপ বলে বর্ণনা করেছেন। পনীরকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বিভিন্নতাকে ভুলতে বসেছি আমরা। একটা কুমড়োর ছোকা বা শুক্তনি বা কচু শাক বা অন্যভাবে দেখতে গেলে ধোকলা, উপমা, সম্বরের মাহাত্ব্য গেছে যমুনায় ভেসে। আর কে না জানে যমুনার জলও যে তলানিতে ঠেকেছে।

Paneer-1000

(১৫০)


আরে বাবু, ঘণ্টা বাজল না, পুষ্পবৃষ্টি হল না, শঙ্খধ্বনি হল না, বিদ্যুৎ চমকাল না, আজানের শব্দ ভেসে এল না কমসে কম বাতাসার হরির লুট হল না আর দেড়শ হয়ে গেল? বললেই হল? আরে তামাশা বনাকে রাখ দিয়া রে বাওয়া!!!

জন্মেই আপনি কি ভেবেছিলেন যে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার মোক্তার উকিল চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হবেন? বাজি রেখে বলতে পারি কক্ষনো না। আমি ছোটবেলায় ভেবেছিলাম গোলকিপার হব। সে তো কি ভাঁটের গোলকিপিং করতাম আমার স্কুলের বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করলেই জানবেন। তারপর একবার স্কুলের রচনায় (স্কুলে গরু ছাড়াও অন্য রচনা হয় কিন্তু- ইতিহাস রচনা) লিখলাম ক্রিকেটার হব। তখন স্বপ্নে দিলীপ দোশি আর ডেভিড গাওয়ার। আর বাস্তবে মনিন্দার সিং আর আজহার! ৯২তে ডেভিড গাওয়ারকে একদম সামনাসামনি দেখে কেঁপে গেছিলাম। বিশ্বাস করুন, শচীন তো কোন ছাড় ইমরান, ভিভ, গাভাসকার (নাকি গাওস্কর?) বা প্রকাশ পাড়ুকোন, লিয়েন্ডার বা পিটি ঊষাকে দেখেও কখনো হয় নি সে রকম। তা সে থাক সে তো ‘বাপি বাড়ি যা’-র ছন্দে সপাটে সিক্সারের মতো গ্যালারির বাইরে গিয়ে পড়েছে। স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে, বাস্তবের সিঁড়িতে চড়তে পারে নি।

তারপর আর কি? বাপের বড় ছেলে হয়ে দায়িত্ব কাঁধে উঠে গেল আর চাকরি নিয়ে চলে এলাম দিল্লিতে। তবে সত্যি বলব, না হলে মাথায় বাজ পড়বে! আমার বাবা কোনদিন জোর করেন নি- মাও না। মানে যখন বললাম জয়েন্টে বসব না, বা খেলা ছেড়ে দেব বা সায়েন্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করব না তখন যেমন বারণ করেন নি। তেমনই নব্বইয়ের শেষ বছরে হুট করে বললাম বিয়ে করব। তখনও বারণ করেন নি। কিন্তু এমন সৌভাগ্য কতজনের ভাগ্যে জোটে? নিজে নিজে উচ্ছন্নে যেতেও তো আজকের সমাজ দেয় না। ঘাড় ধরে ঘোড়দৌড়ে নামিয়ে দেবে তারপর ঠুলি পরিয়ে দৌড়। ট্র্যাক থেকে সরতে চাইলে চাবুক, অসুস্থ হয়ে পড়লে চাবুক, বিশ্রামে চাবুক। সকাল সন্ধ্যা শুধু ছুটে চল ছুটে!
আমার এক বন্ধু খুব টেনশন করছিলেন, তাঁর ছেলের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে বলে। কোন ক্লাস? আপার নার্সারি। বললাম, এই সময়ই তো টেনশন করতে হয়। উঁচুর দিকে উঠলে বাপ মার টেনশন ছেলেমেয়েরাই নিয়ে নেবে। আরে জিন্দেগী কো একদম তামাশা বনাকে রাখ দিয়া রে বাওয়া।

তা তামাশা গেলাম দেখতে! এমনিতে আমার এই রনবীর আর দীপিকা জুটি হিসাবে ভাল লাগে। গুড কেমিস্ট্রি। একে অপরকে কমপ্লিমেন্ট করে সহজেই। তা বলে বাস্তব জীবনেও এদের জুটি বাঁধতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। প্রায় পাঁচ বছর মুখ দেখাদেখি বন্ধ অবস্থাতেই ভূপতি আর পেজ একসঙ্গে খেলে গেছে।

যাই হোক, কর্সিকা আর কোলকাতা ছুঁয়ে শিমলা আর দিল্লি। গল্পের গরু জাবর কাটতে শুরু করল। যাকে মনে করলাম সবার থেকে আলাদা সেই দেখিই পরিস্থিতির চাপে খুঁটিতে বাঁধা গরু। একই চর্বিত চর্বণ দিন রাত চিবিয়ে যাচ্ছে। তা মার তাকে ল্যাং। সে তো ল্যাং খায় নি কখনো। প্যাকেজ, সেফটি, সিকিউরিটির চাকচিক্যে মিথ্যেটাকেই সত্যি বলে ধরে নিয়েছে। মাপা হাসি চাপা কান্না ছাপা রাগ কাঁপা কাঁপা স্বপ্ন নিয়ে তার জীবন নটা থেকে পাঁচটা আর পাঁচটা থেকে নটায় আবদ্ধ। কিন্তু ল্যাং খেয়েই মুখ থুবড়ে পড়ে বুঝতে পারল- ‘আরে! মাটির গন্ধটা তো সাফল্যের সৌরভের থেকেও বেশি কাছের! মুখোশের আড়ালে যে খচরামিটা চাপা পড়ে থাকে তাকে খুঁড়ে তুলে আনলে যে দারুণ আনন্দ হয়! ভালত্ব শুধু কনভেনশনের মোড়কে বাঁধা থাকে না! গল্প চাই গল্প! শুধু মুখে মুখে নয়! হৃদয় দিয়ে চাই গল্প! জীবনে চাই গল্প!”

তারপর আর কি। নটে গাছটি গল্পের গরু গপগপিয়ে খেয়ে চলে যায় আর গল্প নেমে আসে জীবনে। র‍্যাট রেসের বাংলা হয়ে যায় ঘোড়দৌড় আর রেসের স্টার্টে সকলের সঙ্গে শুরু না করে নায়ক হেলতে দুলতে হাঁটতে শুরু করে উলটো দিকে। যেখানে আকাশের রঙ সবুজ, ঘাসের রঙ নীল। হলুদ জলে লাল লাল মাছ চড়ে বেরায়। বেগুনী গোলাপ আর মিষ্টি গোলাপি রঙের ভায়োলেট ফুলের আলোর মালা ছড়িয়ে থাকে গাছে গাছে, আকাশে আকাশে আর হ্যালোজেনের পোস্টে।
আহা বড় ভাল লাগল দাদা ‘বই’টা! মানে মাথা দিয়ে ভাবলে প্রচুর গাফিলতি। কিন্তু স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখল তো! প্রিজনার অব জেন্দা টুকে রাজকুমারের দ্বৈত কাহিনীই বানাতে হয় নি আবার এন্টারটেইনমেন্টের নামে পচা কচুরি অ্যান্টাসিড দিয়ে গেলাতে হয় নি! স্মুদ টেকঅফ ফরম সিডনী, সিঙ্গাপুর অ্যাট সানরাইজ অ্যাণ্ড জিলেট জিলেট অ্যাণ্ড জিলেট। প্লেন থেকে নেমে এল সুচিত্রা সেন।

ভুলভাল বকছি? বেশ করছি! আমার ভাল লাগছে তাই বলছি! আপনিও ভুলভাল বকতে থাকুন না পাঠক বা পাঠিকা। আপনারও দারুণ ভাল লাগবে! মস্তি! বাঙাল ভাষা না জেনে বলুন। নিজের ভাষা তৈরী করুন। ছবি আঁকুন, অভিনয় করুন- রোলপ্লে, কচিকাঁচাদের সঙ্গে কাদা মাঠে সাদা শার্ট আর ব্ল্যাক টাই পরেই নেমে যান গোল খেতে- সুন্দরীরা আপনাকে স্নান করাবার জন্য তৈরী থাকুক আর না থাকুক। প্লাস্টিক আর গার্টার দিয়ে তৈরী বল পেটান কাঠের বাটাম দিয়ে- চোঁচ ফুটে গেলে দাঁত দিয়ে শুষে বার করে নিন। ঘাস ছিঁড়ে তার শাঁস চিবিয়ে নিন। প্যান্টে ফ্রকে সালোয়ার শাড়িতে জড়িয়ে নিন চোরকাঁটা। আর আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে দু চোখ ভরে শ্বাস নিন ফুসফুসে। তারপর বাড়ি আসুন! নিজের সামান্য জীবনেই একটু রঙ ছোঁয়ান, আলো জ্বালান। দিয়ালিতে হোলি আর হোলিতে দিওয়ালি। মানা কিসনে কিয়া হ্যায় ভাই? আর প্রয়োজনে হারিয়ে যান। আর অপ্রয়োজনেই নটা পাঁচটার ঘড়িটাকে আগে পরে করে দিন। তারপর দেখুন আউটপুটে আকাশ পাতাল পার্থক্য। ভবিষ্যৎ নয় বর্তমানেই বাঁচবেন। মনে আরাম মানে আপনিও নবাবী চালে! শাল্লা পৃথিবীটাই পালটে যাবে।

কিন্তু তা তো হবার নয়! তাই আর কি! নিজের ঘরেরটাই পরিবর্তন করি! সকলেই এরকম ভাবতেই পারে! আর নাও পারে! তবুও শুরু তো কোথাও না কোথাও করতেই হয়! তাই শেষ এখানেই করলাম! আমেন!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ আমার দুই সিনিয়র বসের কালকেই ট্যুরে যাবার কথা ছিল বলে বিকালে টিকিট কেটেছিলাম তামাশার। চারটে পঞ্চাশ। তা দেখলাম দুজনেই ট্যুর ক্যান্সেল করে বসে আছে! তার উপর চেরি অন দ্য টপের মত চারটেয় মিটিং। ভুজুং ভাজুং দিয়ে চাপ নিয়ে নিলাম পরের সপ্তাহের জন্য। তারপর পার্শ্ববর্তিনীকে তুলে দ্রুত চলে গেলাম হলে! উফ বাঁচা গেল, তখনও পাঁচ মিনিট বাকি! কিন্তু টিকিট খুলে দেখি সব্বনাশ! এ তো অন্য হল! তাও গুনগুনিয়ে গাইতে গাইতে গিয়ে যখন পৌঁছলাম সঠিক হলে তখন পাঁচটা বেজে গেছে। কিন্তু আমরা যাবার পরেই সিনেমা আরম্ভ হল। না হলে এসব হাবিজাবি লিখতাম কি ভাবে বলুন তো? পার্শ্ববর্তিনী কিছু বলেন নি। কিন্তু মুচকি হাসি দিয়েই যা বোঝাবার বুঝিয়ে দিলেন! শাল্লা জিন্দেগীকো তামাশা বনা কে রাখ দিয়া!
tamasha_640x480_51442924553

প্রওঃ পুঃ ১- আরে এক ব্যাঙ্কের ক্যাশ ভ্যান ড্রাইভার বাইশ কোটি টাকার ক্যাশ নিয়ে গায়েব হয়ে গেছিল। সবাই তার এখানকার বাড়ি দেশের বাড়ি আর হিল্লিদিল্লি খুঁজেও পেল না তাকে। পাওয়া গেল দেড় দিন পর, যেখান থেকে গায়েব হয়েছিল তার পাঁচ কিমি দূরে। মাত্র দশ হাজার টাকা ঝেড়ে দিয়ে ভদকা আর মুর্গির ঠ্যাঙ ওড়াচ্ছিল সে। দায় দায়িত্বকে ধুঁয়ায় উড়িয়ে। ধরা পড়তে বলল, ‘মাইনে ঠিক করে দিত না, গাধার খাটনি খাটাত! বেশ করেছি!’ অনুতপ্ত নয় সে। শাল্লা সচ মে জিন্দেগীকো তামাশা বনা কে রাখ দিয়া…

(১৪৯)

তারপর তো শ্রীরামচন্দ্র বহুত ধানাইপানাই-য়ের পর কোন রকমে চোদ্দটা বছর কাটিয়ে অযোধ্যায় ফিরলেন। সঙ্গে ওয়ান পিসে তেনার বউ আর হট হেডেড ভাইটি। ভাইটির অসহিষ্ণুতায় যে সমস্যা হয়েছিল তা দেবতাদের আনটাইমলি (পড়ুন অকালে বোধন) ঘুষটুস দিয়ে মেকআপ করে বউকে তুলে নিয়ে যাওয়া বুড়ো ভামটাকে কাটার জন্য তারই ছোটভাইকে রাজত্ব আর বৌদির লোভ দেখিয়ে তার মেজ ছেলেটাকে আনপ্রিপেয়ার্ড অবস্থায় মেরে আর বাকিদের সাবাড় করে পনেরো দিন পরে ফিরে এলেন ভরতের কাছ থেকে লিজ দেওয়া পাদুকা ফেরত নেবার জন্য। ভরতেরও হয়েছিল এক জ্বালা! কোকিলের বাচ্চার মতো দাদার পাদুকা ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে ক্ষমতাহীন দায়িত্ব পালন করে করে হেদিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। লক্ষণের বউটি ১৪ বছর ধরে ঘর বন্ধ অবস্থায় ছিল, সেও হই হই করে ছুটে এল দাদাভক্ত আমসত্ত্বটিকে ঘিরে উল্লাস করার জন্য। আর সীতা দেবী? তিনি তো জয়ের মালা বা মাল! হরধনু ভেঙে রাম দখল নিলেন, চুপকি দিয়ে রাবণ আর তাকে ডবল চুপকি দিয়ে রাম আবার ফিরিয়ে নিলেন। তার পরেও অবশ্য ক্যারমের ঘুঁটির মতো তিনি এস্পার ওস্পার করেছেন। কিন্তু সেসবের ইতিহাস অন্য।

দীপাবলি উদযাপনের সেই শুরু। অনার্য দ্রাবিড়দের উপর আর্যদের বিজয়গাথা। লক্ষ্মীর পূজার মাধ্যমে সমৃদ্ধির আনয়ন। সারা উত্তরভারতে এবং বিজয়ীর ইতিহাসের তলায় চাপা পড়ে যাওয়া দ্রাবিড় ভারতের আলোর উৎসব।

ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে দীপাবলির দিন দীপান্বিতা লক্ষ্মী পুজো হত। আমার বিশেষ কিছু কাজ ছিল না! বিকেল বিকেল কলার ডোঙা করে একটু গোবর তুলে আনা আর পরে প্যাঁকাটি দিয়ে কুলো বাজাতে বাজাতে অলক্ষ্মী বিদায়। তারপর পরিবার পরিজনেরা হাতে হাত মিলিয়ে লুচি ঘুগনি আলু ফুলকপি প্লাস্টিকের চাটনি আর মিষ্টি। তাই সাবড়ে পটকা ফাটিয়ে ফুলঝুরি জ্বালিয়ে কালীপূজোর উদযাপন। তার দুদিন পরেই ছিল ভাই ফোঁটা। তা নিজের বোন আন থাকলেও ভাই ফোঁটার অভাব হয় নি। মাসতুতো পাড়াতুতো মিলিয়ে জমজমাট কেস।

ছোটবেলায় পটকায় হাত পাকাবার আগে ক্যাপ ফাটানো আর সাপের ট্যাবলেটে ফুলঝুরি স্থাপন। রকেট টকেট আমাদের হাতের মধ্যে ছিল না। আর বুড়িমা তো লেজেন্ড- আমাদের বড় হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ। সে একবার পরের দিন সকালে বেড়াবাগান মাঠে চকলেট জ্বালিয়ে দূরে ছুঁড়ে দিলাম। আর ঠিক মাটিতে পড়ার মুহুর্তে ফেটে সে অদ্ভুত এক ধোঁয়ার রিং তৈরী হল। সিগারেট দিয়ে তো সবাই করে হে অর্বাচীন। বোমা দিয়ে করে দেখান দিকি? বলয়? মৃত্যু বলয়?

তারপর সত্যিই বড় হয়ে গেলাম আর দিল্লি চলে এলাম বছর চারেক আগে এক বন্ধুর বাড়িতে তিনটে বোমা একসঙ্গে বেঁধে ফাটাতে গিয়ে দেখে বাচ্চা ছুটে আসছে। উপায়ান্তর না দেখে হাতেই ফাটিয়ে চিত্তির কাণ্ড। নেহাত ঠাণ্ডা জল আর বার্ণল ছিল তাই প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিয়ে সামলে নিলাম।

তা সে সব তো ইতিহাস। শব্দবাজী নিয়ে আক্কেলটা গত দু তিন বছর ধরেই খুলেছে। আর এবারে তো সামনের বাড়ির ছোট মেয়েটি শব্দবাজীর বিরুদ্ধে ‘প্লেজ’-এ সই করিয়ে নিয়ে গেল।

জ্ঞানত অন্যথা করি কি করে? তাই ছেলেকেও বুঝিয়ে বাঝিয়ে চরকি তুবড়ি ফুলঝুরি আর রঙ মশালে ম্যানেজ করলাম। সেও দেখি সমস্যাটা বুঝল। যদিও ফাঁকে ফুঁকে কালিপটকা টটকা ইতিমধ্যেই ফাটানো হয়ে গেছে। তবুও একটা দিন যদি শব্দদূষণ কমে একজনের থেকেও। তাই আর কি।

যাই হোক সক্কালবেলায় পিলান ছিল জামা মসজিদের করিমে গিয়ে নাহারি সাঁটিয়ে আসব। কিন্তু মেয়েটার একটু শরীর বেগড়বাঁই করাতে সে প্রোগরাম ক্যানসেল। তাই একটু পরে বেরোলাম। স্টুডিওর ঘড়িতে তখন প্রায় দুই ছুঁই ছুঁই। কিন্তু রাখব কোথা গাড়ি? মেট্রোতে তো আর দিওয়ালি দিন চড়া যায় না। তাই অনেক ভেবেচিন্তে জামা মসজিদের ঠিক আগের গলি দিয়ে ঢুকিয়ে পতৌদি হাউসের পিছনে এক গলিতে সাইড করে রাখলাম। তারপর ছেলে আর পার্শ্ববর্তিনীকে নিয়ে শুরু হল জামা মসজিদের আশপাশের গলি গলি তস্য গলি অভিযান। মোটামুটি চেনা খাঁজ ধরে ঠিক চলে এলাম করিমে। কিন্তু তার আগে পুরনো দিল্লির ওয়াল্ড সিটির প্রাচীন চার্ম চোখে মনে গেঁথে নিলাম। এই এখানে রুটির কারখানা তো ওখানে বিস্কুট তৈরী হচ্ছে। সেখানে সব্জি নিয়ে বসেছে তো দূরেই তার দিয়ে ঝোলানো পায়রার খোপ। পার্শ্ববর্তিনী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে জানালো যে এই ছোট্ট সাম্রাজ্যে সকলের জন্যই জায়গা আছে।

ঘুরঘুরে একটুকরো সিঁড়ি উঠে গেছে উপরের জানলার খোপটায় যেখানে ওড়না টেনে সদ্য তরুণী চলাচলের খবর নিচ্ছে। ঠিক তার পাশ দিয়ে একটা বট গাছের শিকড় নেমে গেছে, মানুষের অনবধানতার সাক্ষী হয়ে। দোকান বাজার বিকিকিনি পেরিয়ে ঘরছাড়া নেড়িও একটা গদি পেয়ে গেছে নিশ্চিন্তের আশ্রয়ে। নর্দমার জলের আর ময়লার দুর্গন্ধ মানুষের নিত্য যুদ্ধের বেঁচে থাকার সাক্ষী।

সব ডিঙিয়ে মসজিদ জামা! তার পায় পায়ে, খেজুরের দোকান পেরিয়ে ‘বড়ের মাংস’ পেরিয়ে বিরিয়ানি পেরিয়ে খোবানি পেরিয়ে জ্যান্ত মাছের নড়াচড়া পেরিয়ে হাবসি হালুয়া পেরিয়ে ফিরনির গন্ধ নিয়ে ছোট্ট গলিতে করিম খুলে দিল জন্মতের খাজানা। এমনিতে দিল্লিতে বিরিয়ানি তেমন দড় কিছুই পাই নি। যা ছিল মটকা পীর সেও সময়ের প্রভাবে গেছে সামান্যের আওতায়। জামিয়ায় এক আছে ‘হামাদ’ সেও চলনসই। করিমে খেতে হলে নাহারি আর রাণ। ইয়াব্বড় পাঁঠার লেগপিস তারিয়ে তারিয়ে কাঠ কয়লার আগুনে চুবিয়ে স্বর্গীয় অনুভূতি। আর হল মাটন স্ট্যু। আহা প্রতিটি মসলার আলাদা স্বাদ জিভটাকে খেলার ময়দান বানিয়ে দিচ্ছে। আর পাশবালিশের মত খামিরি রুটি। খেয়ে দেয়ে খেজুর করে ফেরা।

করিমেই দেখা হয়ে গেল পরিচিত পরিবারের। তাদের ছবি তোলার মধ্যে দিয়েই আমাদের গোপন অভিসার জিন্দা হয়ে রইল। তবে এই ফিসফাসের ময়দানে নামা কিন্তু অন্য কারণে। একটা গলিতে প্রায় শ ফিট এগিয়ে গাড়ি লাগাবার জায়গা পেয়েছিলাম। সেখান থেকে বেরতে গিয়ে গলদ্ঘর্ম হয়ে গেল যদিও। কিন্তু বার করার পর পার্শ্ববর্তিনীর অবজারভেশনটা মনে রাখার মতঃ

এ যেন অন্য পৃথিবী। কেউ কাউকে গালাগাল দিচ্ছে না। সকলেই ধৈর্য ধরে পথ করে দিচ্ছে। সুবিধা মতো এগিয়ে দিচ্ছে একে অপরকে নিজেরটা পরোয়া না করেই। দিল্লির জ্যাম বিশ্ববিদিত। যে যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে বিনাযুদ্ধে কেউ নড়বে না। নড়লেই কোর্ট মার্শাল- ফায়ারিং স্কোয়াড।

 

কিন্তু যে জায়গাটাকে আমাদের সংস্কার ও সমাজ অবিশ্বাসের চোখে দেখতে শেখাচ্ছে, সেখান থেকেই মানবতার বেঁচে থাকা নজরে পড়ে যায়। চাঁদনি চকের এই গলিটা কিভাবে আজকের দিনে বেঁচে থাকব তা শিখিয়ে দিয়ে গেল যেন। অপরকে জায়গা দিলে তবেই নিজের জায়গা থাকবে। এই বিশ্বাস দিয়ে গেল যেন।

বিশ্বাস থাক বিশ্বাসের জায়গায়, কিন্তু সবার উপরে থাক মানুষের উপর বিশ্বাস। সহমমর্মিতা! আমেন।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ ওহ বলতে ভুলে যাচ্ছিলাম। চলার পথে এক তিন চাক্কার পিছনে দেখলাম, লেখা আছেঃ হ্যায় আগর বাজুও মে দম তো হিলা দে তাজমহল। নেহি হ্যায় তো মেরে সাথ দো দম লাগা- তাজমহল কো হিলতা হুয়া দেখ!

কোই সক? হাইঁ?

12227949_10153737677030763_1970378731_o