(১৬২)

 

সাধারণতঃ আমি নাগরিক হিসাবে বেশ ভালো। নিয়মানুবর্তিতা এবং নির্দেশানুসারে চলাটা একদম রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। এতদিনের সরকারি মুটেগিরির এফেক্ট বলতে পারেন। চট করে খাঁই মাই করে প্রতিবাদ না করে আগে দেখার চেষ্টা করি ব্যাপারটা কি। বিশেষতঃ সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্র ভিতরে থাকলে তো বটেই।

১৭ বছর হয়ে গেল সরকারি ঠিকানায়, লোকে বলে সরকারি চাকুরেগুলো নাকি ফ্রিতে বিষ পেলেও তা খেয়ে নেবে! তারা আরও বলে, সরকারি কর্মচারীদের কাজ করতে হয় না! ‘আসি যাই মাইনে পাই, কাজ করলে ওভারটাইম পাই’! একজন সরকারি কর্মচারীর দিনপঞ্জী লিখতে গিয়ে এটাই মোটামুটি ট্র্যাডিশন ধরে নেওয়া হয় যে সে এগারোটায় অফিস যায়, ছেলে হলে দুটো ফাইল নাড়িয়ে চা খেতে বসে মহিলা হলে উল বুনতে বসে। দুপুরে লাঞ্চ দেড় ঘন্টা তার পর এক কাপ চা খেয়ে বাড়ি। ভালো কথা! যুগ যুগ ধরে সরকারি চাকুরেরা ইম্প্রেশনটা সেইরকমই করে রেখেছেন বলেই না এসব কথা!

আবার নদীর এপারের গল্পও আছে, সরকারি চাকর হবার জন্য নাওয়া খাওয়া ভুলে সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা অব্ধি ঘস্টানো, মন্ত্রী বা আমলাদের পা চাটা, ঘাড়টাকে তলপেট পর্যন্ত নুইয়ে তাদের মনমর্জিমাফিক ল্যাজ নেড়ে যাওয়া, না পারলেই কম্ফোর্ট জোনের বাইরে ছুঁড়ে ফেলা। এরপরেও কাজ করলেও একই মাইনে কাজ না করলেও! বরং যারা কাজ করে, ঘাড় সোজা রেখে কাজ করে তাদের ধরে ধরে মাঝেই তুর্কীর ক্যুতে চুকিতকিত খেলতে পাঠানো হয়।

যাকগে পাঠক পাঠিকারা, উপরের হাবিজাবিগুলো স্রেফ ভুলে যান! আসুন কালকের গল্পে নামি! দেখুন হামি গরীব আদমি আছে! তাই ডব্লিউএইচ প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে পারব না। কেন কবে কি বৃত্তান্ত! কিন্তু ঘটনা হল, বিকলাঙ্গ সশক্তিকরণ বিভাগের অ্যাক্সেসেবল ইন্ডিয়া ক্যাম্পেনের জন্য একটা সুপার বাইক র‍্যালি সংঘটিত হল রবিবার। আর তাতে ভর সকালবেলায় সাড়ে চারশো সুপারবাইকার তাদের ন্যুনতম ৫০০ সিসির সুপারবাইকের ১০০০ ওয়াটের হেডলাইট জ্বালিয়ে ঢ্যাকঢ্যাক করতে করতে ইন্ডিয়াগেটে এল আর গেল! আর হুজুগে পাবলিক সেলফি তুলে তুলে হয়রান হয়ে গেল।

ও হ্যাঁ মন্ত্রী আর আমলাদের সঙ্গে ছিলেন দেশের অন্যতম ‘সুপারস্টার’ বিবেক ওবেরয়। সবাই বিশাল বিশাল মানুষ। এদের ভিড়ে আমি থাকি টাকি না! নিজের কাজ করে টুক করে সরে পড়ি। এবারেও আমার দায়িত্ব ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ডঃ হর্ষবর্ধনকে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে ব্রিফ করা এবং তাঁকে অন্ধের যষ্টির মতো এস্কর্ট করে নিয়ে আসা। হর্ষবর্ধন অতীব অমায়িক ব্যক্তি। তাঁকে ব্রিফ করার সময়ও চুপ থাকেন, তাঁকে ক্যাম্পেনের টিশার্ট পরবার জন্য অনুরোধ করলেও মেনে নেন। আর চ্যাংড়া চামচার দল যখন বারফট্টাই করে কাউকে ভোর সাতটায় তার ইয়ার দোস্ত ‘মন্ত্রী’র সঙ্গে দেখা করাতে আনে তখনও হাসিমুখে মেনে নেন। এমনকি অতিরিক্ত উত্তেজিত কোন সহনির্দেশক, অনুষ্ঠান মঞ্চের দিকে ডাক্তারবাবুর যাবার সময় যদি ধাক্কা মেরে চলে যায় তাহলেও কিছু বলেন না এবং সেই সহ নির্দেশককে রীতিমতো বকাঝকা করে যদি ডাক্তার বাবুর এসকর্ট ডাক্তারবাবুর কাছে ক্ষমা চাওয়াতে বাধ্য করে তাহলেও হাসিমুখে তা মেনে নেন।
কিন্তু সকলেই তো সেরকম হয় না! সরকারী ক্ষেত্রে লুকানো কারণ সর্বত্র থাকে! কে কোথায় কার নম্বর বাড়াচ্ছে সে সব জানিয়ে কি করব বলুন! শুধুমাত্রা নিজেকে মাঝে মাঝেই এই পৃথিবীতে বড়ই অপাংক্তেয় বলে মনে হয়। উদ্দেশ্য বিধেয় কিস্যুটি খুঁজে না পেয়ে কেমন যেন ম্যাদামারা ভ্রমণ করছি! উদ্দেশ্যহীন, বিধেয়বিলীন!

সে যাই হোক, তারপর একটা লম্বা মিটিং সামলে বাড়ি ফিরলাম সাড়ে তিনটে। এবারে পার্শ্ববর্তিনীকে নিয়ে একটু ইডলি উডলি উহু করতে গাড়ি নিয়ে বেরোলাম। আনন্দবিহারের দিকে যাচ্ছি! রাস্তা একদম গড়ের মাঠ! ফ্লাইওভার চড়লাম! রেডিওতে একটা বেশ চ্যানেল হয়েছে ১০৭.২ কাছের দূরের পুরনো গান ফান দেয়। তাতে স্বপ্নো কি রাণী চলছে আর পার্শ্ববর্তিনী পাশে বসে। কি ইয়াইয়া মৌসম! ফ্লাইওভার থেকে নামলাম!

হঠাৎ দেখি চার পাঁচটা কচি কচি পুলিশ ছুটে এল! আমি ভাবলাম সিটবেল্ট পরে চালাচ্ছি না বলেই বোধহয়। যাও গচ্চা যাবেই! কিস্যু করার নেই! মুড খারাপ করব না ভেবেও জিগালাম! কি কেস ভাই? বলে কি ওভারস্পিডিং? অ্যাঁহ বলে কি? আমার নাইন্টিন ফর্টি টু আ লাভস্টোরির শেভরোলে স্পার্ক মডেল, যেটা একাশিহাজার কিমি ড্যাংড্যাং করে চলে গেছে সেটা ওভারস্পিড করছে? মেজাজটা একটু ইয়ে হল বটে তাও জিজ্ঞাসা করলাম কত? বলে একাত্তর! লাও গজা! খালি রাস্তায় ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় একাত্তর? জিজ্ঞাসা করলাম স্পিড গান কই? আর লিমিট কত? বলে স্পিড গান ক্যামেরায় লাগিয়ে ফ্লাইওভার থেকে নেমেই লাগানো আছে! আর লিমিট পঞ্চাশ। মাজাকি পায়া হ্যায়! দশ বারোটা পুলিশ আর আমি একা! দে ঝাড় দে ঝাড়! ইয়ে তো জান বুঝকে ফাঁসানে কি তরিকা!

কিছু করার নেই স্যার সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! লাও ব্যাটা যখন সোমবার আটটার সময় আনন্দ বিহার দিয়ে যাবার সময় পাঁচশো অটো আর টুকটুক দাঁড়িয়ে থাকে আর আট লেনের রাস্তাটাও কাশীর পেয়ারের গলি হয়ে যায় তখন তোমাদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ কোথায় যায় হে? উত্তর নেই! আমি বললাম, না হে এগুলো তোমরা বাড়াবাড়ি করছ! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! ইচ্ছে করে ফাঁকা রাস্তায় স্লোপে টঙে তুলে ক্যামেরা লাগিয়েছ। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! সাধারণ মানুষকে বিবস্ত্র করার এটা নতুন পন্থা। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! শেষে বলে কি লাইসেন্স সিজ করবে! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! লাও ঠ্যালা! সু নাগরিক হবার ট্যালা বোঝ! সুপ্রিম কোর্টের আদেশ! ওকে ওকে! বুঝেছি! চিৎকার করছি, এরই মধ্যে পার্শ্ববর্তিনী বেরিয়ে এসেছেন। আর তাঁর সেই বরাভয় মুর্তি দেখে মামারা গেছে ভয় পেয়ে! বলে ‘ম্যাডাম আপ বৈঠিয়ে না কুছ নাহি হুয়া!’ আমি বলি কুছ নাহি হুয়া মতলব? লাইসেন্স তুমি নিয়ে নিচ্ছ আর কুছ নহি হুয়া? তবুও তারা দেখি রা কাড়ে না! তা ম্যাডাম বললেন, যা করার একটু তাড়াতাড়ি করতে! লাও! তারপর তিন পাতার একটা চোথা ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তিন মাস পরে নিয়ে যাবেন! কিস্যু হবে না!

কেমন ভেবলে গেলাম! পুলিশও এমন অমায়িক ভাবে গ্যাঁট কেটে নিল? সাতজন ছিল অধিকাংশ জাঠ গুর্জর! স্বচ্ছন্দে আমাকে মাটি ধরিয়ে দিতে পারত! কিন্তু এমন একটা মাটির মানুষের মত ব্যবহার করল যে আমিই কেমন মাটিতে মিশে গেলাম! ফাইন দিয়ে লাইসেন্স দিয়ে তিনপাতার ক্রোড়পত্র নিয়ে গাড়িতে যখন এলাম পার্শ্ববর্তিনী গচ্চার হিসাব চাইলেন! বিরস বদনে বলিলাম চারশো! কিন্তু বিকেলের মুডটার দফারফা করে চলে গেল শুধু মাত্র লাইসেন্স নিয়ে!

লাইসেন্সের শোক ভোলার জন্য আজ সকালে যখন গ্রেটার নয়ডা হাইওয়ে ধরেছি ছেলেকে স্কুলে পৌঁছোবার জন্য তখনও বাধ্য নাগরিকের মতো ওডোমিটারের কাঁটায় চোখ রেখে চলেছি! ফ্লাইওভার থেকে নামতে গিয়ে পঞ্চাশের নিচে গতি নিয়ে আসতে কালঘাম ছুটে গেল! তাও ছাড়লাম না! তারপর ক্রিকেট মাঠের আম্পায়ারের মতো ব্যাটসম্যানের দিকে নজর দেবার আগে দেখে নিচ্ছি নোবল হচ্ছে কি না!

পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার রাস্তা। প্রতিটি লুকনো ক্যামেরার হিসাব নেওয়া হয়ে গেছে বস! খোঁজ খবর নিয়ে রাহাজানি করতে হলে আমাকে জিজ্ঞাসা করে নেবেন! বিলকুল ফাস্টোকেলাশ গাইডের কাজ করে দেব। তবে কিনা রাহাজানি বাটপাড়ি এসবই বেআইনি কাজ! আর কে না জানে, অন্ততঃ এখন তো জেনেই গেছেন যে। ঘাড়টায় এমন মালিশ হয়েছে, যে আইনের দাস হয়ে নিজেকে সুনাগরিক প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লেগেছি।

তবে কি না এতো পথ দুর্ঘটনা হচ্ছে হামেশাই! না হয় একটা লাইসেন্স তিন মাসের জন্য সরকারি মেহমাননওয়াজির জন্য পাঠিয়েই দিলাম! পুলিশ তো আমায় তুললো না! আমার লাইসেন্সটাকে আলতো করে তুলে নিল! লাইং সেন্সটাই কমে যায় যাতে, আর লাইনে আসার সেন্সটা বাড়ে! আমেন!

(১৬১)

ফিসফাসের বাজার এখন বেশ খারাপ। কিছু না ঘটলে ফিসফাস আসে না, আর ঘটনার জন্য চাতক পাখির মত হা পিত্যেশ করে বসে থাকতে হয়। না হলে জীবন একদম বর্ষাকালের নালার জলের মতন চলেছে। নড়েও না চড়েও না! ড্যাব ড্যাব করে একই ভাবে তাকিয়ে থাকে।

সে যাই হোক, আমি সাধারণতঃ কোন বিরূপ অবস্থায় পড়লে খুব বিচলিত হই না বলেই মনে হয়। খৃস্টজন্মের আগে একটা জোক চালু ছিল সেটা খুব খুব ইন্সেনসিটিভ এবং সেক্সিস্ট। তবে মোদ্দা কথা হল যখন উপরঅলার মার পড়ে তখন চুপ চাপ হজম করে যান, পারেন তো এনজয় করুন! চিল্লিয়েছেন কি মরেছেন! তখন জ্বালা বেড়ে জালা বেয়ে গড়িয়ে পড়ার সামিল হবে।

যাই হোক, সরকারি আদেশে যেতে হল হায়দ্রাবাদ, তাও ভর রবিবারে। টু পাইসের জিন্দেগী। তাতেও যদি শনি রবিবার মারা পড়ে তাহলে তো কেয়াব্বাত। কিন্তু কা করস্মি! পেট কা সওয়াল বাওয়া। যাই হোক দেখে শুনে ঠিক করেছিলাম যে সন্ধ্যায় যেটা যায় সেটা মনে হয় ড্রিমলাইনার! কম সে কম ভাল ছিনিমা টিনিমা দেখা যায়। নিজের পছন্দমতো! কিন্তু সে গুড়ে উচ্ছের রস! কৈসে?

তাইলে শুনুন! নির্দিষ্ট সময়ে বেশ কিছু আগে গিয়ে টপাটপ সিট বেছে বসার বাঞ্ছায় চেকিন করতে গেলাম! বললাম উইন্ডো দে, নাই! বললাম ফ্র্যাজাইল ট্যাগ লাগা, নাই! আছেটা কি মামা? আছে আছে, টেলিপ্যাথির জোর আছে। ড্রিমলাইনারে উঠে গেনু ৩৩ ডি সিট! বসে সবে দু চারটে ফাস্টোক্লাস ফিলিমকে ঝারি মেরে রেখেছি! ওবাবা আম্রিগি তেলেগু হরেকিষ্ণো পার্টি হাজির হল! তাদের মোট সাতজন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে! আমাকে বলল দয়া করে উয়াপানে উঠে যাবা? আমি আর কি বলি! আসলে মনটা আমার ভালো! তা সরে গিয়ে বসলাম ৩৩এইচে! এক পাশে একটা কচি হরেকিষ্ণো আর ডান দিকে এক ঘুমন্ত ভদ্রলোক। কিন্তু গে দেকি ও বাবা! স্ক্রিন চলে না! লাও! কচি হরেকিষ্ণোর স্ক্রিনটাও চলছিল না! কিন্তু প্লেন ছাড়তেই শুরু হল চলা! আমারটা সেই ট্যালট্যালে পদ্মপাতার জল! নড়েও না চড়েও না! কচিটি আমার সঙ্গে চোস্ত আম্রিগা উচ্চারণে গপ্প করল! (আমারটা অবশ্যই পাতি ইণ্ডিয়ান বাঙালি ইংলিশ) আর মাঝে মাঝে চিল্লিয়ে মা মাসি পিসিদের সঙ্গে ট্যান তেলেগুতেও গপ্প করল। কিন্তু আমার নজর তো তার স্ক্রিনের দিকে তাতে কষে টম আর জেরি চলছে কিন্তু সে গড়াচ্ছে সিটময়। কি আর করব একখান বই নিয়ে গেছিলাম, তাই খুলেই টাইম পাস করতে লাগলাম। ঘুমিয়েও পড়লাম!

ঘুম ভাঙলে দেখি এক ঘন্টা হয়ে গেছে আর খাবার সার্ভ হচ্ছে! স্লার্প করে জিভ শুকিয়ে নিয়ে বললাম ‘ননভেজ’! বিমান ললনা বলে, ‘নেই’! কেমন ভিতরটা আমসি মতো হয়ে গেল! খুব গম্ভীর মুখ করে বললাম, স্ক্রিনটার সঙ্গে চিকেনটাও নিয়ে নিলে মা! (মা? বলেছি নাকি? না মনে হয়!) দয়ার শরীর! ছুটে গিয়ে কোথা থেকে একটা এনভি লেখা প্যাকেট এনে ধরিয়ে দিল! তাতে চিকেন টিক্কা আর খান তিনেক সাইলেন্সার লাগানো প্যাটিস আর সিঙ্গারা! খাবি কি চুষেই হড়কে যাবি!

কিন্তু বিপদ হল অন্যত্র। পাশের তেলেগু বৈষ্ণব বাচ্চাটি খাচ্ছিল জৈন ফুড। মানে শুকনো আলু টিক্কি আর ঘুঘনি! সে আমার চিকেন টিক্কা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, হোয়াটস দিস? আমি বললাম! জিজ্ঞাসা করল কেমন খেতে! সত্যি বলছি মায়া লাগল! বললাম অতি জঘন্য! কিন্তু নন ভেজিটেরিয়ান বলেই চিবোতে হচ্ছে! আমার দিকে করুণার চোখে তাকালো!

খাবার শেষের পরে বসেই রইলাম বসেই রইলাম! চল্লিশ মিনিট পড়ে এসে থালা ফালা সাফ করে নিয়ে চলে গেল! কফি বা চা? বাপি বাড়ি যা! কফির কাপটা বোধহয় ডিজাইনার পারপাসে রেখেছিল।

শেষে আধপেটা খেয়ে এয়ারপোর্টে নামলাম কিন্তু গাড়ি কিছুদূর গড়াতেই হেইসান খিদে পেয়ে গেল যে, দ্রুতগামী রাস্তা পেরিয়ে আটার বিস্কুট নিয়ে এসে চিবোতে হল।

সত্যি বলতে কি অভিযোগ খুব যে করি তা নয়! তবে এয়ার ইণ্ডিয়াকে বছর পাঁচেক আগে যিনি গাধার গুহ্যদেশে ঢুকিয়ে দিয়েছেন তাঁর জন্য অনেক চেষ্টা করেও আশীর্বাণী বর্ষণ করতে পারলাম না! এয়ার ইণ্ডিয়া ছেড়ে এখন আবার তিনি ভারতীয় ফুটবল সংরক্ষণের কাজে লেগেছেন। মিউজিয়ামে পাঠাবার জন্য আর কি!

যাই হোক, দুই দিন কাজের কাজ সেরে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছি! তবে দুখানা ছিনিমা যা ঝারি মেরে রেখেছিলাম, তা ডাউনলোডে বসিয়ে এসেছি! কাল পরশু ছুটি আছে! সদ্ব্যবহার করতে হবে না?

ও হ্যাঁ! একটা প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ খুব দ্বিধায় আছি জানেন, একজন সংবেদনহীন অনাদিঅপ্রাপ্তবয়স্ক হাফসেঞ্চুরিসম্পূর্ণকৃত বৃষস্কন্ধ নিজের ইগো এবং বুদ্ধিহীনতা দিয়ে আমাদের মোহিত করে রেখেছেন। কিন্তু বক্স অফিসে তো তাঁরই জয়জয়কার! আলপিন টু এলিফ্যান্ট যে কোন বিষয়ে তিনি যথেষ্ট মন্তব্য করে পার পেয়ে যান! আর আমরা শুকনো ছোলাভাজা চিবিয়ে হরেকৃষ্ণ গাই! তবে কি জানেন তো! আরামকেদারার সামাজিক ক্রিয়াকলাপকে বাস্তবে নামাবার সময় বোধহয় এসেছে। অন্ততঃ নিজ জীবনে, তাই চিনি খাওয়া কম করছি মশাই! ক্রীড়া সংক্রান্ত সিনেমা খুবই পছন্দ হলেও দু-তিনশো কোটিতে আরও একটা দুশো টাকা যেন কিছুতেই যুক্ত করতে মন চাইছে না! তাই বেবি কো বেস পসন্দ নেহি হ্যায়! বিলকুল নেহি হ্যায়!

(১৬০)

অবশেষে… অরিন্দম কহিলা বিষাদে
কুম্ভকর্ণের ঘুমঘোর ভাঙিল সখেদে
ফিসফাস দিল ডাক কলিকাতা বুকে
যার মাঝে কৈশোর গিয়েছিল চুকে।
ফি বৎসর একবার রাজধানী চড়ি
অম্লজান আহরণ ফিরিয়াছি করি…
ব্যাস আর পারলাম না দাদা! অনেক দূর টেনে দিয়েচি। তবে কথাটা হল, এই যে এতদিনের হিয়াটাস বা অজ্ঞাতবাস, তা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম সেই কোলকাতা নিয়েই। বস্তুতঃ কম দিন তো হল না! নিজদেশে প্রবাসী হয়ে আছি। দিল্লির লাড্ডুতে পাক দিচ্ছি। থেকে থেকে কোলকাতার মুণ্ডপাত করছি। কিন্তু কেন জানি না শহর কোলকাতা আমাকে রসে ডুবিয়ে রাখে। সেই মাছি ধরার ফাঁদের মত! গল্প তৈরী হয় রাতে গল্প তৈরী হয় দিনে। আর তার পরই চলে আসে ফিসফাস!

তা হলে আর দেরি কেন? নেমে পড়ি ময়দানে!

সেই শনিবার দুরন্ত থামল কোলকাতার বুকে। শিয়ালদহ থেকে বাড়ি হয়েই আড্ডা! ছেলেটাকে বইমেলাতেই বেশ পছন্দ হয়েছিল! বলল এখন আছি মুর্শিদাবাদে! কিন্তু থাকব শনিবার! ডাক দিলাম চলে এল! কলেজ স্ট্রীট কলেজ স্কোয়ার! বাপুরে কি ভিড়! আড্ডা তো পগার পাড়। না কফি হাউসে ঠাঁই না প্যারামাউন্টে পাই! তাতে কী? দেলখোশ আছে না? কব্জি ডুবে জায় কভারেজে আর আঙুল ডোবে না চায়ের কাপে! আড্ডা দিয়ে ফিরে আসার সময় বলে আসলে আমার জন্মদিন! লাও! দিই ঠুসে একখান বই!

তাপ্পর আর কি? যেখানেই যাই নাই আর নাই! পুরনো কোলকাতার প্রদর্শনী! বৃষ্টি মাথায় সাড়ে বারোটায় ছেলে মেয়ে ট্যাঁকে! বলে চারটেয় খুলবা! লাও! রোববারের বাজারে গেনু পিটারক্যাট! বলে একঘণ্টা লাগবা! তাপ্পর আর ট্যাক্সিও নাই! একটাকে ধরে গেলাম আর্সেলান! সেখানেও পঞ্চাশ মিনিট। শেষে সিরাজে পাকে চক্রে ঢুকে পড়ে মাখনের মতো মাটন বরায় দাঁত চোবানো! বিরিয়ানিগুলোও আছে ঠিক ঠাক। ঠিক যেমনটি থাকার কথা… ডিম, আলু, মাংসের টুকরো, স্নেহ, মশলা, কেওড়া জল আর মোলায়েম প্রলেপে!

সে সব থাক! কফি হাউস ট্র্যাডিশন ট্র্যাডিশন! নিডস বিগ চেঞ্জ বস! ঠাণ্ডা কফি যেন টই টই পুকুরের জল! গরম কফি যেন ইক্ষুমোরন! আহা ইনফিউশনে যদি চিনি না থাকত! বাবি আর গুড্ডুকে জিগাও! কেমন লাগে কভারেজ চিকেন?

সে সব কথাও থাক। বরং বলি অন্য গল্প! পরের রোববার হক্কালে পার্শ্ববর্তিনী বাক্স প্যাঁটরা সহযোগে রওনা দিল জামশেদপুর। কায়দা মেরে আইআরসিটিসি থেকে বুক করলাম খাবার। মন আমার আর আরেক ঠাঁই থেকে। মন আমার খুশ করে দিল, কিন্তু চিকেন ফ্রাইড রাইস শত ফোনেও এল না। বললাম অর্ডার ক্যান্সেল করান! বলে মেল ঢেলে দিন (মেল ডাল দিজিয়ে)। দিলাম ঢেলে! আকাশ থেকে এক মুঠো মেঘ ধার নিয়ে! তা দেড় সপ্তাহ হয়ে গেল কোন জবাব নেই! অথচ ওলায় ওঠার পর ভুল করে চল্লিশ টাকা পার্কিং ফি নেওয়ায় তা সঙ্গে সঙ্গেই ফেরত পেলাম সেই দিনই। সরকারি ফস্কা গেরো! ব্যায়াম কর রে ভাই!

এছাড়া আরও কত কি! ট্রাম বাস ঠেলা টেম্পোর শহর এখনও সেই রকমই রয়ে গেছে। আধবোজা চোখের আধো আধো রোমান্স। বৃষ্টি আসবেই ধরে চাতকপাখিরা হাঁ করে থাকে সূর্যের পানে। গণ্ড দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ে। ভিতরের ঠাণ্ডা আর বাইরের গরম মিলে ক্যাটাভরাস।

IMG_1818.JPG

নকুড় নন্দীর সন্দেশ, ঘোষ ব্রাদার্স- দ্বারিক- গাঙ্গুরামের বেকড চমচম- সাব্বিরের রেজালা- রয়ালের চাঁপ- নিজামের কাঠি রোল আর জিলেট জিলেট জিলেট। নরম মসৃণ গালের মতো স্মৃতিরা নেমে আসে বুকের উপর।

আচ্ছা দক্ষিণ কি আমার দুয়োরাণী? চিরন্তন উত্তর দক্ষিণ লড়াই পেরিয়ে আজ তো দক্ষিণেও আমার বন্ধু কুটুম আত্মীয়রা ছড়িয়ে আছে! তাহলে দক্ষিণে রোমান্স নেই? গড়িয়াহাটার মোড়, রাসবিহারী, গলফ লিঙ্ক, আনোয়ার শা, গোলপার্ক, বচ্চনের ধাবা, ঢাকুরিয়া, হাজরার মোড়, আদিগঙ্গা আর ন্যাশনাল লাইব্রেরী!

জাতীয় গ্রন্থাগার? আরিব্বাস! তারা সাড়ে তেরোর ডাচ আর কোরীয় ভাষার ভক্তকে উপদেশ দেয় হার্ডি বয়েজ পড়তে আর অনেক খুঁজে পেতে একটা বই চাইলে বলে ‘জামাই ষষ্ঠী’! তার থেকে তো বাইরের জঙ্গলটাই ভাল! কি সুন্দর পরী নামে সেখানে, গাছের ঝুরি বেয়ে- কাঠবিড়ালীর আঁচড় বেয়ে ছায়া ঘনায় পথের প্রান্তে।
আর আছে পোলাপান! দুইখান! তারা রাতে জাগে! আলো দেখলেই একজন বলে ‘পাঁচ মিনিট’ বলে ঘুমিয়ে পড়ে! আর একজন বলে, ‘কি মজা সক্কাল হয়ে গেছে! উঠে পড় সবাই!’ বলে ঘুমিয়ে পড়ে! তা তারা এখন নিজ নিজ দায়িত্বে বড় হচ্ছে। শহর কোলকাতা তাদের আপন নয়! কিন্তু তবু যেন কোথায় একটা নাড়ির টান তৈরী হচ্ছে!

যাই হোক তিনখান গল্প বলে এই সব হাবিজাবি শেষ করি!

এক
ঘনাদাকে ফোন করলাম, কিভাবে যাব? বইয়ের দাম দিতে হবে! বলল বাস অটো আর হরির দোকান। পৌঁছলাম। গিয়ে আড়াইশো টাকা দিতে গিয়ে খুচরো উপর করতে হল! সব বড় নোটের বাহার! আড্ডা মেরে এবার যাব বাসু দার কাছে! কদ্দুর? এই তো দমদম সাতগাছি থেকে বাস ধরে মিল্ক কলোনি! বাহ বাহ!

কিন্তু পকেটে পাঁচশোর রাজত্ব। সঙ্গে একটা পাঁচ টাকার কয়েন! দুটো বাস বলল পাঁচশোর খুচরো নেই! হাঁটতে থাকলাম! ট্যাক্সি? খুচরো নেই! আরও হাঁটতে গিয়ে কেলেঙ্কারি! চটির পটি গেল খুলে! লাও ঠ্যালা! হাঁটতে থাকলাম! মুচির দেখা নেই! কোলকাতায় সবাই রোববার ছুটি মারে নাকি? শেষে দু কিমি হেঁটে কেষ্টপুর খালের বাঙ্গুর আর যশোর রোডের মাথায় পেলাম তাকে? কত টাকা? লাগাতে পাঁচ আর টেকাতে দশ! পাঁচই নাও ভাই! জুড়ে দাও! সর্বশ্রান্ত সর্বস্বান্ত হয়ে চটি সারিয়ে এগোতে লাগলাম! আরও এক দুই! গলা শুকিয়ে পাঁপড় টিশার্ট ঘাম গড়িয়ে ন্যাতা! স্টুডিওর ঘড়িতে সাড়ে বারো! দুটো বাস একটা ট্যাক্সি হাঁকিয়ে দিল! কোথাকার বেয়াদপ! খুচরো ছাড়া সওয়ারি হও! তাও রোববারের বাজারে! পাস দিয়ে এক এক করে আখের রস, ছাতুর সরবত, লেবুর সরবত সব বেরিয়ে যাচ্ছে! একটাও কোল্ডড্রিংসের দোকান নেই! ক্যাথলিন খোলা! ন্যাহ খোলা নেই হে! আড্ডা দিচ্ছেন তারা! জয়ত্তারা! লেক্টাউন যশোর রোড পেরিয়ে একটা মোড়ে পেলাম তার দেখা! আহা সশশীরে বর্তমান সহৃদয় সজ্জন! ফ্রুট জুস খাইয়ে পাঁচ শো টাকা খুচরো করে দেবেন তিনি! কিন্তু বললেন আমার কাছে তো মোটে চারশো ষাট হচ্ছে! কালিয়া… মানে তালিয়া! আরও একপিস ফ্রুট জুস দিন দাদা! তাপ্পর দুটো স্টপেজের জন্য বাসে উঠে গেলাম বাসুদার বাড়ি। বাসুদা শম্পাদিকে বলল ওকে একটা নয় দুটো লস্যি দাও! লাপিস লাজুলি লস্যি! সাদা টেট্রা প্যাকে নীল আঙ্গিকের আমূল ভালোবাসা ছড়ানো লস্যি! গরমের দুপুরে নরমের পরশ আহা!

সে যাই হোক। এবারে দুই
সরোজের সঙ্গে দেখা করতে ভর সন্ধ্যায় গেলাম ই-মল-এ! মল অত্যন্ত নোংরা শব্দ! কিন্তু ভিতরটা শব্দহীন ও পরিষ্কার। তার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেও মাঝে মাঝেই দরজা খুলে গিয়ে পিঠে হাওয়া খাওয়া যায়। তারপর হাঁটতে হাঁটতে র্যাালিজের কুলফি, নিজামের কাঠি রোল ঠেঙিয়ে সরোজের সৌমিতাকে নিয়ে হাজির হলাম ঔধ ১৫৯০!

মাঝে তারা কাকে সব ফোন করে বলল দাঁড়াতে পারব না! ভালো কথা! গিয়ে দেখি, বেশ একটা সুন্দর সুন্দর মেহফিল! আধো অন্ধকারের নরম আলো নষ্ট করে দিয়ে আধদামড়া আধকানা কোলকাতাবাসী, মোবাইলে আলোকিত হচ্ছে আর আর সেলফি মারছে। উপরে প্রদীপ আর নীচে সিন্দুক দেখে সৌমিতা বলল, ‘দীপক তিজোরি’। পুরনো জোকেও হেসে উঠল মেহফিল। নরম গলাওটি কাবাবের সঙ্গে রেশমি রুমালি! আর রান বিরিয়ানি। মশলার গন্ধ হাতে চলে আসে আর আসে নরম মাটনি তন্তু। মুখে দিলে একটা জবজবে ভাব থাকে বটে কিন্তু গলে যেতে সময় নেয় না। তবে চমকে দিল এক চাটনি। তেঁতুল দিয়ে রাঙালুর চাটনি! কেয়াবাত মিয়াঁ! সব কিছু মিটিয়ে বিল চেয়েছি! পরিবেশক গলায় গামছা দিয়ে বলে কমপ্লিমেন্টারি! আইলা টিকিট কমপ্লিমেন্টারি হয় শুনেছি! তা বলে আস্ত ডিনার? বলে না না উপরঅলা বলে দিয়েছে! আর সিসিটিভিতে নজর রাখছে! পয়সা নিলে পাপ হবে! সৌমিতা আবার ফোন ঘুরিয়ে জেরা করল কাকে কি বলেছিস! আমিও তাদেরকে জেরা করলাম কাকে কি বলেছিস! জানলাম ফোন গেছিল ঔধ-এর জন সংযোগের কাছে। ভ্যাবলার মত বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলাম, “হ্যাঁ গা তোমাদের আলুর গুদামে আবার কবে আগুন লাগবে?”

IMG_1850.JPG

 

আড়াই
অনেক খুঁজে পেতে গেলাম স্যান্টাস ফ্যান্টাসিয়া! গোলপার্কের লোকেরাই জানে না কিন্তু কসবার রূপঙ্কর সরকার জানেন যে বাঁশপোড়া চিকেন আর চালের রুটির সঙ্গে স্কুইড আর অক্টোপাসও পাওয়া যায় হেথায়! কিন্তু বিধি তো এখন জোট! যেখানে যাবি চোট খাবি! বন্ধু ফোন করে বলল আজ তো বন্ধ! তাই বসে বসে কফি চিবোন আর বচ্চনের ধাবায় গিয়ে রেশমি কাবাব চোষা!

শেষ পাতে একদিন গিয়ে মোহনবাগান মাঠে খালি পায়ে ঘাস জড়িয়ে ইডেনের সঙ্গে ভালোবাসা সেরে এলাম। ঝিরিঝিরি আকাশ সামান্য সময় রেয়াত দিয়ে পাশে দাঁড়াল আমার! ব্যাস খেল খতম! এবারকার মতন আর কি!

এই আর কি! কলেজের বন্ধু স্কুলের বন্ধু দীনের বন্ধু কৃপাসিন্ধু আরও সব এবারে দেখা না করতে পারা বন্ধুদের সঙ্গে থেকে দূরে চলে এলাম পরশু! আহা মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিও… ওগো আমার প্রিয়!

 

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ ফিসফাস কিচেন ছাপা হচ্ছে http://www.abasar.net-এ পড়বেন কিন্তু!

(১৫৯)

“খুদা ভি আসমা সে যব জমিন পর দেখতা হোগা
মেরে মেহবুব কো কিসনে বানায়া শোচতা হোগা…”

কন্টেক্সটের একেবারেই বাইরে কোটেশন কিন্তু তবুও যদি ধরে নিই প্রত্যেকটি মানুষকে উপরওলা নিজে হাতে করে বানায়, তাহলে কম বেশির দাঁড়িপাল্লাটা উনিশ বিশ হয়েই যায়।

প্রতিবন্ধী কথাটা আজকের দিনে আলাদা করে কোন অনুভূতি জাগায়? অনুকম্পা না সহমর্মিতা? দুর্বলের প্রতি অনুকম্পা নয় সহমর্মিতার প্রয়োজন। কিন্তু আপনার সহমর্মিতার সুযোগ যদি কেউ নেয় তাহলে? লাইনে আসি পাঠক পাঠিকারা তাহলে?

গতকাল দিল্লি বইমেলা সমাপন হল। বাণিজ্য- বিপণন- প্রচার- প্রসার- প্রভাবের দিক থেকে দেখতে গেলে সফলতম বইমেলা। কিন্তু ওই যে বলি না? টেবিলের এপারে থাকার উটকো ঝামেলা!

সেটাই কাল হল বটে! এক ভদ্রলোক আছেন বসন্তকুঞ্জে থাকেন! গানটান করেন বটে কিন্তু তার থেকে বেশী করেন ইষ্টুকুটুমি ঝামেলা। গতবছর বইমেলায় আবৃত্তি প্রতিযোগিতার ফলাফল ওঁর সুবিধার জন্য কেন সেদিনই ঘোষণা করা হবে না সেই নিয়ে সপরিবারে ঝামেলা করেন। ওঁর মেয়েটি বেশ ভালই আবৃত্তি করে বটে। আর ভদ্রলোকের পায়ে একটু অসুবিধা আছে।

গতকাল সবে পসরা সাজিয়ে বসেছি। ওবাবা আবার এসে হাজির এবং দেখলাম অন্যান্য আধিকারিক, যাঁরা ওঁকে চেনেন না তাদের সঙ্গে রীতিমত বিতণ্ডায় মত্ত। আপত্তিজনক কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন। কিন্তু খুব মিষ্টি করে। আমি ইশারা করলাম বাকিদের, ‘কাটিয়ে দাও’। কিন্তু ততক্ষণে কেউ একজন ওঁর কাঁধে হাত রেখে বলেছেন যে আপনি একটু ধীরে কথা বলুন না!

ব্যাস আর যায় কোথা! “আমার গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?’ এই সেই তুই তোকারি! তারপর হঠাৎ একজনকে নিজেই ধাক্কা মেরে পড়ে গেলেন। আর পড়বি তো পড় আমার স্টলেরই গায়ে। হুড়মুড় করে অক্টোনমের র্যােকে রাখা বই ঝরে পড়ল। বোর্ডে ফাটল দেখা দিল। আমি দৌড়ে গিয়ে বললামও, “আরে মশায় উঠুন! কি করছেন কি?” অকথ্য চিৎকার করতে শুরু করলেন। সঙ্গে স্ত্রী ও মেয়েকে এগিয়ে দিচ্ছেন! আমি ওনাকে তুলতে গেলাম তো, ঢ্যাপ করে পায়ে লাথি মারলেন! আমি সাবধান করছি এদিকে কেউ এগিও না। এ কিন্তু ঠিক প্রতিবন্ধকতার সুযোগ নেবে! তারপর ‘ওরে বাবারে মেরে ফেলল রে!” বলে নিজে গিয়ে স্টেজের সামনে শুয়ে পড়লেন।

মঞ্চে তখন ছোটদের অনুষ্ঠান শুরু হব হব করছে। সবাই প্রমাদ গণল। এমন কি কোলকাতা থেকে আগত পুস্তক বিক্রেতারাও অনুরোধ উপরোধ করতে শুরু করেছেন। বয়স্ক ব্যক্তিরা অনুরোধ করছেন। ‘তুইও প্রতিবন্ধী হবি’ ‘তোদের জেলের হাওয়া খাওয়াব’ ‘আমি মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছি’ ‘এই জন্যই ভগবান তোকে টাকলা করে দিয়েছে’, ‘তুই তাঁবেদার, তুই এই তুই ওই’। ইতিমধ্যেই পুলিশকে ফোন করে দিয়েছে।

পুলিশও এসে হাজির। কিন্তু পুলিশের অনুরোধেও সে নড়তে রাজি নয়। আইওকে আসতে হবে। আইও এসে পৌঁছল। ধর্মেন্দ্র কুমার! বয়স সাতাশ আঠাশ। এসেই রিপোর্টিং করতে লাগল। নাম এল আমার এবং আমার সম্পাদকের! আহা আমাদেরই তো চেনে সে! তবু সে নড়বে না! যতক্ষণ না আমাদের গ্রেফতার করা হবে। তার নাকি বেজায় লেগেছে। প্যারামেডিক্স না হলে সে স্ট্রেচারেও উঠবে না।

এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে, কোন আশ্বাস বিশ্বাসেও থামছে না। শেষে অ্যাম্বুলেন্স এনে তাকে পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হল আর আমাদের বলা হল তার স্ত্রী এবং মেয়ের সঙ্গেই থানায় যেতে। আইওর ব্যবহারেই কেমন যেন ইয়ে ইয়ে ঠেকছিল। পরে শুনলাম বইমেলার পুলিশ পার্মিশনের জন্য পঁচিশ হাজার টাকা চেয়েছিল। কিন্তু সবকিছু অনলাইন হয়ে যাওয়ায় তার কপাল পুড়েছে। তাই বাগে পেয়ে ভাল্লুকের মতো ঘেরবার প্ল্যান। আমাদের বসিয়ে রেখে সে হাওয়া। এদিকে সময় বেড়ে চলেছে। বিকেলে তিনটেয় এই সময়ের সুমন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা আছে বইমেলায় সে কি হবে কে জানে। আমার বড়শালীকে ফোন করলাম। তিনি বিধান দিলেন যে আবেদন লিখতে দুটি একটি তো ওঁদের বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ। এবং অপরটি কেন আটকে রাখা হচ্ছে তার কারণ জানানো! আইও এবার নিজমূর্তি ধরলে। বলে কিনা ৩৫৪ ধারা! মহিলাদের উপর অত্যাচার! আচ্ছা?

এদিকে আমার বড় শালী আসতেও দেরী হচ্ছে। আর অ্যাসোসিয়েশনের আধিকারিকদের টেনশন বাড়ছে। তাঁরাও এসে হাজির। তারপর আর কি? এদিক সেদিক থেকে ফোন টোন চলছে। মেলা প্রাঙ্গণ থেকে খবর চাইছে এবার কি হবে? এবার কি অনুষ্ঠান ইত্যাদি! হাসপাতাল থেকে খবর এল। খবর আনলেন ডাক্তারবাবুই! ডাক্তাররা পরীক্ষা করে ছেড়ে দিয়েছে। রিপোর্টও দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তিনি রিসেপশনেই শুয়ে আছেন। তাঁর এক্সরে হবে। আইও হেলতে দুলতে গেল রিপোর্ট আনতে। তিনঘণ্টা হয়ে গেছে। সময় কাটছে না। সেকেন্ড অফিসারকে জিজ্ঞাসা করলাম, “মশা হয় না?” “রাতে ঘুম হয়?” ফালতুকা আলফাল প্রশ্ন করে টাইম পাস করছি।

আইও ফিরে এল প্রায় পাঁচটায়। এসে বলে এখনও ছাড়া পায় নি! আর আমাদের নাকি জেলের ভিতর রাখা হবে! আমরা মচকাব না! ইতিমধ্যে এসএইচও এসে হাজির। হাজির সহসভাপতিও আর আমার বড় শালীও। তা এসএইচও বেশ ভদ্রই। তিনি আইওকে ডেকে মিষ্টি করে দাবড়ে দিলেন। আমাদের রিপোর্ট নিলেন! আর আইওকে দায়িত্ব দিলেন তদন্তকে ঠাণ্ডা বস্তায় ঢোকাতে।

আর আমরা হইহই করে ছুটলাম মেলা প্রাঙ্গণের দিকে। সেখানে তখন হইচই পড়ে গেছে। কে নাকি রটিয়েছে যে আমাদের গ্রেফতার করা হয়েছে! আর যে কি সব হয়েছে কে জানে!

যাই হোক আমি ঢুকেই ঘোষণা করলাম, “মাই নেম ইস সৌরাংশু সিনহা! অ্যান্ড আই অ্যাম নট আ টেররিস্ট!” আর কি দুজনেই কানহাইয়ার অভ্যর্থনা পেলাম! বই টই বিক্রি হল। প্রচুর আড্ডা হল। অনুষ্ঠান ধন্যবাদ জ্ঞাপন। ছৌনাচ আর চেন্নাইয়ের নাটক। তারপর? তারপর আর কি? রাত বারোটায় একে একে ময়দান ফাঁকা আর আমরা আবার সেই থোড় বড়ি খাড়ায় ফেরত। কিন্তু যে কথাটা আজ ফেবুতে ইংরাজিতে লিখলাম সেটাই আবার লিখি!

নাম নেওয়াটা আমার ঠিক আসে না। তাই এখানেও নিলাম না! তবে কি না! নিজের আপাত পিছিয়ে থাকাটাকে কেউ যদি অস্ত্র করেন তাহলে সব পিছিয়ে থাকা মানুষকেই কিন্তু অসৎ ভাববেন না। মনে রাখবেন সহানুভূতি নয় সুযোগ। অনুকম্পা নয় বিশ্বাস দরকার। একটু সুযোগ একটু বিশ্বাস পেলেই কিন্তু প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তারা বহুদূর এগিয়ে যাবে। আর যারা অসৎ অস্ত্র ব্যবহার করে? হেহ! কি যে কন কত্তা? কদ্দিন? পাবলিক কিন্তু জেনে গেছে! তাই সাধু সাবধান!

(১৫৮)

“You see, the whole country of the system is juxtaposition by the hemoglobin in the atmosphere because you are a sophisticated rhetorician intoxicated by the exuberance of your own verbosity…”

বুইলেন কিছু? আমিও না! আর বুঝে কি হবে। আজ সকালে তো আমি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মতো মুক্ত কচ্ছ হয়ে গেছিলাম কি না! মরেচে! ফিসফাস আবার দিল্লি বেলি ২ হয়ে যাবে নাকি?

খুলেই বলি তাইলে বলুন? না মানে খোলসা করেই বলি! আরে ধুর! মানে ওই ইয়ে আর কি! বিস্তারিত বিবরণ দিই।

হয়েছে কি! চলছে তো দিল্লি বইমেলা! আর বইমেলা মানেই তো মেলা বই আর হইচই আর সৃষ্টিসুখ। তা দিল্লি বইমেলায় কাজ ডবল! আমি টেবিলের ওপারেও আবার এপারেও! তাই গালাগাল খাবার জন্য গাল এগিয়ে দিই আর গালাগাল দেবার সময় মুখে কুলুপ! এমনই হচ্ছে যে যে সে এসে আমায় কয়ে যাচ্ছে “এই একটু হাস না?” আমি আর বলছি না যে পাতি তো কাকও হয়। আর এ তো খাঁচায় পোড়া সিংহ।

সে যাক আনসান বকে কি হবে! আজকের ঘটনায় সোজাসুজি আসছি!

আজ বিকালে বৃত্তের বাইরের বাঙালি (এটা অনিতা অগ্নিহোত্রীর কয়েনেজ আমার এই বৃহৎ বঙ্গ আর বহির্বঙ্গের বাজারে হেব্বি লেগেছে) কবিদের কবিতা ও কাব্যচর্চা নিয়ে আড্ডা। সবাই এক এক করে ঢুকছেন দিল্লিতে! সবার আগে এসেছেন সুকুমার চৌধুরী। কোলকাতার বাইরের কবিদের মধ্যে অন্যতম প্রধান এবং ভীষণ শক্তিশালী কবি! ভীষণ শক্তি বলে ভীষণ? একখানা ব্যাগ এনেছেন ভীমের বাবা দশরথেরও সাধ্যি নেই তোলে! না মানে ইয়ার্কি নয়! তাতে অবশ্য কবিতার বই ভর্তি। আর ভদ্রলোক বড়ই অমায়িক ও ভদ্র।

তা সক্কাল সক্কাল নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে ওঁকে প্রিপেড ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে আমি এপারে এসে নিজের গাড়ি উদ্ধার করতে যাবার আগে। এক কাপ চা খেলাম। আহা কি চা মাইরি! যেন আদার সঙ্গে ঘর্ষণে বাতাসা গলে জল হয়ে গিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

তা সে চা খেয়ে জিন্দেগি গম গাড়ির চাকায় চেপ্টে দিয়ে যতক্ষণে মেন রোডে উঠলাম ততক্ষণে সুকুমার বাবু পৌঁছে গেছেন সিআর পার্ক। বেশ কথা! আমি এগোতে লাগলাম নিজামুদ্দিন হাইওয়ে ধরে এমন সময় সুকুমার বাবুর ফোন।
– এই এরা তো বলছে রুম ১২টার সময় পাওয়া যাবে!
আমি বললাম, ‘সে কী? দিন দেখি লোকটাকে?’ আরে সে লোক তো সকাল থেকেই তেড়িয়া! বলে কোই ভি হো হাম বাত কিঁউ করে! যব হ্যায় তব হি দুঙ্গা! তা তাকে যতই বাবা বাছা করি! সে খেপেই যায়! আর এদিকে হঠাৎ ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক শুনতে শুরু করলাম পেটে! গুড়গুড় গুড়গুড়।

সম্পাদক মশায়কে ফোন করলাম! এমনিতে তিনি আমাদের মধুসূদন দাদা, অমৃত মন্থন না করেও হাতে এনে দিতে তাঁর জুড়ি নেই! কিন্তু সকালে খুব চাপ কেস! কেউ ওঠেই নি! তিনি ফোনের পর ফোন করছেন আর আমিও এদিকে করে যাচ্ছি! সুকুমার বাবু কিন্তু অত্যন্ত অমায়িক! ভাল ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করছেন দরোয়ানকে! যাই হোক ওয়েটিং রুমে একটু বসার সুযোগ করে দেওয়া গেল। কিছুক্ষণের জন্য! আর আমিও ময়ূর বিহার ফেজ টু-র কাছে। ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক এবার ড্রাম নিয়ে হাজির! গুড় গুড় দুম গুড় গুড় দুম। পেটের মধ্যে স্টার ওয়র্স শুরু হয়ে গেছে। লেজার সোর্ড নিয়ে যার যার ব্লিঙ্কস আর হ্যান সোলো আক্রমণ করেছে ডার্থ ভাডেরের গ্রহ।

ভাবলাম একটু থিতিয়ে নিই। সামলে নেব! এদিক আহমেদাবাদ থেকে আরেক মক্কেল এসে হাজির! তাকেও বললাম তুই ওখানে চলে যা ব্যবস্থা হয়ে যাবে! সে তার পরেও এসএমএস করে জিজ্ঞাসা করছে! প্রথমবার একা একা রাজধানীতে। একটু চিন্তা তো হবেই।

আমি আর কি করব! আমার পেটে তখন লঙ্গর রান্না হচ্ছে! ম্যারাথন দৌড়! বব বিমনের লঙ জাম্প! উসাইন বোল্ট! চাক দে ইণ্ডিয়া! ঘুর্ণি পিচ! বাইসাইকেল কিক! আরে থাম থাম! আর বলা যাচ্ছে না! লিখতে গেলেও চাপ লাগছে! ভর সকালে মনোরম বসন্তে আমি দরদর করে ঘামছি! নাকি কুলকুল করে ঘামছি! তাই ঠিক করতে পারছি না!

সম্পাদকের ফোন এল! একজন কর্তাকে ধরা গেছে! সুকুমার দার ফোন এল! আমি তো গরু হারিয়েছি মা!। ভাবলাম দেশের উন্নতি হচ্ছে না কারণ ওপেন ডিফেকশন এখনও কমে নি! চোখ বুলিয়ে দেখলাম রাস্তার ওপাশে পাঁচিলের ওপাশে একটা পার্কে কতগুলো ইয়ং ছেলেপুলে স্লিপের উপর সিট আপ দিয়ে পেটের পেশী শক্ত করছে। আবার পেট! উফ আমারটা পুরো রামদেবের মতো ঢেউ খেলিয়া যায় রে ঢেউ খেলিয়া যায়! একদম বিসমিল্লার মাইহার ব্যাণ্ড! আওয়াজ হচ্ছে সাবসোনিক! কেউ শুনতে পাচ্ছে না কিন্তু আমি এক মনে খালি গোপাল ভাঁড়কে গাল দিয়ে যাচ্ছি!

আর থাকতে না পেরে ইউএন-এর নিকুচি করেছে বলে পাঁচিলের এপারের জঙ্গলের দিকে এগোতে যাব। ও বাবা দেখি এক বেশ রহিস মহিলা নাদুস নুদুস করে তার নেড়ি নিয়ে টুক টুক করে সেখানে যাচ্ছেন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে কুকুর আর মানুষ এক ডাস্টবিন থেকে উচ্ছিষ্ট খেত। আর এখন তো বার করবে! কিন্তু মহিলা কেন রে বাবা! এসব স্থানে তো মহিলাদের যাওয়া বারণ! অন্তত পাবলিকালি! ছাতা কি আর করি নিজেকে নিজেই আরও জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম। এখন নয় মন্টাসোনা! এখানে নয়!

বিপদে পড়লে আমি ধরে নিই যে আমার আয়ু বিরানব্বই! এক্ষুনি টসকাব না! এই সময় দুঃসময় আজকাল বর্তমান সব কেটে যাবে! আবার গাছে গাছে পাখি শাখে শাখে পলাশের সমারোহ দেখা যাবে! আরে সে তো আজকেও দেখা যাচ্ছে। নরনারীরা স্বল্প সংখ্যায় জোড়ায় জোড়ায় বাইক চেপে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছে। আর আমি গাড়ির দরজা খুলে সমানে নিজের মন এবং পেটকে শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছি! যেন পেটের ভিতর দিয়ে টেন কমাণ্ডমেন্টসের রামেসিসের অশ্বারোহী রথ ছুটে যাচ্ছে।

দশ পনেরো তিরিশ! সমস্যার সমাধান দেখা যাচ্ছে! পেটের কষি আলগা করে সিটটাকে হালকা পিছনের দিকে এগিয়ে জয় মা বলে ভাসিয়ে দিলাম তরী। ইয়ে মানে গাড়ি! মানে ভাসাই নি! স্টার্ট দিয়ে দিলাম আর কি!

ময়ূর বিহার পেরিয়ে গাজীপুর ঘুরে আনন্দ বিহার! আরও কত দূরে আনন্দধাম আছে। আমি ইয়ে আমি উয়ে। আমি উরিবাবারে বাবা! আনন্দবিহার বাস আড্ডার সামনে মেট্রো কন্সট্রাকশনের জন্য জ্যাম! আর আমার পেটে রকেট ইঞ্জিনের শব্দ! এবার আরও চিত্তির! গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে ধাক্কা সামলাব তার জো নেই! মাঝ রাস্তায় টুক টুক করে গাড়ি চলছে। আমি আহ্লাদে ট্যারা হয়ে গেছি প্রায়।

চলে যাবে বসন্তের দিন চলে যাবে। দিস ক্লাউড উইল পাস ওভার আওয়ার হেডস। আহা ফাঁকা রাস্তা! উহু বাম্পার! ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে। ঘরের দোরগোড়ায় প্রায়! আমি তো শুয়েই পড়েছি সিটে! একদম ফর্মুলা ওয়ানের মতো শুয়ে গাড়ি চালাচ্ছি! পার্শ্ববর্তিনীকে ফোন করে দিলাম রাস্তা কিলিয়ার রেখো! পার্ক করে! হাই বাই বলে ঘরের ভিতর ঢুকে ঠাকুর ঘরে ঢুকে দরজা দিলাম! আর সশব্দে ফেটে পড়লাম সিংহাসনে! আহা কৃষ্ণ কৃষ্ণ! কৃষ্ণচন্দ্র হে!

বেরিয়ে এসেও আরাম নেই! ঢক ঢক করে দু গ্লাস জল খেয়ে তবে শান্তি! বাওয়া আর যাই হোক! এই শাস্তি যেন শত্তুরকেও না দেওয়া হয়! ওদিকে ম্যানেজারকে বোঝাবার জন্য সুকুমার দার ফোন বার দুই বেজে গেছে। তাকে ফিরে ফোন করলাম। দেশ কা ইজ্জত মা কা ইজ্জত বলে কোনরকমে একটা ঘরে ট্রান্সফার করালাম! সম্পাদক মহাশয়ও ফোনে জানালেন কর্তাব্যক্তিকে ধরা গেছে এবং তিনি তক্ষনি যাচ্ছেন। শান্তি! সব্যসাচীর ফোন এল মেলা কখন! আমি বললাম সে তো একটার পর। কিন্তু এ তো অন্য মেলা! আকাশে আজ রঙের মেলা! কি আনন্দ কি আনন্দ! ক্ষি আনন্দ!

All the world is a stage and you are merely a fellow safaiwala boss! আমেন!

(১৫৬)


পুরাকালের দেবতাদের ফেলে ছড়িয়ে চলাফেরা করার অভ্যাস ছিল। বিশেষত বিষ্ণুর। সতীর মৃত্যুতে শিবের মতিগতি দেখে সন্দিহান হয়ে উনি করলেন কি সতীদেহটিকেই একান্ন অংশে ভাগ করে ফেললেন। আর তারপর এদিক ওদিক ছুঁড়ে টুঁড়ে ফেললেন। ব্যোমভোলা শিব বেচারি বউয়ের বডিপার্ট খুঁজতে খুঁজতেই সব রাগ টাগ ভুলে গেল।

অমৃতভাণ্ড নিয়েও বিষ্ণুবাবু একই কাজ করেছিলেন। ভারত মহাসাগরে দেবতা আর অসুররা মিলে শেষনাগের মুণ্ডু আর লেজ ধরে টানা হ্যাঁচড়া করে অনেক কষ্টে অমৃত উৎপাদন করেছে। আর বিষ্ণুবাবাজীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যে লুকিয়ে লুকিয়ে অমৃতের কলসিটাকে সটান অমর্ত্যলোকে ট্রান্সফার করতে। কিন্তু বাবাজী তো কোন কাজই গুছিয়ে করতে অভ্যস্ত নন! প্রত্যেক যুগে একটা না একটা ঝামেলা বাঁধিয়েছেন। তা সে রাবণই হোক আর দুর্যোধন শকুনি। তাই চার জায়গায় ফেলতে ফুলতে কলসি নিয়ে গিয়ে গ্যারেজ করলেন।

মর্ত্যের মানুষ বরাবরই ন্যালাখ্যাপা! তা সেই সামান্য অমৃতের স্বাদ পেয়েই অমৃত কুম্ভের সন্ধানে শুরু করে দিল খোঁজ প্রয়াস। আর হরিদ্বার আর এলাহাবাদের ত্রিবেণীতে কুম্ভ আর শিপ্রা নদীর তীরে উজ্জ্বয়নীতে এবং গোদাবরী তীরে নাসিকে সিংহ রাশিতে হতে লাগল সিংহস্থ কুম্ভমেলা। নাম মাহাত্ম্য আর স্থানমাহাত্ম্য যাই বলুন। এই স্থানগুলি সাধারণ পর্যটকের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্র। কারণ খুঁজতে গেলে খুব বেশী দূর যেতে হয় না! মানুষ! পুণ্য অর্জন কি আর জল জঙ্গল দেবতায় হয়? সে তো মানুষের হাতেই মানুষেরই বুকেই খুঁজে পাওয়া যায়।

যাই হোক, এবারে ফিসফাসে ফিরে আসা যাক। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ইন্সপেকশনের কাজে মাঝে মাঝেই আমায় আমতলা থেকে বটতলা করতে হয়। এইবারে সুযোগ চলে এসেছিল এলাহাবাদ যাবার। একটা ইন্সপেকশন নোটিস এসেছিল বটে। কিন্তু সে তো কত কিছু আসে যায়। খেয়াল করি নি! ব্যাস এক রাতে হুকুম এলো কালকেই যেতে হবে। খেইচে! আমরা মধ্যবিত্তরা, বেশ হাতপা ছড়িয়ে সংসার করি! বললেই মশক কাঁধে ভিস্তির মত বেরিয়ে পড়তে পারি না! বাক্স প্যাঁটরা সমাজ দায়দায়িত্ব নিয়ে মাকড়সার মতো বাঁচা।

যাই হোক, সক্কাল সক্কাল উড়ে যাবার জন্য তৈরী হলাম। সঙ্গে এলাহাবাদের শুক্লাজি। শহরের ঘাঁট ঘোঁট জানেন বলে তিনিও আমার সঙ্গী হলেন। তা আমাদের জাহাজ হল নাইন্টিন টুয়েন্টির লজঝরে এটিএস। একবার ঢুকেছেন কি দু পা দিয়ে বহিঃপ্রকাশের কোন রকম ইচ্ছা চেপে ঠুসে রেখে দিতে হবে। একটা সবুজ পাতার কানওলা পাঁউরুটি আর আর মিশরীয় মমিদের সঙ্গী চকোলেট কেক দেবে খাবেন তো খান না হলে হাওয়ায় ভেসে যান।

হাওয়ায় ভেসে যাবার কথা বলতে গেলে যে কথাটা প্রথমেই মনে হল সেটা হল ওই প্লেনটা ভাসে কি করে হাওয়ায়? আছে আছে! প্রপেলার আছে! সে তো প্লেনের মুখের থেকেও বড় দুর্গার দশ হাতের মতো। আর লাগানের গোলি-র মতো পাঁই পাঁই করে হাত ঘোরাতে থাকে আর প্লেন লরি হয়ে আকাশে উড়ে যায়। সফর সঙ্গী ছিলেন জেনারেল বক্সি, যিনি কদিন আগেই ন্যাশনাল নিউজ চ্যানেলে সুখেন দাসের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ভাল লোক বোধহয় হবে। সারাক্ষণ ইংরাজিতে কথা বলে গেলেন আর ভারতীয় ব্যবস্থাপনার বাপবাপান্তও। তা যাই হোক। ভাল লোকদের কি আর কথা শুনে বোঝা যায়? দেশের জন্য কেন আমি আমার বউয়ের জন্যও বোধহয় সুখেন দাস হতে পারি না! (আমার কান্নাটা আবার রাজেন্দ্র কুমারের মতো! হেহে)

তা প্লেনটা শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে নামল এলাহাবাদ বিমানবন্দরে। বন্দর কোথায়? এ তো জেটি। ট্যাং ট্যাং করে হেঁটে হেঁটে গিয়ে ঘাটে উঠলাম। আর ব্যাগগুলো আমাদের পিছু পিছু ট্র্যাকটরে করে এসে পৌঁছল তারপর একজন পোর্টার দুহাতে করে দুটো করে ব্যাগ নিয়ে আসছে। আর হরির লুটের মতো সব লাফফ্যে ঝাপ্প্যে নিজের মাল কব্জা করছে। সে একেবারে দেখার মতো ব্যাপার।

ওহ! বক্সী বাবুর জন্য অবশ্য নিজস্ব বাহক ছিল! সে আবার ভারতীয়ই দেখলাম।

তা যাই হোক। সাড়ে তিনশো কম বেশী বয়সের ছেলে মেয়েগুলোর সঙ্গে ঘন্টা দেড়েক আড্ডা মেরে ফিরে এলাম হোটেলে। এই ইন্সপেকশনের এই একটা ভাল দিক আছে। অসাধারণ বাচ্চাগুলোর সঙ্গে সময় কাটানো! আর নিজেকে মানুষ হিসাবে আরও একটু সংবেদনশীল করে তোলা।

আমার সঙ্গের শুক্লাজি অবশ্য একটুতেই উত্তেজিত। ইন্সপেকশনের সময় হুড়ুৎ করে হাউঁমাউ প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন। আর ছেলে মেয়েগুলো ঘাবড়ে গেছে। আমি ওনাকে বুঝিয়ে বললামও! আস্তে লেডিজ! বাচ্চাদের পড়াশুনো জানার জন্য শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রশ্ন করুন! তাও শান্তস্বরে। সম্মানহানী কখনই নয়! হাজার হোক ১৯২৯ থেকে চলে আসা রেপুটেড স্কুল বলে কথা।
রাত্রে খাবার টেবিলেও অর্ডার দেবার পর পুড়ুক করে উঠে পড়লেন ওঁর পরিচিত কেউ ওঁর সঙ্গে এসেছে দেখা করতে বলে! আর আমি চিকেন টিক্কা একাই সাবড়ালাম!

যাই হোক, এ তো গেল কেজো কথা! কিন্তু আসুন এই অভিযানের অন্য পর্বে। যেখানে ভিতেরের চোখ আবার খুলে গেল।

ওই যে শুরুতেই গল্পটা বললাম না? ত্রিবেণী, প্রয়াগ, অমৃত, কুম্ভ, বিষ্ণু এসব? কদিন আগেই তো পৌষ মাসে হয়ে গেল এলাহাবাদের সঙ্গমে। যতই সঙ্গমের দিকে এগোতে থাকি। উত্তেজনার তুঙ্গের মতো খাড়া হয়ে আছে ফেলে যাওয়া তাঁবু আর পূর্বাগমনের স্মৃতিচিহ্ন। এখানে ওখানে রাস্তার ব্যারিকেড। ধুসর লোকারণ্য পেরিয়ে এলাহাবাদ কেল্লার ধারে। কথিত আছে আকবরের তৈরী এই কেল্লাতেই নাকি কোন এক গোপন কুয়োয় সরস্বতীর অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। কথিত কাহাবত তো বিজ্ঞানের ধার ধারে না! লোকায়ত কথন নিয়েই তার কারবার!

নদিতে নামলাম। নৌকায়। এ হল যমুনা নদী! এখানে গভীর হয়েছে তার বুক! ঘোলা জলে গভীর! গভীর কিন্তু স্রোতহীন। দূর থেকে দেখা যায় সঙ্গমের দিকে তীরবেগে এগিয়ে চলেছে সে কিন্তু এলাহাবাদ কেল্লার কাছে নিশ্চল। যেন উত্তুঙ্গ সঙ্গমের আগের দুদণ্ড জিরিয়ে নেওয়া। নৌকো এগোতে লাগল ত্রিবেণীর দিকে! ওদিকের গঙ্গা আর এদিকের যমুনা! সরস্বতী তো থেকেও নেই! না থেকেও আছে। আর আছে, অজস্র সাইবেরীয় সঙ্গমাভিমুখী সাদা ‘গাল’ পাখি। আর তাদের খাওয়ানোর জন্য নৌকায় পসরা সাজিয়ে বিপণী। কিনছেও লোকে ছবি তোলার জন্য। আজকের দিনে ছবি তুলতে তো পারদর্শিতার প্রয়োজন হয় না! শুধু মূল্যবান অ্যাণ্ড্রয়েডেই কাজ চলে যায়।

আর আছে একইমুখি সারি সারি যাত্রী ঠাসা নৌকা! সকলেই চলেছে পুণ্য অর্জনে। আবার একবার জেএনইউ, ক্যাম্পাস, পার্লামেন্ট, মলসংস্কৃতি, হাইরাইজ পার করে ভারতের সুগভীর বিস্তৃতি দেখে নিলাম। শহুরে বুদ্ধিদীপ্ত চাকচিক্যের পিছনে আছে এই আপাত রংহীন কিন্তু ভাবনায় রঙিন জীবনশৈলী! ভারতবর্ষ তো বাস করে গ্রামে গঞ্জে মাঠে ঘাটে এলাহাবাদ হরিদ্বারের সঙ্গমে মন্দির মসজিদে। যতই আমরা শিক্ষার দোহাই দিয়ে এই বিশালতাকে অস্বীকার করি না কেন। এদের কাছ থেকে ক্রমশই দূরে সরে যাওয়া ঘটে চলেছে প্রতিনিয়তই।

তফাত শুধু শিরদাঁড়ায় নয় হে কবি! মানুষে মানুষে ফারাক তার স্থান কাল পাত্র বিছিয়ে ভিন্নতাকে একত্রিত করে দূর থেকে দূরতর দ্বীপ হয়ে চলেছে প্রতিনিয়তই। অর্ধনগ্ন নারী পুরুষ কেশহীন নারী পুরুষ করজোররত নারী পুরুষ দেখে আমরা আত্মশ্লাঘা বোধ করতেই পারি যে এ আমি নই! কিন্তু ভীড় ভেদ করে উঠে দাঁড়িয়ে যদি আবার ভীড়েই মিশে যেতে না পারলাম তাহলে তো অভিমন্যুর শিক্ষা সম্পূর্ণ হল না!

সঙ্গমে পৌঁছে দেখলাম গঙ্গা এখানে অগভীর। যেন যমুনার সঙ্গে মিলনের অপেক্ষায় মাত্র! তারপরেই দ্রুত ছুটে চলেছে লোকালয়ের উপর দিয়ে সাগর সঙ্গমে। পথে কত শত পচাগলা ফুলমালা আবর্জনা বুকে করে বয়ে নিয়ে চলেছে সাগর অভিমুখে। বেশী নয়, দশ মিনিট! চুপ করে প্রত্যক্ষ করলাম উত্তর ভারতের শিরাস্রোতকে! প্রদীপ ভাসানো বা দুধের অঞ্জলি দানের অনুরোধ উপেক্ষা করে। প্রকৃতি আর স্বীয়র মাঝে কোন ফারাক নেই! নেই কোন দূরত্ব! শুধু অপার বিস্ময়!

ফিরে আসার সময় সঙ্গে ছিল এলাহাবাদের বিখ্যাত লাল পেয়ারা! কাশীর পেয়ারার মতো এর সব রঙ ভিতরে নয়! বাহ্যিক লালেই রসনা লালায়িত করে! আর ছিল কাঁচা ছোলা নুনে সেঁকে ছোলাভাজা! আহা আমার মতো ঘোর অঘোড়া যারা তাদেরও লালা নিঃস্বরণ ঘটাল সে।

আবার সেই লরি আর আবার সেই চাঁদমালার মতো প্রপেলার। আর কি আশ্চর্য এবারও সঙ্গে ছিলেন মেজর বক্সী! যাক আরে সবাইকেই তো সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে! এরই নাম তো ভারতবর্ষ! তাই না?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ মেয়েটার নতুন নতুন গানের শখ! সেদিন ভোরে দেখি ‘ওগো পুরবাসী’ গাইছে। কিন্তু ‘পুর’ গেছে ভুলে! তাই ‘ওগো বাসী’ “ওগো বাসী” বলে সুর ধরেছে। কিছুক্ষণ পরে মাঝে একটা ভাই ঢুকিয়ে দিল! ব্যাস তারপর সরগম তানপুরো, বেহালা, পিয়ানো, ঢোল করতাল সব বেজে উঠল একসঙ্গে সুরে সুরে। “ওগো ভাই বাসী” “ওগো ভাই বাসী”!

প্র পু১- ছেলেটা এখন দেখছি শখ করে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে সুর বাঁধছে “এভরি শা লা লা লা লা”। নিজে নিজেই! আহা ওর জীবনটাও যেন এতটাই সুরম্য হয়! আমেন!!
siberian-birds-ganga-3

(১৫৫)

বিশ্বাস করুন! আমি জানি রোববারের সকালে যদি কেউ কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে গল্প করতে আসে! বইমেলার ঘটনা টটনাও আমি চেপে রেখেছিলাম এদ্দিন ধরে! কিন্তু কাল গভীর রাতে যা ঘটল…
কাল পার্শ্ববর্তিনীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সুবোধ বড় গোপাল ছেলের মতো আমি ‘ডেডপুল’ দেখতে গেছিলাম। সিনেমা দেখে বেরিয়েছি! তখন রাত সাড়ে বারোটা। গাড়িটা নিয়ে একটা গোল চক্কর ঘুরতেই ‘ক্যাঁচ’ ‘হুড়মুড়’ ‘আহ আহ!’ আওয়াজ! গাড়ি পার্ক করে ছুটে গিয়ে দেখলাম আমার বেশ কিছু হাত দূরে একটি লোক পড়ে আছে ম্যাগির প্যাকেট, পিজ্জা, পেপসির বোতল আরও কিছুমিছু এদিক ওদিক ছড়ানো! আর তার সামনেই একটা বাইক একা দাঁড়িয়ে আর একটি লোক তাকে তোলার চেষ্টা করছে!

কে কাকে ধাক্কা মেরেছে? নাকি বাইক হড়কেছে? নাকি অন্য কিছু! এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই দৌড়ে গিয়ে সাহায্য করলাম। পেপসির বোতলটা গড়াগড়ি খেতে খেতে শক্ত হয়ে গেছে! পিজ্জাটা অটুট! ম্যাগিটা চানাচুরের মতো ছড়িয়ে গেছে! লোকটা উঠে দাঁড়াল! সঙ্গের লোকটি জিজ্ঞাসা করছে, আমিও জিজ্ঞাসা করছি! লোকটি বলল, পা ঠিক আছে, কিন্তু পশ্চাতে খুব ব্যথা! তারপর বাইকের দিকে তাকিয়ে বলল ব্যাকরেস্ট কিঁউ নেহী হ্যায়?
ততক্ষণে বিষয়টা অনুধাবন করেছি! সিনেমা দেখে ফেরা আরও কয়েকজন লোক এগিয়ে এসেছে! তারাও করেছে! এবারে উৎকণ্ঠার জায়গা নিল, ‘হো হো’ হাসি! আরে! একটা লোক পড়ে গেছে বা আহত হয়েছে আর আমরা হাসছি? কেসটা খুব করুণ মুখে বলতে গিয়ে সঙ্গী লোকটাও হেসে ফেলল! সঙ্গী লোকটি নীল রঙের বাজাজ অ্যাভেঞ্জার চালাচ্ছিল! কেতার বাইক! পিছনের ব্যাকরেস্টটা যে খোলা তা পিছনে বসে থাকা লোকটি খেয়াল করে নি! টার্ণিং-এর মুখে একটু আয়েস করে পিছনে ভার দিতে গিয়ে একদম চারপা তুলে দুম! আর হাতে সব জিনিসপত্র থাকায় ধরতেও পারে নিই কিছু!

আরে লোকের খোরাক! আহা আমারও যে এই অভিজ্ঞতা আছে তা আর বললাম না! সেই সেই ২০০২ সালের ১৯শে জানুয়ারি! তখনোও দু চাকা ঠিক করে চালাতে জানি না! তাই এক বন্ধুকে নিয়ে একটা নতুন স্কুটার কিনতে গেলাম! ১১৫ সিসি ১২৫ কিলোর ফোর স্ট্রোক বাজাজ লেজেণ্ড নেক্সট! তা তারপর সে বাড়ি অবধি পৌঁছিয়ে দিয়ে গেল! মাংস ভাত রান্না করে তাকে খাওয়ালাম! তারপর তাকে টা টা করে স্কুটার নিয়ে ফিরবো! ক্লাচ ব্রেক এক্সিলেরটরের কারিকুরি তখনও ঠিক মত সড়গড় নয়! ব্যাস! ফার্স্ট গিয়ারে নিয়ে এক্সিলেরেটরে রেস দেবার আগেই দিয়েছি ক্লাচ ছেড়ে! ও মা স্কুটার পুরোপুরি ঊর্দ্ধগামী! আর আমি চার পা তুলে মাটিতে! নিজেই হাসছি বটে! কিন্তু পশ্চাৎদেশের বালিশ ফুঁড়ে একেবারে মর্মবিদির্ণ করে ধাক্কা লেগেছে! আইব্বাপ! কি ব্যথা হয়েছিল! দু মিনিট সোজা হাঁটতে পারছিলাম না! কিন্তু যাকে বলছি সেই কুটোপুটি হেসে! বোজো কাণ্ড!
যাই হোক! এখানেই শেষ করে দিতাম! কিন্তু তাহলে আপনারা আমায় ঠ্যাঙাতেন পাঠক/ পাঠিকারা! বইমেলা গেলাম এত সেলফি গ্রুপি আর পোজ! কই গল্প না করেই পালাব নাকি?

তাহলে বইমেলার গল্প হিসাবেই দিই কটা!

সৃষ্টিসুখ থেকে এবার সাড়া জাগানো বই বেরিয়েছে ‘মীর এই পর্যন্ত’ আর তা মিরাক্কেলের স্টেজ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে বিজ্ঞাপন করেছেন স্বয়ং মীর! ব্যাস! আর যায় কোথা! চাহিদার জোগান দিতে দিতে পেরে উঠছি না! এমন হল প্রথম সংস্করণ সব শেষ প্রথম তিনদিনেই! যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পূনর্মুদ্রণের খোঁজ পড়েছে! কিন্তু সময় তো লাগে! তাই মাঝে রবিবার আর সোমবার ‘মীর আছে?’ উত্তর দিচ্ছি ‘মঙ্গলবার পাবেন’ বলে!
এমন হল যে আমরা শিখে গেলাম কে মীরের বই খুঁজতে আসছে! তার মধ্যেই এক ব্যাক ফায়ার! মাটিতে বসে আছি! এক ভদ্রলোক এলেন! আমি জিজ্ঞাসা করলাম! “মীর?” “সে আবার কি? রাশিয়ান বই?” “না না আপনি দেখুন!” “আচ্ছা মীরের বই বললেন? সেটা কি অনুবাদ” “নাহ নাহ মীর আফসার আলির উপর বই বেরিয়েছে!” “সে কে?” “ওই যে মিরাক্কেল?” “অ”। নিষ্ক্রমণ! আমার ইগোর মহাপ্রস্থান!
বাদ বাকি চাহিদা না চাহিদা মিষ্টি খাওয়া আপ্যায়ন নতুন বন্ধু পুরনো বান্ধবী পেরিয়ে মনে থেকে গেল আরেক গল্প।

মানুষ সৌরাংশুকে ফেসবুক এবং অন্যান্য সূত্রে চেনেন অনেকেই! কিন্তু লেখক সৌরাংশুকে দেখে কেউ বাক্যহারা হয়ে বন্ধুকে চুপিচুপি বলছে যে ‘একসঙ্গে একটু সেলফি তুলব! তুই একটু বলবি!’ অনুরোধটা শুনে আমারই মুখ থেকে ইয়াব্বড় ‘অ্যাঁ’ বেরিয়ে গেছিল! যাই হোক! ছোট্ট ব্যাপার কিন্তু আমার লেখক সত্ত্বার কাছে তো ছোট নয়! মানে ফুটপাথজীবীর আর কি বা রোলসরয়েস! তাই মনেই থেকে যায়!
যেমন থেকে গেল, সেই গোলাপ পাতা পানের গল্প! ছেলেটি সদা হাস্যমুখে পানের মধ্যে আমসত্ত্ব, আঙুর, চকোলেট থেকে সব ধরণের খাদ্য সম্পদ দিয়ে রুপোলী তবকে মুড়ে তারপর খাদককে বলছে, ‘Open your mouth’ আর তারপর যে কোথায় সেই পান মিলিয়ে যাচ্ছে মুখে এক অকল্পনীয় স্বাদ রেখে…! রোহণ দেখে বলল, ‘যা সব দিচ্ছে তা দিয়ে জুতোর শুকতলা মুড়ে দিলেও দারুণ খেতে হবে!’
আর কিছু? সবই আছে! সব ভালোবাসা ছবি আদর ডিঙিয়ে কিছু কিছু ঘটনা মনের সদর দরজা দিয়ে ঢুকে চিলেকোঠায় লুকিয়ে থাকে সযত্নে! সেগুলো শুধু আমারই থাকুক না হয়! খালি স্টল ফেলে আসার স্মৃতি আবার তা ভরে দেবার স্বপ্ন নিয়েই বাঁচি কটা মাস! আসছে বছর আবার হয়!

ও হ্যাঁ! ‘দেবাংশু সাহিত্য সম্মাননা’য় যারা উপস্থিত হলেন বা হতে পারলেন না! ফিসফাস লেখকের পক্ষ থেকে একটা ধন্যবাদ না দিলে তো চলেই না! বেশ সুন্দর কাটল সন্ধ্যাটা!

ইম্প্রোভাইজও করতে হল কয়েকবার! যেমন আগের অনুষ্ঠানটি ছিল সেক্সপিয়ার সোসাইটির! তারা বলেই যাচ্ছে বলেই যাচ্ছে! সাতটা পনেরো পেরিয়ে গেছে! আর আমি একটু একটু করে স্টেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি মিডিয়া সেন্টারে! যিনি আয়োজক তিনি বিব্রত! কিন্তু বিদগ্ধ জন্মেদের কবিতা পাঠ আর বক্তৃতা তাও চলেছে সমানে! আরে যেন আর কোথাও কেউ কবিতা পড়তে দেবে না!

তারপর সেই নিচু মাইকে বলতে বলতে তা হাতে তুলে নিয়ে বলতে শুরু করা! বাবা এবং আমার দুই পিসতুতো দাদার হাত দিয়ে সিদ্ধার্থদাকে প্রথম দেবাংশু সাহিত্য সম্মাননা প্রদান! দুদিন পরে বিয়ে বাড়ি যাবার জন্য ট্যাক্সির জন্য ছোটাছুটি! সিঁথির মোড়ের প্রেস থেকে বই নিয়ে আসা! আর বন্ধুদের সান্নিধ্য! এই সব টুকরো স্মৃতি জড়িয়েই তো বইমেলা! আবার আসব বললেই তো আর অঙ্গীকার আর মনের ভালোলাগা বোঝানো যায় না! কিছু কিছু কথা বুঝে নিতে হয়! পাঠক পাঠিকারা, এতদিনের সম্পর্ক! নিশ্চয় বুঝতে পারছেন কি বলতে চাইছি! সব কথা না হয় নাই লিখলাম! সঙ্গে থাকবেন! আরও গল্প হবে! আজীবন! আমেন!