চোদ্দই ফেব্রুয়ারী- কিছু বিক্ষিপ্ত বক্তব্য


এই দেখুন, আমি কিন্তু কিছু করি নি। মানে আমায় অভীক মাথায় গোলাপ ফুল ঠেকিয়ে কসম টসম খাইয়ে লিখতে বলেছে। এমনিতে ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে আমি জম্মে কিস্যু লিখে উঠতে পারি নি! না না ভুল বললাম, বেশ বছর চারেক আগে তেরোই ফেব্রুয়ারিতে ‘লা বেলা পারসোনা’ বলে একখান ইংরাজি সাবটাইটেল সহ ফরাসি সিনেমা দেখে চেগে গিয়ে কবতে কপচে ফেলেচিনু “হেই বিউটিফুল” বলে। তা সে কবতের কি হয়েছিল সে দুঃখের কাহিনী আর কোথায় বলব। খালি এটা জানি ষাটের দশকে সনি রামাধিনের সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এক বাঁহাতি স্পিনারের নাম ছিল অ্যালফ ভ্যালেন্টাইন।

আর ওমনিতেও দেখতে গেলে ১৪ই ফেব্রুয়ারী নিয়ে সাহেবদের মাথাব্যথা আমাদের ঘাড় বেয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে সেই ‘দিল তো পাগল হ্যায়’-এর সময় থেকে। গোল বেলুনের মাঝখানে রদ্দা মেরে পানের মতো বানিয়ে তাপ্পর বাণিজ্যিক দর নির্মাণ এবং সব শেষে মুরগী জবাই। তারপর আর্চিস আর কী সব যেন জুড়ে টুরে একদম ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ অবস্থা।

তা আঙুল ফুলে কলাগাছ হলে তার নিদান পুলটিস সবই জুটে যায়। এখানেও মরাল পুলিস কচি কচি থোকা থোকা মেঘেদের ছানাদের মরাল গ্রীবা ধরতে উদ্যত হতে শুরু হল। কিছু অবিশ্বাসী চারকদমে জোরকদমে ঘোষণা করতে শুরু করল যে আমাদের জন্য বছরের ৩৬৫ দিনই প্রেম দিবস তাই বিশেষ দিনের প্রয়োজন নাই। কিন্তু মাঝখান থেকে আপামর শহরাঞ্চলের লাল পান বেলুনদের গাল ফোলা গোবিন্দ হয়ে ব্যবসায় বৃহস্পতি তুঙ্গে উঠল। টাইটান থেকে শুরুর করে পাঁড়ে ফ্লাওয়ারস সবাই রেস্তের ঝনঝনানি বাড়িয়ে ফেলল।

এইবার আমার হল শিরে পৌষ পাব্বন। লিখতে বসেছি ভ্যালেন্টাইন নিয়ে ভয়ানক গদ্য সেখানে পাঁচ পাতা জুড়ে খালি সারে গামা আলাপ করাই সার। তাহলে একটু ইতিহাস বা উইকিপিডিয়ার পাতা উলটে দেখি আসুন, ভ্যালেন্টাইনটা খায় না মাথায় মাখে?

উইকিপিডিয়া সোজা সাপটা বলছে ১৪ ফেব্রুয়ারীটাকে ভ্যালেন্টাইনের দিন বলে ক্যাথলিকরাই মানে। জনশ্রুতি আছে, ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইন’স নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচার-অভিযোগে তৎকালীন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাঁকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছিল। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইন’স স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন’ দিবস ঘোষণা করেন।

পূর্ব ইউরোপীয় অর্থোডক্স চার্চ আবার ভ্যালেন্টাইন্স ডে উদযাপন করে ৬ই জুলাই। এবারে আসুন ভ্যালেন্টাইন্স দিবস সম্পর্কিত অন্যান্য রীতিনীতি ঘেঁটে দেখি। ইংল্যাণ্ডের নরফোকে এখনো সেন্ট নিকোলাসের মতই জ্যাক ভ্যালেন্টাইন্স বলে এক কাল্পনিক চরিত্র বাড়ির পিছনের দরজায় মিষ্টি কেক এবং উপহার রেখে যান।

শ্লোভানিয়ায় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন বা স্থানীয় ভাষায় জ্রাভকোকে বসন্ত এবং বীজবপনের সন্ত হিসাবে বর্তমান। ১৪ই ফেব্রুয়ারী থেকে বসন্ত আগমনের সূচনা হয়। নবজীবনের বার্তা বয়ে আনেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন।

সত্যি কথা বলতে কি ভ্যালেন্টাইন যে কিভাবে প্রেম ভালবাসার সঙ্গে জুড়ে গেল তার কোন প্রাচীন যুগের প্রমাণ নেই। চসারের পদ্যতেই প্রথম প্রেমের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তার আগে তো প্রেম দিবস ছিল ১২ই মার্চ সেন্ট গ্রেগরী দিবসে।

যাই হোক কবিকুলশিরোমণি চসারের দয়ায় ১৪ই ফেব্রুয়ারী লাল বেলুনের মর্যাদা তো লাভ করল। কিন্তু তা এইরকম ভয়ানকভাবে দেশে দেশে ছড়িয়ে গেল কি ভাবে? আসলে সাহিত্যের একটা বিশাল বড় প্রভাব রয়েছে, ভ্যালেন্টাইন্স দিবসের কবিতা দেখতে গেলে চসার পেরিয়ে শেক্সপিয়ার হয়ে জন ডান এমন কি নার্সারি রাইমেও দেখি

গোলাপেরা লাল, ভায়োলেট চুমি
মধু হলে মিঠে মধুভাষী তুমি
আমি তুমি মিলে প্রেমে একাকার-
তোমাকে আমার মেনেছি যে সখী
ভ্যালেন্টাইন লটারিতে দেখি
আহা কি যে শোভা
মন মনলোভা
তুমি যে আমার আমি যে তোমার।।

এহে সেই ‘রোজেস আর রেড’-এর অক্ষম অনুবাদ। ক্ষমা টমা করে দেবেন।

সে যাই হোক অষ্টদশ শতকেই আমরা দেখতে পাই গণহিস্টেরিয়া বিশেষত ইংল্যাণ্ডে উর্ধগামী। তবে গোঁড়া পিউরিটানিজম তো সব জায়গাতেই থাকে। ইংল্যাণ্ড এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশেও কখনো না কখনো প্রেম ভালবাসার নামে তথাকথিত উদ্দাম বেলেল্লাপনার উপর ধর্মের খাঁড়া নেমে এসেছে।

তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রেম দিবস পালনের হিড়িক সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বোধহয় উনবিংশ শতকে এসে। ততদিনে গ্রিটিংস কার্ড চলে এসেছে। বাজারও বুঝে গেছে শুধুমাত্র নাতির অন্যপ্রাশন ছেলের বিয়ে আর মেয়ের সন্ধ্যাহ্নিকের গুটি কয়েক কার্ড বিক্রি করলে তার পেট চলবে না। অতএব চালাও পানসি খালাসিটোলা। ভারত বর্ষ চিরকালই এইসব ব্যাপারে পেটে কথা মুখে লাজ। ঘোমটার আড়ালে প্রিয়তমার মুখই বুঝতে পারে না তো গ্রিটিংস কার্ডে ‘আই লব ইউ’। রোসো বাছা, বয়সটা আরও একটু বাড়ুক না হয়।

কিন্তু ম্যাচিউরিটির চক্করে পরাণ যায় জ্বলিয়া। প্রেম শুনবে কেন। সে এতদিন ধরে নীরবে দুয়ারপ্রান্তে বিদ্যাসাগরের ছাতার মতো পড়ে থেকে থেকে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাই বাণিজ্যিক সাহায্য নিয়ে গর্জে উঠল, ভসভসিয়ে সোডার মতো গ্যাসের মতো ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল। প্রেমহীন সমাজকে। কিন্তু সমাজের প্রাণে তো প্রেম দেয় নি কবি। সে জানে সময়ের গাড়ি চলতে থাকলেও লটবহরকে শতাব্দী প্রাচীন সিন্দুকের ভিতরেই ভোমরার প্রাণের মতো কিভাবে ভরে রাখতে হয়। তাই অচলায়তনে উঠলো বোল, ‘হর হর মহাদেব’ ‘আল্লা হো আকবর’।

ইউরোপ অ্যামেরিকা এসব দেখে দেখেই বড় হয়েছে। তাই তারাও গতি বাড়ালো। বাজারও বাড়ালো চাপ। প্রেম নেই তো কি হয়েছে? প্রেমের জন্য ভ্যালেন্টাইন নাকি ভ্যালেন্টাইনের জন্য প্রেম? আগে দিনটাকে রঙিন করি, জীবন তো বহুদূর পথ, তোমাকে চাইতে এখনো অনেক দেরী।
অন্যদিকেও গোঁসাইপুর সরগরম- ধর তক্তা কর বিয়ে- সুশীল সমাজও ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভ্যালেন্টাইন্স ডেতে দোকা দেখলেই ফেবিকল।

এসবের জাঁতাকলে পড়ে প্রেম কেমন জানি ছটফটিয়ে ওঠে। প্রথম দেখার উজ্জ্বল স্মৃতিটাকে হাতড়ে নিয়ে বিশবছর পরের সকালে একটু ছোঁয়া একটু বিশ্বাস একটু নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু শুকনো বেলুন বাদাম আর চকোলেটে চিঁড়ে ভেজে না। শুল্ক? শুল্ক দিয়েছ? ন্যাহ দাও নি? বিরহহীন জীবন তখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

প্রেমহীন হরিমটর আর বাস্তবের খরকেকাঠি তখন এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় দেখ। এর মধ্যেই পাঁচু বলে ওঠে, “ওরে বাঙালীর ভ্যালেন্টাইন তো সরস্বতী পুজো! সেই লাল পাড় সাদা শাড়ির পেঁচীর জন্য হাজারটা লাল গোলাপ কুরবান, মেহেরবান কদরদান!” সকলে কনুই ধরে টেনে পাঁচুকে বসিয়ে দেয়।

মোলো যা! হচ্ছে খটখটে বাজারের ওঠানামার কথা ইতিহাসের কথা ইতিহাসহীনতার কথা! কোথথেকে নরম সরম মরাল গ্রীবার হংসবাহিনীকে এনে হাজির কল্লি। এখুনি মরাল পুলিশকে ডাকছি।

ব্যাস তার পরেই গেরুয়া, লাল, সাদা, সবুজ আর না জানি কত না ঝাণ্ডা ডাণ্ডা দুলিয়ে শিং নাড়িয়ে এ বলে আমায় গুঁতো ও বলে আমায় গুঁতো। রিয়ালিটি টিভি- একটু চোখের জল, একটু নাক কোঁচকানো, একটু ভ্রুপল্লব, একটু ঠোঁট কামড়ানি আর একটু অন্তঃসারশূন্য বোকা বোকা ‘আই লব ইউ’।

আসলে সবই তো দড়ির উপর ট্রাপিজ খেলা, একটু ধাক্কা দিলেই নীচে ধরে থাকা জালে বন্দী। পালাবার পথটি নেই।

তাই বাপু বলি কি, এদেরকে ভ্যালেন্টাইন ভ্যালেন্টাইন খেলতে দাও, চাই কি একটু শিবসেনা বানরসেনা কুরবানি সেনাও খেলতে পার। দরকার হলে প্রিয়তম বা প্রিয়তমাকে একটা বৃন্তচ্যুত গোলাপ একটা মোমদানি একটু যত্ন দিয়ে দিনটা কাবার করে দাও। কিন্তু বাকি দিনগুলোকেও মাঝে মধ্যে কক্ষচ্যুত করে নিয়ে নিজেদের করে তুলতে ভুলো না।

আর যাদের প্রাণে প্রেম দিলে না তাদের? উৎসবের দিনে তাদেরকেও ভুলো না হে প্রেমিক পাগল। আনন্দ তো ভাগ করলেই বাড়ে। মন্দির মসজিদ গীর্জা গুরুদ্বারে না হলে নিজের হৃদয় মাঝে তাদের জন্যও এক ফোঁটা জল বরাদ্দ রেখ।

শেষপাতে একমুঠো গালিব রেখে যাইঃ
আভি মশরুফ হুঁ কাফি, কভি ফুরসত মে শোচুঙ্গা
কে তুঝকো ইয়াদ রাখনে মে ম্যায় কেয়া কেয়া ভুল যাতা হুঁ

ওয়াহ ওয়াহ!! আর একটা প্লিজঃ
হামকো মালুম হ্যায় জন্নত কি হকিকত লেকিন
দিল কো খুশ করনে কা, গালিব, ইয়ে খয়াল আচ্ছা হ্যায়!!

(আদরের নৌকায় প্রকাশিত)

(১২৫)

বন্ধুর বাড়ি ওপারে

দাঁড়ান দাঁড়ান! আগে কয়েকটা ছবি টাঙিয়ে দিই। বাকি লেখালেখি তো আজকের বাজারে কাগজের পাতা ওলটালেই পেয়ে যাবেন হাই ভোল্টেজ ম্যাচ বলে কথা।
Javed-Miandad-Last-Ball-Six-Against-India-Sharjah-1986

inda-vs-pakistan_enl

Jadeja

236533,xcitefun-world-cup-1996-1

India vs Pakistan 1996,1999,2003 world cup encounters highlights

venkatesh-prasad

sachin-upper-cutting-shaib-for-six-world-cup-2003

victory

237550,xcitefun-world-cup-india
ভারত পাকিস্তান নিয়ে আমার প্রথম স্মৃতি বলতে সেই ১৯৮০তে আসিফ ইকবালের বিদায়ী ম্যাচ। সেই ম্যাচেও কিরমানির হাতে বল থাকা সত্ত্বেও আসিফ ইকবাল আর জাভেদ মিয়াঁদাদ সিঙ্গল চুরি করে নিয়ে চলে গেল।(এই ছবিটা কোথাও খুঁজেও পাই নি) তার পর রথম্যান্স কাপে ভারতের ১২৫এর জবাবে পাকিস্তানের ৮৭তে গুটিয়ে যাওয়া পেরিয়ে অস্ট্রেলেশিয়া কাপে চেতন শর্মার শেষ বলে ছক্কা। ইডেনের বুকে প্রথম সীমিত ওভারের ম্যাচে সেলিম মালিকের অতিমানব হয়ে ওঠা এসব পেরিয়ে ৯২এর বিশ্বকাপে প্রথম দেখা।

তার আগে অবশ্য ৮৭র বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে দুই দলের হেরে গিয়ে ইডেনের ফাইনালে বিরিয়ানির বদলে শুকনো চিঁড়ে চিবনোর মত করে ইংল্যণ্ড অস্ট্রেলিয়া আর ৮৯-র নেহেরু কাপে শেষ ওভারে ভিভ রিচার্ডসের নির্বিশ অফস্পিনে ওয়াসিম আক্রমের বিশাল ছক্কার উৎসবে ড্রেসিংরুম ভরে যাওয়ার গল্পও রয়েছে।

বিরানব্বইয়ে মিয়াঁদাদের নিষ্ফল নাচ, ছিয়ানব্বইতে জাদেজার ওয়াকার ইউনিসকে ক্লাবস্তরের বোলারে নামিয়ে আনা, নিরানব্বইতে বেঙ্কটেশ প্রসাদের পাঁচ উইকেট, দুহাজার তিনে শোয়েবকে শচীনের থার্ডম্যান গ্যালারিতে ফেলে দেবার পর গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের ফিফথ গিয়ারে চাপ না দেওয়া। এর মধ্যে আবার প্রথম টি২০ বিশ্বকাপে মিসবার অকল্পনীয় চামচ ক্যাচও রয়েছে। ভারত পাক ম্যাচ মানেই ‘হর হর মহাদেব’ ‘জিয়ে জিয়ে পাকিস্তান’-এর জিগির আর দেশগৌরবের আমদানি। কালকেও একটা নিউজ রিপোর্ট দেখলাম। অ্যাডিলেডের ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা আবদার করেছে ওয়ার্ল্ড কাপ চাই না কিন্তু পাকিস্তান ম্যাচ হারা চলবে না। কিন্তু এতটা হাই ভোল্টেজ সাস বহুর নাটকের মধ্যে স্বচ্ছন্দে ভুলে যাই যে এটা শুধুমাত্র একটা খেলা। খেলাকে খেলার মাঠে রেখে আসতে আর কবে শিখব কে জানে?

রক্ত… এত রক্ত কেন রাজা?
71349-004-5D04A44D
সেদিন পার্শ্ববর্তিনীর সঙ্গে আড্ডা হচ্ছিল প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব নিয়ে। হানাহানি আর রক্ত যে কেন ১০০ বছর পরেও এত প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে সেটাই অকল্পনীয়।

ভাবতে পারেন, যে পৃথিবী গত শতকের শুরু এবং মাঝামাঝিতে ওই দুটো যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে সে এখনো শিক্ষা নেয় নি? মৃত্যু এখন শুধুমাত্র একটা সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। পৃথিবীতে ঘৃণার পাহাড় দুদিকেই বাড়ছে। শার্লে এবদো, ৯/১১, ৭/৭, আল কায়দা, তালিবান, পেশোয়ার, আইএস, ইজরায়েল-ফিলিস্তিন, ইউরোপ অ্যামেরিকা আর মধ্যপ্রাচ্য। সংখ্যা দিয়ে সংশয় আর ঘৃণার পরিমাপ করা যাবে না।

রক্তক্ষয় বন্ধের সব থেকে শুরুর রাস্তা হল সংবেদনশীলতা। বিভেদকে গ্রহণ করেই তাকে মিলনের অন্তরায় না করে রাখা। আমরা ওরার রাজনীতি বা কূটনীতি মানুষের মাথার দামের হিসাব কসতে কসতেই জীবন কাবার করে দেয়।

বই না ফিশফ্রাই?

পাঠক পাঠিকারা, আমি নিজে ভোজনবিলাসী, তাই খাবার খাবার অদম্য চাহিদাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারি না। তাই হয়তো এই অংশের অবতারণা। ধরুন স্বামী স্ত্রী দুজনের একজন বই ভালবাসেন আর একজন বাসেন না! বইমেলায় উভয়কেই আনতে গেলে তো রকমারি রংচঙে বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে খাবারের স্টলও তো রাখতে হবে। হাজার হোক বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক বইমেলা বলে কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বোধহয় কোথাও একটা অনুপাতের গণ্ডগোল করে ফেলছেন। মানে গুণমানের থেকে সংখ্যাকে আগে রাখতে গিয়েই এটা হয়ে যাচ্ছে। টিভি চ্যানেলগুলোর বুদ্ধিমত্তাকে মাটিতে শুইয়ে দেওয়া প্রচারগুলো দেখে সেটা আরও বেশী করে মনে হল। রোজ পাঁচ কোটি নাহলেও চলবে। সবাই থাক বইয়ের মিলনমেলায়। কিন্তু গুরুত্ব যেন বই বই আর কিছুতে না থাকে। শব্দকল্পদ্রুমের চাপে বইপাঠকের সংবেদনশীল মন চাপা পড়ে গেলে পড়বে কে?

আর যাঁরা পার্কস্ট্রীটের ময়দান নিয়ে হাহুতাশ করেন তাঁদের জন্য বলি। আমার ছেলেবেলায় বাবা দশ টাকা নিয়ে বাজারে গিয়ে ব্যাগভর্তি বাজার করে নিয়ে আসত। দুপুরের অবসরে গল্পের বই, মাঠে নেমে ক্রিকেট খেলা, সবুজের সমারোহ সব ছিল। কিন্তু টিভি ছিল না কম্পিউটার মোবাইল কিচ্ছুটি ছিল না। কিন্তু তারপর একটু বড় হবার পর বইমেলা থেকে ফিরতাম ধূলোভর্তি মাথা নিয়ে। ময়দান কোলকাতার ফুসফুস, সেখানে যদি নিকোটিনের ছোপ লাগিয়ে দিই, শহরটাই তো বাঁচবে না।

তাই মিলনমেলা, কদিন অপেক্ষা করুন না। শহরটাও তো তরতর করে এগোচ্ছে। সব নাগরিক সুযোগ সুবিধা আপনার হাতের কাছেই পাবেন। তখন আর ছেলেভুলানো গল্প, “আমার ছেলেবেলায় এই ছিল ওই ছিল”তে ভরসা করতে হবে না। আপনার ছেলেমেয়ের ছেলেবেলার গল্পও দেখবেনে আপনার ভাল লাগতে শুরু করেছে।

ষোল বছর পরে বইমেলায় এলাম… কোলকাতা বইমেলা। দিল্লিতেও হয় বইমেলা। ওয়র্ল্ড বুক ফেয়ার। বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের ৫০টি স্টল নিয়েও বইমেলা হয়। কিন্তু কোলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার বিশালতার কাছে এরা সব মুসুরডাল। আর উন্মাদনা? কিচ্ছুটি লাগবে না, লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে চলে যান। সমান্তরাল সাহিত্য আজও বুক বেঁধে আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। কুড়ি পনেরো দশ বছরের পুরনো মুখগুলো পেরিয়ে যখন কচিকচি মুখগুলো কপালের ঘাম মুছে, নতুন সংখ্যাটা অন্যদের থেকে কেন আলাদা সেটা বোঝাবে, তখন আশার সঙ্গে ভালবাসাও ছিলর জায়গায় আছে হয়ে দেখা দেবে। তবে ভণ্ডামি যে নেই তা নয়, তা সে সব দেখতে বসলে তো আপনার চলবে না। আপনি উপরের ক্ষীরটা খান। নীচে নোংরা অবশেষের চিন্তা পুরসভার।

একটু সৃষ্টিসুখ

থাক! ফেসবুকের পাতায় গলা কাঁপিয়ে অনেক ভাষণ দিয়েছি। আর দিলে আপনারাই ফিসফাসকে বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলবেন। তবে কি না যাকে নিজের বলে মনে করি তাকে নিয়ে বুক ফুলিয়ে বলতে লজ্জা কিসের। বাংলা প্রকাশনার জগত যখন মেঘে আচ্ছন্ন। বড় প্রকাশকের মৌরসিপাট্টায় ছোটদের নাভিশ্বাস উঠে যাবার অবস্থা। কিন্তু বড়রাও সংখ্যা দিয়ে গুণমানের বিচার করতে গিয়ে ফেলে ছড়িয়ে মেখে একশেষ করে ফেলছেন সেখানে অভিযান, ধানসিঁড়ি, সৃষ্টিসুখ এরাই কিন্তু বিকল্প পথ দেখাচ্ছে। প্রতিভাস পারুল পুনশ্চ এরাও হয়তো আরও এগিয়েছে। তবে লক্ষ্য রাখুন। বই কিন্তু সইয়ের জায়গা ছাড়তে রাজী নয়। নতুনরাও যেমন লিখছি, তেমন পুরনোরাও নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলতে।
P1150313
সৃষ্টিসুখ আমার প্রথম বইয়ের প্রকাশক, আমার দ্বিতীয় বইয়েরও। রোহণ এবং সৃষ্টিসুখের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা তাই ভাষায় ভাবা সম্ভব নয়। ভালবাসার আরেক নাম সৃষ্টিসুখ।

এবং রাজনীতি

রাজনীতি নিয়ে বাঙালীর ছুঁতমার্গ বরাবরই। আমারও যে নেই তা নয়। বাঘের এক আর পুলিশের আঠারো পেরিয়ে রাজনীতির ছত্রিশ ঘা নিয়ে আমরা বড়ই কাতর। মতামত একটা আছে তবে নিরপেক্ষতা যাতে না হারাই সেটা মাথায় রাখতে গিয়ে মন্তব্য করা হয়ে ওঠে না। তবে সাম্প্রতিক দিল্লি নির্বাচনের ফলাফল অনেক কিছুই দেখাচ্ছে। দেখাচ্ছে সাধারণ মানুষও দূর থেকে ঝারি না মেরে যুদ্ধে নামতে পারে সরাসরি। অন্ততঃ আজকের জনতা তাই চাইছে। যে নিজের মতো কেউ আসুক আর সব কিছু সাফাই করে দিক।

তবে ঝাড়ু নিয়ে এখনি আশাবাদী হবার মতো কিছু দেখি নি। নিরাশাও নয়। নির্বাচনী ইস্তেহারে বড় বড় বাতেলা মারা তো রাজনৈতিক দলগুলির একচেটিয়া হতে পারে না। তাই ৫০০ স্কুল, ১০০ কলেজ, শহর জুড়ে ওয়াই ফাই, সিসিটিভি, এসবগুলো জাদুর ছড়িতে হয়ে যাবার আশা না করাই ভাল।

কিন্তু আট নমাস আগেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসার পরেও মুখ থুবড়ে কেন পড়ল একটি দল? তার পিছনে সাবোতাজের গল্প আছে না আত্মম্ভরিতায় অন্ধত্বের গল্প আছে, সেটা মনে হয় দেখার দরকার আছে। আপের জয় তাই সাধারণ মানুষের টনকে টানের মধ্যেই যাতে সীমাবদ্ধ না থাকে এই আশাতেই আরেকবার বুক বাঁধলাম। আসলে ধাক্কা খেতে খেতে আর বিশ্বাসভঙ্গের গল্প শুনতে শুনতে আজও আমরা গরু হারাই নি। পৃথিবীর শেষ স্টেশনের খোঁজটা যে এ জীবনে যাবার নয়। আমেন।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বইমেলার একদিন, বন্ধুর বই নিতে ধানসিঁড়ির স্টলে গেছি, এক ভদ্র সন্তান এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “নজরুলের কবিতার বই আছে?” স্বাভাবিক উত্তর, “না নেই”। এই অবধি কোন সমস্যা নেই। কিন্তু তারপরেই ধেয়ে এল তাঁর স্বগতোক্তি, “নজরুলেরও বই রাখে না এরা!” কি হল কে জানে, সম্পূর্ণ অনধিকার চর্চা করে ভদ্রলোককে ডেকে বললাম, “আপনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার, সাহিত্য অ্যাকাদেমী বা বাংলাদেশের স্টলে পেয়ে যাবেন। আসলে আমরা ছোট প্রকাশক তো! নজরুলকে ঠিক মতো কদর করতে পারব না বলেই রাখি না।”

প্রয়োজনহীন পুনশ্চ২- শান্ত স্বভাবের রোহণ দাঁড়িয়ে আছে সৃষ্টিসুখের স্টলে। তাকে এসে আরেক ভদ্রসন্তান জিজ্ঞাসা করল, “লিটল ম্যাগাজিন?” হাতে তার আনন্দ এবং দেজের ক্যাটালগ। রোহণ ধৈর্য নিয়ে তাকে সৃষ্টিসুখ কি, কি ধরণের বই বের করে তা বোঝালো। সে কি বুঝল কে জানে, “লিটল ম্যাগাজিন না আমি ঠিক বুঝি না!” বলে চলে গেল। লাও ঠ্যালা।
10986511_10153067337550761_105309937910942553_n

(১২৪)

চোখে হারানোর রঙ

বিশ্বাস করুন, ষোলো বচ্ছর কোন সম্পর্ক ছিল না। প্রথম প্রেমও না যে আঁচড় গভীর হবে। এতো অলসো রানেদের দলে ছিল। বেড়ে ওঠার সঙ্গী বই পড়া বই পাড়া মেলা বই বই মেলা। তবে স্বার্থপরের মতো নিজের বই বেরনোর সময় থেকেই খালি আনটান শুরু হলো। গত দু বছর আসতে না পারার দুঃখটা যেন আসার পর বেশী করে বাজছে। বেহালার ছড়ে টান দিলে রেশ থেকে যায়, জাত কফিতে চুমুক দিলে রেশ থেকে যায় আর বইমেলার রেশ চোখ ছড়িয়ে মুখ ছড়িয়ে ছেয়ে যায় বুকে। মাত্র একদিনের জন্য ভিন রাজ্য ভ্রমণ, তাও এখন যেন মনে হচ্ছে কি সব হচ্ছে ওই দশ বাই দশের খুপরিটায়। বুড়ো বয়সের প্রেম, বুঝলেন না?

চার কদম… দুই পা ফেলিয়া

পঁয়তাল্লিশ মিনিটেই স্বর্গের সীমারেখায়। গৌহাটি আসি নি কখনও। শহরটা ঘুরেও দেখা হল না কাজের চক্করে। কিন্তু কামাখ্যা ছুঁয়ে নামতে নামতে মনে হলো তারাদের হাতছানি ওই নীচ থেকেই আসছে। সন্ধ্যার ব্রহ্মপুত্র গড়গড়িয়ে জানান দিয়ে যাচ্ছে আমি আছি। আছি হেথায়। বুকে ভাসা হল না হয়তো কিন্তু ভাষা খুঁজে পাবই এই বিশ্বাস রেখে গেল সে।

ভিন্ন ক্ষমতা- সহানুভূতি নয় সুযোগ চাই

রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল অব ইণ্ডিয়ার সেমিনারে স্পেশাল এডুকেটরদের আশার বাণী শোনাতে শোনাতে বার বার বলতে হল। তারাও একমত। প্রতিবন্ধকতা নয় ভিন্ন ক্ষমতা, সহানুভূতি নয় সুযোগ চাই। বেড়ে ওঠার সুযোগ লালন পালনের সুযোগ আর চাই কাজের সুযোগ। মানুষের সেবায় গ্যাঁটের কড়ি গুনতে গেলেই পকেট ফুটো থেকে যাবার সম্ভাবনা। সমবেদনা নয় সংবেদনা- পরিবর্তন আনুক সমাজে। ডিসেবেল্ড পরিবর্তিত হোক ডিফারেন্টলি এবেল্ডে।

ফিরে যাই ফিরে যাই

বইমেলাটা শুরু থেকেই চমকে দিল আমায়, মাথায় বুকে পায়ে চমক। মেলাপ্রাঙ্গণে ধুলোর অভাব, তো কি হয়েছে! আসাযাওয়ার পথ তো ধুলোমলিন! পরিচয়, পরিচয়। পুরনো পরিচয় নতুন হয়ে দেখা দিচ্ছে। নতুন পরিচয় যেন কত দিনের পুরনো এমন ভাবে বুকে নিচ্ছে। সেই যে সেই ভদ্রলোক এক দুজন বিশিষ্ট লেখক ছাড়া পড়বেনই না। জায়গার বড় অভাব। শুধুমাত্র আন্তরিকতায় ভর করে বন্ধু হয়ে গেলেন। টানে টানে দুদিন চলে এলেন, শুধু মাত্র আড্ডা দিতে।

আরেকজন শুধু বইয়ের লেখক নামায় চেনা, অচিনপুরের বাস থেকে নেমে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটলেন। গল্প দিয়ে চমকে দিলেন। আরে এ তো আমারই মতন ভাবে। আগলে রাখতে হবে দেখছি।

আরেকটি সে তৈরী ছেলে, বছর দুয়েক আগে মনোমালিন্য হয়ে এখন বন্ধুতালিকা ছাড়া, কিন্তু বই আগলে বাণিজ্যে সে তো আমার পথের পথিক। আহা ছোট হোক বড় হোক, গাল টিপে আদর করতে দোষ কোথায়।

আরও যারা সব কোরিয়ায় বসে সাধ করিয়া কবিতা লেখেন বা দেহরাদুন চালের সুগন্ধের মতো অল্প স্বল্প কবিতায় ভাসিয়ে রাখেন বা বরফ বন্দী তাজা প্রাণ বা পথ চলতে চলতে লিখে ফেলে লাইন বা তেরোর গেরোয় আটকে থাকা প্রাণ, গোপন বাঁচায় সুর ধরানো গান, বিনি সুতোয় গেঁথে নেওয়া মালা, এক জীবনে অনেক জীবন মালা। অভিযানের পাতায় পাতায় সুখ, উত্তুরে হাওয়ায় কাঁপাল যে বুক।
আরে রাখুন সাহেব কাব্যি করবেন না, জীবনের থেকে বড় কাব্যি আর দুইখান নেই।
P1150313

বাইটে বাইটে প্রশ্ন পরতে পরতে সৃষ্টি- স্মৃতিতে স্মৃতিতে টুকরো, উপেক্ষিত যে বৃষ্টি। হুই হুই! আবার পদ্য করছে। তুমি বাপু ফিসফাসাও, সেইখানেই তুমি বাঁচবে। আর রোহণ রোহণ রোহণ। আমার এই তরল কলমে তো টালার ট্যাঙ্ক ভরতে পারি না। ছোট্ট কাঁধে এতটা জোয়াল টানার জোর, ছোট্ট বুকে এতটা গভীরতার ব্যাজ। সিরিয়াসলি বলছি অন্ত্যমিল দেব না বলেই বললাম ব্যাজ। আসলে স্তুতিতে শব্দ খতম হবে না। খামোখা বইমেলাটা খতম হয়ে যায়।

স্টপ ওভার

আবার কালকে আসব আবার ঝড়ের কাছে রেখে যাব ঠিকানা। কাল থেকে আর মাত্র তিন দিন তবু তাতে কি? এক সপ্তাহে এক জীবনের গল্প ঝেড়ে বেছে নিলাম। আবার আসতে হবে, তবে সত্যি বলতে কি বাক্স প্যাঁটরা ছাড়া এতদিন ঠিক মন টেকে না। তাদেরকেও কোন না কোন ভাবে ছুঁয়ে থাকতে হবে। ছুঁইয়ে রাখতে হবে। তারাও তো বইয়েই বাঁচে। এক মন না হলে এক প্রাণ থাকব কি করে বলুন তো?

কাল থেকে আবার সেই ৪৫৭ নম্বর স্টলে! আসবেন তো?

10687981_10153059630295763_1247873749102847541_o

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ আরে বিশাল টেনশন… বইমেলা থেকে ফেরার পথে মানি স্কোয়ারে অটোয় উঠেছি গুনগুন করে গান গাইছি। ওমা পাশের একটি অল্প বয়সী মেয়ে বলে, “আপনি সৃষ্টিসুখের সৌরাংশু না?” গেল ধ্যাস্টামোর মোষ জলের মধ্যে… আর গান গাইবি মনা?

প্র পু ২ আরেকজন হেবি ঘ্যাম নিয়ে রান্না বা গানের বই খুঁজতে এসে ফিসফাসের পাতা ওলটালেন। পড়বি তো পড় গানের গুঁতোর পাতায়। তাই দেখে তেনার কি আনন্দ, “আসলে মিউজিকের লাইনের লোক তো! ছবিটা দেখে মন ভালো হয়ে গেল। আচ্ছা ফুডকোর্টটা কোনদিকে বলতে পারেন? ……

(১২৩)

শেষ যে বারে কোলকাতা বইমেলায় এসেছিলাম সেবার আগুন লেগে গিয়েছিল আর আমি মনের সুখে পোড়া কাঠ আসবাব পেরিয়ে পোড়া বইয়ের গন্ধ নেবার জন্য জঞ্জাল ঘেঁটেছিলাম। পুড়ে যাওয়া খালিল গিব্রান তুলে নিয়ে সযত্নে রেখে দিয়েছিলাম যদি কখনো তাকে মনে পড়ে বলে।

তারপর তো গঙ্গার জল যমুনায় এসে শুকিয়ে পালংশাকের ক্ষেত হয়ে গেছে… সেও অনেক বছর হল। ফিসফাস প্রথমবার যখন বার হল। তখনও কবে আসবে কবে আসবের চক্করে আসতে পারি নি। গত বছর তো আমার কন্যাটির ভূমিষ্ঠ হবার সময়, তাই প্রশ্নই নেই। কিন্তু এবারে ছাড় নেই, একে তো দুই নং ফিসফাস মুখ দেখাচ্ছে তার উপর ষোল্লো বছর পর বইমেলায় হাঁটার উত্তেজনা। সব মিলিয়ে একেবারে চলচ্চিত্রচঞ্চরী। দেবজ্যোতিদাকে জানালাম আসছি। দেবজ্যোতি দা আমায় বললেন, “আমার নাম কিন্তু দেবাশিষ নয়, দেবজ্যোতি!” আমি আর কি বলব? গরু হারানোর পর ফিরে পাওয়ার আনন্দে দন্তরুচিকৌমুদী।

তবে সে বত্রিশ পাটি আর বাইরে বেশীক্ষণ থাকল না। কাল অফিস থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরচ্ছি। শিয়ালদা রাজধানী ধরব বলে। নীচে নেমেই দেখি, আমার গাড়ির ঠিক পিছনেই এক সফেদ স্যান্ত্রো বেমালুম হ্যাণ্ডব্রেক সহকারে দাঁড়িয়ে। কি করি? গাড়ি ঘুরিয়ে কাশীর গলি দিয়ে বেরোতে গিয়ে দিয়েছি এক ঠোনা। ব্যাস গাড়ির মালিক সিআরপিএফ-এর সাবইনস্পেক্টর এসে জাঠ ভাষায় তুই তোকারি করে এক ঝটকায় টেনে নামাল। গাড়িতে ঠোনা মারা হয়তো দোষের কিন্তু পাঠক পাঠিকারা নিশ্চয় মানবেন গায়ে হাত তোলাটা অধিক দোষের। আমি তবুও যথেষ্ট সম্ভ্রম দেখিয়েই বললাম ঠিক ভাবে কথা বলতে। কিন্তু সে তো ইউনিফর্মের গরমে ফার্নেস। শেষে আমার নিজের অধিকার এবং আধিকারিক অবস্থান জানাতে আরও দেখি ক্ষেপে গেল। এবং সবথেকে খারাপ হল, যখন সে তার করা প্রতিটি অকাজ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিল। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে ট্রেন ধরার তাড়া, এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের অনুরোধ, “আপ তো পড়ে লিখে হো। মাফি মাঙ্গ লো!” (যেন পড়েলিখে হবার প্রথম শর্তই হল আত্মসমর্পন)

যাই হোক বুকে পাথর চাপিয়ে নিজেকে সিভিলিয়ান রূপী কুকুর ঘোষণা করে জাঠ ভাইকে বললাম যে ভাই শুধু এই কৃতকর্ম নয় সারা পৃথিবীর সমস্ত রকম অন্যায় অবিচার অনাচারের জন্য আমি ক্ষমা চাইলাম। অন্য কথা ভাবতেই পারতাম বিশেষত সে যখন সাদা স্যান্ত্রোর পিছনে আমার লাল স্পার্কের চুম্বনের খরচ নেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল তখন তো প্রায় ভেবেই নিয়েছিলাম ষোলো বছরের বিরহ যাক চুলোর দোরে। পুলিশে এবং সরকারী সামরিক ক্রিয়াকলাপ সম্পূর্ণ করেই তবে নিঃশ্বাস নেব। আমার সরকারী অফিসের চৌহদ্দির মধ্যেই যদি আমারই এমন অবস্থা হয় তাহলে রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষ কি অবস্থার মুখোমুখি হয় দিবারাত্র। সাধে কি আর লোকে কেজরিওয়ালের ওয়ালে নাম লেখাতে উঠে পড়ে লেগেছে? সে যতই তার রাজ্য চালানোর ক্ষমতায় প্রশ্নচিহ্ন থাকুক না কেন। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনউষ্মাকে কাজে লাগিয়ে।

যাই হোক, যে কোনভাবেই হোক, কেটে যাওয়া দুটো কানকে জুড়ে নিয়ে বাড়ি ফিরেই রওনা দিলাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে। বাক্সপ্যাঁটরাদের এতদিনের জন্য ছেড়ে যাব ভেবেই কেমন মনে হচ্ছিল। কিন্তু প্রকাশকের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা বলে কথা।

শিয়ালদা রাজধানীর খাবার দাবারের অবস্থা দিনে দিনে সঙ্গিন হচ্ছে। যাই বলুন না কেন, “সবই ব্যাদে লেখা আছে!” বলে কাটান দেওয়া লেগেই ছিল। সত্যিই ট্রেন সফর যদি এতই হ্যাঙ্গাম হয় তাহলে আর সরকার বদলেই বা কি লাভ হয় বলুন দেখি? সাধারণ মানুষের তো আগাতেও কাটা হয় আর গোড়াতেও!

তবুও সহযাত্রীদের দৌলতে আমার শহরে এসে পৌঁছলাম আর কোনরকমে নাক মুখ চোখে দুটি গুঁজে ছুট লাগালাম সৃষ্টিসুখের স্টলে।

রোহণ আর নিরুপম দা আর রূপঙ্কর দা আর দেবজ্যোতি দা আর ইন্দ্রনীল দা আর অতনু আর অমিতাভ দা, দোয়েলপাখী আর সন্দীপন আর কিশোর দা আর সুমেরু দা, পিনাকী আর অর্ঘ্য দা,আর উল্কা আর বৈজয়ন্ত দা, আর অরুনদা, দীপ্তি দি পেরিয়ে পার্থ, শুদ্ধসত্ত্ব। আহা বইমেলায় মেলা বই থাকলেও চোখ মেলে মন মেলে আড্ডা দেওয়া যায়।

রোহণ আবার নিজের ডাইরি হারিয়ে এর ওর পাতা থেকে নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল কিন্তু শেষ রাতে সেটাও ফিরে পেল। মাহরুফ গল্প শোনালো দিল্লির বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন তাকে নাকি ডিস্কাউন্টের উপর ডিস্কাউন্ট লাগিয়ে বইয়ের চেক নিয়ে যেতে বলেছে। আমি আবার আশ্বস্ত করলাম যে কোথাও কিছু ভুল টুল হয়েছে। মাঝে মাঝেই বেরিয়ে বুড়িয়ে এলাম এপাশ ওপাশ থেকে। মিলন মেলার সর্বোদ্দীপক যজ্ঞে নিজেকে এতদিনে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঙ্গ মনে ভেবে নিতেও ভাল লাগছিল। নিরুপম দা আবার আমায় সেলিব্রেটি বানিয়ে ছেড়ে দিলেন। উল্কা এসে তার বিজিটোনের সমালোচনা পড়ালো। (আমার অবশ্য মনে হল, উল্কার লেখা পড়ে তার ভাল লেগেছে বলে সামনা সামনি দেখবে বলেই গাল পেড়েছে। কিন্তু উল্কার মতে অন্যথা!)

বই আর আলো আর মেলা আর খাবার দাবার। তার মাঝে রসভঙ্গ করতে চোঙা মুখো মাইকরাও আছে। তবে সব মিলিয়ে যে জাঁদরেল পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে তা দেখে মন্দ লাগছে না।

তবে কোলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে অচেনা অজানা লোক ফিসফাস নিয়ে যাচ্ছেন দেখেও আরাম হল। দিল্লি তো নিজের জায়গা। কিন্তু সিংহের গুহায় যদি নেচে আসতে পারি তবেই কি না আমিও সিঙ্গি!

পাঠক পাঠিকারা, ফিসফাস ২ ও ১ ভরপুর কিনুন সঙ্গে কিনুন নতুনদের জন্য নতুন বই। সৃষ্টিসুখে দৃষ্টিসুখ আর মিষ্টিমুখ করতে চলে আসুন মচমচিয়ে ৪৫৭ নং স্টলে। কাল রোববার বন্ধুবান্ধব ক্রেতা বিক্রেতা নিয়ে মোচ্ছব করতে প্রস্তুত হচ্ছি। উফ কি যে উত্তেজনা হচ্ছে মাইরি। পুরো সাতদিন বইয়ের ধুলো চাটব। দিল্লিতেও এই সৌভাগ্য হয় না যে।

প্রয়োজনীয় পুনশ্চঃ দোয়েলপাখী আর অমিতাভ দা আমার হাতে এসে রসাতল দিয়ে গেল। আমার ভাইটার শেষ লেখা ‘রাণীকাহিনী’। কিছু কিছু সুখ- দুঃখ শেষ হয়েও শেষ হয় না যে। কি যে করিস না! রুলায়গা কেয়া পাগলে?

ফিসফাস-২ ও ফিসফাস-১ পাওয়া যাচ্ছে কোলকাতা বইমেলার সৃষ্টিসুখের স্টলে (স্টল নং ৪৫৭)

low_res - Copy (2)

(১২২)

পুরনো কয়েকটি ঠাকুরবাড়ির মাথা ছুঁয়ে টুনিবাল্বগুলো সূর্যের দোলাচলের সুযোগ নিয়ে বোধহীন ভাষায় টুপটাপ করে যাচ্ছে। তিস্তা তোর্সা এক্সপ্রেসের বাঙ্কে ঘুমচ্ছিলাম, একজন কুলি এসে বলে গেল যে সরস্বতী পূজো এসে গেছে। বসন্ত না আসুক বসন্ত পঞ্চমী এসে গেছে। দুটো ব্যাগ টেনে শিয়ালদা স্টেশনে নামলাম। অপ্রাকৃতিক আলোগুলোর কাছে গুটি কয় মানুষ যেন ক্ষীণ হয়ে গেছে। জগত সিনেমার কাছাকাছি এক ট্যাক্সিওলা যেচে বাড়ি পৌঁছে দিতে এসে ‘কিছুই নয়’ এমন মুখ করে বলল, ‘একশো টাকা দিয়ে দেবেন!’ রাস্তা পেরতেই অন্য একটা ট্যাক্সির দেখা মিলল- ‘নো রিফিউজাল’। সে বলল ‘পঞ্চাশ’ আমিও বললাম, ‘পঞ্চাশ!’ ব্যাস বসন্ত পঞ্চমী এসে গেছে।

এই দিনটায় বাবা ভোরবেলায় উঠে আলপনা দিত- ঠাকুর সাজাত। মা আর অন্যান্য মহিলারা ফলপাকুড় কাটাকুটি আর পুজোর যোগাড় যন্ত্রে হৈহৈ করত। পাঁচটা পাঁচে বাড়ি পৌঁছে দেখলাম দুজনেই ঘুমচ্ছে। সন্তপর্ণে কড়া নাড়া শুনতে পেল না। গলা তুলে ডাকতেই, তিন ভুবনের পার থেকে সিগনাল এল, দরজা খোলার। বাবা মা এখন সরস্বতী পুজোর সকালে ওঠে না। আমাদের বাড়িতে সরস্বতী পুজো হয় না তা বেশ কিছুদিন হল।

প্রত্যেকটি ক্ষতিই জীবনে কিছু না কিছু ক্ষত বয়ে আনে। নিজস্ব ক্ষত। বছর আটেক আগে আমার ভাইয়ের পড়াশুনো শেষের সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের বাড়িতে সরস্বতী পুজো হয় না। আর এখন সেই তো নেই।

তবু আমি আছি! ষোল বছর পর সরস্বতী পুজোতে আছি আমি। আজকের দিনটায় দেখি কি ভাবে কি করতে পারি। তবে আমার সরস্বতী পুজো কাল হয়ে গেছে।

ইন্সপেকশনের কাজে মানসিক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য মালদায় সালেহা মেমোরিয়াল স্কুল গিয়েছিলাম! বহুদিন ধরে সরকারি সহায়তা তাদের প্রতি বিমুখ। যদি রিপোর্টের ভিত্তিতে কিছু হয় তাই উপোষী মুখের শিক্ষক শিক্ষিকা আর শিশুদের মায়েরা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
P1150176

নেতাজী সুভাষ বঙ্গজীবনের গুটিকয় অ্যাডভেঞ্চারের অঙ্গ। আমরা ছোটবেলাতে বিশ্বাস করতাম সুভাষ ফিরে আসবে। সুভাষ হয়তো ফিরে এসেছিল- হয়তো আসে নি। হয়তো তিনি সাইবেরিয়ার বাঘের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। রূপকথার লড়াই। গল্প শুনি, নেহেরুর প্রাইভেট সেক্রেটারীর সঙ্গে নাকি দেখা হয়েছিল তাঁর। ফিরে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন রাশিয়া থেকে। বাকিটা তো সাউথ ব্লকের গোপন নথিতে, কূটনীতিক সম্পর্কে আঘাত লাগবের পর্দার আড়ালে আত্মগোপন করে আছে। সরকার আসে সরকার যায়, বোফর্স আর সুভাষ কূটনীতিক সম্পর্কের আড়ালে ধুলো মাখে। পুরনো মৃতদেহগুলোকে সরিয়ে নতুন মৃতদেহ আসে। (এটা প্রতিদিন ক্রোড়পত্র থেকে নেওয়া- শেষ বাক্যটি!)

তবুও স্কুলের অনুষ্ঠানে প্রায় দুশো মানসিক এবং শ্রবণিক অসমর্থ বাচ্চাগুলোর সামনে যখন নেতাজীকে নিয়ে বলতে উঠলাম, কেন জানি না মনে হল- এদের কাছেও সুভাষকে এনে ফেলতে হবে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন তাঁর সন্তান বিধানসভা সদস্য ঈশা খানকে। এও যেন রূপকথার নায়ক। বঙ্গ জীবনের বৃহত্তর অঙ্গ রাজনীতির মধ্যেও বহিরাগত। আজ দাঁড়িয়ে ভাবা যায় কেউ বলছে যে আমার পার্টিরও কেউ যদি হাঙ্গামা করে তাহলে পুলিশের কর্তব্য তাকে গ্রেফতার করা। সীমান্ত অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক টেনশন মুক্তির জন্য ঘোষ এবং চা’ মণ্ডলদের দুই পাণ্ডাকেই গ্রেফতার করান ভোটব্যাঙ্কের তোয়াক্কা না করে।

অবশ্য মালদায় গনিখান চৌধুরী যা করে গেছেন তাতে তাঁর উত্তরপুরুষরা অন্ততঃ পঞ্চাশ বছর করে খেতে পারবেন, রাজনীতি করে। এতদিন পরেও সকলেই একবাক্যে স্বীকার করলেন মালদার প্রবাদপুরুষের সমাজ সেবার কথা। সরকারি কাজকর্ম সেরে রওনা দিলাম গৌড়ের উদ্দেশ্যে। শুরুতেই অবশ্য গৌড় পেরিয়ে সীমান্ত- কোতোয়ালি গেট, বিএসএফ চেকপোস্ট, নো ম্যান্স ল্যাণ্ড আর ‘বাংলাদেশে স্বাগত’ হোর্ডিং। একবার ভুটান সীমান্ত পর্যন্ত গেছিলাম ওয়াগায় যাওয়া হয় নি। এটাই আমার সদ্য সদ্য বিদেশ ভ্রমণের ঘোল। দুপাড়ের সবুজ আর সোনা রঙ কিন্তু একই মনে হল। মনগুলো বোধহয় আলাদা হয়ে গেছে। নাকি হয় নি! রাজনৈতিক মন্তব্যের স্থান নেই। কূটনীতিক অবস্থান নড়ে যেতে পারে, তাই।
P1150203

P1150205

মালদার সবকিছুই গৌড়ের নামে। বিশ্ববিদ্যালয়, গেস্ট হাউস, ট্রেন, বিড়ির দোকান, ফ্লাইওভার এমনকি ইঁটের নামও গৌড়। গৌড়ের ইঁট তুলে নিয়ে এসে শতশত গ্রাম শহরের বাড়ি তৈরী হয়েছে। এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে অতীত বৈভবের কাহিনী। স্বাধীনতা সংগ্রামের আগে বাংলা বলে যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে সে শশাঙ্কের গৌড়, পাল বংশের, বল্লাল- লক্ষ্মণ সেনের গৌড়, সুলতানি গৌড়ের প্রতিপত্তি।

কেন্দ্র সরকার থেকে নাকি চেষ্টা করা হয়েছিল, লক্ষণ সেনের কোষাগারের সন্ধান করতে। তার বদলে প্রত্নতাত্ত্বিকরা যা খুঁজে বার করলেন তা হল বল্লাল বাটি। সেই ‘বোঝে না সে বোঝে না’-র গান, ‘কঠিন, তোমাকে ছাড়া একদিন’- এখানেই হয়েছিল। ইতিহাসের বুকে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি- এমন সময় দুটি বাইক এসে থামল! তারাও বোধহয় ইতিহাস খুঁড়তে এসেছিল। কিন্তু আশাহত হল, ‘পাঁউরুটির কারখানা’ দেখে! আমার সঙ্গী ড্রাইভার আমাকে বোঝাতে গেলেন, “পড়াশুনো করে নি তো, তাই!” ইতিহাসের গৌরবেও (নাকি গৌড়বে!) আঁচ লাগতে দেয় না গৌড়বাসী।

P1150210
P1150222

এগিয়ে গেলাম জাহাজ ঘাটার দিকে মহানন্দার মরা খাতের পাশে জাহাজ ঘাটের ইতিহাসের থেকে মন টেনে নিল, পয়রা গুড়ের গল্পে। এক গ্রামবাসী অসমর্থ খেজুর গাছে দাগ দিয়ে হাঁড়ি বসাচ্ছেন। রাত পোহালে সূর্যের ছোঁয়া লাগার আগেই তাকে নামিয়ে ফেলে জ্বাল দিয়ে ফেলতে হবে। তারপর? অমৃতের সন্ধান অমর্ত্যদের জন্য!
P1150229

P1150231

ফিরে আসতে আসতে চামকাটি, চিকা, লোটন মসজিদ পেরিয়ে কদম রসুল মসজিদ। হজরত মহম্মদের পায়ের ছাপ। আর তার কিছুটা দূরেই রামকেলী গ্রামে চৈতন্যদেবের পায়ের ছাপ। ধর্ম কর্মের পথচলা পায়ে পায়ে ধুলোয়ে এক হয়ে মিশে যায়।
P1150254

P1150248
বারো দুয়ারি- দুয়ার বারো কিন্তু উন্মুখ এগারো। একটি দূর থেকে চম্পার মতো তাকিয়ে থাকে এগারো ভাইয়ের দিকে।

সন্ধ্যা নামে, অতীত ‘গৌড়’বের বাংলার সূর্য কি সত্যিই অস্তাচলে যাচ্ছে? জীবনের সর্বক্ষেত্রে রাজনীতি ত্যাগ না করতে পারলে কিন্তু তাই হয়ে যাবে হয় তো।

ছোটবেলায় বাড়ির পুজো ছাড়াও সুখস্মৃতি ছড়িয়ে আছে স্কুলের দেওয়ালে দেওয়ালে। ঠাকুর আনা ফল কাটা, পুজো করা, মাঞ্জা দেওয়া আর শেষমেশ ধুতি পরে ক্রিকেট। বঙ্গজীবনের ভ্যালেন্টাইন্স ডে এখন টাকের মতন স্মৃতি নিয়ে আছে এপারে ওপারে।

আমাদের ক্লাব নারকেলডাঙা সাধারণ সমিতির এক পুজোয় বাজারের দায়িত্ব ছিল আমার। পঁচিশ কিলো আলু আর তিরিশ কিলো ফুলকপি দু কাঁধে চাপিয়ে ফিরেছিলাম শুধুমাত্র মুটের দশটাকা বাঁচানোর জন্য। একা হাতে এক হাঁড়ি দধিকর্মা মাখা। আর গোটা সেদ্ধ। আজ রাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চক্করে দিল্লি কখন গিয়ে পৌঁছব জানি না। তবে কালকে গোটা সেদ্ধ তো খেতেই হবে। আর আর নারকেলে কুল? বাজারে বাজারে সেগুলো তরমুজের মতো বড় হয়ে পেকে গিয়ে কুমড়ো হয়ে যাচ্ছে আর আমি বসে আছি সরস্বতী পুজোর অপেক্ষায়। ছেলেবেলার সংস্কার বলে কথা। নারকেলে কুল নাকি সরস্বতী পুজো না হলে খেতে নেই। তাই সই।
P1150181

আজ দুপুরে হয়তো একবার স্কুলে যাব- আর একবার বইমেলার মাঠে যাব। ষোল বছর পর- এখন বইমেলাই তো আমার কাছে সরস্বতী পুজো হয়ে গেছে। ফিসফাসের কাছেও। আপনারাও আসবেন কিন্তু ৪৫৭ নং স্টল। সৃষ্টিসুখ আর ফিসফাসের জন্য! সরস্বতী বানান কি বলুন দিকি? নইলে লবডঙ্কা!

(১২১)

আমার ভাগ্নেবউ এসেছিল দিল্লি, তাদের গ্রুপ রণনের সঙ্গে। পাঠক পাঠিকারা, এই কারণেই স্টিফ আপার লিপেরা আঙ্কল আর আন্টি দিয়েই ম্যানেজ করে। অ্যামেরিকানরা তো আরও এককাঠি উপরে যায়। তারা বাবাকে ওল্ড ম্যান আর বাকিদের স্রেফ নাম দিয়ে ডেকে দেয়। স্রেফ বাঙালীরা মন দিয়ে ধারাপাত আর পারিবারিক গাছের সাহায্য নিয়ে সঠিক সম্পর্কগুলিকে সম্মান করে চলে। আমার জাঠতুতো পিসতুতো ভাগ্নে ভাইপোগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি স্যাম্পেল আমার থেকে এট্টু বড় বা সমবয়সী আছে। একমাত্র বাঙালীরাই বুঝতে পারে এই সমস্যাটা, বাকিদের সূক্ষ্মবুদ্ধিতে এসব ধরা পড়বে না।

সরকারী চাকুরীর পরীক্ষায় টেস্ট অফ রিজনিং-এ একটা প্রশ্ন হামেসাই থাকত। বল দেখি খোকা তোমার মামার শ্বশুরের মামাশ্বশুরের মামাতো ভাইয়ের মাসতুতো নন্দাই তোমার কে হয়? আমরা খুব প্যাঁচ কষে টসে বলতাম সে আমার ভায়রাভাইটাই হয়। এই রকম আর কি! তো আমার ভাগ্নে আর ভাগ্নেবউ ব্যাপারটাও সেইরকমই। আমার বাবা এবং মা উভয়ই নিজের নিজের পরিবারের কনিষ্ঠতম/ তমা! ফলে যা হবার তাই হয়েছে। আমার ছেলে তবু বৌদি বললে ঠিক ছিল, মেয়েকে দেখিয়ে যেই ভাগ্নেবউকে বলেছি যে এ তোমার ননদ, সে তো হাঁউমাউ করে উঠেছে, “অ্যাই তুই আমায় কাকিমা ডাকবি!” আর মেয়ে তো সবে সবে মুরগী কিভাবে ডাকে তা শিখেছে, ফলে সেও চটপট বলে উঠল, “কঁক কঁক”!

সে সব থাক, মুদ্দে কি বাতে আসি। রণন একটা সাংস্কৃতিক দল, বিভিন্ন জায়গার সংস্কৃতিবান মানুষদের নিয়ে তাদের কাজকারবার। এখানে এসেছিল বিক্রম আয়েঙ্গারের একটা পিস নিয়ে, যার কোরিওগ্রাফি করেছেন প্রীতি আত্রে। সে এক অদ্ভুত পরিবেশনা! খোলা লনে বর্গাকার ক্ষেত্র তৈরী হয়েছে, আর হয়েছে সেই বর্গক্ষেত্র থেকে দর্শক পর্যন্ত আসার একটি পথ। সীমারেখা নীল রঙ এবং বর্গক্ষেত্রের বাইরের অংশটুকু বালি দিয়ে ঢাকা। শুরুতে শুধুমাত্র শরীরের ঊর্দ্ধাংশ দিয়ে শুরু হল দর্শকদের সঙ্গে পারফর্মারের মানসিক সংযোগ। তারপর সমস্ত প্রপ্স এবং লনের প্রতিটি উপকরণ যুক্ত হল সেই প্রকাশে। শেষ হল কত্থক ও ধারাভাষ্য সমেত। শুরুতে দর্শকদের অধরা থাকলেও ধীরে ধীরে নীল ও হলুদের মিশ্রণে আকাশের নীচে সবুজ বালিয়াড়ির মধ্যে সেই পারফরম্যান্স ধরা দিল উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে। মন্ত্রমুগ্ধতা বোধহয় এক শব্দে প্রকাশ করার পক্ষে কমই।

সে যাই হোক, তারপর মিয়াবিবি গিয়ে হাজির হলাম ইন্ডিয়া হ্যাবিটাটের ক্রাইম লেখকদের মিটে। ব্যোমকেশ, ধৃতিমান চ্যাটার্জী, রজিত কাপুর আর দিবাকর ব্যানার্জী পেরিয়ে সেদিনের রাত্রিটা শেষ হল পিপলস থিয়েটারের ‘ওহ নেহি গান্ধী’ নাটক দিয়ে।

দিল্লির বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহগুলির হলভাড়া যখন আকাশচুম্বী, তখন বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের মুক্তধারা হলটি বিশেষতঃ দিল্লির বাঙালী নাটক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক গ্রুপগুলির কাছে ক্যারাবিয়ান দ্বীপের মতই মনোরম ও সহজলভ্য।
সোমবার অবশ্য অন্যদিন ছিল, যদিও অফিশিয়াল কাজকর্ম নিয়ে বিশেষ কিছু বলার থাকে না। তবুও সোমবার আমার হাজিরা ছিল দিল্লি হাইকোর্টে অফিশিয়াল একটি কোর্টকেস সম্বন্ধীয়। যাদের কোর্ট সম্পর্কে অভিজ্ঞতা আছেন তারা খুব ভালো করেই জানেন যে, সিনেমার কোর্টরুম আর বাস্তবের কোর্টরুমের মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য। কিন্তু নাটকীয় উপাদান তো সর্বত্রই থাকে। যেমন সোমবার সমগ্র আদালতের সামনে ‘আর্লি হিয়ারিং’-এর অনুরোধ আসা একাধিক আবেদনে জাজ মহাশয় উল্লেখ করলেন দিওয়ারের সেই অমোঘ ডায়লগ,

‘যাও, যাকে হর উস আদমিসে এনওসি লেকে আও, যিস নে ভি আপকা অরিজিনাল ডেটসে প্যাহলে হোনেওয়ালি হিয়ারিং কে লিয়ে পেসেন্টলি ইন্তেজার কর রাহা হ্যায়।’ কেয়াবাত! ফাটা পোস্টার নিকলা হিরো। অপর একটি কেসে বিচারকই আর্গুমেন্ট করতে লাগলেন, ‘ধরে নিচ্ছি আপনি যা বলছেন সেটাই ঠিক! পরে কিন্তু বলবেন না ওটা নয় সেটা! যাই হোক, তাহলে ‘এ’-র অর্থ হচ্ছে ‘বি’; আর ‘সি’ হল গিয়ে ‘ডি’?’ ব্যাস উকিল নিজেই ঘাবড়ে গিয়ে না না, হ্যাঁ হ্যাঁ করে একসা কাণ্ড। সে যাই হোক, এমনিতে আমরা সরকারি উকিলকে বেশী টাকা পয়সা দিই না বলে সে নিজে খুব মন দিয়ে কেস লড়ে না বলে বদনাম করি বটে, কিন্তু সঠিকভাবে উকিলকে ব্রিফিং করলে যে কত সহজে কার্যোদ্ধার হয় তা আমার কেসটিতেই পরিস্ফুট হল। কেস ডিসমিস করিয়ে অফিস থেকে দ্রুত ফিরে এলাম পার্শ্ববর্তিনী আর ভাগ্নেবউকে নিয়ে বাড়িতে। তারা এতদকালযাবত দিল্লি ভ্রমণ করছিলেন, কিন্তু ভাগ্নেবউটির ট্রেন ধরার ছিল। তবে কুয়াশায় মোড়া দিল্লিতে তো ট্রেনও ধরা দেয় না দেয় না। (আচ্ছা এতক্ষণ ধরে খালি ভাগ্নেবউ ভাগ্নেবউ করে যাচ্ছি! তা তার কি কোন নাম নেই? জয়তী জয়তী)

যাই হোক, কুয়াশার চক্করে সাড়ে চারটের শিয়ালদা রাজধানী ছাড়বে সাতটা চল্লিশে। আমার বাড়ি থেকে মোটামুটি চল্লিশ মিনিট লাগে। তাই মোটামুটি ছটা কুড়িতে বেরবো বলে গড়িমসি করতে করতে গাড়ি নিয়ে যখন বড় রাস্তায় পড়লাম তখন গাড়ির ঘড়ির কাঁটাটা আরও কুড়ি মিনিট গড়িয়ে গেছে।

পাঠকও/ পাঠিকারা, একটু যে চাপ হয় নি তা নয়। বিশেষত অফিস ফেরত রাস্তা। সন্ধ্যায় কতটা খালি থাকবে সেই প্রশ্নও ছিল। কিন্তু দেখলাম মেয়েটি অতটি ঘাবড়ায় নি! তার দুটি কারণ হতে পারে, হয় সে একেবারেই ঘাবড়ায় না, অথবা দিল্লির রাস্তাঘাট এবং সর্বোপরি দূরত্ব সম্পর্কে সঠিকভাবে ওয়াকিবহাল নয়। যাই হোক, যখন অর্ধেকের বেশী রাস্তা বাকি আর ঘড়ির কাঁটা ৭টা ৭এ পৌঁছে গেছে, জয়তী জিজ্ঞাসা করেই ফেলল, সত্যি করে বলো দিকি ঠিক কতটা সময় লাগবে? আমি বেমালুম বলে দিলাম আধঘণ্টা! সে দেখি তখনও হিসাব কষছে কালকের ফ্লাইট কোনটা পাওয়া যেতে পারে! বাপরে!

তাকে প্রবোধ দেবার সময় সেই গল্পটা শোনালাম, যখন আমার ছেলে ছোট ছিল আর দেড় ঘন্টা আগে থেকে ট্রেন ধরার জন্য বাড়ি থেকে বেরতে গিয়ে তার খাবার ফ্লাস্কটা অসাবধানতায় ফেটে গেল আর বেরতে বেরতে সাড়ে তিনটে বেজে গেল আর রাস্তার আটটা রেডলাইটে দাঁড়াতে দাঁড়াতে অটোচালক এবং কুলির সহযোগিতায় এএস ফাইভে উঠেই দেখলাম ট্রেন ছেড়ে দিল।

আর তারপর পার্শ্ববর্তিনীর সেই গল্প। জার্মান বন্ধুদের নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে প্ল্যাটফর্ম নম্বর তেরোয় ঢুকে দেখল, সামনে দিয়ে প্ল্যাটফর্ম নং এগারো থেকে ট্রেন ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এসব বলতে বলতেই দেখলাম। কঠিনতম রেডলাইটটা সবুজ হয়ে গেল আর আমি মনস্থির করে জয়তীকে বললাম, ‘সিটবেল্ট প্লিজ!’ আর তারপর অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিলাম, চাকা ঘড়ির কাঁটার থেকে জোরে ঘুরতে লাগল। আর কি আশ্চর্য রাস্তার যানজটও যেন সময়ের গুরুত্ব বুঝে পথ ছেড়ে দিল। যখন জয়তী ট্রেনে চড়ল তখনো এগারো মিনিট বাকি ট্রেন ছাড়তে।

ফেরার পথে পার্শ্ববর্তিনী আর ভাগ্নে দুজনকেই ফোন করে বললাম, দ্যাখ ভাই নিজের ট্রেন হলে চিন্তা করতাম না। কিন্তু এটা একে সরকারী, তারপর ভাগ্নের বউয়ের। তাই জ্বর দিয়ে তো ঘাম ছাড়লই।

যাই হোক, মাঝে সাঝে এই মধ্যবয়সী অ্যাডভেঞ্চার নাহলে জীবনটাই কেমন যেন পানসে মেরে যায়! কি বলেন? হেঁহেঁ!