(১৪১)


না দাদা, আর চিন্তা নেই গাড়ি লাইনে ফিরে এসেছে… বিবেকের তাড়নায় একটু ক্ষেতে নেমে বিবেকের পিছনে ছোটাছুটি করল বটে, কিন্তু তা নিষ্ফল বুঝেই লাইনের ট্রেন লাইনে ফিরে এসেছে। সরকারি চাকরি করি চারপাশে কি হচ্ছে দেখে আর জেনে কি করব বলুন? তার থেকে না হয় ঘোড়ার ঠুলি পরে থাকি।

তেতো ভাবটা যাচ্ছে না বুঝলেন… যাই জীবন তো চলতেই থাকে! বরোদার গল্পটায় ফিরে আসি!

সর্বভারতীয় বাঙালী অ্যাসোসিয়েশন- সমগ্র ভারতের প্রবাসী বাঙালী সংস্থাগুলিকে এক ছাতার নীচে নিয়ে আসা, তাদের মধ্যে সমন্বয় গঠন করা এর উদ্দেশ্য। এর ফলে, বিভিন্ন প্রদেশের বাঙালী অন্য প্রদেশে চিকিৎসা, শিক্ষা বা চাকুরী স্বার্থে গেলে যেন রেডিমেড সহায়তা পায় সেটার জন্যই এই সর্বভারতীয় সংস্থা AIBA বা আইবা গঠিত হয়েছে গত ৩রা এপ্রিল, ২০১৫। তা তার গঠনতন্ত্রকে পঞ্জীকৃত করার জন্য এবং ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি আরও অধিক সংখ্যক স্থানীয় সংস্থাকে আইবার ছাতার তলায় নিয়ে আসতে দিল্লি ও গুরগাঁও থেকে জনা চারেক প্রতিনিধি রওনা দেব বরোদা, ৯ তারিখের সম্মেলন উপলক্ষ্যে। তা সেই কারণে টিকিট এসেছে হাতে। ব্যস্ততায় আর খুলে দেখা হয় নি। নিজে কাটলে তো টিকিট এখন মোবাইলেই থাকে। অভ্যাস মানুষের দাস!

নির্দিষ্ট দিনের আগেই কথা হল যে মেট্রো টেট্রো করে পৌঁছে যাব অফিস থেকে। গাড়ি অফিসেই থাকবে। চারটে পঞ্চাশের ট্রেন। সেই মত তিনটে পঁয়ত্রিশে বেরলাম মেট্রো করে। মানব সমুদ্রে দুলতে দুলতে ভাসতে ভাসতে নিউ দিল্লি রেল স্টেশনে যখন পৌঁছলাম তখন স্টুডিওর ঘড়িতে বাজে চারটে পাঁচ। হেলতে দুলতে, ওভারব্রিজের উপর উঠে এগিয়ে গেলাম ট্রেন খুঁজে নেবার জন্য। মুম্বই রাজধানী ৯ নং প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে।

কিন্তু হঠাৎ যেন মনে হল এ তো সে নয়!! মানে শেষ পাতে ৯২-র জায়গায় ৯৪ দেখেছিলাম না? টিকিটে? সঙ্গে সঙ্গে হাতড়ে টিকিট বেরলো হিপ পকেট থেকে। যেটা থেকে শুধুমাত্র পিএনআর নং দেখেছিলাম মন দিয়ে সিট নং জানার জন্য। তারপর?

তারপর আর কি বড় বড় চোখ দিয়ে ড্যাবা ড্যাবা করে দেখলাম ট্রেন মুম্বই রাজধানী নয়, অগস্ট ক্রান্তি রাজধানী এক্সপ্রেস! এবং তা ছাড়বে নয়া দিল্লি নয়, তার থেকে দশ কিমি দূরের নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে। মূহুর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে- ঘড়ি চারটে দশে! আজমেরি গেট নয়, পাহাড়গঞ্জ দিয়েই নামলাম। হাত বাড়ানো ট্যাক্সিওলাগুলোকে পেরিয়ে অটোকে ধরলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, পৌনে পাঁচ তক নিজামুদ্দিন পৌঁছা দোগে?

দোশো রুপিয়া! তাই সই! সে বলল, স্যার কোশিশ তো জরুর করেঙ্গে। আমিও ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়ে ভাবলাম, তাই সই!

ওয়ান ওয়েতে রেড লাইট থাকা কালীন যাত্রা শুরু করলাম। “ভাইয়া পৌনে পাঁচকা ট্রেন নিজামুদ্দিন পৌঁছনা হ্যায়” আই কার্ড ফ্ল্যাশ করতে করতে হাত তুলে থাকা ট্রাফিককে বললাম। সে বরাভয় হয়ে এগিয়ে দিল। আহা শুরুয়াতই সুভানাল্লা!

কুট্টি দা কল করেন নি, দেবাশিস দা ফোনালেন, “কোথায়?” ঘটনাটা ঠাণ্ডা মাথায় বলে বললাম যে যদি সাড়ে চারটের মধ্যে ইণ্ডিয়া গেট ঢুকে যাই তাহলে পৌঁছে যাব। না হলে আর কি! বৌ বাচ্চার সঙ্গে দিনগুলো কাটাব! আপনারা মার্কেট সামলে নেবেন!

চারটে পঁচিশ! কনট প্লেসের ভুলভুলাইয়াতে অটোটা একবার ডানদিক একবার বাঁদিক করছে। আর আমার মাথার ভিতরে অঙ্কের খেলা চলছে। ড্রাইভারকে বললাম সামহালকে চলো! হড়বড় মাত করো। পৌঁছ যায়েঙ্গে। পার্শ্ববর্তিনীর ফোন এল, “পৌঁছে গেছ নাকি?” তাকেও বরাভয় দিলাম। হলে হবে না হলে কি আর হবে! চারটে তিরিশ ইন্ডিয়া গেট! দেবাশিস দাকে বললাম, দেখুন দু মিনিটের এদিক ওদিক হতে পারে। দরকারে অন্য কামরায় গিয়ে চেন টেনে দেবেন। নিজের কামরার বড় হ্যাপা। পুলিশ আসতে আসতে পৌঁছে যাব না হয়।

চারটে পঁয়ত্রিশ, নিজামুদ্দিনের শেষ রেড লাইট পেরিয়ে বাঁ দিকে নিজামুদ্দিন ইষ্টে ঢুকলাম। আঃ শান্তি। ভাড়া মিটিয়ে লাফ দিয়ে ফ্লাইওভারে চড়ে দেখি চারটে তেত্রিশ। ধুস! সিকিউরিটিকে বললাম ভাই রাজধানী! সে বলল, “অগস্টক্রান্তি?” মাথা নাড়লাম! লাইন ছেড়ে দিল। নেমে গিয়ে ট্রেনে উঠতে দেখলাম সবাই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। গুরগাঁও থেকে শ্যামলদাও জ্যামে আটকে গেছিলেন আমার একটু আগেই পৌঁছে গেছেন আর কি। সব মিলিয়ে একদম জ্যামজমাট।

সাতজন যাচ্ছি, একসঙ্গে সিট নেই? আরে কুট্টি দা আছেন তো! ম্যানেজ করা হল। মথুরা থেকে দুজন উঠবেন তাদেরকেও অন্য দিকে ঠেলে দিতে হবে। সেটাও ম্যানেজ হল। তারপর আর কি ঘন্টা চারেকের প্রাণখুলে আড্ডা দিয়ে ঘুমোতে গেলাম যথা সময়ে। যথা সময়ে ট্রেন থামল ভাদোদরা স্টেশনে। ঘড়িতে তখন রাত চারটে কুড়ি। দিল্লির প্রদীপ গাঙ্গুলী ব্যাঙ্কের উচ্চপদে আছেন আর বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে চর্চিত চর্চন করেন। তিনি গত এক বছর যাবত বরোদায়। আর আছেন আইবার ভাইস চেয়ারম্যান অশোক গুপ্ত। সাড়ে চারটের সময় তাঁরা আপ্যায়ন করলেন আমাদের। ভারত সেবাশ্রমের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিসরে ঠাঁই হল।

ঘুমবো কি? আড্ডা তো থামতেই চায় না। সাড়ে সাতটায় চা চলে এল। আর সাড়ে নটায় জলখাবার! আর তার সঙ্গে চলতে থাকল আলোচনাও। বরোদার প্রতিনিধিরা যোগ দিলেন। সব আলোচনা টনা করে উঠে স্নান করতে যাব! এলেন নেতাজী! মাতৃভাষা প্রচার সমিতির পক্ষ থেকে। তারপর আর কি ৭৫ বছরের অভিজ্ঞ ব্যক্তি সবেতেই ফ্যাকড়া তোলেন। এটা কেন নয় এটা কেন? আবার প্রশ্ন করে বসলেন আপনারা কতটা ভারতবর্ষ দেখেছেন একটু জানতে চাইব! খেলে যা! বড় বড় শেরই কুপোকাত হবে তো আমি চুনোপুঁটি ১৬ বছর সরকারি চাকরি করছি তো কদ্দুর যাব? তাও বেশ গুছিয়ে দিলাম। তারপরে একে একে প্রশ্ন তুলতে শুরু করলেন তাঁকে থামান হল এই বলে যে কাল আলোচনা করব আমরা একটু ঘুরে আসি না হয়?

তা পর দিন আলোচনার আগে তো আলো দিতে হবে। প্রতিটি স্থানীয় সংস্থা কি করছে না করছে তার ফিরিস্তি। তা দিতে উঠেই তিনি আবার টেনে দিলেন, দিল্লি চলোর মতো আঙুল তুলে তুলে দাবী রাখলেন, বিবাহ সম্বন্ধ করা, বৃদ্ধাশ্রম খোলা, বাঙালীর পরিচয় নির্ধারণ করা এবং শেষ মেষ বরোদা থেকে কোলকাতা দুরন্ত ট্রেন চালু করা। বলতে উঠলাম, আইবা যে শুধুমাত্র সমন্বয় সাধন ক্ষেত্র এবং জাদুর পুঁটলি নয়, সেটুকু বলেই কায়দা করে চলে যেতে চাইলাম অন্য বক্তাদের কাছে।

ও বাবা মাইকই ছাড়েন না। পিছনের লোক জন চুল ছিঁড়ছে! শেষে একজন উঠে এসে ওনার সামনে বেশ হাত পা নাড়িয়ে বলেই দিলেন, আর একটাও প্রশ্ন নয়! ততক্ষণে রাষ্ট্রীয় চেয়ারম্যান নিজের বক্তব্য রাখতে উঠে গেছেন। আর আমিও মানে মানে সরে এলাম। বিরসবদনে উনি যাবার সময় বলে গেলেন, “আমি একটু আগুন দিয়ে সব ডিটেলসটা জেনে নিলাম। ভাল লাগল বেশ”। কি আর করি! প্রতি ভাল্লাগা জানিয়ে কালকের মতো ক্ষ্যামা দিলাম।

অবশ্য আলোচনার মাধ্যমে আইবার প্রথম শিকড় পশ্চিমাঞ্চলে গাড়া হল। ৩রা এপ্রিল যে চারা গাছটা ১৭টি রাজ্যের ৬৭টি জন প্রতিনিধির সামনে দিল্লিতে পোঁতা হয়েছিল তা ধীরে ধীরে নিজের পা শক্ত করছে! এই শ্লাঘা নিয়েই আজ সকালে ফিরে এলাম।

আর কিছুদিন পরে হয়তো অন্য কোথাও, আহমেদাবাদ থেকে ডাক এসেছে! ন্যাশনাল কনভেনশন চেন্নাইতে জানুয়ারি! বইমেলার চক্করে হয় তো যেতে পারব না। কিন্তু ভারতের কোণে কোণে অন্ততঃ কেউ পরিচিত হয়ে যাবে আর দেশটাও হাতের মুঠোয় চলে আসছে ভাবতেই ভাল লাগল। এক কোটি প্রবাসী বাঙালী বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে শুধুমাত্র কোলকাতার মুখাপেক্ষী থাকবে না! কি দারুণ ব্যাপার হবে বলুন তো? সাফল্য কামনাতেই শুধু হয় না। এগিয়েও আসতে হবে! দায় বা দায়িত্ব আমাদেরই তো! বলুন?

(১৪০)

(আমরা কেউ ধর্মে বিশ্বাস করি, কেউ হয়ত ধর্মকে পরিত্যাগ করিনি কিন্তু ধর্ম নিয়ে মাথাও ঘামাই না, কেউ কট্টর নাস্তিক আবার কেউ বা ধর্মনিরপেক্ষ – কিন্তু একটা জায়গায় আমাদের গভীর মিল আছে, আমরা সবাই বাকস্বাধীনতায় প্রবল ভাবে বিশ্বাসী। আর সেই জন্যই রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাস, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়রা যে কথাগুলো বলতে চেয়ে প্রাণ হারালেন সে কথাগুলো যাতে হারিয়ে না যায় তার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাব, ওনাদের সঙ্গে আমাদের মতাদর্শের মিল আছে কি নেই সেটা এই মুহূর্তে অবান্তর প্রশ্ন। কথাগুলো পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়েই সা্রা বিশ্ব জুড়ে একাধিক ব্লগার কীবোর্ড নিয়ে বসেছেন, সেই লেখাগুলো সঙ্কলিত করে দেওয়া হল পাঠকদের জন্য – তালিকাটি দেখা যাবে এই ব্লগপোস্টের শেষে।)

বরোদা থেকে ফিরে এলাম আজ, এই একটু আগে। যাবার আগেই খবরটা পেয়ে যাই যে রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর, অনন্ত পেরিয়ে এবার নীলাদ্রি… হয়তো অনেকের অনেক মতের সঙ্গেই আমার মত মেলে না। তা বলে সরিয়ে দেবার রাজনীতিকেই বা কি ভাবে মেনে নিই বলুন তো? কেন এই যে এইভাবে! এই একটা ব্লগ লিখে দায়িত্ব সেরে ফেলে আমরা আবার বরোদার গল্পে ফিরে যাব। হেসে কেঁদে খুন হব আবার দৈনন্দিন জাবর কাটতে কাটতে পারিজাতে বিভোর হব। আর খুন হতে থাকবে একে একে আমাদের পাশের দেশটা। আমাদের ভাষায় যারা কথা বলে- অন্যভাবে বলে, তারা। নিজের মতো করে আমি পাশের বাড়ির সমস্যা বলে সরিয়ে রাখতেই পারি। কিন্তু তাতে কি শীত লাগাটা একটু কমবে?

আসলে এই ধর্ম, নিধর্ম আর খুনিধর্ম ব্যাপারগুলো বেশ জটিল। মস্তিষ্কের গলিয়াড়িতে যখন ট্র্যাফিক জ্যাম হয়, তখন চিন্তা অচিন্তাগুলোকে সরিয়ে রাখতে হয়। আর যারা সেই সব অচিন্তা পয়দা করে তাদের? হ্যাঁ তাদেরকেও পৃথিবী থেকে সরিয়ে রাখতে হয়। হয়, হয় হয়! জানতি পার না।

তবে জটিল ব্যাপারগুলো একটু বরং ঘেঁটে দেখি। ওসব বরোদা টরোদা পরে লিখি। মার্চেন্ট অব ভেনিসে শেক্ষপীর একখান কথা রেখে গেছেনঃ I fear you speak upon the rack, Where men enforced do speak anything. (র্যা ক হল মধ্যযুগীয় অত্যাচারের একটি যন্ত্র।) আর এই কথাটার বিপরীত কথা হলঃ If he is not speaking in the night, get his wife to do the talking in morning.
কি মনে হচ্ছে পাঠক পাঠিকা? মধ্যযুগে পড়ে নেই আমরা না? আসলে আমাদের মাথার উপরের আকাশটা থেকে অন্ধকার পর্দাটা সরে গেলেও মনের দরজার পর্দাটা এখনো ময়লা। বহুদিনের অযত্নে কালো কালো ময়লার ছোপ জমে রয়েছে। পুতিগন্ধ ঢাকার জন্য আমরা অগুরুর সাহায্য নিই কিন্তু এখানে গুরু অগুরুই হয়তো ভুল পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

নাকি জটিলতাটা অন্যত্র? আসলে একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে কোথাও। আর ফাঁকটা ভরাট করাও যাচ্ছে না আর বেড়েই চলেছে। সংস্কৃতিগত ফাঁক, ব্যবহারিক ফাঁক, বোঝার ফাঁক। এ যেন দুটো আলাদা আলাদা ট্রেন লাইন সমান্তরাল যেতে যেতে সিদ্ধান্ত নিল ট্রেন দু নৌকায় পা দিয়ে চলবে না! তাই যে কোন একটাকে বেছে নিতে হবে।

আর তাই ৯/১১, ৭/৭, ২৬/১১, নাইজিরিয়া, ইরাক, সিরিয়া, বামিয়ান, মেসোপটেমিয়া, তালিবান আইসিস হয়েই চলেছে। বড়দা তো নিজের হিসেব মতো কাঁটা বেছে খাচ্ছেন ফেলে ছড়িয়ে। আর জান মাল নিয়ে সাধারণ মানুষ রোজ রোজ বলি হয়ে চলেছেন ট্রেনের সামনে পড়ে।

ব্লগার হত্যা এবং অন্যান্য ধর্মীয় গোঁড়ামিগত সমস্যাকে কি এর থেকে আলাদা করে দেখব? ধর্ম জীবনকে ধারণ করে রাখে। কিন্তু ধর্ম জীবনকে ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে পিষে মেরে ফেললে তো আধার বদলাবার সময় হয়েছে বলেই মনে হয়?

বাটি ঘটি গ্লাস কুঁজো কড়াই ডেকচি পুরনো হয়ে ফুটো হয়ে গেলেও কি পুরাতাত্ত্বিক মূল্যের জন্য স্মৃতি আগলে পড়ে থাকি নাকি তাকে প্রথমে সারাবার চেষ্টা করি আর সব কিছুর বাইরে চলে গেলে তাকে ফেলে দিয়ে নতুন আধার নিয়ে আসি? নতুন আধার কিন্তু পুরনোরই রূপরেখায় হয়। মাল মশলা খালি বদলে যায়।

দুঃখ হয় জানেন! রাগ হতাশা ক্ষোভ বিদ্বেষ ভেতরে গুমরে গুমরে ওঠে। আর কি বোর্ড বেয়ে নেমে আসে তরল ক্রিস্টাল পর্দায়। আর তারপর আবার আরশোলার জিন্দেগি নিয়ে পরমাণু বিস্ফোরণ পেরিয়েও ঘুরে বেরাতে থাকে পর্দার আনাচে কানাচে।

আর ভাল লাগছে না! কেন যেন মন হচ্ছে এই প্রতিবাদ প্রতিবাদ খেলাটা খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। ছাতা কিচ্ছু হচ্ছে না বলে প্রতিবাদ করতেই যেন ভুলে যাব। তার থেকে পরের পোস্টে মন দিই। বরোদায় কি হল টল। দেশের উন্নতি বাঙালির উন্নতি এই সব নিয়েই মেতে থাকি। ক্ষুদ্র জীবন, নরকের কীটের মতো ঘুরে ঘুরে মৃত গলা সমাজটা থেকে পাথেয় খুঁজে নিই আর একদিন টপ করে খসে যাই! কার যে তাতে আরাম হবে কে জানে! হ্যাহ!

পরের পর্বটা লিখব নিয়মিত ফিসফাসের মন নিয়ে। তার আগে বরং আমার থেকে বেশী ভাল করে আমাদের কষ্টটা প্রকাশ করতে পেরেছে যে সব সহ ব্লগার, তাদের লেখা পড়ুন। আমি একটু চোখে মুখে জল দিয়ে আসি!! ছ্যাঃ

ও হ্যাঁ গিয়েও ফিরে এলামঃ বরোদার অল ইণ্ডিয়া বেঙ্গলী অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সমিতির প্রশ্নোত্তর সেশন হচ্ছে। একটা প্রশ্ন এল, “বাঙালী কারা? যে সংখ্যালঘু মুসলমান বাংলা ভাষায় কথা বলে তাদেরকেও কি আমরা বাঙালী বলব?” সত্যি বলছি বিশ্বাস করুন! উত্তর দেবার ইচ্ছা ছিল না! কিন্তু সভ্য সমাজে বাস করি মধ্যবিত্ত মানসিকতা নিয়ে তো! তাই চশমাটা খুলে প্রশ্নকর্তার চোখে চোখ রেখে ঠাণ্ডা গলায় শুধুমাত্র একটা শব্দ “হ্যাঁ” বলা ছাড়া কিছু করতে পারি নি! মানব জনম আমার!!! বেঁচে থাক বাওয়া!

ব্লগগুলির লিঙ্কঃ
অভিষেক মুখার্জী- আইডিয়া
Kausik Datta – Plight of secular bloggers in Bangladesh
তন্ময় মুখার্জ্জী – ধর্ম, ব্লগ আর একঘেয়ে খুন-টুন
তপোব্রত ব্যানার্জ্জী – আহত কলম
প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় — ঊনচল্লিশের এক এবং অন্যান্য
রোহণ কুদ্দুস- আমার মহানবী
ইন্দ্রনীল বক্সী- অধর্ম

প্রয়োজনীয় পুনশ্চঃ দয়া করে লাইক মারবেন না! শেয়ার করতে পারেন যদি মনে করেন। তবে লাইক মারবেন না প্লিজ!

(১৩৯)


ধরা যাক রাত সাড়ে নটার সময় একটি চারলেনের রাস্তায় আপনি একা একা হাঁটছেন। আপনার একশো হাতের মধ্যে কোন জনমনিষ্যি দেখতে পাচ্ছেন না। গ্যাসলাইটের আলো মাঝে মাঝেই ব্রেক দিচ্ছে অন্ধকারকে জায়গা করে দিতে। পাশের জানকী দেবী কলেজের গেট পেরিয়ে জঙ্গলের মতো মাঠ উঁকি দিচ্ছে। রাস্তাটা একটু গিয়ে বাঁক নিয়েছে সেখানে হয়তো বেশ কিছু লোক রয়েছে। ডানদিকের রাস্তার ওপারের বাড়িগুলোর জানলাগুলো সবই এসি মেশিনের খাঁচা দিয়ে ঢাকা।

এমন সময় একটা পাঠান টাইপের দেখতে গুঁফো মস্তান মতো লোক কাঁধে ঝোলা ফেলে পাশের গলি থেকে ঠিক আপনার পিছনের দশ পা দূরে আপনার সঙ্গী হল। এমনিতে আপনার গায়ে যে খুব একটা কম জোর তাও নয়। তবুও পরিবেশ আর আবহাওয়া শক্তির প্রায় তিরিশ শতাংশ শুষে নিয়েছে। শহরের রাস্তা, চিৎকার করলেও একটা ঝিঁঝিঁ পোকাও আপনাকে দেখতে আসবে না। সাহায্য করা তো দূরের কথা।

আপনি গতি বাড়ালেন, সেও বাড়ালো। দশ পা ক্রমে ক্রমে নয় আট সাত করে চারে! আপনি আরও জোরে হাঁটলেন। চার বেড়ে ছয় হল কিন্তু আবার কমে দুই। মোড়টা দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের আউট গেট- গেট কিপার- দুটো টোটো রিক্সা- একটা চায়ের দোকান- আরও কিছু লোকজন! আপনি পড়ি কি মরি করে দৌড় লাগালেন! লোকটা হাঁটছে, কিন্তু বড় বড় পায়ে যেন আপনার ঘাড়ের কাছে উঠে আসছে। নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন আপনি। গরম গরম নিঃশ্বাস আপনার ঘাড়ে পড়ে ঠাণ্ডা বরফ ছাপ হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের গেটের দিকে আপনি ঘুরে গেলেন লোকটাও ঘুরল। সামনেই সিকিউরিটি রুম, কিন্তু লোকটা যেন সব কিছু অগ্রাহ্য করেছে আজ। আপনার দমে টান পড়ছে। সিকিউরিটি রুমটা পেরিয়েই ক্যান্টিন। চোখ বুজে ছুটে ঢুকে পড়লেন আলো মিলিয়ে। কি আশ্চর্য লোকটাও ঢুকে পড়েছে। ভয় ডর বলে কিছু নেই না কি?

জল একটু জল চাই! দৌড়ে গিয়ে ওয়াটার কুলারটার উপরে রাখা প্লাস্টিকের জলের গ্লাসটা নিয়ে কল খুলে দিলেন আর তার তিন সেকেণ্ড পরেই গ্লাসের সমস্ত ঠাণ্ডাটা গলা বেয়ে শিরদাঁড়া চুঁইয়ে নামতে লাগল। আর আপনি পরম বিস্ময়ে দেখলেন, লোকটা আপনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ক্যান্টিনের কাউন্টার থেকে দু কাপ চা নিয়ে হাসপাতালের মেন বিল্ডিং-এর দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। যাক বাবা খুব জোর বাঁচা গেছে!

এদিকে লোকটা বিল্ডিং-এর চার তলায় নির্দিষ্ট ঘরে গিয়ে পূর্বপরিচিত দুজনের হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে ফিচ ফিচ করে হাসতে হাসতে ঘটনাটা বলতে লাগল। অবশ্য আপনি সেটা শুনতে বা দেখতে পেলেন না। কিন্তু মনে মনে ভাবলেন খুব বাঁচান বেঁচেছেন আজ! অবশ্য আপনি এটাও বুঝতে পারলেন না পরের দিন দুপুরে লোকটা ফিসফাস বলে একটা ব্লগে আপনার ভয় পেয়ে গলা শুকিয়ে যাবার ঘটনাটা রসিয়ে রসিয়ে লিখেও দিল। যান খুব কমের উপর দিয়ে গেছে যখন তখন আপনাকে আর ঘাঁটাব না। বরং আসুন লোকটা কি বলছে দেখি।

কি আর বলব মশাই! রাত বিরেতে জনমনিষ্যিহীন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ যদি খেয়াল করেন যে আপনার ঠিক আগের লোকটা আপনার সঙ্গে রেস লাগাচ্ছে, তাহলে খাবার হজম করার ফিকিরে আপনিও কি তাল মেলাবেন না? মেল ইগো বলে কথা! আমেন!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এমনিতে মাঝেসাঝেই বিখ্যাত ব্যক্তিদের সফর সঙ্গী হবার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তা আর এমন কি? তবে কদিনের আগে লণ্ডন যেতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আমার সফর সঙ্গী হলেন। মানে আমি লণ্ডন যাচ্ছিলাম না, দিল্লি যাচ্ছিলাম। (প্রয়োজন ছিল না বলার! কিন্তু প্রঃ পুঃ বলে কথা!!) তা তিনি দেখলাম লাইন দিয়ে চেক ইন করলেন, এবং ইকোনমি ক্লাসে ঢুকে সকলকে নমস্কার জানিয়ে বলবার চেষ্টা করলেন, “আমরা সকলে তাহলে দিল্লি যাচ্ছি!” টাইপের কিছু একটা। কিন্তু ব্যাপারটা এতই অবভিয়স যে কেউ আর বিশেষ সাড়া দিল না। তিনিও নিজের সিটে গিয়ে বসে পড়লেন। সোশাল মিডিয়া খুললেই যেখানে ভদ্রমহিলার খিল্লি ও মেমেতে ভরপুর, সেখানে এই ধরণের ব্যবহার (যদি অভিনয় হয় তাও হোক না!) বেশ চমক জাগানো। আমি যে ভদ্রমহিলার বিশাল বড় পাখা সেটা আমার বৃহত্তম শত্রুও বলবে না। খারাপটাকে খারাপ যখন দিল খুলে বলি, ভাল জিনিসকে ভাল বলতেই হয়। দিল্লির ভিআইপি কালচারে গত ষোল বছর ধরে দিন গুজরান করেই বলছি, এটা সত্যিই বিরল। এক মনোহর পারিক্কর ছাড়া কাউকেই বিশেষ দেখি টেখি নি! ভুল হলে শুধরে দেবেন পাঠক পাঠিকারা।

প্রঃ পুঃ ২- গত কয়েকদিনের কয়েকটি মৃত্যু এবং ততসম্বন্ধীয় ঘটনায় মনে হয়েছে সমালোচনা করার অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব বলেও একটা ব্যাপার আমাদের ঘাড়ে অদৃশ্যভাবে চেপে বসে। যত তাড়াতাড়ি আমরা সেটাকে পাকড়াও করতে পারি ততই মঙ্গল। দেশের, দশের কিম্বা একের!

(১৩৮)

মোমিন কামড়েছে!!

অ্যাঁহ? ফিসফাসের শুরুতেই এরকম ভয়ঙ্কর হেডলাইন বা পাঞ্চলাইন? পাঠক পাঠিকা কেন লেখককেই নড়ে চড়ে বসতে হয়!

সেই ছোটবেলায় আমি যখন খুব ছোট ছিলাম না। বাজুও মে দম আসতে শুরু করেছে। সেই সময় খেলা নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে মারামারি হয়ে যায়। তা সে ছিল পাঁচ ফুট আর আমি বর্তমান পাঁচ এগারোতে ততক্ষণে ল্যাণ্ড করে গেছি। তাই সে অমিতশক্তিধর হলেও শুধুমাত্র ‘রিচ’-এর ফায়দা নিয়ে তাকে বগলদাবা করতে দেরী হয় নি। তা সে বগলদাবা বলে বগলদাবা? একেবারে বালির বগলে রাবণের ছটপটানি অবস্থা। অবিশ্রান্ত বুকে পিঠে ঘুষি খেয়েও সে আলগা হয় নি। তবে কিনা কচ্ছপের কামড় ছাড়ে বিদ্যুৎ গর্জনে। আমার ক্ষেত্রে উল্টো ঘটল। সে বন্ধুই হঠাৎ ক্ষেপে মেপে (অথবা না মেপে) “সৌরানশু” বলে খ্যাঁক করে আমার থুতনিতে দিল কামড়ে। মানে সেটাই ছিল আয়ত্ত্বের মধ্যে। ফলে হল হিতে বিপরীত। মারপিট রাগ দুঃখ ভুলে আমি খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে শুরু করলাম। আর সে বন্ধুও গেল আরও চটে। যাই হোক ততক্ষণে বাকিরা এসে যাওয়ায় সে মারপিট বেশি দূর গড়ায় নি।

তারপর বেশ কয়েকবার কুকুর, বিড়াল এমন কি সাপের কামড় থেকে স্রেফ রিফ্লেক্সের জোরে বেঁচে গিয়েও শেষ রক্ষা হল না। কাল মোমিন কামড়ে দিল!

হ্যাঁ পাঠক পাঠিকারা! ঠিকই শুনেছেন! মোমিন কামড়েছে!

তাহলে খোলসা করেই বলি! কি বলেন? আমার অত্যন্ত আপনজন মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে দিল্লির গঙ্গারাম হাসপাতালে ভর্তি আছেন। সেই সুকুমার গঙ্গারাম শুধু মাত্র পিলের জ্বর আর পাণ্ডু রোগে ভুগত। কিন্তু এই গঙ্গারাম হাসপাতাল হিসাবে এক ঘর এবং বেসরকারি হাসপাতাল হবার পরেও তার বাণিজ্যিক বদগুণ কিছুটা হলেও কম। গত সতেরো দিনে আমরা পরিবারের সবাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পাহারাদারের ভূমিকা নিচ্ছি। উনি সুস্থ হচ্ছেন ধীরে ধীরে। তাই এখন আইসিইউ-এর পরিবর্তে এইচডিইউ বা হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে রয়েছেন। যেখানে ২৪ ঘন্টা একজন অ্যাটেন্ডেন্ট থাকা বাধ্যতামূলক।

কাল ছিল আমার পালা। শুনছিলাম গত দু-তিন দিন ধরেই এবং তাকে সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে থাকতে দেখে সন্দেহই হচ্ছিল। রাত্রিবেলায় সমস্ত ক্রিয়াকর্ম সাধন করে তারপর পাশের গদিটায় গুছিয়ে নিজেকে লম্বা করেছি। আমাদের পাশের বেডটিতে যে ভদ্রমহিলা আছেন, তিনি মস্তিষ্কে শর্করার পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে ঘুম ছাড়া সর্বক্ষণ একঘেয়ে “অ্যাহ অ্যাহ” করে যান, তিনিও ঘুমিয়েছেন।

হঠাৎ গভীর রাত্রে গেল ঘুম ভেঙে। ঘড়ি দেখলাম তিনটে বাজে। আর সামনের বাবাজী, যার নাম নথিভুক্ত আছে ‘মোমিন’ তিনি উঠে পড়েছেন। তাঁর একটি বিশাল নিইরোলজিকাল অস্ত্রোপচার হয়েছে। ফলে উৎকট উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। তাঁর খালি মনে হচ্ছে যে তিনি সুস্থ এবং রাত্রে তলপেটে বেগ এলে তাকে করতে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ক্যাথেটার ফ্যাথেটার মারও গোলি! পায়ে লাগানো গ্লুকোজ এবং অন্যান্য ওষুধের ড্রিপ ছিঁড়ে ফ্যাল। ‘মুঝে পিসাব করনা হ্যায়’। তিনজন নার্স এবং মোমিনের দুইজন বেঁটেখাটো কিন্তু শক্ত সমর্থ অ্যাটেন্ড্যান্ট নাঝেহাল। গালাগাল আর হাত পা চালানোর তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এইসব ক্ষেত্রে আমার ভিতরের বনের মোষ তাড়ানো রাখালটা ঝাঁপিয়ে পড়ে পরোপকারে। এই অবলা নারীপুরুষদের কে বাঁচাবে? আমি ছাড়া?
ময়দানে নামলাম। প্রথমে নরমে হল না গরমেও না। আমাকেও চার অক্ষর থেকে শুরু করে ছয় অক্ষরে ভাসিয়ে দিল। “মুঝে পিসাব করনা হ্যায়”! ওদিকে ডিউটিতে থাকা কোন ডাক্তারকেও তক্ষনি পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে নার্সরাই সিডেটিভ ইনজেকশন নিয়ে প্রস্তুত হল। কিন্তু লাগায় কার সাধ্য। শেষে আমিঃ তার উর্ধ্ববাহুর অংশ দুটো চেপ্পে ধরলাম। আর এক নার্স তাকে ঘোরাবার চেষ্টা করতে লাগল। তার দুই অ্যাটেন্ড্যান্ট তার দুপা চেপে ধরল। সে কিছু করতে না পেরে, ডেকে উঠল, ‘ডি কে বোস, হাত ছোড় মেরে, পিসাব করনা হ্যায়!’ ডেকেই ঘ্যাঁক করে দিল কামড়ে আমার ডান হাতের অনামিকার গাঁটে। রক্তপাতের মাঝেও আমি মাথা ঠাণ্ডা রেখে বললাম “ইসকা ক্যাথেটার নিকাল দো” দুই মালায়লি নার্স ভাসা ভাসা হিন্দিতে, “আউই নিকাউল রয়ে অ্যায়” বলে প্যাঁট করে পিছনে দিল ইনজেকশন ফুটিয়ে। “লাগ গয়া, লাগ গয়া!” বলতে বলতে এদিক ওদিক করতে করতে তারপর শুয়ে পড়ল। আর আমি বেটাডিন লাগিয়ে ছুটলাম এমার্জেন্সিতে।

সেখানে আর এক ঘটনা! গিয়ে বললাম, টেটভ্যাক নেব! জিজ্ঞাসা করল, কেন? আমি বললাম, মোমিন কামড়েছে! এমার্জেন্সির উপস্থিত ডাক্তারটা চমকে আমার মুখের দিকে তাকাল। তারপর বিপজ্জনকভাবে আমার মুখের সামনে এসে জিজ্ঞাসা করল, “ফিরসে বোলিয়ে কেয়া হুয়া?” আমি তখন বললাম, “এক নিউরো পেসেন্টনে কাট দিয়া!” ততক্ষণে সে মুখের কাছে শুঁকে টুকে বুঝে গেছে আমি গোপাল বা তমাল নই! তা এক স্টুয়ার্ডকে বলল টিটেনাস দিয়ে দিতে। তারপর বলল, “নিউরো ডিপার্ট্মেন্টমে পেসেন্টকে যাদা পাস মত যাইয়ে”।

আমিও মাথা নেড়ে ফিরে এলাম। এসে দেখি মোমিনের তেজ কমে এসেছে। সে মাঝে মাঝে উঠে বসছে “মুঝে পিসাব করনা হ্যায়” বলে। তারপর আবার শুয়ে পড়ছে। কিন্তু এদিকের বেডের ভদ্রমহিলা উঠে পড়ে, এক ঘেয়ে সুরে “অ্যাহ অ্যাহ” গান গাইতে লেগেছেন। ওদিকের এক ভদ্রলোক অসহ্য যন্ত্রণায় “আম্মা! উঠালে! উঠালে!” করে ডাকতে লেগেছেন। এর মধ্যেই কোনের দিকের এক ভদ্রলোকের আবার ইয়ে হয়ে গেল। তিনি হাঁক ডাক করতে লাগলেন পরিষ্কার করে দেবার জন্য। যাই হোক এরকম করতে করতে সকাল হয়ে গেল। আর সূর্যের ডাক শুনে আমরাও উঠে পড়লাম। ডাক্তার রাউণ্ডে এলেন, তাঁকে বলতে গেলে তিনিই খ্যাঁক করে উঠলেন, “হোয়াই ডিড ইউ গো দেয়ার? হি ইজ অ্যা নিউরো পেসেন্ট অ্যান্ড ডেঞ্জারাস!” যাই হোক তাকেও বোঝানো গেল। নার্সিং ইন চার্জকেও বললাম যে রাতে এই বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলোর সাথে একটা শক্ত সমর্থ অ্যাটেন্ড্যান্ট বয়ের থাকা প্রয়োজন। সেই নার্সগুলোও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আগ বাড়িয়ে বেশি বেশি কাজ করে দিত লাগল।
এই আর কি! চলে আসার সময় দেখি মোমিনকে আজ ডিসচার্জ করে দেওয়া হবে। কারণ বেচারি সব্জিওলার কাছে কতই বা টাকা থাকবে এবং এখন তার শুধু ওষুধ চলবে তা কোন সস্তা হাসপাতালেও চলতে পারে। ততক্ষণে অবশ্য মেট্রন টাইপের নার্সরা এসে গেছেন এবং মোমিনকে ধমকে ধামকে ব্ল্যাক টি খাইয়ে দিচ্ছেন।

দিন শুরু করার আগে পার্শ্ববর্তিনীকে ফোন করে জানলাম, “মোমিন কামড়েছে!” তিনি না বুঝতে পেরে বললেন, একটা গুড নাইট রাখা উচিত ছিল! আমেন… ইয়ে… মোমিন কামড়েছে।

ফিসফাস ২-এর ওয়েবসাইট ও বিজ্ঞাপন

সৃষ্টিসুখের ওয়েবসাইটে ফিসফাস-২
Fullscreen capture 13-07-2015 131050.bmp

(১৩৭)


শেক্ষপীর বলে গেছেন, “বাবুমশায়, ইয়ে দুনিয়া এক রঙ্গমঞ্চ হ্যায়, অউর হাম সব কাঠপুতলিয়া…” উল্লাস করুন পাঠক/ পাঠিকারা, আপনাদের ফিসফাস লেখক তাঁর জীবনে প্রথমবার জীবনদায়ীর ভূমিকায় অভিনয় করল। অবশ্য কারুরই জীবন সে দান করে নি বা ফিরিয়ে আনে নি। তবু অভিনয় তো! কেউ যে মুখ ফুটে তাকে
“ডাক্তার সাব” বলে ডেকেছে, তাই বা কম কি?

অতিরিক্ত ভ্যানত্যারা না মেরে সোজাসুজি কথায় আসি। হয়েছে কি গতকাল বিকেলের দিকে ফিসফাস লেখক পার্শ্ববর্তিনীর সঙ্গে দিল্লির গঙ্গারাম হাসপাতালের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। তালকাটোরা স্টেডিয়াম পেরিয়ে সবে সে শঙ্কর রোডে ঢুকবে, তখন দেখল, সার বেঁধে পুলুশ টুলুশ দাঁড়িয়ে আছে আর জেব্রা ক্রশিং-এ কিছু লোক জবরদস্তি রাস্তা পার হবার চেষ্টা করছে।

রাস্তা তুমি কার?
যার যত বেশী চাকা আমি তার!!

পদযাত্রীদের তো ভাগ্যের চাকা- তাও যে ঘোরেও না। মাঝে সাঝে ইচ্ছে হলে দু পা এগিয়েও এক পা পিছিয়ে আসে। তাই পথ পেরোতে চারচাকা যে অগ্রাধিকার পাবে সে কথা আর বলতে নয়। তবে দিল্লি পুলুশ মাঝে মধ্যেই বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে কিন্তু চালান না কাটলে খরচ বাড়ে। তাই সপ্তাহান্তের ব্যবহারিক প্রক্রিয়া।

আমাদের অবশ্য চিন্তা নেই, দ্বিপ্রাহরিক ভাতঘুমের পর গাড়ি চালাচ্ছি, বেল্ট পরিহিত, বীমার কাগজ এখনো তার গুরুত্ব হারায় নি। অতএব আমার আবার চিন্তা কি? বিশ্বের সকল পুলুশই আমার মাতুলক্রমঃ।
তা সেই মাতুলতুতো ভালবাসা মাঝে মধ্যেই প্রবল হয়ে ওঠে, জানেনই তো। এখানেও আমায় ডাকল ধারে। একেবারে কর্ডলেস মাইকে করে। তাপ্পর বলে কি না, একশো টাকা বার কর, চালান কাটা হবে। কেন? জেব্রা ক্রসিং-এ পদযাত্রীর অগ্রাধিকার, সে কান চুলকোতে চুলকোতে, ব্যাঁও সহ ঢেকুর তুলতে তুলতে চু কিত কিত খেলতে খেলতে পথ পেরবে জেব্রা ক্রসিং বেয়ে। আর আপনি চল্লিশ-ষাট-আশি ছুঁয়ে ঝট করে গাড়িকে শূন্যে নামিয়ে নিয়ে চলে আসবেন তাঁর অনুগ্রহের ভরসায়।

অন্ততঃ সেইটাই আমায় বলা হল, সেই আগে বলেছিলাম পুলুশ শুনলেই কান মাথা ভোঁ ভোঁ করে মাথার চারদিকে আলো হয়ে যায় আর দিব্যদৃষ্টি আসে। এখানেও তাই হল! কি হল কে জানে, হেঁটে গিয়ে দেখতে গেলাম জেব্রা ক্রসিং পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে কি না, নেগেটিভ। ব্লিঙ্কার রেড লাইট আছে কি না, নেগেটিভ। পুলুশের কোটা পূর্ণ করার তাড়া আছে কি না, এইটায় কেমন যেন সন্দেহ বদ্ধমূল হল। ব্যাস আর যাবি কোথায়, হেড কনস্টেবলকে বেশ চড়া গলায় বললাম, “আপলোগ ইয়ে সাজিশ রচ কে ফাঁসা রহে হো, লাইন্সেন্স লে লো! ফাইন ম্যায় দুঙ্গা নহি! কনটেস্ট করনা হ্যায়!”

হেডকনস্টেবল রামপাল গেল ক্ষেপে, বলে, “দিজিয়ে লাইসেন্স!” কেলো, এক ঝটকায় ম্যায় কাহাঁ হুঁ!! কিন্তু এই সময় চট করে হার মানলে তো প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন! হঠাত দেখলাম আরেক পুলুশ আমার দিকে এগিয়ে আসছে এই বলতে বলতে, “আপ চিল্লা কে কিঁউ বাত কর রহে হো?” সত্যিই তো! কিন্তু আমি তো রজনীকান্ত নই, বন্দুকের গুলি একবার বেরিয়ে গেলে তাকে হাজার চেষ্টাতেও ফেরানো যায় না। টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলেছেন, কিন্তু বল গেছে দু টুকরো হয়ে, কোন টুকরোটা ধরলে আউট হবে? হবে না দাদা এটা ডেড বল। হঠাৎ দেখলাম, একটু আশার আলো, নতুন যে পুলুশ আমার দিকে এগিয়ে এলো তার ডান হাতের কব্জির উপর থেকে কনুই পর্যন্ত বেশ অনেকটা ছড়ে যাবার চিহ্ন। ঘা দগদগ করছে, তারউপর ঘাম পড়ে ডুবন্ত সূর্যয় চকচকে হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিস্যু না ভেবে বললাম, “ইয়ে কেয়া হ্যায়? বাইকসে গির গয়ে থে?” সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। রামপাল ততক্ষণে দোর্দণ্ডপ্রতাপ। কিন্তু তাকে একেবারে অমোঘ হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে নতুন পুলুশকে বললাম, উঁহু! গলত কাম হ্যায় ইয়ে! খোলকে কিঁউ রাখখে হো?” সে বলে শুকিয়ে যাবে বলে। তাকে বেশ বকাঝকার মতো করেই বললাম, ধুল মিট্টি আর ঘাম লেগে সেরে ওঠার জায়গায় হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। (কথাটা সত্যি যদিও!!) তার সঙ্গে একদম চেরি অন দ্য টপ লাগিয়ে দিলাম। গম গম করে বলে উঠলাম, “ম্যায় ডক্টর হো কে ইয়ে বাত কহ রাহা হুঁ!” বিশ্বাস করুন পাঠক পাঠিকারা, মাটি চিড়ে দু ফাঁক হল না। মন্দিরের ঘণ্টা, মসজিদের আজান ধ্বনি গীর্জার ঢং ঢং সারা আকাশ বাতাস ভরিয়ে দিল না! এমন কি আমার জিভটাও খসে পড়ল না। খালি নতুন পুলুশ জিজ্ঞাসা করল, কোথাকার ডাক্তার? অম্লান বদনে বলে ফেললাম, “গঙ্গারাম”!

তার চোখমুখই পালটে গেল, সে সম্ভ্রমের সঙ্গে বলে উঠল, “ডক্টর সাব”। আরে হট পাগলে, কাঁদাবি নাকি? আরও বলল, তবে এবার রামপালকে, “ডাক্তার সাব কো ছোড় দো, কোই নহি! ডক্টর সাব দো মিনিট রুক যাও! সব লগ দেখ রহে হ্যায়! রামপাল জী লাইসেন্স ওয়াপস করো!” অ্যাঁ? ছোঁড়া বলে কি? কিন্তু রামপালের তো ডাইরেক্ট ঝামেলা হয়েছে। সে ছাড়বে কেন, তখনো সে তড়পাচ্ছে, “পেয়ার সে বোলতে, সরকারী অফসর, ডক্টর পেয়ার সে বোলতে তো ছোড় নেহি দেতে?”

ধুর পাগলা, এখন আমি দশাবতার, বিনয় অবতার, কাঁটাতার, প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার…। তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “রামপাল জী দেখিয়ে, আব তো আপ চিল্লাকে বাত কর রহে হ্যায় অউর ম্যায় হাস রাহা হুঁ! কেয়া ফায়দা? চলিয়ে সরি বোল দিয়ে! হো গয়ে?” নতুন পুলুশও তখন আমার নতুন উকিল। রামপাল আর কতক্ষণ চালাবে? আসার সময় লাইসেন্সটা নিয়ে রামপালের পিঠ চাপড়ে দিয়ে চালকের আসনে ফিরে এলাম। হায়দ্রাবাদ থেকে আমার বোন বলল, “এটা সফট স্কিল!” হেঁহেঁ ডুবন্ত সূর্যটা তখন বেশ রাঙা হয়ে উঠেছে।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বলছি ফ্রিজ সারাতে পারেন? কাল আমার শ্বশুরবাড়িতে ফ্রিজ সারাতে এসেছিল কোম্পানি থেকে। আমার মেয়ে গিয়ে সটান তার জালির দরজা খুলে দিয়ে তাকে “অ্যাও” বলে হাত বাড়িয়ে দিল। সে লোকটা তো হেসেই খুন। তারপর ফ্রিজ টিজ সারিয়ে যখন বিলের কপিটা আমার শ্বাশুড়ি মাকে দিতে গেছে, মেয়ে গিয়ে তার হাত থেকে সেটা নিয়ে বলল, “তাঙ্কু” তারপর বলল, “টাটা”! লোকটা হাসতে হাসতে চলে গেল। ফিজটা নিয়েছিল কি না সেটা জানা নেই। তবে যেটা পেল সেটা আমি দিন রাত পাই বলেই জানি কতটা ধনী আমি! আমেন!

(১৩৬)


TH09_TAGORE_GRI4R8_1077687e
সব ফিসফাস হাঁউমাউ সাইজের হতে নেই পাঠক পাঠিকা। তবে মূক অন্ধত্ব নিয়ে কিছু কথা বলে চলে যাব। কাল হেলেন কেলারের ১৩৫তম জন্মদিন। ভদ্রমহিলা কি করেছিলেন সে তো ইতিহাসের পাতায় ব্রেইলাক্ষরে রচিত আছে। আজ ডিসএবিলিটি বিভাগে সেন্স ইন্টারন্যাশনাল থেকে এসে ছোট্ট এক ঘন্টার প্রেজেন্টেশন দিয়ে গেলেন তার কর্তারা। একটা সিমুলেশন প্র্যাক্টিকাল গেমও ছিল। একজনের চোখ বন্ধ থাকবে এবং তাকে কিছু না বলে চিরকুটে লেখা প্রশ্নটি বোঝাতে হবে। আমরা যারা পঞ্চেন্দ্রিয় নিয়ে দাঁত ছরকুটে পড়ে থাকি। আর সারা দিন রাত খালি ব্যর্থতার গান গাই, “কিসসু হচ্ছে না, কিসসু হবে না”, তাদের চোখ খুলে দেবার জন্য যথেষ্ট। যে যেখানে যতটুকু পারেন করুন। সহনাগরিকদের জন্য। কে কি পাচ্ছে না পাচ্ছে নিয়ে ঝগড়া বিবাদ না করে আপনি কি দিচ্ছেন সেখানে কান পাতুন। দেখবেন দুনিয়াটাই বদলে গেছে।
0083034b9d766fb2d7d83e930c7a15ac2bccc65f

ছবিতেঃ আজকের অনুষ্ঠানের কিছু অংশ এবং সঞ্জয়, যিনি রানী ও অমিতাভ বচ্চনকে স্পর্শের ভাষা শিখিয়েছিলেন তার বক্তব্য রাখার মুহুর্ত ধরা আছে। মাল্টিপল ডিসএবিলিটির মধ্যে ডেফব্লাইণ্ডনেস বা মূক অন্ধত্ব একটি জটিলতর অবস্থা। কোশিশ মনে করে দেখুন পাঠক পাঠিকারা।
11660092_10153436578915763_1610985825_o
11642153_10153436581370763_316347587_o

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এটা ফেবুতেও দিয়েছি। তবুও আরও বড় পাঠককুলের সঙ্গে শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারলাম না। প্রতিদিন সকালে আমাদের জন্য বরাদ্দ থাকে টাটকা ফুল। গতকাল ছিল রজনীগন্ধা আর হাবিজাবির সময়। আজ সকালে মালী ছেলেটি যখন না ফোটা বাসি রজনীগন্ধাগুলো ফেলে দিতে যাচ্ছিল, আটকালাম। বাকি অফিসারদের আর আমার টেবিলের ফুলগুলোকে এক বোতলে ভরে রেখে দিয়েছি। গন্ধগুলো ধীরে ধীরে ফুটছে। আরাম… আঃ
11663920_10153436480630763_902344946_o